📄 হিন্দুস্তানে আমাদের কিভাবে থাকা উচিত?
আমি বলতে চাচ্ছি যে, যদি হিন্দুস্তানে থাকতে হয় তাহলে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে থাকতে হবে। সকলের প্রিয় হয়ে থাকতে হবে। মারামারি, কাটাকাটি করে কত দিন থাকবেন? এই যুদ্ধ যুদ্ধ অবস্থা কত দিন চলবে? কত দিন আর এই অভিযোগ ও অনুযোগ যে, আমাদের প্রতি জুলুম করা হচ্ছে। কিছু কিছু শিশু হীনমন্যতায় ভোগে। সব সময় চিৎকার করে বলতে থাকে, আম্মু, অমুক আমাকে বিরক্ত করছে, অমুক জ্বালাতন করছে। প্রকৃতপক্ষে এটা একটা মনোগত ব্যাধি বিশেষ। যে শিশু যে বিষয়ে বিরক্ত হয় অন্যরা সেই বিষয় দিয়েই তাকে বিরক্ত করে, জ্বালাতন করে। তো আপনারা কত দিন আর শিশুর মত চিৎকার করতে থাকবেন যে, আমাদের প্রতিবেশী সমাজ আমাদেরকে জ্বালাতন করে, আমাদের প্রতি জুলুম করে? আমাদের সকলের এখন প্রয়োজন চারিত্রিক পরিবর্তন। দিলের মধ্যে ঈমান সৃষ্টি করুন, আমলে সালেহ ও সৎকর্ম সৃষ্টি করুন। চরিত্র ও আচার-আচরণে মাধুর্য সৃষ্টি করুন। আমাদের সুহৃদ নাসের আল-আবূদী যেমনটা বলেছেন এবং অত্যন্ত চমৎকার বলেছেন যে, যদি আপনার আখলাক ও চরিত্র, আচার-আচরণ সুন্দর হয়, তাহলে আপনার সবকিছুতেই সৌন্দর্য সৃষ্টি হবে, তখন লোকে আপনাকে দেখে বলবে— 'লোকটার দ্বীন নিশ্চয়ই উত্তম দ্বীন।'
তিনি আরও সুন্দর বলেছেন যে, অধিকাংশ লোকই বাহ্যিক দিক দেখে। গভীর তলিয়ে দেখে না। তারা মানুষটাকে দেখে। বই-পুস্তক ও কিতাবাদি ও গ্রন্থাদি পাঠ করার সুযোগ ও অবকাশ কার হয়? এই দেশে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছেন তারা মুসলমানদেরকে দেখে মুসলমান হয়েছেন। তাঁরা খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.) কে দেখেছেন। খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী লেখক ছিলেন না মোটেও। চিশতিয়া তরীকার বুযুর্গগণ বলেন, খাজা মাহবুবে ইলাহী হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া বলেছেন, আমাদের বুযুর্গগণ কখনও কিতাব লেখেননি। যে কিতাব সম্পর্কে বলা হয় যে, খাজা মইনুদ্দীন চিশতী কিতাবটি লিখেছেন তা সঠিক নয়। অদ্রূপ কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.) সম্পর্কে যা বলা হয় যে, তিনি অমুক কিতাব লিখেছেন তাও সত্য নয়। তদ্রূপ হযরত ফরীদুদ্দীন গঞ্জে শাকার (রহ.) সম্পর্কে যা বলা হয় যে, তিনি অমুক কিতাব লিখেছেন তাও সঠিক নয়। খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়াও কোন কিতাব বা গ্রন্থ লেখেননি। এই সকল পীর ও বুযুর্গ লেখালেখি বা যাদু বয়ান ইত্যাদি দ্বারা মানুষের হৃদয় জয় করেননি। তাঁরা তাঁদের চরিত্র মাধুর্য দিয়ে মানুষের মন জয় করেছেন। জয় করেছেন ত্যাগ ও কুরবানী দ্বারা, অপরের প্রতি সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাশীলতা দ্বারা। কারও প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণ করার সুযোগ ও শক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। ক্রোধ সংবরণ করে ফেলেছেন। হার মেনে নিয়েছেন। গালি শুনেছেন। কেউ তাঁদের কিছু চুরি করেছে, জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে তাঁরা ক্ষমা করে দিয়েছেন। অভাবী, দরিদ্র ও অসহায় কাউকে দেখে কেঁদেছেন, তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। ক্ষুধার্তকে আগে খাইয়ে তারপর কিছু নিজে খেয়েছেন নতুবা অভুক্ত থেকেছেন। এই ছিল তাঁদের স্বভাব ও চরিত্র, যা মানুষের মন জয় করেছে, হৃদয়কে বিগলিত করেছে। এই উন্নত চরিত্রই ইন্দোনেশিয়া ও চীনে ইসলামের বিস্তার ঘটিয়েছে।
