📄 নেককার সঙ্গী
আলিমগণ এই পৃথিবীর নক্ষত্র এবং দুনিয়ার সবচাইতে সম্মানিত মানুষ। তাদের জন্য পৃথিবীর অবস্থা এবং ব্যবস্থা সাধারণ মানুষ থেকে একটু ভিন্নভাবে সজ্জিত। সকল অপবিত্রতা থেকে তাদের সুরক্ষা করা হয়। তাই সাধারণ অপবিত্র কোনো মানুষ চাইলেই আলিমদের সংস্পর্শ লাভ করতে পারে না। তবে রজনিগন্ধার মতোই তারা যেখানে যান, চারপাশে তাদের ভেতরকার নববি সৌরভ ছড়িয়ে যায়। যার পবিত্র ঘ্রাণ নেওয়ার শক্তি থাকে, সে দীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু গোলাপের মতো তাদের পুরোপুরি নৈকট্যলাভের অনুমতি সবার নেই। এটা আসমান থেকে নির্ধারিত।
তাই আজকের সময়ে একজন জেনারেলশিক্ষিত ব্যক্তির জন্য প্রজ্ঞাবান হক্কানি আলিমদের সার্বক্ষণিক সাহচর্য লাভ করা প্রায় অসম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে ইসলাম সম্পর্কে মাত্রাতিরিক্ত আবেগের কারণেও আলিমগণ তরুণদের থেকে দূরে থাকেন। তবে আজকে তারা স্বেচ্ছায় আমাদের শোধরাতে এগিয়ে এলেও, জাগতিক ব্যস্ততায় আমরাই তাদের কাছে যেতে চাই না।
যাই হোক! সবার পরিস্থিতি তো আর এক রকম হয় না। প্রাথমিক অবস্থায় আলিমের পুরোপুরি সংস্পর্শ যেহেতু পাবে না, তাই তোমার ক্ষেত্রে করণীয় হলো, কোনো নেককার বন্ধু বা বড় ভাইয়ের সাথে সঙ্গ রাখা এবং তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা।
কারণ, প্রাথমিক অবস্থায় তুমি কখনোই দীন পুরোপুরি বুঝতে পারবে না। এ ছাড়া জ্ঞান এবং বাস্তব জীবনের প্রয়োগের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। তুমি প্রথম অবস্থায় শুধু বুঝতে পারবে যে, দীন একটা জীবনব্যবস্থা। তবে ব্যক্তিজীবনে তা প্রয়োগের সঠিক পদ্ধতি শিখতে হলে নেককারদের সঙ্গ দেওয়ার বিকল্প নেই। আর শুধু সঙ্গে থাকলেই হবে না, তাদের জীবনকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কীভাবে তারা জীবনের প্রতিক্ষেত্রে আল্লাহকে প্রাধান্য দিচ্ছে, কীভাবে বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখছে, কীভাবে সালাতে মনোযোগী হচ্ছে, কীভাবে দীনকে সার্বক্ষণিক ভাবনার বিষয় বানিয়ে রেখেছে, দীনের কোন কোন বিষয়গুলো আলোচনা করছে, কীভাবে সুন্নাহকে গুরুত্ব দিচ্ছে, কোনো বিপদ এলে কীভাবে তারা সবকিছু একসাথে সামলে নিচ্ছে, কীসের ওপর ভিত্তি করে জীবনে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো অনায়াসে নিয়ে ফেলছে—তা ভালোমতো বুঝে নাও।
ডাক্তার হতে হলে যেমন ডাক্তারের সাথে থাকতে হয়, ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে যেমন ইঞ্জিনিয়ারের সাথে থাকতে হয়, তেমনই দীনের সঠিক প্রয়োগ জানতে হলে দীন প্রয়োগকারীর সঙ্গী হতে হবে। তার সাথে চলতে হবে, মিশতে হবে।
