📘 উলামা তলাবা > 📄 মাদরাসার দ্যুতিহীন পরিবেশ

📄 মাদরাসার দ্যুতিহীন পরিবেশ


এককালে মাদরাসা ছিল জীবন ও শক্তির কেন্দ্র। যেখানে একের পর এক জন্ম নিত জীবন জগতের আমূল পরিবর্তন সাধনকারী বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব। আর আজ? আজ সেই মাদরাসাগুলো হতাশা, স্থবিরতা আর হীনমন্যতার শিকার। সংখ্যাগত দিক থেকে মাদরাসা, ছাত্র, পাঠ্য কিতাব, কিতাবের সরবরাহ, শিক্ষক বেতনের পরিমাণ সবই উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু জীবন-তন্ত্রী হয়ে পড়েছে বড় দুর্বল, হৃদয়ের আবেগ ও উত্তাপে পড়েছে ভাটা। সচেতন ও দরদী কেউ এই অবস্থা দেখলে তার দম বন্ধ হবার উপক্রম হবে। এই মৃতপ্রায় সাগর দেখলে সে হয়তো বলে উঠবে—

খোদা তুঝে কিসি তুফান সে আশনা কর দে
কে তেরে বহর কি মৌজো মে ইজতিরাব নেহি
তুঝে কিতাব সে মুমকিন নেহি ফারাগ কে তু
কিতাব খোয়াহ হ্যায় মাগার সাহেবে কিতাব নেহি

'খোদা কোন তুফানের সঙ্গে তোমার মিলন ঘটিয়ে দিন। কারণ তোমার সাগর তরঙ্গে কোন উত্তালতা নাই। কিতাব হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি কিতাব আবৃত্তিকারী, কিন্তু কিতাব তোমাতে আত্মস্থ হয়নি।'

কিন্তু মাদরাসা নামক এই সাগর উত্তাল হোক, এতে ঝড় উঠুক— এই দুআ করতেও এখন শঙ্কা বোধ করি। কেননা বর্তমানে মাদরাসাগুলোতে ঝড় বইছে, পরিলক্ষিত হচ্ছে তুফানের আলামত। মাদরাসাগুলোর রক্ষণ প্রাচীরে সে ঝড় আঘাত হানছে। সে তুফানের উত্তাল তরঙ্গ মাদরাসার ভিত ধ্বসিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সে ঝড় আর তুফান বাইরের। তা বর্হিজগতের অন্তসারশূন্য চিন্তা-চেতনা, মূর্খতাপ্রসূত দাওয়াত ও আহ্বানের প্রতিধ্বনি। মাদরাসার ছাত্ররা যার লাউড স্পীকার রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 বিশ্ব-নেতৃত্বের যোগ্যতার অধিকারীরা আজ অপরের অন্ধ অনুসারী

📄 বিশ্ব-নেতৃত্বের যোগ্যতার অধিকারীরা আজ অপরের অন্ধ অনুসারী


যে সকল কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি, যে সকল চিন্তা-চেতনা ও মতবাদ, যে সকল প্রচার-প্রচারণা আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও বস্তা পচা, বাসী ও পুরোনো বলে প্রক্ষিপ্ত হচ্ছে, অচল বলে পরিগণিত হচ্ছে বড় দুঃখজনক ও মর্মপীড়ক সত্য হল বর্তমানে মাদরাসায় সেগুলোরই অনুপ্রবেশ ঘটছে। যাদের হওয়ার কথা ছিল ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যুগ সৃষ্টিকারী নেতা, যুগের দিগদিশারী, সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী দাঈ ও আহ্বায়ক আজ তারাই অপর কর্তৃক প্রভাবান্বিত হয়ে দ্বীন ও ধর্মহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুসরণ ও অনুকরণে গর্ববোধ করছে।

কার সাকতে থে জো আপনে জামানা কি ইমামত
উও কোহনা দামাগ আপনে জামানা কে হ্যায় প্যায়রো

যে হতে পারত আসীন যুগ-নেতৃত্বের আসনে সেই ঘুণে ধরা মস্তিষ্ক এখন যুগের দাস।

📘 উলামা তলাবা > 📄 কেন এই হীনম্মন্যতা?

📄 কেন এই হীনম্মন্যতা?


