📄 হযরত আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী মিয়া হাসানী নদভী নাওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু-র সংক্ষিপ্ত জীবনী
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর চিন্তা-চেতনা, হযরত সাইয়েদ আহমদ শহীদের দ্বীনী আন্দোলন, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতবীর হিকমতে দ্বীন, হযরত মাওলানা মাহমূদ হাসান দেওবন্দীর জ্ঞান-গভীরতা, হযরত মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরীর জ্ঞানব্যাপ্তি, হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর সংস্কার, হযরত মাওলানা ইলিয়াস দেহলভীর বিশ্ব বিস্তৃত দাওয়াত ও ফিকির, হযরত মাওলানা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানীর দ্বীনী মর্যাদাবোধ, হযরত মাওলানা শাহ আবদুল কাদের রায়পুরীর বায়য়াত ও ইরশাদ, হযরত মাওলানা আতাউল্লাহ শাহ বুখারীর আকীদা-বিশ্বাসের বিশুদ্ধকরণের আহ্বান-এর সমষ্টি যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন হযরত আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী মিয়া আল-হাসানী আন-নদভী (রহ.)।
যাঁর পদচারণায় পাক-ভারত উপমহাদেশে শুধু নয়; বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে দাওয়াত ইলাল্লাহ-র ফিকির ও প্রেরণা জাগ্রত হয়েছে এবং তমসাচ্ছন্ন মানবজাতির সামনে দ্বীন ইসলামের আলো প্রজ্জ্বলিত হয়েছে। তাঁর জীবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হল।
জন্ম:
ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলীর তাকিয়াকালাঁ নামক স্থানে ৬ই মহররম, ১৩৩২ হিজরী মোতাবেক ৫ ডিসেম্বর ১৯১৩ ঈসায়ী পবিত্র জুমুআর দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা-মাতা:
তাঁর পিতার নাম হাকীম সাইয়েদ আবদুল হাই এবং মাতার নাম খাইরুন নিসা। ড. সাইয়েদ আবদুল আলী (মৃত্যু ১৩৮১ হিজরী) তাঁর বড় ভাই। তাঁর দুইজন বড় বোন ছিলেন। একজন আমাতুল্লাহ তাসনীম (মৃত্যু ১৩৯৫ হিজরী) অপরজন আমাতুল আযীয। তাঁর শ্রদ্ধেয়া মাতা কুরআনের হাফেজা ছিলেন। তাঁর খালা, খালাতো বোন, মামী এবং ফুফু সকলেই কুরআন হিফয করেছিলেন। তাঁর বয়স যখন নয় বৎসর তখন তাঁর পিতা ইন্তিকাল করেন এবং তাঁর ছাপ্পান্ন বৎসর বয়সে ১৩৮৮ হিজরী সনে তাঁর মাতা ইন্তিকাল করেন।
প্রাথমিক শিক্ষা:
তাঁর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় তাঁর মাতার নিকট। এরপর মাওলানা সাইয়েদ আযীযুর রহমান হাসানী এবং মাওলানা মাহমুদ আলীর নিকট কুরআন মাজীদ এবং উর্দু-ফার্সী পড়েন।
আরবী তালীম:
তিনি আরবী তালীম গ্রহণ করেন শায়খ খলীল আরব মুহাম্মাদ আনসারী ইয়ামানী ও ড. তকীউদ্দীন হেলালী মারাকেশীর নিকট থেকে।
ইলমে তাফসীর:
শায়খ খলীল আরব আনসারীর নিকট নির্বাচিত কয়েকটি সূরার তাফসীর পড়েছেন। অতঃপর ১৩৫১ হিজরী সনে লাহোরে অবস্থান করে হযরত মাওলানা আহমদ আলী লাহোরীর (মৃত্যু ১৩৬২ হিজরী) নিকট তাঁর তারতীব ও বিন্যাস অনুযায়ী সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদের তাফসীর পাঠ করেন।
প্রাচ্য বিজ্ঞান:
১৯২৭ ইং সনে লাক্ষ্ণৌ ইউনিভার্সিটির 'প্রাচ্য বিজ্ঞান' বিভাগে ভর্তি হন। সে সময়ে তিনি ঐ ভার্সিটির সর্বকনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন। ভার্সিটি থেকে সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
ইলমে হাদীস:
১৯২৯ সনে দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা হায়দার হাসান খানের হাদীসের ক্লাসে বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর নিকট বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযী শরীফ পাঠ করেন। ১৯৩২ ইং সনে দারুল উলুম দেওবন্দে যেয়ে হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর হাদীসের দরস দ্বারা উপকার হাসিল করেন এবং তাঁর তাফসীর ও উলূমূল কুরআনের ক্লাসেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।
ইলমে ফিকহ:
তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে হযরত মাওলানা এজাজ আলী আমরূহী সাহেবের নিকট ফিকহের দরস গ্রহণ করেন।
ইলমে তাজবীদ:
তিনি কারী আসগর আলী সাহেবের নিকট হাফসের রেওয়ায়েত মোতাবেক তাজবীদ শিক্ষা করেছেন।
বিবাহ:
১৯৩৪ ইং সনে আপন মামাতো বোন সাইয়েদ আহমদ সাঈদ সাহেবের কন্যাকে তিনি বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন হযরত শাহ জিয়াউন নবীর পুত্রের কন্যা এবং মুফতী আবদুর রাজ্জাক সাহেবের কন্যার কন্যা। দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস মাওলানা হায়দার হাসান খান তাঁর বিবাহ পড়ান। হযরত মাওলানা (রহ.)-এর কোন ঔরসজাত সন্তান ছিল না, কিন্তু বিশ্বব্যাপী তাঁর মানসসন্তান ও ভক্তবৃন্দের সংখ্যা লাখ লাখ নয়, কোটি কোটি।
দর্শন:
তিনি সাইয়েদুল মিল্লাত হযরত মাওলানা সুলাইমান নদভীর নিকট দর্শনশাস্ত্রের পাঠ গ্রহণ করেন এবং তাঁর বিশিষ্ট ছাত্রে পরিণত হন। তাঁর জ্ঞান ও কর্মের ফয়েয হাসিল করেন এবং তাঁর জ্ঞান ও কর্মতৎপরতা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন।
সুলুক ও তরীকত:
তিনি ১৯৩১ সনে মাওলানা আহমদ আলী লাহোরীর শায়খ মাওলানা গোলাম মুহাম্মাদ ভাওয়ালপুরীর হাতে বায়আত হন। ১৯৪২ সনে শায়খের ইঙ্গিতে মাওলানা আবদুর রহীম রায়পুরীর খলীফা মাওলানা শাহ আবদুল কাদের রায়পুরীর হাতে বায়আত হন।
ইংরেজী শিক্ষা:
১৯২৭ হতে ১৯৩০ সনের মাঝামাঝি সময়ে ইংরেজী ভাষা শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করেন। ফলে ইসলাম বিষয়ক এবং আরব সভ্যতা ও ইতিহাস বিষয়ক ইংরেজী ভাষায় লিখিত পুস্তকাদি সরাসরি ইংরেজী ভাষায় পড়ে বোঝার যোগ্যতা অর্জন করেন।
লেবাস-পোশাক ও দৈহিক গঠন:
তাঁর দৈহিক উচ্চতা ছিল মাঝারি প্রকৃতির। সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা ছিলেন। চেহারা ছিল গোলাকৃতির। গায়ের রঙ ছিল উজ্জ্বল। হাত ছিল মখমলের ন্যায় নরম ও কোমল। সব সময় সাদা কাপড় পরিধান করতে ভালবাসতেন, পায়জামা-পাঞ্জাবী পরতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি ও মাহফিলে যেতে শেরওয়ানী পরিধান করতেন।
হযরত মাওলানার বিশেষ খাদেম হাজী আবদুর রাজ্জাক সাহেব বলেন, আমি ১৯৬০ সাল থেকে হযরতের সঙ্গে সফরে হযরে ছিলাম। তাঁর সবচেয়ে বড় চারিত্রিক গুণ ছিল বিনয় ও নম্রতা। তিনি আরও বলেন, এই দীর্ঘ চল্লিশ বৎসরে একবার কোন এক বিষয়ে অতিশয় অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং নিজের ক্রোধ ব্যক্ত করেছিলেন শুধু এই বলে যে, কষ্ট পেয়েছি। এই দীর্ঘ চল্লিশ বৎসরে তাঁকে সর্বাধিক আনন্দিত হতে দেখেছি তখন, যখন হারাম শরীফের চাবি সংরক্ষক কাবা শরীফের চৌকাঠের উপর চাবি রেখে তাঁকে তালা খুলতে ইশারা করেছিলেন আর তিনি তালা খুলে কাবা শরীফের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার মহা সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
দুঃখের মুহূর্ত:
সর্বাধিক দুঃখ ও বেদনাক্রান্ত হয়েছিলেন ১৯৬১ ইং সালে তাঁর বড় ভাই ড. সাইয়েদ আবদুল আলী সাহেবের ইন্তিকালের মুহূর্তে তাঁর কাছে থাকতে না পেরে। সে সময় তিনি বার্মার সফরে ছিলেন।
পছন্দ:
ডিসেম্বর ও জানুয়ারী ব্যতীত বৎসরের দশ মাসই বরফ মিশ্রিত ঠাণ্ডা পানি পান করতেন। সকালে নাশতার পরে এক পেয়ালা এবং আসরের পর দুই তিন পেয়ালা চা পান করার অভ্যাস ছিল। তাঁর চা হতে হত পেয়ালা ভর্তি এবং ঠোঁট পোড়ানো তীব্র গরম ও মুখ ফেরানো অতিশয় মিষ্টিযুক্ত।
মামুলাত:
রাতের শেষ ভাগে ফজরের নামাযের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকতেন। ফজরের পর গোসল করার নিয়মিত অভ্যাস ছিল। জীবনের শেষ দিকে দুর্বলতা ও নিদ্রাহীনতার কারণে ফজরের পর বিশ্রাম করতেন। সাতটা সাড়ে সাতটার দিকে নাশতা ও লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাত করতেন। এরপর চাশতের নামায আদায় ও কুরআন কারীমের তেলাওয়াত করতেন। অতঃপর দুই তিন সহায়তাকারীকে নিয়ে লিখতে পড়তে বসে যেতেন। সাড়ে বারোটা পর্যন্ত লেখালেখির কাজ করতেন এবং চিঠিপত্রের জবাব লিখতেন। বাদ জোহর দুপুরের খাবার খেতেন এবং খাবার খেয়েই শুয়ে পড়তেন। আসরের পূর্বে কখনও চিঠিপত্র নিয়ে বসতেন কখনও লোকজনকে সাক্ষাত দান করতেন আবার কখনও কুরআন মাজীদ পড়তেন।
বাদ আসর মেহমানদের সঙ্গে সাক্ষাত করতেন। মাগরিবের নামাযের বিশ মিনিট পূর্বে নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করতেন। রায়বেরেলীতে থাকলে মাগরিবের পর ঘরে যেতেন। ইশার নামাযের পর খাবার গ্রহণ অতঃপর কিছুক্ষণ জন্য লোকজনের সঙ্গে বসতেন। অতঃপর কিছুক্ষণ ছাত্র ও শিক্ষকবৃন্দের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন। রাত দশটার দিকে নিয়মিত শুয়ে পড়ার অভ্যাস ছিল।
হাস্যরসিকতা:
হযরত মাওলানার স্বভাবে শুষ্কতা ছিল না। তিনি স্বভাবজাতভাবেই প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। একবার ইঞ্জিনিয়ার ইমতিয়াজ সাহেব হযরতের পা টিপতে শুরু করলেন। হযরত বললেন, ভাই! আপনি আমার পা দাবানো ছাড়ুন। কারণ যেখানে আপনার হাত লাগে সেখানে তো বিল্ডিং দাঁড়িয়ে যায়।
দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার হাফেজ আতিকুর রহমান সাহেবকে যখন নদভী প্রেস বিভাগ হতে দারুল উলুমের মাতবাখের (বাবুর্চিখানা) পরিচালক হিসাবে বদলী করা হল তখন তিনি বিষয়টা হযরতকে জানালেন। হযরত বললেন, শুধু ও-র পার্থক্য। অর্থাৎ مطبع (প্রেস) হতে مطبخ (বাবুর্চিখানা) বিভাগে বদলী করা হয়েছে।
এক চিঠিতে হযরত মাওলানা (রহ.) তাঁর একান্ত খাদেম হাজী আবদুর রাজ্জাক সাহেব সম্পর্কে লিখেছেন, সে আমার জীবনের সঙ্গী এবং বৃদ্ধকালের লাঠি।
ইলমী ও দাওয়াতী জীবন:
১৯৩৮ ইং সনে সর্বপ্রথম আরবীতে লিখিত প্রবন্ধ সাইয়েদ রশীদ রেজা মিসরীর পত্রিকা আলমানারে ছাপা হয়। প্রবন্ধটি ছিল সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর আন্দোলনের উপর লিখিত। ১৯৩৪ ইং সনে দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার শিক্ষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং তাফসীর, হাদীস, আরবী সাহিত্য, ইতিহাস ও মানতেকের দরস দেন।
১৯৩৯ ইং সনে দ্বীনী প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে সফর করেন। এই সফরে হযরত শাহ আবদুল কাদের রায়পুরী এবং হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর সঙ্গে পরিচিত হন এবং সেই সময় থেকেই তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও নিয়মিত যোগাযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। প্রথমোক্তজনের নিকট থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও দীক্ষা লাভ করেছেন আর দ্বিতীয়জনের নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। আমৃত্যু তাঁদের সাথে এই সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা বজায় ছিল।
