📘 উলামা তলাবা > 📄 জীবনের সাথে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্পর্ক এবং তার জন্য আমাদের পূর্বসূরীদের সাধনা

📄 জীবনের সাথে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্পর্ক এবং তার জন্য আমাদের পূর্বসূরীদের সাধনা


প্রিয় বন্ধুগণ! আমি পূর্বে বলেছি যে, আপনাদের এক প্রান্ত সংযুক্ত নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর সঙ্গে। সেই কারণে আপনাদের উপর কী কী দায়িত্ব বর্তায় সে সম্পর্কে এতক্ষণ দীর্ঘ আলোচনা করলাম। আমি একথাও বলেছিলাম যে, আপনাদের অপর প্রান্ত সংযুক্ত জীবন জগতের সঙ্গে। এখন আমি আরজ করব যে, এতদসংক্রান্ত দায়িত্ব ও প্রস্তুতিসমূহ কি কি? কিভাবে আপনারা সে দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারেন।

নবুওয়াতে মুহাম্মাদী যে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মহাসত্য এবং যে মৌলিক ও বুনিয়াদী বিধি-বিধান দান করেছে তাতে তিল পরিমাণ পরিবর্তন-পরিবর্ধন বা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব নয়। আপনাদের পূর্বসূরীগণ তাতে কোনরূপ বিকৃতি বা পরিবর্তন সাধিত হতে দেননি। এটাই ছিল তাঁদের সংস্কারমূলক সংগ্রামের মূল লক্ষ্য, এটাই ছিল তাঁদের মহান কীর্তি। তাঁরা উলূমে নবুওয়াতরূপ ঐ সম্পদকে কোন রকম পরিবর্তন, কোন রকম হ্রাস-বৃদ্ধি ব্যতীত নিখুঁতভাবে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে এই সত্যটাও স্মরণ রাখুন যে, প্রত্যেক যুগেই আমাদের পূর্বসূরীগণ নববী উলুমের ঐ মহা সম্পদকে জীবন জগতে বাস্তবায়নের বিরামহীন চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁরা তাঁদের মেধা ও প্রতিভা, মেহনত ও পরিশ্রম দ্বারা নববী জ্ঞানভাণ্ডারকে আমলযোগ্য এক প্রাণবন্ত ও সচল জ্ঞানভাণ্ডার রূপে জগতবাসীর সামনে প্রমাণ করে ছেড়েছেন। তাঁরা উলূমে নবুওয়াতের তাফসীর ও ব্যাখ্যায় এরূপ পথ অবলম্বন করেছিলেন যাতে উলূমে নবুওয়াত জনসমাজের সম্মুখে সহজবোধ্য রূপে প্রতিভাত হয়েছিল। ফলে সমকালীন জনসাধারণের মস্তিষ্ক উলূমে নবুওয়াতকে অতি সহজে গ্রহণ ও আত্মস্থ করতে পেরেছিল। জনসাধারণ তাদের যুক্তিবুদ্ধি এবং সমকালীন যুগের সঙ্গে উলুমে নবুওয়াত ও শরয়ী বিধি-বিধানের কোন সামঞ্জস্যহীনতা বা অসঙ্গতি খুঁজে পায়নি। আমাদের সেই সকল পূর্বসূরীর মাঝে বিদ্যমান ছিল শরীয়তের মূলধারা, দ্বীনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং তা বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ব্যাপারে পর্বতসম অবিচলতা ও ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা। কিন্তু এতদসংক্রান্ত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে, মানুষের নিকট তা হৃদয়গ্রাহী ও আকর্ষণীয় করে তুলতে তাঁরা ছিলেন ফুলশাখের ন্যায় নরম, রেশমের ন্যায় স্নিগ্ধ ও কোমল। তাঁদের কার্যপ্রণালী মূলত ছিল হযরত আলী (রাযি.)-এর উপদেশের বাস্তব দৃষ্টান্ত। হযরত আলী (রাযি.) বলেন— ‘কাল্লিমুন নাসা আলা কাদরি উকুলিহিম আ-তুরিদুনা আই ইউকাযযাবাল্লাহু ওয়া রাসূলুহু’ (মানুষের সঙ্গে তাদের মেধা ও বুদ্ধির গ্রহণ-ক্ষমতা অনুযায়ী কথা বল। তোমরা কি চাও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হোক?)।