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! কেন আপনারা হীনমন্যতার শিকার হবেন? হীনমন্যতার কারণ আকীদা- বিশ্বাস ও ঈমানের দুর্বলতা ব্যতীত আর কিছু নয়। এর কুপ্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। আপনারা নায়েবে নবী। নববী ইলমের ধারক ও বাহক। আপনারা যদি হীনমন্যতার শিকার হন তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায়, আপনারা নবুওয়াতের অত্যুচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ, ইয়াকীন ও বিশ্বাসে আপনারা হীনবল। মনে রাখবেন, আপনারা ঐ সকল মহান ব্যক্তির উত্তরসূরী যাঁদের সম্পর্কে আরেফ রুমী যথার্থই বলেছেন— ‘নাখওয়াতে দারান্দ ওয়া কুবরে চু শাহান, চাকারি খাওয়াহান্দ আজ আহলে জাহান’— বাদশাহ নয় কিন্তু বাদশাহর ন্যায় প্রতিপত্তি ও গর্বের অধিকারী তাঁরা সমগ্র জগতের মালিক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন চাকুরী। শেখ সাদী (রহ.) যাঁদের সম্পর্কে বলেছেন— ‘শাহানে বে কুলাহ ওয়া খুসরওয়ানে বে কামারান্দ’— মুকুট নেই তবুও সম্রাট, বাহিনী নেই তবুও বাদশাহ।

📘 উলামা তলাবা > 📄 আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধ

📄 আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধ


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ আমার! যে সম্পদ আপনাদের নিকট রয়েছে তা পৃথিবীর কারও নিকট নাই। আপনাদের বক্ষে রয়েছে ইলমে ওহী, ইলমে নববী। আপনাদের নিকট রয়েছে ঐসব মহা সত্যের আলো, দুনিয়া হতে যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যার বিলুপ্তির ফলে জগত আজ ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত, মহা অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলায় নিপতিত। আপনারা আপনাদের এই সাদাসিধে অনাড়ম্বর পোশাক, দারিদ্র-পীড়িত শরীর আর অর্থশূন্য পকেটের দিকে তাকাবেন না। আপনারা দেখবেন, আপনাদের বুক কোন সম্পদে সমৃদ্ধ, আপনাদের মধ্যে কীরূপ পূর্ণ-চন্দ্র সংগুপ্ত রয়েছে তা।

বার খোদ নজর কাশ আজ তেহি দামানে মারঞ্জ
দার সিনা তু মাহে তমামি নেহাদে আন্দ

'দৃষ্টি নিবদ্ধ কর নিজের প্রতি, শূন্য তহবিলে দুঃখ করো না তোমার বক্ষে রক্ষিত আছে পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ।'

আপনারা মনে রাখবেন, হীনতা ও দীনতা অন্তর্জগতের সাথে সম্পৃক্ত। বহির্জগতের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেহায়েতই গৌণ। হীনতা মনোজাগতিক একটি অবস্থা। হীনতাবোধের অনিবার্য ফল হল— দ্বিধা ও সংশয়, ভীরুতা ও কাপুরুষতা এবং আত্মপরিচয় বিস্মৃতি। মানুষ বস্তুত নিজেই নিজেকে হীন মনে করে, নিঃস্ব ও লাঞ্ছিত মনে করে, নিজেই নিজেকে তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট জ্ঞান করে। প্রকৃতপক্ষে সে আত্মপ্রতারণার শিকার হয়, সে অযথাই ভাবতে থাকে যে, মানুষ তাকে তুচ্ছজ্ঞান করছে, সে পৃথিবীতে মূল্যহীন, অপাংক্তেয়। এইরূপে সে নিজেই নিজের প্রতি জুলুম করে, অবিচার করে। মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি নিজের দৃষ্টিতেই উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত বলে দৃষ্ট হয়, অন্য কেউ তাকে সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় বলে জ্ঞান করতে পারে না। যে ব্যক্তি নিজেকে নিজের দৃষ্টি হতে দূরে সরিয়ে দেয় অপরের কী দায় ঠেকেছে যে, তাকে সে নিজের হৃদয়ে স্থান দান করবে? নিজের কাছেই যার স্থান ও মূল্যায়ন নেই, পৃথিবীর কোথাও তার স্থান ও মূল্যায়ন নেই। প্রত্যেকের স্ব-স্ব হৃদয়ের সঙ্কোচন ও প্রসারণ অনুপাতেই এই পৃথিবী সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়, তার বিস্তৃতি ও ব্যাপ্তির হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে। প্রত্যেকের লক্ষ্য করা উচিত, নিজের অন্তরে সে নিজ সত্ত্বাকে কতটুকু স্থান দান করেছে, নিজ সত্ত্বার সঙ্গে তার আচরণ কীরূপ হচ্ছে? কেউ যদি নিজেকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ, অক্ষম ও অসহায় জ্ঞান করে; নিজেকে নিঃস্ব ও অপদার্থ মনে করে, দুনিয়ার বাজারে নিজেকে ভাবে অপ্রয়োজনীয় ও মূল্যহীন তবে পৃথিবীর নিকট হতে কোন রকম সুবিচার ও সম্মানের প্রত্যাশা করা তার উচিত নয়। এই ধ্রুব সত্যটাকেই হাতেম তাঈ ব্যক্ত করেছেন এভাবে— ‘ওয়া নাফসাকা আকরিমহা ফাইলনাকা ইন তাহুন আলাইকা ফালান তালকা মিনান নাসি মুকরিমা’— তুমি নিজেকে সম্মান কর। কেননা নিজের দৃষ্টিতেই তুমি যদি নীচ ও হেয় বলে পরিগণিত হও তাহলে তোমাকে সম্মান দানের জন্য কাউকে তুমি পাবে না।

