📄 জনগণের সাথে আলেমগণের ঘনিষ্ঠতা
দ্বিতীয় কথা হল, জনসাধারণের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া উচিত। এখানে আমার উপলব্ধি হয়েছে যে, জনসাধারণের সঙ্গে আলেমগণের যেরূপ সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল, তাতে ঘাটতি রয়েছে। হিন্দুস্তানে জনসাধারণের সঙ্গে আলেমগণের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা এখানকার তুলনায় অধিক— এই কথা আমি জোর গলায় বলতে পারি। হিন্দুস্তানে রাজনৈতিক ময়দানেও এবং সাহিত্য ও গবেষণার ময়দানেও আলেমগণই চালকের আসনে আসীন। তাঁদের মর্যাদা ও প্রতিপত্তিও সেখানে স্বীকৃত। হিন্দুস্তানে আধুনিক উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতজনেরা আলেমগণের প্রতি বীতশ্রদ্ধ নয়। সাহিত্য সভা ও জ্ঞান গবেষণামূলক সভা-সমাবেশে আমরা আলেমরা উপস্থিত হই এবং আলহামদুলিল্লাহ, সেখানে আমাদেরকে যথাযথ সম্মান প্রদান করা হয়। জনসাধারণের সাথে আপনাদের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পাওয়া উচিত। জনসাধারণ যেন আপনাদের হাতছাড়া না হয়ে যায়।
📄 আলেমগণের জীবন হবে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যময়
তৃতীয় যে কথাটি বলার তা হল, আমাদের জীবন জনসাধারণের জীবন হতে ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়া উচিত। দর্শক যেন স্পষ্ট দেখতে পায় যে, আলেমগণ দুনিয়ালোভী নয়। তাঁদের নিকট ধন-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভব জীবনের মাপকাঠি নয়। আমাদের সকল কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহ তাআলার অধিকতর সন্তুষ্টি লাভ। আমাদের পূর্বসূরীগণের জীবনে আমরা এরই প্রতিফলন দেখতে পাই। আলেমগণের মধ্যে যত দিন চারিত্রিক এই বৈশিষ্ট্য জন্মলাভ না করবে, যত দিন তাঁদের মধ্যে ত্যাগ ও কুরবানীর মহৎ গুণ সৃষ্টি না হবে তত দিন তাঁদের ব্যক্তিত্ব প্রভাববিস্তারী এবং সম্মানার্হ হবে না, হৃদয়ে ও মস্তিস্কে দ্বীনের গভীর প্রভাব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভ করবে না। অমুক মাদরাসা এত বিশাল, তমুক মাদরাসা অত বিশাল, অমুক মাদরাসার ছাত্র সংখ্যা এত এত— এসব কিছু দ্বারা আলেমগণের মর্যাদা বৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করবে না। আলেমগণের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে নিজেকে অনুকরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্বরূপে গড়ে তোলার দ্বারা। জনসাধারণ যখন দেখবে যে, তারা যেসব বিষয়ে জান কুরবান করতে প্রস্তুত সেসব স্পর্শ করাকেও আলেমগণ গুনাহ ও গর্হিত বলে বিবেচনা করেন, তাঁদের অন্তরে সেসব বিষয়ের প্রতি কোন আকাঙ্ক্ষা নেই, তখনই আলেমগণের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। জনসাধারণ যখন দেখবে, যে বিত্ত-বৈভব ও ধন-সম্পদকে তারা জীবনের সর্বাধিক মূল্যবান অনুষঙ্গ বলে ধারণা করে আলেমগণের নিকট তার কোন মূল্যই নেই, তা তাদের নিকট নিতান্তই তুচ্ছ বিষয় তখন আলেমগণের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আমাদের আকাবিরগণের ইতিহাসে এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।
ঢাকার নবাব একবার হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) কে ঢাকায় এসে তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য, আবেদন জানিয়ে বার্তা প্রেরণ করলেন। হযরত থানভী (রহ.) উত্তরে বলে পাঠালেন, 'আপনার নিকট (ধন-সম্পদের) যা আছে তা আমার প্রয়োজন অনুপাতে আমার নিকটও আছে, কিন্তু আমার নিকট যা আছে (তথা দ্বীনী ইলম) তা আপনার নিকট আপনার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুও নেই। অতএব আপনার উচিত আমার নিকট আপনার আগমন করা, আপনার নিকট আমার গমনের কোন প্রয়োজন নেই।
