📄 শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর চিন্তা ও কর্মধারা এবং মেজায ও প্রকৃতি
হিজরী দ্বাদশ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) ছিলেন সমকালীন যুগের সর্বাপেক্ষা বড় আলেমে দ্বীন। আমি অত্যন্ত আস্থা ও দৃঢ়তার সাথেই বলছি যে, তিনি ছিলেন শরীয়তের বিধি-বিধানের হেকমত ও রহস্যের এবং শরীয়তের বিধি-বিধানের যৌক্তিকতার সর্বাপেক্ষা বড় ব্যাখ্যাদানকারী, মুসলমানদের জীবনকে শরীয়তের ছাঁচে গড়ে তোলার সর্বাপেক্ষা বড় কারিগর। ইতিহাস লিখতে যেয়ে, বিশেষত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর সমকালীন ব্যক্তিত্ব ও আন্দোলন সম্পর্কে কলম চালাতে যেয়ে আমাকে প্রচুর অধ্যয়ন করতে হয়েছে। আল্লামা ইকবাল মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ.) সম্পর্কে বলেছিলেন— 'উও হিন্দ মে সরমায়া-এ মিল্লাত কা নিগাহবান, আল্লাহ নে বরওয়াক্ত কিয়া জিসকো খবরদার' (তিনি ছিলেন ভারতবর্ষে দ্বীন-সম্পদের অতন্দ্র প্রহরী আল্লাহ যাঁকে উপযুক্ত সময়ে করেছিলেন জ্ঞান দান)।
আমি ঐ অধ্যয়ন ও গবেষণার আলোকে বলতে পারি যে, এই উপমহাদেশে আজ অবধি শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) কর্তৃক সৃষ্ট যুগেরই প্রবাহ চলছে। দারুল উলূম দেওবন্দ, মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর, নাদওয়াতুল উলামা লাক্ষ্ণৌ সহ সকল দ্বীনী মাদরাসা প্রকৃতপক্ষে তাঁরই চিন্তাধারা ও কর্মধারার প্রলম্বিত রূপ। এ সকল দ্বীনী মাদরাসা তাঁরই চিন্তা-চেতনা ও মেজাযের ধারক। এই দিক লক্ষ্য করলে তাঁর জন্মভূমি ফালাত ভ্রমণকেন্দ্র নয় বরং যিয়ারতভূমি।
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে দান করেছেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী। তাঁর সন্তানগণ ছিলেন যেমন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী তদ্রূপ তাঁর সন্তান নয় এরূপ বহু ব্যক্তিও তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী রূপে গড়ে উঠেছিলেন। মোটকথা আল্লাহ তাআলা তাঁকে আখলাফ ও খুলাফা উভয়টিই দান করেছিলেন। এটাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। আখলাফ তথা তাঁর পরিবারের মধ্যে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন ইমামুল হিন্দ শাহ আবদুল আযীয (রহ.), যুক্তিবিজ্ঞানের ইমাম শাহ রফীউদ্দীন দেহলভী এবং শাহ আবদুল কাদের (রহ.)। শেষোক্ত জনের কুরআনের অনুবাদ বহুল প্রসিদ্ধ। কোন ভাষাতেই এ পর্যন্ত তাঁর চেয়ে উত্তম অনুবাদ আর কেউ করেনি। চতুর্থ সন্তান শাহ আবদুল আযীয (রহ.) বেশি সময় পাননি। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে এর উত্তম বিনিময় দান করেছেন। শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ.)-এর ন্যায় মেধাবী ও প্রতিভাসম্পন্ন সন্তান তাঁকে দান করেছেন। আর খুলাফা বা অ-পারিবারিক উত্তরসূরীদের মধ্যে ছিলেন সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.), (যিনি ছিলেন শাহ আবদুল আযীয (রহ.)-এর খলীফা,) মাওলানা আবদুল হাই, শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক প্রমুখ। শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক (রহ.) ছিলেন যুগপৎ দরস ও তাদরীসের ইমাম এবং তাসাওউফের ইমাম। শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর এই উভয় প্রকার উত্তরসূরী ছিল দিল্লীর প্রতি ফালাতের দান। ফালাত ভূমিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই এইসব ইতিহাস সামনে মূর্ত হয়ে উঠে।
যখন রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন পদ লাভের কারণে বিলাসী জীবন যাপনকারীদের অভ্যন্তরীণ শক্তি দুর্বল হতে লাগল, রক্তবাহী শিরা-উপশিরার রক্ত হল শীতল, পরিণত হল জমাট রক্তে তখন মফস্বল এলাকাগুলো সরবরাহ করল নতুন রক্ত। মোঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা ও জিহাদী অনুপ্রেরণার প্রাণকেন্দ্র দিল্লীকে ফালাত উপহার দিল এক বিশাল উপহার। সে উপহার ছিল ওয়ালীউল্লাহী পরিবার। তাঁর ঔরসজাত পরিবার এবং চিন্তা-চেতনার ধারক ও বাহক তাঁর আধ্যাত্মিক ও আত্মিক পরিবার। এতদপেক্ষা বড় উপহার আর কী হতে পারে? যেমন সুহালীর একটি গ্রাম লাক্ষ্ণৌকে উপহার দিয়েছিল ফিরিঙ্গী মহলের উলামা পরিবারকে। তদ্রূপ বাগদাদে যখন সর্বক্ষেত্রে অবক্ষয় দেখা দিল, শাসকদের অপশাসন যখন মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করে ফেলল এবং প্রশাসনের পদ লাভ ব্যতীত মুসলমানদের সামনে আর কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল না তখন ইরানের ছোট একটা গ্রাম 'জীলান' উপহার দিল সাইয়েদুনা আবদুল কাদের জিলানীকে, যিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইশকে ইলাহী ও আল্লাহ প্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিলেন, যার ঢেউ আছড়ে পড়ল সুদূর আফ্রিকাতেও। অদ্রূপ ইরানের একটি সাধারণ ও অখ্যাত গ্রাম মুসলিম বিশ্বকে উপহার দিল ইমাম গাযযালীর ন্যায় এক মহান সুফী ও গবেষক ও দার্শনিককে।
