📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 অনলাইন থেকে দূরত্ব

📄 অনলাইন থেকে দূরত্ব


তোমার সার্বিক কল্যাণের জন্য অনলাইন সম্পর্কে সোজাসাপটা নসিহত হলো, অনলাইন নয়তো দীন-তোমাকে এর যে-কোনো একটা বেছে নিতে হবে।

এই দুটোকে একসাথে সামলাতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইমান থাকতে হয়। আমাদের সেই ইমান নেই। এ ছাড়া তোমার দীনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা এবং ধ্বংসাত্মক হলো অনলাইন। এখানে অনলাইন-এর অর্থ শুধু ফেসবুক নয়; ইউটিউব, টুইটার, ইন্সটা-সহ যা কিছু বোঝায় তার সব।

আজকের যুগের নারী/পুরুষ হিসাবে তোমাকে অনলাইনের ক্ষতি নতুন করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। ধূমপানের ক্ষতির মতোই আমরা অনলাইনের ক্ষতি জেনেও তার মাধ্যমে নিজেকে ধ্বংস করে দিচ্ছি। নিকোটিন যেমন ধীরে ধীরে ফুসফুস অকেজো করে দেয়, অনলাইনও ক্রমান্বয়ে তোমার পবিত্র অন্তরকে মেরে ফেলছে।

পূর্ববর্তী নানান ক্ষতি তো আছেই। কিন্তু আজকের এই নতুন অনলাইন জগৎ তোমার আর আমার জন্য মৃত্যুতুল্য। পাপের এমন সব ক্ষেত্র এখানে, যা থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা দুষ্কর। শয়তানের পাপের সেই আধুনিকায়ন আর কয়টা শুনবে?

তোমাকে কি আমি ফেসবুকের রংমাখা আধুনিক দীনদারের কথা বলব? আত্মমর্যাদাহীন পোস্টগুলোর কথা বলব? দীনের নামে সৃষ্টি করা নানান ফাঁদের কথা বলব? না কি মাত্রাতিরিক্ত আবেগের বশে অপরকে ধ্বংস করতে চাওয়া নির্বোধের উন্মাদনার কথা বলব? বিয়ের নামে আল্লাহর ভালোবাসা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলব? না কি প্রেমের সমাধান নিয়ে ভাবতে গিয়ে অন্তরে জাগ্রত হওয়া অশ্লীল অনুভূতির কথা বলব?

ইউটিউবে দীনের আবরণে দুনিয়া উপস্থাপন করার কথা বলব? বিনোদনের নামে আল্লাহর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলব? অশ্লীল অ্যাড-এর ক্ষতিকারক প্রভাবের কথা বলব? মাজহাব আর হাত বাঁধার দ্বন্দ্বের কথা বলব? কে ভালো কে মন্দ এই বিচার করা নাস্তিকদের কথা বলব? কোনটা শুনতে চাও?

ইন্সটা আর টিকটকের ফিতনার কথা তো বাদই দিলাম। এসব লিখতে গিয়ে যে ভাবনা প্রয়োজন, সে ভাবনাকে নিজের ভেতরে আনতেও ঘৃণা হয়।

দিনশেষে একটার পর একটা ব্রাউজার, অ্যাপসের মাঝে ডুবে যাওয়া চ্যাটের টুং টাং শব্দ আর পরবর্তী ডোপামিনের প্রতীক্ষা মানুষকে উন্মাদ করে তোলে। কিন্তু সবচাইতে বড় ক্ষতিটা কোথায় জানো?

একটা মানুষের মস্তিষ্ক যখন একসাথে এত বেশি তথ্য গ্রহণ করে, তখন তার চিন্তার ওপর গভীর প্রভাব পড়ে। সে বিভিন্ন বিষয়ের অনর্থক লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে মেলাতে নিজের প্রকৃত হিসাব সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। সারাদিনের নানাবিধ চিন্তার প্রভাব, অন্তরে পাপের প্রভাব, আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকার প্রভাব একসাথে হয়ে তাকে নিজ উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দেয়। তখন তার অন্তরে রবের জন্য একান্ত কোনো ভাবনা থাকে না। ফলে সে তার ভালোবাসাও অনুভব করতে পারে না।

অনলাইনের হাজারো ক্ষতির মধ্যে এটাই সবচাইতে বড় ক্ষতি যে, অনলাইন মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর তুমি যদি আল্লাহকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাও, তবে তোমার জন্য অনলাইন থেকে নিজেকে মুক্ত করা অপরিহার্য।

অনেকে হয়তো বলবে, এ যুগে অনলাইন ছাড়া থাকব কী করে? আর অতিরিক্ত আসক্তির কারণে হুট করে ছেড়ে দিলেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারি। কী করব তাহলে?

