📘 উলামা তলাবা > 📄 কেন এই হীনম্মন্যতা?

📄 কেন এই হীনম্মন্যতা?


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! কেন আপনারা হীনমন্যতার শিকার হবেন? হীনমন্যতার কারণ আকীদা- বিশ্বাস ও ঈমানের দুর্বলতা ব্যতীত আর কিছু নয়। এর কুপ্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। আপনারা নায়েবে নবী। নববী ইলমের ধারক ও বাহক। আপনারা যদি হীনমন্যতার শিকার হন তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায়, আপনারা নবুওয়াতের অত্যুচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ, ইয়াকীন ও বিশ্বাসে আপনারা হীনবল। মনে রাখবেন, আপনারা ঐ সকল মহান ব্যক্তির উত্তরসূরী যাঁদের সম্পর্কে আরেফ রুমী যথার্থই বলেছেন— ‘নাখওয়াতে দারান্দ ওয়া কুবরে চু শাহান, চাকারি খাওয়াহান্দ আজ আহলে জাহান’— বাদশাহ নয় কিন্তু বাদশাহর ন্যায় প্রতিপত্তি ও গর্বের অধিকারী তাঁরা সমগ্র জগতের মালিক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন চাকুরী। শেখ সাদী (রহ.) যাঁদের সম্পর্কে বলেছেন— ‘শাহানে বে কুলাহ ওয়া খুসরওয়ানে বে কামারান্দ’— মুকুট নেই তবুও সম্রাট, বাহিনী নেই তবুও বাদশাহ।

📘 উলামা তলাবা > 📄 আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধ

📄 আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধ


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ আমার! যে সম্পদ আপনাদের নিকট রয়েছে তা পৃথিবীর কারও নিকট নাই। আপনাদের বক্ষে রয়েছে ইলমে ওহী, ইলমে নববী। আপনাদের নিকট রয়েছে ঐসব মহা সত্যের আলো, দুনিয়া হতে যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যার বিলুপ্তির ফলে জগত আজ ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত, মহা অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলায় নিপতিত। আপনারা আপনাদের এই সাদাসিধে অনাড়ম্বর পোশাক, দারিদ্র-পীড়িত শরীর আর অর্থশূন্য পকেটের দিকে তাকাবেন না। আপনারা দেখবেন, আপনাদের বুক কোন সম্পদে সমৃদ্ধ, আপনাদের মধ্যে কীরূপ পূর্ণ-চন্দ্র সংগুপ্ত রয়েছে তা।

বার খোদ নজর কাশ আজ তেহি দামানে মারঞ্জ
দার সিনা তু মাহে তমামি নেহাদে আন্দ

'দৃষ্টি নিবদ্ধ কর নিজের প্রতি, শূন্য তহবিলে দুঃখ করো না তোমার বক্ষে রক্ষিত আছে পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ।'

