📘 উলামা তলাবা > 📄 দুই জাহেলিয়াত

📄 দুই জাহেলিয়াত


অতএব আল্লাহ তাআলার দ্বীনের মেজায ও প্রকৃতি সম্পর্কে যারা ওয়াকিফহাল তারা এই দ্বীনকে কোন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে প্রথমে তাঁরা সেই জায়গাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দ্বীন-বৃক্ষ রোপনের জন্য পূর্ণরূপে প্রস্তুত করে নেন। তাঁরা শিরক ও জাহেলিয়াতের শেকড় তন্ন তন্ন করে তালাশ করে উপড়ে ফেলেন, শিরক ও জাহেলিয়াতের প্রতিটি শিরা-উপশিরা খুঁজে খুঁজে বের করেন এবং গোছা বানিয়ে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেন এবং মাটিকে সম্পূর্ণ উল্টে পাল্টে দেন তাতে তাঁদের সময় যতই লাগুক এবং এই কাজ করতে তাঁদের যত কষ্টই হোক এবং তাদের আজীবনের কঠোর মেহনত ও পরিশ্রমের ফসল হযরত নুহ (আ.)-এর ন্যায় কয়েকজন মাত্র ব্যক্তি হোক না কেন বা কিছু কিছু পয়গম্বরের ন্যায় তাঁদের সারা জীবনের পুঁজি একজন ব্যক্তিই হোক না কেন। তাঁরা মেহনত ও কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যেতেন। তাতে ফল যাই হোক তাঁতেই তারা সন্তুষ্ট থাকতেন, মেহনত ও পরিশ্রমকেই সফলতা মনে করতেন, ধৈর্যহারা কখনও হতেন না।

কুফর হল, আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর শরীয়তকে অস্বীকার করা, তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ থেকে বিমুখ হওয়া। এসব যে কোন ভাবেই, যে কোন নিদর্শন দ্বারাই প্রকাশ পাক তাতে ব্যক্তি কাফের বলে গণ্য হবে। যারা কোন বিধানকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান জানা সত্ত্বেও মানে না, অথবা মুখে অস্বীকার না করলেও কার্যত তার বিরোধিতা করে তারা শরীয়তের অন্যান্য বিধানাবলী মান্যকারী হলেও কাফের বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তাআলা ইয়াহুদীদের উদ্দেশ্যে বলেন— ‘আফাতু’মিনুনা বি-বা’দিল কিতাবি ওয়া তাকফুরুনা বিবা’দ, ফামা জাযাউ মাই ইয়াফআলু যালিকা মিনকুম ইল্লা খিযয়ুন ফিল হায়াতিদ দুনিয়া, ওয়া ইয়াউমাল কিয়ামতি ইয়ুরাদ্দুনা ইলা আশাদ্দিল আযাব, ওয়ামাল্লাহু বি-গাফিলিন আম্মা তা’মালুন’ (তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর আর কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান কর? তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের জন্য পার্থিব জীবনে রয়েছে লাঞ্ছনা, আর কিয়ামতের দিন তারা কঠিনতম শাস্তিতে নিক্ষিপ্ত হবে। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্বন্ধে অনবহিত নন)। (সূরা বাকারা ৮৫)

আল্লাহ তাআলার প্রভুত্ব, তাঁর শাসন ও কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেওয়ার দ্বারাই শাসন ও কর্তৃত্বের দাবিদার অন্য সকলের শাসন ও কর্তৃত্বের, তাদের প্রভুত্বের অস্বীকার অনিবার্যরূপেই হয়ে যায়। কিন্তু যারা বাতিল খোদার প্রভুত্ব ও শাসনকে সরাসরি অস্বীকার করতে প্রস্তুত নয়, অন্য কথায়— যারা এই কিবলার দিকে তো মুখ করেছে কিন্তু অন্য কিবলার দিকে পিঠ দিতে রাজী নয়, আল্লাহ তাআলার দ্বীনের মোকাবেলায় দুনিয়াতে আর যেসব জীবনব্যবস্থা প্রচলিত আছে এবং আল্লাহ তাআলার শরীয়তের বিধি-বিধানের মোকাবেলায় অন্য যেসব বিধি-বিধান ও আইন-কানুন প্রচলিত আছে তার প্রতিও যার সমর্থন অবশিষ্ট আছে, যে এসব আইন-কানুনকে আল্লাহর দ্বীনের আইন-কানুনের মোকাবেলায় গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হয় না সে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে ইসলামের গণ্ডিভুক্ত নয়।

ঈমান বিল্লাহ ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের যথার্থতার জন্য কুফর বিত তাগুত তথা গায়রুল্লাহকে অস্বীকার করা জরুরী। আল্লাহ তাআলা ঈমান বিল্লাহর পূর্বে কুফর বিত তাগূতের কথা উল্লেখ করেছেন। বলেছেন— ‘ফামাই ইয়াকফুর বিত তাগূতি ওয়া ইউ’মিম বিল্লাহি ফাকাদিস তামসাকা বিল উরওয়াতিল উছকা’ (যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহে ঈমান আনে সে মজবুত হাতল ধরে ফেলে)। (সূরা বাকারা ২৫৬) এই কারণে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানাবলী ও আইন-কানুন ব্যতীত অন্য কোন আইন-কানুনের দিকে, অন্য কোন মতবাদের দিকে ধাবিত হয়, কুরআন তার ঈমানের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে— ‘আলাম তারা ইলাল্লাযিনা ইয়াযউমুনা আন্নাহুম আমানু বিমা উনযিলা ইলাইকা ওয়ামা উনযিলা মিন কাবলিকা ইউরিদুনা আই ইয়াতাহাকামু ইলাত তাগূতি ওয়া ক্বদ উমিরু আই ইয়াকফুরু বিহি ওয়া ইউরিদুশ শায়ত্বানু আই ইউদিল্লাহুম দলালাম বায়িদা’ (তুমি কি তাদেরকে দেখ নাই যারা দাবি করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায় যদিও তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে উহাকে প্রত্যাখ্যান করতে এবং শয়তান চায় তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে?)। (সূরা নিসা ৪: ৬০)

