📄 আমলের প্রতি গুরুত্ব
পৃথিবীর জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আখিরাত। পরীক্ষাকেন্দ্রের সবচাইতে জরুরি বিষয় হলো, খাতায় উত্তর লেখা। আর পৃথিবীর পরীক্ষায় উত্তর হলো নেক আমল। ফরজগুলো সবার জন্যই অপরিহার্য। তা আদায় করলেও হিসাব হবে, না করলেও হিসাব দিতে হবে।
একজন ব্যাকবেঞ্চার যেমন পাশমার্ক লেখার পর অতিরিক্ত কিছু নম্বর পাওয়ার আশায় আরও দু এক পেইজ ভরতি করে, আরও দু-একটা প্রশ্নের উত্তর বেশি দেয়; একটা ভালো ছাত্র যেমন ৮০ মার্ক পূর্ণ করেও আরেকটু ভালো করার আশায় বাকি উত্তরগুলো লিখে দেয়, তেমনই নেক আমল দুনিয়া এবং আখিরাতে মানুষের স্তর নির্ধারণ করে।
তাই তোমার জীবনে নির্দিষ্ট কিছু নেক আমল থাকা দরকার, আরেকটু বেশি কিছু করা দরকার; নতুবা কেবল দীন দীন করতে করতেই জীবন কেটে যাবে, কিন্তু দীনে ফেরার মূল উদ্দেশ্য আর পূরণ হবে না। ভুলে যেয়ো না, তুমি আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে এসেছ। তাঁর আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম হলো- ইবাদত।
যদিও একবারেই সবকিছু সম্ভব নয়, কিন্তু প্রথম থেকেই একটু একটু করে আমলের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করো; নতুবা পরবর্তী জীবনে দুর্দশা পোহাতে হবে।
একবারেই সবকিছু বোঝা সম্ভব নয়। তাই শুরুতে তুমি দীন বোঝো বা না বোঝো, নেক আমল করতে থাকো; ইবাদতের স্বাদ পাও বা না পাও, আমল করে যাও।
এরপর কখনো যদি আল্লাহ দীন বোঝার তাওফিক দেন, তখন দেখবে দীনের মূল উদ্দেশ্যই আমল। দুনিয়াতে তোমার থাকার উদ্দেশ্য হলো এই আমল। আখিরাতের বিচার হবে আমলের। জান্নাত লাভের জন্যও দরকার আমল।
আমল করব বুঝলাম, কিন্তু কী দিয়ে শুরু করব?
বেশি কিছু করতে যেয়ো না, নতুবা এলোমেলো করে ফেলবে। তুমি একটা একটা করে ধাপে ধাপে এগোতে থাকো।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মাধ্যমে তোমার আমলের শুরু। ফরজের সাথে সাথে সুন্নাহ সালাতগুলোকেও যথাযথ গুরুত্ব দাও। ফজরের সালাত শেষে ঘুমিয়ে পড়ার আগে এক পাতা বা কয়েক লাইন কুরআন পড়ে নাও, যাতে তোমার দিনের শুরুটাই আল্লাহর কালাম পাঠের মাধ্যমে হয়।
এরপর ফরজ সালাত শেষে আয়াতুল কুরসি পড়ো। খুব বেশি সময় তো লাগবে না।
যদি পারো আয়াতুল কুরসির পর দোয়ায়ে ফাতেমি অর্থাৎ ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়ে নাও। প্রথমেই ৩৩ বার করে না পারলে প্রত্যেকটা ১০ বার করে পড়ো। তবুও কিছু তো আমল জমাও।
সারা দিনে শতবার হলেও আসতাগফিরুল্লাহ পাঠ করো। কেননা এই কঠিন সময়ে না চাইতেও তোমার ভেতরে পাপ প্রবেশ করবে। কোনো পাপ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই 'আসতাগফিরুল্লাহ' বলে নিয়ো।
বর্তমানে বাহ্যিক পরিবেশ ইমানের জন্য ধ্বংসাত্মক। একবার বাইরে গেলে ঘরে ফেরার পর অন্তরের ইমানের স্তর পুরোপুরি নিচে চলে যায়। তাই ইমানি দুর্বলতা বোধ করলে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দিকে অন্তরের চিন্তাকে রেখে 'লা ইলাহা ইল্লালাহ' বলতে থেকো। সকালে আর রাতে কালিমা পড়ার অভ্যাস করো। এটা সারাদিনের জমে থাকা আবর্জনা ধুয়ে তোমার ইমানকে নবায়ন করে দেবে।
