📄 ফয়েষ ও বরকত মৃতদের দ্বারাও লাভ হয় কিন্তু দিক-নির্দেশনার কাজটি হয় শুধু জীবনের অধিকারীদের দ্বারাই
অন্য কারও মুখে শুনলে হয়তো আপনারা মনে করবেন লোকটি ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, ইতিহাসের প্রতি সে অবিচার করছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান ও চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রের সাথে আমার সম্পর্ক সেই প্রতিষ্ঠানটি ইসলামের ইতিহাস সংকলনের কাজ করেছে। যে প্রতিষ্ঠানটি সর্বপ্রথম উর্দু ভাষায় ইসলামের ইতিহাস রচনার সৌভাগ্য লাভ করেছে সেই প্রতিষ্ঠান তথা 'দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা' ও 'দারুল মুসান্নিফীন' এর সাথে আমার সম্পর্ক। অতএব আমার মুখ থেকে শুনুন। আমাদের আসলাফ ও পূর্বসূরীদের জীবন ও কর্ম সংরক্ষিত হওয়া উচিত। তাঁদের কীর্তিগুলোকে অনুসন্ধান করে করে লিপিবদ্ধ করে রাখা উচিত এবং নতুন প্রজন্মকে এর সাথে পরিচিত করে তোলা উচিত। বিষয়টি অনস্বীকার্য। কিন্তু এই দ্বীনের জন্য আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত হল, এই দ্বীন কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে। অতএব এর জন্য প্রয়োজন জীবন্ত ব্যক্তিদের। রূহানিয়াত ও আত্মিক উৎকর্ষও লাভ হয় জীবিত ব্যক্তিদের দ্বারা। গবেষক সুফী ও মাশায়েখগণের সুচিন্তিত অভিমতও এটাই যে, তাযকিয়া ও হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা, ইলমে বাতেন ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান জীবিত ব্যক্তিদের নিকট থেকেই অর্জন করা যায়। তাদের নিকট থেকেই এই পথে চরম সফলতা লাভ হয়। নতুবা একজন মৃত ব্যক্তিই যথেষ্ট হত। কেননা এরূপ একাধিক ব্যক্তি অতিক্রান্ত হয়েছে যাদের মধ্য থেকে একজনই যথেষ্ট হওয়ার মত উচ্চমানসম্পন্ন ছিল। কিন্তু সুফীগণ বলেন যে, জীবনের মধ্যে রয়েছে চলমানতা ও বর্ধিষ্ণুতা। জীবনে রয়েছে বৈচিত্র্য। এক রূহ থেকে অপর রূপে, এক রঙ থেকে অপর রঙে পরিবর্তন জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এক ব্যাধি নিরাময় হল তো আরেক ব্যাধির আক্রমণ শুরু হল। অতএব সদা ব্যস্ত ও চলিষ্ণু এই জগতের সঙ্গে যাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, যিনি চলে গেছেন ওপারে তিনি এই পৃথিবীর জীবন্ত ও চলিষ্ণু মানবের জন্য দিক-নির্দেশনা দান করতে পারেন না। হাঁ ফয়েজ ও বরকত লাভের যে প্রক্রিয়া রয়েছে সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের থেকে ফয়েজ ও বরকত লাভ হতে পারে। সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু দিক-নির্দেশনা লাভ হতে পারে শুধু জীবনের অধিকারীদের দ্বারাই। কোন জাতির মাঝে সবকিছুই আছে— বিশালাকারের সব গ্রন্থাগার আছে, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক রয়েছে, কিন্তু জীবনের অধিকারী ঐ সকল ব্যক্তিত্ব নাই যাদের হৃদয়ের উত্তাপ থেকে ঐ জাতি উষ্ণতা হাসিল করতে পারে, যাদের চিন্তা-চেতনা ও গবেষণা থেকে, যাদের বিচক্ষণতা ও জ্ঞানের গভীরতা এবং দ্বীনের যথার্থ উপলব্ধি থেকে ঐ জাতি আলো গ্রহণ করতে পারে তবে ঐ জাতির ধ্বংসের আশঙ্কা যথেষ্ট রূপে বিদ্যমান।