আপনারা মনে রাখবেন, হীনতা ও দীনতা অন্তর্জগতের সাথে সম্পৃক্ত। বহির্জগতের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেহায়েতই গৌণ। হীনতা মনোজাগতিক একটি অবস্থা। হীনতাবোধের অনিবার্য ফল হল— দ্বিধা ও সংশয়, ভীরুতা ও কাপুরুষতা এবং আত্মপরিচয় বিস্মৃতি। মানুষ বস্তুত নিজেই নিজেকে হীন মনে করে, নিঃস্ব ও লাঞ্ছিত মনে করে, নিজেই নিজেকে তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট জ্ঞান করে। প্রকৃতপক্ষে সে আত্মপ্রতারণার শিকার হয়, সে অযথাই ভাবতে থাকে যে, মানুষ তাকে তুচ্ছজ্ঞান করছে, সে পৃথিবীতে মূল্যহীন, অপাংক্তেয়। এইরূপে সে নিজেই নিজের প্রতি জুলুম করে, অবিচার করে। মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি নিজের দৃষ্টিতেই উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত বলে দৃষ্ট হয়, অন্য কেউ তাকে সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় বলে জ্ঞান করতে পারে না। যে ব্যক্তি নিজেকে নিজের দৃষ্টি হতে দূরে সরিয়ে দেয় অপরের কী দায় ঠেকেছে যে, তাকে সে নিজের হৃদয়ে স্থান দান করবে? নিজের কাছেই যার স্থান ও মূল্যায়ন নেই, পৃথিবীর কোথাও তার স্থান ও মূল্যায়ন নেই। প্রত্যেকের স্ব-স্ব হৃদয়ের সঙ্কোচন ও প্রসারণ অনুপাতেই এই পৃথিবী সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়, তার বিস্তৃতি ও ব্যাপ্তির হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে। প্রত্যেকের লক্ষ্য করা উচিত, নিজের অন্তরে সে নিজ সত্ত্বাকে কতটুকু স্থান দান করেছে, নিজ সত্ত্বার সঙ্গে তার আচরণ কীরূপ হচ্ছে? কেউ যদি নিজেকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ, অক্ষম ও অসহায় জ্ঞান করে; নিজেকে নিঃস্ব ও অপদার্থ মনে করে, দুনিয়ার বাজারে নিজেকে ভাবে অপ্রয়োজনীয় ও মূল্যহীন তবে পৃথিবীর নিকট হতে কোন রকম সুবিচার ও সম্মানের প্রত্যাশা করা তার উচিত নয়। এই ধ্রুব সত্যটাকেই হাতেম তাঈ ব্যক্ত করেছেন এভাবে— ‘ওয়া নাফসাকা আকরিমহা ফাইলনাকা ইন তাহুন আলাইকা ফালান তালকা মিনান নাসি মুকরিমা’— তুমি নিজেকে সম্মান কর। কেননা নিজের দৃষ্টিতেই তুমি যদি নীচ ও হেয় বলে পরিগণিত হও তাহলে তোমাকে সম্মান দানের জন্য কাউকে তুমি পাবে না।

বন্ধুগণ! আমি দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে পারি, আমরা হেয় নই, হীন নই, শুধু হীনমন্যতার ব্যাধিতে আক্রান্ত। এই হীনম্মন্যতার সৃষ্টি মূলত আত্মপরিচয়ের অভাব এবং আত্মবিস্মৃতি হতে। এর একমাত্র চিকিৎসা স্বীয় মর্যাদা সচেতনতা এবং স্বীয় সম্পদ ও ঐশ্বর্যের সঠিক পরিমাপ নির্ণয়। পৃথিবীর পরিবর্তন, আমাদের সম্পর্কে পৃথিবীর দৃষ্টির পরিবর্তন আমাদের নিজেদের দৃষ্টির পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল। নিজেদের সম্পর্কে আমাদের নিজেদের বোধ ও দৃষ্টির যে দিন পরিবর্তন ঘটবে, সে দিন পৃথিবীরও পরিবর্তন ঘটবে, হেয়তাবোধ ও হীনমন্যতার ভীতিকর যে অপচ্ছায়া আমাদের মন ও মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, আমাদেরকে শঙ্কিত করে রেখেছে তা কর্পূরের ন্যায় উবে যাবে। কথক কিছুমাত্র ভুল বলেনি—

অর আগার বা খবর আপনি শারাফাত সে হো
তেরি সেপাহ আনস ও জিন, তো হ্যায় আমীরে জুনুদ

স্বীয় মর্যাদা সম্পর্কে তুমি যদি হও সচেতন জীন ও ইনসান হবে তোমার সৈনিক, তুমি হবে সেনাপতি।

আমাদের প্রাচীন ও সমকালীন ইতিহাসের যে সকল ব্যক্তিত্ব নিজেদের মর্যাদা সম্পর্কে ছিলেন সম্যক ওয়াকিফহাল, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে কোন্ ঐশ্বর্যে মণ্ডিত করেছেন এবং কীরূপ পদমর্যাদায় ভূষিত করেছেন সে সম্পর্কে যাঁদের উপলব্ধি ছিল পরিপূর্ণ মাত্রায় তাঁরা সমগ্র জগতকে অসার ও তুচ্ছ বলে জ্ঞান করতেন। বিশাল রাজত্বের অধিকারী রাজ-রাজড়ারাও তাদেরকে কখনও কোন মূল্যে খরিদ করে নিতে পারেনি। দুনিয়ার বড় বড় সম্পদের, বড় বড় পদমর্যাদার লোভনীয় ও মোহনীয় প্রস্তাব শুনে তাঁরা ওষ্ঠপ্রান্তে মুচকি হাসি টেনে বলে উঠেছেন— ‘বারাদ ইন দাম বার মুরগে দিগার নে কে হনকারা বুলান্দাস্ত আশিয়ানে’— 'যাও, এ ফাঁদ অন্য কোন পাখি শিকার করার জন্য পাতো (আমাকে শিকার করতে চেয়ো না)। কারণ, আনকা পাখি (এক কাল্পনিক বিশালকায় পাখি)-র নীড় অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থিত।'

