📄 ভাষা ও সাহিত্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা
এই পর্যায়ে আমি আরও দুটো বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কোন দেশে দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও দ্বীনী কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ঐ দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ দখল থাকা জরুরী। রুচিশীল ও মানোত্তীর্ণ ভাষায় নিজের চিন্তা-চেতনা প্রকাশের যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। বক্তৃতা ও লেখনীতে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় ভাষাশৈলী প্রয়োগের দক্ষতা থাকতে হবে। এটা এমনই এক প্রকৃতিগত সত্য ও অনিবার্য বাস্তবতা যে, নবীগণকে পর্যন্ত স্বীয় সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শনের জন্য তাদের মন-মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তারকারী উচ্চমান সম্পন্ন সম্মোহক ভাষা দান করা হয়েছিল। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— ‘ইন্না আনযালনাহু কুরআনান আরাবিয়্যাল লাল্লাকুম তা’কিলুন’ (আমি ইহাকে আরবী ভাষার কুরআনরূপে নাযিল করেছি, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে সক্ষম হও)। (সূরা ইউসুফ ২) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে— ‘বি-লিসানিন আরাবিয়্যিম মুবিন’ (অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়)। (সূরা শুআরা ১৯৫) আরও ইরশাদ হয়েছে— ‘ওয়া মা আরসালনা মির রাসূলিন ইল্লা বি-লিসানি কাওমিহি লিইউবাইয়িনা লাহুম’ (আমি প্রত্যেক রাসূলকেই স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি যাতে তাদের সামনে তারা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন)। (সূরা ইবরাহীম ৪) বোদ্ধাগণ বোঝেন যে, স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণের অর্থ শুধু এই নয় যে, নবীগণ স্বজাতির ভাষা বোঝেন এবং জাতিকে সেই ভাষায় বক্তব্য বোঝাতে পারেন। বরং এর মর্ম এই যে, নবীগণের ভাষা হত সমকালীন ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ মানে উত্তীর্ণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মান সম্পন্ন। এর সত্যতার সন্ধান পাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উক্তিতে— ‘আনা আফসাহুল আরাবি’ (আমি সর্বাধিক বিশুদ্ধ আরবী ভাষার অধিকারী)।
আপনারা জানেন, ইসলামের ইতিহাসে যাঁরা বৃহৎ কোন সংস্কার ও গঠনমূলক কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, মানব সমাজের চিন্তা-চেতনা ও গতি-প্রকৃতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে যাদের প্রভাব ছিল গভীর ও সুবিস্তারী তাঁদের প্রায় সকলেই বাগ্মিতা ও লেখনীতে ওজস্বিতার অধিকারী ছিলেন। তাঁদের লেখনী ও বক্তৃতায় আমরা ভাষার সাহিত্য ও আলংকারিক উচ্চমান পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান পাই। হযরত শায়খ জিলানী (রহ.)-এর মাওয়ায়েজ ও ভাষণ সংকলন আজ অবধি ওজস্বী ভাষনের উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ইমাম রব্বানী (হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী [রহ.]-এর পত্রাবলী সাহিত্য স্বকীয়তায়, তেজস্বিতা ও গতিশীলতায় সাবলীলতা ও শব্দচয়নে অক্লেশতায় আবুল ফজল এবং ফয়জীর রচনাশৈলী অপেক্ষা অধিক উচ্চমানসম্পন্ন বৈ নয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থটি যুগপৎ আরবী সাহিত্য ও ইলমী ও শাস্ত্রীয় ভাষার উচ্চমান সম্পন্ন এরূপ এক উজ্জল দৃষ্টান্ত যে, মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন-পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে যার নজীর লক্ষ্য করা যায় না। আরবীর ন্যায় ফার্সী ভাষাতেও শাহ সাহেবের দক্ষতা ও সাবলীলতা ছিল অতুলনীয়। ফার্সী ভাষায় প্রণীত তাঁর ইযালাতুল খাফা গ্রন্থের কোন কোন অংশ তো সাহিত্যের শাহী মার্গ স্পর্শ করেছে।
