📄 মাদ্রাসা কাকে বলে?
আমাদের সকলের সর্বপ্রথম অবগত হওয়া উচিত যে, একটি দ্বীনী মাদরাসার মূল্যবান ও মর্যাদাগত অবস্থান কত উচ্চে? মাদরাসা একটি বৃহৎ কারখানা। মানুষ গড়ার কারখানা। ব্যক্তি গঠনের কারখানা। এখানে দ্বীনের দাঈ এবং ইসলামের সৈনিক তৈরি করা হয়। মাদরাসা ইসলামী বিশ্বের বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা (Power House), যেখান থেকে মুসলিম জাতির মাঝে বরং গোটা মানবজাতির মাঝে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ এরূপ এক কারখানা যেখানে হৃদয় ও দৃষ্টি, মন ও মস্তিষ্ক যথারূপে গড়ে ওঠে। মাদরাসা এরূপ এক স্থান যেখান থেকে সমগ্র জীবন জগতকে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং গোটা মানব জীবনের তত্ত্বাবধানকার্য পরিচালিত হয়, যেখানকার ফরমান জগত জুড়ে কার্যকর কিন্তু জগতের ফরমান যেখানে কার্যকর নয়। তথাকথিত কোন আদর্শ ও মূল্যবোধ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, কোন ভাষা ও সাহিত্য, কোন নির্দিষ্ট যুগ ও কালের সাথে মাদরাসার সম্পর্ক নয় যে তা প্রাচীনত্ব দোষে দোষযুক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে কিংবা তা কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। মাদরাসার সম্পর্ক সরাসরি নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর সঙ্গে, যার আবেদন জগৎ জোড়া যা চিরজীবন্ত। মাদরাসার সম্পর্ক ঐ ইনসানিয়াত ও মানবতার সাথে যা চিরযুবা, ঐ জীবনের সাথে যা সদা চলমান। সত্যি বলতে কি, মাদরাসা প্রাচীন কি নবীন— এই বিতর্কের অনেক ঊর্ধ্বে। এ তো এমন এক স্থান যেখানে পাওয়া যায় নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর চিরন্তনত্ব, জীবনের উৎকর্ষের সন্ধান, জীবনের স্পন্দন ও আলোড়ন।
📄 মাদরাসার গুরুদায়িত্ব
সুধী! মাদরাসা 'সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থার নমুনা সংরক্ষণকারী জাদুঘর বিশেষ' কিংবা তা 'পুরাস্মৃতির স্মারক বিশেষ'— মাদরাসা সম্পর্কে এতদপেক্ষা অন্যায় ও আপত্তিকর অভিধা আর হতে পারে না। আমি এটাকে মাদরাসার সাধারণ পরিচিতিরও পরিপন্থী, ন্যূনতম মর্যাদারও হানিকর বলে মনে করি। আমি বিশ্বাস করি— মাদরাসা সর্বাপেক্ষা দৃঢ়, শক্তিশালী, সঞ্জীবনী শক্তিসম্পন্ন এবং প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এক প্রতিষ্ঠান। এর এক প্রান্ত যুক্ত নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর সঙ্গে, অপর প্রান্ত যুক্ত এই জীবন জগতের সঙ্গে। নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর সঞ্জীবনী ঝরনা হতে তা পানি সংগ্রহ করে বিস্তীর্ণ জীবন ক্ষেত্রকে সিঞ্চিত করে। মাদরাসা যদি তার এই সেচকার্য পরিত্যাগ করে তবে জীবনক্ষেত্র পরিণত হতে থাকবে শুষ্ক মরুভূমিতে, মানবতার ঘটবে মৃত্যু। না নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর সমৃদ্ধ ঝরনা হতে অকৃপণ দানের কোন প্রকার অস্বীকৃতি জ্ঞাপন বিদ্যমান, না মানবজাতির অভাবী পেয়ালার পক্ষ হতে তা গ্রহণে কুণ্ঠা প্রকাশ বিদ্যমান। এদিকে ‘ইন্নামা আনা কাসিমুন ওয়াল্লাহু ইয়ুতি’ (আমি বণ্টনকারী আর আল্লাহ তাআলা দান করেন)-এর বারংবার উচ্চারণ, ‘হাল মিম মাজিদ’ (আর আছে কি, আর আছে কি?)-এর অব্যাহত চাহিদাধ্বনি।
এই পৃথিবীতে মাদরাসা অপেক্ষা অধিক জীবন্ত, অধিক প্রাণচঞ্চল ও ব্যস্ত প্রতিষ্ঠান আর কোনটিকে আপনারা দেখাতে পারবেন? জীবনের সমস্যা অগণিত, জীবনের নানা রকম পরিবর্তন অগণিত, জীবনের প্রয়োজন অগণিত, জীবনের ভ্রান্তি অগণিত, জীবন পথে স্খলন অগণিত, জীবনের প্রবঞ্চনা অগণিত, জীবন-পথের পথ-দস্যু অগণিত, জীবনের আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাশা অগণিত ও অসংখ্য। মাদরাসা যখন জীবনের পথ প্রদর্শন এবং পথ চলায় জীবনকে সহায়তা দানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে তখন তার ক্লান্ত সময় অতিবাহিত করার অবকাশ কোথায়?
পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণীর, প্রত্যেকটি ব্যক্তির, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্রাম গ্রহণ ও অবকাশ যাপনের অধিকার আছে। তাদের সকলেরই ছুটি গ্রহণের সুযোগ লাভ হতে পারে কিন্তু মাদরাসার কোন ছুটি নাই। দুনিয়ায় সকল অভিযাত্রীর জন্যই বিশ্রামের সুযোগ আছে, কিন্তু মাদরাসা নামক এই অভিযাত্রীর জন্য ছুটি ভোগ হারাম। জীবন চলায় যদি কোন বিরতি থাকত, জীবনের গতিতে যদি যতি ও স্থিরতা বলে কিছু থাকত তাহলে না হয় মাদরাসাও কিছুটা দম নিয়ে নিতে পারত। কিন্তু জীবন যখন সতত চলমান, সদা গতিশীল, তখন মাদরাসার জন্য নিষ্ক্রিয়তা ও অলস সময় উদযাপনের সুযোগ কোথায়? তাকে তো পদে পদে জীবনের হিসাব গ্রহণ করতে হবে। নিত্য পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত দানে টলায়মান পদসমূহকে দৃঢ় ও অনড় পদে পরিণত করতে হবে। মাদরাসা যদি জীবন থেকে দূরে অবস্থান করে অথবা ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে অথবা কোন এক মনজিলে নিশ্চল স্থানুবৎ হয়ে পড়ে অথবা কোন এক পর্যায়ে উপনীত হয়ে আত্মতুষ্টিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তাহলে জীবনের সঙ্গদান, জীবনের নেতৃত্ব দানের গুরুদায়িত্ব কে পালন করবে? জীবনকে শ্বাশত বীণার সুর-লহরি, পয়গামে মুহাম্মাদী শোনাবে কে? মাদরাসার নিষ্ক্রিয়তা, নেতৃত্ব দান হতে পিছু হটা, কোন মনজিলে নিশ্চল হয়ে পড়া আত্মহত্যার শামিল, মানবতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক। আত্মপরিচয়ে সমৃদ্ধ, কর্তব্য-সচেতন কোন মাদরাসার পক্ষে এহেন কল্পনাও দুঃসাধ্য।
📄 শিক্ষার্থী ও শিক্ষা সমাপনকারী আলেমে দ্বীনের গুরুদায়িত্ব
বন্ধুগণ! মাদরাসা-শিক্ষার্থী ও তালিবুল ইলম হিসাবে আপনাদের দায়িত্ব সর্বাধিক নাজুক, সর্বাধিক মহান। বর্তমান পৃথিবীতে অপর কোন দল ও গোষ্ঠীর কাঁধে এরূপ নাজুক, এত ব্যাপক ও এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে বলে আমার জানা নাই। এই কথাটি পুনরায় স্মরণ করুন যে, আপনার এক প্রান্ত সংযুক্ত নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর সঙ্গে, অপর প্রান্ত সংযুক্ত জীবন জগতের সঙ্গে। এটাই আপনাদের মহানত্বের রহস্য। নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর সঙ্গে সংযোগ একদিকে যেমন মহা সৌভাগ্য ও মহাপ্রাপ্তি। অপর দিকে তা তেমনি অপরিমেয় মহা দায়িত্বের কারণ। আপনাদের নিকট আছে পরম সত্য এবং আকীদা-বিশ্বাস নামক মহা মূল্যবান সম্পদ।
নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর সঙ্গে এই সম্পৃক্ততার কারণে আপনাদের উপর বেশ কিছু দায়িত্ব বর্তায়। আপনাদের মধ্যে থাকা উচিত দৃঢ় ঈমান, অবিচল আস্থা ও ইয়াকীন। এরূপ সাহস ও দৃঢ়তা থাকা উচিত যেন সমগ্র জগতের বিনিময়েও নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর এক বিন্দু উত্তরাধিকারও হাতছাড়া হওয়ার প্রশ্নে আপোষের চিন্তা মস্তিষ্কে স্থান না পায়। হৃদয় পূর্ণ থাকা উচিত এর নুসরত ও সহায়তার উদ্বেল আবেগে। আপনাদের অন্তর থাকবে এই অমূল্য সম্পদের গর্বে গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। এর সত্যতা ও যথার্থতা, এর যৌক্তিকতা ও চিরন্তনতা, এর সর্বকালীন উপযোগিতা, এর ব্যাপ্তি ও বিশালতা, এর অত্যুচ্চ মর্যাদা এবং এর বিশুদ্ধতা ও পূর্ণাঙ্গতার ব্যাপারে আপনাদের অন্তরে থাকবে অবিচল ইয়াকীন, দ্বিধাহীন বিশ্বাস। এর বিপরীতে অন্য সবকিছুকে অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে জাহিলিয়াত ও মূর্খতার উত্তরাধিকার বলে জ্ঞান করবেন। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ ও ইসলামী শিক্ষা কানে পড়লে আপনারা যেখানে বলবেন ‘সামিনা ওয়া আতানা’ (শুনলাম এবং মানলাম), সেখানে জাহিলিয়াত প্রসূত বিধিব্যবস্থা ও তার ধ্বজ্জাধারীদের উদ্দেশ্যে বলবেন, ‘কাফারনা বিকুম ওয়া বাদা বাইনানা ওয়া বাইনাকুমুল আদাওয়াতু ওয়াল বাগদাউ হাত্তা তু’মিনু বিল্লাহি ওয়াহদাহু আবাদা’— আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য সৃষ্টি হল শত্রুতা ও বিদ্বেষ; যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন। (সূরা মুমতাহিনা, আয়াত ৪)
ইসলামের দিক-নির্দেশনা এবং রাসূলের আদর্শের মধ্যেই জগতের মুক্তি নিহিত বলে বিশ্বাস রাখবেন। এই বিশ্বাস আপনাদের অন্তরে বদ্ধমূল থাকবে যে, আধুনিক নুহী প্লাবনে নুহ (আ.)-এর কিশতী একমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত এবং শুধুই তাঁর ইমামত ও নেতৃত্ব। আপনাদের ইয়াকীন থাকবে যে, ব্যক্তি ও সমষ্টির সফলতা এবং উৎকর্ষ ও উন্নতির শীর্ষে পৌছার শর্ত একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ। এটা যথার্থ সত্য যে,
মুহাম্মদ আরবী কে আবরুয়ে হার দো সারাস্ত
কাসিকে খাকে দরশ নিস্ত খাকে বার সারাদ
আরবের মুহাম্মাদ উভয় জাহানের ইজ্জত ও সম্মান, যার মাঝে তাঁর আদর্শের উর্বর মাটি নেই, তার ললাট ধুলোয় লুটাক।
📄 আলেম ও তালিবুল ইলমের স্বাতন্ত্র্য
বন্ধুগণ! পৃথিবীর অন্য সকলের তুলনায় আপনাদের স্বাতন্ত্র্য, তাদের ও আপনাদের মধ্যে পার্থক্য এই যে, উপর্যুক্ত সত্যসমূহে সাদামাটা ঈমান আনাই অন্যদের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু আপনাদের জন্য এইসব বিষয়ে মানসিক প্রশান্তি, চিন্তাগত স্বচ্ছতা ও হৃদয়ে ঔজ্জ্বল্য থাকতে হবে। শুধু বিশ্বাস ও স্বীকারোক্তিই আপনাদের জন্য যথেষ্ট নয়, আপনাদের জন্য জরুরী দ্বীনের প্রচারক ও দাঈ হওয়া, দ্বীন বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়া। অন্যদের ঈমান যদি ঈমানধারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তবুও যথেষ্ট কিন্তু আপনাদের ঈমান হতে হবে আপনাদের সত্ত্বা অতিক্রম করত অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তারকারী, যা শত-সহস্র মানুষকে ইয়াকীন ও বিশ্বাসে আপুত করবে। আর তা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না আপনাদের এই আবেগাপ্লুতি আত্মবিলোপের স্তরে উপনীত হয় এবং যতক্ষণ না ‘ইয়াকরাহু আন ইয়াউদা ফিল কুফরি কামা ইয়াকরাহু আন ইয়ুকযাফা ফিন নার’ (কুফরীতে প্রত্যাবর্তন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ন্যায় অপছন্দ করে)-এর ভাবার্থ ও তাৎপর্য প্রতিফলিত হয়। নববী শিক্ষা সম্পর্কে অন্যদের ভাসা ভাসা জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু আপনাদের জন্য এই জ্ঞানে পাণ্ডিত্য ও বিদগ্ধতা, নিপুণতা ও দৃঢ়তা অপরিহার্য। অপরিহার্য এই ইলমের প্রতি ইশক ও প্রেম, অনুরাগ ও ভালবাসা। অতীব জরুরী নববী ইলমে আত্মলীনতা, একাগ্রতা ও অনন্যমনস্কতা। এতদ্ব্যতীত দাওয়াতী কার্যক্রমের কল্পনাও অর্থহীন। বরং বহুমুখী দাওয়াত ও প্রচার-প্রচারণার এই মহা প্লাবনের যুগে উপর্যুক্ত গুণাবলী ব্যতীত নিজের ঈমানী বৈশিষ্ট্য ও ঈমানী সম্পদকে রক্ষা করাও সুকঠিন ও দুরূহ ব্যাপার।