আরেকটি আকর্ষণীয় ও শিক্ষাপ্রদ ঘটনা আপনাদেরকে শুনাই। শায়খ সাঈদ হালাবী নামক একজন বুযুর্গ আলেম ছিলেন। দামেশকের একটি মসজিদে তিনি তাঁর শিষ্যদেরকে পাঠদান করছিলেন। তাঁর পায়ে ব্যথাজনিত সমস্যা ছিল। মসজিদে শিক্ষাদানের রীতি হল উস্তাদ কিবলার দিকে পিঠ দিয়ে বসেন। আর তাঁর সামনে ছাত্ররা তাঁর দিকে মুখ করে বসে। ফলে মসজিদে কেউ প্রবেশ করলে উস্তাদ তাকে দেখতে পান কিন্তু ছাত্ররা আগন্তুককে দেখতে পায় না। শায়খ হালাবী ছাত্রদেরকে সামনে নিয়ে তাদেরকে পাঠদান করছিলেন। এমন সময় মসজিদে প্রবেশ করলেন খেদীবী শাসনের প্রতিষ্ঠাতা শাসক মুহাম্মাদ আলীর পুত্র তৎকালীন শাসক ইবরাহীম পাশা খেদীব। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত শাসক। তার নাম শুনলে জনগণের কাঁপুনি শুরু হত। জনগণের মাঝে তার প্রতি ছিল প্রচণ্ড ভীতি। তিনি সঙ্গে জল্লাদ নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী পরিবেষ্টিত হয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন। শায়খ হালাবী ব্যথাজনিত সমস্যার কারণে তাঁর পা দুটো সামনের দিকে মেলে দিয়ে ছাত্রদেরকে পাঠদান করছিলেন। ইবরাহীম পাশা নিকটে আসতেই ছাত্ররা তাকে দেখল এবং ছাত্রদের ধারণা হল, শায়খ এবার পা গুটিয়ে নেবেন। কারণ, বাদশাহ বলে কথা। তাঁকে তো সম্মান করতেই হয়। কিন্তু শায়খ ছিলেন নির্বিকার। তিনি একটুও নড়লেন না। পা দুটো প্রসারিত রেখেই তিনি তাঁর পাঠদান কার্য অব্যাহত রাখলেন। ইবরাহীম পাশা সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, ছাত্ররা তখন নিজেদের পরিহিত জামা কাপড় গুটাতে লাগল। কারণ, তাদের নিশ্চিত ধারণা হল, এখনই জল্লাদের প্রতি নির্দেশ হবে শায়খকে হত্যা করার। শায়খের পবিত্র রক্তে নিজেদের কাপড় রঞ্জিত হোক ছাত্ররা তা চাচ্ছিল না। ইবরাহীম পাশা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শায়খের সবক শুনতে লাগলেন। শায়খের ব্যক্তিত্বের ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ ভীতির এরূপ প্রভাব বাদশাহর উপর পড়ল যে, তিনি কিছু বলতে পারলেন না। অবশেষে নীরবে চলে গেলেন। পরবর্তীতে তিনি শায়খ হালাবীর জন্য স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি একটি খলি গ্রহণ করতে অনুরোধ জানিয়ে প্রেরণ করলেন। আল্লাহওয়ালাদের প্রভাব ঐরূপই হয়। জবাবে শায়খ যে বাক্যটি উচ্চারণ করলেন তা ইতিহাস খ্যাত হয়ে আছে। আমি মনে করি এরূপ একটি বাক্যের জন্য গীতি-কবিতা সংকলনের দশ বিশ গ্রন্থ উৎসর্গ করে দেওয়া যায়। তিনি বললেন— ‘আল্লাযি ইয়ামুদ্দু রিজলাহু লা ইয়ামুদ্দু ইয়াদাহু’ (যে ব্যক্তি পা প্রসারিত করে রাখে সে কখনও তার হাত প্রসারিত করে না)। অর্থাৎ যদি হাত প্রসারিত করে কিছু গ্রহণের ইচ্ছা আমার থাকত তবে আমি তোমার আগমন কালে পা প্রসারিত করে রাখতাম না, গুটিয়ে রাখতাম। আমার পা মেলে রাখাটাই প্রমাণ করে যে, আমি দুনিয়ার কিছু গ্রহণ করার জন্য হাত প্রসারিত করার লোক নই। যে পা প্রসারিত করে সে হাত প্রসারিত করে না। এই চেতনা ও মূল্যবোধ আলেমগণের মধ্যে, দ্বীনের সেবকদের মধ্যে পরিপূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান থাকা উচিত। যদি এই চেতনা ও মূল্যবোধ না থাকে তবে আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারি, আপনার সকল ইলমী যোগ্যতা, আপনার পাণ্ডিত্য, আপনার বাগ্মীতা সব নিষ্ফল। অপরের মাঝে কোন প্রভাবই আপনি বিস্তার করতে পারবেন না। বাস্তব জীবনে আপনাকে হতে হবে অপরের জন্য আদর্শ। সমাজের বিত্তশালী ও ক্ষমতার অধিকারীদের যেন এই ধারণা না জন্মায় যে, আলেমরা পয়সার গোলাম, তাদেরকে পয়সা দিয়ে খরিদ করা যায়। বস্তুত আলেমগণ টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদের গোলাম নন। তাঁরা নিজ আদর্শের পরিপন্থী কোন কাজ করেন না।
