📘 উলামা তলাবা > 📄 দ্বীনের প্রতিনিধিত্বের জন্য প্রয়োজন বিভিন্নমুখী যোগ্যতার

📄 দ্বীনের প্রতিনিধিত্বের জন্য প্রয়োজন বিভিন্নমুখী যোগ্যতার


বন্ধুগণ! আধুনিক বিপ্লবের এই যুগে দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব ও ইসলামের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্যই শুধু নয়; বরং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতার চিত্র রূপায়নের জন্যও প্রয়োজন অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জনের এবং বিভিন্নমুখী যোগ্যতার অধিকারী হওয়ার। আপনারা ইসলামের সৈনিক। জীবনের বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য আপনারা নিজেকে প্রস্তুত করছেন। কোন সেনা প্রশিক্ষণ শিবির এবং সেখানে প্রশিক্ষণ রত সৈনিকদের জন্য সর্বাধিক অসঙ্গত ও মারাত্মক বিতর্ক হল নতুন ও পুরাতন অস্ত্র বিতর্ক, নতুন ও পুরাতন রণকৌশল বিতর্ক। সৈনিকের জন্য কোন অস্ত্রই পুরাতন নয়, কোন অস্ত্রই নতুন নয়। তার দেখা উচিত কোন অস্ত্র যুদ্ধের জন্য সর্বাধিক কার্যকর, কোন রণকৌশল অপেক্ষাকৃত অধিক ফলপ্রসূ। সৈনিকের জন্য মুঢ়তা ও হঠকারিতার অবকাশ নেই। না বিশেষ কোন অস্ত্রের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ও জিদ থাকা উচিত, না বিশেষ কোন রণকৌশলের প্রতি। প্রয়োজনীয় ও কার্যকর সকল অস্ত্রে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ হওয়া তার জন্য অপরিহার্য। আরবী কবি অনেক পূর্বেই বলেছেন—

‘কুল্লু ইমরায়িন ইয়াসআ ইলা ইয়াউমিল হিয়া-জি বিমা আসতাআদ্দা’

প্রত্যেক ব্যক্তিই যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে তার প্রস্তুতি ঋদ্ধতা নিয়ে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 নবাগত সকল মতবাদ ও তন্ত্র মন্ত্র সম্পর্কে স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকা অপরিহার্য

📄 নবাগত সকল মতবাদ ও তন্ত্র মন্ত্র সম্পর্কে স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকা অপরিহার্য


প্রিয় বন্ধুগণ! আপনাদের উচিত, নবাগত সকল ফেতনা সম্পর্কে অবগত থাকা। তবে কোন বিষয়ে ভাসা ভাসা জ্ঞান ও অভিজ্ঞান অজ্ঞানতা অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর। বর্তমানে মাদরাসাগুলোতে কোন কোন ফেতনা ও মতবাদ এবং চিন্তাধারা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। তবে তা ফ্যাশন হিসাবে, নামকাওয়াস্তে। ফলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসহ গবেষণামূলক অধ্যয়ন তো দূরের ব্যাপার, এসব বিষয়ের সাধারণ তথ্যাদিও শিক্ষার্থীদের ভাণ্ডারে নিতান্ত স্বল্পই সঞ্চিত হয়। এসব বিষয়ের স্বরূপ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণাও তাদের অর্জিত হয় না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক উস্তাদের দিক-নির্দেশনায় এবং তাদের তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যয়ন করা উচিত এবং তুলনামূলক অধ্যয়ন করত ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য সপ্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। কার্যটি দুরূহ, কিন্তু অপরিহার্য। কার্যটি যদি মাদরাসার তত্ত্বাবধানে সুসংহত ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় না হয় তবে কার্যটি হবে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পদ্ধতিতে, যা হবে অকার্যকর ও নিষ্ফল।

