📘 উলামা তলাবা > 📄 দাওয়াত ও তাবলীগি কাজের মধ্যেই মুসলমানদের প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা নিহিত

📄 দাওয়াত ও তাবলীগি কাজের মধ্যেই মুসলমানদের প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা নিহিত


আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা সাইয়্যিদুল আনবিয়াই ওয়াল মুরসালীন ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমায়ীন ওয়া মান তাবিআহুম বি ইহসানিও ওয়া দাআ বি দাওয়াতিহিম ইলা ইয়াউমিদ দীন। আম্মা বাদ—

ফা আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।

ওয়ালতাকুম মিনকুম উম্মাতুই ইয়াদউনা ইলাল খাইরি ওয়া ইয়ামুরুনা বিল মারুফি ওয়া ইয়ানহাওনা আনিল মুনকার।

প্রিয় ছাত্রবৃন্দ!

এটা একটা যথার্থ ও ঐতিহাসিক সত্য যে, নবীগণের সকল প্রচেষ্টার বুনিয়াদ ছিল দাওয়াত। তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তাঁর সঙ্গে মানবজাতির ঘনিষ্ঠতা ও তাআল্লুক সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের আকীদা-বিশ্বাস বিশুদ্ধতা লাভ করেছে, তাদের চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, অন্যায় অবিচারের প্রতি তাদের ঘৃণার মনোভাব জাগ্রত হয়েছে, নবীগণের মাধ্যমেই অন্যায়-অবিচারের নিষ্ক্রিয়তা শুরু হয়েছে, অন্যায়-অবিচার মূলোৎপাটিত হয়েছে, তাঁদের মাধ্যমেই গোটা মানবজাতির গতির পরিবর্তন ঘটেছে, মানুষের জীবন যাপন প্রণালীর আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এইসব কিছুর মূলে ছিল নবীগণের দাওয়াত। হাঁ একমাত্র দাওয়াতই ছিল নবীগণের সাফল্যের মূলভিত্তি। রাজশাসন কিংবা রাজক্ষমতা, ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি ও দাপট, স্বার্থের প্রলোভন, যুগ ও পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি কোনটাই নয়, তাদের কর্মপ্রচেষ্টার বুনিয়াদ ছিল একমাত্র দাওয়াত। আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম)-এর আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই দিকটাকেই, এই সত্যটাকেই, এই বিশেষত্বকেই বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। আপনি যদি নবীগণের ইতিহাস ও তাঁদের জীবন চরিত পাঠ করেন, তবে আপনার সামনে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে যে, তাঁদের কর্মকাণ্ডের সূচনা ও সমাপ্তি এবং বুনিয়াদ ছিল এই দাওয়াত। আম্বিয়া কেরামের এটাও এক বিশেষ প্রচেষ্টা ছিল যে, তাঁদের প্রস্তুতকৃত ব্যক্তিরাও যেন এই দাওয়াতের দায়িত্ব সুচারুরূপে আঞ্জাম দেয় এবং এটাকে তারা ফরয ও আবশ্যিক বলে জ্ঞান করে। এজন্য কুরআনুল কারীমে আদেশসূচক শব্দ ব্যবহার করে বলা হয়েছে— ‘ওয়ালতাকুম মিনকুম উম্মাতুন’ ইত্যাদি।

তোমাদের মধ্য থেকে এক দলের এরূপ হওয়া উচিত যাদের কাজ হবে— ‘ইয়াদউনা ইলাল খাইর’ কল্যাণের দিকে আহ্বান করা। আর এই কাজের জন্য আল্লাহ তাআলা সর্বাধিক আদর্শ, নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য যে দাঈ (দাওয়াত দানকারী) এবং সর্বাপেক্ষা সফল যে দাঈ-র উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন তাঁরা ছিলেন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম। যদি আপনি তাঁদেরকে পাঠ করেন, তবে অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন যে, দাওয়াত তাঁদের প্রাণ নয় শুধু, বরং দাওয়াত ছিল তাঁদের প্রকৃতিজাত স্বভাব, আল্লাহ প্রদত্ত মেজায। এক হল কাজ, প্রয়োজন পূরণের তাগিদ আর সময়ের দাবি, আরেক হল মেজায। তো আম্বিয়া কেরামের মেজাযই ছিল দাওয়াত। বরং বলুন, সকল দ্বীনের মেজায ছিল দাওয়াত। আল্লাহ তাআলা নবীগণের জীবন-কাহিনীর যে খুঁটিনাটি ও বিস্তারিত বিবরণ দান করেছেন তা হতে এবং নবীগণের স্ব-স্ব জাতির সাথে তাঁদের কথোপকথন ও তাঁদের দাওয়াতের যে পদ্ধতির বিবরণ দান করেছেন তা হতে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁরা মূলত ও প্রথমত ছিলেন দাঈ বা দাওয়াত দানকারী, তারপর অন্য কিছু। যেমন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। তিনি ছিলেন এক্ষেত্রে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের মধ্যে যারা তাঁর সঙ্গে চেতনাগত, বিশ্বাসগত ও দাওয়াত গত সম্পর্কে সম্পৃক্ত হবে তাদের মধ্য থেকে তারাই দাওয়াত ইলাল্লাহ, দাওয়াহ ইলাল আখিরাহ (আখেরাতের দিকে আহ্বান) দাওয়াত ইলাদ্দীন বা দ্বীনের প্রতি আহ্বান ইত্যাদি দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে, যারা প্রকৃত অর্থেই তাঁর অনুগত ও তাঁর পথের পথিক। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘মিল্লাতা আবিকুম ইবরাহীম, হুয়া সাম্মাকুমুল মুসলিমীন’ (তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত আঁকড়ে ধর। তিনি তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম)। (সূরা হাজ্জ ৭৮)

চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে দিলেন যে, যে উম্মতকে ‘খায়রা উম্মাত’ বা শ্রেষ্ঠ উম্মত নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে সেই শেষ উম্মতের প্রকৃত ঊর্ধ্বতম পূর্বসূরী এবং প্রতিষ্ঠাতা ও মুরব্বী হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। কুরআন মাজীদে যেখানেই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আলোচনা এসেছে সেখানেই দাঈ সুলভ প্রাণের উচ্ছ্বলতার সন্ধান মেলে এবং তাঁর আলোচনায় তাঁকে সর্বাপেক্ষা অধিক উপস্থাপন করা হয়েছে দাঈ হিসাবেই। কোন দাঈকে যে সর্বাপেক্ষা অধিক বিপদের মুখোমুখি হতে হয়, তাকে যে সর্বাধিক ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার করে নিতে হয় তার দৃষ্টান্ত হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আলোচনাতেই বৃহৎ দুটি ত্যাগ ও কুরবানীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি যখন তাওহীদী বিশ্বাসের কথা ঘোষণা করলেন এবং সমকালীন বাদশাহ নমরূদের আনুগত্য ও দাসত্বকে অস্বীকার করলেন তখন আগুন জ্বালানো হল এবং বাদশাহ নির্দেশ দিল, তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করতে। অন্যান্য নবীগণের আলোচনায় এরূপ ভয়াবহ পরীক্ষায় নিপতিত হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় পরীক্ষাটির বিবরণ পাওয়া যায় সূরা সাফফাতে। তিনি প্রাণপ্রিয় পুত্রকে বললেন— ‘ইয়া বুনিয়্যা ইন্নী আরা ফিল মানামি আন্নী আযবাহুকা ফানযুর মা যা তারা’ (হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি তোমাকে (আল্লাহর নির্দেশে) যবেহ করছি, তুমি চিন্তা করে দেখ তোমার কী অভিমত)। (সূরা সাফফাত ১০২)

এই দুটি পরীক্ষাই এবং দুটো কুরবানী ও ত্যাগই এরূপ যার নজীর অন্যান্য দাঈর জীবন ও ইতিহাস তো দূরের কথা অন্যান্য নবীগণের জীবন ও ইতিহাসেও পাওয়া যায় না। এই দুটো পরীক্ষার কথা কুরআনুল কারীমে বিবৃত করে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত করেছেন যে, দাঈর সামনে এরূপ পরীক্ষা ও বিপদ আগত হতে পারে। তো ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের, ইসলামের সফলতার, ইসলাম যে বিপ্লব সাধন করেছে এবং যে শূন্যতা মুসলিম উম্মাহ দ্বারা পূর্ণতা লাভ করে সে সবকিছুর মূল হচ্ছে দাওয়াত। এই উম্মত যত দিন দাওয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে ততদিন পৃথিবীতে কল্যাণের আশা করা যেতে পারে, ততদিন পৃথিবীতে কল্যাণের প্রসার ঘটবে। আল্লাহ না করুন! এই উম্মত যদি দাওয়াতের কাজকে নিষ্প্রয়োজন বলে মনে করে এবং দাওয়াতের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে তবে গোটা পৃথিবী বিপন্ন হয়ে পড়বে। অতএব দাওয়াতের কাজকে জীবন্ত করে তোলা আবশ্যক।

রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.)-এর জওয়াব এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। রুস্তম যখন জিজ্ঞাসা করেছিল— ‘মা আল্লাযি জাআ বিকুম’ (তোমরা কী উদ্দেশ্যে এসেছ?)। রুস্তমের এই প্রশ্নের কমপক্ষে দশটি জবাব হতে পারত। কিন্তু রুস্তম অপেক্ষায় ছিল একটি মাত্র উত্তরের। সে প্রত্যাশায় ছিল যে, উত্তরে তাকে বলা হবে, ‘তোমরা বহুকাল যাবৎ বিলাসী জীবন যাপন করছ আর আমরা অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছি। তাঁবুতে বাস করছি। আমাদের খাদ্য বলতে কিছু খেজুর, উটের গোশত আর উটের দুধ। সুতরাং আমরা এসেছি আমাদের হক ও অধিকার আদায় করে নিতে। সুখী জীবন যাপনের অধিকার কি শুধু তোমাদেরই থাকবে? তা কখনও হতে পারে না।’

রুস্তম এই উত্তরের অপেক্ষায় ছিল এবং এর জন্য প্রস্তুতও ছিল যে, যদি তারা এরূপ দাবি করে তবে সে তাদের প্রকৃতিগত ও জন্মগত অধিকার এবং হক দিয়ে দেবে, তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত হক বুঝে নিয়ে চলে যাবে। ফলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধের ঝামেলায় জড়াতে হবে না এবং পরাজিত হয়ে নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে না। সে ঠিক করে রেখেছিল, সে বলবে— ঠিক আছে, আমি তোমাদের ভাতার ব্যবস্থা করছি। প্রতিটি আরর এই পরিমাণ ভাতা পাবে। রুস্তম এই উত্তরের প্রত্যাশায়ই প্রশ্ন করেছিল এবং আমাদের ধারণা, সে নব্বই-পঁচানব্বই ভাগ নিশ্চিত ছিল যে, উত্তরে তাকে বলা হবে, ‘আমাদের ক্ষুধা ও দারিদ্রই আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে। এটা কেমন অবিচার যে, তোমরা একেকজন লাখ টাকার টুপি পরিধান করবে আর আমরা মরব ক্ষুধায়-অনাহারে?’ বাস্তবতা এইরূপই ছিল। ইতিহাস বলে যে, রুস্তম পরাজিত হয়ে যখন পলায়ন করছিল তখনও তার সাথে ছিল এক হাজার বাবুর্চি, এক হাজার জোড়া গরু এবং এক হাজার জন বাজপালক। সাসানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস সম্পর্কে একটি গ্রন্থ আছে প্রফেসর ইকবাল অনূদিত। গ্রন্থটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও তথ্যবহুল। আমি আমার রচনায় গ্রন্থটির বরাত দিয়েছি। আমরা ইতিহাস গ্রন্থ পাঠ করি ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে। গভীর দৃষ্টিতে, চিন্তা ও মনোযোগ সহকারে তা পাঠ করি না।