আলেমগণের জীবন যাপন অধিকতর সাদাসিধা। তাঁরা নিম্নমানের গৃহে বাস করেন, নিম্নমানের খাদ্য আহার করেন। আপনাদের মাঝে এইসব গুণের প্রকাশ ঘটা উচিত। আমাদের পূর্বসূরীগণ এইসব গুণের অধিকারী ছিলেন। সমাজ তাঁদেরকে এইসব গুণের অধিকারী রূপে দেখতে পেত। আমি আমার শিক্ষকমণ্ডলীর ঘটনা শুনাচ্ছি। মাদরাসা কাসেমুল উলুম লাহোরে আমি লেখাপড়া করতাম। সেখানে আমাদের জন্য মাঝে মাঝে অতি উন্নতমানের খাদ্য রান্না হত। মাদরাসার পিছনে হযরত মাওলানা আহমদ আলী সাহেব বসবাস করতেন। তাঁর পুত্র হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ সাহেব মরহুমের সঙ্গে আমার ঘনিষ্টতা ছিল প্রগাঢ়। মাদরাসায় যখন অতি উন্নতমানের খাবার রান্না হত তখন আমি বুঝতে পারতাম আজ তাদের বাড়িতে খাদ্যাভাবে উপোস চলছে। আমাদের আকাবিরদের দ্বারা আল্লাহ তাআলা ঐ সময়ে দ্বীনের যে বিশাল খেদমত গ্রহণ করেছেন তা তাঁদের এই বৈশিষ্ট্যাবলীর কারণেই। তাঁরা ছিলেন দুনিয়াবিরাগী, নির্মোহ, ত্যাগ ও কুরবানীর জন্য প্রবলভাবে উন্মুখ, পরমতসহিষ্ণু এবং অত্যন্ত বিনয়ী। তাঁরা অপরকে জ্ঞানে ও গুণে নিজ অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠতর বলে মনে করতেন। 'আমার সমকক্ষ কেউ নেই'— এরূপ আত্মম্ভরিতা তাঁদের কারও মাঝে কখনও ছিল না। বরং আমি বড় বড় ব্যক্তিকে দেখেছি, নিজকে অত্যন্ত হীন ও তুচ্ছজ্ঞান করতে। শায়খুল ইসলাম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর নিকট কেউ মুরীদ হতে চাইলে কোন কোন সময় তাঁকে আমি কবিতার এই পংক্তি আবৃত্তি করতে শুনেছি— ‘না গুলাম না বারগে সাবযাম না দারাখতে সায়াহ দারাম, দর হীরাতাম কে দিহকান ব-চি কার কাশত মারা’ (আমি না ফুল, না সবুজ পাতা, না ছায়াদানকারী বৃক্ষ; আমি ভেবে অস্থির হই যে, দিহকান আমাকে কোন্ কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন?)
টিকাঃ
১. দিহকান অর্থ কৃষক। রূপকার্থে 'আল্লাহ তাআলা' বুঝানো হয়েছে।
📄 গোঁড়ামী ও হঠকারিতা পরিহার করা উচিত
ভাষা ও সংস্কৃতিগত বিভেদ ও তজ্জনিত গোঁড়ামী ও হঠকারিতা এবং প্রদেশ ভিত্তিক আঞ্চলিকতা ও তজ্জনিত গোঁড়ামী ও হঠকারিতাও এই দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই হঠকারিতাই বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এই জাতীয় অন্ধ ভাষাপ্রীতি ও প্রদেশপ্রীতির বিরুদ্ধে আলেমগণের উচিত সোচ্চার হওয়া এবং এতদসম্পর্কে ইসলামী নীতিমালা ও আদর্শ প্রচার করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন— ‘মান তাআযযা আলাইকুম বিআযায়িল জাহিলিয়্যাতি ফাআযযুহু বিহান আবীহি ওয়া লা তাকনু’— নবীর যে পবিত্র মুখে কুরআন উচ্চারিত হত, সারা পৃথিবী যে পবিত্র মুখের মাধ্যমে কুরআন শ্রবণ করেছে, যে মুখ হতে কখনও কোন অনুচিত কথা কি বাক্য নির্গত হয়নি সেই মুখ হতেই এই প্রথম এবং এই শেষ বারের মত এরূপ কঠিন ও রূঢ় বাক্য উচ্চারিত হল। তিনি যা বললেন, তার মর্মার্থ হল— যারা জাহেলী স্লোগান উচ্চারণ করে— অন্ধ বংশপ্রীতি ও গোষ্ঠীপ্রীতি যারা উস্কে দেয় তাদেরকে তাদের বাপ তুলে গালি দাও, ইঙ্গিতমূলক ভাষায় নয় বরং স্পষ্ট ভাষায়। আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! আল্লাহর রাসূলের যে মুখ হতে ফুল ঝরে পড়ত, মধু নিঃসৃত হত, যে মুখে কুরআন উচ্চারিত