এ কারণে তাঁরা যুগের বুদ্ধিক্ষেত্রের যোগ্যতা অনুযায়ী দ্বীনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। যুগের বাস্তবতা, পরিবেশ, পরিস্থিতি ও সংকটের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে কথা বলেছেন। তৃতীয় শতাব্দীতে খলীফা মামুন ও মুতাসিমের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভাবে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও আকীদা-বিশ্বাস মুতাযিলাপন্থীদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিল। মুতাযিলাপন্থীদের আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার অধিকারী হওয়াটা যুগের ফ্যাশন এবং প্রগতিশীলতার নিদর্শন বলে পরিগণিত হতে শুরু করেছিল। যুগের এই সংকটকালে হযরত আবুল হাসান আশআরী (রহ.) মুতাযিলাপন্থীদের যুক্তি-তর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এই এক তরফা ঠিকাদারীর বিরুদ্ধে জ্ঞানগত ও যুক্তি-তর্কগত যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং মুতাযিলাপন্থীরা যে ভাষা ও যে পরিভাষাসমূহ ব্যবহার করে, যে পদ্ধতি অবলম্বন করে নিজেদের জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব ও চিন্তা-চেতনাগত নেতৃত্ব কায়েম করে রেখেছিল তিনি আহলুস সুন্নাহর আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে ঠিক ঐ ভাষা ও পরিভাষাসমূহই ব্যবহার করলেন এবং তাদের অবলম্বিত পদ্ধতিই অবলম্বন করলেন। ফলে অতি অল্প দিনেই মুতাযিলাপন্থীদের বুদ্ধি ও যুক্তি-তর্ক ভিত্তিক সকল তেলেসমাতির কিস্তিমাত হয়ে গিয়েছিল এবং শরীয়াহ ও সুন্নাহপন্থীদের মাঝে দ্রুত প্রসারমান হীনমন্যতা, হতাশা ও স্থবিরতা দূরীভূত হয়ে তাদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছিল। আবু বকর ইবনুস সাইরাফীর উক্তি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘মুতাযিলাপন্থীদের বাড় বেশ বেড়ে গিয়েছিল। তাদের মুকাবেলায় আল্লাহ তাআলা আবুল হাসান আশআরী (রহ.) কে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁর অনন্য মেধা ও প্রতিভা ব্যবহার করে যুক্তি ও প্রমাণ দ্বারা তাদের গতি রোধ করে দিয়েছিলেন।’ তাঁর অনন্য সাধারণ কৃতিত্বের কারণেই আবু বকর ইসমাঈলীর ন্যায় বিচক্ষণ পণ্ডিত তাঁকে মুজাদ্দিদে উম্মত আখ্যা দান করেছেন।

ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.)-এর ইন্তিকাল-পরবর্তী যুগে তাঁর চিন্তা-চেতনা, আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতির অনুসারী আলেমগণ তাঁর কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর পরে কাযী আবু বকর বাকিল্লানী, শায়খ আবু ইসহাক ইসফিরাইনীর ন্যায় মুতাকাল্লিম ও ধর্মতত্ত্ববিদ এবং আল্লামা ইসহাক সিরাজী ও ইমামুল হারামাইনের ন্যায় সুযোগ্য মুদাররিস ও উস্তাদের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁরা আহলুস সুন্নাহর ইলমী ও জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। কিন্তু সেই যুগে ইতোমধ্যে ইউনানী দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞান আরবী ভাষায় অনূদিত হয়ে গিয়েছিল। আধ্যাত্মবাদী ও দার্শনিকেরা মিলে দর্শনকে পবিত্রতা ও শুভ্রতার লেবাস পরিয়ে দিয়েছিল। ফলে দর্শন হয়ে পড়েছিল যুক্তি, বুদ্ধি ও সত্যের মানদণ্ড। এদিকে যে ইলমে কালাম বিশারদ ও ধর্মশাস্ত্রজ্ঞদের প্রয়োজন ছিল যুগ সচেতন ও জাগ্রত মস্তিষ্ক সম্পন্ন হওয়ার, তাঁদের মধ্যে স্থবিরতা ও পূর্ব যুগীয় পদ্ধতির অন্ধ অনুসরণ জেঁকে বসেছিল। আশআরী ও মাতুরিদী আকীদা-বিশ্বাসে অনড় থাকার প্রতি তাঁরা সবিশেষ জোর দিতেন। এটা তো ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু এ বিষয়েও তাঁরা অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন যে, ঐসব আকীদা-বিশ্বাসের পক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠায় ন্যায়শাস্ত্রীয় ঐ পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে, ঐসব প্রমাণ, ঐসব ভাষা ও পরিভাষাসমূহই প্রয়োগ করতে হবে, আশআরী ও মাতুরীদী মতাবলম্বীগণ পূর্ব যুগে যেগুলোর অনুসরণ করতেন, প্রয়োগ করতেন। অথচ সমকালীন যুগের চাহিদা ছিল ভিন্নতর। পরিবর্তিত যুগের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজন ছিল নতুন প্রমাণাদি উপস্থাপনের, প্রমাণ প্রতিষ্ঠায় নতুন পদ্ধতি অবলম্বনের, প্রয়োজন ছিল নতুন গবেষণার, নতুন অনুসন্ধিৎসার। ইমাম আবুল হাসান আশআরীর কাল ছিল দর্শনের শৈশবকাল। তখন পর্যন্ত ইসলামী বিশ্বের সাথে এর পরিচিতি গভীর হয়নি। পঞ্চম শতাব্দীতে তা যৌবনে উপনীত হয় এবং সমাজ জীবনে তার থাবা বিস্তার করে। সেই সময় প্রয়োজন ছিল একজন নতুন ব্যক্তিত্বের, নতুন গবেষণার, সতেজ মেধার এবং নতুন ইলমে কালাম ও ধর্মতত্ত্ববিশারদের। খোদায়ী ব্যবস্থাপনা এর জন্য নির্বাচিত করল ইমাম গাযযালী (রহ.) কে।

তিনি তাঁর লেখায় ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও মূলনীতিসমূহের পক্ষে নতুন ধরণ ও ঢঙে কথা বললেন। ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও মূলনীতিসমূহ প্রমাণ করতে এরূপ তথ্য উপাত্ত ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করলেন, যুগের চাহিদা অনুযায়ী যা ছিল অধিকতর কার্যকর, হৃদয়গ্রাহী ও আকর্ষণীয়। তাঁর প্রমাণ উপস্থাপন-পদ্ধতি এবং আলোচনা-পর্যালোচনা রীতি নতুনভাবে দ্বীনের গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করল, নতুনভাবে আহলুস সুন্নাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করল। ফলে তাঁর লেখা দ্বিধা ও সংশয়গ্রস্ত হাজার হাজার মানুষের জন্য প্রশান্তির কারণ হল, তাদের ঈমান দৃঢ়তর হল। যদিও ইলমে কালাম চর্চাকারী ও তৎকালীন ধর্মতত্ত্ববিশারদগণ তাঁর এই অমূল্য অবদানের স্বীকৃতি দান করেননি বরং ন্যায়শাস্ত্র ও দর্শনের প্রাচীন পদ্ধতি পরিহার করার কারণে তাঁকে তাঁরা সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করেছেন। ইমাম গাযযালী (রহ.) অবশ্য ‘ফয়সালুত তাফরিকাহ বাইনাল ইসলামি ওয়াযান্দাকাহ’ নামক গ্রন্থে তাঁদের এসব সমালোচনার জবাব দান করেছেন। যা হোক, অবশেষে মুসলিম বিশ্ব তাঁর এই সংস্কারমূলক কার্য ও কীর্তির মূল্যায়ন করেছে।

