📘 উলামা তলাবা > 📄 ইসলামের সঙ্গে ইলম ও জ্ঞানের সম্পর্ক

📄 ইসলামের সঙ্গে ইলম ও জ্ঞানের সম্পর্ক


আমার প্রিয় ভাই ও বন্ধু সকল! ইসলামের সাথে ইলমের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। ইলম ব্যতীত ইসলাম টিকে থাকতে পারে না। বাস্তবতা হল, ইলমও ইসলাম ব্যতীত টিকতে পারে না, তবে এর বিশদ ব্যাখ্যা অন্য কোন মজলিসে হতে পারে। এখানে যা বলতে চাচ্ছি তা হল, ঐ ইলম বা জ্ঞান ইলমই নয়, যা ওহীর তত্ত্বাবধান, ওহীর দিক-নির্দেশনা হতে বিচ্ছিন্ন, যা ওহী ও ইলমে নবুওয়াতের হাত ধরে পরিচালিত হয় না এবং যে ইলম ও জ্ঞানের উপর ওহীর সত্যায়ন-সীলমোহর নাই। যে জ্ঞান ও ইলম আল্লাহ তাআলা কর্তৃক প্রেরিত ও নাযিলকৃত কিতাবের জ্ঞান নয়, যে জ্ঞান তাঁর কিতাবের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে নেই সেই জ্ঞান জ্ঞানই নয়, সেই ইলম ইলমই নয়।

'ইলমে কে রাহে হাক্ক না নামায়াদ জাহালাত আসত' (যে ইলম আল্লাহর পথ দেখায় না তা অজ্ঞতা, ইলম নয়)।

📘 উলামা তলাবা > 📄 প্রথম ওহীতে ইলম ও কলমের উল্লেখ

📄 প্রথম ওহীতে ইলম ও কলমের উল্লেখ


ছয় শত বৎসরের অধিক কাল যাবৎ বিচ্ছিন্ন থাকার পর আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে সম্পর্ক স্থাপিত হল। সে সম্পর্ক ছিল পৃথিবীর পক্ষ থেকে কিছু গ্রহণের জন্য আর আকাশের পক্ষ থেকে কিছু দানের জন্য। দুই হারানো বন্ধু যখন দীর্ঘ বিরহের পর মিলনের সৌভাগ্য লাভ করে তখন তাদের মাঝে কত কথাই না হয়, কত অনুযোগ, কত অভিযোগই না উভয়ের হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়, কত কাহিনী একে অপরকে শোনায়। কিন্তু গারে হেরায় ওহী অবতরণকালে আকাশ ও পৃথিবীর সেই মিলনে আকাশ থেকে ঐ নবীকে, যাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিল আল্লাহর সঙ্গে পৃথিবীবাসীর সম্পর্ক জুড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, যে ওহী, যে প্রথম বার্তা দেওয়া হল তা ছিল 'ইকরা' (পাঠ কর)। এ দ্বারাই ইলম ও কলমের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব ও বিশালত্ব আপনারা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন আশা করি। শেখ সাদী (রহ.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেছিলেন— 'কুতুব খানা চান্দ মিল্লাত বিশুশত' (তিনি একাধিক জাতির গ্রন্থাগার ধৌত করে পরিষ্কার করে ফেলেছিলেন)। তিনি ধৌত করে পরিষ্কার করেছেন যত গ্রন্থাগার, প্রতিষ্ঠা করেছেন তদপেক্ষা অধিক গ্রন্থাগার। তিনি ধৌত করেছিলেন সেগুলোকেই যেগুলোকে ধৌত করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ধৌত করে পৃথিবীবাসীকে তিনি দিলেন কী? দিলেন নূর, দিলেন ইয়াকীন ও বিশ্বাস, আল্লাহ তাআলার বিশুদ্ধ পরিচয়। মানুষকে বানালেন প্রকৃত মানুষ। বানালেন মূর্খতা ও অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত বরং বলা চলে পশু অপেক্ষা অধম মানুষগুলোকে পৃথিবীবাসীর শিক্ষক। কবি আকবর ইলাহাবাদীর ভাষায়—

