📘 উলামা তলাবা > 📄 কিছু ভয়াবহ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ

📄 কিছু ভয়াবহ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ


কিছু শঙ্কাজনক বিষয়ের প্রতি আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। গৃহ মধ্যে অনেক সময় এমন কিছু বিরাজ করে যা বহিরাগত ব্যক্তির দৃষ্টিতে ধরা পড়ে অথচ গৃহে বসবাসকারীরা তা উপলব্ধি করতে পারে না। আপনি হয়তো আলোতে অবস্থান করছেন। আপনার অনুভূতি হবে এক রকম, কিন্তু ঘন অন্ধকার হতে কোন ব্যক্তি যদি আপনার আলোকিত গৃহে প্রবেশ করে তবে তার অনুভূতি ও উপলব্ধি হবে ভিন্ন রকম। কোন বিষয় সর্বদা দেখা ও শোনার কারণে তা এরূপ স্বাভাবিক ও সাধারণ হয়ে যায় যে, তাতে কোন নতুনত্ব ও অভিনবত্ব দৃষ্ট হয় না। তা কোনরূপ মনোযোগ আকর্ষণের কারণ হয় না। কিন্তু বহির্দেশ থেকে আগত ব্যক্তি বিষয়টিকে তড়িৎ উপলব্ধি করতে পারে।

উদাহরণত এই দেশের সাইনবোর্ডগুলো সাধারণত উর্দুতে লিখিত আপনাদের দৃষ্টিতে এতে কোন বৈচিত্র ধরা পড়ে না। কিন্তু আমরা হিন্দুস্তানিরা যেহেতু ইংরেজী অথবা হিন্দী সাইনবোর্ড দেখে অভ্যস্ত, তাই আপনাদের দেশের সাইনবোর্ডগুলো দেখে আমরা পুলকিত হব এবং বলে উঠব, মাশাআল্লাহ এখানে তো সর্বত্র উর্দু আর উর্দুই দৃষ্ট হচ্ছে! আমার নিজের ব্যাপারে আমি না দূরদর্শিতার দাবি করি, না গভীর দর্শিতার, না বিচক্ষণতার দাবি করি, না অতি সচেতনতার। ইকবালের ভাষায়— 'ম্যায় না আরেফ না মুজাদ্দেদ না মুহাদ্দিস না ফকীহ, মুজকো মালুম নেহি কেয়া হ্যায় নবুওয়াত কা মাকাম, হা আলম-এ-ইসলাম পার রাখতা হু নাযার ফাশ হ্যায় মুজপে গামিরে ফালাক নীলি ফাম' (আমি না আরেফ, না মুজাদ্দেদ, না মুহাদ্দিস না ফকীহ নবুওয়াতের মাকাম ও মর্যাদা সম্পর্কে আমি অজ্ঞ তবে ইসলামী বিশ্বের ব্যাপারে সচকিত আমার দৃষ্টি আমার নিকট উদ্ভাসিত নীল আকাশের রহস্য।) হাঁ আমি এতটুকু বলতে পারি যে, আমি বহির্দেশ হতে আগত। অতএব আমার বক্তব্য বিবেচনাযোগ্য হওয়া উচিত। ইতিহাস অধ্যয়ন এবং মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে নিবিড় প্রত্যক্ষজাত জ্ঞানের আলোকে বলছি যে, আকীদা-বিশ্বাসগত মতভেদ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এই ভূখণ্ডের জন্য মারাত্মক এক হুমকি। এখানকার ধর্মীয় দল ও উপদলগুলো একে অপরের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হয়ে আছে। বিতর্কিত যে বিষয়গুলোর সমাধান জ্ঞানগত যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে ঘরোয়াভাবে করা যেত তা জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সর্বত্র যুদ্ধংদেহী মনোভাব গড়ে উঠেছে। এটা অত্যন্ত ভয়াবহ ও সর্বনাশা ব্যাপার। আমিও ঐ দলেরই একজন, আপনাদের সম্পর্ক যে দলের সঙ্গে। আমার উপলব্ধি ও চিন্তা-চেতনা হুবহু তাই যে উপলব্ধি ও যে চিন্তা-চেতনা আপনারা লালন করেন। আমাদের মুরব্বীগণ তো ঐ পতাকা সমুন্নত করেছেন যার কারণে আমরা নানা রকম বিদ্রূপাত্মক ও নিন্দা জ্ঞাপক উপাধি লাভ করেছি এবং সমূহ বিপদ ও তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু পায়ের তলায় যদি মাটিই না থাকে তবে এই প্রাসাদ গড়ে উঠবে কিসের উপর? একদল প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে, তারাই পাকিস্তানের জনক। অপর দল প্রমাণ করতে মরিয়া যে, তারাই সঠিক পথাবলম্বী, এই দেশের সর্বোচ্চ দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হওয়ার অধিকারী একমাত্র তারাই। মাফ করবেন আমি নির্দিষ্ট কোন দলের প্রতি ইঙ্গিত করছিনা; অনুসন্ধান করলে এর পিছনে যশপ্রীতি ও মর্যাদা মোহের সন্ধান পাওয়া যাবে। আমাদের পূর্বসূরীগণ দ্বীন রক্ষার তাগিদে সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন। প্রয়োজনে অকপটে নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন, নতি স্বীকার করেছেন, নিজ অবস্থান থেকে বিনীতভাবে নিম্নে অবতরণ করেছেন। তাঁরা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ভাই! আপনিই উপরে থাকুন তাতে কিছু যায় আসে না, কিন্তু দ্বীন অটুট থাকুক। হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর মাসলাকের অনুসারী এবং তাঁর চেতনায় উজ্জীবিত আমাদের হিন্দুস্তানী বুযুর্গগণের কর্মধারা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এইরূপই ছিল। শ্রেণী কক্ষে এবং ইলমী মজলিসসমূহে বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে আপনারা প্রাণ খুলে আলোচনা করুন, কিন্তু দেশকে হুমকির দিকে ঠেলে দেবেন না। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে যখন কোন মাহফিলের আয়োজন করা হয় এবং সেখানে এরূপ দাবি উচ্চারিত হয় যাতে থাকে অহংবোধ কিংবা দম্ভের প্রকাশ তখন এর প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী আরেকটি মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখান থেকে 'হাম চু মন দিগরে নিস্ত' (আমাদের সমকক্ষ কেউ নাই) ধ্বনি সোচ্চার হয়ে ওঠে।