কুফরের গন্ধ থেকে তারাও বের হয়ে আসতে পারে না, মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও যারা জাহেলী আকীদা-বিশ্বাস ও জাহেলী রীতি-নীতির সাথে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্কচ্ছেদ করতে না পারে। জাহেলিয়াত যেগুলোকে মন্দ বলে, জাহেলিয়াত যে বিষয়গুলোকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে সেগুলোর প্রতি যাদের অন্তরে এখনো ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য বিদ্যমান, যদিও তা আল্লাহ তাআলার দ্বীনে ভাল ও কল্যাণকর বলে বিবেচিত হয় এবং যদিও তা হয় রাসূলের প্রিয় সুন্নাত। তদ্রূপ, যাদের অন্তর থেকে জাহেলী আকীদা-বিশ্বাস ও রীতি-নীতি প্রীতি এখনো বিদূরিত হয়নি যদিও সেসব আল্লাহ তাআলার নিকট অপছন্দনীয় ও ঘৃণিত। তদ্রূপ যাদের অন্তর থেকে জাহেলী গোত্র-প্রীতি, সম্প্রদায়-প্রীতি বিদূরিত হয়নি, যারা সর্বাবস্থায় নিজ গোত্রের, নিজ বংশের ও আত্মীয়ের পক্ষাবলম্বন করে, যদিও তা অন্যায় পক্ষাবলম্বন হোক না কেন। এর চেয়ে দুঃখজনক ও ভয়াবহ বিষয় হল, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও যারা কল্যাণ ও অকল্যাণের, সুন্দর ও অসুন্দরের জাহেলী মাপকাঠিকেই এসবের মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করে। জীবনোপকরণের মূল্যায়ন তারা ঐভাবেই করে যেভাবে তা মূল্যায়িত হত জাহেলিয়াতে। জীবন মানের ঐ স্তর যাদের নিকট মর্যাদাপূর্ণ যে স্তর মর্যাদাপূর্ণ ছিল জাহেলিয়াতে।

ব্যক্তির ইসলাম বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হবে তখনই, যখন কুফর ও কুফরের চতুর্পাশ্বস্থ বিষয়াদি, কুফর সংশ্লিষ্ট বিষয়সকল এবং কুফরের সকল রীতি-নীতি ও আচারের প্রতি তার অন্তরে সৃষ্টি হবে তীব্র ঘৃণার এবং কুফরে প্রত্যাবর্তনের কল্পনাও হবে তার জন্য কষ্টকর। তার ঈমানের দৃঢ়তা প্রমাণিত হবে তখন, যখন সে সাধারণ কোন কুফরী কর্মের মোকাবেলায়ও নিজের মৃত্যুকে শ্রেয় জ্ঞান করবে। বুখারী শরীফের একটি হাদীসে এসেছে— ‘ছালাছুন মান কুন্না ফীহি ওয়াজাদা হলাওয়াতাল ঈমান, আই ইয়াকুনাল্লাহু ওয়া রাসূলুহু আহাব্বা ইলাইহি মিম্মা সিওয়াহুমা, আই ইয়ুহিব্বাল মারা লা ইউহিব্বুহু ইল্লালিল্লাহ, আই ইয়াকরাহা আই ইউউদা ফিল কুফরি কামা ইয়াকরাহা আই ইয়ুকযাফা ফিন নার’ (তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে সে ঈমানের মিষ্টতার স্বাদ লাভ করতে পারবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ব্যতীত যা কিছু আছে সবকিছু অপেক্ষা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অধিক প্রিয় হওয়া, অপরকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালবাসা এবং কুফরে প্রত্যাবর্তন তার নিকট অপছন্দনীয় হওয়া, যেরূপ আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে সে অপছন্দ করে)।

সাহাবায়ে কেরাম এইরূপই ছিলেন। তাঁরা জাহেলী যুগ অপেক্ষা আর কোন কিছুকেই এত ঘৃণিত মনে করতেন না। তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের পূর্ব যুগকে যখন স্মরণ করতেন তখন অত্যন্ত ঘৃণা এবং লজ্জার সাথে স্মরণ করতেন। প্রাক-ইসলামী যুগীয় চরিত্র ও কর্ম, কুফর ও ফিসক এবং আল্লাহর নাফরমানীর প্রতি তাদের অন্তরে শুধু বুদ্ধিজাত ঘৃণা নয় বরং হৃদয়-উৎসারিত আন্তরিক ঘৃণা বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই গুণকে এভাবে বর্ণনা করেন— ‘ওয়ালাকিনাল্লাহা হাব্বাবা ইলাইকুমুল ঈমানা ওয়া যাইয়ানাহু ফী কুলুবিকুম ওয়া কাররাহা ইলাইকুমুল কুফরা ওয়াল ফুসুকা ওয়াল ইসয়ান’ (কিন্তু আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে করেছেন প্রিয় এবং উহাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন; কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের নিকট অপ্রিয়)। (সূরা হুজুরাত ৪৯: ৭)

জাহেলিয়াতের একটি নিদর্শন হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান শুনানো হলে প্রাচীন রীতি-নীতি এবং পূর্ব পুরুষের আচার উল্লেখ করা হয় আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মোকাবেলায় প্রাচীন রীতি-নীতির দলিল পেশ করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘ওয়া ইযা কীলা লাহুমুত তাবিউ মা আনযাল্লাল্লাহু ক্বালু বাল নাত তাবিউ মা আলফাইনা আলাইহি আবাআনা, আওয়ালাউ কানা আবাউহুম লা ইয়া’কিলুনা শাইয়াও ওয়ালা ইয়াহতাদুন’ (যখন তাদেরকে বলা হয়, 'আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তোমরা অনুসরণ কর', তারা বলে, 'না, বরং আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি তার অনুসরণ করব।' এমনকি তাদের পিতৃপুরুষেরা যদিও কিছুই বুঝত না এবং তারা সৎপথেও পরিচালিত ছিল না, তথাপি?)। (সূরা বাকারা ২: ১৭০) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন— ‘বাল ক্বালু ইন্না ওয়াজাদনা আবাআনা আলা উম্মতিও ওয়া ইন্না আলা আছারিহিম মুহ্তাদুন’ (বরং তারা বলে, 'আমরা তো আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের অনুসারী এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি')। (সূরা যুখরুফ ৪৩: ২২)