📄 দ্বীন সর্বদা সজীব হতে থাকবে
সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে— ‘ইন্নাল্লাহা ইয়াবআসু আলা রা’সি কুল্লি মি’আতি সানাতিম মাই ইউজাদ্দিদু লিহাযিহিল উম্মাতি আমরা দ্বীনিহা’ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা প্রতি শতবর্ষে সংস্কারক প্রেরণ করেন, যিনি এই দ্বীনকে নবজীবন দান করেন এবং সংস্কারকের দায়িত্ব পালন করেন। এর অর্থ এই নয় যে, সংস্কারক তাঁর কালে দ্বীনের সংস্কার করে দ্বীনকে নবরূপে সজীব করে দেবেন। অতঃপর তাঁর তিরোধানের সঙ্গে সঙ্গে দ্বীন পুনরায় সংস্কার-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে। বরং অর্থ এই যে, দীর্ঘকাল পর্যন্ত সংস্কারকের প্রভাব বিদ্যমান থাকবে এবং দ্বীন বিশুদ্ধ রূপে টিকে থাকবে। আবার এক সময় সংস্কারকের প্রয়োজন পড়বে। ‘মাই ইউজাদ্দিদু লিহাযিহিল উম্মাতি আমরা দ্বীনিহা’—এর অর্থ এই নয় যে, সংস্কারক আসবেন আর এক সপ্তাহ কি দুই সপ্তাহ দ্বীনের চর্চা হবে অতঃপর তিনি চলে যাবেন। বরং অর্থ তা-ই যা একটু পূর্বে বললাম। সংস্কারকগণের যে কোন একজন সম্পর্কে অধ্যয়ন করুন। জানতে পারবেন যে, তাঁদের কারও কারও সংস্কারের প্রভাব শত বৎসর পর্যন্ত, কারও কারও সংস্কারের প্রভাব কয়েক শত বৎসর পর্যন্ত ছিল।
রেললাইন ঠিক আছে কিনা তা পরখ করার জন্য রেললাইনের উপর দিয়ে একটি ছোট্ট গাড়ি চলাচল করে। গাড়িটিকে বলা হয় ট্রলি। (কোন কোন ট্রলি হয় ইঞ্জিন চালিত, কোন কোনটি হয় ইঞ্জিনবিহীন ঠেলা ট্রলি।) এই ট্রলিকে দুইজন পিছন থেকে ঠেলতে থাকে, যখন তাতে গতি সৃষ্টি হয় তখন লোক দুইজন এর উপরে উঠে বসে। অতঃপর চলতে চলতে ট্রলির গতি যখন নিঃশেষ হওয়ার উপক্রম হয় লোক দুইজন আবার নামে এবং ট্রলিকে আবার ঠেলতে থাকে। গতি সৃষ্টি হলে আবার তারা তাতে উঠে বসে। এই উম্মতের অবস্থাও তদ্রূপ মনে করুন।
এই উম্মত ঐ ঠেলা ট্রলি সদৃশ। উলামা-মাশায়েখ এবং মুজাদ্দেদ ও সংস্কারক এই ঠেলা ট্রলিকে ঠেলে তাতে গতি সৃষ্টি করে দেন, ফলে তা নিজ চাকার উপর চলতে থাকে। তাঁরা সব সময়ই চালাতে থাকেন আর ঠেলতে থাকেন, তা নয়। গাড়ী নিজেই চলবে তার নিজের চাকার উপর ভর করে, কিন্তু তাতে গতি সৃষ্টি করার জন্য গতি সঞ্চারকারী, জীবনের অধিকারী, প্রাণচঞ্চল শক্তি-সামর্থসম্পন্ন ব্যক্তির প্রয়োজন। কেননা ট্রলির জন্য দুটো জিনিসের প্রয়োজন। এক. ট্রলির দেহ কাঠামো এরূপ হালকা-পাতলা হওয়া এবং তার চাকায় এরূপ চলন ক্ষমতা ও যোগ্যতা থাকা, যাতে দ্রুতগতিতে তা চলতে পারে। দুই. যারা ঠেলবে তাদের শরীর ও হাতে এরূপ শক্তি থাকা, যাতে তারা ট্রলিকে ঠেলে তাতে গতিসঞ্চার করতে পারে।