আমাদের বুযুর্গগণ সর্বদা নিজেদের কর্মতৎপরতা চালিয়ে যেতেন বিনয়ের সাথে, নিজেকে দোষযুক্ত ভেবে এবং ঈমানী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে, সওয়াবের প্রত্যাশায়। তাঁরা না কখনও নেতৃত্বের দাবি করতেন, না ক্ষমতা লাভের। তাঁরা এই দাবিও করতেন না যে, তাদের দলই সবকিছু করেছে বা তাদের দলই সমৃদ্ধ দল। হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানীর (রহ.) পত্রাবলী পাঠ করুন। হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহর (রহ.) পত্রাবলী পাঠ করুন। ভারতবর্ষে যখন মুসলমানদের শাসন ক্ষমতার প্রদীপ নিষ্প্রভ হয়ে আসছিল, মোঘল শাসনের অবসান ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র তখন তাঁরা আহমদ শাহ আবদালী, নজীবুদ্দৌল্লাহ প্রমুখের নিকট যে পত্র লিখেছিলেন তা পাঠ করুন। দেখবেন, তাঁরা কি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, কী বেদনা গুঞ্জরিত হৃদয়ে পত্র লিখেছিলেন। হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) মুসলমানদের অসহায়ত্বের বিবরণ তুলে ধরে যে বিশদ পত্র লিখেছিলেন তা থেকে ইসলাম ও মুসলমানের প্রতি তাঁর দরদ ও ইখলাস কী পরিমাণ ছিল তা অনুমান করা যায়। তন্মধ্যে একটি বাক্য ছিল অত্যন্ত আবেগ সৃষ্টিকারী। তিনি লিখেছিলেন— আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সুপারিশকারী মেনে বলছি যে, আল্লাহর ওয়াস্তে হিন্দুস্তানের মুসলমানদের প্রতি রহম করুন এবং একটিবার আসুন। আবেগ ভরা এই পত্র পেয়েই আহমদ শাহ আবদালী হিন্দুস্তানে আসলেন এবং মারাঠা শক্তির কোমর এমনভাবে ভেঙ্গে দিলেন যে, তারা আর কখনও মাথা উঁচু করতে পারেনি। এই ছিলেন শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)। যাঁর হৃদয়ের আকুতি ও দরদ এবং যাঁর দূরদর্শিতা হিন্দুস্তানের ইতিহাস ও চিত্র পাল্টে দিয়েছিল। আপনারা নিজেকে তাঁরই উত্তরসূরী বলে গণ্য করেন। এই সম্পর্কের দাবি অনুযায়ী দ্বীন ও মিল্লাতের জন্য যে ত্যাগ ও কুরবানীর প্রয়োজন আপনারা তা প্রদর্শন করুন এবং স্পষ্ট ভাষায় বলে দিন যে, 'আচ্ছা ভাই! তোমরাই সঠিক, তোমাদের কীর্তিই সর্ব মহান। আস, আমরা তোমরা সকলে মিলে এই দেশকে রক্ষা করি। বর্তমানে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আলেমগণের পারস্পরিক এই হানাহানি কতটুকু সঙ্গত? আমার আকীদা-বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ রক্ষা করেই আমি বলছি যে, আলহামদুলিল্লাহ আমার আকীদা-বিশ্বাসের বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় ঘটতে দিতে আমি প্রস্তুত নই। না ইবাদতের বিধি-বিধান সংক্রান্ত প্রশ্নে, না আকীদা-বিশ্বাসের মূলনীতির প্রশ্নে— কোন ক্ষেত্রেই কোন রকম সমঝোতার জন্য আমি প্রস্তুত নই। কিন্তু এক তো হল নিজে আমল করা। আরেক হল গণ্ডগোল পাকানো, জনসাধারণকে বলির পাঁঠা বানানো এবং সমগ্র দেশকে রণক্ষেত্রে পরিণত করা। এটা সমীচীন নয়। একটি কনফারেন্স হচ্ছে 'ইয়া রাসূলাল্লাহ'র, আরেকটি হচ্ছে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'র। এটা সুস্থ জীবন যাপনের পদ্ধতি নয়।