আল্লাহ তাআলার ওহী ও নির্দেশের বিপরীতে নিজের পিতৃপুরুষদের কর্মধারার অনুসরণ এবং নিজের চাহিদা ও প্রবৃত্তি, নিজের মর্জি মোতাবেক চলা বিশেষ এক জাহেলী চিন্তা, জাহেলী দ্বীন। ‘ক্বালু ইয়া শুয়াইবু আসালাতুকা ত’মুরুকা আন নাতরুকা মা ইয়াবুদু আবাউনা আও আন নাফআলা ফী আমওয়ালিনা মা নাশা’ (তারা বলল, হে শুআইব! তোমার সালাত কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃপুরুষেরা যার ইবাদত করত আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা ইচ্ছা তাই করি তাও?)। (সূরা হুদ ১১: ৮৭)

তো যারা আল্লাহর বিপরীতে অন্যসব কিছুকে পরিত্যাগ করে না, সবকিছুর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে না এবং নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে ন্যস্ত করে না, তারা জাহেলিয়াত থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করেছে বলে বলা যায় না। এই পরিপূর্ণ পরিত্যাগ এবং পরিপূর্ণ সমর্পণই ইসলাম। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম (আ.)কে যার নির্দেশ দান করেছিলেন— ‘ইয ক্বলা লাহু রব্বুহু আসলিম ক্বলা আসলামতু লিরব্বিল আলামীন’ (তাঁর প্রতিপালক যখন তাকে বলেছিলেন আত্মসমর্পণ কর সে বলেছিল, 'আমি আত্মসমর্পণ করলাম জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট')। (সুরা বাকারা ২: ১৩১) ‘ফাইলাহুকুম ইলাহুও ওয়াহিদুন ফালাহু আস্লিমু’ (তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। সুতরাং তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ কর)। (সূরা হাজ্জ ২২: ৩৪)

এই পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ও পরিপূর্ণ আনুগত্য যদি না হয়, তবে তা আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। এই কারনেই পরিপূর্ণ ইসলাম ও আনুগত্যকে আল্লাহ তাআলা আল্লাহর সঙ্গে সিলম বা সন্ধি বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন— ‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানুদ্ খুলু ফিস সিলমি কাফফাহ্ ওয়ালা তাত্তাবিউ খুতুওয়াতিশ শয়ত্বান ইন্নাহু লাকুম আদুউউম মুবীন’ (হে মুমিনগণ! তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলাম ও সন্ধিতে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু)। (সূরা বাকারা ২: ২০৮)

স্মর্তব্য যে, জাহেলিয়াত বলে শুধু আরবের প্রাক-ইসলামী যুগের জীবনকেই বোঝানো হচ্ছে না বরং জাহেলিয়াত হল ঐ সকল জীবন ও জীবনব্যবস্থা, যার উৎস ওহী, নবুওয়াত, আল্লাহর কিতাব ও নববী আদর্শ ব্যতীত অন্য কিছু হয় এবং যা ইসলামের বিধি-বিধান ও আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হয়— চাই তা আরবের জাহেলিয়াত হোক কিংবা ইরানের মজুসিয়্যাত হোক কিংবা হোক ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদ অথবা মিসরের ফেরাউনী মতবাদ অথবা তুরস্কের মতাদর্শ কিংবা আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি ও জীবনাচার এবং চাই তা প্রাচীন হোক অথবা আধুনিক।

কুফর শুধু এক নেতিবাচক বিষয়ই নয়; বরং তা ইতিবাচক এক মতাদর্শের নাম। কুফর শুধু আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে অস্বীকার করার নাম নয় বরং তা একটি স্বতন্ত্র ধর্মাদর্শ, স্বতন্ত্র জীবনাচারের নাম। যে আদর্শ ও জীবনাচারে অবশ্যই পালনীয়, অপছন্দনীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়ও বিদ্যমান। এ কারণে কুফর ও ইসলামের একত্র সমাবেশ অসম্ভব। কোন ব্যক্তির পক্ষে একই সময়ে এতদুভয়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা ও অনুগত থাকা অসম্ভব।

নবীগণ কুফরকে সম্পূর্ণরূপে মূলোৎপাটিত করেন। কুফরের সঙ্গে কোন রকম সমঝোতাকে বা পার্শ্ব অবস্থানকে কোনভাবেই তাঁরা বরদাশত করেননি। কুফরকে চেনার ক্ষেত্রে তাঁদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত। তাঁরা অত্যন্ত দূরদর্শী ও সূক্ষ্মদর্শী হন। এক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে পরিপূর্ণ যোগ্যতা ও দৃঢ়তা দান করেছেন। ফলে তাঁদের আল্লাহ প্রদত্ত দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার উপর নির্ভর করা ব্যতীত মানুষের জন্য অন্য কোন উপায় নেই।

দ্বীন ইসলাম মানুষের জন্য ইসলাম ও কুফরের যে বিভেদ রেখা ব্যক্ত করেছে তার সুরক্ষা ব্যতীত দ্বীনের হেফাযত ও সুরক্ষা সম্ভব নয়। এতে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য কি সামান্যতম অবহেলা দ্বীনকে এতটাই বিকৃত করে ফেলতে পারে যতটা বিকৃত হয়ে গেছে ইয়াহুদী ধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম এবং ভারতীয় বৈদিক ধর্ম। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সার্থক উত্তরসূরী যাঁরা, তাঁরাও এক্ষেত্রে অত্যন্ত দূরদর্শিতা, সূক্ষ্মদর্শিতা ও বিচক্ষণতার অধিকারী হন। তাঁরা কুফরের প্রত্যেকটি নিদর্শনকে চিহ্নিত করত তা নিশ্চিহ্ন করেন, জাহেলিয়াতের একেকটি দাগ তাঁরা চিহ্নিত করেন এবং তাকে ধুয়ে-মুছে ফেলেন। কুফর চেনার ক্ষেত্রে সাধারণ লোক অপেক্ষা তাদের মস্তিষ্ক ও উপলব্ধি শক্তি অধিক জাগ্রত ও শক্তিশালী হয়। কুফর যে পোশাকেই, যে রূপ ধারণ করেই আত্মপ্রকাশ করুক না কেন তারা ঠিক তাকে চিনে ফেলেন এবং তার বিরোধিতায় তাঁরা কোমর বেঁধে ময়দানে অবতীর্ণ হন।

