📘 উলামা তলাবা > 📄 যুগ পরিবর্তনের অভিযোগ

📄 যুগ পরিবর্তনের অভিযোগ


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! আমি যেহেতু কথা বলছি দারুল উলূমে সেহেতু আমি ইলম সম্পর্কে কথা বলব এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণের ভবিষ্যত, তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং যুগের সঙ্কট ও ফেতনা সম্পর্কে আলোকপাত করব। আপনারা নিশ্চয়ই এইরূপ কথা খুব বেশি শুনে থাকেন যে, যুগের পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, দুনিয়া বদলে গেছে, আকাশ ও পৃথিবী বদলে গেছে, চিন্তার ধারা পাল্টে গেছে। এই যুগে দ্বীনী ইলম অর্জনে সময় ব্যয় করা, দ্বীনী ইলমে ব্যুৎপত্তি অর্জন, ইলমের সূক্ষ্মতম ও খুঁটিনাটি বিষয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ অসময়ের তবলা বাদন এবং পাহাড় খনন করে শুকনো ঘাস আহরণের ন্যায় নিষ্ফল নয় তো কী? এই যুগেই শুধু নয় বরং প্রত্যেক যুগেই যুগ পরিবর্তনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, এটাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। আপনি সাহিত্য ও কবিতা অধ্যয়ন করুন। দেখবেন, প্রত্যেক যুগেই এই কান্নারই আওয়াজ যে, যুগ বড় খারাপ হয়ে গেছে, যোগ্য ও যোগ্যতার কোন মর্যাদা নেই, কোন মূল্য নেই। সর্বত্র অযোগ্যতা ও অদক্ষতারই দৌরাত্ম্য। আরবী সাহিত্য ও আরবী কবিতা যদি দেখেন তাহলে আবুল আলা মাআরীকে বলতে শুনবেন-

تطاولت الارض السماء مفاهة وفاخرت الشهب الحصار الجنادل

আসমানের মুকাবিলায় ভূমি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব করে, আর কঙ্কর-পাথর গর্ব করে উল্কাপিণ্ডের মুকাবিলায়।

وقال السها للشمس انت ضئيلة وقال الدجى للصبم لونك حائل

ক্ষীণ আলো বিশিষ্ট ক্ষুদ্র তারকা সূর্যকে বলে তুমি তুচ্ছ আর অন্ধকার বলে প্রভাতকে তোমার রঙ তমসাচ্ছন্ন।

اذا نسب الطائتي بالبخل مادر وخَيْرَ فسا بالفهامة باقل

হাতেম তাঈ সম্পর্কে কার্পণ্যের অভিযোগ তোলে মাদির (জনৈক প্রসিদ্ধ কৃপণ ব্যক্তি) আর বাকিল (মনের ভাব প্রকাশে অক্ষম জনৈক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি) কুস্ ইব্‌ন সায়েদা (জাহেলী যুগের জনৈক বাগ্মী পুরুষ) কে বক্তব্য উপস্থাপনের বিষয়ে বিব্রত করে তোলে। কবি তাঁর কবিতার শেষে বলেন-

فيا موتُ زُرُ إنَّ الحياة دميمة ويانفس جدی ان دهرک هازল

অতএব, হে মৃত্যু! তুমি এসে আমার সাথে সাক্ষাত কর (অর্থাৎ আমাকে আলিঙ্গন কর।) কেননা, এ জীবন অতি মন্দ। (এর আর কোন উপভোগ্যতা নেই) আর হে আত্মা, তুমি গাম্ভীর্যের পথ অবলম্বন কর- কেননা, তোমার সমকালীন যুগ তোমাকে নিয়ে রসিকতা করছে। অন্য দিকে হাফেয শীরাজী অভিযোগ করেন-

این چه شوریست که در دور قمر می بینم همه آفاق پر از فتنه و شری بینم

এই হৈ চৈ কিসের, যা আমি জ্যোৎস্নাময় সময়ে দেখছি? সমগ্র জগৎ অনর্থ ও অমঙ্গলে পরিপূর্ণ দেখছি। তিনি আরও বলেন-