পৃথিবীতে যেহেতু চলতেই হবে সুতরাং এর পাপের প্রতি ঝুঁকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই। তাই যে-কোনো পাপের দিকে অন্তর আকৃষ্ট হওয়ার পূর্বে, সাথে সাথে কিংবা আকৃষ্ট হওয়ার পরে 'লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ' পড়তে থাকবে। এটা অন্তরকে অধিক প্রভাবিত হওয়া থেকে বাঁচাবে।
এরপর আরেকটু ইচ্ছা বাড়লে সকাল-সন্ধ্যার জিকির পড়তে পারো, এটা তোমার চারপাশের সুরক্ষাবেষ্টনী হিসাবে কাজ করবে। ইশার পর বা মাঝরাতে দু রাকাত তাহাজ্জুদ তোমার সফলতার সিঁড়ি হতে পারে।
আরেকটা অনুরোধ করতে চাই, ইচ্ছা হোক বা না হোক, শুরুর দিন থেকেই এর ওপর আমল করতে চেষ্টা করো। তা হলো, দু রাকআত নফল।
সারাদিনে দু রাকআত নফল সালাত আদায় করতে খুব বেশি কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তবুও তোমার যে সময়ে অধিক স্বস্তিবোধ হয়, যেমন: জোহরের পর পড়তে পারো, মাগরিবের পর বা ইশার পর, একেবারে ধীরে সুস্থে সবচাইতে ছোট সুরা দিয়ে হলেও দু রাকআত পড়ে নিয়ো। আর প্রতিদিন পড়ো। এটা কত বেশি উপকারী, তা সময়ের সাথে সাথে উপলব্ধি করতে পারবে ইন-শা-আল্লাহ।
আরও বেশি আমলের ইচ্ছা জাগ্রত হলে আমলের বইগুলো কিনতে পারো। এরপর এক এক করে নিজের ওপর প্রয়োগ করতে থাকো। যে কয়েকটা করতে পারবে মনে হয়, সেগুলো নিয়েই আপাতত এগোতে থাকো।
কিন্তু কোনোকিছু না করেই শুধু দায়সারা ফরজ ইবাদত করেই সন্তুষ্ট থেকো না। কেননা তুমি চাও বা না চাও, ফরজ তোমার জন্য আবশ্যক। নিজ থেকে একটু বেশি করাটা তোমার রবের সাথে সম্পর্ক এবং আখিরাতের উত্তম প্রতিদান লাভের জন্য সহায়ক হবে ইন-শা-আল্লাহ।
📄 হালাল রিজিক অন্বেষণ
বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় আমাদের পারিবারিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ। সামনের দিনগুলোতে কী করব, কোথায় যাব এই চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। আর জাগতিক প্রয়োজনীয়তার সামনে দুর্বল ইমানদারের জন্য দীনকে ঐচ্ছিক বিষয় মনে হয়।
পৃথিবীর ব্যস্ততা মানুষকে আল্লাহ এবং দীন সম্পর্কে উদাসীন করে দেয়। এরপর একটা সময় মনে হয়, দুনিয়াতে টিকে থাকাই প্রকৃত বাস্তবতা আর বাকি সব হলো সামান্য দায়িত্ব মাত্র; পালন করলেও হবে, না করলেও হবে। পরিবার সামলানোর চিন্তার সামনে হাশরের দিনের বিচারের চিন্তাও যেন কিছুই নয়। একদিন না খেয়ে থাকার সামনে জাহান্নামের আজাবের ভয়ও যেন ঠুনকো। জগতের বাস্তবতা বারবার তার সামনে তুলে ধরলেও বাহ্যিক জীবনের বাস্তবতার সম্মুখীন হলেই সব শিক্ষা, নীতি, নৈতিকতা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তির সামনে হাজারো উদাহরণ এবং তার দুর্দশার চাইতেও বড় কোনো বাস্তবতা তুলে ধরা হলেও সে বুঝতে চায় না।
তবে জেনে রাখো, তোমার জীবনের উদ্দেশ্য পরিবার চালানো নয়—ইসলাম। তোমার জীবনের বাস্তবতা অর্থ উপার্জন নয়—আল্লাহর আনুগত্য।