কখনও দেখা যায় যে, ভারতের ন্যায় কোন রাষ্ট্রে বিধবা বিবাহকে অবৈধ জ্ঞান করা এবং বিধবা বিবাহকে ঘৃণার চোখে দেখার মধ্যে তাঁরা কুফরীর গন্ধ পান আর বিধবা বিবাহের প্রচলন দান এবং এই সুন্নাতকে জিন্দাকরণের জন্য তাঁরা উঠে পড়ে লাগেন, কখনও কখনও তাঁরা এর জন্য জীবনবাজী রেখেও কাজ করেন। কখনও দেখা যায় যে, শরীয়তের বিধি-বিধানের উপর প্রথা ও সংস্কারকে প্রাধান্য দান করাকে এবং বোনকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করাকে তাঁরা কুফরী বলে গণ্য করেন আর এইসব লোকের বিরোধিতা করাকে এবং তাঁদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে তাঁরা ফরয বলে গণ্য করেন। কখনও দেখা যায় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা স্পষ্টভাবে শোনার পরও তা অমান্য করা এবং মানবসৃষ্ট আদালত ও মানব রচিত আইন-কানুনের আশ্রয় নেওয়া এবং অনৈসলামী আইন প্রতিষ্ঠা করাকে তাঁরা ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার সমার্থক বলে মনে করেন। ফলে তাঁরা নেহায়েত অপারগতাবশত দেশত্যাগ করেন, অন্য দেশে হিজরত করে চলে যান।

কখনও দেখা যায় যে, কোন নও-মুসলিম কিংবা হিন্দুদের সঙ্গলাভকারী মুসলমানের গরুর গোশত পরিহার করে চলাকে, গরুর গোশতে তাদের ঘৃণার উদ্রেক হওয়াকে তাঁরা ঈমানের দুর্বলতা বা পূর্বধর্ম বা অমুসলিমদের সাথে মেলামেশার প্রতিফল বলে মনে করেন এবং সেসব ক্ষেত্রে তাঁরা একটি সুন্নত অথবা মুবাহ বা মুস্তাহাব কর্মকেও ওয়াজিব বলে ফতোয়া দেন, ইসলামের নিদর্শন বলে সাব্যস্ত করেন। তাঁদের মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে উচ্চারিত হয়— 'যিবহে বকর দর হিন্দুস্তান আয আযম শাআইরে ইসলাম আসত' (অর্থাৎ ভারতে গরু যবেহ করা ইসলামের একটি বড় শিআর ও নিদর্শন)। তাঁরা অমুসলিম রীতি-নীতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও পোশাক-পরিচ্ছদে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বনে প্রচণ্ড বিরোধিতা করেন এবং অমুসলিমদের ঘরোয়া অনুষ্ঠানাদিতেও অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করেন।

মোটকথা কুফর কি কুফর-প্রীতি কি কুফর সহায়ক কোন কিছু যে রূপ ও যে পোশাকেই প্রকাশিত হোক না কেন তারা ঠিক তাকে চিনে ফেলেন। এ ব্যাপারে তাঁদের কোন সন্দেহ ও সংশয় থাকে না এবং তা প্রতিরোধে কোন অজুহাতই, কোন বিশেষ কারণই তাদের সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কুফরের উদ্দেশে তাঁরা বলেন— 'বহর রঙে খা-হি কে জামাহ মে পোশ— মান আন্দাযে কদতরা মে শিনাসাম'। তাঁদের যুগের যে সকল নির্বোধ ও অর্বাচীনেরা কাবা, গীর্জা আর মন্দিরের মাঝে পার্থক্য করে না, পার্থক্য করাকে কূপমণ্ডকতা বলে মনে করে, তারা তাঁদেরকে পণ্ডিত, পরহেজগার, আল্লাহর সৈনিক ইত্যাদি বলে ব্যঙ্গ করে থাকে। কিন্তু তাঁরা এসব ব্যঙ্গ ও উপহাসকে উপেক্ষা করে আপন কাজে নিমগ্ন থাকেন, ধৈর্য ও স্থৈর্যের সাথে নিরলস মেহনত করে যান।

সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক যুগে এই জাতীয় ব্যক্তিগণই আল্লাহর দ্বীনের হেফাযতের কাজ করে গেছেন। তাঁদের সাহসী পদক্ষেপ, দৃঢ় অবস্থান ও অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেহনতের কারণেই ইসলাম আজও ইয়াহুদী-খ্রিস্টান ও হিন্দুধর্মসহ যাবতীয় ধর্মের সাথে সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রেখে স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে, সুপ্রতিষ্ঠিত আছে তাঁদেরই দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার ফলে। জাযাহুমুল্লাহু আনিল ইসলামি ওয়া ওয়ালিইহি ওয়া নবিয়িহি খয়রাল জাযা (আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে ইসলাম ও মুসলমান ও ইসলামের নবীর পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন)।

📘 উলামা তলাবা > 📄 বিদআত কী?

📄 বিদআত কী?


আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে বিষয়ের নির্দেশ দান করেননি, যে বিষয়কে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয় বলে সাব্যস্ত করেননি এরূপ বিষয়কে দ্বীনের অংশ বানিয়ে নেওয়া, দ্বীনী বিষয় বলে সাব্যস্ত করে নেওয়া এবং তা সওয়াব ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে পালন করার নাম বিদআত। তদ্রূপ কোন ইবাদতে নিজেদের মনগড়া নিয়ম ও রীতি-প্রথাকে শরয়ী নির্দেশের ন্যায় মান্য করাও বিদআত।

শিরক ও কুফর যেমনটা পূর্বে বলা হয়েছে, যদি স্বতন্ত্র ও পৃথক এক ধর্ম হয়ে থাকে তবে বিদআত হল স্বতন্ত্র এক শরীয়ত, যার রচয়িতা ও প্রণেতা মানুষ। শিরক ও কুফরের সাথে ইসলামের পার্থক্য থাকে সুস্পষ্ট। কারণ তা ইসলাম বহির্ভূত বিষয়। আর বিদআত ইসলামের অভ্যন্তরীণ শত্রু। ইলাহী দ্বীনের অভ্যন্তরে মানব রচিত শরীয়তী রূপ, যা ভিতরে ভিতরে জন্ম ও বৃদ্ধি লাভ করে। এমনকি তাকে যদি স্বাধীনভাবে বৃদ্ধি পেতে দেওয়া হয়, তাহলে তা কখনো কখনো মূল শরীয়ত অপেক্ষা কয়েক গুণ বেশি বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং ধীরে ধীরে শরীয়তে ইলাহীর সমস্ত স্থান ও মানুষের জীবনের সমস্ত সময়টা দখল করে নেয়। এই শরীয়তের আইনশাস্ত্র স্বতন্ত্র। এর সুন্নাত, মুস্তাহাব, ফরয, ওয়াজিব সবকিছু হয় স্বতন্ত্র, শরীয়তে ইলাহী হতে ভিন্ন। বিদআত সর্বপ্রথম আঘাত হানে এই মূলনীতিতে যে, আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার। কোন কিছুকে আইনের মর্যাদা দান এবং তা পালন ও মান্য করাকে জরুরী সাব্যস্ত করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার। মানব কর্তৃক আইন রচনা, কোন কিছুকে আইনের মর্যাদা দান প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার এই অধিকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা। এই কারণেই আইন প্রণয়নকারী মানুষকে কুরআনুল কারীম তাগূত নামে আখ্যায়িত করেছে। কুরআন বলেছে— ‘ইউরিদুনা আই ইয়াতাহাকামু ইলাত তাগূতি ওয়া ক্বদ উমিরু আই ইয়াকফুরু বিহি’ (তারা তাগূতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করতে)।

এটা তো সাধারণ আইন রচনার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। কিন্তু এতদপেক্ষা আরও গর্হিত হল বিদআত তথা কোন কিছুকে দ্বীন ও শরীয়ত বলে সাব্যস্ত করা এবং নির্দিষ্ট রূপ ও নিয়ম-নীতিতে তা পালন করাকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সওয়াব লাভের উপায় বলে মনে করা। কারণ এটা তো শরীয়ত রচনার নামান্তর। আর কুরআন বলে দ্বীন ও শরীয়ত রচনা একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাজ। 'শারাআ লাকুম মিনাদ দ্বীনি মা ওয়াসসা বিহী নূহাও ওয়াল্লাযী আওহাইনা ইলাইকা' (তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন ঐ দ্বীন যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে আর যা আমি তোমাকে ওহী করেছি)। (সূরা শূরা ৪২: ১৩) মক্কার কাফেররা যখন নিজেদের পক্ষ থেকে হালাল-হারাম সাব্যস্ত করণের পথ অবলম্বন করল তখন কুরআন তাদের প্রতি এই নিন্দাবাদই ব্যক্ত করেছে। 'আম লাহুম শুরাকাউ শারাউ লাহুম মিনাদ দ্বীনি মা লাম ইয়াযান বিহিল্লাহ' (তাদের কি এমন কতকগুলো দেবতা আছে যারা তাদের জন্য বিধান দিয়েছে এমন দ্বীনের যার অনুমতি আল্লাহ দেন নাই?)। (সূরা শূরা ৪২: ২১)

আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত এই আইন প্রণয়নটি কী ছিল তার বিস্তারিত বিবরণ শুনুন। 'ওয়া ক্বালু হাযিহী আনআমুন ওয়া হারছুন হিজরুন লা ইয়াত’য়ামুহা ইল্লা মান নাশা-উ বিযা’মিহিম ওয়া আনআমুন হুররিমাত যুহুরুহা ওয়া আনআমুল লা ইয়াযকুরু নাসমাল্লা-হি আলাইহাফতিরা-আন আলাইহি সাইয়াজযীহিম বিমা কানু ইয়াফতারুন। ওয়া ক্বালু মা ফী বুতুনি হাযিহিল আনআমি খলিসাতুল লিযু কুরিনা ওয়া মুহাররামুন আলা আযওয়া-জিনা ওয়া ইইয়্যাকুম মাইতাতান ফাহুম ফীহি শুরাকাউ সাইয়াজযীহিম ওয়াসফাহুম ইন্নাহু হাকীমু আলীম' (তারা তাদের ধারণা অনুসারে বলে, এইসব গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত্র নিষিদ্ধ; আমরা যাকে ইচ্ছা করি সে ব্যতীত আর কেউ এসব আহার করতে পারবে না এবং কতক গবাদি পশুর পৃষ্ঠে আরোহণ নিষিদ্ধ এবং কতক পশু যবেহ করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনার উদ্দেশ্যে; এই মিথ্যা রচনার শান্তি আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই দিবেন)। (সূরা আনআম ৬:১৩৮) তারা আরও বলে এইসব গবাদি পশুর গর্ভে যা আছে তা আমাদের পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট এবং আমাদের স্ত্রীদের জন্য নিষিদ্ধ। আর যদি তা মৃত হয় তবে সকলেই তাতে অংশীদার। তিনি তাদের এইরূপ বলার শাস্তি অচিরেই তাদেরকে দিবেন; নিশ্চয়ই তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। (সূরা আনআম ৬ : ১৩৯)