اسپ تازی شده مجروح بزیر پلاں طوق زرین همه در گردن খربিনম

'আরব্য অশ্ব পালান বা হাওদার চাপে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ে আছে। আর সোনার কণ্ঠহার সব গাধার গলায় দেখতে পাচ্ছি।' উর্দু কবিতা ও কাব্যে আপনি যুগের পরিবর্তনের এই অভিযোগ দেখবেন। যেমন কবি বলেন-

پھرتے ہیں اہل کمال آشفتہ حال افسوس
اے কمال افسوس ہے تجھ پر کمال افسوس

'আক্ষেপ! গুণ গরিমার অধিকারীরা বেহালদশা হয়ে ঘুরছে হে গুণ গরিমা! আক্ষেপ তোমার প্রতি, পরিপূর্ণ আক্ষেপ।'

কবিতা কয়টি হঠাৎই এখন মনে পড়ে গেল। এ রকম কবিতা ও যুগের বিরুদ্ধে অভিযোগ বহু কাব্যগ্রন্থে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যে কিতাবই দেখবেন যুগ সম্পর্কে মাতম দেখতে পাবেন, অভিযোগের স্তূপ দেখতে পাবেন। নিজের সুপ্ত যোগ্যতা কার সামনে প্রকাশ করা যাবে? যোগ্যতার মূল্যায়নকারী কোথায়? বিচক্ষণ ও দৃষ্টির অধিকারী লোক কোথায়? এটা অযোগ্যতা, অদক্ষতার যুগ। মানুষ কার জন্য পরিশ্রম করবে? কার জন্য শরীরের ঘাম পানি করবে? কার জন্য হৃদয়ের রক্ত ঝরাবে? আপনি যদি এইসব প্রশ্ন ও সমস্যা নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে না মাদরাসায় আপনার মন বসবে, না মেহনত করতে মন চাইবে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 আল্লাহর রীতি অপরিবর্তনীয়

📄 আল্লাহর রীতি অপরিবর্তনীয়


আমি আপনাদেরকে বলতে চাই যে, যুগের পরিবর্তন একটি চিরন্তন রীতি। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। শত বৎসর পূর্বের সময় ও যুগ দেখুন। কী খায়র ও বরকতের যুগ ছিল তা! বিশিষ্টজনেরা তো বটেই সেই যুগের সাধারণ লোকও এই যুগের বিশিষ্টজনদের চেয়ে গুণে-মানে শ্রেয় ছিল। ঈমানের কী তেজ ছিল তাদের! কী দ্বীনী মর্যাদাবোধ ছিল তাদের! দ্বীনী ইলম এবং হিফযে কুরআনের ক্ষেত্রে পুরুষ তো পুরুষ, নারীরাও ছিল ব্যাপকভাবে অগ্রগামী। বর্তমান যুগ বস্তুপূজা ও উদাসীনতার যুগ। দ্বীন, দ্বীনের ইলম ও দ্বীন সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি হয়ে পড়েছে কোণঠাসা। কিন্তু আমি আপনাদেরকে বলছি যে, শত পরিবর্তন সত্ত্বেও- যে পরিবর্তন পূর্বে হয়েছে এবং যা বর্তমানে হয়েছে বা পরবর্তীতে হবে- আল্লাহর রীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তাঁর রীতি তো অপরিবর্তনীয়। আল্লাহর চিরন্তন রীতিতে যুগের পরিবর্তনের কোন প্রভাব পড়তে পারে না। এই সত্যটি যখন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে তখন কুরআনের সাধারণ রীতির বাইরে গিয়ে একই কথার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। বলা হয়েছে-

فَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللهِ تَبْدِيلاً - وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَحْوِيلاً

'আল্লাহর বিধানের কখনও কোন পরিবর্তন পাবে না, আল্লাহর বিধানের কখনও কোন ব্যতিক্রম পাবে না।'

আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম কুদরত ও অপার জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশ্বজগত ও মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে যে আইন ও বিধান, যে নিয়ম ও রীতি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তার ব্যতিক্রম কখনও ঘটবে না। কিয়ামত পর্যন্ত সেসব বিধান ও রীতির কোন ব্যত্যয় ঘটবে না। কুরআন মজীদে অনুসন্ধান করে এবং হাদীস ও সুন্নাহ অধ্যয়ন করে এখন আমরা জানতে পারি যে, সেই নিয়ম ও রীতি, আইন ও বিধান কী? এর তালিকা অনেক দীর্ঘ। আমার ন্যায় শিক্ষানবীসের পক্ষে তার তালিকা প্রস্তুত করা সাধ্যের বাইরে। তবে আমার স্বল্প জ্ঞানের ভিত্তিতে সৃষ্টিগত ঐ বিধানাবলী ও নিয়ম-রীতির মধ্য থেকে তিনটি রীতির উল্লেখ করব। আমাদের জীবন এবং আমাদের মাদরাসা ও মাদরাসার লক্ষ্যের সঙ্গে যে রীতি তিনটির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

তন্মধ্যে একটি রীতি হল উপকারী বস্তুর নিকট মানুষের আত্মসমর্পণ, তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবনত হওয়া। উপকারী বস্তুকে স্বীকার করে নেওয়া ও তার মর্যাদা দান। উপকারীত্ব ও তার কেন্দ্রের সাথে মানুষের ভালবাসা সৃষ্টি হওয়া। উপকারী বস্তুকে তালাশ করা। যদি তা লাভ হয় তাহলে তার মূল্যায়ন করা মানুষের স্বভাবধর্ম। উপকারী বস্তুর স্থায়িত্ব ও তার সজীবতা বহাল রাখার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেছেন। যে বস্তুতে উপকার করার ক্ষমতা নাই তার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাকে স্থায়িত্ব দানের কোন নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়নি। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন-

فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُফা وَمَا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ كَذَالِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ

'যা আবর্জনা তা শুকিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় আর যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিতে থেকে যায়, এইভাবেই আল্লাহ তাআলা (ভ্রান্ত ও অভ্রান্তের) উদাহরণ দিয়ে থাকেন (যাতে তোমরা বোঝ)।' (সূরা রাদ ১৩: ১৭)

'অধিক উপযোগীর স্থায়িত্ব' নয় বরং কুরআনের ভাষা ও বর্ণনাশৈলী অনুযায়ী 'উপকারীর স্থায়ীত্বের' এই নীতি হাজার ও লাখ লাখ বছর যাবৎ কার্যকর হয়ে আছে। যুগের শত পরিবর্তন সত্ত্বেও এই নীতির কোন পরিবর্তন নেই। কিয়ামত পর্যন্ত এই নীতি অপরিবর্তিত রূপে বহাল থাকবে। উপকারী সত্ত্বার ক্রমশ উন্নতি লাভ, ফলে ফুলে সমৃদ্ধি লাভ এবং নিজের মর্যাদা ও গুরুত্বের স্বীকৃতি লাভ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত চিরন্তন রীতি। উপকারী সত্ত্বায় পরিণত হওয়া হাজার বিরোধিতা ও শত্রুতা থেকে রক্ষা পাওয়ার বড় অবলম্বন। এ ক্ষেত্রে পাবলিসিটি ও প্রচারেরও প্রয়োজন হয় না। উপকারী সত্ত্বার মধ্যে সৃষ্টি হয় অপরের ভালবাসা আকর্ষণের চৌম্বক ক্ষমতা। জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে তার প্রতি সকলে আকৃষ্ট হয়। ভৌগোলিক সীমারেখাও সেক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। উপকারীজন যদি পাহাড়ের চূড়ায় যেয়েও আত্মগোপন করে তবে দুনিয়া সেখানে গিয়েও তাকে তালাশ করে বের করে নেবে। মানুষ তাকে মাথায় করে বরং চোখের মণিরূপে গ্রহণ করে নিয়ে আসবে। এটাই আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত রীতি, যা হাজার হাজার বছর যাবৎ অপরিবর্তিতরূপে চলছে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 উপকারী সত্তার অনুসন্ধান

