📄 গোঁড়ামী ও হঠকারিতা পরিহার করা উচিত
ভাষা ও সংস্কৃতিগত বিভেদ ও তজ্জনিত গোঁড়ামী ও হঠকারিতা এবং প্রদেশ ভিত্তিক আঞ্চলিকতা ও তজ্জনিত গোঁড়ামী ও হঠকারিতাও এই দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই হঠকারিতাই বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এই জাতীয় অন্ধ ভাষাপ্রীতি ও প্রদেশপ্রীতির বিরুদ্ধে আলেমগণের উচিত সোচ্চার হওয়া এবং এতদসম্পর্কে ইসলামী নীতিমালা ও আদর্শ প্রচার করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন— ‘মান তাআযযা আলাইকুম বিআযায়িল জাহিলিয়্যাতি ফাআযযুহু বিহান আবীহি ওয়া লা তাকনু’— নবীর যে পবিত্র মুখে কুরআন উচ্চারিত হত, সারা পৃথিবী যে পবিত্র মুখের মাধ্যমে কুরআন শ্রবণ করেছে, যে মুখ হতে কখনও কোন অনুচিত কথা কি বাক্য নির্গত হয়নি সেই মুখ হতেই এই প্রথম এবং এই শেষ বারের মত এরূপ কঠিন ও রূঢ় বাক্য উচ্চারিত হল। তিনি যা বললেন, তার মর্মার্থ হল— যারা জাহেলী স্লোগান উচ্চারণ করে— অন্ধ বংশপ্রীতি ও গোষ্ঠীপ্রীতি যারা উস্কে দেয় তাদেরকে তাদের বাপ তুলে গালি দাও, ইঙ্গিতমূলক ভাষায় নয় বরং স্পষ্ট ভাষায়। আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! আল্লাহর রাসূলের যে মুখ হতে ফুল ঝরে পড়ত, মধু নিঃসৃত হত, যে মুখে কুরআন উচ্চারিত হত, যে মুখে ওহী ব্যতীত কিছু উচ্চারিত হত না— ‘মা ইয়ান্তিকু আনিল হাওয়া ইন হুওয়া ইল্লা ওয়াহইয়ুই ইয়ুহা’— অর্থ: সে মনগড়া কথা বলে না। এতো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। (সূরা নাজম, আয়াত ৩-৪) সে মুখ হতেই উচ্চারিত হল এরূপ কঠিন বাক্য। তিনি অন্য কোন বিষয়ে এরূপ শক্ত কথা বলেছেন বলে তো আমার স্মরণে পড়ে না। আপনাদের উচিত পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে গমন করা এবং প্রতিটি প্রদেশ হতে বালকদেরকে নিয়ে এসে শিক্ষাদান করে এরূপ আলেম তৈরি করা যাতে তাদের মধ্যে কোনরূপ মূঢ়তা ও অন্ধত্ব অবশিষ্ট না থাকে, তাদের মধ্যে বরং এর প্রতি ঘৃণা জন্ম নেয়। অতঃপর তাদেরকে স্ব-স্ব প্রদেশে প্রেরণ করতে হবে। অন্ধ প্রদেশপ্রীতি ও অন্ধ ভাষাপ্রীতির বিরুদ্ধে তারা হবে সোচ্চার ও প্রতিবাদী। জাহেলিয়াত প্রসূত এই ভাষা ও গোষ্ঠীপ্রীতিই বহু ইসলামী রাষ্ট্রকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে। এর ফলে বহু ইসলামী রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটেছে।
জনসাধারণের মাঝে আপনারা আপনাদের ভাষার যাদু এবং পাণ্ডিত্য হয়তো প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কাজের কাজটি হবে তখনই যখন আপনারা মানুষের জন্য হবেন আদর্শিক দৃষ্টান্ত, আপনাদের জীবনাচার হবে উন্নত, উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে আপনারা হবেন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। নির্মোহতা, আত্মমর্যাদাবোধ, অনন্যমুখাপেক্ষীতা ও আধ্যাত্মিকতায় আপনারা হবেন অনুসরণীয়। জ্ঞান ও চিন্তা-চেতনার দিক থেকেও এবং চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের দিক থেকেও প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। আমাদের পূর্বসূরীগণ এইরূপ ছিলেন, ঐরূপ ছিলেন— এই জপ অকার্যকর। কোন দ্বীন ও মিল্লাত, কোন সংস্কৃতি ও সভ্যতা এইরূপ জপ ও স্লোগান দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় বাস্তবানুগ কর্মসূচি গ্রহণের ও তা বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রামের। আমরা নিজেদের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনাকে ইতিহাস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। কিন্তু তা হবার নয়। জনসাধারণ কোন এক সময়ে বলবে, 'সাহেব! অনেক শুনেছি। শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। আপনাদের পূর্বসূরীগণ এইরূপ ছিলেন, ঐরূপ ছিলেন। আমার পিতা বাদশাহ ছিলেন, আমার পিতা তমুক ছিলেন। বলুন আপনি কী?' ইতিহাস তো অনেক শুনানো হয়েছে, গ্রন্থও অনেক লেখা হয়েছে। এখন প্রয়োজন কর্ম-তৎপরতার, ত্যাগ ও তিতিক্ষার, প্রয়োজন মনোযোগ আকর্ষণকারী ও যাদুকরী প্রাণের।
টিকাঃ
২. (পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকেরা উভয় পাকিস্তানের জন্য উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা দিয়ে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে আমাদের মুখ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, প্রতিবাদে সারা বাংলা গর্জে ওঠে। সালাম, বরকত সহ বেশ কিছু প্রাণ বাংলাভাষা রক্ষার আন্দোলনে শহীদ হন। এই আন্দোলনই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপণ করে। অবশেষে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান নামক প্রদেশটি বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তানী শাসকদের এই অন্ধ উর্দুপ্রীতি ও হঠকারিতার দিকেই সাইয়েদ, আবুল হাসান নদভী (রহ.) তাঁর এই ভাষণে ইঙ্গিত করেছেন। -অনুবাদক)