এই উম্মতের চিরন্তন রীতি এটাই যে, যখন এই উম্মত নিষ্ক্রিয় কি দুষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে তখন আল্লাহর কোন বান্দা আগমন করেন এবং এই উম্মতকে ধাক্কা দিতে থাকেন, ঠেলতে থাকেন। অতঃপর উম্মতের গাড়ি নিজেই চলতে থাকে এবং বেশ কিছুদূর পর্যন্ত তার গতি অব্যাহত থাকে। আমি মুজাদ্দেদে আলফেসানী (রহ.) ও শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) উভয়কে এই কালের মুজাদ্দেদ মনে করি। আমি মনে করি, এই যে বিভিন্ন স্থানে দ্বীনী ইলম বিদ্যমান, সুন্নাতের দাওয়াত বিদ্যমান, বিভিন্ন স্থানে যে শিরক ও বিদআত হতে পবিত্র থাকার আবেগ ও প্রচেষ্টা বিদ্যমান, শিরক ও বিদআতের প্রতি ঘৃণা বিদ্যমান তা এতদুভয়েরই সংগ্রাম ও সাধনার ফসল। দেখুন, একজন ব্যক্তি এই উম্মতের গাড়িকে এত জোরে ধাক্কা দিয়েছে যে, সাড়ে তিনশত বৎসর পর্যন্ত তা অবিরাম চলেছে। আল্লাহই ভাল জানেন আর কত দিন চলবে, এরপর আর কে জন্ম নেবেন এবং ধাক্কা দেবেন এবং আবার গাড়ি কতদূর চলবে? হযরত মুজাদ্দেদে আলফেসানী (রহ.)-এর একশ' দেড়শ বৎসর পরে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর পুরো বংশধর জন্ম নেয় এবং তাঁদের সংগ্রাম, সাধনা ও কর্ম-তৎপরতার প্রভাব প্রকাশ পায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে। আমি বলতে চাচ্ছি যে, মাদরাসা ও আলেম উলামাগণের দায়িত্ব হল এরূপ জীবন্ত ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করা।
📄 প্রতিটি শহরেই অভিজ্ঞ আলেম থাকা প্রয়োজন
প্রতিটি দেশে বরং প্রতিটি শহরেই অভিজ্ঞ আলেম থাকা উচিত, যিনি যথাসময়ে দ্বীনী ব্যাপারে মানুষকে সহায়তা করতে পারেন, দিক-নির্দেশনা দান করতে পারেন। কমপক্ষে সঠিক পথের অনুসারী কোন আলেমের নিকট প্রেরণ করতে পারেন। আমি নিজেও এই কাজ করি। কেউ গুরুত্বপূর্ণ কোন মাসআলা জিজ্ঞেস করতে আসলে আমি বলে দেই যে, আমাদের মাদরাসায় মুফতী সাহেব আছেন তাঁর নিকটে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন। কারণ ‘লি কুল্লি ফাননিন রিজালুন’ (প্রত্যেক শাস্ত্রের জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তি থাকে)। আল্লামা ইবনে হাযম সম্পর্কে ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন যে, তিনি সাফা ও মারওয়ার সায়ী করণকালে রমল ও ইজতিবা করতে হবে বলে লিখেছেন। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া অত্যন্ত আদবের সাথে লিখেছেন যে, আসলে আল্লামা ইবনে হাযম যেহেতু হজ্জ পালন করেননি তাই তাওয়াফ ও সায়ীর মাঝে তাঁর বিভ্রম ঘটে গেছে। যাক এটা তো ভিন্ন বিষয়।
কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনি যদি পূর্বসূরী আকাবিরগণের তালিকা প্রদান করতে থাকেন আর বলেন যে, আমাদের পূর্বসূরী আকাবিরদের মাঝে এইরূপ আর ঐরূপ ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছেন তবে তার উদাহরণ হবে এইরূপ যে, কোন পিপাসার্ত ব্যক্তি আপনার নিকট পানি প্রার্থনা করল আর আপনি তাকে বলতে থাকলেন, পৃথিবীতে এইরূপ উচ্চমানের আইসক্রিম প্রস্তুত হয়েছে, এইরূপ সুপেয় মজাদার পানীয় আবিষ্কৃত হয়েছে ইত্যাদি। ভাই, এসব পানীয়ের নাম উল্লেখ এবং সেগুলোর গুণমান বর্ণনা করে কী লাভ হবে? তার তো প্রয়োজন পানির। আপনি যখন তাকে পানি দিবেন তখনই তার পিপাসা নিবারিত হবে নতুবা নয়। তা সেই পানি আপনি কাঁচের গ্লাসেই দেন অথবা মাটির কোন পাত্রেই দেন।