যা হোক, রুস্তমের ঐ জাতীয় প্রশ্নের প্রেক্ষিতে একজন দাঈ’র পক্ষ থেকে কী জবাব হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.)-এর জবাব। শুধু তাই নয় বরং তাঁর জবাব মুসলিম উম্মাহর চেতনাগত ও কর্মগত অবস্থানও সুদৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করে। সে জিজ্ঞেস করেছিল— ‘মা আল্লাযি জাআ বিকুম’ (তোমরা কেন এসেছ?)। রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.) একজন সাধারণ সৈনিক ছিলেন। উত্তর প্রদানের জন্য সেনাপতি সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাযি.) তাঁকে নির্বাচিত করতে কারও ভোট বা পরামর্শ নেননি। কিন্তু যে দীক্ষা তাঁরা পেয়েছিলেন, সেই দীক্ষাই একজন সাধারণ সৈনিককেও এরূপ অভাবিত উত্তর প্রদানে প্রেরণা যুগিয়েছিল। তিনি উত্তরে বললেন— ‘মা জাআ বিনা শাইউন, আল্লাহু বাআছানা লিনুখরিজা মান শাআ মিন ইবাদাতিল ইবাদি ইলা ইবাদাতিল্লাহি ওয়াহদাহু’ (কোন কিছুই আমাদেরকে এখানে নিয়ে আসেনি। আমাদেরকে এখানে প্রেরণ করেছেন আল্লাহ তাআলা, যাতে আমরা আল্লাহ যাকে চান তাকে বান্দার পূজা ও উপাসনা থেকে বের করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে যেতে পারি)।

উত্তরটি গভীর চিন্তার খোরাক যোগায়। উত্তরটিতে তিনি বলতে চাইলেন, আমাদের শক্তি ও ক্ষমতা কোথায় যে, আমরা নিজের ইচ্ছায় বের হয়ে আসব? আমরা কবে নিজের ইচ্ছায় বের হয়েছি? আমাদের বের হওয়ার পিছনে নিজস্ব স্বার্থই বা আমরা কবে দেখেছি? আমাদেরকে তো বের করেছেন আল্লাহ এবং এজন্য বের করেছেন, যাতে আমরা মাখলুকের পূজারীকে এক খালেক ও সৃষ্টিকর্তার পূজায় ও ইবাদতে লিপ্ত করতে পারি। উল্লেখ্য যে, সেখানে মূর্তিপূজা হত। মানুষ হয়ে গিয়েছিল বন্ধু ও সম্পদের দাস, কামনা ও বাসনার পূজারী। তৎকালীন যুগের সকল বাদশাহই নিজেকে মাবুদ বানিয়ে বসেছিল। রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.) যখন রুস্তমের দরবারের কাছাকাছি পৌঁছলেন তখন তাঁকে এই বলে বাধা দেওয়া হল যে, তুমি এভাবে যেতে পারবে না। তোমার ঘোড়াটাকে এখানে রেখে যাও এবং বিনয় ও নম্রতার সাথে দরবারে প্রবেশ কর। তিনি বললেন, দেখ— আমি নিজে আসিনি। আমি আমন্ত্রিত। আমাকে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সুতরাং আমাকে আমার মত যেতে দাও, নতুবা আমি ফিরে যাচ্ছি। রুস্তম দূর থেকে বিষয়টা লক্ষ্য করে প্রহরীদেরকে বলল, 'তাকে আসতে দাও। এরপর রুস্তমের প্রশ্ন এবং তাঁর উত্তর। তিনি বললেন— ‘আল্লাহু বাআছানা লিনুখরিজা মান শাআ মিন ইবাদাতিল ইবাদি ইলা ইবাদাতিল্লাহি ওয়াহদাহু ওয়া মিন দ্বীকিল দুনিয়া ইলা সাআতিহা’ (আমাদেরকে প্রেরণ করেছেন আল্লাহ তাআলা, যাতে তিনি যাকে চান তাকে আমরা মাখলুকের ইবাদত ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসত্ব ও ইবাদতে লিপ্ত করতে পারি এবং দুনিয়ার সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত করে দুনিয়ার প্রশস্ততায় নিয়ে আসতে পারি)।

শেষ কথাটি তো চমকে দেওয়ার মত কথা। রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.)-এর পূর্ণ কথাটি বিভিন্ন ভাষায় ব্যাখ্যাসহ অনূদিত হওয়া উচিত। এর প্রতিটি শব্দ যেন কালামে নবুওয়াত এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এলহামকৃত। তিনি যদি বলতেন— ‘মিন দ্বীকিল দুনিয়া ইলা সাআতিল আখিরাহ’ (আমরা প্রেরিত হয়েছি যেন তোমাদেরকে দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে আখেরাতের প্রশস্ততার দিকে বের করে নিতে পারি) তাহলে বিস্ময়ের কিছু থাকত না বরং ঐরূপ বলাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ, প্রতিটি মুসলিম বিশ্বাস করে যে, দুনিয়ার তুলনায় আখেরাত সর্বদিক দিয়ে অধিকতর প্রশস্ত। কিন্তু না, তিনি সেরূপ বললেন না। তিনি বললেন, আমরা এসেছি যেন তোমাদেরকে সংকীর্ণ দুনিয়া থেকে বের করে প্রশস্ত দুনিয়ার দিকে নিয়ে যেতে পারি। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইলেন, আমরা তোমাদের দূরাবস্থা দেখে তোমাদের প্রতি করুণা করতে এসেছি, তোমাদেরকে দুনিয়ার সকল দাসত্ব থেকে মুক্ত করে স্বাধীন সত্ত্বায় পরিণত করতে এসেছি। তোমরা তো চড়ুই পাখির ন্যায়। পিঞ্জরাবদ্ধ চড়ুই পাখিকে যা দেওয়া হয় তাই সে খেতে পারে। এর বাইরে তার করার কিছুই নেই। তোমাদের অবস্থাও পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির ন্যায়। তোমাদের চাকর-নওকর যদি না থাকে, তোমরা ক্ষুধার্ত থেকে যাবে। তারাই রান্না করে, তারাই তোমাদেরকে আহার করায়, পান করায়। তোমরা তোমাদের গোলামের গোলাম ও চাকর-নওকরের গোলাম। তাদের দাসত্ব নিগড়ে তোমরা বন্দী। তোমরা তোমাদের বাবুর্চির দাস ও গোলাম। প্রহরী ও রক্ষী সেনাদের দাস ও গোলাম। তারা ব্যতীত তোমরা অচল, অক্ষম। তোমরা বিলাসী সামগ্রীর দাস। আমরা তোমাদেরকে এই দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দুনিয়ার খোলা বাতাসে নিয়ে আসতে চাই। যা পেলে তা খেয়ে নিলে, যেভাবে পেলে সেভাবে খেয়ে নিলে। কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হল না।

ইতিহাসে পাওয়া যায় যে, একবার ইরান সম্রাট রাস্তায় বের হওয়ার পর তাকে পানির পিপাসা পেয়ে বসে। অনুসন্ধানের পর পানি পাওয়া গেল এবং একটি পাত্রে তার সামনে পানি নিয়ে আসা হল। তিনি পাত্রটি দেখে বললেন, মরে যাব তবু এইরূপ পাত্রে পানি পান করবো না। একেই বলে মুখাপেক্ষীতা, একেই বলে দুনিয়ার দাসত্ব। তো হযরত রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.) বললেন— ‘লিনুখরিজা মান শাআ মিন ইবাদাতিল ইবাদি ইলা ইবাদাতিল্লাহি ওয়াহদাহু ওয়া মিন দ্বীকিল দীন ইলা সাআতিহা ওয়া মিন জওরিল আদয়ানি ইলা আদলিল ইসলাম’। (আমরা এসেছি তোমাদেরকে বান্দার ও মাখলুকের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে যেতে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে দুনিয়ার প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে, অন্যান্য দ্বীন ও ধর্মের অন্ধকার ও জুলুম থেকে মুক্ত করে ইসলামের আলো ও ইনসাফের ছায়াতলে নিয়ে যেতে)।

মোটকথা এই দাওয়াতই মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত মর্যাদা ও সম্মান আনয়নকারী। এই দাওয়াতই তাদের অস্তিত্বের মূল নিয়ামক। আল্লাহ তাআলা এই দাওয়াতকে জীবন্ত রেখেছেন এবং এর উৎস কুরআনুল কারীমকেও টিকিয়ে রেখেছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন-ইতিহাস দাওয়াতের ইতিহাস। আমাদের পূর্বসূরীদের ইতিহাসও দাওয়াতের ইতিহাসে সমৃদ্ধ। বরং বলা চলে ইসলামের সমগ্র ইতিহাসই দাওয়াতের ইতিহাস। ‘তারীখে দাওয়াত ওয়া আযীমাত’ গ্রন্থে আমি লিখেছি যে, কোন যুগ এরূপ অতিক্রান্ত হয়নি যে, সেই যুগে সময় ও পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী দাঈ সৃষ্টি হয়নি। অন্য কোন ধর্মে এর নজীর পাওয়া যায় না। উক্ত গ্রন্থে আমি অন্যদের আপত্তির কথাও উল্লেখ করেছি। শঙ্কর আচার্য-র পূর্বে কয়েক শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে। শঙ্কর আচার্য কতটুকু সংস্কারের কাজ করেছেন? বরং তিনি তো পৌত্তলিকতাকেই সহায়তা করেছেন। আর সেন্ট পল? ৭০ বৎসর পরে জন্ম নেওয়া সেন্টপল তো খ্রিস্টধর্মকে সম্পূর্ণ উল্টো প্রান্তে নিক্ষেপ করেছে। চূড়ান্ত ‘দলাল’ ও পথভ্রষ্টতায় নিক্ষেপ করেছে। ‘দলাল’ বা গোমরাহী বলা হয় সম্পূর্ণ বিপরীত পথে চলাকে। উদাহরণ স্বরূপ পূর্ব দিকে যার যাওয়া প্রয়োজন সে পশ্চিম দিকে রওয়ানা হল। প্রকৃত ‘দলাল’ বা পথভ্রষ্টতা হল পথের দিক পরিবর্তন করে ফেলা। পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিম দিকে চলা। এই উম্মত যাতে ঐরূপ পথভ্রষ্ট না হয় সেজন্য এই দাওয়াতের প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখা হয়েছে। সঙ্গে দেওয়া হয়েছে চিরন্তন মুজিযা আল-কুরআনুল কারীমকে। এতদ্ব্যতীত আরও আছে সীরাতে নববী। দাঈগণের জীবন-চরিত, তাঁদের ইতিহাস ও ঘটনাবলী। ইসলামের কোন যুগই একনিষ্ঠ দাঈ থেকে শূন্য ছিল না। যদি কেউ দাবি করে যে, এই উম্মতের কোন এক দশক দাঈ-শূন্য ছিল তবে সে দাবিও বাতিল ও মিথ্যা বলে গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলা প্রতি যুগেই দাঈ সৃষ্টি করেছেন। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ। নাদওয়াতুল উলামার ভিত্তিই স্থাপিত হয়েছিল দাওয়াতকে সামনে রেখে। নাদওয়াতুল উলামার প্রতিষ্ঠাকালে বহু মাদরাসা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এই যুগে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের সামনে এই দ্বীনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরার এবং আধুনিক ফেতনাসমূহের মোকাবেলা করার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব তৈরি করার প্রতিষ্ঠান প্রায় ছিল না বললেই চলে। নাদওয়াতুল উলামা প্রতিষ্ঠা করার ভিত্তিই ছিল এর উপরে যে, প্রতিষ্ঠানটি যুগের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মোতাবেক ব্যক্তি গড়ে তুলবে। আল্লাহ তাআলা কবুল করুন এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে এইরূপ দাঈ ব্যক্তিত্ব তৈরি হোক। আমরা আল্লামা শিবলী নোমানী প্রণীত ‘সীরাতুন নবী’ ও মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী প্রণীত ‘সীরাতুন নবী’কে তাঁর খুতুবাতে মাদরাজকে এবং মাওলানা শিবলী মরহুম প্রণীত ‘আল-ফারূক’ গ্রন্থকে এবং দারুল মুসান্নিফীন-এর সকল কর্মকাণ্ডকে এমনকি নাদওয়াতুল উলামার পাঠ্যসূচিকে দাওয়াতের অংশ বলে মনে করি। গ্রন্থগুলোর কথা যখন উঠল তখন একটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। তা হল, আমরা যখন আধুনিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিকট এই প্রশ্ন করে লিখে পাঠালাম যে, আপনাদের প্রতি কোন গ্রন্থগুলোর অবদান অধিক তার তালিকা প্রেরণ করুন, তখন মিঞা বশীর আহমদ লিখে পাঠাল, 'যখন আমি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করতাম তখন আমার উপর কয়েক বার নাস্তিকতার আক্রমণ হয়েছিল। যখনই নাস্তিকতার আক্রমণ হত তখনই আমার সামনে ভেসে উঠত ‘আল-ফারুক’ গ্রন্থখানি। আমার অন্তরে উদিত হত যে, যাঁর জীবন চরিত এত মহান তিনি নিশ্চয়ই বিপথগামী ছিলেন না, তাঁর দ্বীন নিশ্চয়ই সত্য ও মহান দ্বীন। গবেষণামূলক এইরূপ যত কাজ হয়েছে তার সবই দারুল মুসান্নিফীন, নাদওয়াতুল উলামা দ্বারা অথবা এতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দ্বারা হয়েছে। আর এইসব কিছুর মূল বিষয় ছিল একটিই। আর তা হল দাওয়াত।

ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

টিকাঃ
১. এটি প্রকৃতপক্ষে মাওলানা প্রণীত একটি পুস্তক। পুস্তকটির উর্দু নাম 'খানে ইয়াপদ্মা' ।
২. এটি মাওলানার লিখিত একটি পুস্তক। পুস্তকটির উর্দু নাম 'মাগরিব সে সাফ সাফ বাঁতে'।
৩. এটিও একটি পুস্তকের নাম। আরবীতে লিখিত পুস্তকটির নাম ইসমাঈ বা মিসর।
৪. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক।
৫. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক। পুস্তকটির নাম কাবুল দরিয়ায়ে সে দরিয়ায়ে ইয়ারমুক তক।
৬. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক। পুস্তকটির নাম মা যা খাসিরাল আলামু বি ইনহিতাতিল মুসলিমীন।
৭. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক।
৮. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক। পুস্তকটির নাম কারওয়ানে মদীনাহ।

📘 উলামা তলাবা > 📄 মানুষের বিপর্যয়ের কারণ জ্ঞান হতে আল্লাহর নামের বিচ্ছিন্নতা

📄 মানুষের বিপর্যয়ের কারণ জ্ঞান হতে আল্লাহর নামের বিচ্ছিন্নতা


সুধী! এখানে উপস্থিত হতে পেরে আমি আনন্দে আপ্লুত। আমি অনুমানও করতে পারিনি যে, যে ভবনের ভিত্তি আমার হাতে স্থাপিত হয়েছিল সেই ভবন আজ এত উঁচু ও প্রশস্ত ভবনে পরিণত হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে আমি আমার প্রিয় সঙ্গী ও বন্ধুদেরকে মুবারকবাদ জানাচ্ছি।

আনন্দের কথা এই যে, সত্যপ্রিয়তা, গঠনমূলক চিন্তা-চেতনা এবং সমাজ ও জাতির চাহিদা ও দাবি পূরণের প্রেরণাই এখানকার প্রাণ ও মূল চালিকাশক্তি। জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ও চরম উন্নতি সত্ত্বেও বর্তমানে গোটা পৃথিবী ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কারও মাথার উপর উন্মুক্ত তরবারী আঘাতোদ্যত হলে যেমনটা হয় ঠিক তেমনি।

বর্তমানে অর্থনৈতিক চরম উন্নতি ও বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার সত্ত্বেও সমগ্র মানবজাতি যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন তার কারণ আল্লাহর নাম থেকে জ্ঞানের বিচ্ছিন্নতা। আল্লাহর নামের সাথে জ্ঞানের সম্পর্কহীনতা। আল্লাহ তাআলা জ্ঞানকে তাঁর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ যে আয়াতটি প্রথমে অবতীর্ণ করেছিলেন তা হল-

اقرأ باسم ربك الذي خلق

আয়াতটি চিন্তা-ভাবনা ও গভীরভাবে উপলব্ধির দাবি রাখে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার জীবন নিয়ে চিন্তা করার, পরিবার-পরিজন সম্পর্কে চিন্তা করার, তার পরিবেশ ও সমাজ নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ ও অবকাশ দান করেছেন। তবে এই সবকিছু হতে হবে তাঁর তত্ত্বাবধানে, তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী। তিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। এই বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল রাখতে হবে এবং এই বিশ্বাস যেন আমাদের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করে।

নিরক্ষর শহরে, নিরক্ষর নবীর উপর প্রথম যে আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তা রাজ-রাজড়াদের দরবারেও তালাশ করে পাওয়ার মত নয়। যিনি কখনও লেখাপড়া করেননি তাকে বলা হল ইকরা (পাঠ কর)। যেন বলা হল যে, এখন যে জাতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে সে জাতি হবে শিক্ষিত জাতি, লেখাপড়ার জাতি। এই জাতির সম্পর্ক হবে জ্ঞানের সাথে। সেই সঙ্গে দিক-নির্দেশনাও দান করা হল যে, এই জ্ঞান হবে আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যে নির্দেশনা অধিকাংশ জাতিই উপেক্ষা করে চলেছে। আল্লাহ বলেছেন- ইকরা (পাঠ কর)। কিন্তু শুধু পাঠ করাই যথেষ্ট নয়। শুধু 'পাঠ' কোন কাজে আসবে না। বরং নিছক পাঠ দ্বারা অর্জিত জ্ঞান ধ্বংস বয়ে আনবে, ধ্বংসাত্মক চিন্তা ও মনোভাবের সৃষ্টি করবে, মানুষের মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা সৃষ্টি করবে, স্বজনপ্রীতি ও বন্ধুপূজার মনোভাব সৃষ্টি করবে, প্রবৃত্তি পূজার দিকে ধাবিত করবে।

যদি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লেখা হয় এবং সত্যান্বেষী দৃষ্টিতে ইতিহাস লেখা হয় আর তা লিখতে যেয়ে অনুসন্ধান করা হয় যে, মানবতার অধঃপতন ও মানবতার বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে কখন থেকে, তাহলে নিশ্চয়ই শিরোনাম লিখতে হবে এভাবে যে, যখন থেকে জ্ঞানকে আল্লাহর নাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, আল্লাহর নাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জ্ঞান চলেছে স্বাধীন পথে তখন থেকেই শুরু হয়েছে মানবতার বিপর্যয়। বিপর্যয় শুরু হয়েছে তখন, মানুষ যখন তাঁর নাম বিস্তৃত হয়ে, তাঁকে অস্বীকার করে বরং বিদ্রোহ করে একথা বলেছে যে, এই জগতের কোন সৃষ্টিকর্তা নেই অথবা সৃষ্টিকর্তা থাকলেও তিনি এই জগতের মালিক নন ও পরিচালক নন, তিনি শুধুই সৃষ্টিকর্তা, প্রশাসক নন। জগত যেন শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত তাজমহল, যা নির্মাণ করাটাই ছিল শুধু শাহজাহানের কাজ। এরপর এর তত্ত্বাবধান ও পরিচালনের দায়িত্ব আর তার হাতে নেই। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কাঠামো মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। মানুষ যা চাইবে তাই করবে, এতে তাঁর বলার কিছু নেই।

বন্ধুগণ! এই দুনিয়া তাজমহল নয়, কুতুব মিনারও নয়; বরং এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্মিত কারখানা, তিনিই এককভাবে এই দুনিয়া পরিচালনা করছেন।

الا له الخلق والامر

সৃষ্টি তাঁরই, শাসনও তাঁরই।

আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এবং প্রকৌশল ও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখন প্রয়োজন ছিল আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়া। আর এই কাজ তাদের দ্বারাই সম্ভব, যাদের বুনিয়াদ রচিত হয়েছে আল্লাহর নামের উপর। এই ইতিহাসে সমৃদ্ধ হয়েই যাদের যিন্দেগীর সূচনা হয়েছে।

এই উম্মতের ইতিহাস শুরু হয়েছে আসমানী ওহীর মাধ্যমে, উম্মী নবীর পথ-নির্দেশনা ও তাঁর পয়গামের মাধ্যমে। এই উম্মতের বুনিয়াদ রচিত হয়েছে জ্ঞানের সাথে সর্বদা আল্লাহর নামের সম্পৃক্ততার উপর। আজ ইউরোপ ও আমেরিকার যে করুণ দশা তা তাদেরই সৃষ্ট। বর্তমানে সমগ্র দুনিয়ার মোড়লীপনা তাদের হাতে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি, চিন্তা-চেতনা সহ সর্বক্ষেত্রে তাদের মোড়লীপনার একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজমান। আল্লাহর নামের সাথে জ্ঞানের যে সম্পর্ক ছিল তারা তা ছিন্ন করে দিয়েছে। প্রয়োজন ছিল জ্ঞানকে আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে চলার। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী, তাঁর ছত্রছায়ায় জ্ঞানের অগ্রসরতার। তাঁর নামের বরকতও তার সাথে থাকার। তাহলেই নানা শাখা-প্রশাখাসহ আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আমাদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ড, গঠনমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ, আমাদের বিদ্যাপীঠগুলো, গবেষণাগারগুলো হত উপকারী ও কল্যাণকর। আল্লাহর শোকর যে, ক্ষুদ্র পরিসরে ও স্থানীয় পর্যায়ে হলেও বর্ণিত পথে আমরা এক কদম অগ্রসর হলাম। আমাদের এ পদক্ষেপ অত্যন্ত বরকতময়। আমি আমার সহকর্মী ও বন্ধুবর্গকে মুবারকবাদ জানাচ্ছি, যাঁরা এই পদক্ষেপের সাথে সম্পৃক্ত। আলহামদুলিল্লাহ উন্নতির সমূহ নিদর্শন আমাদের সামনে দৃশ্যমান। এই সুযোগে আমি আল্লামা ইকবালের একটি কবিতাংশের দ্বিতীয় পংক্তি আবৃত্তি করছি-

আমাকে নির্দেশ রয়েছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঘোষণা দানের।

সুধী! কম্পিউটার বিভাগ উদ্বোধন করার সুযোগ দান করে আপনারা আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমার স্বীকার করতে কুণ্ঠা নেই যে, এর পূর্বে কম্পিউটার সম্পর্কে আমার কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। আমি লেখাপড়ার মানুষ। আমার সম্পর্ক কিতাব ও কলমের সাথে। আমি যখন কম্পিউটারের কী-বোর্ডে আঙ্গুল রাখলাম তখন সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় কিছু চিত্র ভেসে উঠল। তখন আমার মস্তিষ্কে এই কথা উদিত হল যে, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলা তো মানুষকে, বিশেষত মুসলমানকে কম্পিউটারই বানিয়েছিলেন। তার মধ্যে সকল বিষয় সৃষ্টিগতভাবে গচ্ছিত রাখা আছে। সকল গুণ ও উৎকর্ষের আকর সে। প্রয়োজন ছিল শুধু আঙ্গুল চাপনের। তাহলেই তার সকল সুপ্ত গুণের বর্হিপ্রকাশ ঘটত। সে আঙ্গুল হল নবীকে চেনার আঙ্গুল। যুগের দাবি চেনার আঙ্গুল। সমাজ ও জাতির প্রয়োজন সমাজ ও জাতির চাহিদা পূরণের আঙ্গুল। এ এমন আঙ্গুল, যা জাতিকে গতি সৃষ্টি করে। জাতিকে মনযিলে মকসুদে, অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। এই আঙ্গুলের ব্যবহার হোক আর মানবতার চিত্র স্পষ্ট হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সকল মানুষ তো দূরের কথা মুসলমানরাও আজ আর কম্পিউটার রূপে থাকেনি। মুসলমানদের মধ্যে এই চেতনা, এই উপলব্ধি নেই যে, আমরা কোন কাজে আদিষ্ট। আমাদেরকে কী পান করানো হয়েছে। আমাদের মাঝে কোন বিষয়ের বিস্তৃতি ঘটেছে।