📄 উপকারী সত্তার অনুসন্ধান


আমার প্রিয় ছাত্রবৃন্দ। আপনারা নিজেদের মধ্যে উপকারীত্ব গুণ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করুন। তমসাচ্ছন্ন জীবনপথে আপনাদের দ্বারা যেন একজন পথিক আলোর সন্ধান পায়। আপনারা এরূপ গুণের অধিকারী হয়ে যান, যেন আপনার দ্বারা জ্ঞানবিষয়ক সমস্যার সমাধান লাভ হয়। আপনার সংসর্গে এলে ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি হয়, ঈমান সজীবতা লাভ করে। আপনার নিকট এসে মানুষ সুস্পষ্ট ধারণা ও বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভ করে যেতে পারে। আপনার মধ্যে এরূপ গুণ সৃষ্টি হওয়ার পর আপনি যদি আপনার ও জনগণের মাঝে প্রাচীরও নির্মাণ করেন, আপনি যদি দরওয়াজা বন্ধ করে বসে থাকেন আর লোকেরা যদি জানে যে, এখানে একজন উপকারী ব্যক্তি থাকেন, তার দ্বারা এই এই উপকার লাভ হয়, তাহলে লোকে প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে, দরজা ভেঙ্গে হলেও আপনার নিকট পৌঁছে যাবে।

এই পর্যায়ে হযরত মুহাম্মদ ইয়াকুব মুজাদ্দেদী ভূপালির একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। আল্লাহ তাআলা তাঁকে অনেক জটিল বিষয়কে সহজ ও সাধারণ উদাহরণ দ্বারা বোঝানোর দক্ষতা দান করেছিলেন। একবার জনৈক নবাব সাহেব তাঁর নিকট অনুযোগ করে বলল, হযরত! আমি বড় আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে বহু টাকা ব্যয় করে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। কিন্তু মসজিদটিতে কেউ নামায পড়তে আসে না। হযরত মুজাদ্দেদী সাহেবের বোঝানোর পদ্ধতি ছিল বড় চমৎকার। অনেক সময় তা হেঁয়ালী বলে মনে হত।

তিনি বললেন, মসজিদের দরওয়াজা ইট দিয়ে বন্ধ করে দিন। নবাব সাহেব অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। কারণ এতো সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যবস্থাপত্র! নবাব সাহেব বললেন, হযরত! আমি তো মসজিদ নির্মাণ করেছি নামাযের জন্য। মানুষ আসবে, নামায আদায় করবে, মসজিদ আবাদ হবে আমার উদ্দেশ্য তো এটাই। আর আপনি বলছেন মসজিদে কোন দরজা না রেখে দরজার জায়গাটুকু ইট দিয়ে বন্ধ করে দিতে। এ কেমন পরামর্শ?

হযরত বললেন, আমার কথা তো এখনও শেষ হয়নি। দরজা বন্ধ করে দিন এবং ভিতরে একজন লোককে বসিয়ে দিন এবং তার হাতে কিছু পঞ্চাশ টাকার অথবা দশ টাকার কিংবা পাঁচ টাকার নোট দিয়ে দিন। আর বাইরে ঘোষণা করিয়ে দিন যে, এই মসজিদে নোট বিতরণ করা হচ্ছে। আপনি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। কিন্তু লোকে জানে না, নামাযের কী সওয়াব, নামায আদায় করলে কী লাভ। সুতরাং তারা মসজিদে কেন আসবে? তারা টাকার কী ফায়দা তা জানে। তারা জানে যে, পাঁচ টাকা ব্যয় করে কী কী ক্রয় করা যায়, পাঁচ টাকায় কী কী কাজ হয়। কিন্তু তারা জানে না যে, নামায দ্বারা কী কী ক্রয় করা যায়, তা দ্বারা কী কী ফায়দা হাসিল হয়। অথচ আপনি আশা করছেন যে, শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে দূর-দূরান্ত থেকে কষ্ট সহ্য করে তারা আসবে। তা হবে কী করে? দেখুন টাকা হাতে দিয়ে আপনি লোক বসিয়ে দিন, ঢোল পেটানোরও প্রয়োজন হবে না। দেখবেন, অল্প সময়ে এই কথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে যাবে যে, আল্লাহ জানেন, নবাব সাহেব এই কাজ কেন করছেন, দরজার জায়গা ইট দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন আর হাজার হাজার টাকা দিয়ে একজন লোককে ভিতরে বসিয়ে দিয়েছেন। লোকটি ঐ টাকা বিতরণ করছে। ফল এই হবে যে, তারা প্রাচীর ভেঙ্গে মসজিদে প্রবেশ করবে। কেউ হাজার বাধা দিলেও তারা সে বাধা মানবে না।