তবে আবারও বলছি, পূর্ণাঙ্গ দীন শিখতে হবে আলিমদের থেকেই। নেককারদের থেকে সবকিছু শেখা সম্ভব নয়। তবে যেহেতু প্রাথমিকভাবে আলিমের সংস্পর্শ তোমার জন্য কষ্টসাধ্য, তাই নিজ ঘরানার কোনো দীনদার নেক বন্ধু বা বড় ভাইকে বেছে নেওয়াই তোমার জন্য উত্তম হবে। আর জীবনে এমন কেউ থাকলে বাহ্যিক জীবনে দীন বাস্তবায়ন করাটাও সহজ হয়ে হবে।
তাদের নিকট যাও। প্রশ্ন নয়, যুক্তি নয়, সমস্যা নিয়ে পরামর্শ পেতে নয়; তাদের বন্ধু হতে চেষ্টা করো। একসাথে চলো, একসাথে খাও, একসাথে ঘুরে বেড়াও। তাদের অবসরকে নিজের কল্যাণের মাধ্যম বানাও। নিজের অনর্থক ব্যস্ততা ছেড়ে তাকে সঙ্গ দাও। প্রয়োজনের সময় তাদের সাহায্য করো। তাদের সঙ্গকে লেকচার শোনা থেকে অধিক গুরুত্ব দাও। কেননা লেকচার তোমাকে জ্ঞান দেবে; সৎসঙ্গ তোমাকে সেই জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ শেখাবে। আর আজকের যুগে জীবনের যেকোনো সময়ে জ্ঞান অর্জন সম্ভব, তবে প্রকৃত দীনদার মানুষের সাহচর্য লাভ করাটা বেশি জরুরি।
কিন্তু সেই নেককার কতটা নেক, সেটা যাচাইয়ের পরেই তার সঙ্গী হও; নতুবা আজকালকার আধুনিকতাবাদী (Modernist) নেককার ব্যক্তির সঙ্গী হলে সব কষ্ট বৃথা হয়ে যাবে। প্রকৃত নেককার না পেলে একলা থাকো, আল্লাহর সাহায্য চাও। কিন্তু ভুল করেও এসব আধুনিকতাবাদী দীনদারের সাথে মিশতে যেয়ো না।
আরেকটা বিষয় স্মরণ রেখো, কোনো প্রকৃত নেককার ব্যক্তির বন্ধু হতে হলে সকল অসৎসঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। যতক্ষণ তুমি অসৎ বন্ধু বা খারাপ সঙ্গ পরিহার না করবে, মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র এবং প্রিয় বান্দাকে তোমার সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখবেন। তুমি যদি নিজেকে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করো, তাহলে আল্লাহ তাআলাই তোমার নিঃসঙ্গতা কাটাতে তাঁর নেক বান্দাদের অন্তরে তোমার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দেবেন। এটা বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়।
তোমার দীন, তোমার তাকওয়া, দীনের প্রতি তোমার আগ্রহ, জাগতিক সুখের কুরবানি তোমাকে সেই পবিত্র বান্দাদের নিকটে পৌঁছে দেবে ইন-শা-আল্লাহ। আর তা অবশ্যই হবে। এটুকু বিশ্বাস নিয়েই তুমি অপবিত্র ব্যক্তিদের থেকে পুরোপুরি সরে আসো। আমি বলছি না সম্পর্ক ভেঙে দাও, তবে দূরে সরে আসো। আর তা যদি না করো, তাহলে কী হবে সেটাও জেনে নাও!
ধরো, তোমার ভেতরে দীনের প্রতি আগ্রহ জন্মেছে। নিজেকে পবিত্র করে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে উঠেছে। ইমানের চূড়ায় পৌঁছে তুমি রবের ভালোবাসার স্বাদ গ্রহণ করছ। এমতাবস্থায় তোমার কোনো দুষ্ট বন্ধু হয়তো তোমাকে ডেকে নিয়ে যাবে। শয়তান তাদের মাধ্যমে তোমাকে ফাঁদে ফেলতে চাইবে। তুমি ভাববে, আরে! খারাপ কিছু তো করছি না, খারাপ কোথাও তো যাচ্ছি না, সামান্য ঘোরাঘুরিই তো!