১৯৪৩ ইং সনে 'আঞ্জুমানে তালীমাতে ইসলাম' নামে একটি আঞ্জুমান প্রতিষ্ঠান করেন। যেখানে তিনি কুরআনে কারীম ও সুন্নাতে নববীর পাঠ দানের ব্যবস্থা চালু করেন। এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। ১৯৪৫ সনে নাদওয়াতুল উলামার মজলিসে এন্তেজামিয়ায় রোকন নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সনে আল্লামা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.)-এর প্রস্তাবে শিক্ষা বিভাগের নায়েব মুতামাদ হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৫১ সনে তাহরীকে পয়ামে ইনসানিয়াত বা মানবতার ডাক আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেন। যেহেতু চারিত্রিক মূল্যবোধ অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে পদদলিত করা হচ্ছিল, স্বার্থপরতা ও আত্মপূজার উন্মাদনা ভর করেছিল সকল মানুষের মস্তিষ্কে, মানুষের জান-মাল, ইজ্জত ও আবরুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল দ্রুতগতিতে তাই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন মানবতার ডাক আন্দোলন। ১৯৫৪ সনে সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর সর্বসম্মতিক্রমে মু'তামাদে তালীম হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৫৯ সনে মজলিসে তাহকীকাত ও নাশরিয়াতে ইসলাম (ইসলামী গবেষণা ও প্রকাশনা পরিষদ) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬১ সনে বড় ভাই ডা. আবদুল আলী হাসানীর ইন্তিকালের পর নাদওয়াতুল উলামার নাযেম নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সনে জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারায় বেশ কয়েকটি লেকচার প্রদান করেন। পরবর্তীতে যা (النبوة والانبياء فى ضوء القرآن) নবুওয়াত ও নবী কুরআনের আলোকে) নামে প্রকাশিত হয়। যার নজীর মেলা দুষ্কর।
সম্মান ও স্বীকৃতি, বিভিন্ন দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রের সদস্যপদ:
১৯৫৭ সনে দামেস্কের মাজমাউল লুগাতিল আরাবিয়্যাহর যোগাযোগ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সনে রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাকল্পে মুক্কা মুকাররমায় অনুষ্ঠিত প্রথম সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন এবং সম্মেলন পরিচালনার দায়িত্ব আনজাম দেন। ঐ সম্মেলনে বাদশাহ মাসউদ বিন আবদুল আযীয এবং লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস সানুসী উপস্থিত ছিলেন। ১৯৬২ সনে জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারা প্রতিষ্ঠালগ্নে তাঁকে মজলিসে শুরার সদস্য নির্বাচিত করা হয়। রাবেতা আল-জামেয়াতুল ইসলামিয়ার (রাবাত, মরক্কো) সম্মেলনে রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেলের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেন। এরপর নাদওয়াতুল উলামার প্রতিনিধি হিসাবে এই সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৮০ সনে জর্ডানের মাজমাউল লুগাতিল আরাবিয়ার রোকন মনোনীত হন। ১৯৮১ সনে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানসূচক পি. এইচ. ডি ডিগ্রী প্রদান করা হয়। ১৯৮৩ সনে অক্সফোর্ড ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এর সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করে রাখেন। ১৯৮৪ সনে রাবেতা আল-আদাবিল ইসলামিয়া আল-আলিয়ার প্রতিষ্ঠা হয়। তখন থেকে তিনি এর আজীবন সভাপতি হিসাবে বহাল থাকেন। ১৯৬৮ সনে সউদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর আমন্ত্রণে শরীয়া বিভাগের পাঠ্যসূচী ও নিয়ম-কানুন প্রস্তুতের জন্য রিয়াদ গমন করেন।
১৯৩২ সনে নাদওয়াতুল উলামা থেকে প্রকাশিত আরবী পত্রিকা الضيا এবং ১৯৪০ সনে উর্দু পত্রিকা আন-নাদওয়ার সম্পাদনায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সনে আঞ্জুমানে তালীমাতে ইসলামিয়ার পক্ষ থেকে 'তা'মীর' নামে উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ১৯৫৮-৫৯ সনে দামেস্ক থেকে প্রকাশিত 'আল-মুসলিমুন' পত্রিকায় নিয়মিত সম্পাদকীয় লিখেছেন। প্রথম সম্পাদকীয় ছিল এই শিরোনামে ردة ولا أبا بكر لها যা উর্দুতে অনূদিত হয়ে 'নতুন তুফান এবং তার মুকাবেলা' নামে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া উস্তাদ মুহিব্বুদ্দীন খতীবের 'আল ফাতাহ' পত্রিকাতেও তাঁর কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬৩ সনে লাক্ষ্ণৌ থেকে 'নেদায়ে মিল্লাত' প্রকাশিত হতে শুরু করলে তিনি পত্রিকাটির প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৫ সালে নাদওয়া থেকে আরবী পুস্তিকা البعث الاسلامی এবং ১৯৫৯ সালে প্রকাশিতব্য আরবী পুস্তিকা الرائد এবং উর্দু ম্যাগাজিন পাক্ষিক তামীরে হায়াত এর প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮০ সালে মুসলিম বিশ্বে তাঁর অনবদ্য ইলমী ও আমলী খেদমতের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৪০০ হিজরী সনে বাদশাহ ফয়সাল এওয়ার্ড দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করা হয়। এই এওয়ার্ডে সৌদী দুই লাখ চল্লিশ হাজার রিয়াল ও একটি সনদপত্র তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তৎকালীন ভারতীয় রূপী হিসাবে ঐ অর্থের পরিমাণ ছিল চব্বিশ লাখ রূপী। হযরত মাওলানা মরহুম এই অর্থের অর্ধেক দান করেন আফগান শরণার্থীদের জন্য এবং অবশিষ্ট অর্ধেক অর্থ মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত ইদারায়ে হিফযুল কুরআন ও সাওলাতিয়া মাদরাসায় সমান ভাগে ভাগ করে দান করেন। হযরত সুলাইমান নদভী প্রণীত সীরাতুন নবী গ্রন্থখানির অষ্টম খণ্ডের ভূমিকা মাওলানা লিখে দিয়েছিলেন। কিতাবটি পাকিস্তান থেকে মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক তাঁকে এক লাখ টাকার এওয়ার্ড দান করেন। হযরত মাওলানা এই টাকার অর্ধেক আজমগড়ের 'দারুল মুসান্নিফীন' প্রতিষ্ঠানে দান করেন। আর অর্ধেক সাইয়েদ সুলাইমান নদভী মরহুমের স্ত্রীকে দিয়ে দেন। ১৯৯৯ সনে একটি শানদার অনুষ্ঠানে 'ইসলামী বিশ্বের মহান ইসলামী ব্যক্তিত্ব' এওয়ার্ড মাওলানাকে প্রদান করা হয়। এই এওয়ার্ডের অর্থের পরিমাণ ছিল এক কোটি বিশ লাখ রূপী। এই টাকাও সম্পূর্ণরূপে তিনি ভারতের বিভিন্ন দ্বীনী প্রতিষ্ঠানে দান করে দেন। এই বছরেই অক্সফোর্ড ইসলামী সেন্টারের পক্ষ থেকে 'তারীখে দাওয়াত ও আযীমাত'-এর জন্য তাঁকে সুলতান হাসান বুলকিয়া ব্রুনাই ইন্টারন্যাশনাল এওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়। এই অর্থও তিনি তাঁর বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজন ও অভাবী ব্যক্তিদেরকে দান করে দেন।
দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রসমূহের রোকন হিসাবে তাঁকে নির্বাচন:
* ৮ই জুন ১৯৬১ দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার নাযেম নির্বাচিত হন।
* সভাপতি, তালীমী কাউন্সিল, উত্তর প্রদেশ, ভারত।
* সভাপতি, অল ইণ্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল 'ল' বোর্ড, ভারত।
* সভাপতি, মজলিসে ইন্তেজামী ও মজলিসে আমেলা, আজমগড়।
* সভাপতি, ইসলামিক সেন্টার অক্সফোর্ড লন্ডন, বৃটেন।
* সভাপতি, ফাউন্ডেশন ফার স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ, লুক্সেমবার্গ।
* সভাপতি, মজলিসে তাহকীকাত ও নাশরিয়াতে ইসলামী লাখনৌ, ভারত।
* সভাপতি, আলমী রাবেতা আদবে ইসলামী।
* রোকন, মুআসসাসাহ আলে বাইত, ওমান, জর্ডান।
* প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, তাহরীকে পয়ামে ইনসানিয়াত, ভারত।
* রোকন, মজলিসে তাসীসী রাবেতা আলমে ইসলামী, মক্কা মুকাররমা, সৌদী আরব।
* রোকন, মজলিসে শুরা জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারা।
* রোকন, আরবী একাডেমী, দামেশক, কায়রো ও জর্ডান।
* রোকন, মজলিসে আমেলা, মুতামার আলমে ইসলামী বৈরুত, লেবানন।
* রোকন, মজলিসে এন্তেজামী ইসলামিক সেন্টার, জেনেভা।
* রোকন, মজলিসে ফিকহে ইসলামী, রাবেতা আলমে ইসলামী, মক্কা মুকাররমা, সৌদী আরব।
* রোকন, মজলিসে শূরা দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত।
* রোকন, মজলিসে আমেলা, ইসলামিক ইউনিভার্সিটিজ ফেডারেশন, রাবাত, মরক্কো।
* রোকন, একাডেমী অব অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজেস, ওমান।
* রোকন, ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফার ট্রান্সলেশন রিসার্চ এন্ড স্ট্যাডিজ, তিউনিস।
* ভিজিটিং প্রফেসর, দামেশক-মদীনা ইউনিভার্সিটি, সৌদী আরব।
মাওলানার সফরসমূহ:
১৯২৯ সালে লাহোর সফর করেছেন। এটাই ছিল প্রথম দূরের সফর। এই সফরে লাহোরের ইলমী ও দ্বীনী ব্যক্তিত্ব ও বুযুর্গগণের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এই সফরে প্রাচ্যের কবি ড. মুহাম্মাদ ইকবালের সঙ্গেও সাক্ষাত করেন এবং তাঁর কাব্যগ্রন্থ চান্দ এর আরবী অনুবাদ তাঁর সামনে পেশ করেন। মাওলানা নিজেই আরবীতে কাব্যগ্রন্থটির অনুবাদ করেছিলেন।
১৯৩৫ সনে হরিজন নেতা ড. আম্বেদকরকে ইসলামের দাওয়াত দানের উদ্দেশ্যে বোম্বে সফর করেন।
১৯৪৭ সনে হজ্জের সফর করেন। এটাই ছিল তাঁর হজ্জের প্রথম সফর। বহির্দেশের সফর এটাই ছিল প্রথম। কয়েক মাস হিজাজে অবস্থান করেন। হজ্জের দ্বিতীয় সফর হয়েছিল ১৯৫০ সনে। হজ্জ সমাপণান্তে সেখান থেকে মিশর, সুদান, জর্ডান ও শামের সফর করেন।
১৯৫১ সনে মিশরের প্রথম সফর করেন। মাওলানার গমনের পূর্বেই তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين কিতাবটি যেমন সেখানকার সর্বস্তরের বিদ্বানদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল, তেমনি কিতাবটির বদৌলতে তিনিও পূর্ব থেকে সেখানে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এই সফরেই ফিলিস্তিন গমন করেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস যিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করেন। ফিরতি পথে জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করেন।
১৯৫৬ সনে তুর্কী সফর করেন। তুর্কীতে এটাই ছিল প্রথম সফর। এই সফরের বিবরণী 'তুর্কীতে দুই সপ্তাহ' নামে প্রকাশিত হয়। এই বৎসরই লেবানন সফর করেন।