তো আসল বিষয় হল উপকারিত্ব গুণ। যে গুণ থাকলে মানুষ পতঙ্গের ন্যায় ঐ গুণধারীর নিকট ভিড় করে। পতঙ্গকে বলতে হয় না যে, প্রদীপ জ্বলছে। কেউ কি কখনও ঘোষণা করে যে, হে পতঙ্গ। তোমরা প্রদীপের নিকটে আস? পানির ঝরনা যেখানে থাকে সেখানেই ভিড় করে পাখ-পাখালী, জীব-জানোয়ার ও মানুষজন। যুগ পরিবর্তনের অজুহাত তোলা দৃষ্টির দুর্বলতা ও অজ্ঞতা ও ভীরুতার পরিচায়ক।

📘 উলামা তলাবা > 📄 উপকারিত্ব গুণের সম্মোহনী শক্তি

📄 উপকারিত্ব গুণের সম্মোহনী শক্তি


আপনাদেরকে একটি মজার ঘটনা শোনাচ্ছি। ঘটনাটি শুনিয়েছেন লক্ষ্ণৌ শহরের একজন শীর্ষস্থানীয় ও নামজাদা ডাক্তার আবদুল হামিদ সাহেব মরহুম। তাঁর বুদ্ধিমত্তা, পাণ্ডিত্য ও পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার কথা হিন্দু-মুসলমান সকলেই একবাক্যে স্বীকার করত। ভারত বিভক্তির পর বারাহবাক্বীর একজন বিত্তশালী, নামকরা ব্যবসায়ী হিন্দু তাঁকে বিদ্রূপের সুরে বলল, কী ব্যাপার ডাক্তার সাহেব! আপনি পাকিস্তানে গেলেন না? তিনি বললেন, না, আমি হিন্দুস্তানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আল্লাহ তাআলার কারিশমা! একবার ঐ হিন্দু ভদ্রলোক কঠিন রোগে আক্রান্ত হল। নানা রকম চিকিৎসা, বড় বড় ডাক্তারের পরামর্শ কোন কিছুতেই সে সুস্থতা লাভ করল না। অবশেষে হার স্বীকার করে সে ডাক্তার আবদুল হামিদ সাহেবের শরণাপন্ন হল। ডাক্তার সাহেব যখন তাকে দেখতে গেলেন এবং চিকিৎসা শুরু করলেন তখন বললেন, দেখুন, আমি যদি পাকিস্তান চলে যেতাম তাহলে কি আপনি আমাকে চিকিৎসার জন্য ডেকে পাঠাতে পারতেন? আল্লাহর কী কারিশমা! হিন্দু ভদ্রলোকটি এই ডাক্তার সাহেবের চিকিৎসাতেই আরোগ্য লাভ করে এবং তাকে চরম লজ্জা পেতে হয়।