এরপর পৌঁছানোর পর সকলে একসাথে বসে আড্ডা দেবে। তুমি হয়তো চুপ থাকবে, তবে তাদের মধ্যে প্রেমের গল্প চলতে থাকবে। তুমি একপাশে বসে থাকবে, তারা ধূমপান করতে থাকবে। তুমি হাওয়ায় প্রকৃতি দেখে আল্লাহকে খুঁজবে, তারা গানে গানে শয়তানকে আহ্বান করবে।
এরপর বাড়িতে এসে দেখবে, তোমার ভেতরে ইমান এত নিম্নে পৌঁছে গেছে যে, শয়তান যে-কোনো মুহূর্তেই তোমাকে দিয়ে পাপ করিয়ে নিতে পারে। এটা অসৎসঙ্গের বাস্তব ক্ষতি, যার সামান্য সংস্পর্শ তোমাকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে সক্ষম। সুতরাং নেককার সঙ্গী গ্রহণ করো, নয়তো একা থাকো。
📄 দীনের জ্ঞান-অন্বেষণ
একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি দীনের জ্ঞান-অন্বেষণের চেষ্টা করতে হবে। ধর্মীয় বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। একজন সালাফ বলেছেন, 'ফিতনার যুগে ইমান নিয়ে বাঁচতে চাইলে জ্ঞানের বর্ম পরিধান করো।' আর জ্ঞান হলো এমন এক বর্ম, যা পৃথিবীর ফিতনার বাদশাহ দাজ্জাল থেকেও মুমিনকে বাঁচিয়ে দেবে।
তবে প্রশ্ন হলো, কী পড়ব? আর কীভাবে পড়ব?
দীনি জ্ঞান-অর্জনের আগে এটা স্বীকার করে নাও, তুমি একদম প্রাথমিক পর্যায়ের মুসলমান। দীনের জ্ঞানের তুমি কিছুই জানো না। এখন তুমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলে মাত্র। তাই সরাসরি নাইন-টেনের বা অনার্সের বই পড়তে যেয়ো না। টাকাও নষ্ট হবে, আর পথ হারানোর আশঙ্কাও আছে। তাই একেবারে প্রাথমিক স্তরের বইগুলো দিয়েই শুরু করো।
বর্তমানে কিশোর বয়সি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সকল পর্যায়ের নারী-পুরুষের জন্যই বই পাওয়া যায়। ইসলামি অঙ্গনে যুবসমাজের জন্য অনেক কাজ হচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ। ছোট ছোট আকারের একশো বা দুইশো টাকার মধ্যেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে। সেগুলো কিনে পড়া শুরু করে দাও। শুরুতেই গভীরতায় যাওয়ার দরকার নেই। স্বাভাবিকভাবে ইসলাম কী, তা আগে স্পষ্টভাবে জেনে নাও। তারপর অন্য কিছুতে যেয়ো।
আর একদম গুছিয়ে যদি দীন সম্পর্কে পড়াশোনা করতে চাও, তবে মূল মূল বিষয়গুলো মাথায় রাখো। যেমন:
• ইমান • আকিদা • কুরআন • হাদিস • সিরাত • সাহাবায়ে কেরামের জীবনী • নেককার আলিমদের জীবনী • সুন্নাহ • ইসলামের ইতিহাস • মাসআলা-মাসায়েল • দুআ ও আযকার • অনুপ্রেরণামূলক • ফিতনা ও বাতিল মতবাদ।
এরপর প্রতিটি বিষয়ের ওপর স্বল্প পৃষ্ঠার বই খোঁজ করো। খুঁজে না পেলে ইসলামি গ্রুপগুলোতে তোমার প্রয়োজনীয় বিষয় লিখে জানতে চাও, কোন বইটি ভালো হবে। সেখান থেকে সাজেশন পেলে তার নাম দিয়ে সার্চ করে সূচিপত্র আর ভূমিকা দেখো। যেই বইটার প্রথম কিছু অংশ পড়ে তুমি বুঝতে পারবে আর সেই বিষয়ের প্রতি তুমি আগ্রহী, সেটা কিনে নাও। এভাবে প্রতিটি বিষয়ের একটা করে বই পড়লে দীনের প্রাথমিক একটা ধারণা আসবে, ইন-শা-আল্লাহ।