এক্ষেত্রে অনলাইনের প্রভাব থেকে বাঁচতে প্রাথমিকভাবে তুমি নিজের ফেসবুক আইডিকে অশ্লীলতা থেকে মুক্ত করে দাও। অশ্লীল ছবি আপলোড দেওয়া প্রত্যেক পুরুষ এবং নারীর আইডিকে আনফ্রেন্ড করে দাও। এরপর বিভিন্ন গ্রুপগুলো থেকে লিভ নাও, পেইজগুলো আনলাইক করে দাও। এভাবে তোমার আইডি অশ্লীলতা মুক্ত হলো। এবার দীনি ভাইদের/বোনদের আইডি-পেইজগুলোতে ফলো দিয়ে রাখো।

কিন্তু এক্ষেত্রে স্মরণ রেখো, দীনদার আইডির মধ্যে যারা দেখবে দিনে পাঁচ-সাতটা পোস্ট করে, যদিও তা উপকারী, তারপর যারা প্রেম বা বিবাহ নিয়ে পোস্ট করে, মাজহাব নিয়ে দ্বন্দ্ব করে, অতিরিক্ত আবেগী, চাটুকার—তাদের থেকে দূরে থেকো। এরা তোমার পাপ না বাড়ালেও তোমার সময়কে নষ্ট করবে এবং মস্তিষ্কে অযথা বাড়তি ঝামেলা প্রবেশ করাবে।

এরপর ইউটিউবের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। প্রথমে অশ্লীলতাপূর্ণ চ্যানেল থেকে আন-সাবস্ক্রাইব করে বেরিয়ে আসো, আর দীনি চ্যানেলগুলোতে যুক্ত হও। এক্ষেত্রেও তথাকথিত দীনদার বিনোদনদাতা আর সস্তা অনুপ্রেরণা দেওয়া ইউটিউবার থেকে বেঁচে থেকো। কেননা এভাবে তারা তোমাকে খুশি করলেও তোমার ভেতরে দীন সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্মাতে পারে।

এগুলো ফেসবুক বা ইউটিউব চালানোর জন্য কোনো পরামর্শ নয়; হুট করেই সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার ধাক্কা থেকে তোমাকে বাঁচাতে অনলাইনের সাময়িক নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি মাত্র।

তুমি যদি সত্যিই আল্লাহকে ভালোবেসে তাঁর দীন অনুসরণ করতে চাও, সত্যিই জান্নাতের অধিবাসী হতে চাও, তবে ধীরে ধীরে এই অনলাইন জগৎ থেকে তোমাকে পুরোপুরি মুক্ত হতে হবে; নতুবা তোমার মাঝে দীন তো থাকবে, তবে অর্ধেক।

আর বোনদেরও সতর্ক করে দিতে চাই। এই নতুন অনলাইন দীনদারদের ফাঁদে পড়ে যেয়ো না। ইতিমধ্যেই অনেক বোন এসব মিথ্যা দীনদারিতা দেখে সংসার শুরু করে এখন যন্ত্রণা পোহাচ্ছে।

তুমি ফাতিমার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) মতো করে নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করো, আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মতো পুরুষেরা তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখবে ইন-শা-আল্লাহ। আর অনলাইন তোমাকে আড়াল করলেও তোমার ভেতরে যে পাপ গেঁথে দেবে, যে অনর্থক চিন্তা প্রবেশ করিয়ে দেবে; বিশ্বাস করো আর না-ই করো, তোমার সংসারজীবনে কিন্তু এর প্রভাব পড়বে।

তবুও কিছু মানুষ অনলাইন ছাড়বে না। কেউ না ছাড়ুক, তুমি ছেড়ে দাও। সবাই কি আর জান্নাতুল ফিরদাউসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছাকাছি থাকার সৌভাগ্য লাভ করবে?