এই কাহিনী তখনকার যখন আরবী ফার্সী এই দেশীয় মুসলিম সমাজের জ্ঞানচর্চা ও লেখনীর ভাষা ছিল। উর্দু ভাষার প্রচলন লাভের পরে শাহ সাহেবের সন্তানগণ উর্দু ভাষায় লেখালেখি শুরু করেন। শাহ আবদুল কাদের (রহ.)-এর কুরআনের অনুবাদ তৎকালীন দিল্লীর প্রমিত ভাষার উৎকৃষ্ট নমুনা। সাহিত্যগত সৌন্দর্য ও ভাষা সুষমার কারণে অনুবাদটি ক্ল্যাসিক্যাল উর্দু সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। উর্দু ভাষায় রচিত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.)-এর গ্রন্থাদিতে এরূপ সাবলীল সরল ও স্বচ্ছন্দ্য ভাষাশৈলী বিদ্যমান যে, সূক্ষ্ম ও জটিল জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও উর্দু-প্রিয় পাঠকের রুচিতে কোনরূপ বিস্বাদ কি বিরাগ সৃষ্টি করতে পারে না। ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রের নেতৃত্ব দীর্ঘকাল যাবৎ এ দেশের আলেমগণের হাতেই থেকেছে। এ দেশের সাহিত্য জগতে তাঁরাই দিক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। খাজা আলতাফ হোসাইন হালী, মৌলভী নযীর আহমদ দেহলভী এবং মাওলানা শিবলী নোমানীকে উর্দু ভাষার নির্মাতারূপে গণ্য করা উচিত। আলেমগণ সাহিত্যরুচি ও রচনাশৈলীর এরূপ আদর্শ নমুনা রেখে গেছেন যা উর্দু ভাষার এক অমূল্য সম্পদ। মাওলানা হাবিবুর রহমান শেরওয়ানীর মাযামীন এবং মাওলানা সাইয়েদ আবদুল হাই (নাযেমে নাদওয়াতুল উলামা) প্রণীত তাযকিয়ায়ে গুলে রানা (তযকেরাহ গুল-এ-রানা) এবং তারীখে ইয়াদে আইয়াম গ্রন্থ দুটি নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্য-নির্ভুল ইতিহাস-সমৃদ্ধতার পাশাপাশি উচ্চ সাহিত্যমান ও অলংকারে পূর্ণ উর্দু গদ্য সাহিত্যের উজ্জল এক উদাহরণ। মাওলানা সুলাইমান নদভীকে আল্লাহ কল্যাণ দান করুন। ধর্মীয় জ্ঞান গবেষণা বিষয়ক ও সাহিত্যমূলক রচনাদি দ্বারা তিনি উর্দু সাহিত্যকে ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর গ্রন্থাদি অদ্যাবধি এবং দূর-ভবিষ্যত অবধি ভাষা ও সাহিত্যের তুলনামান পরিমাপের নিক্তি ও মানদণ্ড হয়ে থাকবে। তদ্রূপ মাওলানা আবুল কালাম আযাদের রচনাবলী উর্দু ভাষাকে শক্তিমান এবং উর্দুকে নতুন এক শিক্ষিত ভাষাশৈলী দান করেছে। তাঁর সম্পাদিত আল-হেলাল পত্রিকার যাদুকরী লেখাসমূহ এক কালে গোটা ভারতবর্ষকে সম্মোহিত করে রেখেছিল। তাঁর বিশেষ রচনাশৈলী আজ অবধি সাহিত্য জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছে। আলেমগণের এই জাগ্রত মস্তিষ্কতা ও যুগ সচেতনতার কারণেই দেশ গঠন ও দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধনে আলেমগণের নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ কিংবা দেশের সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে কখনও উত্থাপিত হয়নি। তাঁরা নিজেদেরকে জনবিচ্ছিন্ন উপদ্বীপ বানিয়ে রাখার চেষ্টা করেননি। অন্যান্য মুসলিম দেশের আলেমগণের ন্যায় তাঁরা যুগের নকীব দল হতে দূরত্ব বজায় রেখে চলেননি।
তাঁরা দাওয়াতী কার্যক্রমে ও দ্বীনের লক্ষ্য অর্জনে স্বদেশের ভাষা ব্যবহার করতেন এবং সাহিত্যিক মহলে সমাদৃত ও প্রশংসিত উচ্চমানের ভাষা ব্যবহার করতেন। আমাদের উচিত এই কর্মধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখা, এই উত্তরাধিকার-লব্ধ সম্পদকে সংরক্ষণ করা। আমরা যদি দ্বীনের কার্যকর খেদমত আঞ্জামে অভিলাষী হই এবং বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা সাধারণ ও বিশিষ্টজন সকলের নিকট পৌঁছাতে চাই তাহলে আমাদেরকে এই যুগেও নিজেদের রচনা ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে সাবলীল ও আকর্ষণীয় ভাষা প্রয়োগের কৌশল এবং সৃষ্টিশীল ভাষাশৈলী প্রয়োগের কৌশল আয়ত্ব করতে হবে। বক্তৃতা ও রচনাবলীকে এবং প্রতিপাদ্য বিষয়কে প্রচলিত সাহিত্যের উচ্চমানে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এতে না আপনাদের মান-মর্যাদার হানী হবে, না পূর্বসুরীদের অবলম্বিত পথ পরিহারের দোষ আপনাদের উপর আরোপিত হবে। বরং তা হবে দ্বীনের হেকমত ও চাহিদার সঙ্গে পর্বতোভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।
এই পর্যায়ে আমি আরও দুটো বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কোন দেশে দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও দ্বীনী কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ঐ দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ দখল থাকা জরুরী। রুচিশীল ও মানোত্তীর্ণ ভাষায় নিজের চিন্তা-চেতনা প্রকাশের যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। বক্তৃতা ও লেখনীতে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় ভাষাশৈলী প্রয়োগের দক্ষতা থাকতে হবে। এটা এমনই এক প্রকৃতিগত সত্য ও অনিবার্য বাস্তবতা যে, নবীগণকে পর্যন্ত স্বীয় সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শনের জন্য তাদের মন-মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তারকারী উচ্চমান সম্পন্ন সম্মোহক ভাষা দান করা হয়েছিল। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— ‘ইন্না আনযালনাহু কুরআনান আরাবিয়্যাল লাল্লাকুম তা’কিলুন’ (আমি ইহাকে আরবী ভাষার কুরআনরূপে নাযিল করেছি, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে সক্ষম হও)। (সূরা ইউসুফ ২) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে— ‘বি-লিসানিন আরাবিয়্যিম মুবিন’ (অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়)। (সূরা শুআরা ১৯৫) আরও ইরশাদ হয়েছে— ‘ওয়া মা আরসালনা মির রাসূলিন ইল্লা বি-লিসানি কাওমিহি লিইউবাইয়িনা লাহুম’ (আমি প্রত্যেক রাসূলকেই স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি যাতে তাদের সামনে তারা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন)। (সূরা ইবরাহীম ৪) বোদ্ধাগণ বোঝেন যে, স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণের অর্থ শুধু এই নয় যে, নবীগণ স্বজাতির ভাষা বোঝেন এবং জাতিকে সেই ভাষায় বক্তব্য বোঝাতে পারেন। বরং এর মর্ম এই যে, নবীগণের ভাষা হত সমকালীন ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ মানে উত্তীর্ণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মান সম্পন্ন। এর সত্যতার সন্ধান পাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উক্তিতে— ‘আনা আফসাহুল আরাবি’ (আমি সর্বাধিক বিশুদ্ধ আরবী ভাষার অধিকারী)।
আপনারা জানেন, ইসলামের ইতিহাসে যাঁরা বৃহৎ কোন সংস্কার ও গঠনমূলক কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, মানব সমাজের চিন্তা-চেতনা ও গতি-প্রকৃতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে যাদের প্রভাব ছিল গভীর ও সুবিস্তারী তাঁদের প্রায় সকলেই বাগ্মিতা ও লেখনীতে ওজস্বিতার অধিকারী ছিলেন। তাঁদের লেখনী ও বক্তৃতায় আমরা ভাষার সাহিত্য ও আলংকারিক উচ্চমান পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান পাই। হযরত শায়খ জিলানী (রহ.)-এর মাওয়ায়েজ ও ভাষণ সংকলন আজ অবধি ওজস্বী ভাষনের উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ইমাম রব্বানী (হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী [রহ.]-এর পত্রাবলী সাহিত্য স্বকীয়তায়, তেজস্বিতা ও গতিশীলতায় সাবলীলতা ও শব্দচয়নে অক্লেশতায় আবুল ফজল এবং ফয়জীর রচনাশৈলী অপেক্ষা অধিক উচ্চমানসম্পন্ন বৈ নয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থটি যুগপৎ আরবী সাহিত্য ও ইলমী ও শাস্ত্রীয় ভাষার উচ্চমান সম্পন্ন এরূপ এক উজ্জল দৃষ্টান্ত যে, মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন-পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে যার নজীর লক্ষ্য করা যায় না। আরবীর ন্যায় ফার্সী ভাষাতেও শাহ সাহেবের দক্ষতা ও সাবলীলতা ছিল অতুলনীয়। ফার্সী ভাষায় প্রণীত তাঁর ইযালাতুল খাফা গ্রন্থের কোন কোন অংশ তো সাহিত্যের শাহী মার্গ স্পর্শ করেছে।
এই কাহিনী তখনকার যখন আরবী ফার্সী এই দেশীয় মুসলিম সমাজের জ্ঞানচর্চা ও লেখনীর ভাষা ছিল। উর্দু ভাষার প্রচলন লাভের পরে শাহ সাহেবের সন্তানগণ উর্দু ভাষায় লেখালেখি শুরু করেন। শাহ আবদুল কাদের (রহ.)-এর কুরআনের অনুবাদ তৎকালীন দিল্লীর প্রমিত ভাষার উৎকৃষ্ট নমুনা। সাহিত্যগত সৌন্দর্য ও ভাষা সুষমার কারণে অনুবাদটি ক্ল্যাসিক্যাল উর্দু সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। উর্দু ভাষায় রচিত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.)-এর গ্রন্থাদিতে এরূপ সাবলীল সরল ও স্বচ্ছন্দ্য ভাষাশৈলী বিদ্যমান যে, সূক্ষ্ম ও জটিল জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও উর্দু-প্রিয় পাঠকের রুচিতে কোনরূপ বিস্বাদ কি বিরাগ সৃষ্টি করতে পারে না। ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রের নেতৃত্ব দীর্ঘকাল যাবৎ এ দেশের আলেমগণের হাতেই থেকেছে। এ দেশের সাহিত্য জগতে তাঁরাই দিক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। খাজা আলতাফ হোসাইন হালী, মৌলভী নযীর আহমদ দেহলভী এবং মাওলানা শিবলী নোমানীকে উর্দু ভাষার নির্মাতারূপে গণ্য করা উচিত। আলেমগণ সাহিত্যরুচি ও রচনাশৈলীর এরূপ আদর্শ নমুনা রেখে গেছেন যা উর্দু ভাষার এক অমূল্য সম্পদ। মাওলানা হাবিবুর রহমান শেরওয়ানীর মাযামীন এবং মাওলানা সাইয়েদ আবদুল হাই (নাযেমে নাদওয়াতুল উলামা) প্রণীত তাযকিয়ায়ে গুলে রানা (তযকেরাহ গুল-এ-রানা) এবং তারীখে ইয়াদে আইয়াম গ্রন্থ দুটি নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্য-নির্ভুল ইতিহাস-সমৃদ্ধতার পাশাপাশি উচ্চ সাহিত্যমান ও অলংকারে পূর্ণ উর্দু গদ্য সাহিত্যের উজ্জল এক উদাহরণ। মাওলানা