১৯৬০ সনে বার্মা সফর করেন।
১৯৬২ সনে কুয়েতের প্রথম সফর করেন। পরবর্তীতে কুয়েত সহ উপসাগরীয় দেশসমূহে একাধিকবার সফর করেন। জর্ডান ও ইয়েমেনেও সফর করেছেন।
১৯৬৩ সনে ইউরোপ সফর করেন। এটাই ছিল ইউরোপে প্রথম সফর। এই সফরে লন্ডন, প্যারিস, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রীজ ইত্যাদি জায়গায় গিয়েছেন এবং স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে গিয়েছেন।
১৯৭৬ সনে মসজিদে আকসা সফর করেছেন।
১৯৭৭ সনে আমেরিকার প্রথম সফর হয়েছে। এই সফর ছিল দুই মাস দশ দিনের। এই সফরে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে গিয়েছেন এবং দ্বীনী ও দাওয়াতী বক্তৃতা প্রদান করেছেন। এই সফরে চোখেরও অপারেশন করিয়েছেন।
১৯৭৭ সনে আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান এবং লেবাননের উদ্দেশ্যে রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দান করেছেন।
১৯৮৫ সনে বেলজিয়াম সফর করেছেন।
১৯৮৭ সনে তাসখন্দ, সমরকন্দ প্রভৃতি শহর সফর করেছেন। জর্ডানে সফর করেছেন ১৯৭৩ ও ১৯৮৪ সনে। স্পেনে ১৯৭৩ সনে। সংযুক্ত আরব আমীরাতে ১৯৭৪, ১৯৭৬, ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯৩ এবং ১৯৯৯ সনে। উত্তর আমেরিকা সফর করেছেন ১৯৭৭ ও ১৯৯৩ সনে। ইউরোপ সফর করেছেন ১৯৬৩, ১৯৬৪, ১৯৬৯, ১৯৮৩, ১৯৮৬, ১৯৮৭, ১৯৮৯, ১৯৯২, ১৯৯৩ সনে। ইরান সফর করেছেন ১৯৭৩ সনে। পাকিস্তান সফর করেছেন ১৯৫৯, ১৯৬৪, ১৯৭৮, ১৯৮৪, ১৯৮৬ সনে। বোখারা সফর করেছেন ১৯৮৬ সনে। বৃটেনে সফর করেছেন ১৯৬৩ সনে এবং ১৯৮৫ সনে। বার্মা সফর করেছেন ১৯৬০ সনে। তুর্কী সফর করেছেন ১৯৫৬, ১৯৬৪, ১৯৮৯, ১৯৯৩ এবং ১৯৯৯ সনে। আল-জাযায়ের সফর করেছেন ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সনে। হেজাজ সফর করেছেন ১৯৪৭, ১৯৫১, ১৯৬২, ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সনে। কাতার সফর করেছেন ১৯৭৯ ও ১৯৯৫ সনে। রাবাত সফর করেছেন ১৯৭৬ সনে। শ্রীলংকা সফর করেছেন ১৯৮২ সনে। সমরকন্দ সফর করেছেন ১৯৯৩ সনে। সুদান সফর করেছেন ১৯৫১ সনে। শাম সফর করেছেন ১৯৫১, ১৯৫২, ১৯৬৪ ও ১৯৭৩ সনে। ইরাক সফর করেছেন ১৯৫৬ ও ১৯৭৩ সনে। ওমান সফর করেছেন ১৯৫১, ১৯৭৩, ১৯৮৪ ও ১৯৯৮ সনে। ফিলিস্তিন সফর করেছেন ১৯৫১ সনে। কুয়েত ১৯৬২, ১৯৬৮, ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সনে। লেবানন ১৯৫৬, ১৯৭৩ সনে। লাহোর ১৯৬৯ সনে। মালয়েশিয়া ১৯৮২ ও ১৯৮৭ সনে। মরক্কো ১৯৮৬ সনে। মিশর ১৯৫১ সনে। নেপাল ১৯৯২ সনে। ইয়েমেন ১৯৮৪ সনে। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সনে।
📄 দাওয়াত ও তাবলীগি কাজের মধ্যেই মুসলমানদের প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা নিহিত
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা সাইয়্যিদুল আনবিয়াই ওয়াল মুরসালীন ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমায়ীন ওয়া মান তাবিআহুম বি ইহসানিও ওয়া দাআ বি দাওয়াতিহিম ইলা ইয়াউমিদ দীন। আম্মা বাদ—
ফা আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।
ওয়ালতাকুম মিনকুম উম্মাতুই ইয়াদউনা ইলাল খাইরি ওয়া ইয়ামুরুনা বিল মারুফি ওয়া ইয়ানহাওনা আনিল মুনকার।
প্রিয় ছাত্রবৃন্দ!
এটা একটা যথার্থ ও ঐতিহাসিক সত্য যে, নবীগণের সকল প্রচেষ্টার বুনিয়াদ ছিল দাওয়াত। তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তাঁর সঙ্গে মানবজাতির ঘনিষ্ঠতা ও তাআল্লুক সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের আকীদা-বিশ্বাস বিশুদ্ধতা লাভ করেছে, তাদের চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, অন্যায় অবিচারের প্রতি তাদের ঘৃণার মনোভাব জাগ্রত হয়েছে, নবীগণের মাধ্যমেই অন্যায়-অবিচারের নিষ্ক্রিয়তা শুরু হয়েছে, অন্যায়-অবিচার মূলোৎপাটিত হয়েছে, তাঁদের মাধ্যমেই গোটা মানবজাতির গতির পরিবর্তন ঘটেছে, মানুষের জীবন যাপন প্রণালীর আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এইসব কিছুর মূলে ছিল নবীগণের দাওয়াত। হাঁ একমাত্র দাওয়াতই ছিল নবীগণের সাফল্যের মূলভিত্তি। রাজশাসন কিংবা রাজক্ষমতা, ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি ও দাপট, স্বার্থের প্রলোভন, যুগ ও পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি কোনটাই নয়, তাদের কর্মপ্রচেষ্টার বুনিয়াদ ছিল একমাত্র দাওয়াত। আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম)-এর আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই দিকটাকেই, এই সত্যটাকেই, এই বিশেষত্বকেই বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। আপনি যদি নবীগণের ইতিহাস ও তাঁদের জীবন চরিত পাঠ করেন, তবে আপনার সামনে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে যে, তাঁদের কর্মকাণ্ডের সূচনা ও সমাপ্তি এবং বুনিয়াদ ছিল এই দাওয়াত। আম্বিয়া কেরামের এটাও এক বিশেষ প্রচেষ্টা ছিল যে, তাঁদের প্রস্তুতকৃত ব্যক্তিরাও যেন এই দাওয়াতের দায়িত্ব সুচারুরূপে আঞ্জাম দেয় এবং এটাকে তারা ফরয ও আবশ্যিক বলে জ্ঞান করে। এজন্য কুরআনুল কারীমে আদেশসূচক শব্দ ব্যবহার করে বলা হয়েছে— ‘ওয়ালতাকুম মিনকুম উম্মাতুন’ ইত্যাদি।
তোমাদের মধ্য থেকে এক দলের এরূপ হওয়া উচিত যাদের কাজ হবে— ‘ইয়াদউনা ইলাল খাইর’ কল্যাণের দিকে আহ্বান করা। আর এই কাজের জন্য আল্লাহ তাআলা সর্বাধিক আদর্শ, নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য যে দাঈ (দাওয়াত দানকারী) এবং সর্বাপেক্ষা সফল যে দাঈ-র উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন তাঁরা ছিলেন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম। যদি আপনি তাঁদেরকে পাঠ করেন, তবে অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন যে, দাওয়াত তাঁদের প্রাণ নয় শুধু, বরং দাওয়াত ছিল তাঁদের প্রকৃতিজাত স্বভাব, আল্লাহ প্রদত্ত মেজায। এক হল কাজ, প্রয়োজন পূরণের তাগিদ আর সময়ের দাবি, আরেক হল মেজায। তো আম্বিয়া কেরামের মেজাযই ছিল দাওয়াত। বরং বলুন, সকল দ্বীনের মেজায ছিল দাওয়াত। আল্লাহ তাআলা নবীগণের জীবন-কাহিনীর যে খুঁটিনাটি ও বিস্তারিত বিবরণ দান করেছেন তা হতে এবং নবীগণের স্ব-স্ব জাতির সাথে তাঁদের কথোপকথন ও তাঁদের দাওয়াতের যে পদ্ধতির বিবরণ দান করেছেন তা হতে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁরা মূলত ও প্রথমত ছিলেন দাঈ বা দাওয়াত দানকারী, তারপর অন্য কিছু। যেমন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। তিনি ছিলেন এক্ষেত্রে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের মধ্যে যারা তাঁর সঙ্গে চেতনাগত, বিশ্বাসগত ও দাওয়াত গত সম্পর্কে সম্পৃক্ত হবে তাদের মধ্য থেকে তারাই দাওয়াত ইলাল্লাহ, দাওয়াহ ইলাল আখিরাহ (আখেরাতের দিকে আহ্বান) দাওয়াত ইলাদ্দীন বা দ্বীনের প্রতি আহ্বান ইত্যাদি দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে, যারা প্রকৃত অর্থেই তাঁর অনুগত ও তাঁর পথের পথিক। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘মিল্লাতা আবিকুম ইবরাহীম, হুয়া সাম্মাকুমুল মুসলিমীন’ (তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত আঁকড়ে ধর। তিনি তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম)। (সূরা হাজ্জ ৭৮)
চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে দিলেন যে, যে উম্মতকে ‘খায়রা উম্মাত’ বা শ্রেষ্ঠ উম্মত নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে সেই শেষ উম্মতের প্রকৃত ঊর্ধ্বতম পূর্বসূরী এবং প্রতিষ্ঠাতা ও মুরব্বী হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। কুরআন মাজীদে যেখানেই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আলোচনা এসেছে সেখানেই দাঈ সুলভ প্রাণের উচ্ছ্বলতার সন্ধান মেলে এবং তাঁর আলোচনায় তাঁকে সর্বাপেক্ষা অধিক উপস্থাপন করা হয়েছে দাঈ হিসাবেই। কোন দাঈকে যে সর্বাপেক্ষা অধিক বিপদের মুখোমুখি হতে হয়, তাকে যে সর্বাধিক ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার করে নিতে হয় তার দৃষ্টান্ত হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আলোচনাতেই বৃহৎ দুটি ত্যাগ ও কুরবানীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি যখন তাওহীদী বিশ্বাসের কথা ঘোষণা করলেন এবং সমকালীন বাদশাহ নমরূদের আনুগত্য ও দাসত্বকে অস্বীকার করলেন তখন আগুন জ্বালানো হল এবং বাদশাহ নির্দেশ দিল, তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করতে। অন্যান্য নবীগণের আলোচনায় এরূপ ভয়াবহ পরীক্ষায় নিপতিত হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় পরীক্ষাটির বিবরণ পাওয়া যায় সূরা সাফফাতে। তিনি প্রাণপ্রিয় পুত্রকে বললেন— ‘ইয়া বুনিয়্যা ইন্নী আরা ফিল মানামি আন্নী আযবাহুকা ফানযুর মা যা তারা’ (হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি তোমাকে (আল্লাহর নির্দেশে) যবেহ করছি, তুমি চিন্তা করে দেখ তোমার কী অভিমত)। (সূরা সাফফাত ১০২)
এই দুটি পরীক্ষাই এবং দুটো কুরবানী ও ত্যাগই এরূপ যার নজীর অন্যান্য দাঈর জীবন ও ইতিহাস তো দূরের কথা অন্যান্য নবীগণের জীবন ও ইতিহাসেও পাওয়া যায় না। এই দুটো পরীক্ষার কথা কুরআনুল কারীমে বিবৃত করে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত করেছেন যে, দাঈর সামনে এরূপ পরীক্ষা ও বিপদ আগত হতে পারে। তো ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের, ইসলামের সফলতার, ইসলাম যে বিপ্লব সাধন করেছে এবং যে শূন্যতা মুসলিম উম্মাহ দ্বারা পূর্ণতা লাভ করে সে সবকিছুর মূল হচ্ছে দাওয়াত। এই উম্মত যত দিন দাওয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে ততদিন পৃথিবীতে কল্যাণের আশা করা যেতে পারে, ততদিন পৃথিবীতে কল্যাণের প্রসার ঘটবে। আল্লাহ না করুন! এই উম্মত যদি দাওয়াতের কাজকে নিষ্প্রয়োজন বলে মনে করে এবং দাওয়াতের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে তবে গোটা পৃথিবী বিপন্ন হয়ে পড়বে। অতএব দাওয়াতের কাজকে জীবন্ত করে তোলা আবশ্যক।
রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.)-এর জওয়াব এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। রুস্তম যখন জিজ্ঞাসা করেছিল— ‘মা আল্লাযি জাআ বিকুম’ (তোমরা কী উদ্দেশ্যে এসেছ?)। রুস্তমের এই প্রশ্নের কমপক্ষে দশটি জবাব হতে পারত। কিন্তু রুস্তম অপেক্ষায় ছিল একটি মাত্র উত্তরের। সে প্রত্যাশায় ছিল যে, উত্তরে তাকে বলা হবে, ‘তোমরা বহুকাল যাবৎ বিলাসী জীবন যাপন করছ আর আমরা অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছি। তাঁবুতে বাস করছি। আমাদের খাদ্য বলতে কিছু খেজুর, উটের গোশত আর উটের দুধ। সুতরাং আমরা এসেছি আমাদের হক ও অধিকার আদায় করে নিতে। সুখী জীবন যাপনের অধিকার কি শুধু তোমাদেরই থাকবে? তা কখনও হতে পারে না।’