ইমাম গাযযালী (রহ.) উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, দর্শনের জবাব দানের জন্য দর্শনশাস্ত্রের মূল গ্রন্থসমূহ অধ্যয়নের কোন বিকল্প নাই। দর্শনের যৌক্তিক সমালোচনা ও দর্শনের প্রতিপাদিত বিষয়সমূহ খণ্ডনের জন্য এই শাস্ত্র অধ্যয়ন করত এই শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন নেহাত জরুরী। তাই তিনি পূর্ণ দুই বৎসর সময় লাগিয়ে গভীরভাবে দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং আধ্যাত্মবাদীদের আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি প্রথমে ‘মাকাসিদুল ফালাসিফাহ’ (দার্শনিকগণের লক্ষ্য), অতঃপর ‘তাহাফুতুল ফালাসিফাহ’ (দর্শনের বিনাশ) নামক দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। তখন পর্যন্ত মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিশারদগণ (মুতাকাল্লিম) শুধু দর্শনের আলোকে ইসলামের উপর আপতিত আপত্তি ও সমালোচনার আত্মরক্ষামূলক জবাব দান করেই ক্ষ্যান্ত হতেন। আর আত্মরক্ষা পদ্ধতি সর্বকালেই একটি দুর্বলতম পদ্ধতি। ইমাম গাযযালীই সর্বপ্রথম দর্শনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি দর্শনের প্রতিপাদিত তত্ত্বগুলোর অসারতা প্রমাণ করে দর্শনের শীশমহল ও কাঁচের প্রাসাদকে যুক্তির প্রস্তরাঘাতে ভেঙে খান খান করে দেন। ফলে পাশ্চাত্যের দর্শন-ইতিহাসবিদদের স্বীকারোক্তি মতে প্রায় একশত বৎসর পর্যন্ত দর্শনের প্রাসাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। দীর্ঘ নব্বই বৎসর পর দার্শনিক মহলের একজন ইবনে রুশদ ‘তাহাফুতুত তাহাফুত’ নামক গ্রন্থ লিখে ইমাম গাযযালীর গ্রন্থের জবাব দিতে চেষ্টা করেছে।

ইমাম গাযযালীর পরে প্রয়োজন ছিল দর্শনের ভিত্তিমূলে পুনঃ পুনঃ আক্রমণ অব্যাহত রাখার এবং সমালোচনা, আপত্তি ও প্রশ্নবাণে দর্শনকে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার। প্রয়োজন ছিল একথা প্রমাণ করা যে, দর্শনের যাবতীয় তত্ত্ব ও প্রতিপাদিত বিষয়গুলো অনুমাননির্ভর এবং উন্মাদের প্রলাপের অতিরিক্ত কিছু নয়। আর এর জন্য যুগ প্রতীক্ষায় ছিল দর্শনশাস্ত্রে গভীর ও বিস্তীর্ণ জ্ঞানের অধিকারী একজন বৃহৎ মাপের ধীমান ব্যক্তিত্বের, একটি সাহসী ও শক্তিশালী ধারালো কলমের। সে সময়েই শায়খুল ইসলাম হাফেয ইবনে তাইমিয়ার আবির্ভাব ঘটল। তিনি সর্বদিক থেকে এই কাজের জন্য ছিলেন যথোপযুক্ত। তিনি তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে বিশেষত ‘আর-রাদ্দু আলাল মানতিকিয়্যিন’ গ্রন্থে দর্শন এবং দর্শনের যাবতীয় মতবাদ ও তথ্য-উপাত্তকে অসার প্রমাণ করে ছাড়লেন। তাঁর গবেষণামূলক ও নবধারার উন্মোচনকারী গ্রন্থাদি এখন পর্যন্ত গবেষক মস্তিষ্কের জন্য নতুন খোরাক যোগায়, হৃদয়কে করে আস্থাশীল, চিন্তা ও চেতনাকে দান করে সজীবতা ও প্রফুল্লতা।

এদিকে দর্শন ও ইলমে কালামের (Theology) সংমিশ্রণ যে বুদ্ধিবৃত্তিক বাহ্যিক মাত্রা সৃষ্টি করেছিল এবং সারশূন্য দার্শনিকতার জন্ম দিয়েছিল তার ফলে ইসলামী জগতে এই ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, সত্যপথ ও বিশ্বাস অর্জনের একমাত্র পথ হচ্ছে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণাদি। এই মারাত্মক ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী (রহ.) কলম যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। তাঁর রচিত মছনবী প্রকৃতপক্ষে সপ্তম শতাব্দীর যুক্তি ও বুদ্ধিপূজার বিরুদ্ধে কলব ও হৃদয়, রূহ ও আত্মার এক চিত্তাকর্ষক সুর ঝংকার। তাঁর এই গ্রন্থটি ইলমে কালাম ও ধর্মতত্ত্বের স্বকীয় ধারার গবেষণামূলক গ্রন্থই শুধু নয় বরং তা ইলমে কালামের নতুন ধারার ভিত্তি স্থাপক, যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের এক নয়া কৌশলের জন্মদাতা। তিনি ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করতে নতুন নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, নতুন নতুন উদাহরণ ও দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। ফলে তা হৃদয় ও মস্তিষ্ক উভয়কে একই সাথে প্রভাবিত করে, উভয়ের সংশয় ও আবিলতা দূরীভূত করে অন্তরের অন্তস্থলে প্রোথিত হয়ে যায়। অদ্যাবধি গ্রন্থটির প্রভাব পূর্বের ন্যায় বহাল ও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। দার্শনিক মহলে এখন পর্যন্ত তার তীর লক্ষ্যভেদী।