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 চরিত্র গঠন

📄 চরিত্র গঠন


ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। আর এর সুবিশাল নির্দেশনাছাউনি বা শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে তার মানবীয় চরিত্র ফিরিয়ে দেওয়া। এত এত নিয়মনীতি, এত শাসন-বারণ মানুষের ভেতরকার পশুত্ব দমিয়ে রেখে তাকে মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখায়।

দীন অনুসরণের পূর্বে মানুষ এক কঠিন আঁধারে থাকে, নিয়মশৃঙ্খলা ছাড়া দুনিয়ায় মত্ত হয়ে পশুর মতো জীবনযাপন করতে থাকে। কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য করার ফলে, দীনের সীমারেখার ভেতরে প্রবেশের ফলে সে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পারে। মানবীয় চরিত্রের চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছতে পারে।

তবে আজকে দীনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের অভাবে অনেক দীনদার ব্যক্তির মাঝেও উত্তম চরিত্রের যথেষ্ট অভাব লক্ষ করা যায়। এর জন্য তাদের নিজস্ব উদাসীনতা দায়ী। সারাক্ষণ এটা ওটা নিয়ে পড়ে থাকতে থাকতে, সারাক্ষণ উন্মাদনার খোঁজ করতে করতে, তারা নিজের চরিত্রের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগই পায় না। আর যার চরিত্র নেই, তার কাছে দীনের কোনো গুরুত্বই নেই। যার চরিত্র উত্তম নয়, সে এখনও দীন বুঝতে সক্ষম হয়নি। যার আদব-আখলাক সুন্দর নয়, সে ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর সামনে চূড়ান্ত বিনয় প্রদর্শনে সক্ষম নয়। যার চরিত্র সুন্দর নয়, সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও পুরোপুরি ভালোবাসতে পারেনি। দীনের অনেক বড় একটি অংশ উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।

অনেকে দীনে ফেরার পর দীনের যথাযথ গুরুত্ব না জেনে, দীনি বিষয়ের নির্দিষ্ট সীমারেখা না বুঝে, সবকিছু নিয়েই বাড়াবাড়ি করতে চায়, সবকিছুই বুঝতে চায়। এটা মূলত উত্তম চরিত্রের অভাব, বাহ্যিক জীবনের পশুসুলভ স্বভাব ত্যাগের অক্ষমতা।

আজকে কিছু টুপি-দাড়ি-পাঞ্জাবি পরিহিত যুবককেও রাস্তায় মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করতে দেখা যায়। রাস্তাঘাটে না হলেও মসজিদের বাইরে মাজহাব নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কমেন্টে তাদের আচরণ সবচাইতে জঘন্য হয়। তার কমেন্টের ভাষা দেখলে বোঝা যায়, সে কত নিকৃষ্ট চিন্তা লালন করে!

যদিও তাদের দীন অনুসরণকারী বলা চলে না, তবে ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় তারা কেবল ইসলামি আদর্শকে ধারণ করেছে মাত্র। এ কারণে তাদের খারাপ আচরণ ইসলামের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।

তাই দীনে প্রত্যাবর্তনের পর নিজের চরিত্র সুন্দর করার প্রতি মনোযোগী হও। তোমার হাঁটাচলা, খাওয়াদাওয়া, ওঠাবসা, আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা কোথাও যেন ইসলামবহির্ভূত কিছু না থাকে। এই একটা গুণ তোমার জন্য হাজারটা কল্যাণের দ্বার খুলে দেবে ইন-শা-আল্লাহ।

চরিত্রহীন উন্মাদেরা কখনও দীনের মর্যাদা বুঝতে পারে না। দীনের ক্ষেত্রে তারা কেবল বাহ্যিক ইবাদত পর্যন্তই পৌঁছতে পারে। এর চেয়ে দূরে যেতে চাইলে উত্তম চরিত্রের বিকল্প নেই।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ

📄 সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা কাজ ও সমস্ত জীবনাদর্শ হলো সুন্নাহ। আল্লাহর প্রিয় হওয়ার সর্বোত্তম পথ হলো সুন্নাহ। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো সুন্নাহ। বাহ্যিক জীবনের সমস্ত সুখের চাবিকাঠি হলো সুন্নাহ। জাগতিক সম্মানের মূল হলো সুন্নাহ। এই কঠিন ফিতনার যুগে পৃথিবী এবং পাপ থেকে নিজেকে সুরক্ষা করার একমাত্র পন্থা হলো সুন্নাহ।

কিন্তু আমাদের সমাজে মানুষ সালাতের ক্ষেত্রে ছেড়ে দেয় সুন্নাহ, পোশাকের ক্ষেত্রে ছেড়ে দেয় সুন্নাহ, আদর্শের ক্ষেত্রে ছেড়ে দেয় সুন্নাহ, সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ছেড়ে দেয় সুন্নাহ!

কিন্তু দীনের ক্ষেত্রে অবিচলতার একমাত্র পন্থা হলো সুন্নাহ। তুমি একজন সুন্নাহ অনুসরণকারী এবং সুন্নাহ ছাড়া দীন অনুসরণকারীর জীবনচিত্র দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে।

সুন্নাহ মানুষের জন্য পৃথিবীকে সহজ করে দেয়, সুন্নাহ ছাড়া দীনপালন মানুষের জন্য কঠিন হয়ে যায়। আল্লাহর আদেশ এবং তাঁর রাসুলের আদর্শ একত্রে যুক্ত করাই জাগতিক কল্যাণের চাবিকাঠি। এর যে-কোনো একটি বাদ দিলে কল্যাণ পুরোটা লাভ করা যায় না। সুন্নাহকে বাদ দিলে ইসলামের পথ তো জানা থাকে, পৃথিবীর জীবন সামনে থাকে, কিন্তু চড়াই-উতরাই পেরোবার সঠিক পন্থা খুঁজে পাওয়া যায় না।

তাই সুন্নাহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দাও।

সালাতের সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ো না; এটা তোমাকে আল্লাহর সাথে আরেকটু বেশি সময় কাটানোর সুযোগ করে দেবে।

পোশাকের সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ো না; এটা তোমাকে পৃথিবীতে মর্যাদা দান করবে।

দাড়ির সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ো না; এটা তোমাকে পৃথিবী এবং তার খারাপ মানুষ থেকে আলাদা করে দেবে।

হাঁটার সুন্নাত ছেড়ে দিয়ো না; সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটা তোমার দৃষ্টিকে অবনমিত রাখতে সাহায্য করবে।

বেশি খাবার খেয়ো না; এটা তোমার নফসকে দুর্বল করে তুলবে।

ঘুমানোর সুন্নাহ আদায় করো; ঘুমের মধ্যকার ক্ষতিকর দিকসমূহ থেকে বেঁচে থাকবে।

মিসওয়াক করতে ভুলে যেয়ো না; এটা তোমাকে শ্রেষ্ঠ উপহার দেবে, তা হলো, তাকওয়া।

সর্বোপরি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমস্ত আদর্শকে আঁকড়ে ধরো; এটা তোমাকে দ্রুত আল্লাহর নৈকট্যলাভে সহায়তা করবে।

একটা কথা না বললেই নয়, দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, আজকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহগুলোকে নতুনত্ব আর আধুনিকতায় মিশ্রিত করার প্রচেষ্টা চলছে। সমাজের তরুণ-তরুণীদের সুন্নাহর প্রতি আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে, তাদের উৎসাহদানের নাম করে একটা শ্রেণি সুন্নাহের মাঝে সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাদামাটা জীবনকে রঙিন করে তুলতে চাচ্ছে।

