📘 উলামা তলাবা > 📄 বিদআত কী?

📄 বিদআত কী?


আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে বিষয়ের নির্দেশ দান করেননি, যে বিষয়কে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয় বলে সাব্যস্ত করেননি এরূপ বিষয়কে দ্বীনের অংশ বানিয়ে নেওয়া, দ্বীনী বিষয় বলে সাব্যস্ত করে নেওয়া এবং তা সওয়াব ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে পালন করার নাম বিদআত। তদ্রূপ কোন ইবাদতে নিজেদের মনগড়া নিয়ম ও রীতি-প্রথাকে শরয়ী নির্দেশের ন্যায় মান্য করাও বিদআত।

শিরক ও কুফর যেমনটা পূর্বে বলা হয়েছে, যদি স্বতন্ত্র ও পৃথক এক ধর্ম হয়ে থাকে তবে বিদআত হল স্বতন্ত্র এক শরীয়ত, যার রচয়িতা ও প্রণেতা মানুষ। শিরক ও কুফরের সাথে ইসলামের পার্থক্য থাকে সুস্পষ্ট। কারণ তা ইসলাম বহির্ভূত বিষয়। আর বিদআত ইসলামের অভ্যন্তরীণ শত্রু। ইলাহী দ্বীনের অভ্যন্তরে মানব রচিত শরীয়তী রূপ, যা ভিতরে ভিতরে জন্ম ও বৃদ্ধি লাভ করে। এমনকি তাকে যদি স্বাধীনভাবে বৃদ্ধি পেতে দেওয়া হয়, তাহলে তা কখনো কখনো মূল শরীয়ত অপেক্ষা কয়েক গুণ বেশি বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং ধীরে ধীরে শরীয়তে ইলাহীর সমস্ত স্থান ও মানুষের জীবনের সমস্ত সময়টা দখল করে নেয়। এই শরীয়তের আইনশাস্ত্র স্বতন্ত্র। এর সুন্নাত, মুস্তাহাব, ফরয, ওয়াজিব সবকিছু হয় স্বতন্ত্র, শরীয়তে ইলাহী হতে ভিন্ন। বিদআত সর্বপ্রথম আঘাত হানে এই মূলনীতিতে যে, আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার। কোন কিছুকে আইনের মর্যাদা দান এবং তা পালন ও মান্য করাকে জরুরী সাব্যস্ত করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার। মানব কর্তৃক আইন রচনা, কোন কিছুকে আইনের মর্যাদা দান প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার এই অধিকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা। এই কারণেই আইন প্রণয়নকারী মানুষকে কুরআনুল কারীম তাগূত নামে আখ্যায়িত করেছে। কুরআন বলেছে— ‘ইউরিদুনা আই ইয়াতাহাকামু ইলাত তাগূতি ওয়া ক্বদ উমিরু আই ইয়াকফুরু বিহি’ (তারা তাগূতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করতে)।

এটা তো সাধারণ আইন রচনার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। কিন্তু এতদপেক্ষা আরও গর্হিত হল বিদআত তথা কোন কিছুকে দ্বীন ও শরীয়ত বলে সাব্যস্ত করা এবং নির্দিষ্ট রূপ ও নিয়ম-নীতিতে তা পালন করাকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সওয়াব লাভের উপায় বলে মনে করা। কারণ এটা তো শরীয়ত রচনার নামান্তর। আর কুরআন বলে দ্বীন ও শরীয়ত রচনা একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাজ। 'শারাআ লাকুম মিনাদ দ্বীনি মা ওয়াসসা বিহী নূহাও ওয়াল্লাযী আওহাইনা ইলাইকা' (তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন ঐ দ্বীন যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে আর যা আমি তোমাকে ওহী করেছি)। (সূরা শূরা ৪২: ১৩) মক্কার কাফেররা যখন নিজেদের পক্ষ থেকে হালাল-হারাম সাব্যস্ত করণের পথ অবলম্বন করল তখন কুরআন তাদের প্রতি এই নিন্দাবাদই ব্যক্ত করেছে। 'আম লাহুম শুরাকাউ শারাউ লাহুম মিনাদ দ্বীনি মা লাম ইয়াযান বিহিল্লাহ' (তাদের কি এমন কতকগুলো দেবতা আছে যারা তাদের জন্য বিধান দিয়েছে এমন দ্বীনের যার অনুমতি আল্লাহ দেন নাই?)। (সূরা শূরা ৪২: ২১)

আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত এই আইন প্রণয়নটি কী ছিল তার বিস্তারিত বিবরণ শুনুন। 'ওয়া ক্বালু হাযিহী আনআমুন ওয়া হারছুন হিজরুন লা ইয়াত’য়ামুহা ইল্লা মান নাশা-উ বিযা’মিহিম ওয়া আনআমুন হুররিমাত যুহুরুহা ওয়া আনআমুল লা ইয়াযকুরু নাসমাল্লা-হি আলাইহাফতিরা-আন আলাইহি সাইয়াজযীহিম বিমা কানু ইয়াফতারুন। ওয়া ক্বালু মা ফী বুতুনি হাযিহিল আনআমি খলিসাতুল লিযু কুরিনা ওয়া মুহাররামুন আলা আযওয়া-জিনা ওয়া ইইয়্যাকুম মাইতাতান ফাহুম ফীহি শুরাকাউ সাইয়াজযীহিম ওয়াসফাহুম ইন্নাহু হাকীমু আলীম' (তারা তাদের ধারণা অনুসারে বলে, এইসব গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত্র নিষিদ্ধ; আমরা যাকে ইচ্ছা করি সে ব্যতীত আর কেউ এসব আহার করতে পারবে না এবং কতক গবাদি পশুর পৃষ্ঠে আরোহণ নিষিদ্ধ এবং কতক পশু যবেহ করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনার উদ্দেশ্যে; এই মিথ্যা রচনার শান্তি আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই দিবেন)। (সূরা আনআম ৬:১৩৮) তারা আরও বলে এইসব গবাদি পশুর গর্ভে যা আছে তা আমাদের পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট এবং আমাদের স্ত্রীদের জন্য নিষিদ্ধ। আর যদি তা মৃত হয় তবে সকলেই তাতে অংশীদার। তিনি তাদের এইরূপ বলার শাস্তি অচিরেই তাদেরকে দিবেন; নিশ্চয়ই তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। (সূরা আনআম ৬ : ১৩৯)

আরবের এই আইন প্রণেতাদের অপরাধ কী ছিল, যে অপরাধকে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা ও মিথ্যা আরোপ বলে অভিহিত করা হয়েছে? তা তো ছিল এটাই যে, তারা কোন আসমানী কিতাবের দলিল-প্রমাণ ব্যতিরেকে শুধু নিজেদের মত অনুযায়ী একটা জিনিসকে একজনের জন্য হালাল আর অপরের জন্য হারাম সাব্যস্ত করেছে। আর এক্ষেত্রে তারা এমন কিছু বিধি-বিধান ও আইন-কানুন ও মূলনীতি নির্দিষ্ট করেছে, যার পক্ষে কোন আসমানী কিতাবের দলিল ও সমর্থন ছিল না। অতঃপর ঐসব আইন-কানুন ও মূলনীতি মান্য করাকে তারা নিজেদের জন্য এবং অপরের জন্যও এমনভাবে অপরিহার্য করে দিয়েছে যেরূপ নবীগণের শরীয়ত ও আইন-কানুন মান্য করা অপরিহার্য হয়ে থাকে। আল্লাহর শরীয়ত অমান্যকারীদেরকে যেরূপ অপরাধী ও শাস্তিযোগ্য বলে মনে করা হয়, তাদের প্রণীত আইন-কানুন অমান্যকারীদেরকেও তারা ঐরূপ অপরাধী ও শাস্তিযোগ্য বলে মনে করত।