মাওলানা রূমী ও হাফেয ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর পরে দর্শন নতুন রূপ ধারণ করল, গতিপথ পরিবর্তন করল। তাসাওউফ ও নীতিবিজ্ঞানের অভ্যন্তরে তার অনুপ্রবেশ ঘটল এবং রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থাতেও তা দখল দিতে শুরু করল। এর মুকাবেলায় সেকালে শুধু ইলমে কালাম ও ইলমে ইলাহিয়াত তথা ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা, পর্যালোচনা ও ধর্মতত্ত্বের অনুসন্ধান ও প্রয়োগ যথেষ্ট ছিল না। বরং দর্শনের সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের মুকাবেলা তখন শুধু তিনিই করতে পারতেন যিনি গ্রীক ধর্ম দর্শনের সাথে সাথে গ্রীক নীতিবিজ্ঞান, মিসরীয় নব্য প্লেটো দর্শন, প্রাচ্য দর্শন, ভারতীয় যোগীবাদ এবং মধ্য যুগের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে বিচক্ষণ ও শ্যেন দৃষ্টির অধিকারী, ভ্রান্ত অভ্রান্ত পরখ করতে সিদ্ধহস্ত। সঙ্গে সঙ্গে দর্শন ও তাসাওউফ, নীতিবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থা ও অর্থব্যবস্থা সম্পর্কেও যাঁর অধ্যয়ন ও জ্ঞান অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুগভীর। কালের এই চাহিদা পূরণে শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.)-এর আবির্ভাব ঘটল। তিনি 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা' ও 'ইযালাতুল খফা' নামক দুটি অনবদ্য গ্রন্থ রচনা করে ইসলামের মাহাত্ম্য ও সত্যতার সফল চিত্র অঙ্কণ করে দিলেন এবং বিদ্বান ও পণ্ডিত মহলে নতুনভাবে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব, ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বকালীনতা ও তার চিরজীবন্ততা প্রমাণ করলেন এবং আলেমগণের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করলেন।

১৮৫৭ ঈসায়ী সনে ব্রিটিশ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন নতুন ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক ও পাদ্রীরা ইসলামের উপর প্রকাশ্য আক্রমণ শুরু করে এবং আলেমগণকে তাদের মোকাবেলা করার আহ্বান জানায়। পাদ্রীদের দাঁতভাঙ্গা জবাব প্রদানের জন্য ইঞ্জিলসমূহ ও তার ভাষ্যগ্রন্থসমূহ, এর সংকলন ইতিহাস এবং ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যকার বিতর্কিত বিষয়সমূহ সম্পর্কে গভীর অধ্যয়নের প্রয়োজন ছিল। সেই সময়ে উলামা মহলেরই একজন মাওলানা রহমাতুল্লাহ কিরানবী ময়দানে অবতীর্ণ হলেন এবং ইযহারুল হক এবং ইযালাতুল আওহাম জাতীয় গ্রন্থাদি রচনা করে খ্রিস্টীয় মতবাদের প্রচার প্রসারের পথে এক জগদ্দল পাথর বসিয়ে দিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাদি হিন্দুস্তান থেকে শুরু করে মিসর সহ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত স্ব-বিষয়ে অতুলনীয় গণ্য করা হয়।