সুলাইমান নদভীকে আল্লাহ কল্যাণ দান করুন। ধর্মীয় জ্ঞান গবেষণা বিষয়ক ও সাহিত্যমূলক রচনাদি দ্বারা তিনি উর্দু সাহিত্যকে ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর গ্রন্থাদি অদ্যাবধি এবং দূর-ভবিষ্যত অবধি ভাষা ও সাহিত্যের তুলনামান পরিমাপের নিক্তি ও মানদণ্ড হয়ে থাকবে। তদ্রূপ মাওলানা আবুল কালাম আযাদের রচনাবলী উর্দু ভাষাকে শক্তিমান এবং উর্দুকে নতুন এক শিক্ষিত ভাষাশৈলী দান করেছে। তাঁর সম্পাদিত আল-হেলাল পত্রিকার যাদুকরী লেখাসমূহ এক কালে গোটা ভারতবর্ষকে সম্মোহিত করে রেখেছিল। তাঁর বিশেষ রচনাশৈলী আজ অবধি সাহিত্য জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছে। আলেমগণের এই জাগ্রত মস্তিষ্কতা ও যুগ সচেতনতার কারণেই দেশ গঠন ও দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধনে আলেমগণের নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ কিংবা দেশের সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে কখনও উত্থাপিত হয়নি। তাঁরা নিজেদেরকে জনবিচ্ছিন্ন উপদ্বীপ বানিয়ে রাখার চেষ্টা করেননি। অন্যান্য মুসলিম দেশের আলেমগণের ন্যায় তাঁরা যুগের নকীব দল হতে দূরত্ব বজায় রেখে চলেননি।
তাঁরা দাওয়াতী কার্যক্রমে ও দ্বীনের লক্ষ্য অর্জনে স্বদেশের ভাষা ব্যবহার করতেন এবং সাহিত্যিক মহলে সমাদৃত ও প্রশংসিত উচ্চমানের ভাষা ব্যবহার করতেন। আমাদের উচিত এই কর্মধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখা, এই উত্তরাধিকার-লব্ধ সম্পদকে সংরক্ষণ করা। আমরা যদি দ্বীনের কার্যকর খেদমত আঞ্জামে অভিলাষী হই এবং বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা সাধারণ ও বিশিষ্টজন সকলের নিকট পৌঁছাতে চাই তাহলে আমাদেরকে এই যুগেও নিজেদের রচনা ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে সাবলীল ও আকর্ষণীয় ভাষা প্রয়োগের কৌশল এবং সৃষ্টিশীল ভাষাশৈলী প্রয়োগের কৌশল আয়ত্ব করতে হবে। বক্তৃতা ও রচনাবলীকে এবং প্রতিপাদ্য বিষয়কে প্রচলিত সাহিত্যের উচ্চমানে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এতে না আপনাদের মান-মর্যাদার হানী হবে, না পূর্বসুরীদের অবলম্বিত পথ পরিহারের দোষ আপনাদের উপর আরোপিত হবে। বরং তা হবে দ্বীনের হেকমত ও চাহিদার সঙ্গে পর্বতোভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।
📄 আরবী ভাষায় দক্ষতা অর্জন
দ্বিতীয় কথা এই যে, বর্তমানে আরবী ভাষা শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত একটি ভাষা। আরব দেশসমূহে এই ভাষা বর্তমানে উৎকর্ষের শীর্ষে উপনীত পূর্ণ যৌবনদীপ্ত এক ভাষা। রচনা ও সংকলন, বক্তৃতা ও ভাষণ, রাজনীতি ও সাংবাদিকতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শন এবং আইন-কানুন সহ সর্বক্ষেত্রে এই ভাষা বর্তমানে প্রতাপ-গর্বিতরূপে বিচরণশীল। আরবী মাদরাসাগুলোতে বর্তমানে মারাত্মক এক ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এখানে ধারণা করা হয় যে, তাফসীর, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রেই প্রাচীন আরবীর অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ। অন্যত্র এর অস্তিত্ব এখন বিলুপ্ত। আরবী ভাষার নামে এক নবতর ভাষা জন্মলাভ করেছে এবং এর মধ্যে ইংরেজী ও ফরাসী শব্দ বহুল পরিমাণে কোথাও সরাসরি কোথাও আরবীরূপ নিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। ভ্রান্ত এই ধারণার ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এক জাতীয় ভীতি ও হতাশার শিকার হয়ে পড়েছে। আপনারা যদি আমার উপর আস্থা রাখেন তাহলে আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করব যে, 'নতুন আরবী' বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব কোথাও নেই। মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্বান ও লেখক শ্রেণী বর্তমানে যে ভাষা ব্যবহার করে থাকেন কুরআন, হাদীস ও ইসলাম-যুগের বরং প্রাক-ইসলামী যুগেরও ভাষার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত নিবিড়। আধুনিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও তাঁরা আরবী ভাষার প্রাচীন সাহিত্য ভাণ্ডার এবং কুরআন ও হাদীস থেকেই প্রয়োজনীয় শব্দাবলী চয়ন করে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁদের যে অবদান ও ভূমিকা তা যেমন বিশ্বয়কর তেমন প্রশংসনীয়ও বটে। নেপোলিয়ন কর্তৃক মিশর আক্রান্ত হওয়ার পর যে সকল পাশ্চাত্য শব্দাবলী আরবী ভাষায় অনুপ্রবেশ করেছিল তা একটি একটি করে মূল আরবী ভাষা হতে বহিষ্কৃত