মফস্বল এলাকাসমূহ প্রতি যুগেই রাজধানীকে সরবরাহ করেছে এরূপ উন্নত ও শাণিত নতুন রক্ত যা সমগ্র দেশকে ভরে দিয়েছে উষ্ণতায়। অনেক সময় লোকে ভুলে যায় এই উষ্ণ স্রোতের সূচনাস্থলকে, ভুলে যায় নতুন রক্তের উৎসকে। বড় বড় শহরের ইতিহাস সামনে এসে সব ছোট ছোট গ্রামের ও মহল্লার ইতিহাসকে আড়াল করে ফেলে। আড়ালে চলে যায় ছোট গ্রামের অনবদ্য ইতিহাস ও অবদান।
ছোট ছোট এইসব গ্রাম ও মহল্লায় যেয়ে যেখানে হৃদয় আন্দোলিত হয় একথা ভেবে যে, এখানে কীরূপ গুণধর মহান ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি হয়েছে, অন্তর পুলকিত হয় আল্লাহর দ্বীন ও দানের অসীমত্ব দেখে, তাঁর কুদরতের ব্যাপ্তি ও প্রসারতা উপলব্ধি করে, সেখানে একথাও অন্তরে উদিত হয় যে, বর্তমানে এরূপ ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা যে মৃত থেকে জীবিত সৃষ্টি করার কুদরত রাখেন— ‘ইউখরিজুল হাইয়্যা মিনাল মাইয়্যিতি’ (তিনি মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন) তা ভুলে যেয়ে মস্তিষ্কে এই কথা জাগরূক হয় যে, ব্যস, এখন শুধু ইতিহাস ও ঐ সকল ব্যক্তিবর্গের জীবন ও কর্ম পাঠ করা উচিত। আর নিজের জীবন-জীবিকার সন্ধানে ব্যাপৃত হওয়া উচিত। ফালাতের যে ইতিহাস ও পরিচিতি তুলে ধরলাম তা আমাকে এই মুহূর্তে এই আয়াতটি পাঠ করে আপনাদেরকে শুনাতে উদ্বুদ্ধ করছে। আয়াতটি হল— ‘কুল্লান নুমুদদু হাউলায়ি ওয়া হাউলায়ি মিন আতায়ি রাব্বিকা ওয়ামা কানা আতাউ রাব্বিকা মাহযুরা’।
‘আমি প্রত্যেককে, এদেরকে ওদেরকে দান করতে থাকব তোমার প্রতিপালকের দান দ্বারা। তোমার প্রতিপালকের দান তো অবারিত।’ (সূরা বনী ইসরাঈল ২০) অর্থাৎ আমি এদেরকেও দেই, ওদেরকেও দেই, হাউলায়ি ওয়া হাউলায়ি এবং দিতে থাকব। আপনারা জানেন ‘নুমুদদু’ শব্দটি মুজারি-এর রূপ (Form)। আর আপনারা একথাও জানেন যে, মুজারি বর্তমান ও ভবিষ্যত কাল উভয়টিই বোঝায়। অতএব আমি দেই বা দেব এই দুই অর্থের কোন একটিকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া শুদ্ধ নয়। এর শুদ্ধ অনুবাদ হল আমি দিতে থাকব। তোমার প্রতিপালকের দানে কোন রেশনিং (Rationing) নেই যে, একবার দান করলেন তো বহু বৎসর যাবৎ প্রতীক্ষায় রাখলেন। আমাদের প্রতিপালকের দান অবারিত। তাঁর দানের জন্য নির্দিষ্ট কাল বা নির্দিষ্ট পরিমাণ নাই। কেননা তাঁর দানভাণ্ডার অসীম, অনিঃশেষ। বললেন— ‘ওয়ামা কানা আতাউ রাব্বিকা মাহযুরা’।
আকবর ইলাহাবাদী মরহুম বলেছিলেন— ‘আল্লাহ কি রাহ আব তক হ্যায় খুলি আসার ও নিশান ভি কায়েম হ্যায়, আল্লাহ কে বান্দো নে লেকিন উস রাহ পর চলনা ছোড় দিয়া’। আল্লাহর পথ এখনও রয়েছে খোলা, আলামত ও নিদর্শনও রয়েছে বহাল। কিন্তু আল্লাহর বান্দারা সেই পথে চলা ছেড়ে দিয়েছে।
📄 ঐ সকল বুযুর্গানে দ্বীন জাতিকে কী দিয়েছেন?