যে মানব ইতিহাস আত্ম-বিস্মৃতি ও সস্তা মূল্যে বিকিয়ে যাওয়ার কলঙ্কে কলঙ্কিত তার ইজ্জত ও সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছে ঐ সকল দৃঢ়চেতা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব দ্বারাই যাঁরা ছিলেন আত্ম-পরিচয়ে সমৃদ্ধ এবং আল্লাহর মারেফাতে ধন্য। মানবতার শির সমুন্নত থেকেছে তাঁদের দ্বারাই যাঁরা নিজেদের শির রেখেছেন সমুন্নত।

📘 উলামা তলাবা > 📄 যাঁদের নিঃশ্বাসে জীবনের মর্যাদা রয়েছে আজও অক্ষুণ্ন

📄 যাঁদের নিঃশ্বাসে জীবনের মর্যাদা রয়েছে আজও অক্ষুণ্ন


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! মানব জীবনের অস্তিত্ব টিকে থাকার জন্য যেমন প্রয়োজন হয় খাদ্য-পানীয়, পোশাক-পরিচ্ছদ সহ যাবতীয় পার্থিব উপায়-উপকরণের, তেমনই জীবনকে উজ্জ্বল ও মাহাত্ম্যপূর্ণ করে তুলতে, মানবতাকে উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে প্রয়োজন হয় বস্তুপূজারী ও সংকীর্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন পৃথিবীর এই সমাজে মাঝে মাঝে পয়গম্বর সুলভ আত্মমর্যাদাবোধ এবং পার্থিব জগতের প্রতি ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের প্রকাশ ঘটার। প্রয়োজন হয় কোন দিক থেকে এই দৃঢ় উচ্চারণের—

‘আ-তুমিদ্দুনানি বি-মালিন ফামা আতানিয়াল্লাহু খাইরুম মিম্মা আতাকুম’

'তোমরা কি আমাকে ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করছ? আল্লাহ আমাকে যা দান করেছেন তা তোমাদেরকে যা দান করেছেন তা থেকে উৎকৃষ্ট।' (সূরা নামল ৩৬)

যে দিন এই উচ্চারণ আর উচ্চারিত হবে না, এই সাহসী ধ্বনি আর শ্রুত হবে না, সমগ্র পৃথিবী পরিণত হয়ে যাবে নিলামের বাজারে, যে বাজারে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি হতে থাকবে বিবেক-বুদ্ধি নামক অমূল্য রতন, ঈমানের উত্তাপ আর জ্ঞান-সম্পদ, মানুষ বিক্রিত হতে থাকবে স্থূল পদার্থ আর পশুর দামে সেই দিন এই পৃথিবী বসবাসেরই অনুপযোগী হয়ে পড়বে। মানবতা হারাবে তার প্রাণ ও উত্তাপ।