সমগ্র ইন্দোনেশিয়া আরব বণিকদের চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে এবং সুফীগণের আত্মিক উৎকর্ষ দেখে মুসলমান হয়েছে। আজ পর্যন্ত কেউ এই দাবি করতে পারেনি যে, ইন্দোনেশিয়ায় কখনও কোন মুসলিম সেনাবাহিনীর আগমন ঘটেছিল। মুসলিম সেনাবাহিনী এত দূরের দেশসমূহে কখনই যায়নি। শক্তি বা তরবারী দ্বারা ইসলামের প্রসার ঘটেনি। দেখুন, ভারত উপমহাদেশের যেসব অঞ্চলে সাড়ে সাতশত বৎসর পর্যন্ত মুসলিম শাসন কায়েম ছিল সেখানে মুসলমানেরা এখনও সংখ্যালঘু। এই যে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ এবং বিহার— এই সকল জায়গায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল তবুও এসব জায়গায় মুসলমানরা সংখ্যালঘিষ্ঠ। খোদ দিল্লীতেই মুসলমানরা সংখ্যালঘু। মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোথায় আছে? আছে কাশ্মীরে। যেখানে আল্লাহর এক বান্দা সাইয়েদ আলী হামদানীর আগমন ঘটেছিল, আর তাঁর হাতে সমগ্র কাশ্মীর মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। তদ্রূপ বাংলা, বিশেষত পূর্ব বাংলা। সমগ্র বাংলা সুফীগণের প্রভাবে ইসলামের ছায়াতলে এসেছে। অতএব চরিত্রের পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধন প্রয়োজন। আপনি ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দাঁড়াবেন। আপনার অভ্যন্তরটাও হবে দাঈ, আপনার চরিত্র মাধুর্যই মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করবে। আপনি মুসলমানদের মধ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করুন। মুসলমানদের মধ্যে আপনার কথা যেন প্রভাব বিস্তারকারী হয়, তারা যেন আপনার কথার মূল্যায়ন করে। তারা যেন সংশোধিত হয়, আল্লাহর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক যেন দৃঢ় হয়। তাদের চরিত্র যেন উন্নত হয়ে যায়। অপরের জন্য তারা যেন দৃষ্টান্ত ও আদর্শ হয়ে যায়। অতঃপর তাদের জন্য জরুরী হবে অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করা। তবে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা ও ভাষণ দিয়ে তারা বলবে না যে, আস তোমরা মুসলমান হয়ে যাও। বরং নিজ চরিত্র দ্বারা তাদেরকে আকৃষ্ট করবে, তাদের অন্তরে স্থান করে নিবে। আর নিজের মধ্যে দেশাত্মবোধ থাকতে হবে, দেশপ্রেম জাগরূক করতে হবে। সর্বদা এই চেতনা লালন করতে হবে যে, আমাদের দেশটা যেন ধ্বংস হয়ে না যায়।
📄 শিশুসুলভ মানসিকতা
মুসলমানদের মানসিক অবস্থা বর্তমানে এইরূপ হয়ে গিয়েছে যে, যদি এ দেশের কোথাও বন্যা হয়, তবে তারা তাতে খুশি হয়, আনন্দবোধ করে, কোথাও আগুন লাগলে তাতেও তারা আনন্দিত হয়। মনে করে যে, এই দেশের উপর যত বিপদ আসে ততই ভাল। মানসিকতা এতটাই নীচ পর্যায়ে চলে গেছে যে, হকি, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলাধুলায় যদি দেশের দল হেরে যায় আর কোন মুসলিম দেশের দল জিতে যায় তবে আনন্দিত হয়, পুলকিত হয়। এটা সম্পূর্ণ শিশুসুলভ মানসিকতা। এই মানসিকতা নিয়ে কাজ চলবে না। দেশের প্রতি সত্যিকারের প্রেম ও ভালবাসা থাকতে হবে।
দেখুন, আমাদের আসলাফে কেরাম ও পূর্বসুরীগণ যদি এই দেশের জন্য কাজ না করে যেতেন, তাঁরা যদি এই দেশটাকে গঠন করে না যেতেন, এই দেশকে সজ্জিত করে না যেতেন তাহলে এই দেশকে আমরা কিছুই দেখাতে পারতাম না। অনেক মহাপুরুষকে আমরা দেখিয়েছি। আপনি দারুল উলুমে যান, সেখানে যাদুঘর আছে। দেখুন, আমাদের পূর্বসূরীগণ এই দেশকে কী দিয়েছেন, তাঁরা এই দেশটাকে কতটুকু সমৃদ্ধ করেছেন। যদি তাদের দেশপ্রেম না থাকত বরং উল্টো দেশের বিপদে আনন্দিত হওয়ার মানসিকতা যদি তাঁদের থাকত, তাঁরা যদি মনে করতেন এ দেশ ধ্বংস হয়ে যাক, লানত হোক এই দেশের উপর, আমাদের প্রতি এই দেশ এই অবিচার করেছে ঐ অবিচার করেছে, তাহলে কিছুই হত না। তাঁরা এই দেশকে নিজের দেশ মনে করেছেন। এই দেশের জনসাধারণকে আল্লাহর মাখলুক বলে মনে করেছেন। মনে করেছেন— ‘আল খালকু আয়ালুল্লাহ’ (সকল মাখলুক আল্লাহর পরিবারভুক্ত)। তাঁরা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। আল্লাহর পয়গাম এই দেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন। মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানানোর চেষ্টা করেছেন। ফল এই হয়েছে যে, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের নিকট তাঁরা প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছেন, সকলের চোখের মনিতে পরিণত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাঁর প্রিয় বানিয়ে নিন। আমীন।