একটা বিষয় বলে রাখা দরকার, প্রথম বই পড়া শুরু করবে কুরআনুল কারিম দিয়ে। আরবি না জানলে আগে শুদ্ধভাবে কুরআনপাঠ শেখায় গুরুত্ব দাও। এরপর কুরআন ও হাদিস পাঠের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা দানকারী বইগুলো পড়ো। কুরআন সম্পর্কে একেবারে প্রাথমিক আলোচনা-সংবলিত বইগুলো পড়ো। হাদিসের ক্ষেত্রে সহজ ভাষায় স্বল্প হাদিসের বই যেমন: ফয়জুল কালাম, রিয়াদুস সালেহিন, আল-আদাবুল মুফরাদ পড়তে পারো। কুরআন-হাদিস পড়ার সাথে সাথে অন্যান্য বিষয় পড়ো; অন্য বিষয়ের সাথে কুরআন-হাদিস নয়।
তবে যদি কোনো বিজ্ঞ আলিম বা দীনি জ্ঞানসম্পন্ন কারও থেকে একটা তালিকা করে নিতে পারো, সেটা সবচেয়ে উত্তম হয়। এই কথাগুলো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের এমন ব্যক্তির জন্য, যার নিকট আপাতত মোবাইল ছাড়া অতটা সুযোগ-সুবিধা নেই।
সতর্কতা : যদি তোমার দীনের প্রতি পূর্ণাঙ্গ আগ্রহ থাকে, তবে শুরুতেই কোনো সাহিত্য বা কবিতার দিকে ঝুঁকে যেয়ো না। কেননা শয়তান জ্ঞান-অর্জনের সুরতে তোমাকে ধোঁকা দিয়ে মস্তিষ্ককে বিপরীত দিকে চালিত করতে পারে। এর আগে সাহিত্য পড়ে থাকলেও দীনি জ্ঞান-অন্বেষণের মুহূর্তে এসব থেকে বিরত থাকো। পূর্বের অভ্যাস না থাকলে নতুন করে পড়তে যেয়ো না। কেননা এসব মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। ইসলামিক বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসও পাওয়া যায়। সেগুলোও তোমার জন্য ফিতনা। তা থেকেও দূরে থাকো।
তুমি তোমার জীবনের এত কিছু বিসর্জন দিয়ে, তোমার শখ, কল্পনা, ভালোবাসা, অর্জন ছেড়ে এসেছ এসব অবৈধ গল্প নিয়ে পড়ে থাকার জন্য নয়। আর তোমাকে জানিয়ে রাখি, 'এমন অনর্থক কিস্সা-কাহিনি পড়া, যাতে দীন ও দুনিয়াবি কোনো উপকার নেই, তা মাকরুহ। আর প্রেম-ভালোবাসার উপাখ্যান, অশ্লীল গল্প, বা অবৈধ এমন ঘটনা যা দ্বারা আকিদা ও আমলের মধ্যে প্রভাব পড়ে, অবৈধতায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তা পাঠ করা হারাম।'[১৩৮] অর্থাৎ এসব আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ।
তুমি এসেছ আল্লাহর জন্য। সুতরাং আল্লাহকেই প্রাধান্য দাও। তাঁর দীনকেই পূর্ণাঙ্গ গুরুত্ব দাও। তাঁর দিকে অগ্রসর হওয়ার পন্থা খোঁজ করো। তোমার প্রতিটি দিন এবং প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। এত কিছু বিসর্জন দিয়ে এসে দীনের আবরণের ফাঁদে পা দিয়ে নিজের সব ত্যাগ বৃtha করে দিয়ো না। তুমি তোমার লক্ষ্যে অটল থাকো। তা হলো-দীন শেখা, দীন জানা, দীনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যেই আল্লাহকে তুমি এতকাল নিজের অবাধ্যতার কারণে অসন্তুষ্ট করেছ, তাঁর জন্যই সময়, অর্থ এবং শ্রম ব্যয় করো। অযথা আবেগ আর চাকচিক্য দেখে পা পিছলে পড়ে যেয়ো না, উঠে আসতে কষ্ট হবে।
টিকাঃ
[১৩৮] আল-ইলান বিত তাওবিখ: ৮৬-৯০।
📄 অনলাইন থেকে দূরত্ব
তোমার সার্বিক কল্যাণের জন্য অনলাইন সম্পর্কে সোজাসাপটা নসিহত হলো, অনলাইন নয়তো দীন-তোমাকে এর যে-কোনো একটা বেছে নিতে হবে।
এই দুটোকে একসাথে সামলাতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইমান থাকতে হয়। আমাদের সেই ইমান নেই। এ ছাড়া তোমার দীনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা এবং ধ্বংসাত্মক হলো অনলাইন। এখানে অনলাইন-এর অর্থ শুধু ফেসবুক নয়; ইউটিউব, টুইটার, ইন্সটা-সহ যা কিছু বোঝায় তার সব।