আজ কম্পিউটার যে কাজ করছে সেই কাজ করা উচিত ছিল মুসলমানদের। যখনই ইলাহী নির্দেশ সামনে আসে, যখনই শরীয়তের নির্দেশ শোনানো হয়, যখনই সমাজের ও জাতির প্রয়োজন ব্যক্ত করা হয় তখনই প্রয়োজন ছিল নিজের মধ্যকার সুপ্ত প্রতিভা ও চেতনাকে আঙ্গুল চাপনে জাগরূক করে তোলা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, নিজের চেতনাকে জাগ্রত করতে আঙ্গুল চাপনের কাজ আর হচ্ছে না। সুতরাং মানুষ নামক কম্পিউটারটি নিষ্ক্রিয় হয়েই রয়ে গেল।

যে প্রতিষ্ঠানটিতে দাঁড়িয়ে আমি কথা বলছি এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উচিত এই চেতনা ও অঙ্গীকার, এই সংকল্প ও দৃঢ়তা, এই সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়া যে, আমরা শুধু শাস্ত্রীয় জ্ঞানই শিক্ষাদান করব না, বরং শাস্ত্রীয় জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ পরিচিতির জ্ঞানও শিক্ষাদান করব। যে জ্ঞান আমরা দান করব তার সঙ্গে যুক্ত করে দেব আল্লাহ পরিচিতির জ্ঞান, তাঁর অস্তিত্ব স্বীকারকরণের জ্ঞান। তিনি যে জগতের সৃষ্টিকর্তা, অপার কুদরতের অধিকারী, তাঁকে সন্তুষ্ট করাই যে আসল ও সর্বাধিক প্রয়োজনীয় কাজ ও জীবনের লক্ষ্য, নবীগণের আনীত বার্তার প্রতি শুধু বিশ্বস্ত থাকাই নয়, বরং সে অনুযায়ী আমল করা, জীবন পরিচালনা করাই প্রকৃত দায়িত্ব- এই উপলব্ধি জাগ্রত করে দেওয়া। আজ পৃথিবীতে জ্ঞানচর্চার সাথে এই সকল বিষয়ের সংশ্রবহীনতাই সমূহ বিপর্যয়ের কারণ। আজ আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে জীবনের নানাবিধ উপকরণের পর্যাপ্ত উপস্থিতি সত্ত্বেও মূল লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার কারণ আর কিছু নয়, কারণ শুধু জ্ঞানের সাথে উপরিউক্ত বিষয়াবলীর সংশ্রবহীনতা। যার কারণে মানবতার সেবা ও সুরক্ষার পরিবর্তে মানবতার বিপর্যয়ই শুধু বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এক সফরে ওয়াশিংটনে বিভিন্ন স্থানে আমাকে বক্তৃতা করতে হয়েছিল। একদিন ইসলামী সেন্টারে বক্তৃতা করতে হল। আমি পূর্ব থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করিনি। মনে করলাম অনুষ্ঠানের শুরুতে কারী সাহেব কুরআনুল কারীম থেকে যে আয়াত তেলাওয়াত করবেন তার আলোকেই কথা বলব। কারী সাহেব সূরা কাহ্ফ থেকে একটি অংশ তেলাওয়াত করলেন। অংশটিতে বলা হয়েছে যে, এক বাগানের মালিক বলেছিল, আমার মনে হয় না যে, এই বাগান কখনও ধ্বংস হয়ে যাবে। (সুরা কাহফ ৩৫)

কথাটি সে বলেছিল অত্যন্ত ঔদ্ধত্য সহকারে এবং অহংকার থেকে। তার এক সঙ্গী ছিল মুমিন। সে তাকে বলল-

যখন তুমি বাগানে প্রবেশ করলে তখন একথা কেন বললে না যে, আল্লাহ যা চান তাই হয়, আল্লাহর দেওয়া শক্তি ব্যতীত কোন শক্তি নেই। (সূরা কাহফ ৩৯)

আয়াত্তির সূত্র ধরে আমি বললাম, আমেরিকাতে সবকিছু আছে। কিন্তু মা-শা-আল্লাহ আল্লাহ যা চান তাই হয়- একথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার লোক নাই। এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, আজ আমেরিকা সবকিছু করে, পরোপকারও করে। কিন্তু এর প্রতিদান স্বরূপ কৃতজ্ঞতাটুকুও তারা পায় না। সারা পৃথিবীতে তাদের কর্মকাণ্ডের কোন ফল প্রকাশ পাচ্ছে না। পৃথিবীর নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা, একের প্রতি অপরের বিশ্বাস ও আস্থা, একের প্রতি অপরের শ্রদ্ধাশীলতা এসবের কিছুই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। তার কারণ তাদের কর্মকাণ্ডে আন্তরিকতার অভাব। ঈমান ও ইহতিসাবের অভাব। ঈমানী উত্তাপ ও ঈমানী আলোড়নবিহীন কর্মকাণ্ডের পরিণাম এইরূপই হয়।

আমি বলছি যে, আজ আমেরিকায় সকল নেয়ামত বিদ্যমান, আরাম-আয়েশের সকল উপকরণ বিদ্যমান, শান্তির সকল উপকরণ বিদ্যমান কিন্তু প্রকৃত যে শান্তি লাভের প্রয়োজন ছিল সেই শান্তি লাভ হচ্ছে না। কারণ সেখানে মা-শা-আল্লাহর চেতনা নাই, আল্লাহ যা চান তাই করেন- এই বিশ্বাস নাই। আমরা চাই এরূপ প্রতিষ্ঠান আরও প্রতিষ্ঠিত হোক কিন্তু তা হোক মা-শা-আল্লাহর ছায়াতলে, আল্লাহর নামের আশ্রয়ে। জ্ঞান ও আল্লাহর নাম একসাথে চলুক।

আমি আজ স্পষ্টরূপে বলছি- যদিও কথাটি বলার প্রয়োজন ছিল অতি বড় প্লাটফর্মে তবুও আমাদের এই ক্ষুদ্র মজলিসে কথাটি বলছি যে, যত দিন জ্ঞান ও আল্লাহর নাম জুটি না বাঁধবে, জ্ঞানের সাথে আল্লাহর নাম সম্পর্কযুক্ত না হবে তত দিন এই জ্ঞান দুনিয়ার উপকার সাধন নয় বরং দুনিয়ার ধ্বংস সাধন করবে, দুনিয়া অগ্রসর হবে ধ্বংস অভিমুখে, দুনিয়ার আত্মহননের পথ হবে উন্মুক্ত। জ্ঞানের সাথে আল্লাহর নামকে সম্পৃক্ত করা না হলে কাঙ্ক্ষিত সামাজিক নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা, পারস্পরিক আস্থা ও সহানুভূতি ইত্যাদি বিষয়গুলো কখনও অর্জিত হবে না।

আমি আল্লাহর শোকর আদায় করছি এবং আপনাদের সামনে ব্যক্ত করছি যে, আলহামদুলিল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই বুনিয়াদ ও মৌলিক নীতির উপরই। আমার বিশ্বাস ও প্রত্যাশা যে, প্রতিষ্ঠানটি সর্বদা এই ভিত্তির উপরই অবিচল ও অটুট থাকবে। প্রতিষ্ঠানটি চলবে দ্বীনের ছায়ায়, দ্বীনী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঙ্গে নিয়ে, মানবতার কল্যাণকে সাথে নিয়ে। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপ করেছেন, যে মর্যাদায় তাদেরকে ভূষিত করেছেন সেই দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং সেই মর্যাদার উপলব্ধি ধারণ করে এই প্রতিষ্ঠানটি চলবে। এইরূপ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আজ তীব্র। আল্লাহর নিকট দুআ করি, যেন এইরূপ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা উন্নতির শীর্ষ সোপানে উপনীত হয়। শুধু এইরূপ কারিগরি প্রতিষ্ঠান নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ে প্রাইমারী স্কুল পর্যন্ত সকল প্রতিষ্ঠানেই আল্লাহর নাম বিদ্যমান থাকা জরুরী।

জরুরী আল্লাহর নামের আলো বিদ্যমান থাকা, তাঁর নির্দেশনা বিদ্যমান থাকা। আল্লাহর নামের প্রতি সমীহ থাকা। শুধু সমীহ নয় বরং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ হতে হবে। এরূপ না হওয়ার কারণেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ সত্ত্বেও নিরাপত্তা ও শান্তি অর্জিত হচ্ছে না এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা মানব সমাজের যটুকু উপকার হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না। কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ দ্বীন ও ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন। আমার কথা আমি এখানেই শেষ করছি এবং আপনারা আমাকে যে সম্মান দান করেছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। দুয়া করি প্রতিষ্ঠানটিকে জীবন্ত রাখেন এবং উন্নতি দান করেন।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 আলেমগণের সর্বাপেক্ষা বড় দায়িত্ব আধুনিক যুগের সন্দেহবাদী ব্যক্তিদের হৃদয়ে প্রশান্তি স্থাপন

📄 আলেমগণের সর্বাপেক্ষা বড় দায়িত্ব আধুনিক যুগের সন্দেহবাদী ব্যক্তিদের হৃদয়ে প্রশান্তি স্থাপন


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! পৃথিবীর ইতিহাসের একটি বড় অংশ যথাযথ সংরক্ষিত হয়েছে এবং সে ইতিহাস নির্ভরযোগ্যও বটে। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক যুগের ইতিহাস সংরক্ষিত হয়নি। পৃথিবীর সব ইতিহাসই যদি সংরক্ষিত হত, প্রাগৈতিহাসিক যুগের নবুওয়াতের ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি যদি গুরুত্বারোপ করা হত অথবা বিভিন্ন যুগে অবতীর্ণ আসমানী সহীফা যদি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হত, ঐ সকল সহীফা নাযিলের প্রেক্ষাপট এবং তার বাহকগণ ঐ সকল সহীফার আলোকে যেভাবে মানবজাতিকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন, তাদের সঙ্গে দ্বীনের পরিচয় ঘটিয়ে বিশুদ্ধ জীবনাচারে অভ্যস্ত করেছেন তা যদি সংরক্ষিত হত তাহলে এটা প্রমাণ করা যেত যে, প্রত্যেক যুগে প্রেরিত নবী, তাঁদের নবুওয়াত, তাঁদের আনীত বার্তা, তাঁদের কর্মধারা ও দায়িত্বের সাথে গভীর ঘনিষ্ঠতা ও সামঞ্জস্য ছিল তৎকালীন যুগের প্রয়োজন, তৎকালীন যুগের মানবজাতির ত্রুটি-বিচ্যুতি, তাদের চিন্তাধারা, তাদের জীবনের জ্ঞানগত ও কর্মগত, বিশ্বাসগত ও চরিত্রগত বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতার।

বর্তমানে আমাদের নিকট ইতিহাসের যে নির্ভরযোগ্য ভাণ্ডার ও রেকর্ড সংরক্ষিত আছে এবং কুরআন মাজীদের মাধ্যমে আমরা যে আলো ও নির্দেশনা পাই তা দ্বারা আমাদের এই দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়। এর কিছু দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়।