📘 উলামা তলাবা > 📄 জনগণের সাথে আলেমগণের ঘনিষ্ঠতা

📄 জনগণের সাথে আলেমগণের ঘনিষ্ঠতা


দ্বিতীয় কথা হল, জনসাধারণের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া উচিত। এখানে আমার উপলব্ধি হয়েছে যে, জনসাধারণের সঙ্গে আলেমগণের যেরূপ সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল, তাতে ঘাটতি রয়েছে। হিন্দুস্তানে জনসাধারণের সঙ্গে আলেমগণের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা এখানকার তুলনায় অধিক— এই কথা আমি জোর গলায় বলতে পারি। হিন্দুস্তানে রাজনৈতিক ময়দানেও এবং সাহিত্য ও গবেষণার ময়দানেও আলেমগণই চালকের আসনে আসীন। তাঁদের মর্যাদা ও প্রতিপত্তিও সেখানে স্বীকৃত। হিন্দুস্তানে আধুনিক উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতজনেরা আলেমগণের প্রতি বীতশ্রদ্ধ নয়। সাহিত্য সভা ও জ্ঞান গবেষণামূলক সভা-সমাবেশে আমরা আলেমরা উপস্থিত হই এবং আলহামদুলিল্লাহ, সেখানে আমাদেরকে যথাযথ সম্মান প্রদান করা হয়। জনসাধারণের সাথে আপনাদের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পাওয়া উচিত। জনসাধারণ যেন আপনাদের হাতছাড়া না হয়ে যায়।

📘 উলামা তলাবা > 📄 আলেমগণের জীবন হবে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যময়