ইমাম মালেক (রহ.) চমৎকার বলেছেন— 'মান ইব্তাদাআ ফিল ইসলামি বিদ্আতান ইয়াহ হাসানা ফাকদ যাআমা আন্না মুহাম্মাদান সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা খনা রিসালাতা ফাইনাল্লাহা সুবহানাহু ইয়াকুলু, আল ইয়াউমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম ফামা লাম ইয়াকুন ইয়াউমা ইযিন দ্বীনান ফালা ইয়াকুনুল ইয়াউমা দ্বীনান' (যে ব্যক্তি ইসলামে কোন বিদআতের প্রচলন ঘটায় এবং সেটাকে ভাল বলে জ্ঞান করে প্রকারান্তরে সে যেন দাবি করে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন, ত্রুটি করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন— আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম। অতএব রাসূলের জীবদ্দশায় যা দ্বীনের অংশ ছিল না তা আজও দ্বীনের অংশ হতে পারে না)।

শরীয়তে ইসলামীর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, তার সর্বকালীনতা, সর্বকালেই তার আমলযোগ্য হওয়া। আল্লাহ তাআলা সর্বজ্ঞাতা ও প্রজ্ঞাবান। তিনি মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা, তাদের কল্যাণ, অকল্যাণ তাদের নানাভিধ পরিবেশ ও অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দয়ালু, অনুগ্রহশীল। তাঁর সর্বব্যাপ্ত জ্ঞান ও অসীম দয়ার ভিত্তিতে তিনি তাঁর নবীগণের মাধ্যমে মানুষের জন্য যে শরীয়ত ও বিধি-বিধান দান করেছেন তা অত্যন্ত সহজ ও সরল, সর্বাবস্থায় মানুষের জন্য যা আমলযোগ্য। শরীয়তের বিধি-বিধান বিধিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি মানুষের মানবীয় দুর্বলতা, সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার প্রতি পূর্ণ লক্ষ্য রেখেছেন। তাদের শক্তি ও সামর্থ্য, কাল ও পরিবেশের প্রতি পূর্ণ লক্ষ্য রেখে তিনি তাদের জন্য এক সর্বজনীন ও সর্বকালীন, চিরন্তন ও শাশ্বত বিধান দান করেছেন। তিনি বলেন— 'লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উসহাহা' (আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কর্মের দায়িত্ব অর্পণ করেন না)। (সূরা বাকারা ২: ২৮৬) 'ইউরিদুল্লাহু আই ইউখাফফিফা আনকুম ওয়া খুলিকাল ইনসানু দয়িফা' (আল্লাহ তোমাদের ভার লঘু করতে চান; মানুষকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলরূপে)। (সূরা নিসা ৪: ২৮)

ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের এই অপরাধের কথাই কুরআন বলেছে এভাবে— 'ইত্তাখাযু আহবারাহুম ওয়া রুহবানাহুম আরবাবাম মিন দুনিল্লাহ' (তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসার বিরাগীগণকে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করে নিয়েছে)। (সূরা তাওবা ৯: ৩১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদী ইবনে হাতেম (রাযি.)-এর সামনে আয়াতটির এই ব্যাখ্যাই করেছিলেন। খ্রিস্টান পাদ্রী, পুরোহিত ও পণ্ডিতেরা যে জিনিসকে জনগণের জন্য হালাল বা হারামরূপে সাব্যস্ত করে দিত, তারা বিনা আপত্তিতে তা মেনে নিত এবং পাদ্রী, পুরোহিত ও পণ্ডিতদেরকে তারা বিধান প্রণেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিত। বস্তুত কোন কিছুকে হালাল বা হারাম সাব্যস্তকরণ এবং কোন কিছুকে শরয়ী দলিল ব্যতীত ফরয বা ওয়াজিব সাব্যস্ত করণ আর কোন ইবাদতকে বিশেষ রূপদান ও তার জন্য নিজেদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট শর্তাদি আরোপ করে তাকে সওয়াবের কাজ বলে মনে করার মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। উভয়টিই ‘মা লাম ইয়াযান বিহিল্লাহ’ (আল্লাহ যার অনুমতি দেননি)-এর আওতাভুক্ত।