হয়েছে এবং তদস্থলে বিশুদ্ধ আরবী শব্দাবলী ব্যবহারের প্রচলন দান করা হয়েছে। বর্তমানে আরব দেশসমূহের ভাষা ও সাহিত্যমান এত উচ্চপর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং সংবাদ ও প্রচার জগত আরবীর সমৃদ্ধ ভাণ্ডারে লুকায়িত ধন-ঐশ্বর্যকে এত ব্যাপক প্রচলন দান করেছে যে, এই ভাষায় কোন কাজ করতে গেলে অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরলস সাধনার মাধ্যমে এই ভাষায় দক্ষতা ও বৈদগ্ধ অর্জন ব্যতীত গত্যন্তর নাই। আমাদের মাদরাসাগুলোতে বর্তমানে যে পদ্ধতিতে, যে মানের আরবী ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষাদান করা হচ্ছে তাতে আর যাই হোক আরব দেশসমূহে তা দিয়ে কোন ইলমী খেদমত ও দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা অসম্ভব। আপনাদের যদি আরব দেশসমূহে দ্বীনী দাওয়াত ও তাবলীগের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় অথবা ভারতীয় দ্বীনী আন্দোলন ও কার্যক্রমের সঙ্গে তাদেরকে পরিচিত করে তোলার প্রয়োজন অনুভূত হয় তাহলে আপনাদেরকে অবশ্যই উচ্চমানের ভাষা দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আরব দেশসমূহ হতে ভারত এখন দূরে থাকতে পারে না। বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মধ্যপ্রাচ্য এখনও বিশ্বের হৃৎপিণ্ড এবং স্নায়ুকেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে এবং দ্বীন ও মুসলমানের সঠিক দিক-নির্দেশনার কার্যে আলেমগণ যদি অবহেলা প্রদর্শন করেন, তবে নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব এই বিষয়টির প্রতিও মাদরাসাগুলোর বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা আবশ্যক। ভাষা ও সাহিত্য সতত জীবন্ত ও চলমান। এ থেকে কোন ব্যক্তি কি প্রতিষ্ঠান কিছুদিনের জন্যও যদি দূর-অবস্থান গ্রহণ করে তবে তজ্জনিত ক্ষতি ও ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে বহুকাল।
দ্বিতীয় কথা এই যে, বর্তমানে আরবী ভাষা শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত একটি ভাষা। আরব দেশসমূহে এই ভাষা বর্তমানে উৎকর্ষের শীর্ষে উপনীত পূর্ণ যৌবনদীপ্ত এক ভাষা। রচনা ও সংকলন, বক্তৃতা ও ভাষণ, রাজনীতি ও সাংবাদিকতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শন এবং আইন-কানুন সহ সর্বক্ষেত্রে এই ভাষা বর্তমানে প্রতাপ-গর্বিতরূপে বিচরণশীল। আরবী মাদরাসাগুলোতে বর্তমানে মারাত্মক এক ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এখানে ধারণা করা হয় যে, তাফসীর, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রেই প্রাচীন আরবীর অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ। অন্যত্র এর অস্তিত্ব এখন বিলুপ্ত। আরবী ভাষার নামে এক নবতর ভাষা জন্মলাভ করেছে এবং এর মধ্যে ইংরেজী ও ফরাসী শব্দ বহুল পরিমাণে কোথাও সরাসরি কোথাও আরবীরূপ নিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। ভ্রান্ত এই ধারণার ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এক জাতীয় ভীতি ও হতাশার শিকার হয়ে পড়েছে। আপনারা যদি আমার উপর আস্থা রাখেন তাহলে আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করব যে, 'নতুন আরবী' বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব কোথাও নেই। মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্বান ও লেখক শ্রেণী বর্তমানে যে ভাষা ব্যবহার করে থাকেন কুরআন, হাদীস ও ইসলাম-যুগের বরং প্রাক-ইসলামী যুগেরও ভাষার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত নিবিড়। আধুনিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও তাঁরা আরবী ভাষার প্রাচীন সাহিত্য ভাণ্ডার এবং কুরআন ও হাদীস থেকেই প্রয়োজনীয় শব্দাবলী চয়ন করে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁদের যে অবদান ও ভূমিকা তা যেমন বিশ্বয়কর তেমন প্রশংসনীয়ও বটে। নেপোলিয়ন কর্তৃক মিশর আক্রান্ত হওয়ার পর যে সকল পাশ্চাত্য শব্দাবলী আরবী ভাষায় অনুপ্রবেশ করেছিল তা একটি একটি করে মূল আরবী ভাষা হতে বহিষ্কৃত হয়েছে এবং তদস্থলে বিশুদ্ধ আরবী শব্দাবলী ব্যবহারের প্রচলন দান করা হয়েছে। বর্তমানে আরব দেশসমূহের ভাষা ও সাহিত্যমান এত উচ্চপর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং সংবাদ ও প্রচার জগত আরবীর সমৃদ্ধ ভাণ্ডারে লুকায়িত ধন-ঐশ্বর্যকে এত ব্যাপক প্রচলন দান করেছে যে, এই ভাষায় কোন কাজ করতে গেলে অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরলস সাধনার মাধ্যমে এই ভাষায় দক্ষতা ও বৈদগ্ধ অর্জন ব্যতীত গত্যন্তর নাই। আমাদের মাদরাসাগুলোতে বর্তমানে যে পদ্ধতিতে, যে মানের আরবী ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষাদান করা হচ্ছে তাতে আর যাই হোক আরব দেশসমূহে তা দিয়ে কোন ইলমী খেদমত ও দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা অসম্ভব। আপনাদের যদি আরব দেশসমূহে দ্বীনী দাওয়াত ও তাবলীগের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় অথবা ভারতীয় দ্বীনী আন্দোলন ও কার্যক্রমের সঙ্গে তাদেরকে পরিচিত করে তোলার প্রয়োজন অনুভূত হয় তাহলে আপনাদেরকে অবশ্যই উচ্চমানের ভাষা দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আরব দেশসমূহ হতে ভারত এখন দূরে থাকতে পারে না। বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মধ্যপ্রাচ্য এখনও বিশ্বের হৃৎপিণ্ড এবং স্নায়ুকেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে এবং দ্বীন ও মুসলমানের সঠিক দিক-নির্দেশনার কার্যে আলেমগণ যদি অবহেলা প্রদর্শন করেন, তবে নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব এই বিষয়টির প্রতিও মাদরাসাগুলোর বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা আবশ্যক। ভাষা ও সাহিত্য সতত জীবন্ত ও চলমান। এ থেকে কোন ব্যক্তি কি প্রতিষ্ঠান কিছুদিনের জন্যও যদি দূর-অবস্থান গ্রহণ করে তবে তজ্জনিত ক্ষতি ও ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে বহুকাল।
📄 বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাসের সংরক্ষণ
ভাই ও বন্ধুগণ! আমি আপনাদের অনেক সময় নিয়ে নিলাম। কিন্তু কী করব বলুন— ‘লাযীয বুদ হিকায়াত দরায তার গুফতাম’ (কাহিনী তো বড় মজাদার, বিবরণ-আলাপ তাই করতে হল দীর্ঘ)।
বিদায় গ্রহণের পূর্বে একটি শেষ কথা বলতে চাই। কথাটি যদিও শেষে বলছি কিন্তু এর গুরুত্ব পূর্ববর্তী বিষয়গুলোর তুলনায় কোন অংশে কম নয়। আপনাদের ও আমাদের যাঁরা আসলাফ ও পূর্বসূরী তাঁদের সর্বাধিক মহান কীর্তি হল, তাঁরা মুসলিম সমাজের দ্বীনী চেতনা ও দ্বীনী মূল্যবোধের হেফাযত করেছেন। সমকালীন সমূহ ফেতনা ও বৈরী সঙ্কটের মোকাবেলায় তাঁরা ছিলেন নিরলস ও সংশপ্তক। রসম ও রেওয়াজ, বেদআত ও কুসংস্কার এবং জাহেলী রীতি-নীতি ও সংস্কারের বিরুদ্ধে নিরন্তর দাওয়াত ও সংগ্রামে কোন প্রকার অবহেলা কি শৈথিল্য তাঁরা প্রদর্শন করেননি। সেই সব পূর্বসূরীদের মধ্যে হযরত মাওলানা শাহ মোহাম্মদ ইসমাইল, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর ন্যায় পর্বতসম অটল নকীবে শরীয়তের নাম উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁরা সবকিছুই বরদাশত করেছেন কিন্তু বিদআত কি শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ তাঁরা কখনও বরদাশত করেননি। ইংরেজ শাসনামলে যখন এই দেশে পাশ্চাত্য রীতি-নীতি ও সভ্যতা ও নাস্তিক্য ধ্যান-ধারণা ও আকীদা বিশ্বাস প্লাবনের রূপ ধারণ করল তখন পর্বতসম দৃঢ়তা নিয়ে নিজেদের আদর্শ ও সভ্যতা-সংস্কৃতিকে তাঁরা সুপ্রতিষ্ঠিত রেখেছেন, নিজেকে কি সমাজকে সেই প্লাবনে ভেসে যেতে দেননি। আপনাদের আসলাফ ও পূর্বসূরীগণ ছিলেন বুদ্ধি-দীপ্ত চেতনার অধিকারী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও দ্বীনী মূল্যবোধের বিষয়ে নিরতিশয় আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। বহুরূপী যে বিদআতসমূহ মুসলমানদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হতে চলেছিল তাঁরা এক মুহূর্তের জন্যও সেগুলোকে বৈধতার সনদ দেননি। তাঁরা শরীয়ত রক্ষায় নিঃস্বার্থ ও একনিষ্ঠ প্রহরীর দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। শরীয়তের কোনরূপ বিকৃতি কি কোন বিদআত তাঁদের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়নি। জনসাধারণের গালি-গালাজ ও তিরস্কার তাদের উপেক্ষা ও জ্বালাতন এমনকি তাঁদের বিরুদ্ধে কুফরীর ফতওয়া— এসব কিছুই তাঁরা বরদাশত করেছেন কিন্তু নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রশ্নে তাঁরা এতটুকু আপোষ করেননি। সমাজের লাখ লাখ মানুষ যে আজ সর্বনাশা বিদআত হতে সুরক্ষিত আছে এবং এখন পর্যন্তও যে মুসলিম সমাজে ঐ সকল বিদআত সর্বতোভাবে গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃতি পায়নি তা তাঁদের ঐ সর্বংসহা প্রচেষ্টা ও সংগ্রামেরই ফসল। আল্লাহ তাআলা শরীয়তের ঐ সকল সেবাকর্মীর, দ্বীনের ঐ সকল রক্ষকের কবরকে শীতল রাখুন এবং উম্মতের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিদান দান করুন। আমীন!
