📘 উলামা তলাবা > 📄 ইখলাস ও ইখতেসাস-এর গুরুত্ব

📄 ইখলাস ও ইখতেসাস-এর গুরুত্ব


একটি কথা আমি তাই বলতে চাই যা আমি বড় বড় মাদরাসায় বলে থাকি। তা হল আপনি কোন এক শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্য অর্জন করুন। এক্ষেত্রে একটি বাক্য আমার মুখে প্রায়ই উচ্চারিত হয়, বাক্যটিকে আমি অযীফার ন্যায় স্মরণে রেখেছি। আর তা হল, আপনি ইখলাস ও এখতেসাস পয়দা করুন। আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইখলাস থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত থাকতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে যে, আল্লাহ আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাক। আমরা ফিকহ শাস্ত্রের শিক্ষালাভ করছি, কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান লাভ করছি, যেন আল্লাহ তাআলার মারেফাত ও পরিচয় লাভ করতে পারি, তাঁর সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি অর্জন করতে পারি, তাঁর রাসূলকে চিনতে পারি, তাঁর ও তাঁর রাসূলের কালাম বুঝতে পারি এবং অন্যকে বুঝাতে পারি, সর্বোপরি সেই অনুযায়ী যেন আমল করতে পারি।

তো প্রথম কথা হল ইখলাস থাকতে হবে। দ্বিতীয় কথা হল নিজের মধ্যে ইখতেসাস সৃষ্টি করতে হবে। অর্থাৎ কোন এক শাস্ত্রে অন্যের তুলনায় আপনার মধ্যে বিশেষত্ব থাকতে হবে। যাঁদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশিত হয়, যাঁরা গভীর জ্ঞানের অধিকারী, গুণধরের গুণ সম্পর্কে যাঁরা ওয়াকিফহাল তাঁরা যেন বলেন, ‘এই ব্যক্তি অমুক শাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী, বিদগ্ধ ও পণ্ডিত। অনেকের তুলনায় শাস্ত্রটিতে তার দখল অনেক বেশি।’

শিক্ষার্থী ভাইদেরকে বলব যে, তারা ইখলাস ও ইখতেসাস-এর অধিকারী হোক, তাদের নিয়ত যেন বিশুদ্ধ হয়, শুধু এবং শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যেন হয়। অন্যান্য বিষয় স্বাভাবিকভাবেই অর্জিত হয়ে যাবে। এটা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার চিরন্তন রীতি যে, নিয়ত বিশুদ্ধ হলে অন্যান্য কাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলো এমনিতেই অর্জিত হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত কোন কোন শাস্ত্র ও বিষয়ে কমপক্ষে একটি বিষয়ে (আর আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিলে একাধিক বিষয়ে) ইখতেসাস ও বিশেষত্ব সৃষ্টি করতে হবে। এটা ঠিক যে, যুগ অনেক বদলে গেছে। কিন্তু এই ব্যাপারটির ক্ষেত্রে যুগের আচরণ পূর্বের ন্যায়ই আছে। এখনও যারা কোন বিষয়ে অন্যদের তুলনায় নিজেকে পৃথক বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত করে তুলেছে তারা তার স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে। তাদের সামনে মানুষ নতশির হচ্ছে, তাদের পদচুম্বন করছে। তাদেরকে অনুরোধ করে, কাকুতি-মিনতি করে মাথায় উঠিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। তারা মানুষের চোখের মনিতে পরিণত হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে কোন স্থান বা দেশের বিশেষত্ব নেই। না নেপালের বিশেষত্ব আছে, না বার্মার। যে কোন স্থানের, যে কোন দেশের লোকই হোক না কেন ইখতেসাস সৃষ্টি করতে পারলে তার মর্যাদা নিজের দেশ পেরিয়ে বহির্দেশেও প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ অনেকেই জানে না, হেদায়া গ্রন্থ প্রণেতা মারগীনানী কোথাকার অধিবাসী। অথচ তাঁর মর্যাদা ও যোগ্যতা, তাঁর ইলমী পাণ্ডিত্য সারা বিশ্বে স্বীকৃত। তদনুরূপ কেউ তাবরিষী, কেউ যামাখশারী, কেউ সাক্কাকী। ভূগোল শাস্ত্রের বিশাল বিশাল গ্রন্থ বর্তমানে লিখিত হয়েছে। সেসব গ্রন্থ দ্বারা আমরা জানতে পারি যে, ঐ সকল মনীষার কেউ নেপালের, কেউ হিন্দুস্তানের। এমনকি কোন প্রদেশের সীমাবদ্ধতাও এক্ষেত্রে বাধা নয়। আপনি নিজের যোগ্যতা সৃষ্টি করুন, সারা বিশ্ব বিশেষত মুসলিম বিশ্ব আপনার যোগ্যতার মর্যাদা দান করবে। আপনার পাণ্ডিত্য স্বীকার করে নেবে। আপনি নিভৃতচারী হয়ে থাকতে চাইলেও পারবেন না। লোকে আপনাকে তালাশ করে বের করে আনবে। আপনি সহস্র পর্দার অন্তরালে লুকিয়ে থাকতে চাইলেও পারবেন না। লোকেরা পর্দা অপসারিত করে আপনাকে মাথায় উঠিয়ে নিয়ে যাবে। তারা খোশামদ করবে, আপনার পায়ে তাদের মাথার টুপি লুটিয়ে দেবে। বলবে, আপনি আমাদের মাদরাসায় চলুন। কেউ বলবে, আপনি আমাদের কলেজে চলুন, আমাদের ভার্সিটিতে চলুন, এই সাবজেক্টটি পড়িয়ে দিন।