রুস্তম এই উত্তরের অপেক্ষায় ছিল এবং এর জন্য প্রস্তুতও ছিল যে, যদি তারা এরূপ দাবি করে তবে সে তাদের প্রকৃতিগত ও জন্মগত অধিকার এবং হক দিয়ে দেবে, তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত হক বুঝে নিয়ে চলে যাবে। ফলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধের ঝামেলায় জড়াতে হবে না এবং পরাজিত হয়ে নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে না। সে ঠিক করে রেখেছিল, সে বলবে— ঠিক আছে, আমি তোমাদের ভাতার ব্যবস্থা করছি। প্রতিটি আরর এই পরিমাণ ভাতা পাবে। রুস্তম এই উত্তরের প্রত্যাশায়ই প্রশ্ন করেছিল এবং আমাদের ধারণা, সে নব্বই-পঁচানব্বই ভাগ নিশ্চিত ছিল যে, উত্তরে তাকে বলা হবে, ‘আমাদের ক্ষুধা ও দারিদ্রই আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে। এটা কেমন অবিচার যে, তোমরা একেকজন লাখ টাকার টুপি পরিধান করবে আর আমরা মরব ক্ষুধায়-অনাহারে?’ বাস্তবতা এইরূপই ছিল। ইতিহাস বলে যে, রুস্তম পরাজিত হয়ে যখন পলায়ন করছিল তখনও তার সাথে ছিল এক হাজার বাবুর্চি, এক হাজার জোড়া গরু এবং এক হাজার জন বাজপালক। সাসানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস সম্পর্কে একটি গ্রন্থ আছে প্রফেসর ইকবাল অনূদিত। গ্রন্থটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও তথ্যবহুল। আমি আমার রচনায় গ্রন্থটির বরাত দিয়েছি। আমরা ইতিহাস গ্রন্থ পাঠ করি ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে। গভীর দৃষ্টিতে, চিন্তা ও মনোযোগ সহকারে তা পাঠ করি না।
যা হোক, রুস্তমের ঐ জাতীয় প্রশ্নের প্রেক্ষিতে একজন দাঈ’র পক্ষ থেকে কী জবাব হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.)-এর জবাব। শুধু তাই নয় বরং তাঁর জবাব মুসলিম উম্মাহর চেতনাগত ও কর্মগত অবস্থানও সুদৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করে। সে জিজ্ঞেস করেছিল— ‘মা আল্লাযি জাআ বিকুম’ (তোমরা কেন এসেছ?)। রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.) একজন সাধারণ সৈনিক ছিলেন। উত্তর প্রদানের জন্য সেনাপতি সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাযি.) তাঁকে নির্বাচিত করতে কারও ভোট বা পরামর্শ নেননি। কিন্তু যে দীক্ষা তাঁরা পেয়েছিলেন, সেই দীক্ষাই একজন সাধারণ সৈনিককেও এরূপ অভাবিত উত্তর প্রদানে প্রেরণা যুগিয়েছিল। তিনি উত্তরে বললেন— ‘মা জাআ বিনা শাইউন, আল্লাহু বাআছানা লিনুখরিজা মান শাআ মিন ইবাদাতিল ইবাদি ইলা ইবাদাতিল্লাহি ওয়াহদাহু’ (কোন কিছুই আমাদেরকে এখানে নিয়ে আসেনি। আমাদেরকে এখানে প্রেরণ করেছেন আল্লাহ তাআলা, যাতে আমরা আল্লাহ যাকে চান তাকে বান্দার পূজা ও উপাসনা থেকে বের করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে যেতে পারি)।
উত্তরটি গভীর চিন্তার খোরাক যোগায়। উত্তরটিতে তিনি বলতে চাইলেন, আমাদের শক্তি ও ক্ষমতা কোথায় যে, আমরা নিজের ইচ্ছায় বের হয়ে আসব? আমরা কবে নিজের ইচ্ছায় বের হয়েছি? আমাদের বের হওয়ার পিছনে নিজস্ব স্বার্থই বা আমরা কবে দেখেছি? আমাদেরকে তো বের করেছেন আল্লাহ এবং এজন্য বের করেছেন, যাতে আমরা মাখলুকের পূজারীকে এক খালেক ও সৃষ্টিকর্তার পূজায় ও ইবাদতে লিপ্ত করতে পারি। উল্লেখ্য যে, সেখানে মূর্তিপূজা হত। মানুষ হয়ে গিয়েছিল বন্ধু ও সম্পদের দাস, কামনা ও বাসনার পূজারী। তৎকালীন যুগের সকল বাদশাহই নিজেকে মাবুদ বানিয়ে বসেছিল। রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.) যখন রুস্তমের দরবারের কাছাকাছি পৌঁছলেন তখন তাঁকে এই বলে বাধা দেওয়া হল যে, তুমি এভাবে যেতে পারবে না। তোমার ঘোড়াটাকে এখানে রেখে যাও এবং বিনয় ও নম্রতার সাথে দরবারে প্রবেশ কর। তিনি বললেন, দেখ— আমি নিজে আসিনি। আমি আমন্ত্রিত। আমাকে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সুতরাং আমাকে আমার মত যেতে দাও, নতুবা আমি ফিরে যাচ্ছি। রুস্তম দূর থেকে বিষয়টা লক্ষ্য করে প্রহরীদেরকে বলল, 'তাকে আসতে দাও। এরপর রুস্তমের প্রশ্ন এবং তাঁর উত্তর। তিনি বললেন— ‘আল্লাহু বাআছানা লিনুখরিজা মান শাআ মিন ইবাদাতিল ইবাদি ইলা ইবাদাতিল্লাহি ওয়াহদাহু ওয়া মিন দ্বীকিল দুনিয়া ইলা সাআতিহা’ (আমাদেরকে প্রেরণ করেছেন আল্লাহ তাআলা, যাতে তিনি যাকে চান তাকে আমরা মাখলুকের ইবাদত ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসত্ব ও ইবাদতে লিপ্ত করতে পারি এবং দুনিয়ার সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত করে দুনিয়ার প্রশস্ততায় নিয়ে আসতে পারি)।
শেষ কথাটি তো চমকে দেওয়ার মত কথা। রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.)-এর পূর্ণ কথাটি বিভিন্ন ভাষায় ব্যাখ্যাসহ অনূদিত হওয়া উচিত। এর প্রতিটি শব্দ যেন কালামে নবুওয়াত এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এলহামকৃত। তিনি যদি বলতেন— ‘মিন দ্বীকিল দুনিয়া ইলা সাআতিল আখিরাহ’ (আমরা প্রেরিত হয়েছি যেন তোমাদেরকে দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে আখেরাতের প্রশস্ততার দিকে বের করে নিতে পারি) তাহলে বিস্ময়ের কিছু থাকত না বরং ঐরূপ বলাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ, প্রতিটি মুসলিম বিশ্বাস করে যে, দুনিয়ার তুলনায় আখেরাত সর্বদিক দিয়ে অধিকতর প্রশস্ত। কিন্তু না, তিনি সেরূপ বললেন না। তিনি বললেন, আমরা এসেছি যেন তোমাদেরকে সংকীর্ণ দুনিয়া থেকে বের করে প্রশস্ত দুনিয়ার দিকে নিয়ে যেতে পারি। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইলেন, আমরা তোমাদের দূরাবস্থা দেখে তোমাদের প্রতি করুণা করতে এসেছি, তোমাদেরকে দুনিয়ার সকল দাসত্ব থেকে মুক্ত করে স্বাধীন সত্ত্বায় পরিণত করতে এসেছি। তোমরা তো চড়ুই পাখির ন্যায়। পিঞ্জরাবদ্ধ চড়ুই পাখিকে যা দেওয়া হয় তাই সে খেতে পারে। এর বাইরে তার করার কিছুই নেই। তোমাদের অবস্থাও পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির ন্যায়। তোমাদের চাকর-নওকর যদি না থাকে, তোমরা ক্ষুধার্ত থেকে যাবে। তারাই রান্না করে, তারাই তোমাদেরকে আহার করায়, পান করায়। তোমরা তোমাদের গোলামের গোলাম ও চাকর-নওকরের গোলাম। তাদের দাসত্ব নিগড়ে তোমরা বন্দী। তোমরা তোমাদের বাবুর্চির দাস ও গোলাম। প্রহরী ও রক্ষী সেনাদের দাস ও গোলাম। তারা ব্যতীত তোমরা অচল, অক্ষম। তোমরা বিলাসী সামগ্রীর দাস। আমরা তোমাদেরকে এই দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দুনিয়ার খোলা বাতাসে নিয়ে আসতে চাই। যা পেলে তা খেয়ে নিলে, যেভাবে পেলে সেভাবে খেয়ে নিলে। কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হল না।
ইতিহাসে পাওয়া যায় যে, একবার ইরান সম্রাট রাস্তায় বের হওয়ার পর তাকে পানির পিপাসা পেয়ে বসে। অনুসন্ধানের পর পানি পাওয়া গেল এবং একটি পাত্রে তার সামনে পানি নিয়ে আসা হল। তিনি পাত্রটি দেখে বললেন, মরে যাব তবু এইরূপ পাত্রে পানি পান করবো না। একেই বলে মুখাপেক্ষীতা, একেই বলে দুনিয়ার দাসত্ব। তো হযরত রিবৃঈ ইবনে আমের (রাযি.) বললেন— ‘লিনুখরিজা মান শাআ মিন ইবাদাতিল ইবাদি ইলা ইবাদাতিল্লাহি ওয়াহদাহু ওয়া মিন দ্বীকিল দীন ইলা সাআতিহা ওয়া মিন জওরিল আদয়ানি ইলা আদলিল ইসলাম’। (আমরা এসেছি তোমাদেরকে বান্দার ও মাখলুকের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে যেতে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে দুনিয়ার প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে, অন্যান্য দ্বীন ও ধর্মের অন্ধকার ও জুলুম থেকে মুক্ত করে ইসলামের আলো ও ইনসাফের ছায়াতলে নিয়ে যেতে)।
মোটকথা এই দাওয়াতই মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত মর্যাদা ও সম্মান আনয়নকারী। এই দাওয়াতই তাদের অস্তিত্বের মূল নিয়ামক। আল্লাহ তাআলা এই দাওয়াতকে জীবন্ত রেখেছেন এবং এর উৎস কুরআনুল কারীমকেও টিকিয়ে রেখেছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন-ইতিহাস দাওয়াতের ইতিহাস। আমাদের পূর্বসূরীদের ইতিহাসও দাওয়াতের ইতিহাসে সমৃদ্ধ। বরং বলা চলে ইসলামের সমগ্র ইতিহাসই দাওয়াতের ইতিহাস। ‘তারীখে দাওয়াত ওয়া আযীমাত’ গ্রন্থে আমি লিখেছি যে, কোন যুগ এরূপ অতিক্রান্ত হয়নি যে, সেই যুগে সময় ও পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী দাঈ সৃষ্টি হয়নি। অন্য কোন ধর্মে এর নজীর পাওয়া যায় না। উক্ত গ্রন্থে আমি অন্যদের আপত্তির কথাও উল্লেখ করেছি। শঙ্কর আচার্য-র পূর্বে কয়েক শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে। শঙ্কর আচার্য কতটুকু সংস্কারের কাজ করেছেন? বরং তিনি তো পৌত্তলিকতাকেই সহায়তা করেছেন। আর সেন্ট পল? ৭০ বৎসর পরে জন্ম নেওয়া সেন্টপল তো খ্রিস্টধর্মকে সম্পূর্ণ উল্টো প্রান্তে নিক্ষেপ করেছে। চূড়ান্ত ‘দলাল’ ও পথভ্রষ্টতায় নিক্ষেপ করেছে। ‘দলাল’ বা গোমরাহী বলা হয় সম্পূর্ণ বিপরীত পথে চলাকে। উদাহরণ স্বরূপ পূর্ব দিকে যার যাওয়া প্রয়োজন সে পশ্চিম দিকে রওয়ানা হল। প্রকৃত ‘দলাল’ বা পথভ্রষ্টতা হল পথের দিক পরিবর্তন করে ফেলা। পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিম দিকে চলা। এই উম্মত যাতে ঐরূপ পথভ্রষ্ট না হয় সেজন্য এই দাওয়াতের প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখা হয়েছে। সঙ্গে দেওয়া হয়েছে চিরন্তন মুজিযা আল-কুরআনুল কারীমকে। এতদ্ব্যতীত আরও আছে সীরাতে নববী। দাঈগণের জীবন-চরিত, তাঁদের ইতিহাস ও ঘটনাবলী। ইসলামের কোন যুগই একনিষ্ঠ দাঈ থেকে শূন্য ছিল না। যদি কেউ দাবি করে যে, এই উম্মতের কোন এক দশক দাঈ-শূন্য ছিল তবে সে দাবিও বাতিল ও মিথ্যা বলে গণ্য হবে।
