📄 জ্ঞানের সূচনা হওয়া উচিত প্রতিপালকের নামে
‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযি খালাক’ (পাঠ কর, তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন)।
সর্বাপেক্ষা বড় বিপদ ছিল এই যে, রব ও প্রতিপালকের সঙ্গে জ্ঞানের সম্পৃক্ততা বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে জ্ঞান তার সঠিক ও বিশুদ্ধ পথ হারিয়ে ফেলেছিল। এই ভাঙ্গা সম্পর্ককে এখানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যখন ইলম ও জ্ঞানের বিষয় আলোচিত হল, ইলম ও জ্ঞানকে যথাযথ মর্যাদা দান করা হল তখন সঙ্গে সঙ্গে এই কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল যে, এই জ্ঞানের সূচনা হওয়া উচিত রব ও প্রতিপালকের নামে। কারণ ইলম ও জ্ঞান তাঁরই দান। তাঁরই সৃষ্টি। তাঁরই নির্দেশনায় তা যথোপযুক্ত উৎকর্ষ ও উন্নতি লাভ করতে পারে। এটা ছিল এক বিপ্লবী আওয়াজ, যা এই পৃথিবীবাসী প্রথম শুনেছিল, যার কল্পনাও কেউ কোনদিন করতে পারে না। যদি পৃথিবীর সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদেরকে আহ্বান জানানো হত যে, আপনারা বলুন তো, যে ওহী নাযিল হবে তার সূচনা কোন্ কথা দ্বারা হতে পারে? কোন্ বিষয়কে সূচনার মর্যাদা দেওয়া হবে? আমি নিশ্চিত যে, তাদের কেউই— যারা ঐ নিরক্ষর জাতি ও তাদের মেজায ও প্রকৃতি, তাদের মস্তিষ্ক-শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল— একথা বলতে পারত না যে, ওহীর সূচনা হবে ‘ইকরা’ (পাঠ কর) দ্বারা।
ইকরা (পাঠ কর)। এ ছিল এক বিপ্লবী দাওয়াত ও বিপ্লবী আহ্বান যে, ইলমের ও জ্ঞানের যাত্রার সূচনা হওয়া উচিত মহাপ্রজ্ঞাবান ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশনায়। কারণ, এই যাত্রা বড় দীর্ঘ ও জটিল যাত্রা। এই যাত্রা কুসুমাস্তীর্ণ নয়, কণ্টকাকীর্ণ। এই যাত্রায় দিন-দুপুরে ডাকাত দল সর্বস্ব লুটে নেয়। এই যাত্রার পদে পদে রয়েছে ভয়াবহ গভীর খাদ। প্রতি পদে রয়েছে সাপ ও বিচ্ছু। তাই মনযিলে মকসুদে পৌঁছাতে এই যাত্রায় একজন সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ পথ প্রদর্শকের সঙ্গ প্রয়োজন। আর সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ পথ প্রদর্শক আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ নয়; হতে পারে না। এই ইলম ও জ্ঞান নিছক জ্ঞান ও সাহিত্যের নাম নয়। ঐ জ্ঞান জ্ঞান নয়, যা চিত্রকর্ম ও চিত্রশিল্প শিক্ষাদান করে, যা খেলনা খেলতে শেখায়। শুধুই চিত্ত আকর্ষণের নাম ইলম বা জ্ঞান নয়। যে বিদ্যা এককে অপরের বিরুদ্ধে শত্রু করে তোলে, জাতিতে জাতিতে বিভেদ সৃষ্টি করে, শত্রুতা সৃষ্টি করে তার নাম ইলম ও জ্ঞান নয়। যে বিদ্যা শুধু উদরপূর্তির পদ্ধতি শিক্ষাদান করে তার নাম ইলম ও জ্ঞান নয়। যে বিদ্যা শুধু ভাষা ব্যবহার পদ্ধতি শিক্ষাদান করে তার নাম ইলম ও জ্ঞান নয়; বরং—
'ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযি খালাক - খালাকাল ইনসানা মিন আলাক - ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরাম - আল্লাযি আল্লামা বিল কালাম - আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়ালাম।'
পাঠ কর, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক হতে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহা অনুগ্রহশীল, যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দান করেছেন, শিক্ষা দান করেছেন মানুষকে, যা সে জানত না।
বলা হল, পাঠ কর— তোমার প্রতিপালক বড় কারীম, বড় অনুগ্রহশীল। তিনি তোমাদের প্রয়োজন, তোমাদের দুর্বলতা সম্পর্কে সম্যক অবগত। 'ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরামুল্লাযি আল্লামা বিল কালাম' (পাঠ কর, আর প্রতিপালক বড় কারীম, যিনি শিক্ষাদান করেছেন কলম দ্বারা)। লক্ষ্য করুন, কলমের মর্যাদাকে এতদপেক্ষা উচ্চতা আর কে দান করেছে? গারে হেরায় অবতীর্ণ প্রথম ওহীতেও যে কলমের কথা অনুচ্চারিত থাকেনি, যার উল্লেখ আল্লাহ তাআলা করতে ভোলেননি? অথচ তখন কলম এরূপ একটি বস্তু ছিল, যা তন্ন তন্ন করে তালাশ করেও মক্কার কোন ঘরে পাওয়া অসম্ভব ছিল। যদি আপনি তালাশ করতে বের হতেন তাহলে হয়তো তা পেতে পারতেন ওরাকা ইবনে নাওফল অথবা আরবের বাইরে শিক্ষাপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তির ঘরে।
অতঃপর আয়াতটিতে এক বিপ্লবাত্মক, অবিনশ্বর ও শ্বাশত মহাসত্য উচ্চারিত হয়েছে যে, ইলম ও জ্ঞানের কোন শেষ নেই। বলা হয়েছে— 'আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়ালাম' (শিখিয়েছেন মানুষকে, যা সে আগে জানত না)। সাইন্স ও টেকনোলজী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার স্বরূপ কী? মানুষ চাঁদে গমন করছে। মহাশূন্য ভ্রমণ করছে। পৃথিবীর দূরত্ব কমিয়েছে— এসব 'আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়ালাম'-এর কারিশমা নয় তো আর কী?