জো না থে খুদ রাহ পার গায়রোঁ কে হাদী বন গায়ে
কিয়া নাযার থি জিস নে মুর্দোঁ কো মাসীহা কর দিয়া

'নিজেই ছিল না যে সঠিক পথে, অন্যদের জন্য সে হয়ে গেল পথ প্রদর্শক। কী ছিল সেই দৃষ্টি যা মৃতকে পরিণত করেছিল মৃতসঞ্জীবনী সত্ত্বায়।'

পৃথিবীর অন্য কোন জাতি ইলম ও জ্ঞানের প্রতি নিরাসক্ত থাকতে পারে, জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা তাদের নাও থাকতে পারে; তারা বলতে পারে জ্ঞানার্জন না করলে আমাদের কোন ক্ষতি নেই। আমাদের উপর ফরয, ওয়াজিব কিছুই নাই। অতএব শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের এবং আমাদের সন্তানদের শিক্ষা দানের ব্যবস্থা গ্রহণের কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। কিন্তু কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমান যেখানেই বসবাস করুক, মক্কা-মদীনা বা যে কোন পবিত্র স্থানে বসবাস করুন, কিংবা আরব উপদ্বীপের যেখানেই বাস করুক, কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা, হিন্দুস্তানে বসবাস করুক, শহরে বাস করুক কিংবা গ্রামে, যেখানেই চার ঘর মুসলমান বাস করুক বরং যেখানে চারজন মুসলমান বাস করুক সেখানেই তাদের জন্য জরুরী তালীম ও তাআল্লুম তথা শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণ। এটা হাসপাতাল, কল-কারখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা অপেক্ষাও জরুরী। আপনাদের দোকান অপেক্ষা জরুরী। কারণ এগুলোর কোনটিকে প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে নির্দেশ দান করেননি। আল্লাহ তাআলা এই নির্দেশ দান করেননি যে, তোমরা ব্যবসা কর, উপার্জন কর। বলেননি যে, এগুলো শক্তি-সামর্থ্যের উপাদান, দ্বীনকে বিজয়ী করতে পর্যাপ্ত সম্পদ সঞ্চিত কর, টাকা-পয়সার প্রবাহ বৃদ্ধি কর। যা বলেছেন তা হল ‘ইকরা’। 'পাঠ কর'। এখন বলুন জ্ঞানের ও ইলমের মর্যাদা কত বিশাল!

এক ধরনের জ্ঞান ও ইলম আছে যাকে ইলমে লাদুন্নী বলা হয়। আল্লাহ তাআলা কোন কোন ব্যক্তির হৃদয়দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। ব্যক্তিটি তখন পরিণত হয় জ্ঞানের ভাণ্ডারে। তার মুখ থেকে তখন মূল্যবান সব জ্ঞানের কথা বের হতে থাকে। এই ব্যক্তি নিশ্চয়ই সৌভাগ্যবান, আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। আমরা তাকে আমাদের নিজেদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে মেনে নেব। তাঁর ছায়া আমাদের কারও উপর পড়লে সে সোনার মানুষে পরিণত হবে। এই সবই অনস্বীকার্য। কিন্তু তারপরও ‘ইকরা’-এর আবেদন যথাস্থানেই থাকবে। কারণ ইলমে লাদুন্নীর অধিকারী ব্যক্তিদেরও প্রয়োজন হবে আলেমের নিকট মাসআলা জিজ্ঞেস করার। ‘ইকরা’-এর আবেদন নবীয়ে উম্মী থেকে শুরু করে এই উম্মতের শেষ উম্মী পর্যন্তই একইভাবে অব্যাহত থাকবে। পৃথিবীতে যতই বিপ্লব ঘটে যাক, রাজা-বাদশাহ ও কর্তৃত্ব বদল হোক, যতই সভ্যতার পরিবর্তন হোক, সভ্যতার যতই বিকাশ ঘটুক, ভাষার পরিবর্তন ঘটুক, মহাবিপ্লবই ঘটে যাক না কেন, শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের ধারা অব্যাহত থাকবে, থাকতে হবে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 কুরআন সংরক্ষিত হওয়ার অর্থ