আসমান উনকি লাহাদ পার শাবনাম আফশানি কারে
সাবযা নূরসতা ইস ঘর কি নেগাহবানি কারে
তাঁর সমাধিকে আসমান করুক শিশিরসিক্ত ঐ গৃহকে পাহারা দিক নতুন গজানো সবুজ তৃণলতা।
তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব যে অসামান্য নিষ্ঠা ও সুন্দর ও সুচারুরূপে আঞ্জাম দিয়েছেন তাতে তাঁদের দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা, তাঁদের দ্বীনী উপলব্ধি, তাঁদের জ্ঞানের গভীরতা ও দৃঢ়তার সত্যিকারের পরিচয় আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘মিনাল মুমিনিনা রিজালুন সাদাকু মা আহাদুল্লাহা আলাইহি ফামিনহুম মান কাদা নাহবাহু ওয়া মিনহুম মাই ইয়ানতাযিরু ওয়ামা বাদ্দালু তাবদিলা’— মুমিনদের মধ্য থেকে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, আর তাদের কেউ কেউ তাদের জীবন দান করেছে। তারা তাদের অঙ্গীকারের কোন পরিবর্তন করে নাই। (সুরা আহযাব ২৩)
তাঁরা তাঁদের জীবনকে রক্ষাপ্রাচীর বানিয়ে এই বাগানের হেফাযত করেছেন। তাঁরা তাঁদের রক্ত দ্বারা তার বৃক্ষাদি সিঞ্চিত করেছেন এবং আমাদেরকে দেখিয়ে গেছেন যে, বাগে শরীয়তের রক্ষণাবেক্ষণ ও মালিগিরি এইভাবেই করতে হয়। ‘আগাশতহ ঈম হার সারে খারে বেখুনে দিল, কানূনে বাগবানি সায়রা নুশতাহ ঈম’— কলজের খুন দ্বারা প্রতিটি কাঁটার মাথা নিষিক্ত করেছি (এবং তা দ্বারা) বিয়াবানের বাগান পরিচর্যার নিয়ম-কানুন লিখে দিয়েছি।
ভাই ও বন্ধুগণ! আমি আপনাদের অনেক সময় নিয়ে নিলাম। কিন্তু কী করব বলুন— ‘লাযীয বুদ হিকায়াত দরায তার গুফতাম’ (কাহিনী তো বড় মজাদার, বিবরণ-আলাপ তাই করতে হল দীর্ঘ)।
বিদায় গ্রহণের পূর্বে একটি শেষ কথা বলতে চাই। কথাটি যদিও শেষে বলছি কিন্তু এর গুরুত্ব পূর্ববর্তী বিষয়গুলোর তুলনায় কোন অংশে কম নয়। আপনাদের ও আমাদের যাঁরা আসলাফ ও পূর্বসূরী তাঁদের সর্বাধিক মহান কীর্তি হল, তাঁরা মুসলিম সমাজের দ্বীনী চেতনা ও দ্বীনী মূল্যবোধের হেফাযত করেছেন। সমকালীন সমূহ ফেতনা ও বৈরী সঙ্কটের মোকাবেলায় তাঁরা ছিলেন নিরলস ও সংশপ্তক। রসম ও রেওয়াজ, বেদআত ও কুসংস্কার এবং জাহেলী রীতি-নীতি ও সংস্কারের বিরুদ্ধে নিরন্তর দাওয়াত ও সংগ্রামে কোন প্রকার অবহেলা কি শৈথিল্য তাঁরা প্রদর্শন করেননি। সেই সব পূর্বসূরীদের মধ্যে হযরত মাওলানা শাহ মোহাম্মদ ইসমাইল, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর ন্যায় পর্বতসম অটল নকীবে শরীয়তের নাম উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁরা সবকিছুই বরদাশত করেছেন কিন্তু বিদআত কি শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ তাঁরা কখনও বরদাশত করেননি। ইংরেজ শাসনামলে যখন এই দেশে পাশ্চাত্য রীতি-নীতি ও সভ্যতা ও নাস্তিক্য ধ্যান-ধারণা ও আকীদা বিশ্বাস প্লাবনের রূপ ধারণ করল তখন পর্বতসম দৃঢ়তা নিয়ে নিজেদের আদর্শ ও সভ্যতা-সংস্কৃতিকে তাঁরা সুপ্রতিষ্ঠিত রেখেছেন, নিজেকে কি সমাজকে সেই প্লাবনে ভেসে যেতে দেননি। আপনাদের আসলাফ ও পূর্বসূরীগণ ছিলেন বুদ্ধি-দীপ্ত চেতনার অধিকারী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও দ্বীনী মূল্যবোধের বিষয়ে নিরতিশয় আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। বহুরূপী যে বিদআতসমূহ মুসলমানদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হতে চলেছিল তাঁরা এক মুহূর্তের জন্যও সেগুলোকে বৈধতার সনদ দেননি। তাঁরা শরীয়ত রক্ষায় নিঃস্বার্থ ও একনিষ্ঠ প্রহরীর দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। শরীয়তের কোনরূপ বিকৃতি কি কোন বিদআত তাঁদের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়নি। জনসাধারণের গালি-গালাজ ও তিরস্কার তাদের উপেক্ষা ও জ্বালাতন এমনকি তাঁদের বিরুদ্ধে কুফরীর ফতওয়া— এসব কিছুই তাঁরা বরদাশত করেছেন কিন্তু নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রশ্নে তাঁরা এতটুকু আপোষ করেননি। সমাজের লাখ লাখ মানুষ যে আজ সর্বনাশা বিদআত হতে সুরক্ষিত আছে এবং এখন পর্যন্তও যে মুসলিম সমাজে ঐ সকল বিদআত সর্বতোভাবে গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃতি পায়নি তা তাঁদের ঐ সর্বংসহা প্রচেষ্টা ও সংগ্রামেরই ফসল। আল্লাহ তাআলা শরীয়তের ঐ সকল সেবাকর্মীর, দ্বীনের ঐ সকল রক্ষকের কবরকে শীতল রাখুন এবং উম্মতের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিদান দান করুন। আমীন!