📄 আলেমগণের জীবন হবে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যময়


তৃতীয় যে কথাটি বলার তা হল, আমাদের জীবন জনসাধারণের জীবন হতে ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়া উচিত। দর্শক যেন স্পষ্ট দেখতে পায় যে, আলেমগণ দুনিয়ালোভী নয়। তাঁদের নিকট ধন-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভব জীবনের মাপকাঠি নয়। আমাদের সকল কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহ তাআলার অধিকতর সন্তুষ্টি লাভ। আমাদের পূর্বসূরীগণের জীবনে আমরা এরই প্রতিফলন দেখতে পাই। আলেমগণের মধ্যে যত দিন চারিত্রিক এই বৈশিষ্ট্য জন্মলাভ না করবে, যত দিন তাঁদের মধ্যে ত্যাগ ও কুরবানীর মহৎ গুণ সৃষ্টি না হবে তত দিন তাঁদের ব্যক্তিত্ব প্রভাববিস্তারী এবং সম্মানার্হ হবে না, হৃদয়ে ও মস্তিস্কে দ্বীনের গভীর প্রভাব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভ করবে না। অমুক মাদরাসা এত বিশাল, তমুক মাদরাসা অত বিশাল, অমুক মাদরাসার ছাত্র সংখ্যা এত এত— এসব কিছু দ্বারা আলেমগণের মর্যাদা বৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করবে না। আলেমগণের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে নিজেকে অনুকরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্বরূপে গড়ে তোলার দ্বারা। জনসাধারণ যখন দেখবে যে, তারা যেসব বিষয়ে জান কুরবান করতে প্রস্তুত সেসব স্পর্শ করাকেও আলেমগণ গুনাহ ও গর্হিত বলে বিবেচনা করেন, তাঁদের অন্তরে সেসব বিষয়ের প্রতি কোন আকাঙ্ক্ষা নেই, তখনই আলেমগণের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। জনসাধারণ যখন দেখবে, যে বিত্ত-বৈভব ও ধন-সম্পদকে তারা জীবনের সর্বাধিক মূল্যবান অনুষঙ্গ বলে ধারণা করে আলেমগণের নিকট তার কোন মূল্যই নেই, তা তাদের নিকট নিতান্তই তুচ্ছ বিষয় তখন আলেমগণের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আমাদের আকাবিরগণের ইতিহাসে এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।

ঢাকার নবাব একবার হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) কে ঢাকায় এসে তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য, আবেদন জানিয়ে বার্তা প্রেরণ করলেন। হযরত থানভী (রহ.) উত্তরে বলে পাঠালেন, 'আপনার নিকট (ধন-সম্পদের) যা আছে তা আমার প্রয়োজন অনুপাতে আমার নিকটও আছে, কিন্তু আমার নিকট যা আছে (তথা দ্বীনী ইলম) তা আপনার নিকট আপনার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুও নেই। অতএব আপনার উচিত আমার নিকট আপনার আগমন করা, আপনার নিকট আমার গমনের কোন প্রয়োজন নেই।