📘 উলামা তলাবা > 📄 আধুনিক বিষয়ে অধ্যয়নের সমস্যা ও সমস্যা উত্তরণে করণীয়

📄 আধুনিক বিষয়ে অধ্যয়নের সমস্যা ও সমস্যা উত্তরণে করণীয়


মাদরাসাগুলোতে আধুনিক বিষয় অধ্যয়নের প্রতি আকর্ষণ ও আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এসব অধ্যয়নে অভিনিবিষ্টতা ও গভীরতা নেই। আমি আধুনিক বিষয় অধ্যয়নের জোরালো সমর্থক। কিন্তু আমি নির্দ্বিধায় বলছি, বিষয়টি এত সহজ ও হালকা নয়। এর জন্য প্রয়োজন গ্রন্থ নির্বাচন ও সেগুলোর পর্যায়ক্রম নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ দিক-নির্দেশনা ও কোন উপযুক্ত পরামর্শকের নিয়মিত পরামর্শ লাভ। এরও পূর্বে প্রয়োজন অধ্যয়নকারীর মানসিক প্রস্তুতি, যাতে সে অধ্যয়ন দ্বারা সর্বোচ্চ সঠিক জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং তার জ্ঞান সুবিন্যস্ত ও শৃঙ্খলিত আকারে অন্তরে বদ্ধমূল হয় এবং যথাস্থানে সে তার আহরিত জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করতে পারে। ছাত্রদের মেধা ও মনন যদি নির্ভুল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ও শিক্ষকমণ্ডলীর সংসর্গ প্রভাবিত হয়ে পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে যায় তবে পঠিত যে কোন বিষয়কে সে যথাযথ কাজে লাগাতে পারবে, অর্জিত তথ্যাদির কাঁচামাল দ্বারা হিতকর ও কার্যকর সামগ্রী উৎপাদনে সবিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে। ফলে তার অর্জিত জ্ঞান হবে অভাবনীয় ও পর্যাপ্ত ফলপ্রসূ। তখন সে সাহিত্য ও ইতিহাস ও সাধারণ জ্ঞান এমনকি দ্বীন-সংশ্লিষ্ট নয় এমন জ্ঞান দ্বারাও দ্বীনের সেবা-যত্নে ও দ্বীন সংরক্ষণে এরূপ অভাবনীয় ভূমিকা ও অবদান রাখতে পারবে, যা অনেক সময় দ্বীনী বিষয় দ্বারাও সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তখন ‘খালিছাম মিম বাইনি ফারছিও ওয়া দামিল লাবানান সাইগাল লিশ শারিবি-ন’ (রক্ত ও উদর-বর্জের মধ্য হতে পানকারীদের জন্য বিশুদ্ধ ও সুপেয় দুগ্ধ নির্গত হওয়ার) তাৎপর্য ও স্বরূপ নিজের সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে এর ব্যতিক্রম ঘটলে, দ্বীনের প্রকৃত রূপ হৃদয় ও মস্তিষ্কে বদ্ধমূল না হলে, মেধা ও মনন সুষ্ঠু পরিচর্যা ও তত্ত্বাবধানের অভাবে বক্রতা ও ভ্রান্তি পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে গেলে তার সবকিছুই দোষনীয় ও অসুস্থতার প্রতিকৃতি হয়ে যাবে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 ভাষা ও সাহিত্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা

📄 ভাষা ও সাহিত্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা


এই পর্যায়ে আমি আরও দুটো বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কোন দেশে দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও দ্বীনী কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ঐ দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ দখল থাকা জরুরী। রুচিশীল ও মানোত্তীর্ণ ভাষায় নিজের চিন্তা-চেতনা প্রকাশের যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। বক্তৃতা ও লেখনীতে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় ভাষাশৈলী প্রয়োগের দক্ষতা থাকতে হবে। এটা এমনই এক প্রকৃতিগত সত্য ও অনিবার্য বাস্তবতা যে, নবীগণকে পর্যন্ত স্বীয় সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শনের জন্য তাদের মন-মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তারকারী উচ্চমান সম্পন্ন সম্মোহক ভাষা দান করা হয়েছিল। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— ‘ইন্না আনযালনাহু কুরআনান আরাবিয়্যাল লাল্লাকুম তা’কিলুন’ (আমি ইহাকে আরবী ভাষার কুরআনরূপে নাযিল করেছি, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে সক্ষম হও)। (সূরা ইউসুফ ২) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে— ‘বি-লিসানিন আরাবিয়্যিম মুবিন’ (অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়)। (সূরা শুআরা ১৯৫) আরও ইরশাদ হয়েছে— ‘ওয়া মা আরসালনা মির রাসূলিন ইল্লা বি-লিসানি কাওমিহি লিইউবাইয়িনা লাহুম’ (আমি প্রত্যেক রাসূলকেই স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি যাতে তাদের সামনে তারা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন)। (সূরা ইবরাহীম ৪) বোদ্ধাগণ বোঝেন যে, স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণের অর্থ শুধু এই নয় যে, নবীগণ স্বজাতির ভাষা বোঝেন এবং জাতিকে সেই ভাষায় বক্তব্য বোঝাতে পারেন। বরং এর মর্ম এই যে, নবীগণের ভাষা হত সমকালীন ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ মানে উত্তীর্ণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মান সম্পন্ন। এর সত্যতার সন্ধান পাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উক্তিতে— ‘আনা আফসাহুল আরাবি’ (আমি সর্বাধিক বিশুদ্ধ আরবী ভাষার অধিকারী)।