আরবের এই আইন প্রণেতাদের অপরাধ কী ছিল, যে অপরাধকে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা ও মিথ্যা আরোপ বলে অভিহিত করা হয়েছে? তা তো ছিল এটাই যে, তারা কোন আসমানী কিতাবের দলিল-প্রমাণ ব্যতিরেকে শুধু নিজেদের মত অনুযায়ী একটা জিনিসকে একজনের জন্য হালাল আর অপরের জন্য হারাম সাব্যস্ত করেছে। আর এক্ষেত্রে তারা এমন কিছু বিধি-বিধান ও আইন-কানুন ও মূলনীতি নির্দিষ্ট করেছে, যার পক্ষে কোন আসমানী কিতাবের দলিল ও সমর্থন ছিল না। অতঃপর ঐসব আইন-কানুন ও মূলনীতি মান্য করাকে তারা নিজেদের জন্য এবং অপরের জন্যও এমনভাবে অপরিহার্য করে দিয়েছে যেরূপ নবীগণের শরীয়ত ও আইন-কানুন মান্য করা অপরিহার্য হয়ে থাকে। আল্লাহর শরীয়ত অমান্যকারীদেরকে যেরূপ অপরাধী ও শাস্তিযোগ্য বলে মনে করা হয়, তাদের প্রণীত আইন-কানুন অমান্যকারীদেরকেও তারা ঐরূপ অপরাধী ও শাস্তিযোগ্য বলে মনে করত।

ইমাম মালেক (রহ.) চমৎকার বলেছেন— 'মান ইব্তাদাআ ফিল ইসলামি বিদ্আতান ইয়াহ হাসানা ফাকদ যাআমা আন্না মুহাম্মাদান সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা খনা রিসালাতা ফাইনাল্লাহা সুবহানাহু ইয়াকুলু, আল ইয়াউমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম ফামা লাম ইয়াকুন ইয়াউমা ইযিন দ্বীনান ফালা ইয়াকুনুল ইয়াউমা দ্বীনান' (যে ব্যক্তি ইসলামে কোন বিদআতের প্রচলন ঘটায় এবং সেটাকে ভাল বলে জ্ঞান করে প্রকারান্তরে সে যেন দাবি করে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন, ত্রুটি করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন— আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম। অতএব রাসূলের জীবদ্দশায় যা দ্বীনের অংশ ছিল না তা আজও দ্বীনের অংশ হতে পারে না)।

শরীয়তে ইসলামীর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, তার সর্বকালীনতা, সর্বকালেই তার আমলযোগ্য হওয়া। আল্লাহ তাআলা সর্বজ্ঞাতা ও প্রজ্ঞাবান। তিনি মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা, তাদের কল্যাণ, অকল্যাণ তাদের নানাভিধ পরিবেশ ও অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দয়ালু, অনুগ্রহশীল। তাঁর সর্বব্যাপ্ত জ্ঞান ও অসীম দয়ার ভিত্তিতে তিনি তাঁর নবীগণের মাধ্যমে মানুষের জন্য যে শরীয়ত ও বিধি-বিধান দান করেছেন তা অত্যন্ত সহজ ও সরল, সর্বাবস্থায় মানুষের জন্য যা আমলযোগ্য। শরীয়তের বিধি-বিধান বিধিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি মানুষের মানবীয় দুর্বলতা, সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার প্রতি পূর্ণ লক্ষ্য রেখেছেন। তাদের শক্তি ও সামর্থ্য, কাল ও পরিবেশের প্রতি পূর্ণ লক্ষ্য রেখে তিনি তাদের জন্য এক সর্বজনীন ও সর্বকালীন, চিরন্তন ও শাশ্বত বিধান দান করেছেন। তিনি বলেন— 'লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উসহাহা' (আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কর্মের দায়িত্ব অর্পণ করেন না)। (সূরা বাকারা ২: ২৮৬) 'ইউরিদুল্লাহু আই ইউখাফফিফা আনকুম ওয়া খুলিকাল ইনসানু দয়িফা' (আল্লাহ তোমাদের ভার লঘু করতে চান; মানুষকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলরূপে)। (সূরা নিসা ৪: ২৮)

ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের এই অপরাধের কথাই কুরআন বলেছে এভাবে— 'ইত্তাখাযু আহবারাহুম ওয়া রুহবানাহুম আরবাবাম মিন দুনিল্লাহ' (তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসার বিরাগীগণকে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করে নিয়েছে)। (সূরা তাওবা ৯: ৩১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদী ইবনে হাতেম (রাযি.)-এর সামনে আয়াতটির এই ব্যাখ্যাই করেছিলেন। খ্রিস্টান পাদ্রী, পুরোহিত ও পণ্ডিতেরা যে জিনিসকে জনগণের জন্য হালাল বা হারামরূপে সাব্যস্ত করে দিত, তারা বিনা আপত্তিতে তা মেনে নিত এবং পাদ্রী, পুরোহিত ও পণ্ডিতদেরকে তারা বিধান প্রণেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিত। বস্তুত কোন কিছুকে হালাল বা হারাম সাব্যস্তকরণ এবং কোন কিছুকে শরয়ী দলিল ব্যতীত ফরয বা ওয়াজিব সাব্যস্ত করণ আর কোন ইবাদতকে বিশেষ রূপদান ও তার জন্য নিজেদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট শর্তাদি আরোপ করে তাকে সওয়াবের কাজ বলে মনে করার মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। উভয়টিই ‘মা লাম ইয়াযান বিহিল্লাহ’ (আল্লাহ যার অনুমতি দেননি)-এর আওতাভুক্ত।