আরেকটি আকর্ষণীয় ও শিক্ষাপ্রদ ঘটনা আপনাদেরকে শুনাই। শায়খ সাঈদ হালাবী নামক একজন বুযুর্গ আলেম ছিলেন। দামেশকের একটি মসজিদে তিনি তাঁর শিষ্যদেরকে পাঠদান করছিলেন। তাঁর পায়ে ব্যথাজনিত সমস্যা ছিল। মসজিদে শিক্ষাদানের রীতি হল উস্তাদ কিবলার দিকে পিঠ দিয়ে বসেন। আর তাঁর সামনে ছাত্ররা তাঁর দিকে মুখ করে বসে। ফলে মসজিদে কেউ প্রবেশ করলে উস্তাদ তাকে দেখতে পান কিন্তু ছাত্ররা আগন্তুককে দেখতে পায় না। শায়খ হালাবী ছাত্রদেরকে সামনে নিয়ে তাদেরকে পাঠদান করছিলেন। এমন সময় মসজিদে প্রবেশ করলেন খেদীবী শাসনের প্রতিষ্ঠাতা শাসক মুহাম্মাদ আলীর পুত্র তৎকালীন শাসক ইবরাহীম পাশা খেদীব। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত শাসক। তার নাম শুনলে জনগণের কাঁপুনি শুরু হত। জনগণের মাঝে তার প্রতি ছিল প্রচণ্ড ভীতি। তিনি সঙ্গে জল্লাদ নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী পরিবেষ্টিত হয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন। শায়খ হালাবী ব্যথাজনিত সমস্যার কারণে তাঁর পা দুটো সামনের দিকে মেলে দিয়ে ছাত্রদেরকে পাঠদান করছিলেন। ইবরাহীম পাশা নিকটে আসতেই ছাত্ররা তাকে দেখল এবং ছাত্রদের ধারণা হল, শায়খ এবার পা গুটিয়ে নেবেন। কারণ, বাদশাহ বলে কথা। তাঁকে তো সম্মান করতেই হয়। কিন্তু শায়খ ছিলেন নির্বিকার। তিনি একটুও নড়লেন না। পা দুটো প্রসারিত রেখেই তিনি তাঁর পাঠদান কার্য অব্যাহত রাখলেন। ইবরাহীম পাশা সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, ছাত্ররা তখন নিজেদের পরিহিত জামা কাপড় গুটাতে লাগল। কারণ, তাদের নিশ্চিত ধারণা হল, এখনই জল্লাদের প্রতি নির্দেশ হবে শায়খকে হত্যা করার। শায়খের পবিত্র রক্তে নিজেদের কাপড় রঞ্জিত হোক ছাত্ররা তা চাচ্ছিল না। ইবরাহীম পাশা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শায়খের সবক শুনতে লাগলেন। শায়খের ব্যক্তিত্বের ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ ভীতির এরূপ প্রভাব বাদশাহর উপর পড়ল যে, তিনি কিছু বলতে পারলেন না। অবশেষে নীরবে চলে গেলেন। পরবর্তীতে তিনি শায়খ হালাবীর জন্য স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি একটি খলি গ্রহণ করতে অনুরোধ জানিয়ে প্রেরণ করলেন। আল্লাহওয়ালাদের প্রভাব ঐরূপই হয়। জবাবে শায়খ যে বাক্যটি উচ্চারণ করলেন তা ইতিহাস খ্যাত হয়ে আছে। আমি মনে করি এরূপ একটি বাক্যের জন্য গীতি-কবিতা সংকলনের দশ বিশ গ্রন্থ উৎসর্গ করে দেওয়া যায়। তিনি বললেন— ‘আল্লাযি ইয়ামুদ্দু রিজলাহু লা ইয়ামুদ্দু ইয়াদাহু’ (যে ব্যক্তি পা প্রসারিত করে রাখে সে কখনও তার হাত প্রসারিত করে না)। অর্থাৎ যদি হাত প্রসারিত করে কিছু গ্রহণের ইচ্ছা আমার থাকত তবে আমি তোমার আগমন কালে পা প্রসারিত করে রাখতাম না, গুটিয়ে রাখতাম। আমার পা মেলে রাখাটাই প্রমাণ করে যে, আমি দুনিয়ার কিছু গ্রহণ করার জন্য হাত প্রসারিত করার লোক নই। যে পা প্রসারিত করে সে হাত প্রসারিত করে না। এই চেতনা ও মূল্যবোধ আলেমগণের মধ্যে, দ্বীনের সেবকদের মধ্যে পরিপূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান থাকা উচিত। যদি এই চেতনা ও মূল্যবোধ না থাকে তবে আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারি, আপনার সকল ইলমী যোগ্যতা, আপনার পাণ্ডিত্য, আপনার বাগ্মীতা সব নিষ্ফল। অপরের মাঝে কোন প্রভাবই আপনি বিস্তার করতে পারবেন না। বাস্তব জীবনে আপনাকে হতে হবে অপরের জন্য আদর্শ। সমাজের বিত্তশালী ও ক্ষমতার অধিকারীদের যেন এই ধারণা না জন্মায় যে, আলেমরা পয়সার গোলাম, তাদেরকে পয়সা দিয়ে খরিদ করা যায়। বস্তুত আলেমগণ টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদের গোলাম নন। তাঁরা নিজ আদর্শের পরিপন্থী কোন কাজ করেন না।