📄 কুরআন সংরক্ষিত হওয়ার অর্থ


আল্লাহ তাআলা কোন গ্রন্থ ও ভাষা সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। কিন্তু কুরআনে কারীম সংরক্ষণের দায়িত্ব তিনি নিজেই গ্রহণ করেছেন বলে ঘোষণা করেছেন। তবে সংরক্ষিত থাকার অর্থ এই নয় যে, ব্যস কুরআনে কারীম থাকবে কিন্তু তাকে কেউ বুঝবে না, অপরকে বুঝাবে না। সংরক্ষিত থাকার জন্য কুরআন বুঝার লোক থাকতে হবে, অপরকে বুঝানোর লোক থাকতে হবে এবং কুরআন যেহেতু একটি ভাষায় নাযিল হয়েছে সুতরাং সে ভাষাও সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। অতএব কুরআন সংরক্ষিত থাকার সঙ্গে সঙ্গে কুরআনের ভাষা আরবীও সংরক্ষিত থাকবে। পৃথিবীর বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু শরীয়তে ইলাহীর আরবী ভাষা আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে আছে। সুতরাং প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য ফরয যথাসাধ্য দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ। মাসআলা বলার মত উপযুক্ত একজন আলেম বিদ্যমান থাকাই শুধু যথেষ্ট নয়; বরং ঐরূপ আলেম তৈরি করার ধারা অব্যাহত থাকা জরুরী এবং এই ধারা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা গ্রহণও মুসলমানদের জন্য ফরয। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা এবং তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হওয়ার ধারা অব্যাহত থাকা জরুরী। এটা কোন বিলাসিতা বা বিনোদন নয়; বরং খাঁটি দ্বীনী প্রয়োজন। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বলছি যে, মসজিদের পরে দ্বিতীয় নম্বর জরুরী বিষয় এটাই।

সত্য কথা বলতে কি, মসজিদের পৃষ্ঠপোষক এই মাদরাসাগুলোই। মাদরাসা না থাকলে ইমাম কোথায় পাবেন? দ্বীনী কথা, মাসআলা-মাসায়েল কে শোনাবে? পাঁচ ওয়াক্ত নামায কোন রকম পড়িয়ে দেওয়ার মত কোন ইমাম হয়তো পাওয়া গেল, কিন্তু জুমুআর কী হবে? তারপরে মাসআলা জিজ্ঞেস করতে কার নিকট যাবেন? সুতরাং এই মাদরাসাগুলো প্রকৃতপক্ষে মসজিদের জন্য রক্ষাকবচ, মসজিদের পুষ্টি সরবরাহকারী।

📘 উলামা তলাবা > 📄 মাদরাসার শিক্ষা সমাপনকারীদের দায়িত্ব

📄 মাদরাসার শিক্ষা সমাপনকারীদের দায়িত্ব


আমি আলোচনার শুরুতে আয়াত পড়েছিলাম— 'ওয়া মা কানাল মুমিনুনা লিয়ানফিরু কাফফাহ'। 'এটা তো হতে পারে না অর্থাৎ এটা তো প্রায় অসম্ভব ও অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার যে, সব মুসলমান সব কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে দ্বীন শিখতে বের হয়ে যাবে। দোকানে কেউ বসবে না, বেচাকেনার লোক থাকবে না, কোন প্রয়োজন পূরণের মত কেউ থাকবে না, মনে হবে যে, শহরের সকল বাসিন্দা মাদরাসার তালিবুল ইলম হয়ে শহর ছেড়ে চলে গেছে— এটা হতে পারে না। আল্লাহ এরূপ নির্দেশ দেন না, বান্দার নিকট এরূপ অস্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টির দাবিও তিনি করেন না। আল্লাহ তাআলা আয়াতাংশটুকুতে বলছেন— এটা তো সম্ভব নয় যে, মুমিনরা সবাই ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাবে, তবে 'ফালাও লা নাফারা মিন কুল্লি ফিরকাতিম মিনহুম তায়িফাতুল লিয়াতাফাক্কাহু ফিদ দীন'— এরূপ কেন হয় না যে, প্রত্যেক দল থেকে কিছু লোক বের হয়ে যাবে, যাতে তারা দ্বীন শেখে, দ্বীনের বুঝ অর্জন করে, দ্বীনের বিধি-বিধান ও মাসআলা-মাসায়েলের জ্ঞান অর্জন করে?