ঐ সকল বুযুর্গানে দ্বীন উভয়বিধ কাজ করেছেন। আমাদের মস্তিষ্ক তো শুধু একদিকে ধাবিত হয়। তা হল, তাঁরা এই দ্বীনকে কী দিয়েছেন, হাদীস ও তাফসীরে তাঁরা কী কী নতুন দ্বার উম্মোচন করেছেন। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানকে তাঁরা কতটুকু গভীরে নিয়ে গেছেন, তাতে কী পরিমাণ বিস্তৃতি তাঁরা ঘটিয়েছেন। পরিবেশে ও সমাজে তাঁরা কতটুকু আধ্যাত্মিকতার ধারা সৃষ্টি করেছেন, পরিবেশ ও সমাজের আত্মিক উন্নতি কতটুকু সাধন করেছেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে অপর একটি বিষয় অদৃশ্যই থেকে যায়, আমাদের মস্তিষ্ক সে বিষয়টির দিকে ধাবিত হয় না। আর তা হল, অমুসলিমদের নিকট ইসলামের মর্যাদা তাঁরা কতটুকু তুলে ধরেছেন, অমুসলিমদের অন্তরে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব কতটুকু প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কীভাবে তাঁরা তাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত অধ্যয়ন, গভীর দৃষ্টি দ্বারা চিন্তা-ভাবনা ও তা আত্মস্থ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। ঐতিহাসিকরাও এই দিকটাকে এড়িয়ে গেছেন, তাঁদের এই কর্মধারাকে পর্দার অন্তরালে রেখে দিয়েছেন।
অথচ একদিকে যেমন তাঁরা মুসলমানদের মাঝে জ্ঞানের সাগর প্রবাহিত করে দিয়েছেন, শিক্ষাদানের চাদর বিছিয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে তাঁরা তেমনই প্রতিবেশী অমুসলিমদের অন্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জগতের জন্য রহমত স্বরূপ, ইসলাম যে সত্য ও শ্রেষ্ঠ ধর্ম, ইসলাম যে যুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম, ইসলাম যে পৃথিবীর পিপাসা নিবারণের একক ক্ষমতার অধিকারী ধর্ম— এর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাদের অন্তরে এসব বিশ্বাস বদ্ধমূল করতে সক্ষম হয়েছেন। আমাদের লিখিত জীবন-ইতিহাসসমূহে তাঁদের কীর্তির এই দিকটি উপেক্ষিত থেকে গেছে, কমপক্ষে গৌণ থেকে গেছে।
আজ আমি বলছি যে, বর্তমানে মুসলিম জাতিকে এই উভয়বিধ কাজ করতে হবে। বিশুদ্ধ বিশ্বাস, গ্রহণযোগ্য ইবাদত এবং আল্লাহ তাআলার মারেফাত লাভের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে মুসলমানদের বিশুদ্ধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, শক্তিশালীও করতে হবে। উভয়টিই জরুরী। সম্পর্কের বিশুদ্ধতা এবং শক্তিশালীতা। শুধু বিশুদ্ধ হলেই চলবে না, শক্তিশালীও হতে হবে। শুধু শক্তিশালী হলেও চলবে না, বিশুদ্ধও হতে হবে। ইবাদত তো মুশরিকরাও করে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘ওয়ামা কানাত সালাতুহুম ইনদাল বাইতি ইল্লা মুকাআন ওয়া তাসদিয়াহ’ (কাবা ঘরের নিকট তাদের সালাত শুধু শিস ও হাততালি ব্যতীত কিছুই ছিল না)। (সূরা আনফাল ৩৫)