তবে তুমি জেনে রাখো, চাকচিক্য দীন নয়, চাকচিক্য সুন্নাতের অংশ নয়।

যদি তা-ই হতো, তাহলে মদিনার সবচাইতে ধনী সাহাবি আবদুর রহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু হাজার হাজার দিরহামের মালিক হয়েও সাদামাটাভাবে চলাফেরা করতেন না। হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলিফা এবং বিশাল সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও সাদামাটা জীবনকে বেছে নিতেন না। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম?
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা ফাতিমার ঘরে গেলেন। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেন না। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘরে এলে ফাতিমা তাকে ঘটনা জানালেন। তিনি আবার নবিজির নিকট বিষয়টি নিবেদন করলেন। তখন তিনি বললেন, আমি তার দরজায় নকশা করা পর্দা ঝুলতে দেখেছি। দুনিয়ার চাকচিক্যের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?'[১৩৯]

চাকচিক্য ধারণ করা ব্যক্তির ভেতরে রাসুলের ভালোবাসা নেই। যা আছে তা কেবল নিজেকে প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষা মাত্র। ইসলাম চাকচিক্য পুরোপুরিভাবে নিষেধ করেনি। তোমার অর্থসম্পদ বেশি; তুমি দামি শার্ট-প্যান্ট পড়ো, ফ্যাশন হিসাবে তৈরি করা পাঞ্জাবি পড়ো; তাতে কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু একজন দীনদার ব্যক্তির পরনে আমার রাসুলের সুন্নাহকে ফুটিয়ে তোলা পাঞ্জাবির মধ্যে নারীর পোশাকের ন্যায় ওই নকশা, গলায় ঔদ্ধত্যের চেন, আর চোখধাঁধানো উজ্জ্বল রং কেন?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি চাকচিক্যময় সামান্য পর্দা পছন্দ না করেন, তিনি কি তাঁর সুন্নাতের ক্ষেত্রে চাকচিক্য পছন্দ করবেন?

আমি তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি। দীনে ফিরেছ, আল্লাহকে ভালোবাসো, তাঁর রাসুলের প্রতিও ভালোবাসা আছে, সুন্নাহ মানার প্রতি প্রবল আগ্রহ আছে; কিন্তু শুনে রাখো, সুন্নাহের ক্ষেত্রে সাদাসিধা হও; চাকচিক্য ধারণ করতে যেয়ো না। নতুবা শরীরে পাঞ্জাবি থাকবে, কিন্তু আসমান থেকে সম্মান আসবে না; মুখভরতি দাড়ি তো থাকবে, কিন্তু কেবল রাসুলের প্রেমিক হওয়ার নামে নিজেকে প্রদর্শনের চেষ্টা হবে উদ্দেশ্য। কিন্তু কোনো মর্যাদা দেওয়া হবে না। তাই তোমাকে বলব,

শরীরে সাদা উঠুক, সুন্নাতে হউক জীবন রঙিন, রবের সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য থাকুক, জীবনাদর্শ হউক দীন!

বোনদের জন্যও একই বিষয় সতর্ক করতে চাই। চাকচিক্য দীন নয়, আর নারীদের চাকচিক্য পুরুষকে আকৃষ্ট করে।

এমনিতেই ঢেকে রাখা বিষয়ের প্রতি সবার আকর্ষণ একটু বেশি থাকে। মানুষ বাজারে গেলে খোলা পণ্যের চাইতে একটু বেশি টাকা দিয়ে হলেও প্যাকেটজাত পণ্যটাই কেনে। তবে প্যাকেটজাত পণ্যের মধ্যেও অনেক কমবেশি রয়েছে।

Mমজার বিষয় হলো, যখন কোনো পণ্যের প্যাকেট অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়, তখন সব ধরনের মানুষ সেই পণ্য হাতে তুলে নেয়। তার গুণমান আর যাচাই করে না।

আমার বোন! তুমি যদি নিজেকে চাকচিক্য দিয়ে সজ্জিত করে প্রদর্শন করো, তবে ঢেকে রাখা তো হবে, কিন্তু সব রকম মানুষই তোমার দিকে আকৃষ্ট হবে। একজন যোগ্য দীনদার মানুষ কখনো বাইরের চাকচিক্য দেখে তোমাকে গ্রহণ করবে না। তারা সৌন্দর্যের চেয়ে তোমার তাকওয়াকেই অধিক গুরুত্ব দেবে।