আসমান উনকি লাহাদ পার শাবনাম আফশানি কারে
সাবযা নূরসতা ইস ঘর কি নেগাহবানি কারে
তাঁর সমাধিকে আসমান করুক শিশিরসিক্ত ঐ গৃহকে পাহারা দিক নতুন গজানো সবুজ তৃণলতা।
তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব যে অসামান্য নিষ্ঠা ও সুন্দর ও সুচারুরূপে আঞ্জাম দিয়েছেন তাতে তাঁদের দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা, তাঁদের দ্বীনী উপলব্ধি, তাঁদের জ্ঞানের গভীরতা ও দৃঢ়তার সত্যিকারের পরিচয় আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘মিনাল মুমিনিনা রিজালুন সাদাকু মা আহাদুল্লাহা আলাইহি ফামিনহুম মান কাদা নাহবাহু ওয়া মিনহুম মাই ইয়ানতাযিরু ওয়ামা বাদ্দালু তাবদিলা’— মুমিনদের মধ্য থেকে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, আর তাদের কেউ কেউ তাদের জীবন দান করেছে। তারা তাদের অঙ্গীকারের কোন পরিবর্তন করে নাই। (সুরা আহযাব ২৩)
তাঁরা তাঁদের জীবনকে রক্ষাপ্রাচীর বানিয়ে এই বাগানের হেফাযত করেছেন। তাঁরা তাঁদের রক্ত দ্বারা তার বৃক্ষাদি সিঞ্চিত করেছেন এবং আমাদেরকে দেখিয়ে গেছেন যে, বাগে শরীয়তের রক্ষণাবেক্ষণ ও মালিগিরি এইভাবেই করতে হয়। ‘আগাশতহ ঈম হার সারে খারে বেখুনে দিল, কানূনে বাগবানি সায়রা নুশতাহ ঈম’— কলজের খুন দ্বারা প্রতিটি কাঁটার মাথা নিষিক্ত করেছি (এবং তা দ্বারা) বিয়াবানের বাগান পরিচর্যার নিয়ম-কানুন লিখে দিয়েছি।
📄 আধুনিক যুগের ফেতনা
সেই সঙ্গে আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, আধুনিক যুগে নতুন নতুন ফেতনা আত্মপ্রকাশ করছে। পুরানো জাহিলিয়াতের প্রকাশ ঘটছে নতুন রূপে। পূর্বে ছিল বিদআতের সমস্যা, কিন্তু এখন প্রচলন লাভ করছে স্পষ্ট পৌত্তলিকতা ও প্রাচীন মূর্তিপূজা সদৃশ ধ্যান-ধারণা ও কার্যকলাপ। এই পরিস্থিতি আমাদের দ্বীনী মূল্যবোধ, আমাদের দ্বীনী স্বকীয়তা ও আমাদের তাওহীদী আকীদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। দেখার বিষয় হল— যারা বিদআত ও সাধারণ রসম-রেওয়াজকে পর্যন্ত বরদাশত করেননি তারা এইসব শিরক-আশ্রয়ী রসম রেওয়াজকে ও শিরকী কর্মকাণ্ডকে বরদাশত করেন কীরূপে এবং এসবের বিরুদ্ধে তাদের কর্মধারাই বা কী হয়। আমাদের পূর্বসূরীগণের ইস্পাত-সম দ্বীনী দৃঢ়তা, দ্বীনের ব্যাপারে তাঁদের অসম সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা আমরা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করি এবং আল্লাহ ও মানুষের সামনে এই সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত যে, বাতিলের মোকাবেলায় তাঁরা কখনও মাথা নত করেননি, কখনও অস্ত্র ত্যাগ করেননি। দেখার বিষয় হল, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করবে এবং ইতিহাসের পাতায় আমাদের সম্পর্কে কীরূপ চিত্র অঙ্কিত হবে।
সেই সঙ্গে আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, আধুনিক যুগে নতুন নতুন ফেতনা আত্মপ্রকাশ করছে। পুরানো জাহিলিয়াতের প্রকাশ ঘটছে নতুন রূপে। পূর্বে ছিল বিদআতের সমস্যা, কিন্তু এখন প্রচলন লাভ করছে স্পষ্ট পৌত্তলিকতা ও প্রাচীন মূর্তিপূজা সদৃশ ধ্যান-ধারণা ও কার্যকলাপ। এই পরিস্থিতি আমাদের দ্বীনী মূল্যবোধ, আমাদের দ্বীনী স্বকীয়তা ও আমাদের তাওহীদী আকীদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। দেখার বিষয় হল— যারা বিদআত ও সাধারণ রসম-রেওয়াজকে পর্যন্ত বরদাশত করেননি তারা এইসব শিরক-আশ্রয়ী রসম রেওয়াজকে ও শিরকী কর্মকাণ্ডকে বরদাশত করেন কীরূপে এবং এসবের বিরুদ্ধে তাদের কর্মধারাই বা কী হয়। আমাদের পূর্বসূরীগণের ইস্পাত-সম দ্বীনী দৃঢ়তা, দ্বীনের ব্যাপারে তাঁদের অসম সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা আমরা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করি এবং আল্লাহ ও মানুষের সামনে এই সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত যে, বাতিলের মোকাবেলায় তাঁরা কখনও মাথা নত করেননি, কখনও অস্ত্র ত্যাগ করেননি। দেখার বিষয় হল, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করবে এবং ইতিহাসের পাতায় আমাদের সম্পর্কে কীরূপ চিত্র অঙ্কিত হবে।