আল্লাহ তাআলা প্রতি যুগেই দাঈ সৃষ্টি করেছেন। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ। নাদওয়াতুল উলামার ভিত্তিই স্থাপিত হয়েছিল দাওয়াতকে সামনে রেখে। নাদওয়াতুল উলামার প্রতিষ্ঠাকালে বহু মাদরাসা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এই যুগে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের সামনে এই দ্বীনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরার এবং আধুনিক ফেতনাসমূহের মোকাবেলা করার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব তৈরি করার প্রতিষ্ঠান প্রায় ছিল না বললেই চলে। নাদওয়াতুল উলামা প্রতিষ্ঠা করার ভিত্তিই ছিল এর উপরে যে, প্রতিষ্ঠানটি যুগের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মোতাবেক ব্যক্তি গড়ে তুলবে। আল্লাহ তাআলা কবুল করুন এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে এইরূপ দাঈ ব্যক্তিত্ব তৈরি হোক। আমরা আল্লামা শিবলী নোমানী প্রণীত ‘সীরাতুন নবী’ ও মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী প্রণীত ‘সীরাতুন নবী’কে তাঁর খুতুবাতে মাদরাজকে এবং মাওলানা শিবলী মরহুম প্রণীত ‘আল-ফারূক’ গ্রন্থকে এবং দারুল মুসান্নিফীন-এর সকল কর্মকাণ্ডকে এমনকি নাদওয়াতুল উলামার পাঠ্যসূচিকে দাওয়াতের অংশ বলে মনে করি। গ্রন্থগুলোর কথা যখন উঠল তখন একটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। তা হল, আমরা যখন আধুনিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিকট এই প্রশ্ন করে লিখে পাঠালাম যে, আপনাদের প্রতি কোন গ্রন্থগুলোর অবদান অধিক তার তালিকা প্রেরণ করুন, তখন মিঞা বশীর আহমদ লিখে পাঠাল, 'যখন আমি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করতাম তখন আমার উপর কয়েক বার নাস্তিকতার আক্রমণ হয়েছিল। যখনই নাস্তিকতার আক্রমণ হত তখনই আমার সামনে ভেসে উঠত ‘আল-ফারুক’ গ্রন্থখানি। আমার অন্তরে উদিত হত যে, যাঁর জীবন চরিত এত মহান তিনি নিশ্চয়ই বিপথগামী ছিলেন না, তাঁর দ্বীন নিশ্চয়ই সত্য ও মহান দ্বীন। গবেষণামূলক এইরূপ যত কাজ হয়েছে তার সবই দারুল মুসান্নিফীন, নাদওয়াতুল উলামা দ্বারা অথবা এতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দ্বারা হয়েছে। আর এইসব কিছুর মূল বিষয় ছিল একটিই। আর তা হল দাওয়াত।
ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।
টিকাঃ
১. এটি প্রকৃতপক্ষে মাওলানা প্রণীত একটি পুস্তক। পুস্তকটির উর্দু নাম 'খানে ইয়াপদ্মা' ।
২. এটি মাওলানার লিখিত একটি পুস্তক। পুস্তকটির উর্দু নাম 'মাগরিব সে সাফ সাফ বাঁতে'।
৩. এটিও একটি পুস্তকের নাম। আরবীতে লিখিত পুস্তকটির নাম ইসমাঈ বা মিসর।
৪. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক।
৫. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক। পুস্তকটির নাম কাবুল দরিয়ায়ে সে দরিয়ায়ে ইয়ারমুক তক।
৬. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক। পুস্তকটির নাম মা যা খাসিরাল আলামু বি ইনহিতাতিল মুসলিমীন।
৭. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক।
৮. এটিও তাঁর লিখিত পুস্তক। পুস্তকটির নাম কারওয়ানে মদীনাহ।
📄 মানুষের বিপর্যয়ের কারণ জ্ঞান হতে আল্লাহর নামের বিচ্ছিন্নতা
সুধী! এখানে উপস্থিত হতে পেরে আমি আনন্দে আপ্লুত। আমি অনুমানও করতে পারিনি যে, যে ভবনের ভিত্তি আমার হাতে স্থাপিত হয়েছিল সেই ভবন আজ এত উঁচু ও প্রশস্ত ভবনে পরিণত হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে আমি আমার প্রিয় সঙ্গী ও বন্ধুদেরকে মুবারকবাদ জানাচ্ছি।
আনন্দের কথা এই যে, সত্যপ্রিয়তা, গঠনমূলক চিন্তা-চেতনা এবং সমাজ ও জাতির চাহিদা ও দাবি পূরণের প্রেরণাই এখানকার প্রাণ ও মূল চালিকাশক্তি। জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ও চরম উন্নতি সত্ত্বেও বর্তমানে গোটা পৃথিবী ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কারও মাথার উপর উন্মুক্ত তরবারী আঘাতোদ্যত হলে যেমনটা হয় ঠিক তেমনি।
বর্তমানে অর্থনৈতিক চরম উন্নতি ও বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার সত্ত্বেও সমগ্র মানবজাতি যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন তার কারণ আল্লাহর নাম থেকে জ্ঞানের বিচ্ছিন্নতা। আল্লাহর নামের সাথে জ্ঞানের সম্পর্কহীনতা। আল্লাহ তাআলা জ্ঞানকে তাঁর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ যে আয়াতটি প্রথমে অবতীর্ণ করেছিলেন তা হল-
اقرأ باسم ربك الذي خلق
আয়াতটি চিন্তা-ভাবনা ও গভীরভাবে উপলব্ধির দাবি রাখে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার জীবন নিয়ে চিন্তা করার, পরিবার-পরিজন সম্পর্কে চিন্তা করার, তার পরিবেশ ও সমাজ নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ ও অবকাশ দান করেছেন। তবে এই সবকিছু হতে হবে তাঁর তত্ত্বাবধানে, তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী। তিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। এই বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল রাখতে হবে এবং এই বিশ্বাস যেন আমাদের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করে।
নিরক্ষর শহরে, নিরক্ষর নবীর উপর প্রথম যে আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তা রাজ-রাজড়াদের দরবারেও তালাশ করে পাওয়ার মত নয়। যিনি কখনও লেখাপড়া করেননি তাকে বলা হল ইকরা (পাঠ কর)। যেন বলা হল যে, এখন যে জাতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে সে জাতি হবে শিক্ষিত জাতি, লেখাপড়ার জাতি। এই জাতির সম্পর্ক হবে জ্ঞানের সাথে। সেই সঙ্গে দিক-নির্দেশনাও দান করা হল যে, এই জ্ঞান হবে আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যে নির্দেশনা অধিকাংশ জাতিই উপেক্ষা করে চলেছে। আল্লাহ বলেছেন- ইকরা (পাঠ কর)। কিন্তু শুধু পাঠ করাই যথেষ্ট নয়। শুধু 'পাঠ' কোন কাজে আসবে না। বরং নিছক পাঠ দ্বারা অর্জিত জ্ঞান ধ্বংস বয়ে আনবে, ধ্বংসাত্মক চিন্তা ও মনোভাবের সৃষ্টি করবে, মানুষের মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা সৃষ্টি করবে, স্বজনপ্রীতি ও বন্ধুপূজার মনোভাব সৃষ্টি করবে, প্রবৃত্তি পূজার দিকে ধাবিত করবে।
যদি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লেখা হয় এবং সত্যান্বেষী দৃষ্টিতে ইতিহাস লেখা হয় আর তা লিখতে যেয়ে অনুসন্ধান করা হয় যে, মানবতার অধঃপতন ও মানবতার বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে কখন থেকে, তাহলে নিশ্চয়ই শিরোনাম লিখতে হবে এভাবে যে, যখন থেকে জ্ঞানকে আল্লাহর নাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, আল্লাহর নাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জ্ঞান চলেছে স্বাধীন পথে তখন থেকেই শুরু হয়েছে মানবতার বিপর্যয়। বিপর্যয় শুরু হয়েছে তখন, মানুষ যখন তাঁর নাম বিস্তৃত হয়ে, তাঁকে অস্বীকার করে বরং বিদ্রোহ করে একথা বলেছে যে, এই জগতের কোন সৃষ্টিকর্তা নেই অথবা সৃষ্টিকর্তা থাকলেও তিনি এই জগতের মালিক নন ও পরিচালক নন, তিনি শুধুই সৃষ্টিকর্তা, প্রশাসক নন। জগত যেন শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত তাজমহল, যা নির্মাণ করাটাই ছিল শুধু শাহজাহানের কাজ। এরপর এর তত্ত্বাবধান ও পরিচালনের দায়িত্ব আর তার হাতে নেই। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কাঠামো মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। মানুষ যা চাইবে তাই করবে, এতে তাঁর বলার কিছু নেই।
বন্ধুগণ! এই দুনিয়া তাজমহল নয়, কুতুব মিনারও নয়; বরং এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্মিত কারখানা, তিনিই এককভাবে এই দুনিয়া পরিচালনা করছেন।
الا له الخلق والامر
সৃষ্টি তাঁরই, শাসনও তাঁরই।
আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এবং প্রকৌশল ও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখন প্রয়োজন ছিল আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়া। আর এই কাজ তাদের দ্বারাই সম্ভব, যাদের বুনিয়াদ রচিত হয়েছে আল্লাহর নামের উপর। এই ইতিহাসে সমৃদ্ধ হয়েই যাদের যিন্দেগীর সূচনা হয়েছে।
এই উম্মতের ইতিহাস শুরু হয়েছে আসমানী ওহীর মাধ্যমে, উম্মী নবীর পথ-নির্দেশনা ও তাঁর পয়গামের মাধ্যমে। এই উম্মতের বুনিয়াদ রচিত হয়েছে জ্ঞানের সাথে সর্বদা আল্লাহর নামের সম্পৃক্ততার উপর। আজ ইউরোপ ও আমেরিকার যে করুণ দশা তা তাদেরই সৃষ্ট। বর্তমানে সমগ্র দুনিয়ার মোড়লীপনা তাদের হাতে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি, চিন্তা-চেতনা সহ সর্বক্ষেত্রে তাদের মোড়লীপনার একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজমান। আল্লাহর নামের সাথে জ্ঞানের যে সম্পর্ক ছিল তারা তা ছিন্ন করে দিয়েছে। প্রয়োজন ছিল জ্ঞানকে আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে চলার। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী, তাঁর ছত্রছায়ায় জ্ঞানের অগ্রসরতার। তাঁর নামের বরকতও তার সাথে থাকার। তাহলেই নানা শাখা-প্রশাখাসহ আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আমাদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ড, গঠনমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ, আমাদের বিদ্যাপীঠগুলো, গবেষণাগারগুলো হত উপকারী ও কল্যাণকর। আল্লাহর শোকর যে, ক্ষুদ্র পরিসরে ও স্থানীয় পর্যায়ে হলেও বর্ণিত পথে আমরা এক কদম অগ্রসর হলাম। আমাদের এ পদক্ষেপ অত্যন্ত বরকতময়। আমি আমার সহকর্মী ও বন্ধুবর্গকে মুবারকবাদ জানাচ্ছি, যাঁরা এই পদক্ষেপের সাথে সম্পৃক্ত। আলহামদুলিল্লাহ উন্নতির সমূহ নিদর্শন আমাদের সামনে দৃশ্যমান। এই সুযোগে আমি আল্লামা ইকবালের একটি কবিতাংশের দ্বিতীয় পংক্তি আবৃত্তি করছি-
আমাকে নির্দেশ রয়েছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঘোষণা দানের।
সুধী! কম্পিউটার বিভাগ উদ্বোধন করার সুযোগ দান করে আপনারা আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমার স্বীকার করতে কুণ্ঠা নেই যে, এর পূর্বে কম্পিউটার সম্পর্কে আমার কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। আমি লেখাপড়ার মানুষ। আমার সম্পর্ক কিতাব ও কলমের সাথে। আমি যখন কম্পিউটারের কী-বোর্ডে আঙ্গুল রাখলাম তখন সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় কিছু চিত্র ভেসে উঠল। তখন আমার মস্তিষ্কে এই কথা উদিত হল যে, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলা তো মানুষকে, বিশেষত মুসলমানকে কম্পিউটারই বানিয়েছিলেন। তার মধ্যে সকল বিষয় সৃষ্টিগতভাবে গচ্ছিত রাখা আছে। সকল গুণ ও উৎকর্ষের আকর সে। প্রয়োজন ছিল শুধু আঙ্গুল চাপনের। তাহলেই তার সকল সুপ্ত গুণের বর্হিপ্রকাশ ঘটত। সে আঙ্গুল হল নবীকে চেনার আঙ্গুল। যুগের দাবি চেনার আঙ্গুল। সমাজ ও জাতির প্রয়োজন সমাজ ও জাতির চাহিদা পূরণের আঙ্গুল। এ এমন আঙ্গুল, যা জাতিকে গতি সৃষ্টি করে। জাতিকে মনযিলে মকসুদে, অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। এই আঙ্গুলের ব্যবহার হোক আর মানবতার চিত্র স্পষ্ট হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সকল মানুষ তো দূরের কথা মুসলমানরাও আজ আর কম্পিউটার রূপে থাকেনি। মুসলমানদের মধ্যে এই চেতনা, এই উপলব্ধি নেই যে, আমরা কোন কাজে আদিষ্ট। আমাদেরকে কী পান করানো হয়েছে। আমাদের মাঝে কোন বিষয়ের বিস্তৃতি ঘটেছে।