সুতরাং আমার বোনকে বলব, তোমার বাহ্যিক চাকচিক্য বাদ দিয়ে অন্তরকে তাকওয়া দিয়ে পূর্ণ করে নাও। তোমার আমলকে উন্নত করো। চরিত্রের দিক থেকে তুমি লজ্জাশীল হও। কেননা লজ্জাহীন বেহায়া নারী নেককার পুরুষের জন্য অগ্নিতুল্য। আর কেউ জেনেবুঝে অগ্নিকে নিজের সঙ্গী করতে চাইবে না। ঘরকে এখন থেকেই আপন করে নিতে শেখো। আর কিছুদিন পর পৃথিবী তোমাকে পুরোপুরি সুরক্ষা দিতেও ব্যর্থ হয়ে পড়বে। এজন্য আল্লাহকে ভালোবাসতে শুরু করো, তাহলে বাইরের পৃথিবীকে ভুলে যেতে পারবে।

আমার ভাই এবং বোন! সুন্নাহ সেটাই, যা আমার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন। সুতরাং তুমি তোমার রাসুলকে দেখে শেখো, তিনি যা করেছেন সেটাই করো। ফেসবুক আর ইউটিউবের জনপ্রিয় কাউকে দেখে ইচ্ছাপূরণ করা কখনো দীন নয়। এই চাকচিক্য কখনোই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে না।

টিকাঃ
[১৩৯] সহিহুল বুখারি: ২৬১৩।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 আমলের প্রতি গুরুত্ব

📄 আমলের প্রতি গুরুত্ব


পৃথিবীর জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আখিরাত। পরীক্ষাকেন্দ্রের সবচাইতে জরুরি বিষয় হলো, খাতায় উত্তর লেখা। আর পৃথিবীর পরীক্ষায় উত্তর হলো নেক আমল। ফরজগুলো সবার জন্যই অপরিহার্য। তা আদায় করলেও হিসাব হবে, না করলেও হিসাব দিতে হবে।

একজন ব্যাকবেঞ্চার যেমন পাশমার্ক লেখার পর অতিরিক্ত কিছু নম্বর পাওয়ার আশায় আরও দু এক পেইজ ভরতি করে, আরও দু-একটা প্রশ্নের উত্তর বেশি দেয়; একটা ভালো ছাত্র যেমন ৮০ মার্ক পূর্ণ করেও আরেকটু ভালো করার আশায় বাকি উত্তরগুলো লিখে দেয়, তেমনই নেক আমল দুনিয়া এবং আখিরাতে মানুষের স্তর নির্ধারণ করে।

তাই তোমার জীবনে নির্দিষ্ট কিছু নেক আমল থাকা দরকার, আরেকটু বেশি কিছু করা দরকার; নতুবা কেবল দীন দীন করতে করতেই জীবন কেটে যাবে, কিন্তু দীনে ফেরার মূল উদ্দেশ্য আর পূরণ হবে না। ভুলে যেয়ো না, তুমি আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে এসেছ। তাঁর আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম হলো- ইবাদত।

যদিও একবারেই সবকিছু সম্ভব নয়, কিন্তু প্রথম থেকেই একটু একটু করে আমলের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করো; নতুবা পরবর্তী জীবনে দুর্দশা পোহাতে হবে।

একবারেই সবকিছু বোঝা সম্ভব নয়। তাই শুরুতে তুমি দীন বোঝো বা না বোঝো, নেক আমল করতে থাকো; ইবাদতের স্বাদ পাও বা না পাও, আমল করে যাও।

এরপর কখনো যদি আল্লাহ দীন বোঝার তাওফিক দেন, তখন দেখবে দীনের মূল উদ্দেশ্যই আমল। দুনিয়াতে তোমার থাকার উদ্দেশ্য হলো এই আমল। আখিরাতের বিচার হবে আমলের। জান্নাত লাভের জন্যও দরকার আমল।

আমল করব বুঝলাম, কিন্তু কী দিয়ে শুরু করব?