হযরত ইবরাহীম (আ.) যে যুগে প্রেরিত হয়েছিলেন সে যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তৎকালীন যুগের মানব সমাজ তাওহীদের বিশ্বাস বিবর্জিত হয়ে নিকৃষ্ট পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। মনুষ্য মর্যাদা ও সাম্যের ধারণা তৎকালীন মানবসমাজে বিস্মৃতির আড়ালে চলে গিয়েছিল। আল্লাহর সঙ্গে প্রেম ও ভালবাসার সম্পর্ক কার্যত বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দাওয়াতের মাধ্যমে যে নব যুগের, যে নতুন ধারার সূচনা হয়েছিল তা এখনও চলছে এবং সত্যিকারার্থে তাঁর দাওয়াত ছিল তাঁর পূর্ববর্তী যুগ ও তাঁর পরবর্তী যুগের মধ্যকার ভেদরেখা। আমি কোন এক বক্তৃতায় যেমনটা বলেছি যে, পৃথিবীতে যে দুটি ধারা যুগ পরস্পরায় চলে আসছে সে দুটি ধারার জন্য যদি কোন নাম তালাশ করা হয়, তাহলে দুটি নাম আমরা পাব। এক. ইবরাহীমিয়্যাত, দুই. বারহামিয়্যাত (ব্রাহ্মণ্যবাদ)। আমি নুন অক্ষরটিকে (বাংলায় ণ') ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছি, যাতে মানুষ ভুল না বোঝে। এই দুটি ধারা হাজার হাজার বছর ধরে চলছে। প্রথম ধারাটি বিশুদ্ধ তাওহীদের ধারা। এই ধারায় নিহিত রয়েছে মনুষ্য মর্যাদার পুনরুদ্ধার ও নবায়ণ। এই ধারার সাথে সম্পৃক্ত আল্লাহ তাআলার প্রেম ও ভালবাসা, আল্লাহতে লীনতা ও তন্ময়তা।

এই কারণে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আলোচনা প্রসঙ্গে তাওহীদের আলোচনা এসেছে বার বার। কোন কোন রুকুর পুরোটা জুড়েই বিশেষত সূরা ইবরাহীমের শেষ রুকুর আয়াতসমূহে বিশুদ্ধ তাওহীদ, আল্লাহর সাথে অপরিমেয় সম্পর্ক, তাঁর প্রেম ও ভালবাসা, তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হওয়ার বিষয় আলোচিত হয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনে এই সবকিছুর প্রমাণ মেলে তৎকর্তৃক প্রাণাধিক পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর মধ্যে। আল্লাহ তাআলা যার সত্যতা তুলে ধরেছেন এই ভাষায়-

يَا إِبْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ

হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছ। আর আমি এইভাবেই সৎকর্মশীলদেরকে বিনিময় প্রদান করে থাকি। এটা ইবরাহীমী দ্বীনের বৈশিষ্ট্য, ইবরাহীমী মেযাজ ও ইবরাহীমী দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য।

এরপর হযরত সুলাইমান ও দাউদ (আ.)-এর যুগের আগমন ঘটল। যুগটি ছিল রাজ-রাজত্বের ও শিল্প-কারিগরির উৎকর্ষের যুগ। এইজন্য আল্লাহ তাঁদের আলোচনায় বিশেষভাবে সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বের কথা আলোচনা করেছেন।

رَبِّ هَبْ لِى مُلْكًا لَّا يَنْۢبَغِى لِاَحَدٍ مّিনْۢ بَعْدِى

হে আমার পালনকর্তা! আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন আমার পরে যা অন্য কারও জন্য শোভনীয় না হয়। (সূরা সোয়াদ ৩৫)

আরও বলেছেন-

فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيْحَ تَجْرِىْ بِاَمْرِهٖ رُخَآءً حَيْثُ اَصَابَ

'আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হত যেখানে সে পৌছাতে চাইত।' (সূরা সোয়াদ ৩৬)

এরপরে আলোচনা করা হয়েছে জীনদের সম্পর্কে। আল্লাহ তাআলা কীভাবে তাদেরকে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর বশীভূত করে দিয়েছেন সেই আলোচনা। হযরত দাউদ (আ.) প্রসঙ্গে আলোচনায় তাঁর জন্য লোহাকে কীরূপ নরম করে দেওয়া হয়েছিল সেই আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে-

وَ اَلَنَّا لَهُ الْحَدِيْدَ

'এবং আমি তার জন্য নরম করে দিয়েছি লোহাকে।'

এ থেকে বোঝা যায় যে, সেই যুগটি ছিল শিল্প ও কারিগরি বিদ্যার বিস্তৃতি ও উন্নতির যুগ। এরপর আমাদের সামনে আসে ইউনানী যুগ। এই যুগকে বলা হয়- দর্শন, গণিত ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উৎকর্ষের যুগ। হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম ও তাঁর নবুওয়াতের প্রকাশ ঘটেছিল ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির যুগে। হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে বিশেষভাবে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি মৃতকে জীবিত করছেন, অসুস্থকে সুস্থ করছেন। হযরত ঈসা (আ.)-এর মসীহী কারিশমা এবং তাঁর জন্য আসমান থেকে খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার উল্লেখ কুরআনুল কারীমে বিবৃত হয়েছে। তাঁর হাতে পর্যাপ্ত মুজিযা প্রকাশের ঘটনা আমরা জানি।

মোটকথা হযরত ঈসা (আ.)-এর যুগের পরিবেশ ও সমাজের সাথে তাঁর হাতে প্রকাশিত মুজিযাসমূহের বেশ মিল ও সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু ইলাহী বিবেচনা খাতামুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য এমন এক যুগ নির্বাচিত করেছে যে যুগ সর্বক্ষেত্রে মানবজাতির উন্নতির যুগ। জীবনের ব্যাপ্তি, জীবনের সকল শাখা-প্রশাখায় মানুষের বিচরণ, মানুষের সমূহ চাহিদা ও সমস্যা এবং সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে মানুষের গভীর সম্পৃক্ততার যুগ। যেহেতু তিনি ছিলেন শেষ নবী, তাঁরই শিক্ষা ও আদর্শকে যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকতে হবে সেহেতু মানব জীবন ও মানবজাতির জন্য প্রয়োজন ছিল তাদের মধ্যে সুপ্ত আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভাকে, শক্তি ও সামর্থ্যকে এবং সফলতার সকল উপকরণকে, তাদের সকল যোগ্যতাকে উজাড় করে দেওয়ার। তাঁর পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নতুন যুগের আগমন ঘটবে না। শেষ নবীর যুগই নিরবচ্ছিন্নভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চলমান থাকবে। অতএব মানুষকে তার বুদ্ধি ও প্রতিভার, তার উপলব্ধি ও জ্ঞানের এবং শক্তি ও সামর্থ্যের প্রয়োগ ঘটাতে হবে পরিপূর্ণরূপে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদের ন্যায় মহাগ্রন্থ আপনাদেরকে দান করেছেন। যে কুরআন ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনাহীন দৃষ্টান্ত, যার নজীর কোন মানুষের পক্ষে উপস্থাপন করা অসম্ভব। আরববাসী কবিতা ও সাহিত্যে শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করেও তারা এই কুরআনের অনুরূপ কিছু রচনা করতে পারেনি। অপর দিকে কুরআনুল কারীমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তৃতির এরূপ অমিত সম্ভাবনা সুপ্ত রাখা হয়েছে এবং এরূপ সূক্ষ্ম নির্দেশনা ও ইঙ্গিত তাতে গচ্ছিত রাখা হয়েছে যে, যখনই মানুষের জ্ঞান গবেষণা- চাই তা যে কোন ক্ষেত্রে হোক না কেন, চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হবে তখন তা তার সম্ভাবনাকেই শুধু প্রমাণ করবে না বরং তার বাস্তবতাকে নির্দেশ করবে।

বলতে জ্ঞানের যে মাহাত্ম্য ও বিশালতা ও তার অসীমতা তুলে ধরা হয়েছে তা শুধু কুরআনুল কারীমেই পাওয়া যায়। এর অনিবার্য ফল বের হয় এই যে, এই উম্মতের আঁচলকে জ্ঞানের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই উম্মত জ্ঞান ও বুদ্ধিচর্চা হতে, চিন্তা ও গবেষণা হতে, রচনা ও লেখনী হতে কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না। বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। এটা কুদরতে ইলাহীর ফায়সালা যে, এই উম্মতের অভিযাত্রা, তাদের কর্মতৎপরতা, তাদের রুচি ও ঝোঁক এবং তাদের সফলতা জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত ও সংযুক্ত থাকবে।

সুধী! আমার এই দাবির সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ প্রথম ওহী। প্রথম যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল তার সূচনা হয়েছিল اقরা 'পাঠ কর' শব্দ দ্বারা।

যদি পৃথিবীর বড় বড় বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী-গুণীকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করা হত যে, দীর্ঘ পাঁচশত বৎসর পর ওহী অবতরণের মাধ্যমে আকাশ ও পৃথিবীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হতে যাচ্ছে এবং মানুষকে আসমানী বার্তা, ঐশী পয়গাম দান করা হচ্ছে, বলুন তো এই প্রথম বার্তার সূচনা হতে পারে কোন শব্দ বা কোন বাক্য দ্বারা? আমি অকাট্য দাবি করে বলতে পারি যে, তাদের মস্তিষ্কে বিভিন্ন রকম সব শব্দ এবং বিভিন্ন রকম সব বাক্য উদিত হত। কেউ বলত, প্রথম ওহীর সূচনা হওয়া উচিত এই বাক্য দ্বারা-

اعرف نفسك 'নিজেকে চেন।' কারণ মানুষ তখন আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছিল, নিজের উৎসের সন্ধান তারা হারিয়ে ফেলেছিল। কেউ বলত, প্রথম ওহীর সূচনা হওয়া উচিত এই বাক্য দ্বারা-

اعبد ربك 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর।' কেননা তখন মানুষ পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল, বিশুদ্ধ ইবাদত বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। কেউ বলত, এইরূপ, কেউ বলত ঐরূপ। কিন্তু কেউ বলত না যে, اقরা 'পাঠ কর' -এই শব্দ দ্বারা ওহীর সূচনা হওয়া উচিত। কারণ যার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে তিনি নিজে নিরক্ষর। তিনি যে জাতির মাঝে প্রেরিত হয়েছেন সেই জাতিও নিরক্ষর। আল্লাহ তাআলা বলেন-

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ 'তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন তাদের মধ্য হতে।' ইয়াহুদীরাও তাঁকে উম্মী বলত। যে দেশে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন সে দেশটি ছিল উম্মী বা নিরক্ষর দেশ। যে শহরে ওহী নাযিল হচ্ছিল সেই শহর তথা মক্কায় প্রচুর অনুসন্ধানের পর সাক্ষর ব্যক্তি হয়তো পাওয়া যেত দুই-চারজন, এর বেশি নয়। লেখাপড়া জানা ব্যক্তির জন্য পৃথিবীতে বহু শব্দের ব্যবহার প্রচলন রয়েছে। লেখাপড়া জানা ব্যক্তিকে বলা হত কাতেব। কলম দ্বারা লিখতে পারাটাকেই মনে করা হত সর্বাপেক্ষা বৃহৎ গুণ। যেন লিখতে পারাটা এক মহা দুঃসাধ্য কর্ম।

আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে জ্ঞান আত্মস্থ করার এবং জ্ঞানের সব দাবি পূরণের যে অসাধারণ যোগ্যতা ও দক্ষতা দান করেছেন এবং এই উম্মতের সাথে জ্ঞানের যে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন তাকে আমরা এক কথায় চুম্বক বলে ব্যক্ত করতে পারি। এ কারণেই প্রতি যুগে জ্ঞানের সাথে এই উম্মতের সম্পর্ক অটুট রয়েছে এবং এই কারণেই প্রত্যেক যুগে এই উম্মত নতুন নতুন জ্ঞানী-গুণী, নতুন নতুন শাস্ত্রজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ ও জিনিয়াস ও প্রতিভা জন্ম দিয়েছে।