বন্ধুগণ! আমি দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে পারি, আমরা হেয় নই, হীন নই, শুধু হীনমন্যতার ব্যাধিতে আক্রান্ত। এই হীনম্মন্যতার সৃষ্টি মূলত আত্মপরিচয়ের অভাব এবং আত্মবিস্মৃতি হতে। এর একমাত্র চিকিৎসা স্বীয় মর্যাদা সচেতনতা এবং স্বীয় সম্পদ ও ঐশ্বর্যের সঠিক পরিমাপ নির্ণয়। পৃথিবীর পরিবর্তন, আমাদের সম্পর্কে পৃথিবীর দৃষ্টির পরিবর্তন আমাদের নিজেদের দৃষ্টির পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল। নিজেদের সম্পর্কে আমাদের নিজেদের বোধ ও দৃষ্টির যে দিন পরিবর্তন ঘটবে, সে দিন পৃথিবীরও পরিবর্তন ঘটবে, হেয়তাবোধ ও হীনমন্যতার ভীতিকর যে অপচ্ছায়া আমাদের মন ও মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, আমাদেরকে শঙ্কিত করে রেখেছে তা কর্পূরের ন্যায় উবে যাবে। কথক কিছুমাত্র ভুল বলেনি—

অর আগার বা খবর আপনি শারাফাত সে হো
তেরি সেপাহ আনস ও জিন, তো হ্যায় আমীরে জুনুদ

স্বীয় মর্যাদা সম্পর্কে তুমি যদি হও সচেতন জীন ও ইনসান হবে তোমার সৈনিক, তুমি হবে সেনাপতি।

আমাদের প্রাচীন ও সমকালীন ইতিহাসের যে সকল ব্যক্তিত্ব নিজেদের মর্যাদা সম্পর্কে ছিলেন সম্যক ওয়াকিফহাল, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে কোন্ ঐশ্বর্যে মণ্ডিত করেছেন এবং কীরূপ পদমর্যাদায় ভূষিত করেছেন সে সম্পর্কে যাঁদের উপলব্ধি ছিল পরিপূর্ণ মাত্রায় তাঁরা সমগ্র জগতকে অসার ও তুচ্ছ বলে জ্ঞান করতেন। বিশাল রাজত্বের অধিকারী রাজ-রাজড়ারাও তাদেরকে কখনও কোন মূল্যে খরিদ করে নিতে পারেনি। দুনিয়ার বড় বড় সম্পদের, বড় বড় পদমর্যাদার লোভনীয় ও মোহনীয় প্রস্তাব শুনে তাঁরা ওষ্ঠপ্রান্তে মুচকি হাসি টেনে বলে উঠেছেন— ‘বারাদ ইন দাম বার মুরগে দিগার নে কে হনকারা বুলান্দাস্ত আশিয়ানে’— 'যাও, এ ফাঁদ অন্য কোন পাখি শিকার করার জন্য পাতো (আমাকে শিকার করতে চেয়ো না)। কারণ, আনকা পাখি (এক কাল্পনিক বিশালকায় পাখি)-র নীড় অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থিত।'

যে মানব ইতিহাস আত্ম-বিস্মৃতি ও সস্তা মূল্যে বিকিয়ে যাওয়ার কলঙ্কে কলঙ্কিত তার ইজ্জত ও সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছে ঐ সকল দৃঢ়চেতা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব দ্বারাই যাঁরা ছিলেন আত্ম-পরিচয়ে সমৃদ্ধ এবং আল্লাহর মারেফাতে ধন্য। মানবতার শির সমুন্নত থেকেছে তাঁদের দ্বারাই যাঁরা নিজেদের শির রেখেছেন সমুন্নত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00