বেশি কিছু করতে যেয়ো না, নতুবা এলোমেলো করে ফেলবে। তুমি একটা একটা করে ধাপে ধাপে এগোতে থাকো।

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মাধ্যমে তোমার আমলের শুরু। ফরজের সাথে সাথে সুন্নাহ সালাতগুলোকেও যথাযথ গুরুত্ব দাও। ফজরের সালাত শেষে ঘুমিয়ে পড়ার আগে এক পাতা বা কয়েক লাইন কুরআন পড়ে নাও, যাতে তোমার দিনের শুরুটাই আল্লাহর কালাম পাঠের মাধ্যমে হয়।

এরপর ফরজ সালাত শেষে আয়াতুল কুরসি পড়ো। খুব বেশি সময় তো লাগবে না।

যদি পারো আয়াতুল কুরসির পর দোয়ায়ে ফাতেমি অর্থাৎ ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়ে নাও। প্রথমেই ৩৩ বার করে না পারলে প্রত্যেকটা ১০ বার করে পড়ো। তবুও কিছু তো আমল জমাও।
সারা দিনে শতবার হলেও আসতাগফিরুল্লাহ পাঠ করো। কেননা এই কঠিন সময়ে না চাইতেও তোমার ভেতরে পাপ প্রবেশ করবে। কোনো পাপ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই 'আসতাগফিরুল্লাহ' বলে নিয়ো।

বর্তমানে বাহ্যিক পরিবেশ ইমানের জন্য ধ্বংসাত্মক। একবার বাইরে গেলে ঘরে ফেরার পর অন্তরের ইমানের স্তর পুরোপুরি নিচে চলে যায়। তাই ইমানি দুর্বলতা বোধ করলে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দিকে অন্তরের চিন্তাকে রেখে 'লা ইলাহা ইল্লালাহ' বলতে থেকো। সকালে আর রাতে কালিমা পড়ার অভ্যাস করো। এটা সারাদিনের জমে থাকা আবর্জনা ধুয়ে তোমার ইমানকে নবায়ন করে দেবে।

পৃথিবীতে যেহেতু চলতেই হবে সুতরাং এর পাপের প্রতি ঝুঁকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই। তাই যে-কোনো পাপের দিকে অন্তর আকৃষ্ট হওয়ার পূর্বে, সাথে সাথে কিংবা আকৃষ্ট হওয়ার পরে 'লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ' পড়তে থাকবে। এটা অন্তরকে অধিক প্রভাবিত হওয়া থেকে বাঁচাবে।

এরপর আরেকটু ইচ্ছা বাড়লে সকাল-সন্ধ্যার জিকির পড়তে পারো, এটা তোমার চারপাশের সুরক্ষাবেষ্টনী হিসাবে কাজ করবে। ইশার পর বা মাঝরাতে দু রাকাত তাহাজ্জুদ তোমার সফলতার সিঁড়ি হতে পারে।

আরেকটা অনুরোধ করতে চাই, ইচ্ছা হোক বা না হোক, শুরুর দিন থেকেই এর ওপর আমল করতে চেষ্টা করো। তা হলো, দু রাকআত নফল।

সারাদিনে দু রাকআত নফল সালাত আদায় করতে খুব বেশি কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তবুও তোমার যে সময়ে অধিক স্বস্তিবোধ হয়, যেমন: জোহরের পর পড়তে পারো, মাগরিবের পর বা ইশার পর, একেবারে ধীরে সুস্থে সবচাইতে ছোট সুরা দিয়ে হলেও দু রাকআত পড়ে নিয়ো। আর প্রতিদিন পড়ো। এটা কত বেশি উপকারী, তা সময়ের সাথে সাথে উপলব্ধি করতে পারবে ইন-শা-আল্লাহ।

আরও বেশি আমলের ইচ্ছা জাগ্রত হলে আমলের বইগুলো কিনতে পারো। এরপর এক এক করে নিজের ওপর প্রয়োগ করতে থাকো। যে কয়েকটা করতে পারবে মনে হয়, সেগুলো নিয়েই আপাতত এগোতে থাকো।

কিন্তু কোনোকিছু না করেই শুধু দায়সারা ফরজ ইবাদত করেই সন্তুষ্ট থেকো না। কেননা তুমি চাও বা না চাও, ফরজ তোমার জন্য আবশ্যক। নিজ থেকে একটু বেশি করাটা তোমার রবের সাথে সম্পর্ক এবং আখিরাতের উত্তম প্রতিদান লাভের জন্য সহায়ক হবে ইন-শা-আল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00