📄 কুরআন সংরক্ষিত হওয়ার অর্থ
আল্লাহ তাআলা কোন গ্রন্থ ও ভাষা সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। কিন্তু কুরআনে কারীম সংরক্ষণের দায়িত্ব তিনি নিজেই গ্রহণ করেছেন বলে ঘোষণা করেছেন। তবে সংরক্ষিত থাকার অর্থ এই নয় যে, ব্যস কুরআনে কারীম থাকবে কিন্তু তাকে কেউ বুঝবে না, অপরকে বুঝাবে না। সংরক্ষিত থাকার জন্য কুরআন বুঝার লোক থাকতে হবে, অপরকে বুঝানোর লোক থাকতে হবে এবং কুরআন যেহেতু একটি ভাষায় নাযিল হয়েছে সুতরাং সে ভাষাও সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। অতএব কুরআন সংরক্ষিত থাকার সঙ্গে সঙ্গে কুরআনের ভাষা আরবীও সংরক্ষিত থাকবে। পৃথিবীর বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু শরীয়তে ইলাহীর আরবী ভাষা আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে আছে। সুতরাং প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য ফরয যথাসাধ্য দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ। মাসআলা বলার মত উপযুক্ত একজন আলেম বিদ্যমান থাকাই শুধু যথেষ্ট নয়; বরং ঐরূপ আলেম তৈরি করার ধারা অব্যাহত থাকা জরুরী এবং এই ধারা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা গ্রহণও মুসলমানদের জন্য ফরয। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা এবং তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হওয়ার ধারা অব্যাহত থাকা জরুরী। এটা কোন বিলাসিতা বা বিনোদন নয়; বরং খাঁটি দ্বীনী প্রয়োজন। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বলছি যে, মসজিদের পরে দ্বিতীয় নম্বর জরুরী বিষয় এটাই।
সত্য কথা বলতে কি, মসজিদের পৃষ্ঠপোষক এই মাদরাসাগুলোই। মাদরাসা না থাকলে ইমাম কোথায় পাবেন? দ্বীনী কথা, মাসআলা-মাসায়েল কে শোনাবে? পাঁচ ওয়াক্ত নামায কোন রকম পড়িয়ে দেওয়ার মত কোন ইমাম হয়তো পাওয়া গেল, কিন্তু জুমুআর কী হবে? তারপরে মাসআলা জিজ্ঞেস করতে কার নিকট যাবেন? সুতরাং এই মাদরাসাগুলো প্রকৃতপক্ষে মসজিদের জন্য রক্ষাকবচ, মসজিদের পুষ্টি সরবরাহকারী।
📄 মাদরাসার শিক্ষা সমাপনকারীদের দায়িত্ব
আমি আলোচনার শুরুতে আয়াত পড়েছিলাম— 'ওয়া মা কানাল মুমিনুনা লিয়ানফিরু কাফফাহ'। 'এটা তো হতে পারে না অর্থাৎ এটা তো প্রায় অসম্ভব ও অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার যে, সব মুসলমান সব কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে দ্বীন শিখতে বের হয়ে যাবে। দোকানে কেউ বসবে না, বেচাকেনার লোক থাকবে না, কোন প্রয়োজন পূরণের মত কেউ থাকবে না, মনে হবে যে, শহরের সকল বাসিন্দা মাদরাসার তালিবুল ইলম হয়ে শহর ছেড়ে চলে গেছে— এটা হতে পারে না। আল্লাহ এরূপ নির্দেশ দেন না, বান্দার নিকট এরূপ অস্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টির দাবিও তিনি করেন না। আল্লাহ তাআলা আয়াতাংশটুকুতে বলছেন— এটা তো সম্ভব নয় যে, মুমিনরা সবাই ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাবে, তবে 'ফালাও লা নাফারা মিন কুল্লি ফিরকাতিম মিনহুম তায়িফাতুল লিয়াতাফাক্কাহু ফিদ দীন'— এরূপ কেন হয় না যে, প্রত্যেক দল থেকে কিছু লোক বের হয়ে যাবে, যাতে তারা দ্বীন শেখে, দ্বীনের বুঝ অর্জন করে, দ্বীনের বিধি-বিধান ও মাসআলা-মাসায়েলের জ্ঞান অর্জন করে?