কিন্তু তোমার পারিবারিক অবস্থা যদি স্বাভাবিক না হয়, এখন থেকেই একটা হালাল উপার্জনের পথ খুঁজে নাও। কিছু করার চেষ্টা করো; নয়তো সামনের দিনগুলোতে কষ্ট বেড়ে গেলে, পারিবারিক চাপ এবং তোমার নতুন পরিবার সাজাতে গিয়ে তুমি পাগলের মতো উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকবে। এসব জাগতিক চিন্তায় কখন যে দীন হারিয়ে যাবে, তা টেরও পাবে না।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম হলো ব্যাবসা। ছাত্রজীবন থেকেই যদি একটু একটু করে কোনো একটা ব্যাবসা দাঁড় করাতে পারো, তাহলে দুনিয়া নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।
আর চাকুরি করলে চাকুরির ক্ষেত্রটা ভালোমতো দেখে নিয়ো। সালাতের সময় দেওয়া হবে কি না, তোমার দায়িত্ব অনুযায়ী পারিশ্রমিক দেবে কি না, তাও জেনে নিয়ো। তবে সামান্য কিছু অর্থের জন্য ছাত্র অবস্থায় দিনরাত এক করে দেওয়ার দরকার নেই। সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। এখন তোমার বয়স দিনরাত ধরে চাকুরি করার নয়। খুব বেশি পারিবারিক সংকট না হলে কোনো স্কিল শিখে নাও। সে অনুযায়ী কিছু করার প্রচেষ্টা করো। তাও সম্ভব না হলে পার্টটাইম কিছু করো। সবার সক্ষমতা সমান হয় না। তাই একটু বেশি অর্থের আশায় এই বয়সে নিজের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিয়ো না। মনে রেখো, তোমার উদ্দেশ্য চাকুরি নয়; বরং দীনকে সুরক্ষা করা। পরবর্তী সময়ে যাতে চাকুরি করতে গিয়ে দীন না হারিয়ে যায়, এটা তার একটা অভ্যাস মাত্র।
অনেকে এভাবে কমবয়সে চাকুরি করতে গিয়ে নতুন নতুন টাকার চেহারা দেখে তার প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ে। তাকে পাওয়ার জন্য নিজের পেছনের সবকিছু পুরোপুরি ভুলিয়ে দেয়।
সুতরাং উদ্দেশ্য ভুলে যেয়ো না। তোমার অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, দীনের হিফাজত। তুমি যেখানেই থাকো, যা-ই করো, যেভাবেই করো; প্রথম কথা হলো, তা যেন হালাল হয়, এরপর তা যেন তোমার দীনের জন্য ধ্বংসাত্মক না হয়। তাই এখন থেকেই দীনি ভাইদের ক্যারিয়ার গাইডলাইন কোর্সগুলো করে নাও। দীন এবং দুনিয়া একসাথে মেইনটেইন করার উপায় শিখে নাও।
তবে বৈধ কিছুও যদি তোমার এবং তোমার রবের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে, যদি কর্মক্ষেত্রে তোমার দীন ধরে রাখতে অসুবিধা হয়, তবে আল্লাহর জন্য তা কুরবানি দিয়ে দাও। তোমার রব এর চাইতেও উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করতে সক্ষম। আর যদি তা না করো, তাহলে জীবনে আর কখনও পুরোপুরি দীনপালন করা না-ও হতে পারে। কেননা পুরুষের জন্য চাকুরি নতুন এক জগৎ। একবার এতে প্রবেশ করলে সে এর ভেতরেই তলিয়ে যেতে থাকে।
আর যা-ই হোক আমার ভাই! দীনকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়ো। মনের মধ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে নাও যে, দীনের পথে বৈধ বাধাকেও তুমি সরিয়ে ফেলবে। তোমার আর তোমার রবের মধ্যে যা কিছু দূরত্ব সৃষ্টি করবে, তুমি তাকে নিজের জীবন থেকে ছুড়ে ফেলে দেবে। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটুক, তবুও জীবনে দীনটুকু অবশিষ্ট থাকুক।