বিদআত যে দ্বিতীয় সত্যের মূলে আঘাত হানে তা হল, শরীয়ত পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, যা নির্ধারিত হওয়ার তা নির্ধারিত হয়ে গেছে। একজন মানুষের মুক্তির জন্য যা যা জরুরী, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য যে উপায়াদির প্রয়োজন, শরীয়ত তার সবকিছুই স্পষ্ট ব্যক্ত করে দিয়েছে, দ্বীনের টাকশাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এখন যে মুদ্রাই দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত করা হোক না কেন তা নকল ও জাল বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আল ইয়াউমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নি’মাতি ওয়া রদিতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীনা’ (আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম)। (সূরা মায়েদা ৫: ৩) ‘ওয়ামা জাআলা আলাইকুম ফিদ দ্বীনি মিন হারাজ’ (তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই)। (সূরা হাজ্জ ২২:৭৮)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তিনি বলেছেন— ‘লাকাদ জাআকুম রাসূলুম মিন আনফুসিকুম আযীযুন আলাইহি মা আনিত্তুম হারীসুন আলাইকুম বিল মুমিনিনা রউফুর রহীম’ (অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট এক রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু)। (সূরা তাওবা ৯ : ১২৮) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আনীত দ্বীন সম্পর্কে বলেছেন— ‘বুয়িছতু বিল হানীফিয়্যাতিস সামহাতি ইন্না হাযাদ দ্বীনা ইউসর’ (আমাকে নিতান্ত সাদাসিদা, সরল দ্বীন দিয়ে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই দ্বীন সহজ)। উম্মতের তাকলীফ ও কষ্টের প্রতি তাঁর এত বেশি দৃষ্টি ছিল যে, তিনি বলেছেন— ‘লাওলা আন আশুক্কা আলা উম্মাতি লাআমারতুহুম বিস সিওয়াকি ইনদা কুল্লি সলাত’ (যদি আমার উম্মতের কষ্ট হবে বলে আমার ধারণা না হত, তাহলে তাদেরকে আমি নির্দেশ দিতাম প্রত্যেক নামাযের সময় মিসওয়াক করতে)।

তবে দ্বীনের এই সহজতা এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এর জামানত ততক্ষণই বহাল থাকে ততক্ষণ আল্লাহ তাআলাই হন বিধানদাতা এবং শরীয়ত হয় তাঁরই। কিন্তু মানুষ যখন আইন প্রণেতা হয়, আর তারা ইলাহী শরীয়তে হস্তক্ষেপ করতে থাকে, অন্য কিছু সংযোজন করতে থাকে তখন আর এই দ্বীনের সহজতা অবশিষ্ট থাকতে পারে না। না মানুষের জ্ঞান সর্বব্যাপ্ত, না মানুষ মানুষের প্রয়োজনাদি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। না সে কালের ব্যবধান ও পরিবেশের ব্যবধানের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে পারে, না সে স্ব-জাত মানুষের প্রতি ঐ দরদ রাখতে পারে যে দরদ আছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। ফল দাঁড়ায় এই যে, বিশুদ্ধরূপে থাকা অবস্থায় যে দ্বীন প্রত্যেকের জন্য সহজে আমলযোগ্য হয় সেই দ্বীন ঐসব বিদআতের মিশ্রণে এবং বারবার দ্বীনে সংযোজনের ফলে তা এত দীর্ঘ, জটিল ও সুকঠিন হয়ে যায় যে, দ্বীনের উপর আমল করা ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে পড়ে। মানুষ দ্বীন থেকে পলায়নপর হয়ে পড়ে, দ্বীন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা না করার ফাঁক-ফোকর অন্বেষণ করতে থাকে। অনেকে ঐ দ্বীনের লাগাম নিজের গলা থেকে সম্পূর্ণরূপে খুলে ফেলে।

বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস অধ্যয়ন করে জানা যায় যে, ধর্ম পরিহার করে চলার ও কোন কোন ক্ষেত্রে নাস্তিক হয়ে যাওয়ার বড় কারণ ঐ অসংখ্য নবসৃষ্ট বিদআত, যা পালন করা মধ্য পর্যায়ের ধার্মিকদের জন্য হয়ে পড়েছিল প্রায় অসম্ভব। মধ্যযুগে গীর্জার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক যে বিদ্রোহের সুচনা হয়েছিল তার কারণও ছিল এই নবসৃষ্ট বিদআতভিত্তিক 'ধর্মীয় আচারের, যার সাথে মূল খ্রিস্টধর্মের কোন সম্পর্কই ছিল না। এটাও লক্ষ্যণীয় যে, ইলাহী দ্বীন ও শরীয়তের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল তার সর্বকালীন ও সর্বজনীন অভিন্নতা। এই অভিন্নতা যেমন কালগত দিক থেকে তেমনই স্থানগত দিক থেকেও। আল্লাহ তাআলা যেহেতু ‘রব্বুল মাশরিক্বাইনি ওয়া রব্বুল মাগরিবাইনি’ (তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের প্রভু) তিনি যেহেতু কাল ও স্থানের বন্ধন ও সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে সেহেতু তাঁর প্রদত্ত শরীয়তে পূর্ণাঙ্গ অভিন্নতা বিদ্যমান। তাঁর শেষ শরীয়ত যা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে তা সকলের জন্য অভিন্ন। যেমন অভিন্ন সূর্য। পৃথিবী ও আকাশ যেমন সকলের জন্য এক ও অভিন্ন। প্রাথমিক যুগে এই দ্বীনের যে রূপ ও আকৃতি ছিল, হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীতে এসেও তার ঐ একই রূপ ও আকৃতি বিদ্যমান। যতটুকু তা প্রাচ্যের জন্য ততটুকুই তা প্রতীচ্যের জন্য। যে নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, ইবাদতের যে রূপ, আল্লাহর তাআলার নৈকট্য লাভের যে নির্দিষ্ট ধারা আরবদের জন্য নির্ধারিত ছিল তা সমভাবে নির্ধারিত ভারতবাসীদের জন্যও। এই কারণে পৃথিবীর কোন প্রান্তের মানুষ যদি অপর প্রান্তে গমন করে তবে ইসলামের ফরয-ওয়াজিব আদায় করতে এবং মসজিদে যেয়ে ইবাদত করতে তার কোন সমস্যা সৃষ্টি হবে না এবং তার জন্য স্থানীয় কোন নির্দেশনা ও পথ প্রদর্শকেরও প্রয়োজন হবে না। সে যেখানেই যাক স্থানটিকে ধর্মীয় দিক থেকে অপরিচিত ও নিজেকে ভিনদেশী বলে মনে হবে না। সে যদি আলেম হয়ে থাকে তাহলে মুক্তাদী নয় বরং ইমামও হয়ে যেতে পারে এবং সর্বত্র সে ফতোয়া দানের কাজও করতে পারে।

কিন্তু বিদআতের এইরূপ কোন বৈশিষ্ট্য নেই। বিভিন্ন স্থানের বিদআতের মধ্যে একতা ও অভিন্নতা পাওয়া যায় না। বিদআতে স্থান ও কালের প্রভাব বিদ্যমান থাকে। বিভিন্ন স্থানের বিদআত স্থানীয় ছাঁচে গড়ে উঠে। বিদআতের টাকশাল বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম হয়। বিদআতকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সমভাবে চালু কলা সম্ভব হয় না। মুসলিম বিশ্বের সকল মুসলমান নির্দিষ্ট কোন বিদআত সম্পর্কে জানবে তা নিশ্চিত নয়। জানলেও সকলেই তা গ্রহণ করে নেবে তা জরুরী নয়। এ কারণেই ভারতের বিদআত এক রকম, মিসরের বিদআত আরেক রকম। অদ্রূপ ইরান ও সিরিয়ার বিদআতের মাঝে কোন সাদৃশ্য নেই। ভিন্ন ভিন্ন দেশের বিদআতের মধ্যকার পার্থক্য তো অনেক পরের কথা, অনেক সময় একই দেশের ভিন্ন ভিন্ন শহরের বিদআত ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয়। এক শহরের বিদআত সম্পর্কে অন্য শহরের অধিবাসীদের কোন পরিচিতিই থাকে না। এই সীমাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেতে পেতে মহল্লায় মহল্লায় পার্থক্য, ঘরে ঘরে পর্যন্ত পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। একেক মহল্লার বিদআত একেক রকম আর একেক ঘরের বিদআত একেক রকম হয়ে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে ছিল অপরাপর শরীয়ত ও ধর্মের শিক্ষণীয় পরিণতি। ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মের বিকৃত ও পরিবর্তিত রূপও ছিল তাঁর সামনে। এইজন্য তিনি ইসলামী শরীয়তকে তার প্রকৃত রূপ ও আসল আকৃতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য যাবতীয় সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর সাহাবীগণকে সুন্নাত আঁকড়ে ধরতে ও বিদআত পরিহার করে চলতে জোর নির্দেশ দান করেছেন এবং সেইমত তাদেরকে শিক্ষাদান করেছেন। তাঁর সরাসরি শিষ্য সাহাবীগণ তাঁর নির্দেশ যথাযথ পালন করেছেন এবং বিদআতের ব্যাপারে তাঁরা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। বিদআতের ব্যাপারে কোন রকম শৈথিল্য কি দুর্বলতা তাঁদের থেকে প্রকাশ পায়নি।