আপনারা জানেন, ইসলামের ইতিহাসে যাঁরা বৃহৎ কোন সংস্কার ও গঠনমূলক কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, মানব সমাজের চিন্তা-চেতনা ও গতি-প্রকৃতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে যাদের প্রভাব ছিল গভীর ও সুবিস্তারী তাঁদের প্রায় সকলেই বাগ্মিতা ও লেখনীতে ওজস্বিতার অধিকারী ছিলেন। তাঁদের লেখনী ও বক্তৃতায় আমরা ভাষার সাহিত্য ও আলংকারিক উচ্চমান পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান পাই। হযরত শায়খ জিলানী (রহ.)-এর মাওয়ায়েজ ও ভাষণ সংকলন আজ অবধি ওজস্বী ভাষনের উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ইমাম রব্বানী (হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী [রহ.]-এর পত্রাবলী সাহিত্য স্বকীয়তায়, তেজস্বিতা ও গতিশীলতায় সাবলীলতা ও শব্দচয়নে অক্লেশতায় আবুল ফজল এবং ফয়জীর রচনাশৈলী অপেক্ষা অধিক উচ্চমানসম্পন্ন বৈ নয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থটি যুগপৎ আরবী সাহিত্য ও ইলমী ও শাস্ত্রীয় ভাষার উচ্চমান সম্পন্ন এরূপ এক উজ্জল দৃষ্টান্ত যে, মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন-পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে যার নজীর লক্ষ্য করা যায় না। আরবীর ন্যায় ফার্সী ভাষাতেও শাহ সাহেবের দক্ষতা ও সাবলীলতা ছিল অতুলনীয়। ফার্সী ভাষায় প্রণীত তাঁর ইযালাতুল খাফা গ্রন্থের কোন কোন অংশ তো সাহিত্যের শাহী মার্গ স্পর্শ করেছে।