হত, যে মুখে ওহী ব্যতীত কিছু উচ্চারিত হত না— ‘মা ইয়ান্তিকু আনিল হাওয়া ইন হুওয়া ইল্লা ওয়াহইয়ুই ইয়ুহা’— অর্থ: সে মনগড়া কথা বলে না। এতো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। (সূরা নাজম, আয়াত ৩-৪) সে মুখ হতেই উচ্চারিত হল এরূপ কঠিন বাক্য। তিনি অন্য কোন বিষয়ে এরূপ শক্ত কথা বলেছেন বলে তো আমার স্মরণে পড়ে না। আপনাদের উচিত পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে গমন করা এবং প্রতিটি প্রদেশ হতে বালকদেরকে নিয়ে এসে শিক্ষাদান করে এরূপ আলেম তৈরি করা যাতে তাদের মধ্যে কোনরূপ মূঢ়তা ও অন্ধত্ব অবশিষ্ট না থাকে, তাদের মধ্যে বরং এর প্রতি ঘৃণা জন্ম নেয়। অতঃপর তাদেরকে স্ব-স্ব প্রদেশে প্রেরণ করতে হবে। অন্ধ প্রদেশপ্রীতি ও অন্ধ ভাষাপ্রীতির বিরুদ্ধে তারা হবে সোচ্চার ও প্রতিবাদী। জাহেলিয়াত প্রসূত এই ভাষা ও গোষ্ঠীপ্রীতিই বহু ইসলামী রাষ্ট্রকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে। এর ফলে বহু ইসলামী রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটেছে।
জনসাধারণের মাঝে আপনারা আপনাদের ভাষার যাদু এবং পাণ্ডিত্য হয়তো প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কাজের কাজটি হবে তখনই যখন আপনারা মানুষের জন্য হবেন আদর্শিক দৃষ্টান্ত, আপনাদের জীবনাচার হবে উন্নত, উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে আপনারা হবেন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। নির্মোহতা, আত্মমর্যাদাবোধ, অনন্যমুখাপেক্ষীতা ও আধ্যাত্মিকতায় আপনারা হবেন অনুসরণীয়। জ্ঞান ও চিন্তা-চেতনার দিক থেকেও এবং চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের দিক থেকেও প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। আমাদের পূর্বসূরীগণ এইরূপ ছিলেন, ঐরূপ ছিলেন— এই জপ অকার্যকর। কোন দ্বীন ও মিল্লাত, কোন সংস্কৃতি ও সভ্যতা এইরূপ জপ ও স্লোগান দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় বাস্তবানুগ কর্মসূচি গ্রহণের ও তা বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রামের। আমরা নিজেদের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনাকে ইতিহাস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। কিন্তু তা হবার নয়। জনসাধারণ কোন এক সময়ে বলবে, 'সাহেব! অনেক শুনেছি। শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। আপনাদের পূর্বসূরীগণ এইরূপ ছিলেন, ঐরূপ ছিলেন। আমার পিতা বাদশাহ ছিলেন, আমার পিতা তমুক ছিলেন। বলুন আপনি কী?' ইতিহাস তো অনেক শুনানো হয়েছে, গ্রন্থও অনেক লেখা হয়েছে। এখন প্রয়োজন কর্ম-তৎপরতার, ত্যাগ ও তিতিক্ষার, প্রয়োজন মনোযোগ আকর্ষণকারী ও যাদুকরী প্রাণের।
টিকাঃ
২. (পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকেরা উভয় পাকিস্তানের জন্য উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা দিয়ে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে আমাদের মুখ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, প্রতিবাদে সারা বাংলা গর্জে ওঠে। সালাম, বরকত সহ বেশ কিছু প্রাণ বাংলাভাষা রক্ষার আন্দোলনে শহীদ হন। এই আন্দোলনই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপণ করে। অবশেষে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান নামক প্রদেশটি বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তানী শাসকদের এই অন্ধ উর্দুপ্রীতি ও হঠকারিতার দিকেই সাইয়েদ, আবুল হাসান নদভী (রহ.) তাঁর এই ভাষণে ইঙ্গিত করেছেন। -অনুবাদক)