উপরিউক্ত বিষয় দুটোর সঙ্গে সঙ্গে বিশেষত এই যুগে আরও একটি বিষয় মুসলিম মিল্লাতের জন্য অপরিহার্য। আর তা হল নিজেদেরকে জাতি ও দেশের জন্য উপকারী বলে প্রমাণ করা। আমাদের কারণে বহু বিপদ থেকে দেশ রক্ষা পাচ্ছে; আমরা এই দেশের জন্য রহমত ও বরকত স্বরূপ— এটা আমরা তখনই প্রমাণ করতে পারব যখন আমরা অফিস-আদালতে, হাটে-বাজারে, ঘাটে-মাঠে খাঁটি মানুষ হয়ে যেতে পারব। খাঁটি মানুষ হতে পারলে অমুসলিমরা চিন্তা করতে বাধ্য হবে যে, কোন সে ধর্ম যা এদেরকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করেছে? আমাদের বলতে হবে যে, এই দেশের জন্য পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী ও সাগর এতটা প্রয়োজনীয় নয় যতটা আমরা এই দেশের জন্য প্রয়োজনীয়, আমাদের মানবতার পয়গাম, আমাদের খোদাভীতি যতটা প্রয়োজনীয়।
আমরা এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছি যে, একটি রাস্তা চলে যাচ্ছে ইরতিদাদ ও ধর্মান্তরিত হওয়ার দিকে। এর চেয়ে লঘু কোন শব্দ ব্যবহার করতে আমি রাজী নই, যদি না আসমান থেকে কোন ইশারা পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলার কুদরতের সরাসরি হস্তক্ষেপ না হলে পরবর্তী প্রজন্ম সম্ভবত ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে থাকবে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। সম্পূর্ণ অজ্ঞই শুধু নয়, বরং তারা আরও এক ধাপ অগ্রসর হয়ে ইসলাম বিরোধী বিশ্বাস ও ইসলাম বিরোধী চিন্তা-চেতনার ধারক হবে। শিরকপ্রসূত বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার প্রবক্তা হবে। এটা শুধু কল্পনা নয় বরং বাস্তবতা। এইরূপই হবে বলে আমাদের দিব্যদৃষ্টিতে যেন আমরা দেখতে পাচ্ছি। এইরূপ ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে বর্তমান যুগ অতিবাহিত হচ্ছে যে, মুসলমানদের যদি উপরিউক্ত আশঙ্কা দূরীভূত করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োজিত করার তাওফীক না হয় তাহলে পঁচিশ বৎসর পর, না এতদিনও নয়— বরং পনের বৎসর পরই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাম সম্পূর্ণরূপে ভুলে যাবে। এর আলামত ও পূর্বাভাস স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এখনই স্কুলের অনেক শিশু আল্লাহ শব্দটি বিশুদ্ধভাবে লিখতে পারে না। তারা জিজ্ঞেস করে আমরা ‘আল্লাহ’ কীভাবে লিখব? আর বিপুল সংখ্যক যুবক বর্তমানে এই ধারণা পোষণ করে যে, এই ধরিত্রী পরিচালনা করছে রাম অথবা কৃষ্ণ। হিন্দুদের দেব-দেবী বিষয়ক বিদ্যা শিশুদের মন-মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করছে। বর্তমানে টেলিভিশনে যে রামায়ন সিরিজ প্রচারিত হচ্ছে এবং কলেজে যেসব গ্রন্থের পাঠদান করা হচ্ছে তা দ্বারা যুবকদের মন-মানস প্রভাবিত হয়ে পড়ছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— ‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানু কু আনফুসাকুম ওয়া আহলিকুম নারা’ (হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর)। (সূরা তাহরীম ৬)
সন্তানদের আলেম, ফাযেল, মুফাসসির এবং মুহাদ্দিস বানানোর বিষয় নয় বরং বিষয় হল তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষার করার, দোযখের আগুন থেকে রক্ষার করার। মহিলাদের একটি মজলিসে এক বোনের চেহারায় চিন্তা ও বিষণ্ণতার ছাপ দেখা যাচ্ছিল। চেহারা ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছিল। অন্যান্য মহিলারা তাকে জিজ্ঞেস করল, বোন ব্যাপার কী বল তো? তোমার কি মাথা ব্যথা