বিদআত যে দ্বিতীয় সত্যের মূলে আঘাত হানে তা হল, শরীয়ত পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, যা নির্ধারিত হওয়ার তা নির্ধারিত হয়ে গেছে। একজন মানুষের মুক্তির জন্য যা যা জরুরী, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য যে উপায়াদির প্রয়োজন, শরীয়ত তার সবকিছুই স্পষ্ট ব্যক্ত করে দিয়েছে, দ্বীনের টাকশাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এখন যে মুদ্রাই দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত করা হোক না কেন তা নকল ও জাল বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আল ইয়াউমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নি’মাতি ওয়া রদিতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীনা’ (আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম)। (সূরা মায়েদা ৫: ৩) ‘ওয়ামা জাআলা আলাইকুম ফিদ দ্বীনি মিন হারাজ’ (তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই)। (সূরা হাজ্জ ২২:৭৮)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তিনি বলেছেন— ‘লাকাদ জাআকুম রাসূলুম মিন আনফুসিকুম আযীযুন আলাইহি মা আনিত্তুম হারীসুন আলাইকুম বিল মুমিনিনা রউফুর রহীম’ (অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট এক রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু)। (সূরা তাওবা ৯ : ১২৮) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আনীত দ্বীন সম্পর্কে বলেছেন— ‘বুয়িছতু বিল হানীফিয়্যাতিস সামহাতি ইন্না হাযাদ দ্বীনা ইউসর’ (আমাকে নিতান্ত সাদাসিদা, সরল দ্বীন দিয়ে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই দ্বীন সহজ)। উম্মতের তাকলীফ ও কষ্টের প্রতি তাঁর এত বেশি দৃষ্টি ছিল যে, তিনি বলেছেন— ‘লাওলা আন আশুক্কা আলা উম্মাতি লাআমারতুহুম বিস সিওয়াকি ইনদা কুল্লি সলাত’ (যদি আমার উম্মতের কষ্ট হবে বলে আমার ধারণা না হত, তাহলে তাদেরকে আমি নির্দেশ দিতাম প্রত্যেক নামাযের সময় মিসওয়াক করতে)।

তবে দ্বীনের এই সহজতা এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এর জামানত ততক্ষণই বহাল থাকে ততক্ষণ আল্লাহ তাআলাই হন বিধানদাতা এবং শরীয়ত হয় তাঁরই। কিন্তু মানুষ যখন আইন প্রণেতা হয়, আর তারা ইলাহী শরীয়তে হস্তক্ষেপ করতে থাকে, অন্য কিছু সংযোজন করতে থাকে তখন আর এই দ্বীনের সহজতা অবশিষ্ট থাকতে পারে না। না মানুষের জ্ঞান সর্বব্যাপ্ত, না মানুষ মানুষের প্রয়োজনাদি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। না সে কালের ব্যবধান ও পরিবেশের ব্যবধানের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে পারে, না সে স্ব-জাত মানুষের প্রতি ঐ দরদ রাখতে পারে যে দরদ আছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। ফল দাঁড়ায় এই যে, বিশুদ্ধরূপে থাকা অবস্থায় যে দ্বীন প্রত্যেকের জন্য সহজে আমলযোগ্য হয় সেই দ্বীন ঐসব বিদআতের মিশ্রণে এবং বারবার দ্বীনে সংযোজনের ফলে তা এত দীর্ঘ, জটিল ও সুকঠিন হয়ে যায় যে, দ্বীনের উপর আমল করা ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে পড়ে। মানুষ দ্বীন থেকে পলায়নপর হয়ে পড়ে, দ্বীন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা না করার ফাঁক-ফোকর অন্বেষণ করতে থাকে। অনেকে ঐ দ্বীনের লাগাম নিজের গলা থেকে সম্পূর্ণরূপে খুলে ফেলে।

বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস অধ্যয়ন করে জানা যায় যে, ধর্ম পরিহার করে চলার ও কোন কোন ক্ষেত্রে নাস্তিক হয়ে যাওয়ার বড় কারণ ঐ অসংখ্য নবসৃষ্ট বিদআত, যা পালন করা মধ্য পর্যায়ের ধার্মিকদের জন্য হয়ে পড়েছিল প্রায় অসম্ভব। মধ্যযুগে গীর্জার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক যে বিদ্রোহের সুচনা হয়েছিল তার কারণও ছিল এই নবসৃষ্ট বিদআতভিত্তিক 'ধর্মীয় আচারের, যার সাথে মূল খ্রিস্টধর্মের কোন সম্পর্কই ছিল না। এটাও লক্ষ্যণীয় যে, ইলাহী দ্বীন ও শরীয়তের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল তার সর্বকালীন ও সর্বজনীন অভিন্নতা। এই অভিন্নতা যেমন কালগত দিক থেকে তেমনই স্থানগত দিক থেকেও। আল্লাহ তাআলা যেহেতু ‘রব্বুল মাশরিক্বাইনি ওয়া রব্বুল মাগরিবাইনি’ (তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের প্রভু) তিনি যেহেতু কাল ও স্থানের বন্ধন ও সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে সেহেতু তাঁর প্রদত্ত শরীয়তে পূর্ণাঙ্গ অভিন্নতা বিদ্যমান। তাঁর শেষ শরীয়ত যা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে তা সকলের জন্য অভিন্ন। যেমন অভিন্ন সূর্য। পৃথিবী ও আকাশ যেমন সকলের জন্য এক ও অভিন্ন। প্রাথমিক যুগে এই দ্বীনের যে রূপ ও আকৃতি ছিল, হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীতে এসেও তার ঐ একই রূপ ও আকৃতি বিদ্যমান। যতটুকু তা প্রাচ্যের জন্য ততটুকুই তা প্রতীচ্যের জন্য। যে নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, ইবাদতের যে রূপ, আল্লাহর তাআলার নৈকট্য লাভের যে নির্দিষ্ট ধারা আরবদের জন্য নির্ধারিত ছিল তা সমভাবে নির্ধারিত ভারতবাসীদের জন্যও। এই কারণে পৃথিবীর কোন প্রান্তের মানুষ যদি অপর প্রান্তে গমন করে তবে ইসলামের ফরয-ওয়াজিব আদায় করতে এবং মসজিদে যেয়ে ইবাদত করতে তার কোন সমস্যা সৃষ্টি হবে না এবং তার জন্য স্থানীয় কোন নির্দেশনা ও পথ প্রদর্শকেরও প্রয়োজন হবে না। সে যেখানেই যাক স্থানটিকে ধর্মীয় দিক থেকে অপরিচিত ও নিজেকে ভিনদেশী বলে মনে হবে না। সে যদি আলেম হয়ে থাকে তাহলে মুক্তাদী নয় বরং ইমামও হয়ে যেতে পারে এবং সর্বত্র সে ফতোয়া দানের কাজও করতে পারে।