আমার প্রিয় ছাত্রবৃন্দ। আমি আপনাদের হাজারো সমস্যার সমাধান একটাই মনে করি। তা হল আপনারা আপনাদের উপকারীত্ব ও যোগ্যতার স্বীকৃতি আদায় করে নিন। আপনারা প্রমাণ করুন যে, আপনাদের নিকট যে জ্ঞান ও আদর্শ রয়েছে তা দুনিয়ার কারও কাছে নেই। দুনিয়ার নিয়ম হল, যে পণ্য যে দোকানে পাওয়া যায় মানুষ তা ক্রয়ের জন্য সেই দোকানেই উপস্থিত হয়। একজন গুণী অপর গুণীর নিকট উপস্থিত হয়, যার নিকট লাভ করা যায় হৃদয়ের পরিতৃপ্তি, আত্মিক রোগের ঔষধ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ছিলেন হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের ইমাম। বাগদাদে তৎকালীন যুগের সকল মানুষের আকর্ষণের মধ্যমণি। কিন্তু তিনিও আত্মার খোরাক সংগ্রহের উদ্দেশ্যে, রূহকে শক্তিশালী করতে ছুটে যেতেন বাগদাদের একজন হৃদয়-সম্পন্ন ছাহেবে দিল বুযুর্গের দরবারে। ইলম ও জ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যাঁর সাথে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কোন সম্পর্ক ছিল না। একবার ইমাম সাহেবের এক ছেলে তাঁকে বলল, আব্বাজান! আপনি সেখানে গেলে আমাদের সকলের মাথা নীচু হয়ে যায়। লোকে নানা রকম কথা বলে। তিনি বললেন, বৎস! মানুষ যেখানে ফায়দা দেখে, লাভ দেখে সেখানেই যায়। আমি ঐ বুযুর্গের কাছে আমার কলবের ফায়দা পাই।

এই যে দরসে নিযামী, যা আজ কাগজের নোটের ন্যায় ব্যাপকভাবে বিভিন্ন দেশে চলছে তা মোল্লা নিযামুদ্দীন ফিরিঙ্গি মহল্লী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও বিন্যাসকৃত, যিনি ছিলেন উস্তাযুল উলামা, উস্তাযুল হিন্দ, আলেমকুল শিরোমনি। জ্ঞান গরিমায়, ইলম ও পূর্ণতায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও তিনি সাইয়েদ আবদুর রাজ্জাক বাঁসবী কাদেরীর মুরীদ ছিলেন- যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল প্রাথমিক স্তরের। স্তরের কিছু কিতাবাদি তিনি অধ্যয়ন করেছিলেন। কথা বলতেন ঊধু অঞ্চলের পূরবী ভাষায়। মোল্লা নিযামুদ্দীন (রহ.) ঐ বুযুর্গের বাণীসমূহের একটি সংকলনও প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি যখন তাঁর নাম নিতেন তখন শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে তাঁর নাম নিতেন। এর কারণ আর কিছুই নয়। মোল্লা নিযামুদ্দীন নিজের জ্ঞান-গরিমার শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও নিজের মধ্যে একটা কিছুর অভাববোধ করতেন, যে অভাব তিনি পূরণ করতে পারতেন ঐ বুযুর্গের কাছে যেয়ে। মোল্লা নিযামুদ্দীন সকলের উস্তাদ ও গুরু ছিলেন। কিন্তু তাঁরও অন্বেষা ছিল এমন এক ব্যক্তিত্বের যেখানে যেয়ে তাঁর অনুভব হবে যে, তিনি কিছুই নন এবং এখনও তার অনেক কিছু জানার ও শেখার আছে।

হযরত মাওলানা আবদুল হাই বাড়হানাবী এবং হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ (রহ.)-এর নাম কে না জানে। হযরত মাওলানা শাহ আবদুল আজীজ (রহ.) প্রথম জনকে 'শায়খুল ইসলাম' এবং দ্বিতীয় জনকে 'হুজ্জাতুল ইসলাম' অভিধায় অভিহিত করতেন। তাঁরা দুইজন হযরত সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর হাতে বায়আত ছিলেন। অথচ সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সব স্তর অতিক্রম করতে পারেননি। দেওবন্দের প্রবীণ ব্যক্তিগণ বর্ণনা করেন, যখন সাইয়েদ সাহেব এখানে আগমন করতেন তখন উক্ত বুযুর্গদ্বয়ের অবস্থা এরূপ হত যে, সাইয়েদ সাহেব খাটে ঘুমিয়ে পড়তেন আর তাঁরা খাটের ডান পাশে ও বাম পাশে বসে থাকতেন। সাইয়েদ জাগ্রত হয়ে কিছু বললে তাঁরা সেই কথা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন এবং তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীর স্বাদ উপভোগ করতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00