অপর দিকে ইংরেজ সরকারের আনুকূল্য লাভকারী হিন্দুসমাজ ইংরেজদের মদদে ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস, ইসলামী তত্ত্ব ও দর্শনের বিরুদ্ধে নতুনভাবে আক্রমণ শুরু করল। তারা জগতের নশ্বরতা, আল্লাহর সত্ত্বা, গুণাবলী ও তাঁর কালামের অবিনশ্বরতা, মৃত্যু পরবর্তী জীবন তথা পুনরুত্থান, কেবলা পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ের বিরুদ্ধে বুদ্ধি ও যুক্তিভিত্তিক আপত্তি উত্থাপন করে এসব বিষয়কে অযৌক্তিক প্রমাণ করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করল। তাদের উত্থাপিত আপত্তি খণ্ডন করতে প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিক প্রমাণাদি, প্রাচীন তথ্য-উপাত্ত এবং প্রাচীন পদ্ধতি ছিল অনেকাংশেই অকার্যকর। হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.) তাদের আপত্তির জবাবে একটি নতুন ইলমে কালাম ও ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি-প্রমাণাদির জন্ম দিলেন। তিনি প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত হালকা ও সহজ ভাষায় ছোট ছোট উদাহরণ এবং সাধারণ্যের জন্য সহজবোধ্য প্রমাণাদি দ্বারা বড় বড় জটিল ইলমী বিষয়সমূহ বোঝালেন এবং বড় বড় বিতর্কের অবসান ঘটালেন। তাকরীরে দিল পায়ীর, হুজ্জাতুল ইসলাম, আবে হায়াত, কিবলা নুমা ইত্যাদি কিতাবগুলো তাঁর মেধা ও প্রতিভা, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়সমূহ সম্পর্কে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও গভীর জ্ঞানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অপর দিকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পাঞ্জাবের কাদিয়ানে নতুন ফেতনা মাথাচাড়া দিল। ফেতনাটি ছিল নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত বিদ্রোহ, ছিল ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিন্তা-চেতনার গোটা প্রাসাদকে ডিনামাইট দ্বারা উড়িয়ে দিয়ে (আল্লাহ না করুন) তার ধ্বংসস্তূপের উপর জাল নবুওয়াত ও মিথ্যা ইমামতের প্রাসাদ নির্মাণের অপচেষ্টা। এর মোকাবেলায় কিছু মুখলিস ও একনিষ্ঠ, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ আলেম ময়দানে অবতীর্ণ হলেন। মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরী এবং মাওলানা সাইয়েদ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)-এর নাম ও কাম তাঁদের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

📘 উলামা তলাবা > 📄 যুগকে সঙ্গে নিয়ে চলা এবং যুগের দাবি পূরণ

📄 যুগকে সঙ্গে নিয়ে চলা এবং যুগের দাবি পূরণ


আমার আলোচনাকে বিস্তারিত করণের উদ্দেশ্য, আপনারা যেন যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, উলামায়ে ইসলামের মেধা ও চিন্তা, ইসলামের খেদমতে তাঁদের আবেগ ও উদ্দীপনা কখনও কোন স্থানে এসে স্থবিরতার শিকার হয়ে পড়েনি কিংবা প্রাচীন প্রথা ও রীতি-নীতির কাঙ্গাল হয়ে থাকেনি। তাঁরা চলমান জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন। তাঁদের হাত যুগের জীবনস্পন্দন জ্ঞাপক ধমনী হতে কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাঁদের দৃষ্টি সর্বদা যুগের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। ইসলামের খেদমতের জন্য যে যুগে যা কিছু প্রয়োজন, যে পদ্ধতি ও যে প্রক্রিয়া অবলম্বনের প্রয়োজন অকৃত্রিম আন্তরিকতার সাথে তাঁরা তাই গ্রহণ করেছেন, তাই অবলম্বন করেছেন। তাঁরা ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার, ইসলাম ও দ্বীনের খেদমতে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ ছিলেন। নির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠান কি নির্দিষ্ট কোন গোষ্ঠীর কি নির্দিষ্ট কোন উৎসের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও কর্মপদ্ধতি অপ্রয়োজনেও তারা আঁকড়ে ধরে রাখবেন— এরূপ কোন কসম তারা করেননি। মিসর ও ভারতে যখন তাহযীব-তামাদ্দুন, ইতিহাস ও সাহিত্যের পথে ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু হল, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য লেখকেরা ইসলামের সোনালী যুগ ও তৎকালীন মহান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমালোচনার তীর নিক্ষেপ শুরু করল এবং বিকৃত বীভৎস ও কুৎসিত রূপে ইসলামকে উপস্থাপন করতে শুরু করল তখন উলামা মহল থেকেই তীক্ষ্ণ কলমের অধিকারী শক্তিশালী লেখক ও সাহিত্যিক একদল সৈনিক এগিয়ে এলেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁরা এরূপ কিছু গ্রন্থ রচনা করলেন, যা ধর্মীয় বিচারে নয় শুধু, সাহিত্য বিচারেও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁরা তাঁদের উচ্চ সাহিত্যমান সম্পন্ন লেখনী দ্বারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হাজার হাজার দ্বিধান্বিত ও বিভ্রান্ত ব্যক্তিকে দ্বিধা ও সংশয়মুক্ত করেছেন। তাদের চিন্তা ও ধ্যান-ধারণাগত মালিন্য দূর করে তাদের মন ও মস্তিষ্কে প্রশান্তির বীজ বপন করেছেন। ফলে তাদের ভ্রান্তি ও দ্বিধাই শুধু অপসৃত হয়নি, ইসলামের প্রতি তাদের গভীর অনুরাগ ও আকর্ষণও সৃষ্টি হয়েছে। মাওলানা শিবলীর আল-ফারুক, আল জিযইয়াহ ফিল ইসলাম এই ধারার রচনাবলীর উৎকৃষ্ট ও সফল দৃষ্টান্ত।