যত দিন জ্ঞানের অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে তত দিন সমূহ জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধিৎসা সৃষ্টি হতে থাকবে। চাই তা সভ্যতা সংক্রান্ত হোক কিংবা জ্ঞান সংক্রান্ত হোক কিংবা বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সমাজনীতি সংক্রান্তই হোক। দ্বীন ও শরীয়তের আলোকে সেই সকল জিজ্ঞাসার জবাব প্রদানও অব্যাহত থাকবে, উদ্ভুত সকল সমস্যার সমাধান দানও অব্যাহত থাকবে। উদাহরণস্বরূপ আমরা সাহাবায়ে কেরাম, ইমাম চতুষ্টয় এবং উম্মতের অন্যান্য মুজতাহিদগণকে পেশ করতে পারি। এটাকে নিছক আকস্মিক কোন ঘটনা বলা যায় না। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সজীব মস্তিষ্কের অধিকারী ও প্রতিভাবান এরূপ ব্যক্তিবর্গ ছিলেন, যাঁরা রোম ও ইরানের ন্যায় উন্নত সভ্যতার অধিকারী সাম্রাজ্যের মোকাবেলা করতে এরূপ যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, যার কোন দৃষ্টান্ত অন্য কোন ধর্ম উপস্থাপন করতে পারবে না। তদ্রূপ ইমাম চতুষ্টয় ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এরূপ প্রতিভাবান আইনবিদ ছিলেন যে তাঁরা জীবন ও দ্বীনের মৌল নীতিমালার মধ্যে সঙ্গতি বিধান করতে এরূপ অসাধারণ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন, যা না রোমীয়দের মধ্যে পাওয়া যায়, না ইরানীদের মধ্যে, না ইউনানীদের মধ্যে, না অন্য কোন জাতির মধ্যে। তাঁরা ছিলেন স্ব-যুগের সর্বাধিক প্রতিভাবান ব্যক্তি। তাঁদের কীর্তি শত শত বৎসর যাবৎ দীপ্যমান ও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাঁদের কীর্তির সঠিক মূল্যায়ন আজ কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

যখন ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞান আরবী ভাষায় অনূদিত হল তখন তা ইলম ও জ্ঞান চর্চাকারীদের মধ্যে যে কিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা আজ আর কেউ অনুমানও করতে পারবে না। ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সামনে মানুষ তখন হয়ে পড়েছিল বুদ্ধি-বিভ্রান্ত। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনা তখন এক রকম ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকাকে মানুষ গর্বের বিষয় বলে মনে করত। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী, সাইয়েদ আবদুল কাদের জিলানী, ইমাম গাযযালী, মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী, শায়খ মঈনুদ্দীন চিশতী, হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ প্রমুখ প্রতিভাবান ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাদের নিজ নিজ যুগে সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা যুগের স্রোত ও গতিকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে যুগকে দিয়েছিলেন বিশুদ্ধ গতি ও স্রোত। অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তারা মোকাবেলা করেছিলেন ভ্রান্ত ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের এবং সমূহ বিপদ থেকে দ্বীনকে করেছিলেন নিরাপদ।

যুবক শ্রেণীর মন-মস্তিষ্ককে সমূহ সন্দেহ ও সংশয়ের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে নতুনভাবে তাদের মন ও মস্তিষ্কে ঈমান ও ইয়াকীনের ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

১৮৫৭ সালের পর ইংরেজ-সংস্কৃতি ও আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ঠিক একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাবে এরূপ প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েছিল যে, সরাসরি দ্বীনকে অস্বীকার না করলেও দ্বীনের ব্যাপারে সন্দিহান ও সংশয়যুক্ত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন যুগের অটল ঈমানের অধিকারী পরিবার সমূহ থেকে জন্ম নেওয়া মাশায়েখ ও সুফীগণের অবস্থাও ছিল এইরূপ যে, যদি তাঁদের পিতা-মাতার বিশেষ তত্ত্বাবধান তাঁদের প্রতি না থাকত এবং তাঁরা যদি বুযুর্গদের সংসর্গ লাভ না করতেন, বুযুর্গদের সতর্ক দৃষ্টির অধীনে যদি তাঁরা প্রতিপালিত না হতেন, তাহলে চিন্তা ও বিশ্বাসগত ইরতিদাদ ও বিচ্যুতি ব্যাপক আকার ধারণ করত এবং গোটা হিন্দুস্তান এই ইরতিদাদের শিকার হয়ে যেত।

আল্লাহ তাআলা যদি তাঁর করুণায় ঠিক সময় মতো যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ না করতেন, তাহলে তিনিই জানেন এই দেশের মুসলমানদের অবস্থা কী রূপ হত। এটা শুধু হিন্দুস্তানের বৈশিষ্ট্য নয়, যখনই ইসলামী ইতিহাসের দীর্ঘকালীন সময়ে এই ধরণের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তখনই আল্লাহ তাআলা এরূপ কিছু ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যাঁরা দ্বীনের সাথে এই উম্মতের সম্পর্ক অটুট রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন এবং সফলতা লাভ করেছেন। এই ধারা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকা প্রয়োজন, থাকা উচিত।

আমাদের দায়িত্ব হল- এই ধারাকে অব্যাহতভাবে চলমান রাখা। আমি আমার প্রিয় ছাত্রবৃন্দকে বলতে চাই, কোন জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন বড় আলেম ও লেখক ও গবেষক সৃষ্টি হয়ে যাওয়া যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠান এমনকি দ্বীন ও মাযহাবও ইতিহাস দ্বারা চলে না। বরং তা চলে এই ধারা অব্যাহতভাবে গতিমান থাকার দ্বারা। কোন কর্মসূচী ও আন্দোলন কোন একজন গবেষক ও চিন্তাবিদ সৃষ্টি করে দিল কিংবা একজন বড় লেখকের জন্ম দিয়ে দিল- শুধু এতটুকুই যথেষ্ট নয়।

এটা স্মরণে রাখতে হবে যে, যখন নিজেদের পূর্বসূরীদের কীর্তি নিয়ে শুধু গর্ব করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়, তখন নিজেদের চিন্তাশক্তি অথর্ব ও অকর্মণ্য হয়ে পড়ে। নিছক পূর্বসূরীদের কীর্তিচর্চা মানুষের কর্মদক্ষতা ও চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। জনৈক আরব কবি অতি চমৎকারভাবে এই সত্যকে ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন-

الهي بني تغلب عن كل مكرمة قصيدة قالها عمر و بن كلثوم

'বনু তাগলিবকে বিরোচিত কোন কৃতিত্ব, বড় কোন বিজয় অর্জন করতে এবং বড় কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধার সৃষ্টি করেছে শুধু একটা বিষয়। আর তা হল, তারা শুধু আমর ইবনে কুলছুম রচিত কাসিদা আবৃত্তি করে এবং তাতেই তারা বিভোর থাকে।' এই রোগ কোন প্রতিষ্ঠানেও সৃষ্টি হতে পারে, কোন দলের মধ্যেও সৃষ্টি হতে পারে। দলের প্রতিষ্ঠাতা কিংবা দলের মধ্যকার কোন বিখ্যাত ব্যক্তির রচনা, গবেষণা তাঁর উন্নত ও উচ্চ চিন্তা-চেতনা দলের জন্য গর্বের বিষয় হল। দল তাই নিয়েই শুধু গর্ব করতে থাকল। কিন্তু এ দ্বারা কাজ চলবে না। দল হোক, প্রতিষ্ঠান হোক, মাদরাসা হোক বরং বলতে পারি পুরো জাতি হোক কারও জন্যই এরূপ পূর্ব ইতিহাস নিয়ে শুধু গর্ব করলে চলবে না।

একথা বলাতে কোন লাভ নেই যে, এই জাতি গাযযালী, ইবনে তাইমিয়াহ ও শাহ ওয়ালীউল্লাহর ন্যায় ব্যক্তিত্ব উপহার দিয়েছে। এই বললে চলবে না যে, আমরা অমুক অমুক নগর ও জনপদ আবাদ করেছি। সমরকন্দ, বোখারা, গ্রানাডা, আশবিলিয়াহ ও দিল্লীকে আমরা আবাদ করেছি, সমৃদ্ধ করেছি। বরং প্রয়োজন প্রত্যেক যুগেই ঐরূপ ব্যক্তিত্বের জন্মলাভ অব্যাহত থাকা। প্রয়োজন স্ব-স্ব যুগের চিন্তাগত ও বিশ্বাসগত অস্থিরতার অনুসন্ধান, এর কারণ নির্ণয় এবং তদনুযায়ী যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। দ্বীনী আদর্শ ও শিক্ষাকে, দ্বীনের মৌল নীতিমালা সমূহকে বাস্তব জীবনের ঘটনাবলী ও কার্যক্রমের সাথে, জীবনযাত্রায় উদ্ভুত সমস্যাসমূহের সাথে সঙ্গতি বিধানের প্রচেষ্টা গ্রহণ। প্রত্যেক যুগে ইসলামী আইনের মর্যাদাকে সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করণ।

আল্লামা ইকবাল তাঁর এক চিঠিতে লিখেছেন, এই যুগে সবচেয়ে বড় মুজাদ্দিদ সেই ব্যক্তি যে অন্যান্য আইনের উপর ইসলামী আইনের উচ্চতা ও মর্যাদাকে সুপ্রমাণিত করবে। আল্লামা ইকবাল ষাট বৎসর পূর্বে যে কথা বলেছিলেন তা আজ এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ইসলামী শরীয়ত বিশেষত পারিবারিক বিধি-বিধানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা। ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য, তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্য ইসলামী বিধি-বিধানই যে সর্বোত্তম উপায় তা প্রমাণ করা।

আমরা আমাদের প্রিয় ছাত্রবৃন্দের উদ্দেশ্যে বলব যে, তারা কঠোর অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দ্বীনী ইলমে পাণ্ডিত্য অর্জন করুক। অতঃপর আধুনিক জিজ্ঞাসা সম্পর্কে অবহিত হোক এবং দ্বীনের আলোকে সেগুলোর সমাধান দান করুক।

দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামা গর্বিত যে, প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরীর ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন, আলোকিত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিত্বের সাথে এবং 'সীরাতুন নবী'র লেখক আল্লামা শিবলী নুমানীর ন্যায় ধর্মতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ও সীরাত রচয়িতার সাথে।

বাস্তবতা হল, আজ পর্যন্ত ইলমী ও দ্বীনী বিষয়ে লেখনী ধারণ এবং ইলমী ও দ্বীনী বিষয়কে কার্যকর ও প্রভাব বিস্তারকারী রূপে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আমার জানা মতে আল্লামা শিবলী নুমানীর পদ্ধতি ও ধরণ অপেক্ষা উত্তম কোন পদ্ধতি ও ধরণ হতে পারে না। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে সাইয়েদ সুলাইমান নদভী, আবদুস সালাম নদভী প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের ন্যায় ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এতটুকু তো যথেষ্ট নয়। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, আপনারা এই জাতীয় জলসায় শুধু তাঁদেরই নাম উচ্চারণ করতে বাধ্য হন, নতুন কোন নাম এই তালিকায় সংযুক্ত করতে পারেন না। এটা এই প্রতিষ্ঠানের অধঃগতি ও অবক্ষয়ের প্রমাণ এবং গোটা জাতির জন্য শঙ্কার বিষয়। এটা কত বড় দুঃখের কথা যে, কোন ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত মানে উত্তীর্ণ নতুন কোন ব্যক্তি সৃষ্টি হচ্ছে না।

কোন কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এখানকার অবস্থাও অভিন্ন। সেখানেও এখন জ্ঞান গবেষণা ও চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানের মত ব্যক্তিত্বের অভাব। এ রকম কোন ব্যক্তি নেই যিনি ইউরোপ আমেরিকায় লেখাপড়া করা নতুন প্রজন্মকে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার উপকরণ সরবরাহ করতে পারেন। এমন কোন পুস্তিকা বা গ্রন্থ নেই, যাতে দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক জিজ্ঞাসা ও সমস্যার জবাব ও সমাধান দান করা হয়েছে। জ্ঞান গবেষণা ও ভাষার মান নিম্নমুখী ও নিতান্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেসব পুস্তিকা আছে তা নির্দিষ্ট দল ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক, নির্দিষ্ট মত ও পথ কেন্দ্রিক। তাতে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা মূলত নির্দিষ্ট দল, নির্দিষ্ট মত ও পথের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সেসব পুস্তিকা লিখিত হয়েছে। এই অবস্থা বড় ভয়াবহ। যে আলেমগণের দায়িত্ব ছিল যুবক শ্রেণীর আস্থা ও বিশ্বাসকে ইসলামের পক্ষে সুসংহত করা, যাদের দায়িত্ব ছিল ইসলামের সত্যতা ও চিরন্তনতা প্রমাণ করা এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের প্রয়োজনীয়তা ও কল্যাণকারিতা প্রমাণ করা তাঁরা এখন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে লিপ্ত। এটা বড় সর্বনাশা ব্যাপার। যদি এই উম্মতের মধ্যে দ্বীনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ নেককার মুত্তাকী ব্যক্তি উপস্থিত থাকে তবুও উপরিউক্ত প্রয়োজন সব সময়ই অবশিষ্ট থাকবে।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 দ্বীনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করা অপরিহার্য

