📄 পাপের অভ্যাস ত্যাগ করা
এই প্রজন্মের জন্য পাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা বেশ কষ্টসাধ্য। পূর্বের জাহিলিয়াত ছেড়ে এলে তা আরও বেশি কষ্টকর। তবে পেছনের অভ্যাসগুলো ছাড়তে দেরি করায় অনেক মানুষ পুরোপুরি দীনে ফিরতে পারে না। মাঝপথেই তার যাত্রা আটকে যায়।
একজন মানুষের জন্য দীনে প্রবেশের পথে, আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসার সবচাইতে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো তার পাপ। অনেকেই শুরুতে নিজের সমস্ত জীবনকে ইসলাম দিয়ে সাজিয়ে রাখে। ব্যাবসাবাণিজ্য, পরিবার, আদর্শ-সবকিছুতে হালাল পন্থায় চলার প্রচেষ্টা করে। কিন্তু মোবাইলের আসক্তি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু পাপের অভ্যাস ছাড়তে না-পারায় ধীরে ধীরে তা আল্লাহর থেকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকে। এরপর সে পুরোপুরি ইসলাম থেকে সরে যায়। সাথে থেকে যায় শুধু তার পাপ।
তবে আমার প্রিয় ভাই/বোন! তুমি যদি প্রত্যাবর্তনের পরেও নিজের পাপের প্রতি ভালোবাসা রাখো বা ক্ষুদ্র কোনো বদভ্যাস না ছাড়ো, তা তোমাকে দীন থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম।
পাপের প্রভাবে দীন অনুসরণের পরেও তোমার অন্তরে শূন্যতা অনুভব হবে, দীনের প্রতি আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে, পাপ তোমার নেক কর্মের স্পৃহা কেড়ে নেবে। অধিক পাপের প্রভাবে তাওবা করে পুনরায় প্রত্যাবর্তনেরও ইচ্ছাও অবশিষ্ট থাকে না।
পাপের ক্ষতি অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। এত কষ্ট করে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে, পেছনের জীবনের সব সুখ ছেড়ে দিয়ে, অনুভূতি আর কল্পনা ভেঙে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পর যদি সামান্য দু-একটা পাপের অভ্যাস না ছাড়তে পারো, তবে কী লাভ হবে বলো?
এরপর যদি এই ক্ষুদ্র পাপগুলো তোমাকে তোমার রব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখন তোমার কাছে আর কী বাকি থাকবে? তুমি তো পেছনেও আর ফিরে যেতে পারবে না, সামনেও এগোতে পারবে না। সুতরাং অবৈধ অভ্যাস ছেড়ে দাও।
📄 আন্তরিক প্রার্থনা
দীর্ঘ দিন পরিবার ছেড়ে দূরে থাকার পর বাড়ি ফেরা সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে মমতাময়ী মা যেভাবে স্নেহের পরশে কাছে টেনে নেন, সেই অনুভূতি কেমন হয় বলো তো? এরপর কি সন্তানের অন্তরে আর কোনো অভাব থাকে?
সন্তানের সুখেই যার অন্তর পূর্ণ হয়ে ওঠে, সন্তানের প্রয়োজন পূরণে যে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেয়, নয় মাস নিজের ভেতরে তোমাকে ধারণ করা মায়ের ভালোবাসাও কি বর্ণনা করা যাবে? মায়ের স্পর্শে যে প্রশান্তি, তা কি অন্য কোথাও পাওয়া যাবে?
আচ্ছা মা এবং তার মমতা যদি এমন হয়, তাহলে সেই মায়ের চরিত্রের মানুষ এবং মমতার বিশেষ অনুভূতি যিনি সৃষ্টি করেছেন, তার মমতা কত বেশি!
তোমাকে ধারণ করে মা যদি সবকিছু উজাড় করে দেন, তবে তোমাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি তোমার জন্য কী করবেন?
মা তো তোমাকে ধারণ করেন মাত্র। আর মাতৃগর্ভের তিন স্তরের পর্দার অভ্যন্তরে তোমার প্রতিটা অঙ্গ যিনি একটু একটু করে সাজালেন, তার মমতা কত বেশি!