📄 শূন্যস্থান পূরণের জন্য প্রয়োজন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তির
জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিদ্যার এবং কোন জাতির অবক্ষয় এভাবেই ঘটেছে যে, যখন উপযুক্ত কোন ব্যক্তি বিদায় গ্রহণ করেছে তখন তার শূন্যস্থান পূরণের জন্য কেউ সৃষ্টি হয়নি। বর্তমানে এই আশঙ্কাই সৃষ্টি হয়েছে। কারণ যিনি বিদায় গ্রহণ করছেন তাঁর শূন্যস্থান পূরণ হচ্ছে না। আপনাদের নিকট কী বলব। বলতেও বুক ফেটে যায়। হিন্দুস্তানে মারাত্মক শূন্যতা অনুভূত হচ্ছে। কোন মাদরাসায় শায়খুল হাদীসের প্রয়োজন কিন্তু শায়খুল হাদীস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও উসূলে ফিকহ পড়ানোর জন্য যোগ্য উস্তাদের প্রয়োজন কিন্তু তা পাওয়া যাচ্ছে না। কোন আল্লাহর বান্দা হয়তো আল্লাহর নিকট চলে গেছেন, কেউ হয়তো অন্য মাদরাসায় চলে গেছেন। আমাদের জন্য ফলাফল একই। যিনি চলে গেছেন তাঁর শূন্যস্থান পূরণের কেউ নেই। আমার বক্তব্যের সারকথা হল, শূন্যস্থান পূরণ হওয়া উচিত।
আর এর জন্য প্রয়োজন কিছু নিবেদিতপ্রাণ উৎসাহী ব্যক্তির। যদি আপনারা চান, হাদীস শাস্ত্রে কিছু অভিজ্ঞ আলেম তৈরি হোক, ফিকহ শাস্ত্রে কিছু অভিজ্ঞ আলেম তৈরি হোক তাহলে রক্ত পানি করার প্রয়োজন। দুঃখের বিষয়, মাদরাসাসমূহে বর্তমানে এই বিষয়টিরই নিদারুণ অভাব। মাদরাসাগুলোতে সবকিছুই আছে কিন্তু সেই মেহনত, সেই অক্লান্ত পরিশ্রম আর নাই। ইউরোপ যে পার্থিব উন্নতির উচ্চশিখরে আরোহণ করেছে তার পিছনে এই মেহনত ও পরিশ্রমেরই ভূমিকা রয়েছে। তারা তাদের পথে চূড়ান্ত মেহনতে লিপ্ত। আমি বহু ঘটনা শুনেছি যে, তাদের কোন কোন গবেষণাকর্মে গবেষকরা এমনভাবে তাদের গবেষণায় লিপ্ত ছিল যে, রাত দূরীভূত হয়ে কখন ভোর হয়েছে, আবার কখন দিনের শেষে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, তাদের খবরও ছিল না।
আমার পরিচিত একজন জার্মানী গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কখন কাজ শুরু কর, তোমার এই প্রতিষ্ঠান কখন খোলে? সে বলল, আমি এখনই বলছি। অতঃপর সে ভিতরে গেল এবং একজনকে জিজ্ঞেস করল, আমার বিভাগটা কখন খোলে? লোকটি বলল, এতটার সময়ে। সে এসে আমার পরিচিত লোকটাকে তখন জানাল যে, এতটার সময়ে খোলে। আমার পরিচিত লোকটা তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার প্রতিষ্ঠান ও শাখা কখন খোলে তা আপনি নিজে না বলে অন্যকে জিজ্ঞেস করে বললেন কেন? সে উত্তরে বলল, কারণ, খোলার সঠিক সময়টা আমার জানা নাই। এত ভোরে আমি চলে আসি যে, আমার কোন হুঁশ থাকে না এবং ঘড়িও দেখি না। কাজের প্রতি তার একনিষ্ঠতা এরূপই।