📘 উলামা তলাবা > 📄 পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন

📄 পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন


আপনাদের বর্তমান পাঠ্যসূচিই স্বয়ং এই সত্যের মহাসাক্ষী যে, আলেমগণ কোন প্রয়োজনকে স্বীকার করে নিতে এবং তৎমাফিক কল্যাণকর ও অপরিহার্য কোন বিষয়কে গ্রহণ করে নিতে কখনও দ্বিধা করেননি। এ কারনেই মাদরাসার পাঠ্যসূচিতে প্রত্যেক যুগেই নিয়মিত ধারায় পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজন বিয়োজনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু চলতি শত বৎসরেই পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে সর্বাধিক স্বল্প পরিমাণে। অথচ রাজনৈতিক চিন্তা ও ধ্যান-ধারণাগত ব্যাপক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই যুগই ছিল পাঠ্যসূচী পরিবর্তনের সর্বাধিক দাবিদার, সর্বাধিক উপযুক্ত।

📘 উলামা তলাবা > 📄 দ্বীনের প্রতিনিধিত্বের জন্য প্রয়োজন বিভিন্নমুখী যোগ্যতার

📄 দ্বীনের প্রতিনিধিত্বের জন্য প্রয়োজন বিভিন্নমুখী যোগ্যতার


বন্ধুগণ! আধুনিক বিপ্লবের এই যুগে দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব ও ইসলামের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্যই শুধু নয়; বরং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতার চিত্র রূপায়নের জন্যও প্রয়োজন অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জনের এবং বিভিন্নমুখী যোগ্যতার অধিকারী হওয়ার। আপনারা ইসলামের সৈনিক। জীবনের বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য আপনারা নিজেকে প্রস্তুত করছেন। কোন সেনা প্রশিক্ষণ শিবির এবং সেখানে প্রশিক্ষণ রত সৈনিকদের জন্য সর্বাধিক অসঙ্গত ও মারাত্মক বিতর্ক হল নতুন ও পুরাতন অস্ত্র বিতর্ক, নতুন ও পুরাতন রণকৌশল বিতর্ক। সৈনিকের জন্য কোন অস্ত্রই পুরাতন নয়, কোন অস্ত্রই নতুন নয়। তার দেখা উচিত কোন অস্ত্র যুদ্ধের জন্য সর্বাধিক কার্যকর, কোন রণকৌশল অপেক্ষাকৃত অধিক ফলপ্রসূ। সৈনিকের জন্য মুঢ়তা ও হঠকারিতার অবকাশ নেই। না বিশেষ কোন অস্ত্রের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ও জিদ থাকা উচিত, না বিশেষ কোন রণকৌশলের প্রতি। প্রয়োজনীয় ও কার্যকর সকল অস্ত্রে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ হওয়া তার জন্য অপরিহার্য। আরবী কবি অনেক পূর্বেই বলেছেন—

‘কুল্লু ইমরায়িন ইয়াসআ ইলা ইয়াউমিল হিয়া-জি বিমা আসতাআদ্দা’

প্রত্যেক ব্যক্তিই যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে তার প্রস্তুতি ঋদ্ধতা নিয়ে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00