এই কাহিনী তখনকার যখন আরবী ফার্সী এই দেশীয় মুসলিম সমাজের জ্ঞানচর্চা ও লেখনীর ভাষা ছিল। উর্দু ভাষার প্রচলন লাভের পরে শাহ সাহেবের সন্তানগণ উর্দু ভাষায় লেখালেখি শুরু করেন। শাহ আবদুল কাদের (রহ.)-এর কুরআনের অনুবাদ তৎকালীন দিল্লীর প্রমিত ভাষার উৎকৃষ্ট নমুনা। সাহিত্যগত সৌন্দর্য ও ভাষা সুষমার কারণে অনুবাদটি ক্ল্যাসিক্যাল উর্দু সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। উর্দু ভাষায় রচিত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.)-এর গ্রন্থাদিতে এরূপ সাবলীল সরল ও স্বচ্ছন্দ্য ভাষাশৈলী বিদ্যমান যে, সূক্ষ্ম ও জটিল জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও উর্দু-প্রিয় পাঠকের রুচিতে কোনরূপ বিস্বাদ কি বিরাগ সৃষ্টি করতে পারে না। ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রের নেতৃত্ব দীর্ঘকাল যাবৎ এ দেশের আলেমগণের হাতেই থেকেছে। এ দেশের সাহিত্য জগতে তাঁরাই দিক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। খাজা আলতাফ হোসাইন হালী, মৌলভী নযীর আহমদ দেহলভী এবং মাওলানা শিবলী নোমানীকে উর্দু ভাষার নির্মাতারূপে গণ্য করা উচিত। আলেমগণ সাহিত্যরুচি ও রচনাশৈলীর এরূপ আদর্শ নমুনা রেখে গেছেন যা উর্দু ভাষার এক অমূল্য সম্পদ। মাওলানা হাবিবুর রহমান শেরওয়ানীর মাযামীন এবং মাওলানা সাইয়েদ আবদুল হাই (নাযেমে নাদওয়াতুল উলামা) প্রণীত তাযকিয়ায়ে গুলে রানা (তযকেরাহ গুল-এ-রানা) এবং তারীখে ইয়াদে আইয়াম গ্রন্থ দুটি নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্য-নির্ভুল ইতিহাস-সমৃদ্ধতার পাশাপাশি উচ্চ সাহিত্যমান ও অলংকারে পূর্ণ উর্দু গদ্য সাহিত্যের উজ্জল এক উদাহরণ। মাওলানা সুলাইমান নদভীকে আল্লাহ কল্যাণ দান করুন। ধর্মীয় জ্ঞান গবেষণা বিষয়ক ও সাহিত্যমূলক রচনাদি দ্বারা তিনি উর্দু সাহিত্যকে ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর গ্রন্থাদি অদ্যাবধি এবং দূর-ভবিষ্যত অবধি ভাষা ও সাহিত্যের তুলনামান পরিমাপের নিক্তি ও মানদণ্ড হয়ে থাকবে। তদ্রূপ মাওলানা আবুল কালাম আযাদের রচনাবলী উর্দু ভাষাকে শক্তিমান এবং উর্দুকে নতুন এক শিক্ষিত ভাষাশৈলী দান করেছে। তাঁর সম্পাদিত আল-হেলাল পত্রিকার যাদুকরী লেখাসমূহ এক কালে গোটা ভারতবর্ষকে সম্মোহিত করে রেখেছিল। তাঁর বিশেষ রচনাশৈলী আজ অবধি সাহিত্য জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছে। আলেমগণের এই জাগ্রত মস্তিষ্কতা ও যুগ সচেতনতার কারণেই দেশ গঠন ও দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধনে আলেমগণের নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ কিংবা দেশের সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে কখনও উত্থাপিত হয়নি। তাঁরা নিজেদেরকে জনবিচ্ছিন্ন উপদ্বীপ বানিয়ে রাখার চেষ্টা করেননি। অন্যান্য মুসলিম দেশের আলেমগণের ন্যায় তাঁরা যুগের নকীব দল হতে দূরত্ব বজায় রেখে চলেননি।

তাঁরা দাওয়াতী কার্যক্রমে ও দ্বীনের লক্ষ্য অর্জনে স্বদেশের ভাষা ব্যবহার করতেন এবং সাহিত্যিক মহলে সমাদৃত ও প্রশংসিত উচ্চমানের ভাষা ব্যবহার করতেন। আমাদের উচিত এই কর্মধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখা, এই উত্তরাধিকার-লব্ধ সম্পদকে সংরক্ষণ করা। আমরা যদি দ্বীনের কার্যকর খেদমত আঞ্জামে অভিলাষী হই এবং বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা সাধারণ ও বিশিষ্টজন সকলের নিকট পৌঁছাতে চাই তাহলে আমাদেরকে এই যুগেও নিজেদের রচনা ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে সাবলীল ও আকর্ষণীয় ভাষা প্রয়োগের কৌশল এবং সৃষ্টিশীল ভাষাশৈলী প্রয়োগের কৌশল আয়ত্ব করতে হবে। বক্তৃতা ও রচনাবলীকে এবং প্রতিপাদ্য বিষয়কে প্রচলিত সাহিত্যের উচ্চমানে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এতে না আপনাদের মান-মর্যাদার হানী হবে, না পূর্বসুরীদের অবলম্বিত পথ পরিহারের দোষ আপনাদের উপর আরোপিত হবে। বরং তা হবে দ্বীনের হেকমত ও চাহিদার সঙ্গে পর্বতোভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