আজকের যুগের নারী/পুরুষ হিসাবে তোমাকে অনলাইনের ক্ষতি নতুন করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। ধূমপানের ক্ষতির মতোই আমরা অনলাইনের ক্ষতি জেনেও তার মাধ্যমে নিজেকে ধ্বংস করে দিচ্ছি। নিকোটিন যেমন ধীরে ধীরে ফুসফুস অকেজো করে দেয়, অনলাইনও ক্রমান্বয়ে তোমার পবিত্র অন্তরকে মেরে ফেলছে।
পূর্ববর্তী নানান ক্ষতি তো আছেই। কিন্তু আজকের এই নতুন অনলাইন জগৎ তোমার আর আমার জন্য মৃত্যুতুল্য। পাপের এমন সব ক্ষেত্র এখানে, যা থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা দুষ্কর। শয়তানের পাপের সেই আধুনিকায়ন আর কয়টা শুনবে?
তোমাকে কি আমি ফেসবুকের রংমাখা আধুনিক দীনদারের কথা বলব? আত্মমর্যাদাহীন পোস্টগুলোর কথা বলব? দীনের নামে সৃষ্টি করা নানান ফাঁদের কথা বলব? না কি মাত্রাতিরিক্ত আবেগের বশে অপরকে ধ্বংস করতে চাওয়া নির্বোধের উন্মাদনার কথা বলব? বিয়ের নামে আল্লাহর ভালোবাসা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলব? না কি প্রেমের সমাধান নিয়ে ভাবতে গিয়ে অন্তরে জাগ্রত হওয়া অশ্লীল অনুভূতির কথা বলব?
ইউটিউবে দীনের আবরণে দুনিয়া উপস্থাপন করার কথা বলব? বিনোদনের নামে আল্লাহর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলব? অশ্লীল অ্যাড-এর ক্ষতিকারক প্রভাবের কথা বলব? মাজহাব আর হাত বাঁধার দ্বন্দ্বের কথা বলব? কে ভালো কে মন্দ এই বিচার করা নাস্তিকদের কথা বলব? কোনটা শুনতে চাও?
ইন্সটা আর টিকটকের ফিতনার কথা তো বাদই দিলাম। এসব লিখতে গিয়ে যে ভাবনা প্রয়োজন, সে ভাবনাকে নিজের ভেতরে আনতেও ঘৃণা হয়।
দিনশেষে একটার পর একটা ব্রাউজার, অ্যাপসের মাঝে ডুবে যাওয়া চ্যাটের টুং টাং শব্দ আর পরবর্তী ডোপামিনের প্রতীক্ষা মানুষকে উন্মাদ করে তোলে। কিন্তু সবচাইতে বড় ক্ষতিটা কোথায় জানো?
একটা মানুষের মস্তিষ্ক যখন একসাথে এত বেশি তথ্য গ্রহণ করে, তখন তার চিন্তার ওপর গভীর প্রভাব পড়ে। সে বিভিন্ন বিষয়ের অনর্থক লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে মেলাতে নিজের প্রকৃত হিসাব সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। সারাদিনের নানাবিধ চিন্তার প্রভাব, অন্তরে পাপের প্রভাব, আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকার প্রভাব একসাথে হয়ে তাকে নিজ উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দেয়। তখন তার অন্তরে রবের জন্য একান্ত কোনো ভাবনা থাকে না। ফলে সে তার ভালোবাসাও অনুভব করতে পারে না।
অনলাইনের হাজারো ক্ষতির মধ্যে এটাই সবচাইতে বড় ক্ষতি যে, অনলাইন মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর তুমি যদি আল্লাহকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাও, তবে তোমার জন্য অনলাইন থেকে নিজেকে মুক্ত করা অপরিহার্য।
অনেকে হয়তো বলবে, এ যুগে অনলাইন ছাড়া থাকব কী করে? আর অতিরিক্ত আসক্তির কারণে হুট করে ছেড়ে দিলেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারি। কী করব তাহলে?