করছে? নাকি তোমার পেটে কোন সমস্যা? সে বলল, কিছুই হয়নি। অনেক পীড়াপীড়ির পর সে বলল, আমি আমার শিশু সন্তানকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে এসেছি। তার অদূরে দিয়াশলাই রাখা আছে। যদি আমার বাচ্চাটি জেগে যায় এবং দিয়াশলাইর কাছে পৌঁছে যায় আর তা দ্বারা নিজের কাপড়ে আগুন জ্বালিয়ে ফেলে তাহলে কী অবস্থা হবে— এই চিন্তাই আমাকে অস্থির করে তুলেছে। মহিলারা জিজ্ঞেস করল, বাচ্চার বয়স কত? সে বলল, আড়াই বছর। তখন মহিলারা বলল, কথা হুঁশ করে বল। এতটুকু বাচ্চা চৌকি থেকে কীভাবে নামবে আর দিয়াশলাইর কাছে যাবে? আর গেলেই যে সে এই কাজটিই করবে তা তুমি কি করে চিন্তা কর? উত্তরে সে বলল, বাচ্চাটি যদি তোমাদের হত তাহলে তোমরাও এরূপই আশঙ্কা করতে। বাচ্চাটি তো আমার। এজন্য আমার খুব আশঙ্কা হচ্ছে।
সুধীবৃন্দ! আপনাদের নিকট আমি প্রশ্ন রাখছি যে, আজ আমাদের পিতা-মাতার অন্তরে এই চিন্তার উদয় কেন হয় না যে, আমরা যদি আজ আমাদের সন্তানদেরকে কালিমা ও নামাযের শিক্ষা না দেই, তাওহীদের শিক্ষা তাদেরকে স্মরণ না করিয়ে দেই, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মূর্তি ভাঙ্গার তাৎপর্য সম্পর্কে তাদের ধারণা না দেই তাহলে কাল তারা মুশরিক হয়ে যাবে। এটা তো কল্পনাপ্রসূত আশঙ্কা শুধু নয় বরং বাস্তবতা। আর বাচ্চার ব্যাপারে ঐ মহিলার আশঙ্কা ছিল অনেক দূরের।
আমি একটা উদাহরণ দিয়ে থাকি যে, ঢাল বেয়ে যাওয়া পথে একটি বালক সাইকেল চালাচ্ছে, সামনে আছে গভীর গর্ত। যে গর্ত হল হিন্দুদের দেবতাদের গর্ত, পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজার গর্ত। মুসলমানদের অন্তরে শিরক ও মূর্তিপূজার ব্যাপারে ঐরূপ ঘৃণা বিদ্যমান থাকা উচিত যেরূপ ঘৃণা থাকে পায়খানা-পেশাবের ব্যাপারে বরং পায়খানা পেশাব অপেক্ষাও মূর্তিপূজা ও শিরকের প্রতি অধিক ঘৃণা বিদ্যমান থাকা জরুরী। মুসলমানদের অন্তর থেকে এই ঘৃণা, এই শিরক-ভীতি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। এটা আশঙ্কাজনক। একজন মুসলমানের অন্তরে তো সব সময় এই আশঙ্কা বিদ্যমান থাকা উচিত ছিল যে, সে মুশরিক হয়ে, শিরকী বিশ্বাস নিয়ে পুনরুত্থিত হয় কিনা। হযরত খিজির আলাইহিস সালাম কর্তৃক একজন বালককে হত্যাকরণ শরীয়তের বিধি-বিধানের আওতায় পড়ে না, সুতরাং তদনুরূপ আমল করতে যাওয়াও অপর কারও জন্য বৈধ নয়। কিন্তু ঘটনাটি কুরআনুল কারীমে বিবৃত করা হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে। কিয়ামত পর্যন্ত তা পঠিত হতে থাকবে। ঘটনাটি বিবৃত করার উদ্দেশ্য এই কথা বোঝানো যে, মুসলমানরা যেন বোঝে যে, বংশের জন্য ফেতনা ও বিপদ হতে পারে এরূপ বালক কত অশুভ ও অকল্যাণকর। কুরআনে ঘটনাটিকে স্থান দিয়ে একথা জানান দেওয়া হয়েছে যে, শিরক ও কুফরীর বিপদ কত বড় বিপদ ও কত ভয়াবহ বিপদ।