মানবতার মর্যাদা, নবীগণের নেতৃত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব আপনাদেরই। ঐসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এর প্রত্যাশা অবান্তর যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার লক্ষ্য কেবলই উদরপূজা। উদরপূজার ঊর্ধ্বে অন্য কোন লক্ষ্যের দাবি যারা নিজেরাও করে না। এর প্রত্যাশা শুধু আপনাদের নিকট থেকেই করা যেতে পারে। কারণ, আপনাদের পূর্বসূরীদের তালিকায় রয়েছেন ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের ন্যায় আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহান ইমাম। আব্বাসী শাসন যাঁদেরকে কোন মূল্যেই খরিদ করে নিতে পারেনি। রয়েছেন ইমাম গাযযালীর ন্যায় অমিত সাহসী ব্যক্তিত্ব। রাজশাসনের অধিকারী খলীফার পদের পর সর্বোচ্চ দ্বীনী সম্মানজনক পদ বাগদাদের নিজামীয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ পদ যিনি খলীফার অনুরোধ সত্ত্বেও গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলেন। রয়েছেন হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানীর ন্যায় দৃঢ়চিত্ত অসম সাহসী ব্যক্তি, যিনি বরণ করে নিয়েছিলেন গোয়ালিয়র কারাগারের বন্দীজীবন, তবুও বাদশাহ জাহাঙ্গীরকে কুর্নিশ করতে সম্মত হননি। আপনাদের আসলাফ ও আকাবিরের মধ্যে রয়েছেন মির্জা মাযহার জানে জানাঁ। দিল্লীর সম্রাট যাঁর নিকট বার্তা প্রেরণ করেছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে যে বিশাল রাজত্ব দান করেছেন তার কিছু অংশ আপনি গ্রহণ করুন। উত্তরে তিনি বলে পাঠিয়েছিলেন, আল্লাহ তাআলা সাত মহাদেশকে (তথা সমগ্র পৃথিবীকে) ‘দুনিয়া মাতাউন কালীল’ (দুনিয়ার সামগ্রী স্বল্প ও তুচ্ছ) বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই সাত মহাদেশের মধ্য থেকে একটি মাত্র মহাদেশেরও অংশবিশেষ রাজত্বের অধিকারী আপনি। তা কতটুকুন যে, এই ফকীর তার দিকে লোভের হাত প্রসারিত করবে? নওয়াব আসফ জাহ একবার তাঁকে বিশ হাজার টাকা হাদিয়া স্বরূপ দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। নওয়াব বললেন, আপনি গ্রহণ করুন এবং দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করে দিন। তিনি বললেন, পথে আপনি নিজেই দান করতে করতে যান। প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছার পূর্বেই এই টাকা নিঃশেষ হয়ে যাবে। পথে নিঃশেষ না হলে প্রাসাদে পৌঁছার পর নিঃশেষ হয়ে যাবে।

আপনাদের আসলাফ ও পূর্বসূরীদের মধ্যে রয়েছেন হযরত শাহ গোলাম আলী দেহলভী (রহ.)। টুংক প্রদেশের গভর্নর মীর খাঁ তাঁর খানকা শরীফের খরচাদির জন্য বাৎসরিক কিছু অর্থ বরাদ্দ করতে চাইলে তিনি লিখে পাঠালেন— ‘মা আবরুয়ে ফাকর ও কানায়াত নিমি বারিম, বা মীর খাঁ বিগুয়ে কে রুযি মুকাদ্দার আস্ত’ (দারিদ্র ও অল্পেতুষ্টির গর্ব ত্যাগ করতে আমি নই রাজী মীর খাঁকে বল, এই পৃথিবীতে নির্ধারিত সকলের রুজী।)

আপনাদের পূর্বসূরীদের তালিকায় রয়েছেন আবদুর রহীম রামপুরীর ন্যায় নির্মোহ মুদাররিস ও শিক্ষক। মাসিক দশ টাকা মাসোহারাকে যিনি বেরেলী কলেজের আড়াইশ টাকার উপর এবং আল্লাহর ওয়াস্তে মুফতে শিক্ষাদানকে সম্মানজনক প্রফেসর পদের উপর প্রাধান্য দান করেছিলেন এবং কারণ হিসাবে বলেছিলেন, আল্লাহ যদি এ ব্যাপারে আমাকে কিয়ামতের দিন জবাবদিহী করতে বলেন তাহলে কী জবাব দিব? আপনাদের আসলাফ ও পূর্বসূরীদের মধ্যে রয়েছেন হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.)। যিনি আলীগড়ের জনৈক দ্বীনদার ধনাঢ্য ব্যক্তির নিকট থেকে বেতনরূপে প্রাপ্ত মাসিক দশ টাকা হতে দুই টাকা কমিয়ে দিতে বললেন। কারণ দর্শিয়ে বললেন, আমি আমার মাকে মাসে দু টাকা করে দিতাম। তাঁর ইন্তিকালের পর এই দুই টাকা আমার জন্য অতিরিক্ত হয়ে যাবে। আমি কিয়ামতের দিন এই অতিরিক্ত অর্থের হিসাব দান থেকে রক্ষা পেতে চাই। নিকট অতীতের পূর্বসূরীদের মধ্যেও আমরা দেখতে পাই ঐসব ত্যাগী মুদাররিসকে যাঁদের স্বল্প বেতনে এবং স্বীয় উস্তাদ ও শায়খের সান্নিধ্যে পরিতুষ্ট থেকে বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় উচ্চ বেতনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, সংকট ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়েই নিজেদের জীবন অতিবাহিত করেছেন। অতএব আমি নিশ্চিত যে, আপনাদেরই অধিকার রয়েছে কবিতার এই পংক্তিটি পাঠ করার—