'অয়ালিয়ুনযিরু কাওমাহুম ইযা রাজাঊ ইলাইহিম' এবং ঘরে ফিরে নিজ নিজ এলাকায় হেদায়েতের কাজ করে, ওয়াজ-নসীহত এবং মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনের কাজ করে? সঙ্গে সঙ্গে তারা তাদেরকে সমূহ বিভ্রান্তি ও সর্বনাশ থেকে রক্ষা করবে। শিরকের সর্বনাশ থেকে কুফরের সর্বনাশা ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে। যে সকল আকীদা-বিশ্বাস ও রসম-রেওয়াজ দ্বারা মানুষ ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়, ইসলামের সীমারেখা অতিক্রম করে যায়, সে আর মুসলমান বলে গণ্য হয় না সেসব থেকে তাদেরকে রক্ষা করবে। কেননা কোন কোন আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড দ্বারা মানুষের ধ্বংস সাধন হয়, সে মুরতাদ হয়ে যায়।

'অয়ালিয়ুনযিরু কাওমাহুম ইযা রাজাঊ ইলাইহিম' আয়াতাংশের দাবি একমাত্র আলেমই পূরণ করতে পারে। যদি কোন স্থানে কোন শহর বা গ্রামে মুসলমানদের বসতি থাকে, বাণিজ্য কেন্দ্রও থাকে, মুসলমান সেখানে আরাম ও সুখময় জীবন যাপন করে অথচ একটি মাদরাসাও না থাকে, প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় সাধারণ সাধারণ মাসআলা বলার মত যোগ্য লোকও না থাকে, তবে শহরবাসী ও গ্রামবাসী সকলেই গোনাহগার হবে। ফরযে কেফায়ার অর্থ এটাই। আল্লাহর নিকট জবাবদিহী করতে হবে। তিনি জিজ্ঞেস করতে পারেন, এত বড় শহরে তোমাদের কারও কি সুযোগ হল না একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার? মাদরাসা প্রতিষ্ঠা তাহাজ্জুদ নামাযের মত নয় যে, যেহেতু এটা ফরয নয়, কাজেই কেউ আদায় করলে লোকে মনে করে যে, লোকটা ভাল কাজ করল, আদায় না করলেও এ ব্যাপারে কেউ কাউকে খারাপ চোখে দেখে না।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি এ রকম নয় যে, তা প্রতিষ্ঠা করলে ভাল, না করলে কোন ক্ষতি নেই। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা একটি বুনিয়াদী ও মৌলিক কাজ, এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মাদরাসা আপনার ঘাড়ের মোটা শিরার ন্যায়, যা ছিন্ন হলে আপনার মৃত্যু অনিবার্য। যা হলেই নয় অন্তত এতটুকু দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ স্ব-স্ব অঞ্চলে আপনাদের প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য। আপনার এলাকায় দ্বীনী শিক্ষাপ্রাপ্ত এরূপ আলেম থাকা জরুরী, যিনি প্রয়োজন হলে দ্বীনী মাসআলা বলতে পারবেন। মুসলমানদের সঙ্কটের মুখে, যখন মুসলমানদের সামনে হালাল-হারাম ও কুফর ও ঈমানের প্রশ্ন আসে তখন যেন তিনি তাঁদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করতে পারেন। বলতে পারেন, এটা হালাল ওটা হারাম, এটা করলে তুমি ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে, ওটা করলে তুমি খাঁটি মুমিন ও মুসলমান হিসাবে গণ্য হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00