এই পর্যায়ে আমি আরও দুটো বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কোন দেশে দ্বীনের প্রচার-প্রসার ও দ্বীনী কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ঐ দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ দখল থাকা জরুরী। রুচিশীল ও মানোত্তীর্ণ ভাষায় নিজের চিন্তা-চেতনা প্রকাশের যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। বক্তৃতা ও লেখনীতে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় ভাষাশৈলী প্রয়োগের দক্ষতা থাকতে হবে। এটা এমনই এক প্রকৃতিগত সত্য ও অনিবার্য বাস্তবতা যে, নবীগণকে পর্যন্ত স্বীয় সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শনের জন্য তাদের মন-মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তারকারী উচ্চমান সম্পন্ন সম্মোহক ভাষা দান করা হয়েছিল। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— ‘ইন্না আনযালনাহু কুরআনান আরাবিয়্যাল লাল্লাকুম তা’কিলুন’ (আমি ইহাকে আরবী ভাষার কুরআনরূপে নাযিল করেছি, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে সক্ষম হও)। (সূরা ইউসুফ ২) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে— ‘বি-লিসানিন আরাবিয়্যিম মুবিন’ (অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়)। (সূরা শুআরা ১৯৫) আরও ইরশাদ হয়েছে— ‘ওয়া মা আরসালনা মির রাসূলিন ইল্লা বি-লিসানি কাওমিহি লিইউবাইয়িনা লাহুম’ (আমি প্রত্যেক রাসূলকেই স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি যাতে তাদের সামনে তারা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন)। (সূরা ইবরাহীম ৪) বোদ্ধাগণ বোঝেন যে, স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণের অর্থ শুধু এই নয় যে, নবীগণ স্বজাতির ভাষা বোঝেন এবং জাতিকে সেই ভাষায় বক্তব্য বোঝাতে পারেন। বরং এর মর্ম এই যে, নবীগণের ভাষা হত সমকালীন ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ মানে উত্তীর্ণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মান সম্পন্ন। এর সত্যতার সন্ধান পাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উক্তিতে— ‘আনা আফসাহুল আরাবি’ (আমি সর্বাধিক বিশুদ্ধ আরবী ভাষার অধিকারী)।

আপনারা জানেন, ইসলামের ইতিহাসে যাঁরা বৃহৎ কোন সংস্কার ও গঠনমূলক কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, মানব সমাজের চিন্তা-চেতনা ও গতি-প্রকৃতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে যাদের প্রভাব ছিল গভীর ও সুবিস্তারী তাঁদের প্রায় সকলেই বাগ্মিতা ও লেখনীতে ওজস্বিতার অধিকারী ছিলেন। তাঁদের লেখনী ও বক্তৃতায় আমরা ভাষার সাহিত্য ও আলংকারিক উচ্চমান পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান পাই। হযরত শায়খ জিলানী (রহ.)-এর মাওয়ায়েজ ও ভাষণ সংকলন আজ অবধি ওজস্বী ভাষনের উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ইমাম রব্বানী (হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী [রহ.]-এর পত্রাবলী সাহিত্য স্বকীয়তায়, তেজস্বিতা ও গতিশীলতায় সাবলীলতা ও শব্দচয়নে অক্লেশতায় আবুল ফজল এবং ফয়জীর রচনাশৈলী অপেক্ষা অধিক উচ্চমানসম্পন্ন বৈ নয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থটি যুগপৎ আরবী সাহিত্য ও ইলমী ও শাস্ত্রীয় ভাষার উচ্চমান সম্পন্ন এরূপ এক উজ্জল দৃষ্টান্ত যে, মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন-পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে যার নজীর লক্ষ্য করা যায় না। আরবীর ন্যায় ফার্সী ভাষাতেও শাহ সাহেবের দক্ষতা ও সাবলীলতা ছিল অতুলনীয়। ফার্সী ভাষায় প্রণীত তাঁর ইযালাতুল খাফা গ্রন্থের কোন কোন অংশ তো সাহিত্যের শাহী মার্গ স্পর্শ করেছে।