সাহাবীগণের পর ইসলামের ইমাম ও ফকীহগণ এত উচ্চ পর্যায়ের বুদ্ধিদীপ্ততা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, যা নবীগণের উত্তরসূরীদের জন্যই যথোপযুক্ত। তাঁরা সর্বকালে বিদআতের কঠোর বিরোধিতা করেছেন। জ্ঞানগত ও কার্যগত উভয় দিক থেকে তাঁরা বিদআতপন্থীদের মোকাবেলা করেছেন। ইসলামী সমাজে বিদআত যাতে সুদৃঢ় ও গ্রহণযোগ্য হতে না পারে এবং বিদআতপন্থীরা যেন সমাজে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে না পারে সে ব্যাপারে তাঁরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বিশেষত হানাফী ফকীহগণ এ ব্যাপারে যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং যে সূক্ষ্মদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সাথে স্ব-যুগের বাহ্যত মামুলী বিদআত ও রসম-রেওয়াজের বিরোধিতা করেছেন এবং শরীয়তের হেফাযত আর সুন্নাত ও বিদআতের পার্থক্য চিহ্নিতকরণে যে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তাতে দ্বীনের মৌলিকত্ব সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞানের গভীরতা, পাণ্ডিত্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় মেলে।

দ্বীনের প্রতি আগ্রহী ও আত্মপ্রসাদে নিমগ্ন ব্যক্তিদেরকে আকৃষ্ট করতে বিদআত যে কীরূপ চৌম্বকর্ষণসম ক্ষমতা রাখে এবং কীভাবে যে তা দ্রুত প্রসার ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এ সম্পর্কে যারা ওয়াকিফহাল তারা নিশ্চয়ই ঐসব উলামায়ে ইসলামের সাহসী ও সফল ভূমিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবেন, যাদের প্রচেষ্টা ও মেহনতে কোন কোন বিদআত চিরতরে মূলোৎপাটিত হয়ে গেছে এবং কোন কোন বিদআত কমপক্ষে বিদআত হিসাবে নিশ্চিতরূপে চিহ্নিত হয়ে গেছে। সেগুলো নিশ্চিহ্ন না হলেও একদল হকপন্থী সব সময় তার বিরোধিতায় লিপ্ত আছে। তবে বিদআত বিরোধী ও সুন্নাতের পতাকাবাহী উলামায়ে ইসলাম সব সময়ই বিদআতপন্থীদের পক্ষ থেকে গোঁড়া, রক্ষণশীল ইত্যাদি উপাধি লাভ করেছেন। এটা নতুন কিছু নয়, প্রত্যেক যুগেই প্রচলিত কুসংস্কারের বিরোধীরা এইরূপ উপাধি লাভ করে থাকেন। তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। 'মা ইয়ুকা-লু লাকা ইল্লা মা ক্বদ ক্বিলা লির রুসুলি মিন ক্ববলিকা' (তোমার সম্বন্ধে তো তাই বলা হয় যা বলা হত তোমার পূর্ববর্তী নবীগণ সম্বন্ধে)। (সূরা হা-মীম আস-সাজদা ৪১ : ৪৩)

ওয়া আখিরু দাওয়া না আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00