শিক্ষার্থী ভাইদেরকে বলছি যে, আপনি আপনার স্তরে স্বকীয়তা অর্জন করুন, নিজের মধ্যে অন্যের তুলনায় বিশেষত্ব সৃষ্টি করুন। আপনার দিকে অন্যের দৃষ্টি আকৃষ্ট হোক, অঙ্গুলি নির্দেশিত হোক যে, দেখ, ছেলেটি নেপালের তালিবুল ইলম। সে নাহব ও সরফে আমাদের তালিবুল ইলম অপেক্ষা উত্তম। সে পরবর্তী পাঠ দেখে আসে এবং দরসের পরেও দরসের পাঠ বোঝার চেষ্টা করে, মুখস্থ করে। ছেলেটির যোগ্যতা বেশ ভাল। ছেলেটি মাশাআল্লাহ আরও উন্নতি করবে। এক্ষেত্রে অন্য কোন বৈশিষ্ট্য বিশেষত ভৌগোলিক কোন বৈশিষ্ট্য বিবেচ্য হয় না।

ইমাম গাযযালীর কথাই ভাবুন। তিনি ছিলেন ইরানের। অথচ কেউ জানতই না যে, তিনি ইরানের অধিবাসী। তাঁর পূর্বপুরুষদের কেউ বড় আলেম-বুযুর্গ ছিলেন বলে কারও জানা নাই। তাঁর পিতাই তো আলেম ছিলেন না। গাযযালী শব্দটই ব্যক্ত করে যে, তাঁর পরিবারের লোকজন সুতা প্রস্তুতের কাজ করত। আরেকজন বুযুর্গ খাজা নকশবন্দ নামে প্রসিদ্ধ। তাঁদের পরিবার চিত্রাঙ্কণের কাজ করত। এই জাতীয় উপাধি আরও অনেক বুযুর্গের ছিল। যেমন খাসসাফ (জুতা মেরামতকারী), যাইয়াত (তৈল বিক্রেতা), খাইয়াত (দর্জি) ইত্যাদি। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা মর্যাদাসম্পন্ন মসজিদ মসজিদে হারামের একজন ইমাম ছিলেন খাইয়াত। তাঁর পিছনে আমরা বহু নামায আদায় করেছি। ভেবে দেখুন তো, যে মসজিদ সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী, যে মসজিদের ইমামতি মর্যাদা ও গর্বের বিষয়, যে মসজিদকে বলা হয়, বাইতুল্লাহ; সেই মসজিদের ইমাম ছিলেন একজন খাইয়াত! বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। তিনি ছিলেন হিন্দুস্তানের অধিবাসী। সম্ভবত ভুপালের। নাম ছিল তাঁর শায়খ আবদুল্লাহ আল খাইয়াত। হিন্দুস্তানের হলেও তাঁর ইলমের কারণে তাঁকে মসজিদে হারামের ইমাম বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এরূপ আরও অনেক উদাহরণ দিতে পারি। বড় বড় গ্রন্থ প্রণেতাদের নামের সাথে এরূপ উপাধির উদাহরণও কম নয়। কেউ তো হাজ্জার (পাথর ভাঙ্গার কাজ করে যে)। তাঁর সঙ্গেও আমাদের সাক্ষাত হয়েছে। কুদুরী (রহ.) ছিলেন উচ্চ আইন শাস্ত্রবিদ। তাঁর লিখিত ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের গ্রন্থ মাদরাসার পাঠ্যসূচিতে জরুরী কিতাবরূপে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। তিনি মাটি দ্বারা হাঁড়ি পাতিল বানাতেন বলে তাঁর উপাধি হয়েছে কুদূরী (قدوری) তথা হাঁড়ি-পাতিল প্রস্তুতকারী। তিনি আইন শাস্ত্রের কিতাব লিখলেন। কিতাবটি বোদ্ধাদের নিকট শুধু সমাদৃতই নয়, অপরিহার্য কিতাবরূপে বিবেচিত হল। হাঁড়ি-পাতিল প্রস্তুতকারীর লিখিত কিতাব পাঠকদের নিকট থেকে নিজের মর্যাদা আদায় করে নিল, সঙ্গে সঙ্গে লেখকের মর্যাদাও।

