📄 আত্মিক ও অভ্যন্তরীণ গুণাবলী
এটাও স্মরণ রাখুন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্ঞানরাশি ও বাহ্য বিধানাবলীর বিশাল ভাণ্ডার রেখে গেছেন— ‘ফাইননাল আম্বিয়া লাম ইউরিসু দিনারান ওয়ালা দিরহামান ওয়ালাকিন ওয়ারাসু হাজাল ইলম’ (কেননা নবীগণ দীনার ও দিরহামের উত্তরাধিকার ছেড়ে যান না তাঁরা উত্তরাধিকারীদের জন্য যা রেখে যান তা হচ্ছে ইলম ও জ্ঞান ভাণ্ডার)।
এই জ্ঞান কুরআন, হাদীস ও ফিকহের আকারে সংরক্ষিত আছে এবং আপনাদের মাদরাসা আলহামদুলিল্লাহ সেই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের সংরক্ষণ, প্রতিপালন, পরিষেবা ও প্রচার-প্রসারের বিশাল এক কেন্দ্র। উলূমে নবুওয়াত ও বাহ্য বিধানাবলীর সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু অভ্যন্তরীণ গুণাবলী, কিছু আত্মিক বৈশিষ্ট্যাবলীর উত্তরাধিকারও রেখে গেছেন। প্রথম প্রকার সম্পদ যেরূপ যুগ হতে যুগান্তরে, প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে সঞ্চালিত হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলা তার সংরক্ষণের ও প্রচার-প্রসারের ব্যবস্থা করেছেন, তদ্রূপ দ্বিতীয় প্রকারের সম্পদও যুগ ও প্রজন্মান্তরে বাহিত হয়ে এসেছে এবং এর সংরক্ষণ ব্যবস্থাও সম্পন্ন করেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। সেই গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যাবলী হচ্ছে— ইয়াকীন ও ইখলাস, ঈমান ও ইহতিসাব তথা বিশ্বাস ও নিয়তের পরিশুদ্ধতা, সকল কাজের লক্ষ্য নির্ধারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাআলুক মাআল্লাহ ও আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন, ইনাবত ও ইখবাত তথা আল্লাহমুখিতা ও আল্লাহ-নিবিষ্টতা, খুশু-খুজু, বিনয় ও নম্রতা, দুআ ও ইবতিহাল তথা প্রার্থনা ও কাকুতি-মিনতি, আত্ম বিনাশন ও আত্মমর্যাদা সচেতনতা ইত্যাদি। উলুম ও আহকাম— জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাহ্য বিধানাবলী এবং আত্মিক গুণ ও বৈশিষ্ট্যাবলী— এই উভয়বিধ সম্পদের একত্র সমাবেশ ঘটেছিল নবুওয়াতে মুহাম্মাদীতে। নবুওয়াতে মুহাম্মাদী ছিল উভয় প্রকার সম্পদের আকর। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— ‘হুয়াল্লাজি বাআসা ফিল উম্মিয়্যিনা রাসূলাম মিনহুম ইয়াতলু আলাইহিম আয়াতিহি ওয়ায়ুজাক্কিহিম ওয়ায়ুআল্লিমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাহ’— তিনিই উম্মীদের মধ্যে প্রেরণ করেছেন তাদের মধ্য হতে একজন রাসূলকে, যে তাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁর আয়াতসমূহ; তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হেকমত। (সূরা জুমুআ : ২)
নবুওয়াতে মুহাম্মাদী হতে বাহ্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিধানাবলী গ্রহণ আর অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যাবলী ও আত্মিক গুণাবলী বিবর্জন আসলে ত্রুটিপূর্ণ উত্তরাধিকারিত্ব, অসম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব। যাঁরা নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যাঁরা ইসলামের মহা মূল্যবান আমানত আমাদের নিকট বয়ে এনেছেন তাঁরা কখনই একটিমাত্র অংশের ধারক ও বাহক ছিলেন না। তাঁরা উভয়বিধ ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ছিলেন, উভয় প্রকার সম্পদে সমৃদ্ধ ছিলেন। শুধু প্রথম অংশ দ্বারা বর্তমান যুগেও ইসলামী দাওয়াত ও ইসলামী বিপ্লব প্রতিষ্ঠিত করা অসম্ভব। নিকট অতীতের যে সকল আসলাফ ও পূর্বসূরীর সাথে সম্পৃক্ততার সৌভাগ্যে আপনারা সৌভাগ্যবান তাঁদের মধ্যেও সমাবেশ ঘটেছিল এই উভয়বিধ বৈশিষ্ট্যের। আপনারা যদি প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের অত্যুচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করতে চান তবে আপনাদেরকেও এই উভয়বিধ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে সমানভাবে। এতদ্ব্যতীত ইলম ও জ্ঞানের পাণ্ডিত্য পরিণত হবে সৌরভ ও সজীবতাহীন কাগজের ফুলে। বর্তমান দুনিয়ার কোথাও কাগুজে ফুলের কোন অভাব নেই। আরও কিছু কাগুজে ফুল বৃদ্ধি করে আমরা কিছু নতুন মাত্রা সৃষ্টি করতে পারব না। এখানে তো প্রয়োজন বাগে নবুওয়াতের সজীব ও সুরভিত ফুল, যা জীবনতন্ত্রীকে করবে আন্দোলিত, আপন সৌরভে জীবন জগতকে করবে মাতোয়ারা। কৃত্রিম কাগজের ফুল যার সামনে লজ্জায় হবে অবনত। ‘ফাওয়াকাআল হাক্কু ওয়াবাতালা মা কানু ইয়ামালুন’— সত্য প্রতিষ্ঠিত হল এবং তাদের কর্ম মিথ্যা প্রতিপন্ন হল। (সূরা আরাফ ১১৮)
📄 মাদরাসার আত্মিক ও অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়
আমার পরবর্তী কথায় আপনারা দুঃখ পাবেন না। এই অধম কথকও আপনাদেরই একজন। আমাদের এই মাদরাসাগুলো ঐ ফুলের সজীবতা হারাচ্ছে। আলেম ও তালিবুল ইলমদের মধ্যে উপযুক্ত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমাদের শোনা উচিত এবং ভাবা উচিত, কবির এই কথার সত্যতা কতটুকু?
উঠা ম্যায় মাদ্রাসা ও খানকাহ সে নম্নাক
না জিন্দেগী না মহাব্বত না মারেফাত না নিগাহ
মাদরাসা ও খানকাহ হতে বের হয়েছি আমি শিশিরসিক্ত হয়ে, না আছে প্রাণ, না প্রেম ও ভালবাসা, না মারেফাত, না বিচক্ষণ দৃষ্টি।
ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় বর্তমান যুগে প্রতিষ্ঠান হতে শিক্ষাগ্রহণ শেষে অধিক সংখ্যক হারে আলেম বের হবার পরও সমাজে তাঁদের কোন প্রভাব দৃষ্ট হচ্ছে না, জীবন জগতে আলেমগণ কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারছেন না।
📄 বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব
এই ভারতবর্ষেই খাজা মঈনুদ্দীন আজমিরী অথবা সাইয়েদ আলী হামদানী কাশ্মীরীর ন্যায় দুনিয়া-বিরাগী এক ফকীর, এক সুফী আগমন করেন আর গোটা ভারতবর্ষকে আপন হৃদয়ের উত্তাপে উত্তপ্ত এবং ঈমানী নুরের জ্যোতিতে জ্যোর্তিময় করে তোলেন। হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ.)-এর আবির্ভাব ঘটে আর মোঘল রাজশাসনে সৃষ্টি হয় বিপ্লব, আমূল পরিবর্তন। তাঁরই নীরব ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে আকবরের সিংহাসনে আমরা আসীন দেখতে পাই আওরঙ্গজেবের ন্যায় ইসলামী আইন শাস্ত্রে পণ্ডিত, বিশেষজ্ঞ ফকীহ এবং শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ ও কট্টর অনুসারী একজন বাদশাহকে। হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) এই বিশাল ভূখণ্ডের গতি-প্রকৃতিই বদলে দিলেন। সমগ্র দেশের চিন্তা-জগত ও শিক্ষাব্যবস্থা তাঁর প্রভাবে বিপুলভাবে প্রভাবান্বিত হল। হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.) জাতির চরম হতাশা ও স্থবিরতার এক মহা সংকটকালে বিশাল এক ইসলামী দূর্গ নির্মাণ করলেন আর নববী ইলমের চর্চায় সঞ্চারিত করলেন নবজীবন। সাম্প্রতিক অতীতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) কে দেখুন। ঈমানী ও দ্বীনী কর্মকাণ্ডে এক নতুন রূহ, নতুন প্রাণের সঞ্চার করলেন। মোটকথা— ‘সে জাহানে রা দাগারগু করদ এক মর্দ খোদ আগাহে’ (আত্ম-সচেতন একজন ব্যক্তিই ওলট-পালট করে দিয়েছে সমগ্র জগতকে।)