আলেমগণের জীবন যাপন অধিকতর সাদাসিধা। তাঁরা নিম্নমানের গৃহে বাস করেন, নিম্নমানের খাদ্য আহার করেন। আপনাদের মাঝে এইসব গুণের প্রকাশ ঘটা উচিত। আমাদের পূর্বসূরীগণ এইসব গুণের অধিকারী ছিলেন। সমাজ তাঁদেরকে এইসব গুণের অধিকারী রূপে দেখতে পেত। আমি আমার শিক্ষকমণ্ডলীর ঘটনা শুনাচ্ছি। মাদরাসা কাসেমুল উলুম লাহোরে আমি লেখাপড়া করতাম। সেখানে আমাদের জন্য মাঝে মাঝে অতি উন্নতমানের খাদ্য রান্না হত। মাদরাসার পিছনে হযরত মাওলানা আহমদ আলী সাহেব বসবাস করতেন। তাঁর পুত্র হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ সাহেব মরহুমের সঙ্গে আমার ঘনিষ্টতা ছিল প্রগাঢ়। মাদরাসায় যখন অতি উন্নতমানের খাবার রান্না হত তখন আমি বুঝতে পারতাম আজ তাদের বাড়িতে খাদ্যাভাবে উপোস চলছে। আমাদের আকাবিরদের দ্বারা আল্লাহ তাআলা ঐ সময়ে দ্বীনের যে বিশাল খেদমত গ্রহণ করেছেন তা তাঁদের এই বৈশিষ্ট্যাবলীর কারণেই। তাঁরা ছিলেন দুনিয়াবিরাগী, নির্মোহ, ত্যাগ ও কুরবানীর জন্য প্রবলভাবে উন্মুখ, পরমতসহিষ্ণু এবং অত্যন্ত বিনয়ী। তাঁরা অপরকে জ্ঞানে ও গুণে নিজ অপেক্ষা উত্তম ও শ্রেষ্ঠতর বলে মনে করতেন। 'আমার সমকক্ষ কেউ নেই'— এরূপ আত্মম্ভরিতা তাঁদের কারও মাঝে কখনও ছিল না। বরং আমি বড় বড় ব্যক্তিকে দেখেছি, নিজকে অত্যন্ত হীন ও তুচ্ছজ্ঞান করতে। শায়খুল ইসলাম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর নিকট কেউ মুরীদ হতে চাইলে কোন কোন সময় তাঁকে আমি কবিতার এই পংক্তি আবৃত্তি করতে শুনেছি— ‘না গুলাম না বারগে সাবযাম না দারাখতে সায়াহ দারাম, দর হীরাতাম কে দিহকান ব-চি কার কাশত মারা’ (আমি না ফুল, না সবুজ পাতা, না ছায়াদানকারী বৃক্ষ; আমি ভেবে অস্থির হই যে, দিহকান আমাকে কোন্ কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন?)

টিকাঃ
১. দিহকান অর্থ কৃষক। রূপকার্থে 'আল্লাহ তাআলা' বুঝানো হয়েছে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 গোঁড়ামী ও হঠকারিতা পরিহার করা উচিত

📄 গোঁড়ামী ও হঠকারিতা পরিহার করা উচিত


ভাষা ও সংস্কৃতিগত বিভেদ ও তজ্জনিত গোঁড়ামী ও হঠকারিতা এবং প্রদেশ ভিত্তিক আঞ্চলিকতা ও তজ্জনিত গোঁড়ামী ও হঠকারিতাও এই দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই হঠকারিতাই বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এই জাতীয় অন্ধ ভাষাপ্রীতি ও প্রদেশপ্রীতির বিরুদ্ধে আলেমগণের উচিত সোচ্চার হওয়া এবং এতদসম্পর্কে ইসলামী নীতিমালা ও আদর্শ প্রচার করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন— ‘মান তাআযযা আলাইকুম বিআযায়িল জাহিলিয়্যাতি ফাআযযুহু বিহান আবীহি ওয়া লা তাকনু’— নবীর যে পবিত্র মুখে কুরআন উচ্চারিত হত, সারা পৃথিবী যে পবিত্র মুখের মাধ্যমে কুরআন শ্রবণ করেছে, যে মুখ হতে কখনও কোন অনুচিত কথা কি বাক্য নির্গত হয়নি সেই মুখ হতেই এই প্রথম এবং এই শেষ বারের মত এরূপ কঠিন ও রূঢ় বাক্য উচ্চারিত হল। তিনি যা বললেন, তার মর্মার্থ হল— যারা জাহেলী স্লোগান উচ্চারণ করে— অন্ধ বংশপ্রীতি ও গোষ্ঠীপ্রীতি যারা উস্কে দেয় তাদেরকে তাদের বাপ তুলে গালি দাও, ইঙ্গিতমূলক ভাষায় নয় বরং স্পষ্ট ভাষায়। আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! আল্লাহর রাসূলের যে মুখ হতে ফুল ঝরে পড়ত, মধু নিঃসৃত হত, যে মুখে কুরআন উচ্চারিত হত, যে মুখে ওহী ব্যতীত কিছু উচ্চারিত হত না— ‘মা ইয়ান্তিকু আনিল হাওয়া ইন হুওয়া ইল্লা ওয়াহইয়ুই ইয়ুহা’— অর্থ: সে মনগড়া কথা বলে না। এতো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। (সূরা নাজম, আয়াত ৩-৪) সে মুখ হতেই উচ্চারিত হল এরূপ কঠিন বাক্য। তিনি অন্য কোন বিষয়ে এরূপ শক্ত কথা বলেছেন বলে তো আমার স্মরণে পড়ে না। আপনাদের উচিত পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে গমন করা এবং প্রতিটি প্রদেশ হতে বালকদেরকে নিয়ে এসে শিক্ষাদান করে এরূপ আলেম তৈরি করা যাতে তাদের মধ্যে কোনরূপ মূঢ়তা ও অন্ধত্ব অবশিষ্ট না থাকে, তাদের মধ্যে বরং এর প্রতি ঘৃণা জন্ম নেয়। অতঃপর তাদেরকে স্ব-স্ব প্রদেশে প্রেরণ করতে হবে। অন্ধ প্রদেশপ্রীতি ও অন্ধ ভাষাপ্রীতির বিরুদ্ধে তারা হবে সোচ্চার ও প্রতিবাদী। জাহেলিয়াত প্রসূত এই ভাষা ও গোষ্ঠীপ্রীতিই বহু ইসলামী রাষ্ট্রকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে। এর ফলে বহু ইসলামী রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটেছে।