শিক্ষার্থী ভাইদেরকে আমি সংক্ষেপে বলছি, অতএব আপনারা মেহনত ও পরিশ্রম করুন। ইখলাস এবং ইখতেসাস সৃষ্টি করুন। নিজেও উজ্জ্বল হবেন, দেশের মুখকেও উজ্জ্বল করবেন। আপনাদের আলোর বিচ্ছুরণ ও বিকিরণ বিস্তৃতি লাভ করবে বহু দূর পর্যন্ত।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার বয়ান করেছিলাম। হলের উপস্থিত লোকজনের সামনে আমি ভারতের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছিলাম। যখন ভারতের মুজাহিদ দল পেশাওয়ার জয় করল এবং সেখানে কয়েক সপ্তাহ কি কয়েক মাস অবস্থান করল, তখনকার ঘটনা এটি। সেই সময়ে এক পাঠান মুজাহিদ বাহিনীর এক সদস্যের হাত ধরল এবং বলল, আমি তোমাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করব, তুমি জিজ্ঞাসাটির সঠিক জবাব দেবে। জিজ্ঞাসাটি হল, তোমাদের ভারতীয়দের দৃষ্টিশক্তি কি দুর্বল, তোমরা কি দূরে দেখতে পাও না? মুজাহিদ সদস্যটি বিস্মিত হয়ে বলল, না, আমাদের দৃষ্টিশক্তি তো দুর্বল নয়, আমরা তো দূরে খুব ভালভাবেই দেখতে পাই, যেমনটা তোমরা দেখতে পাও। পাঠানটি বলল, তোমাদের চোখে নিশ্চয়ই কোন সমস্যা আছে, নিশ্চয়ই তোমরা দূরে দেখতে পাও না। মুজাহিদ সদস্যটি অপেক্ষাকৃত আরও বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, জনাবের এই ধারণার কারণ কী? এই জিজ্ঞাসারই বা কী কারণ? এরূপ জিজ্ঞাসা তো কেউ করে না, এটা জিজ্ঞাসার বিষয়ও নয়! পাঠান বলল, জিজ্ঞাসার কারণ হল, আমরা জানি তোমরা কয়েক মাস যাবৎ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন। এদিকে তোমরা বেশ নিরোগ ও সুঠাম দেহের অধিকারী। অথচ আমরা তোমাদের কাউকে কোন নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতে দেখি না। অথচ এখানকার নারীরা অত্যন্ত সুশ্রী, সুন্দরী, কমনীয় চেহারা ও আকর্ষণীয় দেহের অধিকারী। এদের দিকে লোলুপ দৃষ্টি তো দূরের কথা চোখ তুলে তাকাতেও তোমাদেরকে দেখি না। আমরা তোমাদেরকে সব সময় নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে দেখি। মাসাধিক কাল যাবৎ স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন পুরুষের অন্তরে কামনা-বাসনা জাগ্রত হবে, তারা লোলুপ দৃষ্টিতে একজন নারীর দিকে তাকাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তোমাদের