প্রথম কথা তো এই যে, ভবিষ্যত প্রজন্মকে স্পষ্ট মূর্তিপূজা থেকে এবং শিরকী আকীদা-বিশ্বাস থেকে রক্ষা করতে মরণপণ চেষ্টা করুন, সম্ভাব্য সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করুন। স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের জন্য অবসর সময়ে প্রাইভেট ক্লাসের ব্যবস্থা করুন অথবা তাদেরকে মাদরাসা ও মক্তবে ভর্তি করুন। মাদরাসা ও মক্তব আমাদের মেরুদণ্ড স্বরূপ, আমাদের নিঃশ্বাস স্বরূপ। যদি নিঃশ্বাস, প্রশ্বাস চলে তো আমরা জীবিত, নতুবা আমরা মৃত। পরিবেশকে গড়ে তুলুন। পরিবেশকে নিজের কাছাকাছি আনতে চেষ্টা করুন। সমাজ ও পরিবেশ যদি এইরূপ অগ্নিফুলিঙ্গ নিয়েই বহাল থাকে তাহলে যে কোন সময় আগুনে ভস্মীভূত হতে পারে। যদি সমাজের লোকজন আমাদেরকে দেখার পর তাদের মুখমণ্ডলে বিরক্তিভাব প্রকাশ পায়, যদি তারা দেখতে থাকে যে, আমাদের মধ্যে না চারিত্রিক গুণাবলী বিদ্যমান, না আমাদের মধ্যে অন্যের জন্য উপকারী গুণ বিদ্যমান, আমরাও ওয়াদার বরখেলাফ করি যেমন তারা, আমরাও মিথ্যা বলি যেমন তারা বলে, তাহলে আমরা শুধু নিজেদের জন্য নয় বরং ইসলামের অস্তিত্বের জন্যও এই দেশে আমরা হুমকি হয়ে দাঁড়াব। আমাদের আকাবির ও পূর্বসূরীগণ আফ্রিকা, মরক্কো, স্পেন পর্যন্ত ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। ইসলামের কথা তাঁরা শুধু মুখে প্রচার করেননি, বরং তাঁদের চারিত্রিক গুণাবলীর উৎকৃষ্টতা ইসলামের প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছে। তাঁদেরকে দেখে তাঁদের চারিত্রিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে এমনিতেই অমুসলিমদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের প্রেরণা সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামের সৌন্দর্যের কথা মুখে বেশি একটা প্রচার করতে হয়নি।
মুসলিম পার্সোনাল 'ল' বা মুসলিম পারিবারিক আইন সংশোধন উদ্যোগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা হয়েছে শুধু এজন্য যে, পারিবারিক সম্পর্ক, উত্তরাধিকার, বিবাহ তালাক সব যেন ইসলামী আইন অনুযায়ী হয়। আর এই সংগ্রামে দেশের সর্বস্তরের উলামায়ে কেরাম কিতাব অধ্যয়ন ছেড়ে কামরা থেকে রাস্তায় নেমে পড়েছেন, মাঠে-ময়দানে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। নিজেদের পারিবারিক আইনের হেফাযত করতে হবে, নিজেদের ধর্মীয় স্বকীয়তাকে রক্ষা করতে হবে। এর সর্বোত্তম নিকটবর্তী উপকরণ হল এই সকল মাদরাসা ও মক্তব। দ্বিতীয় যে কাজটি করা প্রয়োজন তা হল, পরিবেশের ও সমাজের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি ও তিক্ত আবহাওয়াকে দূরীভূত করতে হবে। ইসলামের পরিচিতি সমাজের সামনে তুলে ধরতে হবে, নতুবা কোন উপায় অবশিষ্ট থাকবে না।
সুধী! 'মানবতার মুক্তি আন্দোলন' একটা চার দেয়াল বিশিষ্ট সুরক্ষিত দূর্গ। এতে অবস্থান করে আপনি কুরআন পাঠ করুন, মসজিদ নির্মাণ করুন। আল্লাহ না করুন! যদি তা ধ্বংস হয়ে যায় তবে? আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ঐ দিন পর্যন্ত জীবিত না রাখুন যখন এই সমস্যা চার দেয়ালের মধ্যে প্রবেশ করবে এবং মাদরাসা, মসজিদ হুমকির সম্মুখীন হবে। এতটুকু কথা বলার মত শারীরিক অবস্থা আমার ছিল না। আপনাদের একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা ও সহায়তা আমাকে এত কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আল্লাহ আমল করার তাওফীক দান করুন।
ওয়া আখিরু দাওয়া না আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।