এই কাহিনী তখনকার যখন আরবী ফার্সী এই দেশীয় মুসলিম সমাজের জ্ঞানচর্চা ও লেখনীর ভাষা ছিল। উর্দু ভাষার প্রচলন লাভের পরে শাহ সাহেবের সন্তানগণ উর্দু ভাষায় লেখালেখি শুরু করেন। শাহ আবদুল কাদের (রহ.)-এর কুরআনের অনুবাদ তৎকালীন দিল্লীর প্রমিত ভাষার উৎকৃষ্ট নমুনা। সাহিত্যগত সৌন্দর্য ও ভাষা সুষমার কারণে অনুবাদটি ক্ল্যাসিক্যাল উর্দু সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। উর্দু ভাষায় রচিত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.)-এর গ্রন্থাদিতে এরূপ সাবলীল সরল ও স্বচ্ছন্দ্য ভাষাশৈলী বিদ্যমান যে, সূক্ষ্ম ও জটিল জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও উর্দু-প্রিয় পাঠকের রুচিতে কোনরূপ বিস্বাদ কি বিরাগ সৃষ্টি করতে পারে না। ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রের নেতৃত্ব দীর্ঘকাল যাবৎ এ দেশের আলেমগণের হাতেই থেকেছে। এ দেশের সাহিত্য জগতে তাঁরাই দিক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। খাজা আলতাফ হোসাইন হালী, মৌলভী নযীর আহমদ দেহলভী এবং মাওলানা শিবলী নোমানীকে উর্দু ভাষার নির্মাতারূপে গণ্য করা উচিত। আলেমগণ সাহিত্যরুচি ও রচনাশৈলীর এরূপ আদর্শ নমুনা রেখে গেছেন যা উর্দু ভাষার এক অমূল্য সম্পদ। মাওলানা হাবিবুর রহমান শেরওয়ানীর মাযামীন এবং মাওলানা সাইয়েদ আবদুল হাই (নাযেমে নাদওয়াতুল উলামা) প্রণীত তাযকিয়ায়ে গুলে রানা (তযকেরাহ গুল-এ-রানা) এবং তারীখে ইয়াদে আইয়াম গ্রন্থ দুটি নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্য-নির্ভুল ইতিহাস-সমৃদ্ধতার পাশাপাশি উচ্চ সাহিত্যমান ও অলংকারে পূর্ণ উর্দু গদ্য সাহিত্যের উজ্জল এক উদাহরণ। মাওলানা সুলাইমান নদভীকে আল্লাহ কল্যাণ দান করুন। ধর্মীয় জ্ঞান গবেষণা বিষয়ক ও সাহিত্যমূলক রচনাদি দ্বারা তিনি উর্দু সাহিত্যকে ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর গ্রন্থাদি অদ্যাবধি এবং দূর-ভবিষ্যত অবধি ভাষা ও সাহিত্যের তুলনামান পরিমাপের নিক্তি ও মানদণ্ড হয়ে থাকবে। তদ্রূপ মাওলানা আবুল কালাম আযাদের রচনাবলী উর্দু ভাষাকে শক্তিমান এবং উর্দুকে নতুন এক শিক্ষিত ভাষাশৈলী দান করেছে। তাঁর সম্পাদিত আল-হেলাল পত্রিকার যাদুকরী লেখাসমূহ এক কালে গোটা ভারতবর্ষকে সম্মোহিত করে রেখেছিল। তাঁর বিশেষ রচনাশৈলী আজ অবধি সাহিত্য জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছে। আলেমগণের এই জাগ্রত মস্তিষ্কতা ও যুগ সচেতনতার কারণেই দেশ গঠন ও দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধনে আলেমগণের নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ কিংবা দেশের সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে কখনও উত্থাপিত হয়নি। তাঁরা নিজেদেরকে জনবিচ্ছিন্ন উপদ্বীপ বানিয়ে রাখার চেষ্টা করেননি। অন্যান্য মুসলিম দেশের আলেমগণের ন্যায় তাঁরা যুগের নকীব দল হতে দূরত্ব বজায় রেখে চলেননি।

তাঁরা দাওয়াতী কার্যক্রমে ও দ্বীনের লক্ষ্য অর্জনে স্বদেশের ভাষা ব্যবহার করতেন এবং সাহিত্যিক মহলে সমাদৃত ও প্রশংসিত উচ্চমানের ভাষা ব্যবহার করতেন। আমাদের উচিত এই কর্মধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখা, এই উত্তরাধিকার-লব্ধ সম্পদকে সংরক্ষণ করা। আমরা যদি দ্বীনের কার্যকর খেদমত আঞ্জামে অভিলাষী হই এবং বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা সাধারণ ও বিশিষ্টজন সকলের নিকট পৌঁছাতে চাই তাহলে আমাদেরকে এই যুগেও নিজেদের রচনা ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে সাবলীল ও আকর্ষণীয় ভাষা প্রয়োগের কৌশল এবং সৃষ্টিশীল ভাষাশৈলী প্রয়োগের কৌশল আয়ত্ব করতে হবে। বক্তৃতা ও রচনাবলীকে এবং প্রতিপাদ্য বিষয়কে প্রচলিত সাহিত্যের উচ্চমানে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এতে না আপনাদের মান-মর্যাদার হানী হবে, না পূর্বসুরীদের অবলম্বিত পথ পরিহারের দোষ আপনাদের উপর আরোপিত হবে। বরং তা হবে দ্বীনের হেকমত ও চাহিদার সঙ্গে পর্বতোভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00