কাউকে আমরা এরূপ তাকাতে দেখি না বরং নিচের দিকে তাকিয়ে সব সময় হাঁটতে দেখি। একজন দুইজন হলে না হয় কথা ছিল। মনে করতাম লোকটি নারী-বিবাগী। কিন্তু একজন দুইজন নয়, তোমাদের দলের সকলকে যখন একই রূপে দেখলাম তখন আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল যে, এদের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল কিনা। তাই তোমাকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলাম। ভারতীয় মুজাহিদ সদস্য জবাব দিল, আমাদের দৃষ্টিশক্তি আলহামদুলিল্লাহ খুবই ভাল আছে। আমরা দূরে খুব ভালরূপেই দেখতে পাই, স্পষ্ট দেখতে পাই। আমরা যে চোখ তুলে তাকাইনা তা আমাদের ধর্মীয় রীতি। আমরা কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী আমল করি। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘ক্বুল লিল মু’মিনিনা ইয়াগুদ্দু মিন আবসারিহিম ওয়া ইয়াহফাযু ফুরুজাহুম’ (ঈমানওয়ালাদের বলে দাও, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। শূচিতা ও পবিত্রতার সাথে যেন তারা জীবন যাপন করে)।

ঘটনাটি শোনানোর পর উপস্থিত ছাত্রবৃন্দ ও সমাবেশের সুধীমহল যারপরনাই বিস্মিত হল। আমি সেখানে ভারতীয় ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললাম, আপনারাও এরূপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। মানুষের মধ্যে জিজ্ঞাসা জাগ্রত হোক, এই চরিত্রের অধিকারী তারা কিভাবে হল। জিজ্ঞাসা জাগ্রত হোক, এরা ঘরবাড়ী ছেড়ে এখানে শিক্ষা গ্রহণ করতে এসেছে এবং দীর্ঘদিন যাবৎ অবস্থান করছে, কেউ বি. এ ক্লাসে, কেউ বি. এস. সি.-তে, কেউ এম. এস. সি.-তে লেখাপড়া করছে; ভারতে যাতায়াত ব্যয় অনেক বেশি, ফলে তারা একটানা চার বৎসর ছয় বৎসর অবস্থান করছে, এদের অনেকে আবার অবিবাহিত, এখানকার মেয়েরা অত্যন্ত সুন্দরী, বহির্বিশ্বের সকলেই এদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, অথচ এই শিক্ষার্থীরা এদের দিকে ফিরেও তাকায় না, কারণ কী? এই জিজ্ঞাসা সৃষ্টি হোক। অতঃপর তারা জানুক যে, ইসলামের কল্যাণেই, ইসলামের ফয়েজ ও বরকতেই এ সকল ছাত্র এরূপ আদর্শবান, এরূপ উচ্চ চরিত্রের অধিকারী। তারা বুঝুক যে, এটা ইসলামের শিক্ষার ফসল।