📄 দ্বীনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করা অপরিহার্য


সুধী! আমি আপনাদের সামনে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

يا أيها الذين امنوا قوا أنفسكم وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلئِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

হে ঐ সকল ব্যক্তিগণ, যারা ঈমান এনেছ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর ঐ আগুন থেকে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন এবং তারা তা-ই করে যা তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়। (সূরা তাহরীম ৬)

সুধী! আমি আপনাদের সামনে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আয়াতটি আপনাদের সামনে এর পূর্বেও অনেকে তেলাওয়াত করে থাকবেন। আপনাদের নিজেদের তেলাওয়াতের সময়ও আয়াতটি আপনাদের দৃষ্টিতে পড়ে থাকবে। অবশ্য কোন বিষয় বার বার সামনে আসা সত্ত্বেও অনেক সময় তা গভীর দৃষ্টিতে ও মনোযোগী দৃষ্টিতে দেখা হয় না। আপনি একই রাস্তায় বার বার আসা-যাওয়া করে থাকেন, রাস্তাটির উভয় পার্শ্বে অনেক সাইনবোর্ড টানানো থাকে আপনি সেগুলোকে বার বার দেখেও থাকেন। কিন্তু আপনি নিজেই চিন্তা করুন এ সকল সাইনবোর্ডের কতটিকে আপনি মনোযোগ সহকারে দেখেছেন এবং তাতে কী লেখা আছে তা মনে রেখেছেন? আপনাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, বলুন তো এসব সাইনবোর্ডের মধ্যে কয়টি সাইনবোর্ড গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংক্রান্ত? আপনাদের মধ্যে কম লোকই তা বলতে পারবে।

আয়াতটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং চমকে দেওয়ার মত। কোন জিনিস বার বার সামনে আসলে অনেক সময় তা সাধারণ ও মামুলী বিষয় বলে গণ্য হতে থাকে- তা না হলে আয়াতটি এতই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী যে, আমি অনুরোধ করতাম এবং জোর দিয়ে বলতাম যে, আয়াতটি দেয়ালে দেয়ালে স্পষ্ট অক্ষরে লিখে রাখা হোক। সাইনবোর্ড আকারে লিখে মসজিদে মসজিদে টানিয়ে দেওয়া হোক।

আল্লাহ তাআলা বলছেন, হে ঐ সকল লোক, যারা নিজেরা ঈমান এনেছ- يا أيها الذين امنوا -এর মধ্যকার امنوا শব্দটি অতীতকাল বাচক ক্রিয়াপদ। প্রতিটি শব্দ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। কুরআন মাজীদের কোন শব্দের ব্যবহারই যথেচ্ছাচার-নির্ভর নয়, অপরিকল্পিত নয়। এটা কবিতা কিংবা কাব্যগ্রন্থ নয়। এর প্রতিটি শব্দই তাৎপর্যপূর্ণ। أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ হে মুমিনগণ! বা أَيُّهَا الْمُسْلِمُونَ হে মুসলমানগণ বলা যেত, কিন্তু তা বলা হয়নি। বলা হয়েছে يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا হে ঐ সকল লোক, যারা ঈমান এনেছ قُوا أَنْفُসَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّাসُ وَالْحِجَارَةُ তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর ঐ আগুন থেকে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। আয়াতটিতে প্রথম সম্বোধন যাদেরকে করা হয়েছে তাঁরা ছিলেন মুসলমান, তাঁরা ছিলেন সাহাবী। কুরআন অবতরণের সময় কালে যাঁরা ছিলেন বর্তমান। তাঁরাই ছিলেন আয়াতের সম্বোধনের প্রধান লক্ষ্য। এমনিতে তো কিয়ামত পর্যন্ত যে সকল মানুষ জন্ম নেবে তাদের সকলেই এই আয়াতের সম্বোধনের লক্ষ্য। কিন্তু প্রথম লক্ষ্য তাঁরাই যাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে ঈমান এনেছেন। যাঁরা সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে নিশ্চয়ই ঐ সকল সাহাবীও ছিলেন, যাঁরা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যাঁরা হুদায়বিয়াতে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রাসুলের হাতে হাত রেখে ইসলামের জন্য জীবন দানের শপথ করেছিলেন। যাঁদের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُবָايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا

'আল্লাহ তো মুমিনগণের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন যখন তারা বৃক্ষতলে তোমার নিকট বায়আত গ্রহণ করল এবং তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি অবগত হলেন; ফলে তাদের উপর তিনি নাযিল করলেন প্রশান্তি এবং তাদেরকে পুরস্কার দান করলেন আসন্ন বিজয়।' (সূরা ফাতহ ১৮)

যাদেরকে স্থায়ী সনদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এইরূপ সনদপ্রাপ্ত উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীগণও ছিলেন আলোচ্য আয়াতের সম্বোধনের লক্ষ্য। নিশ্চয়ই আশারায়ে মুবাশশারা বিল জান্নাহ সাহাবীগণও এই সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বড় বড় সাহাবীগণ।

এখন আমি আপনাদের নিকট প্রশ্ন করি, কোন ব্যক্তি কি জেনে-শুনে তার সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে আগুনে নিক্ষেপ করে কিংবা আগুনে ঝাঁপ দিতে দেয়? তাহলে এই আয়াতে যে বলা হল, হে ঐ সকল লোক, যারা নিজেরা ঈমান এনেছ তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর- এর অর্থ ও তাৎপর্য কী?

আপনারা কি ইতিহাসে এরূপ কোন ঘটনার কথা পাঠ করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে আগুনে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেছিল কিংবা তাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজন আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হয়েছিল, আর তারা নিশ্চুপ বসে বসে তামাশা দেখছিলেন? তাহলে কেন তাদের উদ্দেশ্যে এই কথা বলা হল যে, হে ঐ সকল লোক, যারা ঈমান এনেছ তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর? এটা কি বিনা প্রয়োজনে বলা হয়েছে? এটা কোন আগুন ছিল? কবে এই ঘটনা ঘটেছিল যে, মুসলমানদের সন্তান ও পরিবার-পরিজন আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হয়েছিল আর মুসলমানরা আরামের ঘুম ঘুমাচ্ছিল, তাদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল না, ফলে আল্লাহ তাদেরকে সচেতন করতে ওহী নাযিল করলেন, আর তাতে সকলে চমকে গেল, সচেতন হল এবং নিজেদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করতে চেষ্টা করল? বলাবাহুল্য, এইরূপ ঘটনা কখনও ঘটেনি। তাহলে এই আয়াতের মর্ম ও তাৎপর্য কী?

আয়াতটির মর্ম এছাড়া আর কিছুই নয় যে, তোমরা তোমাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে এরূপ বিষয় থেকে এরূপ কাজ-কর্ম থেকে রক্ষা কর, যার পরিণতি হবে তাদের জাহান্নামে প্রবেশ। কোন মানুষ নিজ সন্তান বা পরিবার-পরিজনকে আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হতে দেখলে তাকে রক্ষার চেষ্টা না করে পারে না। কিন্তু শঙ্কার বিষয় শুধু একটাই যে, মানুষ জানে না কোন্ কর্মে, কোন্ কারণে আগুনে জ্বলতে হয়। সুতরাং আয়াতের মর্ম দাঁড়াল এই যে, ঐসব আমল থেকে তাদেরকে রক্ষা কর, যা আগুনে প্রবেশের কারণ হয়। ফিকহের পরিভাষায় ঐসব আমলকে বলা হয়, আসবাবে মুআদ্দিয়াহ (কোন কিছুতে উপনীতকারী কারণ)। অর্থাৎ ঐ সকল কারণ যা কোন পরিণামের দিকে ধাবিত করে। ফিকাহ বিদগণের মতে ঐসব কারণ ও পরিণাম প্রকারান্তরে একই বিষয়। উদাহরণ স্বরূপ কেউ যদি এমন ঔষধ কাউকে পান করায়, যা মৃত্যু ডেকে আনে তাহলে এই ঔষধ প্রদান হত্যার সমার্থক হবে। কেননা সে এরূপ কারণ অবলম্বন করেছে, যার ফলে মৃত্যু অনিবার্য। আইনও তাকে হত্যাকারী বলেই সাব্যস্ত করবে এবং চিকিৎসকরাও তাকে হত্যাকারী বলে সাব্যস্ত করবে।

এখন আমি আপনাদের নিকট আরজ করছি যে, বর্তমান পরিস্থিতি এইরূপই। সন্তানদেরকে দ্বীনী শিক্ষাদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। তাদেরকে ন্যস্ত করা হচ্ছে ধর্মহীন শিক্ষার পরিবেশে। ঐ সকল লোকের ইচ্ছা ও মর্জির উপর তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যে শিক্ষার উপর পরকালীন মুক্তি নির্ভরশীল, পয়গম্বরগণের আনীত যে শিক্ষা না থাকার পরিণতি হল ঈমানহারা হওয়া শিশুদেরকে সেই শিক্ষাদানের ব্যাপারে যাদের ন্যূনতম দায়িত্ববোধ নেই এবং যারা ঐ শিক্ষাদানের উপযুক্তও নয়। দেখার বিষয় হল তাহলে এই বিষয়টা সন্তানদের জন্য কিভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে? বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শুধু ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা নয়; বরং এই শিক্ষাব্যবস্থা দ্বীন ও তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শগত শিক্ষাব্যবস্থা। বৃটিশ শাসনামলের শিক্ষাব্যবস্থাও ছিল ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা। তৎকালীন পাঠ্য পুস্তকে কুকুর-বিড়ালের কাহিনী থাকত। আমাদের অনেকেই তৎকালীন যুগে ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তৎকালীন যুগের ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ্য পুস্তক ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসে কোন বিরূপ প্রভাব বিস্তার করত না, ঐসব পাঠ্যপুস্তক দ্বারা সৃষ্ট কোন বস্তুর প্রতি দাসত্ব মনোভাব সৃষ্টি হত না এবং এই জগতে কোন মাখলুকের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার ধারণাও সৃষ্টি হত না। সেই সময়কার পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষার্থীরা বাঘ, ভালুক, শিয়াল, নেকড়ে আর বিড়াল-কুকুরের কাহিনী ও গল্প পাঠ করত। বাড়ী থেকে যেরূপ মানসিকতা নিয়ে পাঠশালায় যেত সেই মানসিকতা নিয়েই ঘরে ফিরে আসত। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারী সিলেবাসভুক্ত পাঠ্যপুস্তকে আকীদা-বিশ্বাসের উপর প্রভাব বিস্তারকারী সমূহ উপাদান, গল্প ও আলোচ্য বিষয়াদি বিদ্যমান থাকে। আকীদা-বিশ্বাস বিনষ্টকারী উপাদানে যতটুকু ঘাটতি থাকে শিক্ষকগণ তা পূর্ণ করে দেন। শিক্ষার্থীদেরকে সম্মিলিতভাবে কিছু কাজ এইরূপ করতে হয়, যা তাওহীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দেখুন, রাস্তা এরূপ ঢালু যেখানে ঠিকমত পা জমে না। এরূপ ঢালু রাস্তায় কোন বালক সাইকেল চালাচ্ছে। সামনে গভীর বড় গর্ত রয়েছে। সাইকেলের ব্রেকও ঠিকমত কাজ করছে না। পিতা বসে বসে দেখছেন কিন্তু তাকে বাধা দিচ্ছেন না। অথচ তিনি জানেন যে, তার ছেলের সাইকেলটির ব্রেক ঠিকমত কাজ করে না, তিনি এটাও জানেন যে, সাইকেল চালিয়ে ঐ রাস্তায় গেলে তার ছেলের জীবন রক্ষা পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। এমতাবস্থায় আপনারা কি বলবেন না যে, পিতাই ছেলেটিকে ঐ গর্তে নিপতিত করে তার জীবন ধ্বংস করেছে?