এক্ষেত্রে অনলাইনের প্রভাব থেকে বাঁচতে প্রাথমিকভাবে তুমি নিজের ফেসবুক আইডিকে অশ্লীলতা থেকে মুক্ত করে দাও। অশ্লীল ছবি আপলোড দেওয়া প্রত্যেক পুরুষ এবং নারীর আইডিকে আনফ্রেন্ড করে দাও। এরপর বিভিন্ন গ্রুপগুলো থেকে লিভ নাও, পেইজগুলো আনলাইক করে দাও। এভাবে তোমার আইডি অশ্লীলতা মুক্ত হলো। এবার দীনি ভাইদের/বোনদের আইডি-পেইজগুলোতে ফলো দিয়ে রাখো।
কিন্তু এক্ষেত্রে স্মরণ রেখো, দীনদার আইডির মধ্যে যারা দেখবে দিনে পাঁচ-সাতটা পোস্ট করে, যদিও তা উপকারী, তারপর যারা প্রেম বা বিবাহ নিয়ে পোস্ট করে, মাজহাব নিয়ে দ্বন্দ্ব করে, অতিরিক্ত আবেগী, চাটুকার—তাদের থেকে দূরে থেকো। এরা তোমার পাপ না বাড়ালেও তোমার সময়কে নষ্ট করবে এবং মস্তিষ্কে অযথা বাড়তি ঝামেলা প্রবেশ করাবে।
এরপর ইউটিউবের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। প্রথমে অশ্লীলতাপূর্ণ চ্যানেল থেকে আন-সাবস্ক্রাইব করে বেরিয়ে আসো, আর দীনি চ্যানেলগুলোতে যুক্ত হও। এক্ষেত্রেও তথাকথিত দীনদার বিনোদনদাতা আর সস্তা অনুপ্রেরণা দেওয়া ইউটিউবার থেকে বেঁচে থেকো। কেননা এভাবে তারা তোমাকে খুশি করলেও তোমার ভেতরে দীন সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্মাতে পারে।
এগুলো ফেসবুক বা ইউটিউব চালানোর জন্য কোনো পরামর্শ নয়; হুট করেই সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার ধাক্কা থেকে তোমাকে বাঁচাতে অনলাইনের সাময়িক নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি মাত্র।
তুমি যদি সত্যিই আল্লাহকে ভালোবেসে তাঁর দীন অনুসরণ করতে চাও, সত্যিই জান্নাতের অধিবাসী হতে চাও, তবে ধীরে ধীরে এই অনলাইন জগৎ থেকে তোমাকে পুরোপুরি মুক্ত হতে হবে; নতুবা তোমার মাঝে দীন তো থাকবে, তবে অর্ধেক।
আর বোনদেরও সতর্ক করে দিতে চাই। এই নতুন অনলাইন দীনদারদের ফাঁদে পড়ে যেয়ো না। ইতিমধ্যেই অনেক বোন এসব মিথ্যা দীনদারিতা দেখে সংসার শুরু করে এখন যন্ত্রণা পোহাচ্ছে।
তুমি ফাতিমার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) মতো করে নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করো, আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মতো পুরুষেরা তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখবে ইন-শা-আল্লাহ। আর অনলাইন তোমাকে আড়াল করলেও তোমার ভেতরে যে পাপ গেঁথে দেবে, যে অনর্থক চিন্তা প্রবেশ করিয়ে দেবে; বিশ্বাস করো আর না-ই করো, তোমার সংসারজীবনে কিন্তু এর প্রভাব পড়বে।
তবুও কিছু মানুষ অনলাইন ছাড়বে না। কেউ না ছাড়ুক, তুমি ছেড়ে দাও। সবাই কি আর জান্নাতুল ফিরদাউসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছাকাছি থাকার সৌভাগ্য লাভ করবে?