📄 আত্মসমালোচনা
সর্বশেষে যে কথাটি বলতে চাই তা হলো, আত্মসমালোচনা। ব্যক্তি অনুযায়ী মানুষের অবস্থা নানা রকম হয়ে থাকে। প্রতিমুহূর্তে তার ব্যস্ততা, বিভিন্ন কর্ম করা, বিভিন্ন স্থানে যাওয়া আর বিভিন্ন রকম মানুষের সাথে মেশার ফলে তার অন্তরের অবস্থার উত্থান-পতন ঘটতে থাকে। ফলে সে একবার সুখী থাকে, আরেকবার দুঃখী হয়ে যায়।
এরপর সারা দিনের শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক নানান চাপ, অন্তরে পাপের প্রভাবে ব্যক্তির সমস্ত সত্তা অপবিত্র হয়ে পড়ে। তার সমস্ত সত্তার দুর্বলতার সুযোগ নেয় শয়তান। প্রবৃত্তির কামভাব প্রবল করে তুলে তাকে দিয়ে পাপ করিয়ে নেয়।
এ ছাড়া সারা দিন বিভিন্নভাবে শরয়ি সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়, বিভিন্নভাবে পাপ হয়ে যায়, দীর্ঘক্ষণ আল্লাহকে ভুলে থাকা হয়। পৃথিবীর ব্যস্ততায় মানুষ অনেক সময় তার উদ্দেশ্যকেই পুরোপুরি ভুলে যায়।
তাই এক্ষেত্রে করণীয় হলো, দিনশেষে সারা দিনের হিসেব মেলানো। কোন কোন কারণগুলোর জন্য তোমার ভেতরে দুর্বলতা তৈরি হলো, কেন এখনও তুমি সেই পাপ ছাড়তে পারছ না, কী দিয়ে শয়তান তোমাকে বারবার ধোঁকায় ফেলছে...। এভাবে এক এক করে তোমাকে ধ্বংস করা প্রতিটা বিষয় খুঁজে বের করো। এরপর শয়তান প্রবেশের দরজাগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দাও। ভুলগুলোর জন্য তাওবা করো। আল্লাহর কাছে সব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার তাওফিক চাও।
আত্মসমালোচনার সুবিধা হলো, এটা পরদিন তোমাকে তোমার পূর্বের দুর্বলতার দিকে অগ্রসর হতে দেখলে সতর্ক করে দেবে।
পাপের কারণ খোঁজার সাথে সাথে ইবাদতগুলোরও হিসাব মিলিয়ে নাও। দেখো, তোমার কোনো আমল জান্নাতের নিয়ামত পাওয়ার উপযুক্ত কি না, এখনো কত আমল করা বাকি, আজকে আল্লাহকে কতটুকু স্মরণ করেছ... ইত্যাদি।
আর বিশেষ করে, তুমি আজকে কতটা গুরুত্বের সাথে সালাত আদায় করেছ। কেননা সারা দিনে তো এইটুকুই তোমার অর্জন। এইটুকুই কেবল আখিরাতে পৌঁছেছে।
এভাবে হিসাব মেলানোর ফলে তোমার পরের দিনের ইবাদতে আরও বেশি স্পৃহা কাজ করবে। তুমি আরও বেশি অনুপ্রাণিত বোধ করবে। ইবাদতের প্রতি আরও অধিক মনোযোগী হতে পারবে ইন-শা-আল্লাহ।
তোমার কোনো একটা দিনও যেন অনর্থক না হয়। পৃথিবীর প্রতিটি দিন তোমার আখিরাতের স্তর নির্ধারণ করছে। সুতরাং তুমি যদি উচ্চস্তর চাও, বেশি সুযোগ-সুবিধা চাও, অসীম প্রশান্তি চাও—তবে সেভাবেই প্রস্তুতি নাও। আর যদি স্বাভাবিক স্তরের সান্ত্বনা পুরস্কার নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চাও, তাহলে আর কিছু বলার নেই!
اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ.
‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমাদের অন্তরকে তোমার ইবাদত ও আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দাও।’[১৪০]
সমাপ্ত
টিকাঃ
[১৪০] সহিহ মুসলিম: ৬৬৪৩।