‘উলাইকা আবাঈ ফাজিইনী বিমিছলিহিম— ইযা জামাআতনা ইয়া জারিরুল মাজামি’

'তাঁরা আমাদের পূর্বসূরী, বিভিন্ন সমাবেশে যখন আমরা সমবেত হই তখন হে জারীর! তাঁদের অনুরূপ কাউকে দেখাও তো তুমি।'

📘 উলামা তলাবা > 📄 এটা সুখ ও আরামপ্রিয়তার পথ নয়

📄 এটা সুখ ও আরামপ্রিয়তার পথ নয়


বন্ধুগণ! আমার এতক্ষণের বক্তব্যে আপনারা আমাকে ভুল বুঝবেন না। আপনারা মনে করবেন না যে, যুগের পরিবর্তন, প্রয়োজন ও চাহিদার ক্রমশ বৃদ্ধিপ্রাপ্তি, সাহস ও সামর্থ্যের ঘাটতি, পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্কট ইত্যাদি সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। আপনারা এই ধারণা পোষণ করবেন না যে, আমি এই যুগে আপনাদের নিকট থেকে হযরত মাওলানা আবদুর রহীম এবং মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.)-এর ত্যাগ ও কুরবানীর ন্যায় ত্যাগ ও কুরবানী দাবি করছি। তবে একথা আমি না বলে পারছি না যে, আপনাদের পথ নিঃসন্দেহে ত্যাগ ও তিতিক্ষার পথ, অল্পে তুষ্টি এবং ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পথ। আরামপ্রিয়তা এবং জাগতিক সমৃদ্ধি লাভের পথ আপনাদের পথ নয় কখনও। এই পথে— ‘কাদ কুনতা ফিনা মারজুয়ান কাবলা হাযা’ (তুমি তো পূর্বে আমাদের আশাস্থল ছিলে)— জাতীয় তিরস্কারমূলক বাক্যবানে জর্জরিত হতেই হবে। এই পথে তো— ‘ওয়া লা তমুদ্দন্নাইআইনাকা ইলা মা মত্তা’না বিহি আযওয়াজাম মিনহুম যাহরাতাল হায়াতিদ দুনিয়া লিনাফতিনাহুম ফিহি ওয়া রিযকু রাব্বিকা খাইরুও ওয়া আবকা’ (তুমি তোমার চোখ দুটিকে প্রসারিত করো না তার দিকে যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দান করেছি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য স্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসাবে, তা দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার নিমিত্তে। তোমার প্রতিপালকের নিকট রক্ষিত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী)—র পাঠ গ্রহণ করতেই হবে।

তবে এর প্রতিদান কী তাও শুনে নিন। তা হল— ‘ওয়া জাআলনা মিনহুম আইম্মাতাই ইয়াহদুনা বি-আমরিনা লাম্মা সাবারু ওয়া কানু বি-আয়াতিনা ইয়ুকিনুন’ (তাদের মধ্য হতে আমি নেতা মনোনীত করেছিলাম তাদের ধৈর্য ধারণের কারণে, তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করত, আর তারা ছিল আমার আয়াতসমূহে দৃঢ়বিশ্বাসী)। (সূরা সাজদা ২৪)

মাওলানা রূমী (রহ.) এই স্তরের দিকেই ইঙ্গিত করে বলেছেন— ‘মেদাহ রা বিগুযার সুয়ে দিল খেরাম, তা কে বে পারদাহ যে হক আয়েদ সালাম’ (উদরপূজা পরিহার কর, ধাবিত হও হৃদয় পানে সরাসরি যেন সালাম আসে প্রভু হতে তোমার পানে।)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00