আজ কম্পিউটার যে কাজ করছে সেই কাজ করা উচিত ছিল মুসলমানদের। যখনই ইলাহী নির্দেশ সামনে আসে, যখনই শরীয়তের নির্দেশ শোনানো হয়, যখনই সমাজের ও জাতির প্রয়োজন ব্যক্ত করা হয় তখনই প্রয়োজন ছিল নিজের মধ্যকার সুপ্ত প্রতিভা ও চেতনাকে আঙ্গুল চাপনে জাগরূক করে তোলা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, নিজের চেতনাকে জাগ্রত করতে আঙ্গুল চাপনের কাজ আর হচ্ছে না। সুতরাং মানুষ নামক কম্পিউটারটি নিষ্ক্রিয় হয়েই রয়ে গেল।
যে প্রতিষ্ঠানটিতে দাঁড়িয়ে আমি কথা বলছি এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উচিত এই চেতনা ও অঙ্গীকার, এই সংকল্প ও দৃঢ়তা, এই সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়া যে, আমরা শুধু শাস্ত্রীয় জ্ঞানই শিক্ষাদান করব না, বরং শাস্ত্রীয় জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ পরিচিতির জ্ঞানও শিক্ষাদান করব। যে জ্ঞান আমরা দান করব তার সঙ্গে যুক্ত করে দেব আল্লাহ পরিচিতির জ্ঞান, তাঁর অস্তিত্ব স্বীকারকরণের জ্ঞান। তিনি যে জগতের সৃষ্টিকর্তা, অপার কুদরতের অধিকারী, তাঁকে সন্তুষ্ট করাই যে আসল ও সর্বাধিক প্রয়োজনীয় কাজ ও জীবনের লক্ষ্য, নবীগণের আনীত বার্তার প্রতি শুধু বিশ্বস্ত থাকাই নয়, বরং সে অনুযায়ী আমল করা, জীবন পরিচালনা করাই প্রকৃত দায়িত্ব- এই উপলব্ধি জাগ্রত করে দেওয়া। আজ পৃথিবীতে জ্ঞানচর্চার সাথে এই সকল বিষয়ের সংশ্রবহীনতাই সমূহ বিপর্যয়ের কারণ। আজ আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে জীবনের নানাবিধ উপকরণের পর্যাপ্ত উপস্থিতি সত্ত্বেও মূল লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার কারণ আর কিছু নয়, কারণ শুধু জ্ঞানের সাথে উপরিউক্ত বিষয়াবলীর সংশ্রবহীনতা। যার কারণে মানবতার সেবা ও সুরক্ষার পরিবর্তে মানবতার বিপর্যয়ই শুধু বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এক সফরে ওয়াশিংটনে বিভিন্ন স্থানে আমাকে বক্তৃতা করতে হয়েছিল। একদিন ইসলামী সেন্টারে বক্তৃতা করতে হল। আমি পূর্ব থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করিনি। মনে করলাম অনুষ্ঠানের শুরুতে কারী সাহেব কুরআনুল কারীম থেকে যে আয়াত তেলাওয়াত করবেন তার আলোকেই কথা বলব। কারী সাহেব সূরা কাহ্ফ থেকে একটি অংশ তেলাওয়াত করলেন। অংশটিতে বলা হয়েছে যে, এক বাগানের মালিক বলেছিল, আমার মনে হয় না যে, এই বাগান কখনও ধ্বংস হয়ে যাবে। (সুরা কাহফ ৩৫)
কথাটি সে বলেছিল অত্যন্ত ঔদ্ধত্য সহকারে এবং অহংকার থেকে। তার এক সঙ্গী ছিল মুমিন। সে তাকে বলল-
যখন তুমি বাগানে প্রবেশ করলে তখন একথা কেন বললে না যে, আল্লাহ যা চান তাই হয়, আল্লাহর দেওয়া শক্তি ব্যতীত কোন শক্তি নেই। (সূরা কাহফ ৩৯)
আয়াত্তির সূত্র ধরে আমি বললাম, আমেরিকাতে সবকিছু আছে। কিন্তু মা-শা-আল্লাহ আল্লাহ যা চান তাই হয়- একথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার লোক নাই। এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, আজ আমেরিকা সবকিছু করে, পরোপকারও করে। কিন্তু এর প্রতিদান স্বরূপ কৃতজ্ঞতাটুকুও তারা পায় না। সারা পৃথিবীতে তাদের কর্মকাণ্ডের কোন ফল প্রকাশ পাচ্ছে না। পৃথিবীর নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা, একের প্রতি অপরের বিশ্বাস ও আস্থা, একের প্রতি অপরের শ্রদ্ধাশীলতা এসবের কিছুই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। তার কারণ তাদের কর্মকাণ্ডে আন্তরিকতার অভাব। ঈমান ও ইহতিসাবের অভাব। ঈমানী উত্তাপ ও ঈমানী আলোড়নবিহীন কর্মকাণ্ডের পরিণাম এইরূপই হয়।
আমি বলছি যে, আজ আমেরিকায় সকল নেয়ামত বিদ্যমান, আরাম-আয়েশের সকল উপকরণ বিদ্যমান, শান্তির সকল উপকরণ বিদ্যমান কিন্তু প্রকৃত যে শান্তি লাভের প্রয়োজন ছিল সেই শান্তি লাভ হচ্ছে না। কারণ সেখানে মা-শা-আল্লাহর চেতনা নাই, আল্লাহ যা চান তাই করেন- এই বিশ্বাস নাই। আমরা চাই এরূপ প্রতিষ্ঠান আরও প্রতিষ্ঠিত হোক কিন্তু তা হোক মা-শা-আল্লাহর ছায়াতলে, আল্লাহর নামের আশ্রয়ে। জ্ঞান ও আল্লাহর নাম একসাথে চলুক।
আমি আজ স্পষ্টরূপে বলছি- যদিও কথাটি বলার প্রয়োজন ছিল অতি বড় প্লাটফর্মে তবুও আমাদের এই ক্ষুদ্র মজলিসে কথাটি বলছি যে, যত দিন জ্ঞান ও আল্লাহর নাম জুটি না বাঁধবে, জ্ঞানের সাথে আল্লাহর নাম সম্পর্কযুক্ত না হবে তত দিন এই জ্ঞান দুনিয়ার উপকার সাধন নয় বরং দুনিয়ার ধ্বংস সাধন করবে, দুনিয়া অগ্রসর হবে ধ্বংস অভিমুখে, দুনিয়ার আত্মহননের পথ হবে উন্মুক্ত। জ্ঞানের সাথে আল্লাহর নামকে সম্পৃক্ত করা না হলে কাঙ্ক্ষিত সামাজিক নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা, পারস্পরিক আস্থা ও সহানুভূতি ইত্যাদি বিষয়গুলো কখনও অর্জিত হবে না।
আমি আল্লাহর শোকর আদায় করছি এবং আপনাদের সামনে ব্যক্ত করছি যে, আলহামদুলিল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই বুনিয়াদ ও মৌলিক নীতির উপরই। আমার বিশ্বাস ও প্রত্যাশা যে, প্রতিষ্ঠানটি সর্বদা এই ভিত্তির উপরই অবিচল ও অটুট থাকবে। প্রতিষ্ঠানটি চলবে দ্বীনের ছায়ায়, দ্বীনী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঙ্গে নিয়ে, মানবতার কল্যাণকে সাথে নিয়ে। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপ করেছেন, যে মর্যাদায় তাদেরকে ভূষিত করেছেন সেই দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং সেই মর্যাদার উপলব্ধি ধারণ করে এই প্রতিষ্ঠানটি চলবে। এইরূপ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আজ তীব্র। আল্লাহর নিকট দুআ করি, যেন এইরূপ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা উন্নতির শীর্ষ সোপানে উপনীত হয়। শুধু এইরূপ কারিগরি প্রতিষ্ঠান নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ে প্রাইমারী স্কুল পর্যন্ত সকল প্রতিষ্ঠানেই আল্লাহর নাম বিদ্যমান থাকা জরুরী।
জরুরী আল্লাহর নামের আলো বিদ্যমান থাকা, তাঁর নির্দেশনা বিদ্যমান থাকা। আল্লাহর নামের প্রতি সমীহ থাকা। শুধু সমীহ নয় বরং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ হতে হবে। এরূপ না হওয়ার কারণেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ সত্ত্বেও নিরাপত্তা ও শান্তি অর্জিত হচ্ছে না এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা মানব সমাজের যটুকু উপকার হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না। কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ দ্বীন ও ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন। আমার কথা আমি এখানেই শেষ করছি এবং আপনারা আমাকে যে সম্মান দান করেছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। দুয়া করি প্রতিষ্ঠানটিকে জীবন্ত রাখেন এবং উন্নতি দান করেন।
ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।
📄 আলেমগণের সর্বাপেক্ষা বড় দায়িত্ব আধুনিক যুগের সন্দেহবাদী ব্যক্তিদের হৃদয়ে প্রশান্তি স্থাপন
প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! পৃথিবীর ইতিহাসের একটি বড় অংশ যথাযথ সংরক্ষিত হয়েছে এবং সে ইতিহাস নির্ভরযোগ্যও বটে। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক যুগের ইতিহাস সংরক্ষিত হয়নি। পৃথিবীর সব ইতিহাসই যদি সংরক্ষিত হত, প্রাগৈতিহাসিক যুগের নবুওয়াতের ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি যদি গুরুত্বারোপ করা হত অথবা বিভিন্ন যুগে অবতীর্ণ আসমানী সহীফা যদি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হত, ঐ সকল সহীফা নাযিলের প্রেক্ষাপট এবং তার বাহকগণ ঐ সকল সহীফার আলোকে যেভাবে মানবজাতিকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন, তাদের সঙ্গে দ্বীনের পরিচয় ঘটিয়ে বিশুদ্ধ জীবনাচারে অভ্যস্ত করেছেন তা যদি সংরক্ষিত হত তাহলে এটা প্রমাণ করা যেত যে, প্রত্যেক যুগে প্রেরিত নবী, তাঁদের নবুওয়াত, তাঁদের আনীত বার্তা, তাঁদের কর্মধারা ও দায়িত্বের সাথে গভীর ঘনিষ্ঠতা ও সামঞ্জস্য ছিল তৎকালীন যুগের প্রয়োজন, তৎকালীন যুগের মানবজাতির ত্রুটি-বিচ্যুতি, তাদের চিন্তাধারা, তাদের জীবনের জ্ঞানগত ও কর্মগত, বিশ্বাসগত ও চরিত্রগত বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতার।
বর্তমানে আমাদের নিকট ইতিহাসের যে নির্ভরযোগ্য ভাণ্ডার ও রেকর্ড সংরক্ষিত আছে এবং কুরআন মাজীদের মাধ্যমে আমরা যে আলো ও নির্দেশনা পাই তা দ্বারা আমাদের এই দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়। এর কিছু দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়।
হযরত ইবরাহীম (আ.) যে যুগে প্রেরিত হয়েছিলেন সে যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তৎকালীন যুগের মানব সমাজ তাওহীদের বিশ্বাস বিবর্জিত হয়ে নিকৃষ্ট পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। মনুষ্য মর্যাদা ও সাম্যের ধারণা তৎকালীন মানবসমাজে বিস্মৃতির আড়ালে চলে গিয়েছিল। আল্লাহর সঙ্গে প্রেম ও ভালবাসার সম্পর্ক কার্যত বিলীন হয়ে গিয়েছিল।
হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দাওয়াতের মাধ্যমে যে নব যুগের, যে নতুন ধারার সূচনা হয়েছিল তা এখনও চলছে এবং সত্যিকারার্থে তাঁর দাওয়াত ছিল তাঁর পূর্ববর্তী যুগ ও তাঁর পরবর্তী যুগের মধ্যকার ভেদরেখা। আমি কোন এক বক্তৃতায় যেমনটা বলেছি যে, পৃথিবীতে যে দুটি ধারা যুগ পরস্পরায় চলে আসছে সে দুটি ধারার জন্য যদি কোন নাম তালাশ করা হয়, তাহলে দুটি নাম আমরা পাব। এক. ইবরাহীমিয়্যাত, দুই. বারহামিয়্যাত (ব্রাহ্মণ্যবাদ)। আমি নুন অক্ষরটিকে (বাংলায় ণ') ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছি, যাতে মানুষ ভুল না বোঝে। এই দুটি ধারা হাজার হাজার বছর ধরে চলছে। প্রথম ধারাটি বিশুদ্ধ তাওহীদের ধারা। এই ধারায় নিহিত রয়েছে মনুষ্য মর্যাদার পুনরুদ্ধার ও নবায়ণ। এই ধারার সাথে সম্পৃক্ত আল্লাহ তাআলার প্রেম ও ভালবাসা, আল্লাহতে লীনতা ও তন্ময়তা।