তাহলে আমি আপনাদেরকে বলছি যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দ্বারা ঈমান কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে যদি সন্তানের জন্য দ্বীনী শিক্ষার ভিন্ন কোন ব্যবস্থা না করা হয় (যাকে আমরা সাইকেলের ব্রেকের সঙ্গে তুলনা করতে পারি)? স্কুলে বাচ্চারা যা পাঠ করে এবং যা শিক্ষা লাভ করে তার সংশোধনের ব্যবস্থা না করা হয়? যদি বাচ্চাকে ঈমানী ও তাওহীদী ব্যবস্থা দেওয়া হয়, প্রভাতকালীন অথবা সান্ধ্যকালীন মক্তবে প্রেরণ করা হয়, দ্বীনী আলোচনা সভায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, পিতা-মাতা নিজেরাও তাদেরকে দ্বীনের উপদেশ দান করে, উৎসাহব্যঞ্জক ও দ্বীনী অনুপ্রেরণা মূলক ভাল ভাল কিসসা-কাহিনী তাদেরকে শোনানো হয়, ঘরের পরিবেশও দ্বীনের অনুকূল হয়, তবে তো এসব এক প্রকার ব্রেকের কাজ করবে। পক্ষান্তরে এসব যদি না হয় তাহলে আপনি যেন আপনার সন্তানদেরকে কানে কানে বলে দিলেন যে, স্কুলে শিক্ষা লাভ করা সব বিষয়ই মেনে নেবে। হাঁ আপনি আপনার সন্তানদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন আর তার জন্য দ্বীনী শিক্ষার ভিন্ন কোন ব্যবস্থা করলেন না, তবে তার কানে যেন এই কথাই বলে দেওয়া হল যে, স্কুলের সব বিষয়ই মেনে নেবে। আপনি যেন আপনার সন্তানদেরকে একপ্রকার উৎসাহ দান করলেন ইসলাম বিরোধী সব কথা মেনে নিতে। তার দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন না, মহল্লায় কোন মক্তবও চালু নেই, দ্বীনী পুস্তকাদিও সে পাঠ করে না তাহলে আপনি বলুন আপনার উদ্দেশ্যে কি বলা হয়নি قوا انفسكم واهليكم نارا তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর?

লাক্ষ্ণৌতে মহিলাদের একটি মাহফিলে আমি একজন মমতাময়ী মায়ের গল্প বলেছিলাম। সুশিক্ষিতা ঐ মা একবার একটি আপ্যায়ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন। অন্য মহিলারা মহিলাটিকে বেশ অস্থির, বিষণ্ণ ও চিন্তিত দেখতে পেল। তারা দেখল যে, কোন কথায় মহিলাটির মন বসছে না। অনেক দিন পর সকলেই একত্রিত হয়ে আনন্দ-ফুর্তির কথাবার্তা বলছে কিন্তু ঐ মহিলা কোন কিছুতেই আনন্দ পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে- যেন তার মন-মস্তিস্ক অন্য কোথাও পড়ে আছে। অন্যরা তাকে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার বোন! শরীর খারাপ? মনে কোন বেদনা আছে কি? অনেক জিজ্ঞাসার পর মহিলাটি বলল, না এসব কিছুই নয়। আসলে আমি ঘরে আমার শিশুটিকে রেখে এসেছি। এদিকে রান্নাঘরের দিয়াশলাইয়ের কৌটাটা সামলে রেখে আসিনি। ফলে আমার খুব আশঙ্কা হচ্ছে আমার বাচ্চা না পাছে দিয়াশলাই থেকে কাঠি বের করে আগুন জ্বালিয়ে নেয়। সঙ্গিনী মহিলারা বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন! আপনার বাচ্চার বয়স কত? মহিলাটি জবাব দিল- এই বছর দুয়েক হবে। দেখুন, বাচ্চা দিয়াশলাইয়ের বাক্স খুলতে জানে কি জানে না, যদি জানে তবে দিয়াশলাইয়ের কাঠির বারুদ যুক্ত দিক দিয়ে ঘষা দেবে কি উল্টো দিক দিয়ে ঘষা দেবে এই উভয় রকম সম্ভাবনাই বিদ্যমান। কিন্তু তা সত্ত্বেও মা বিচলিত হয়ে পড়েছেন। তার কল্পনায় ভেসে উঠছে তার বাচ্চা খেলতে খেলতে সেখানে গেল। দিয়াশলাইয়ের কৌটা খুলল। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বের করে দিয়াশলাইয়ের বারুদযুক্ত পাশে কাঠির বারুদযুক্ত দিক দিয়ে ঘষা দিল। ফলে আগুন জ্বলল আর তার বাচ্চার কাপড়ে আগুন লেগে গেল। এইসব কিছু দূর সম্ভাবনার বিষয় হলেও মমতাময়ী মা এই সম্ভাবনাযুক্ত শঙ্কাকেই নিশ্চিত মনে করে বিচলিত হয়ে পড়ছে।

দ্বীন পরিপন্থী পরিবেশে দ্বীন ও ঈমান বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কি জীবন নাশের সম্ভাবনা অপেক্ষা গুরুতর নয়? আপনাদের যে বাচ্চারা স্কুলে লেখাপড়া করছে আপনি কি তাদেরকে কোন দিন শিক্ষা দিতে চেষ্টা করেছেন যে, তাওহীদ কী? নিজেদের শহর ও মহল্লায় দ্বীনী মক্তব প্রতিষ্ঠার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। না ঘরে দ্বীনী পরিবেশ আছে, না মহল্লায়। এই অবস্থায় তাদের দ্বীন ও ঈমান কিভাবে সংরক্ষিত হবে? স্কুলের ব্যাপারে কী বলব, আরবী মাদরাসাগুলোর অবস্থাও এই দাঁড়িয়েছে যে, যে সকল শিশুরা এখানে আসছে তারাও ঐসব মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ, আমাদের শৈশবে যেসব বিষয়ে কোন মুসলমান শিশুর অজ্ঞ থাকার কল্পনাও আমরা করতে পারতাম না।

এই অবস্থার পরিণতি কী হবে? পরিণতি হবে এই যে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম দ্বীন সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ থেকে যাবে। উর্দু পড়তে পারবে না। বর্তমানে অবস্থা এই যে, ঐহিত্যের অধিকারী একটি বড় মাপের তিব্বীয়া কলেজের এক ছাত্রকে বলা হল একটি প্রবন্ধ লিখতে। ধারণা করা হল যে, যেহেতু তিব্বিয়া কলেজের পাঠ্যপুস্তক সব আরবী, ফার্সী ও উর্দু ভাষায় রচিত সেহেতু সে প্রবন্ধটি কমপক্ষে উর্দুতে লিখবে। কিন্তু দেখা গেল যে, সে হিন্দীতে তা লিখে এনেছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ছেন অথচ উর্দু লিখতে জানেন না? উত্তরে সে বলল, আমাদেরকে হিন্দীই পড়ানো হয়েছে। তো বলছিলাম যে, নতুন প্রজন্মের ব্যাপারে আমাদের আশঙ্কা অমূলক নয়, বাস্তবও বটে। দ্বীনের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ, মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে অজ্ঞ, আমাদের অন্তরে আল্লাহ ও রাসূল সম্পর্কে যে বিশ্বাস বিদ্যমান সে সম্পর্কে অজ্ঞ প্রজন্ম যথারীতি সৃষ্টি হয়ে গেছে। একজন মুসলিম ছাত্রকে সীরাত সম্পর্কে একটি রচনা লিখতে বলা হলে, সে তা হিন্দিতে লিখল এবং পাঠ করল উর্দু উচ্চারণে। শব্দ তো উর্দু কিন্তু Script ও বর্ণমালা হিন্দির।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক আর্নল্ড টয়েনবি লিখেছেন, এখন কোন জাতিকে ধ্বংস করতে তাদের গ্রন্থাগারে আগুন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু Script তথা তাদের ভাষার হস্তলিপি ও বর্ণমালা পরিবর্তন করলেই যথেষ্ট। এর দ্বারা ঐ জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে তাদের সম্পর্ক বিনষ্ট হয়ে যাবে, তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। এরপর তাদেরকে যে দিকে ইচ্ছা সেদিকে পরিচালিত কর। যে জিনিস জাতিকে তার অতীত ও ঐতিহ্যের সাথে, তার মতাদর্শ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ সৃষ্টি করে তা হল ঐ জাতির Script তথা হস্তলিপি ও বর্ণমালা। হস্তলিপির পরিবর্তন হল তো জাতিরও পরিবর্তন হল। ভারতে তাই হচ্ছে। দলগত বিভেদে লাভ কিছুই হয় না, দেশের বদনাম হয়। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন যদি হয়ে যায়, তাহলেই আমাদের সর্বনাশের জন্য যথেষ্ট। আজ থেকে ষাট বৎসর পূর্বে মরহুম আকবর এলাহাবাদী বলেছেন-

শায়খ মরহুমের কথাটি আজ আমার খুব মনে পড়ে হৃদয় বদলে যাবে শিক্ষা বদলে গেলে।

আমাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিছু সময় লাগবে। ত্রিশ-চল্লিশ বৎসরের মধ্যে এরূপ এক প্রজন্মের সৃষ্টি হবে যাদের নিকট কুফর ও ঈমানের পার্থক্য, তাওহীদ ও শিরকের পার্থক্য, আকীদা-বিশ্বাসের পার্থক্য এসব কিছুই নিরর্থক বলে মনে হবে।

মুসলমান পিতা-মাতা তাদের সন্তানের ক্যারিয়ার ক্ষতি হবে আশঙ্কায় সন্তানদেরকে মাতৃভাষা উর্দু লেখায় না, পড়ায় না। তাদের দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। তাদের ক্যারিয়ারের সাথে এগুলো কি সাংঘর্ষিক? একজন মুসলমানের চেতনা তো এরূপ দৃঢ় হওয়া উচিত যে, যদি সে কোনভাবে বুঝতে পারে, তার সন্তানের ভাগ্যে ইসলাম নেই কিংবা খোদা না করুন সে মুসলমান থাকবে না তবে সে দুআ করবে, হে আল্লাহ! আমার এই সন্তানকে ভালোয় ভালোয় উঠিয়ে নাও। মুসলমানের শান এটাই।

একজন মহিলা সাহাবীয়া ছিলেন। নাম ছিল খানসা (রাযি.)। কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর হৃদয় ছিল কোমল। তিনি তাঁর মৃত দুই ভাইয়ের শোকগাথা রচনা করে সব সময় বেদনার্ত হৃদয়ে তা আবৃত্তি করতেন। বলা যায় যে, কোন ভাষায় নারী কর্তৃক রচিত শোকগাথার এত বড় ভাণ্ডার আর নেই। এই কোমল হৃদয়ের অধিকারিণী নারী একটি জিহাদ উপলক্ষ্যে তাঁর এক সন্তানকে ডাকলেন এবং বললেন, বৎস! তোমাকে আমি এই দ্বীনের জন্যই লালন-পালন করে বড় করেছি। যাও, আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়ে দাও। অতঃপর দ্বিতীয়জন, তৎপরে তৃতীয়জনকে ডেকেও অনুরূপ কথা বললেন। যখন তাদের সকলের শহীদ হওয়ার সংবাদ তাঁর নিকট আসল তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন,

'ঐ আল্লাহর শোকর, যিনি আমাকে সম্মানিত করেছেন তাদের শাহাদাতের মাধ্যমে।'

ঈমানের শান এটাই। ইসলামের জন্য সবকিছুই কুরবান করতে প্রস্তুত হওয়া। জিজ্ঞাসা একটাই। তা হল এই প্রজন্মকে কিভাবে রক্ষা করা যাবে। কিভাবে মুসলমানরূপে তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা যাবে। সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সাধনের প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনী শিক্ষারও সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আজ এই পর্যন্তই। আল্লাহ আমাদেরকে কাজ করার তাওফীক দিন। আমীন!

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00