কিন্তু বিদআতের এইরূপ কোন বৈশিষ্ট্য নেই। বিভিন্ন স্থানের বিদআতের মধ্যে একতা ও অভিন্নতা পাওয়া যায় না। বিদআতে স্থান ও কালের প্রভাব বিদ্যমান থাকে। বিভিন্ন স্থানের বিদআত স্থানীয় ছাঁচে গড়ে উঠে। বিদআতের টাকশাল বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম হয়। বিদআতকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সমভাবে চালু কলা সম্ভব হয় না। মুসলিম বিশ্বের সকল মুসলমান নির্দিষ্ট কোন বিদআত সম্পর্কে জানবে তা নিশ্চিত নয়। জানলেও সকলেই তা গ্রহণ করে নেবে তা জরুরী নয়। এ কারণেই ভারতের বিদআত এক রকম, মিসরের বিদআত আরেক রকম। অদ্রূপ ইরান ও সিরিয়ার বিদআতের মাঝে কোন সাদৃশ্য নেই। ভিন্ন ভিন্ন দেশের বিদআতের মধ্যকার পার্থক্য তো অনেক পরের কথা, অনেক সময় একই দেশের ভিন্ন ভিন্ন শহরের বিদআত ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয়। এক শহরের বিদআত সম্পর্কে অন্য শহরের অধিবাসীদের কোন পরিচিতিই থাকে না। এই সীমাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেতে পেতে মহল্লায় মহল্লায় পার্থক্য, ঘরে ঘরে পর্যন্ত পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। একেক মহল্লার বিদআত একেক রকম আর একেক ঘরের বিদআত একেক রকম হয়ে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে ছিল অপরাপর শরীয়ত ও ধর্মের শিক্ষণীয় পরিণতি। ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মের বিকৃত ও পরিবর্তিত রূপও ছিল তাঁর সামনে। এইজন্য তিনি ইসলামী শরীয়তকে তার প্রকৃত রূপ ও আসল আকৃতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য যাবতীয় সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর সাহাবীগণকে সুন্নাত আঁকড়ে ধরতে ও বিদআত পরিহার করে চলতে জোর নির্দেশ দান করেছেন এবং সেইমত তাদেরকে শিক্ষাদান করেছেন। তাঁর সরাসরি শিষ্য সাহাবীগণ তাঁর নির্দেশ যথাযথ পালন করেছেন এবং বিদআতের ব্যাপারে তাঁরা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। বিদআতের ব্যাপারে কোন রকম শৈথিল্য কি দুর্বলতা তাঁদের থেকে প্রকাশ পায়নি।

সাহাবীগণের পর ইসলামের ইমাম ও ফকীহগণ এত উচ্চ পর্যায়ের বুদ্ধিদীপ্ততা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, যা নবীগণের উত্তরসূরীদের জন্যই যথোপযুক্ত। তাঁরা সর্বকালে বিদআতের কঠোর বিরোধিতা করেছেন। জ্ঞানগত ও কার্যগত উভয় দিক থেকে তাঁরা বিদআতপন্থীদের মোকাবেলা করেছেন। ইসলামী সমাজে বিদআত যাতে সুদৃঢ় ও গ্রহণযোগ্য হতে না পারে এবং বিদআতপন্থীরা যেন সমাজে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে না পারে সে ব্যাপারে তাঁরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বিশেষত হানাফী ফকীহগণ এ ব্যাপারে যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং যে সূক্ষ্মদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সাথে স্ব-যুগের বাহ্যত মামুলী বিদআত ও রসম-রেওয়াজের বিরোধিতা করেছেন এবং শরীয়তের হেফাযত আর সুন্নাত ও বিদআতের পার্থক্য চিহ্নিতকরণে যে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তাতে দ্বীনের মৌলিকত্ব সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞানের গভীরতা, পাণ্ডিত্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় মেলে।

দ্বীনের প্রতি আগ্রহী ও আত্মপ্রসাদে নিমগ্ন ব্যক্তিদেরকে আকৃষ্ট করতে বিদআত যে কীরূপ চৌম্বকর্ষণসম ক্ষমতা রাখে এবং কীভাবে যে তা দ্রুত প্রসার ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এ সম্পর্কে যারা ওয়াকিফহাল তারা নিশ্চয়ই ঐসব উলামায়ে ইসলামের সাহসী ও সফল ভূমিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবেন, যাদের প্রচেষ্টা ও মেহনতে কোন কোন বিদআত চিরতরে মূলোৎপাটিত হয়ে গেছে এবং কোন কোন বিদআত কমপক্ষে বিদআত হিসাবে নিশ্চিতরূপে চিহ্নিত হয়ে গেছে। সেগুলো নিশ্চিহ্ন না হলেও একদল হকপন্থী সব সময় তার বিরোধিতায় লিপ্ত আছে। তবে বিদআত বিরোধী ও সুন্নাতের পতাকাবাহী উলামায়ে ইসলাম সব সময়ই বিদআতপন্থীদের পক্ষ থেকে গোঁড়া, রক্ষণশীল ইত্যাদি উপাধি লাভ করেছেন। এটা নতুন কিছু নয়, প্রত্যেক যুগেই প্রচলিত কুসংস্কারের বিরোধীরা এইরূপ উপাধি লাভ করে থাকেন। তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। 'মা ইয়ুকা-লু লাকা ইল্লা মা ক্বদ ক্বিলা লির রুসুলি মিন ক্ববলিকা' (তোমার সম্বন্ধে তো তাই বলা হয় যা বলা হত তোমার পূর্ববর্তী নবীগণ সম্বন্ধে)। (সূরা হা-মীম আস-সাজদা ৪১ : ৪৩)

ওয়া আখিরু দাওয়া না আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00