'অয়ালিয়ুনযিরু কাওমাহুম ইযা রাজাঊ ইলাইহিম' এবং ঘরে ফিরে নিজ নিজ এলাকায় হেদায়েতের কাজ করে, ওয়াজ-নসীহত এবং মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনের কাজ করে? সঙ্গে সঙ্গে তারা তাদেরকে সমূহ বিভ্রান্তি ও সর্বনাশ থেকে রক্ষা করবে। শিরকের সর্বনাশ থেকে কুফরের সর্বনাশা ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে। যে সকল আকীদা-বিশ্বাস ও রসম-রেওয়াজ দ্বারা মানুষ ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়, ইসলামের সীমারেখা অতিক্রম করে যায়, সে আর মুসলমান বলে গণ্য হয় না সেসব থেকে তাদেরকে রক্ষা করবে। কেননা কোন কোন আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড দ্বারা মানুষের ধ্বংস সাধন হয়, সে মুরতাদ হয়ে যায়।
'অয়ালিয়ুনযিরু কাওমাহুম ইযা রাজাঊ ইলাইহিম' আয়াতাংশের দাবি একমাত্র আলেমই পূরণ করতে পারে। যদি কোন স্থানে কোন শহর বা গ্রামে মুসলমানদের বসতি থাকে, বাণিজ্য কেন্দ্রও থাকে, মুসলমান সেখানে আরাম ও সুখময় জীবন যাপন করে অথচ একটি মাদরাসাও না থাকে, প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় সাধারণ সাধারণ মাসআলা বলার মত যোগ্য লোকও না থাকে, তবে শহরবাসী ও গ্রামবাসী সকলেই গোনাহগার হবে। ফরযে কেফায়ার অর্থ এটাই। আল্লাহর নিকট জবাবদিহী করতে হবে। তিনি জিজ্ঞেস করতে পারেন, এত বড় শহরে তোমাদের কারও কি সুযোগ হল না একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার? মাদরাসা প্রতিষ্ঠা তাহাজ্জুদ নামাযের মত নয় যে, যেহেতু এটা ফরয নয়, কাজেই কেউ আদায় করলে লোকে মনে করে যে, লোকটা ভাল কাজ করল, আদায় না করলেও এ ব্যাপারে কেউ কাউকে খারাপ চোখে দেখে না।
মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি এ রকম নয় যে, তা প্রতিষ্ঠা করলে ভাল, না করলে কোন ক্ষতি নেই। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা একটি বুনিয়াদী ও মৌলিক কাজ, এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মাদরাসা আপনার ঘাড়ের মোটা শিরার ন্যায়, যা ছিন্ন হলে আপনার মৃত্যু অনিবার্য। যা হলেই নয় অন্তত এতটুকু দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ স্ব-স্ব অঞ্চলে আপনাদের প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য। আপনার এলাকায় দ্বীনী শিক্ষাপ্রাপ্ত এরূপ আলেম থাকা জরুরী, যিনি প্রয়োজন হলে দ্বীনী মাসআলা বলতে পারবেন। মুসলমানদের সঙ্কটের মুখে, যখন মুসলমানদের সামনে হালাল-হারাম ও কুফর ও ঈমানের প্রশ্ন আসে তখন যেন তিনি তাঁদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করতে পারেন। বলতে পারেন, এটা হালাল ওটা হারাম, এটা করলে তুমি ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে, ওটা করলে তুমি খাঁটি মুমিন ও মুসলমান হিসাবে গণ্য হবে।
📄 জনসাধারণের দায়িত্ব
মাদরাসা প্রতিষ্ঠার অর্থ এই নয় যে, আমরা মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করে দিলাম, আমাদের এক দায়িত্ব আমরা পালন করে ফেললাম আর আপনাদের কোন দায়িত্ব নেই। আমরা তো আপনাদের পক্ষ থেকে ভিত্তি স্থাপন করব, যেন আপনাদের হাতেই তা হবে। যেহেতু আপনারা সকলেই হাত লাগাতে পারবেন না সেহেতু আপনাদের পক্ষ থেকে আমরা আপনাদের প্রতিনিধিত্ব করব। এই সূচনার পর আপনাদের উপর দায়িত্ব বর্তায় মাদরাসার উন্নয়নের। এরপর অবশিষ্ট থাকে শিক্ষক নির্বাচনের বিষয়, সিলেবাস ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণের বিষয়, পরামর্শের বিষয়। এসবের জন্য আমরা আপনাদের আহ্বানে সাড়া দিতে সদা প্রস্তুত। আপনাদের শুকরিয়া আদায় করা উচিত। কেননা, আলেমগণ আপনাদের পক্ষ থেকে আপনাদের দায়িত্ব অনেকটাই আদায় করে দিচ্ছেন এবং দ্বীনী ও জাতীয় অবহেলার বিপদ থেকে আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে রক্ষা করছেন। এই মাদরাসাগুলো প্রতিষ্ঠিত না হলে আল্লাহ তাআলার নিকট অবশ্যই আপনাদেরকে জবাবদিহী করতে হবে।
📄 স্কুলসমূহের শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ
একথাও মনে রাখা উচিত— যে সকল সন্তান স্কুলে লেখাপড়া করছে তাদের জন্যও দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ আপনাদের উপর ফরয। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— ‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানু কু আনফুসাকুম ওয়া আহলিকুম নারা’ (হে মুমিনগণ। তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের ঘরের সদস্যদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর)। (সূরা তাহরীম ৬)
সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের জন্য দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ আপনাদের উপর ফরয। ভাল কোন মৌলভী সাহেবকে গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করতে পারেন। মোটকথা স্কুল পড়ুয়া সন্তানদের দ্বীন ও ঈমান হেফাযতের জন্য কোন ব্যবস্থা আপনাদের করা উচিত। এমনিতে তো আরও অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় আছে। উদাহরণত আমরা এই গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যালঘিষ্ঠ। এখানে নানা রকম আন্দোলন ও কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে, ফলে অবস্থা ও পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। নানা রকম সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে আসছে। এই প্রেক্ষিতে আমরা যেন আমাদের জীবন ও মান রক্ষা করতে পারি, আমাদের দ্বীন রক্ষা করে চলতে পারি সেজন্য বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। সে সব বিষয়েও আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমি এখন ঐ দিকে যাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি নির্ভেজাল দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে। আপনাদের জন্য আবশ্যক ও ফরয মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা এবং তার সার্বিক উন্নতি সাধনের চেষ্টা করা এবং মাদরাসাকে এরূপ শীর্ষ সোপানে উন্নীত করা, যাতে মাদরাসাটি এক বিশাল এলাকা ও অঞ্চলের জন্য কেন্দ্রীয় মাদরাসায় পরিণত হয়। সেই সঙ্গে নিজের সন্তানদেরকে মাতৃভাষার শিক্ষাদান, দ্বীনী শিক্ষা প্রদান, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত মুবারক, সাহাবায়ে কেরামের জীবন চরিত এবং আল্লাহওয়ালাদের জীবন চরিত সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিফহাল করানো এবং তাওহীদ ও শিরকের পার্থক্য, ঈমান ও কুফরের পার্থক্য সম্পর্কে তাদেরকে জ্ঞানদান করা অত্যন্ত জরুরী।
আর যারা বয়স্ক তাদের নিজেদের দ্বীনী অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে, দ্বীনী প্রেরণা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এবং দ্বীনের ব্যাপারে দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তাবলীগ জামাতের সাথে সম্পর্ক রাখা জরুরী। তাবলীগ জামাতের ইজতেমাগুলোতে শরীক হওয়া, মাঝে মাঝে সময় দেওয়া এবং দ্বীনী কিতাবাদি পাঠ করা নেহায়েত জরুরী। নতুবা যে দেশে (ভারত) আমরা বসবাস করি এবং যে মহা সংকটের যুগে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রেরণ করেছেন আমাদের ঈমান ও দ্বীন রক্ষা করা এবং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করা সুকঠিন হয়ে পড়বে। এই দেশে এবং এই যুগে সর্বদা সতর্কতার সাথে পথচলা আবশ্যক। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং চতুর্দিকে সতর্ক ও গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার প্রয়োজন খুব বেশি। জীবনের ধারা থেকে পৃথক থাকার পরিণাম বড় ভয়াবহ। মুসলমান যদি নিজ পরিবেশ ও নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ খোলসে বন্দী হয়ে থাকে এবং খেয়াল-খুশি অনুযায়ী বিলাসী ও সুখী জীবন যাপনে ব্যস্ত থাকে আর মনে করতে থাকে যে, যা কিছু হয় হোক; আমরা তো নামায-রোযা আদায় করছি, তাহলে এই দেশে মুসলমানদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। সদা সতর্ক থাকুন। নিঃস্বার্থ ও শুভাকাঙ্ক্ষী পথ প্রদর্শক আলেমগণের কথা মেনে চলুন। তাঁরা শুধু তাঁদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা বিবেচনা করে নিজেদেরকে ধন্য মনে করে থাকেন এবং তাঁরা শুধু এই চিন্তাতেই বিভোর থাকেন যে, তাঁদের প্রতি ন্যস্ত সমাজের আমানত কীভাবে তাঁরা আদায় করবেন। দুনিয়ার কোন মোহ তাঁদেরকে স্পর্শ করেনা। অতএব তাঁদের পরামর্শ গভীর মনোযোগের সাথে শুনুন এবং মানতে থাকুন। এই দেশে সদা-সর্বদা নিজের চোখ খোলা রাখুন এবং দেখতে থাকুন কী হয়, কোন পরিস্থিতি এরূপ সৃষ্টি হয় কি-না যার কারণে আমরা বা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মুসলমান হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিষয়টিকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখুন। এখানেই শেষ করছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের মূল্য বোঝার তাওফীক দিন। আমীন!
ওয়া আখিরু দাওয়া না আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।