📄 চরিত্র গঠন
ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। আর এর সুবিশাল নির্দেশনাছাউনি বা শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে তার মানবীয় চরিত্র ফিরিয়ে দেওয়া। এত এত নিয়মনীতি, এত শাসন-বারণ মানুষের ভেতরকার পশুত্ব দমিয়ে রেখে তাকে মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখায়।
দীন অনুসরণের পূর্বে মানুষ এক কঠিন আঁধারে থাকে, নিয়মশৃঙ্খলা ছাড়া দুনিয়ায় মত্ত হয়ে পশুর মতো জীবনযাপন করতে থাকে। কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য করার ফলে, দীনের সীমারেখার ভেতরে প্রবেশের ফলে সে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পারে। মানবীয় চরিত্রের চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছতে পারে।
তবে আজকে দীনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের অভাবে অনেক দীনদার ব্যক্তির মাঝেও উত্তম চরিত্রের যথেষ্ট অভাব লক্ষ করা যায়। এর জন্য তাদের নিজস্ব উদাসীনতা দায়ী। সারাক্ষণ এটা ওটা নিয়ে পড়ে থাকতে থাকতে, সারাক্ষণ উন্মাদনার খোঁজ করতে করতে, তারা নিজের চরিত্রের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগই পায় না। আর যার চরিত্র নেই, তার কাছে দীনের কোনো গুরুত্বই নেই। যার চরিত্র উত্তম নয়, সে এখনও দীন বুঝতে সক্ষম হয়নি। যার আদব-আখলাক সুন্দর নয়, সে ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর সামনে চূড়ান্ত বিনয় প্রদর্শনে সক্ষম নয়। যার চরিত্র সুন্দর নয়, সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও পুরোপুরি ভালোবাসতে পারেনি। দীনের অনেক বড় একটি অংশ উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।
অনেকে দীনে ফেরার পর দীনের যথাযথ গুরুত্ব না জেনে, দীনি বিষয়ের নির্দিষ্ট সীমারেখা না বুঝে, সবকিছু নিয়েই বাড়াবাড়ি করতে চায়, সবকিছুই বুঝতে চায়। এটা মূলত উত্তম চরিত্রের অভাব, বাহ্যিক জীবনের পশুসুলভ স্বভাব ত্যাগের অক্ষমতা।
আজকে কিছু টুপি-দাড়ি-পাঞ্জাবি পরিহিত যুবককেও রাস্তায় মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করতে দেখা যায়। রাস্তাঘাটে না হলেও মসজিদের বাইরে মাজহাব নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কমেন্টে তাদের আচরণ সবচাইতে জঘন্য হয়। তার কমেন্টের ভাষা দেখলে বোঝা যায়, সে কত নিকৃষ্ট চিন্তা লালন করে!
যদিও তাদের দীন অনুসরণকারী বলা চলে না, তবে ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় তারা কেবল ইসলামি আদর্শকে ধারণ করেছে মাত্র। এ কারণে তাদের খারাপ আচরণ ইসলামের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।
তাই দীনে প্রত্যাবর্তনের পর নিজের চরিত্র সুন্দর করার প্রতি মনোযোগী হও। তোমার হাঁটাচলা, খাওয়াদাওয়া, ওঠাবসা, আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা কোথাও যেন ইসলামবহির্ভূত কিছু না থাকে। এই একটা গুণ তোমার জন্য হাজারটা কল্যাণের দ্বার খুলে দেবে ইন-শা-আল্লাহ।
চরিত্রহীন উন্মাদেরা কখনও দীনের মর্যাদা বুঝতে পারে না। দীনের ক্ষেত্রে তারা কেবল বাহ্যিক ইবাদত পর্যন্তই পৌঁছতে পারে। এর চেয়ে দূরে যেতে চাইলে উত্তম চরিত্রের বিকল্প নেই।