আমাদের বর্তমান ফুযালায়ে কেরামের মধ্যে সেই প্রাণ অনুপস্থিত, সেইসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য হতে তারা নিঃস্ব, সেই সঞ্জীবনী শক্তি হতে বঞ্চিত, যা জাতিকে নতুনভাবে চিন্তা করার প্রেরণা যোগাতে পারত, তাদেরকে আমূল পরিবর্তন গ্রহণ করতে শক্তি দান করতে পারত। যুগ বড় সত্যাগ্রহী, সত্য-সচেতন। সে শ্রদ্ধা করে শুধু সমুন্নতকেই। মেধা ও মস্তিষ্ক শুধু নত হয় উন্নত মেধার সামনেই। শীতল ও শূন্য হৃদয় বশীভূত হয় শুধু উন্নত ও সমৃদ্ধ হৃদয়ের। মাদরাসাগুলোতে বর্তমানে মেধা ও প্রতিভার অবনতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। হৃদয়ের উষ্ণতাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। শীতলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে ওয়াজ ও নসীহত করার মত বাগ্মীর অভাব নাই, কিন্তু কবি জিগারের ভাষায়—
আঁখোঁ মে সুরুরে ইশক নেহি চেহরা পর ইয়াকীন কা নূর নেহি
চোখে নাই প্রেমানন্দের দীপ্তি, চেহারায় নাই ইয়াকীন ও বিশ্বাসের ঔজ্জ্বল্য।
📄 মাদরাসার দ্যুতিহীন পরিবেশ
এককালে মাদরাসা ছিল জীবন ও শক্তির কেন্দ্র। যেখানে একের পর এক জন্ম নিত জীবন জগতের আমূল পরিবর্তন সাধনকারী বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব। আর আজ? আজ সেই মাদরাসাগুলো হতাশা, স্থবিরতা আর হীনমন্যতার শিকার। সংখ্যাগত দিক থেকে মাদরাসা, ছাত্র, পাঠ্য কিতাব, কিতাবের সরবরাহ, শিক্ষক বেতনের পরিমাণ সবই উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু জীবন-তন্ত্রী হয়ে পড়েছে বড় দুর্বল, হৃদয়ের আবেগ ও উত্তাপে পড়েছে ভাটা। সচেতন ও দরদী কেউ এই অবস্থা দেখলে তার দম বন্ধ হবার উপক্রম হবে। এই মৃতপ্রায় সাগর দেখলে সে হয়তো বলে উঠবে—
খোদা তুঝে কিসি তুফান সে আশনা কর দে
কে তেরে বহর কি মৌজো মে ইজতিরাব নেহি
তুঝে কিতাব সে মুমকিন নেহি ফারাগ কে তু
কিতাব খোয়াহ হ্যায় মাগার সাহেবে কিতাব নেহি
'খোদা কোন তুফানের সঙ্গে তোমার মিলন ঘটিয়ে দিন। কারণ তোমার সাগর তরঙ্গে কোন উত্তালতা নাই। কিতাব হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি কিতাব আবৃত্তিকারী, কিন্তু কিতাব তোমাতে আত্মস্থ হয়নি।'
কিন্তু মাদরাসা নামক এই সাগর উত্তাল হোক, এতে ঝড় উঠুক— এই দুআ করতেও এখন শঙ্কা বোধ করি। কেননা বর্তমানে মাদরাসাগুলোতে ঝড় বইছে, পরিলক্ষিত হচ্ছে তুফানের আলামত। মাদরাসাগুলোর রক্ষণ প্রাচীরে সে ঝড় আঘাত হানছে। সে তুফানের উত্তাল তরঙ্গ মাদরাসার ভিত ধ্বসিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সে ঝড় আর তুফান বাইরের। তা বর্হিজগতের অন্তসারশূন্য চিন্তা-চেতনা, মূর্খতাপ্রসূত দাওয়াত ও আহ্বানের প্রতিধ্বনি। মাদরাসার ছাত্ররা যার লাউড স্পীকার রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।