এই কারণে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আলোচনা প্রসঙ্গে তাওহীদের আলোচনা এসেছে বার বার। কোন কোন রুকুর পুরোটা জুড়েই বিশেষত সূরা ইবরাহীমের শেষ রুকুর আয়াতসমূহে বিশুদ্ধ তাওহীদ, আল্লাহর সাথে অপরিমেয় সম্পর্ক, তাঁর প্রেম ও ভালবাসা, তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হওয়ার বিষয় আলোচিত হয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনে এই সবকিছুর প্রমাণ মেলে তৎকর্তৃক প্রাণাধিক পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর মধ্যে। আল্লাহ তাআলা যার সত্যতা তুলে ধরেছেন এই ভাষায়-
يَا إِبْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছ। আর আমি এইভাবেই সৎকর্মশীলদেরকে বিনিময় প্রদান করে থাকি। এটা ইবরাহীমী দ্বীনের বৈশিষ্ট্য, ইবরাহীমী মেযাজ ও ইবরাহীমী দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য।
এরপর হযরত সুলাইমান ও দাউদ (আ.)-এর যুগের আগমন ঘটল। যুগটি ছিল রাজ-রাজত্বের ও শিল্প-কারিগরির উৎকর্ষের যুগ। এইজন্য আল্লাহ তাঁদের আলোচনায় বিশেষভাবে সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বের কথা আলোচনা করেছেন।
رَبِّ هَبْ لِى مُلْكًا لَّا يَنْۢبَغِى لِاَحَدٍ مّিনْۢ بَعْدِى
হে আমার পালনকর্তা! আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন আমার পরে যা অন্য কারও জন্য শোভনীয় না হয়। (সূরা সোয়াদ ৩৫)
আরও বলেছেন-
فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيْحَ تَجْرِىْ بِاَمْرِهٖ رُخَآءً حَيْثُ اَصَابَ
'আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হত যেখানে সে পৌছাতে চাইত।' (সূরা সোয়াদ ৩৬)
এরপরে আলোচনা করা হয়েছে জীনদের সম্পর্কে। আল্লাহ তাআলা কীভাবে তাদেরকে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর বশীভূত করে দিয়েছেন সেই আলোচনা। হযরত দাউদ (আ.) প্রসঙ্গে আলোচনায় তাঁর জন্য লোহাকে কীরূপ নরম করে দেওয়া হয়েছিল সেই আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে-
وَ اَلَنَّا لَهُ الْحَدِيْدَ
'এবং আমি তার জন্য নরম করে দিয়েছি লোহাকে।'
এ থেকে বোঝা যায় যে, সেই যুগটি ছিল শিল্প ও কারিগরি বিদ্যার বিস্তৃতি ও উন্নতির যুগ। এরপর আমাদের সামনে আসে ইউনানী যুগ। এই যুগকে বলা হয়- দর্শন, গণিত ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উৎকর্ষের যুগ। হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম ও তাঁর নবুওয়াতের প্রকাশ ঘটেছিল ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির যুগে। হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে বিশেষভাবে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি মৃতকে জীবিত করছেন, অসুস্থকে সুস্থ করছেন। হযরত ঈসা (আ.)-এর মসীহী কারিশমা এবং তাঁর জন্য আসমান থেকে খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার উল্লেখ কুরআনুল কারীমে বিবৃত হয়েছে। তাঁর হাতে পর্যাপ্ত মুজিযা প্রকাশের ঘটনা আমরা জানি।
মোটকথা হযরত ঈসা (আ.)-এর যুগের পরিবেশ ও সমাজের সাথে তাঁর হাতে প্রকাশিত মুজিযাসমূহের বেশ মিল ও সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু ইলাহী বিবেচনা খাতামুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য এমন এক যুগ নির্বাচিত করেছে যে যুগ সর্বক্ষেত্রে মানবজাতির উন্নতির যুগ। জীবনের ব্যাপ্তি, জীবনের সকল শাখা-প্রশাখায় মানুষের বিচরণ, মানুষের সমূহ চাহিদা ও সমস্যা এবং সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে মানুষের গভীর সম্পৃক্ততার যুগ। যেহেতু তিনি ছিলেন শেষ নবী, তাঁরই শিক্ষা ও আদর্শকে যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকতে হবে সেহেতু মানব জীবন ও মানবজাতির জন্য প্রয়োজন ছিল তাদের মধ্যে সুপ্ত আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভাকে, শক্তি ও সামর্থ্যকে এবং সফলতার সকল উপকরণকে, তাদের সকল যোগ্যতাকে উজাড় করে দেওয়ার। তাঁর পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নতুন যুগের আগমন ঘটবে না। শেষ নবীর যুগই নিরবচ্ছিন্নভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চলমান থাকবে। অতএব মানুষকে তার বুদ্ধি ও প্রতিভার, তার উপলব্ধি ও জ্ঞানের এবং শক্তি ও সামর্থ্যের প্রয়োগ ঘটাতে হবে পরিপূর্ণরূপে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদের ন্যায় মহাগ্রন্থ আপনাদেরকে দান করেছেন। যে কুরআন ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনাহীন দৃষ্টান্ত, যার নজীর কোন মানুষের পক্ষে উপস্থাপন করা অসম্ভব। আরববাসী কবিতা ও সাহিত্যে শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করেও তারা এই কুরআনের অনুরূপ কিছু রচনা করতে পারেনি। অপর দিকে কুরআনুল কারীমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তৃতির এরূপ অমিত সম্ভাবনা সুপ্ত রাখা হয়েছে এবং এরূপ সূক্ষ্ম নির্দেশনা ও ইঙ্গিত তাতে গচ্ছিত রাখা হয়েছে যে, যখনই মানুষের জ্ঞান গবেষণা- চাই তা যে কোন ক্ষেত্রে হোক না কেন, চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হবে তখন তা তার সম্ভাবনাকেই শুধু প্রমাণ করবে না বরং তার বাস্তবতাকে নির্দেশ করবে।
বলতে জ্ঞানের যে মাহাত্ম্য ও বিশালতা ও তার অসীমতা তুলে ধরা হয়েছে তা শুধু কুরআনুল কারীমেই পাওয়া যায়। এর অনিবার্য ফল বের হয় এই যে, এই উম্মতের আঁচলকে জ্ঞানের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই উম্মত জ্ঞান ও বুদ্ধিচর্চা হতে, চিন্তা ও গবেষণা হতে, রচনা ও লেখনী হতে কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না। বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। এটা কুদরতে ইলাহীর ফায়সালা যে, এই উম্মতের অভিযাত্রা, তাদের কর্মতৎপরতা, তাদের রুচি ও ঝোঁক এবং তাদের সফলতা জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত ও সংযুক্ত থাকবে।
সুধী! আমার এই দাবির সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ প্রথম ওহী। প্রথম যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল তার সূচনা হয়েছিল اقরা 'পাঠ কর' শব্দ দ্বারা।
যদি পৃথিবীর বড় বড় বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী-গুণীকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করা হত যে, দীর্ঘ পাঁচশত বৎসর পর ওহী অবতরণের মাধ্যমে আকাশ ও পৃথিবীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হতে যাচ্ছে এবং মানুষকে আসমানী বার্তা, ঐশী পয়গাম দান করা হচ্ছে, বলুন তো এই প্রথম বার্তার সূচনা হতে পারে কোন শব্দ বা কোন বাক্য দ্বারা? আমি অকাট্য দাবি করে বলতে পারি যে, তাদের মস্তিষ্কে বিভিন্ন রকম সব শব্দ এবং বিভিন্ন রকম সব বাক্য উদিত হত। কেউ বলত, প্রথম ওহীর সূচনা হওয়া উচিত এই বাক্য দ্বারা-
اعرف نفسك 'নিজেকে চেন।' কারণ মানুষ তখন আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছিল, নিজের উৎসের সন্ধান তারা হারিয়ে ফেলেছিল। কেউ বলত, প্রথম ওহীর সূচনা হওয়া উচিত এই বাক্য দ্বারা-
اعبد ربك 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর।' কেননা তখন মানুষ পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল, বিশুদ্ধ ইবাদত বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। কেউ বলত, এইরূপ, কেউ বলত ঐরূপ। কিন্তু কেউ বলত না যে, اقরা 'পাঠ কর' -এই শব্দ দ্বারা ওহীর সূচনা হওয়া উচিত। কারণ যার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে তিনি নিজে নিরক্ষর। তিনি যে জাতির মাঝে প্রেরিত হয়েছেন সেই জাতিও নিরক্ষর। আল্লাহ তাআলা বলেন-
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ 'তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন তাদের মধ্য হতে।' ইয়াহুদীরাও তাঁকে উম্মী বলত। যে দেশে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন সে দেশটি ছিল উম্মী বা নিরক্ষর দেশ। যে শহরে ওহী নাযিল হচ্ছিল সেই শহর তথা মক্কায় প্রচুর অনুসন্ধানের পর সাক্ষর ব্যক্তি হয়তো পাওয়া যেত দুই-চারজন, এর বেশি নয়। লেখাপড়া জানা ব্যক্তির জন্য পৃথিবীতে বহু শব্দের ব্যবহার প্রচলন রয়েছে। লেখাপড়া জানা ব্যক্তিকে বলা হত কাতেব। কলম দ্বারা লিখতে পারাটাকেই মনে করা হত সর্বাপেক্ষা বৃহৎ গুণ। যেন লিখতে পারাটা এক মহা দুঃসাধ্য কর্ম।
আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে জ্ঞান আত্মস্থ করার এবং জ্ঞানের সব দাবি পূরণের যে অসাধারণ যোগ্যতা ও দক্ষতা দান করেছেন এবং এই উম্মতের সাথে জ্ঞানের যে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন তাকে আমরা এক কথায় চুম্বক বলে ব্যক্ত করতে পারি। এ কারণেই প্রতি যুগে জ্ঞানের সাথে এই উম্মতের সম্পর্ক অটুট রয়েছে এবং এই কারণেই প্রত্যেক যুগে এই উম্মত নতুন নতুন জ্ঞানী-গুণী, নতুন নতুন শাস্ত্রজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ ও জিনিয়াস ও প্রতিভা জন্ম দিয়েছে।
যত দিন জ্ঞানের অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে তত দিন সমূহ জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধিৎসা সৃষ্টি হতে থাকবে। চাই তা সভ্যতা সংক্রান্ত হোক কিংবা জ্ঞান সংক্রান্ত হোক কিংবা বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সমাজনীতি সংক্রান্তই হোক। দ্বীন ও শরীয়তের আলোকে সেই সকল জিজ্ঞাসার জবাব প্রদানও অব্যাহত থাকবে, উদ্ভুত সকল সমস্যার সমাধান দানও অব্যাহত থাকবে। উদাহরণস্বরূপ আমরা সাহাবায়ে কেরাম, ইমাম চতুষ্টয় এবং উম্মতের অন্যান্য মুজতাহিদগণকে পেশ করতে পারি। এটাকে নিছক আকস্মিক কোন ঘটনা বলা যায় না। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সজীব মস্তিষ্কের অধিকারী ও প্রতিভাবান এরূপ ব্যক্তিবর্গ ছিলেন, যাঁরা রোম ও ইরানের ন্যায় উন্নত সভ্যতার অধিকারী সাম্রাজ্যের মোকাবেলা করতে এরূপ যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, যার কোন দৃষ্টান্ত অন্য কোন ধর্ম উপস্থাপন করতে পারবে না। তদ্রূপ ইমাম চতুষ্টয় ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এরূপ প্রতিভাবান আইনবিদ ছিলেন যে তাঁরা জীবন ও দ্বীনের মৌল নীতিমালার মধ্যে সঙ্গতি বিধান করতে এরূপ অসাধারণ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন, যা না রোমীয়দের মধ্যে পাওয়া যায়, না ইরানীদের মধ্যে, না ইউনানীদের মধ্যে, না অন্য কোন জাতির মধ্যে। তাঁরা ছিলেন স্ব-যুগের সর্বাধিক প্রতিভাবান ব্যক্তি। তাঁদের কীর্তি শত শত বৎসর যাবৎ দীপ্যমান ও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাঁদের কীর্তির সঠিক মূল্যায়ন আজ কারও পক্ষে সম্ভব নয়।