জনসাধারণের মাঝে আপনারা আপনাদের ভাষার যাদু এবং পাণ্ডিত্য হয়তো প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কাজের কাজটি হবে তখনই যখন আপনারা মানুষের জন্য হবেন আদর্শিক দৃষ্টান্ত, আপনাদের জীবনাচার হবে উন্নত, উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে আপনারা হবেন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। নির্মোহতা, আত্মমর্যাদাবোধ, অনন্যমুখাপেক্ষীতা ও আধ্যাত্মিকতায় আপনারা হবেন অনুসরণীয়। জ্ঞান ও চিন্তা-চেতনার দিক থেকেও এবং চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের দিক থেকেও প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। আমাদের পূর্বসূরীগণ এইরূপ ছিলেন, ঐরূপ ছিলেন— এই জপ অকার্যকর। কোন দ্বীন ও মিল্লাত, কোন সংস্কৃতি ও সভ্যতা এইরূপ জপ ও স্লোগান দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় বাস্তবানুগ কর্মসূচি গ্রহণের ও তা বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রামের। আমরা নিজেদের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনাকে ইতিহাস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। কিন্তু তা হবার নয়। জনসাধারণ কোন এক সময়ে বলবে, 'সাহেব! অনেক শুনেছি। শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। আপনাদের পূর্বসূরীগণ এইরূপ ছিলেন, ঐরূপ ছিলেন। আমার পিতা বাদশাহ ছিলেন, আমার পিতা তমুক ছিলেন। বলুন আপনি কী?' ইতিহাস তো অনেক শুনানো হয়েছে, গ্রন্থও অনেক লেখা হয়েছে। এখন প্রয়োজন কর্ম-তৎপরতার, ত্যাগ ও তিতিক্ষার, প্রয়োজন মনোযোগ আকর্ষণকারী ও যাদুকরী প্রাণের।

টিকাঃ
২. (পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকেরা উভয় পাকিস্তানের জন্য উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা দিয়ে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে আমাদের মুখ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, প্রতিবাদে সারা বাংলা গর্জে ওঠে। সালাম, বরকত সহ বেশ কিছু প্রাণ বাংলাভাষা রক্ষার আন্দোলনে শহীদ হন। এই আন্দোলনই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপণ করে। অবশেষে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান নামক প্রদেশটি বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তানী শাসকদের এই অন্ধ উর্দুপ্রীতি ও হঠকারিতার দিকেই সাইয়েদ, আবুল হাসান নদভী (রহ.) তাঁর এই ভাষণে ইঙ্গিত করেছেন। -অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00