আমি আপনাদেরকে বলছি, আপনারা এই শহরে চলুন ফিরুন, জীবন যাপন করুন, দোকান খুলুন, চাকুরী করুন, অমুসলিমদের সঙ্গে মেলামেশা করুন। তাদের থেকে দূরে থাকার প্রয়োজন নাই। কিন্তু আপনারা নিজের স্বকীয়তা ও বিশিষ্টতা প্রমাণ করুন। নেপালের এই ভূখণ্ডে জিজ্ঞাসা জাগ্রত হোক, ‘এরা কারা? এরা কোনরূপ অসতর্ক, অন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ করে না, পর নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত পর্যন্ত করে না। এরা চাকুরী করে অত্যন্ত আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে। এরা অসহায় লোকদেরকে সাহায্য করে। সম্পদহীন ও দুর্বলদের প্রতি এরা কখনও কোনরূপ জুলুম করে না। এরা কারা?’ আপনাদের চরিত্র বৈশিষ্ট্য দ্বারা এই ভূখণ্ডে এরূপ জিজ্ঞাসা আপনাদের জাগ্রত করতে হবে।

আপনারা আপনাদের চরিত্র, ঈমান, সততা ও আচার-আচরণ মাধুর্য দ্বারা প্রমাণ করুন যে, আপনারা অন্যদের তুলনায় ভিন্ন আদর্শ, ভিন্ন মডেল, ভিন্ন দৃষ্টান্ত, ভিন্ন কিছু। এই বিষয়টিই তো ইন্দোনেশিয়ার সকল অধিবাসীকে মুসলমান বানিয়ে দিয়েছে। দেশের সকল অধিবাসী ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। ঐতিহাসিকগণ বলেন, ইন্দোনেশিয়ায় কখনও মুসলিম সেনাবাহিনীর আগমন ঘটেনি। এটা ঐতিহাসিক সত্য। শুধু আরব বণিকদের চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে সে দেশের অধিবাসীরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং সারা দেশ একশ ভাগ মুসলমানের দেশে পরিণত হয়েছে।

তৃতীয় কথা আপনাদেরকে বলতে চাচ্ছি এই যে, বিয়ে-শাদীতে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান, ধুমধাম ও অপব্যয় করবেন না। আমাদের দেশ ভারতে সম্প্রতি এই বিপদ দৃষ্ট হচ্ছে। গতকালই ভাগলপুরে হাজার হাজার মানুষের এক সমাবেশে আমি এ সম্পর্কে আলোচনা করে এসেছি। সেই সমাবেশে বড় বড় আলেমগণও বক্তৃতা করেছেন। এর পূর্বে মুংগেরে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিল। কর্ণাটক ও অন্ধ্র প্রদেশ সহ বিভিন্ন স্থানের উলামা হযরাত সেখানে তাশরীফ এনেছিলেন। তো ভারতে বর্তমানে এক বড় বিপদ এই দেখা যাচ্ছে যে, সেখানকার বিয়ে-শাদীতে প্রচুর অপব্যয় করা হয়। বিপুল সংখ্যক লোক নিয়ে বর যাত্রা করে, কনের বাড়িতে মহা ধুমধাম হয়, প্রচুর অপব্যয় করা হয়। আরেকটি বড় বিপদ বরং বলা চলে বড় আযাব ও গযব হল বরপক্ষের দাবি-দাওয়া। বরপক্ষ কনে পক্ষের নিকট বিভিন্ন দাবি-দাওয়া করে থাকে। যেমন কনেকে এই পরিমাণ স্বর্ণালংকার দিতে হবে, এই এই আসবাবপত্র ও তৈজষপত্র দিতে হবে, মোটর গাড়ী দিতে হবে ইত্যাদি। এগুলো দিতে রাজী হলে বরপক্ষ বিয়েতে রাজী হয়, নতুবা বিয়ে ভেঙ্গে যায়। আমি আশা করব, আপনাদের এখানে এমনটি হবে না। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 মক্তব ও মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা

📄 মক্তব ও মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা


দ্বিতীয় কথা হল, মক্তব-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করুন। কোন গ্রাম, কোন মহল্লা যেন এরূপ না থাকে যেখানে কোন মাদরাসা বা মক্তব নেই, যেখানে দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। স্ত্রী, কন্যা, জায়াদেরকে দ্বীনী শিক্ষা দিন এবং নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজ সন্তানদেরকে দ্বীনী শিক্ষা দান করে, তাদেরকে পয়গম্বরদের কাহিনী শোনায়। বাচ্চাদের অন্তরে যেন তারা তাওহীদের বীজ বপণ করে, তাদের অন্তরে তাওহীদের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করে। শিরকের প্রতি তাদের অন্তরে যেন তারা ঘৃণার সৃষ্টি করে। বদ চরিত্রের প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করে, তাদের অন্তরে রাসূলের প্রতি প্রেম ও ভালবাসা সৃষ্টি করে এবং দ্বীনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার শিক্ষা দান করে। তবেই এখানে নতুন প্রজন্মের ঈমান ও ইসলাম হেফাযতে থাকবে, সুরক্ষিত থাকবে। অন্যথায় কী হবে তা কল্পনা করাও কষ্টের ও বেদনার।

📘 উলামা তলাবা > 📄 নিজের দ্বীনের মূল্যায়ন করুন

📄 নিজের দ্বীনের মূল্যায়ন করুন


সবশেষ কথা হল, আপনারা নিজ দ্বীনের মূল্যায়ন করবেন। দ্বীনকে সর্বাপেক্ষা বড় নেয়ামত বলে গণ্য করবেন। নামাযের পাবন্দী করবেন। কালিমার অর্থ শিখবেন, বুঝবেন। কিছু সূরা মুখস্থ করে নিবেন। সুরাগুলোর অর্থ বুঝে নিবেন এবং সম্ভব হলে তা মুখস্থ করে নিবেন। দ্বীনের জরুরী বিষয়ের জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ আপনাদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। আপনারা মাদরাসাগুলোতে যাবেন। গ্রামে গ্রামে মাদরাসা, মক্তব প্রতিষ্ঠা করবেন। সারকথা, আপনারা অধিকাংশ সময় দ্বীন ও ঈমানের ফিকির করবেন। ইসলামের উপর অটল থাকতে এবং মৃত্যু যেন ঈমানের সাথে হয় সেই চেষ্টা চালিয়ে যাবেন, সঙ্গে তার জন্য দুআও করবেন। কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে— ‘ওয়া লা তামুতুন্না ইল্লা ওয়া আনতুম মুসলিমুন’ (তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না)। তোমাদের মৃত্যু যেন হয় ইসলামের উপর অটল থাকা অবস্থায়। ইসলামের সম্পদ হস্তগত হওয়াই সর্বাপেক্ষা বড় নেয়ামত, সর্বাপেক্ষা বড় সৌভাগ্য। ইসলামই সর্বাপেক্ষা বড় সম্পদ। ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করা, আল্লাহর রাসূলের শাফাআত লাভ করা, তাঁর হাতে কাওছারের পেয়ালা পান করা এবং জান্নাতের উপযোগী বলে বিবেচিত হওয়াই সর্বাপেক্ষা বড় নেয়ামত, বড় সম্পদ, সর্বাপেক্ষা বড় সফলতা। সুতরাং নিজ ঈমান ও ইসলামের হেফাযত করুন, এতে অবিচল থাকুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00