যখন ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞান আরবী ভাষায় অনূদিত হল তখন তা ইলম ও জ্ঞান চর্চাকারীদের মধ্যে যে কিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা আজ আর কেউ অনুমানও করতে পারবে না। ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সামনে মানুষ তখন হয়ে পড়েছিল বুদ্ধি-বিভ্রান্ত। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনা তখন এক রকম ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকাকে মানুষ গর্বের বিষয় বলে মনে করত। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী, সাইয়েদ আবদুল কাদের জিলানী, ইমাম গাযযালী, মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী, শায়খ মঈনুদ্দীন চিশতী, হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ প্রমুখ প্রতিভাবান ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাদের নিজ নিজ যুগে সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা যুগের স্রোত ও গতিকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে যুগকে দিয়েছিলেন বিশুদ্ধ গতি ও স্রোত। অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তারা মোকাবেলা করেছিলেন ভ্রান্ত ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের এবং সমূহ বিপদ থেকে দ্বীনকে করেছিলেন নিরাপদ।
যুবক শ্রেণীর মন-মস্তিষ্ককে সমূহ সন্দেহ ও সংশয়ের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে নতুনভাবে তাদের মন ও মস্তিষ্কে ঈমান ও ইয়াকীনের ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
১৮৫৭ সালের পর ইংরেজ-সংস্কৃতি ও আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ঠিক একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাবে এরূপ প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েছিল যে, সরাসরি দ্বীনকে অস্বীকার না করলেও দ্বীনের ব্যাপারে সন্দিহান ও সংশয়যুক্ত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন যুগের অটল ঈমানের অধিকারী পরিবার সমূহ থেকে জন্ম নেওয়া মাশায়েখ ও সুফীগণের অবস্থাও ছিল এইরূপ যে, যদি তাঁদের পিতা-মাতার বিশেষ তত্ত্বাবধান তাঁদের প্রতি না থাকত এবং তাঁরা যদি বুযুর্গদের সংসর্গ লাভ না করতেন, বুযুর্গদের সতর্ক দৃষ্টির অধীনে যদি তাঁরা প্রতিপালিত না হতেন, তাহলে চিন্তা ও বিশ্বাসগত ইরতিদাদ ও বিচ্যুতি ব্যাপক আকার ধারণ করত এবং গোটা হিন্দুস্তান এই ইরতিদাদের শিকার হয়ে যেত।
আল্লাহ তাআলা যদি তাঁর করুণায় ঠিক সময় মতো যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ না করতেন, তাহলে তিনিই জানেন এই দেশের মুসলমানদের অবস্থা কী রূপ হত। এটা শুধু হিন্দুস্তানের বৈশিষ্ট্য নয়, যখনই ইসলামী ইতিহাসের দীর্ঘকালীন সময়ে এই ধরণের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তখনই আল্লাহ তাআলা এরূপ কিছু ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যাঁরা দ্বীনের সাথে এই উম্মতের সম্পর্ক অটুট রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন এবং সফলতা লাভ করেছেন। এই ধারা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকা প্রয়োজন, থাকা উচিত।
আমাদের দায়িত্ব হল- এই ধারাকে অব্যাহতভাবে চলমান রাখা। আমি আমার প্রিয় ছাত্রবৃন্দকে বলতে চাই, কোন জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন বড় আলেম ও লেখক ও গবেষক সৃষ্টি হয়ে যাওয়া যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠান এমনকি দ্বীন ও মাযহাবও ইতিহাস দ্বারা চলে না। বরং তা চলে এই ধারা অব্যাহতভাবে গতিমান থাকার দ্বারা। কোন কর্মসূচী ও আন্দোলন কোন একজন গবেষক ও চিন্তাবিদ সৃষ্টি করে দিল কিংবা একজন বড় লেখকের জন্ম দিয়ে দিল- শুধু এতটুকুই যথেষ্ট নয়।
এটা স্মরণে রাখতে হবে যে, যখন নিজেদের পূর্বসূরীদের কীর্তি নিয়ে শুধু গর্ব করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়, তখন নিজেদের চিন্তাশক্তি অথর্ব ও অকর্মণ্য হয়ে পড়ে। নিছক পূর্বসূরীদের কীর্তিচর্চা মানুষের কর্মদক্ষতা ও চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। জনৈক আরব কবি অতি চমৎকারভাবে এই সত্যকে ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন-
الهي بني تغلب عن كل مكرمة قصيدة قالها عمر و بن كلثوم
'বনু তাগলিবকে বিরোচিত কোন কৃতিত্ব, বড় কোন বিজয় অর্জন করতে এবং বড় কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধার সৃষ্টি করেছে শুধু একটা বিষয়। আর তা হল, তারা শুধু আমর ইবনে কুলছুম রচিত কাসিদা আবৃত্তি করে এবং তাতেই তারা বিভোর থাকে।' এই রোগ কোন প্রতিষ্ঠানেও সৃষ্টি হতে পারে, কোন দলের মধ্যেও সৃষ্টি হতে পারে। দলের প্রতিষ্ঠাতা কিংবা দলের মধ্যকার কোন বিখ্যাত ব্যক্তির রচনা, গবেষণা তাঁর উন্নত ও উচ্চ চিন্তা-চেতনা দলের জন্য গর্বের বিষয় হল। দল তাই নিয়েই শুধু গর্ব করতে থাকল। কিন্তু এ দ্বারা কাজ চলবে না। দল হোক, প্রতিষ্ঠান হোক, মাদরাসা হোক বরং বলতে পারি পুরো জাতি হোক কারও জন্যই এরূপ পূর্ব ইতিহাস নিয়ে শুধু গর্ব করলে চলবে না।
একথা বলাতে কোন লাভ নেই যে, এই জাতি গাযযালী, ইবনে তাইমিয়াহ ও শাহ ওয়ালীউল্লাহর ন্যায় ব্যক্তিত্ব উপহার দিয়েছে। এই বললে চলবে না যে, আমরা অমুক অমুক নগর ও জনপদ আবাদ করেছি। সমরকন্দ, বোখারা, গ্রানাডা, আশবিলিয়াহ ও দিল্লীকে আমরা আবাদ করেছি, সমৃদ্ধ করেছি। বরং প্রয়োজন প্রত্যেক যুগেই ঐরূপ ব্যক্তিত্বের জন্মলাভ অব্যাহত থাকা। প্রয়োজন স্ব-স্ব যুগের চিন্তাগত ও বিশ্বাসগত অস্থিরতার অনুসন্ধান, এর কারণ নির্ণয় এবং তদনুযায়ী যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। দ্বীনী আদর্শ ও শিক্ষাকে, দ্বীনের মৌল নীতিমালা সমূহকে বাস্তব জীবনের ঘটনাবলী ও কার্যক্রমের সাথে, জীবনযাত্রায় উদ্ভুত সমস্যাসমূহের সাথে সঙ্গতি বিধানের প্রচেষ্টা গ্রহণ। প্রত্যেক যুগে ইসলামী আইনের মর্যাদাকে সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করণ।
আল্লামা ইকবাল তাঁর এক চিঠিতে লিখেছেন, এই যুগে সবচেয়ে বড় মুজাদ্দিদ সেই ব্যক্তি যে অন্যান্য আইনের উপর ইসলামী আইনের উচ্চতা ও মর্যাদাকে সুপ্রমাণিত করবে। আল্লামা ইকবাল ষাট বৎসর পূর্বে যে কথা বলেছিলেন তা আজ এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ইসলামী শরীয়ত বিশেষত পারিবারিক বিধি-বিধানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা। ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য, তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্য ইসলামী বিধি-বিধানই যে সর্বোত্তম উপায় তা প্রমাণ করা।
আমরা আমাদের প্রিয় ছাত্রবৃন্দের উদ্দেশ্যে বলব যে, তারা কঠোর অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দ্বীনী ইলমে পাণ্ডিত্য অর্জন করুক। অতঃপর আধুনিক জিজ্ঞাসা সম্পর্কে অবহিত হোক এবং দ্বীনের আলোকে সেগুলোর সমাধান দান করুক।
দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামা গর্বিত যে, প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরীর ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন, আলোকিত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিত্বের সাথে এবং 'সীরাতুন নবী'র লেখক আল্লামা শিবলী নুমানীর ন্যায় ধর্মতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ও সীরাত রচয়িতার সাথে।
বাস্তবতা হল, আজ পর্যন্ত ইলমী ও দ্বীনী বিষয়ে লেখনী ধারণ এবং ইলমী ও দ্বীনী বিষয়কে কার্যকর ও প্রভাব বিস্তারকারী রূপে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আমার জানা মতে আল্লামা শিবলী নুমানীর পদ্ধতি ও ধরণ অপেক্ষা উত্তম কোন পদ্ধতি ও ধরণ হতে পারে না। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে সাইয়েদ সুলাইমান নদভী, আবদুস সালাম নদভী প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের ন্যায় ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এতটুকু তো যথেষ্ট নয়। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, আপনারা এই জাতীয় জলসায় শুধু তাঁদেরই নাম উচ্চারণ করতে বাধ্য হন, নতুন কোন নাম এই তালিকায় সংযুক্ত করতে পারেন না। এটা এই প্রতিষ্ঠানের অধঃগতি ও অবক্ষয়ের প্রমাণ এবং গোটা জাতির জন্য শঙ্কার বিষয়। এটা কত বড় দুঃখের কথা যে, কোন ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত মানে উত্তীর্ণ নতুন কোন ব্যক্তি সৃষ্টি হচ্ছে না।
কোন কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এখানকার অবস্থাও অভিন্ন। সেখানেও এখন জ্ঞান গবেষণা ও চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানের মত ব্যক্তিত্বের অভাব। এ রকম কোন ব্যক্তি নেই যিনি ইউরোপ আমেরিকায় লেখাপড়া করা নতুন প্রজন্মকে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার উপকরণ সরবরাহ করতে পারেন। এমন কোন পুস্তিকা বা গ্রন্থ নেই, যাতে দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক জিজ্ঞাসা ও সমস্যার জবাব ও সমাধান দান করা হয়েছে। জ্ঞান গবেষণা ও ভাষার মান নিম্নমুখী ও নিতান্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেসব পুস্তিকা আছে তা নির্দিষ্ট দল ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক, নির্দিষ্ট মত ও পথ কেন্দ্রিক। তাতে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা মূলত নির্দিষ্ট দল, নির্দিষ্ট মত ও পথের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সেসব পুস্তিকা লিখিত হয়েছে। এই অবস্থা বড় ভয়াবহ। যে আলেমগণের দায়িত্ব ছিল যুবক শ্রেণীর আস্থা ও বিশ্বাসকে ইসলামের পক্ষে সুসংহত করা, যাদের দায়িত্ব ছিল ইসলামের সত্যতা ও চিরন্তনতা প্রমাণ করা এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের প্রয়োজনীয়তা ও কল্যাণকারিতা প্রমাণ করা তাঁরা এখন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে লিপ্ত। এটা বড় সর্বনাশা ব্যাপার। যদি এই উম্মতের মধ্যে দ্বীনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ নেককার মুত্তাকী ব্যক্তি উপস্থিত থাকে তবুও উপরিউক্ত প্রয়োজন সব সময়ই অবশিষ্ট থাকবে।
ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।