তুমি কি জানো, মায়ের গর্ভে যখন শিশুর লিঙ্গের আকৃতি দেওয়া হয়, তার পূর্বমুহূর্তে মহান রবের আদেশের প্রয়োজন হয়?
তিনি যদি তোমার থেকে কিছু মুহূর্ত নিজের দয়ার দৃষ্টি সরিয়ে রাখতেন, তবে এই বিশেষ অঙ্গ দিয়ে তাঁরই অবাধ্যতা করার সুযোগ পেতে না। তোমার প্রতি তাঁর এই মায়াকে কীভাবে তুমি মিথ্যা প্রমাণ করবে?
তাহলে কেন তুমি তোমার রবের ভালোবাসা বুঝতে চাও না? কেন তাঁর সাথেই তোমার এত এত দূরত্ব? কেন নিজের ভালোবাসার কাছ থেকেই এভাবে পালিয়ে বেড়াও?
মায়ের কাছে ফিরে এসে তার স্নেহের পরশে লেপ্টে থাকার মতোই তোমার রবের কাছেও ফিরে এসে তার রহমতের চাদরে নিজেকে জড়িয়ে ফেলো। ফিরে এসে বলে দাও-
'আমার প্রিয় রব! আমি তোমার পালিয়ে যাওয়া এক দাস। এক নির্বোধ গোলাম। কিন্তু আজ আমি ফিরে এসেছি, দেখো। আমার সকল প্রিয় জিনিসকে পেছনে ফেলে রেখে এসেছি। তোমার থেকে পালিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে এলাম, কিন্তু কোথাও একবিন্দু সুখ খুঁজে পাইনি। কেউ আমাকে সুখী করতে পারেনি।
আমি ইচ্ছা করে তোমার থেকে দূরে সরে থাকতে চাইনি, আমি স্বেচ্ছায় তোমার অবাধ্যতা বেছে নিইনি। পরিবার আর পৃথিবী আমাকে নিজের মায়ার শেকলে বেঁধে ফেলেছিল। জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে তোমার কথা বলেনি, তুমি আমাকে কত ভালোবাসো তা কেউ জানায়নি। পৃথিবী বলেছে, তুমি শুধু শাস্তি দাও। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তোমার ব্যাপারে আমার অন্তরে কেবল ভয়ের অনুভূতি ছিল।
সবাই আমাকে শুধু তোমার নিয়ম আর তোমার শাস্তির কথাই বলেছে। কেউ একটিবারও বলেনি, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো!
তবে আমি শুরু থেকেই নিজের অন্তরে কীসের যেন একটা অভাব, কীসের যেন শূন্যতা বোধ করতাম। সব থেকেও মনে হতো, এখনো সবচাইতে বড় সুখটাই পাওয়া হয়নি। কিন্তু কেউ আমাকে একবারও বলেনি, সেই অপূর্ণ হয়ে থাকা সুখটা আমার রব। সেই পূর্ণতা হলে তুমি, ইয়া আল্লাহ!
তোমার অপূর্ণতা পূর্ণ করতে আমি কত কিনা করেছি! এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে আমার পা পড়েনি। ভালো-মন্দ, হালাল-হারামের কোনো তোয়াক্কা না করেই আমি কেবল সেই অপূর্ণতা পূর্ণ করতে গিয়েছিলাম। মূর্খের মতো জাগতিক অপবিত্রতায় মহাপবিত্র সত্তার পূর্ণতা খুঁজতে গিয়েছিলাম।
সবাই আমাকে ইসলামের কথা বলেছে, জান্নাতের সুখের কথা বলেছে, কেউ সমস্ত ইসলামকেই বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেউ আমাকে বলেনি যে, তুমিই আমার প্রকৃত সুখ! তোমাকে ভালোবাসলেই বাকি সবকিছু তুমি দিয়ে দাও। সবাই শুধু তোমার আনুগত্যের কথা বলেছে, তোমার পথ অনুসরণ করতে বলেছে; কেউ তোমাকে ভালোবাসতে বলেনি!
তাই তো আমি তোমার কিছু নিয়ম মানলেও পৃথিবীকে নিজের ভালোবাসা বানিয়ে রেখেছিলাম। পৃথিবী আর পৃথিবীর মানুষকে ভালোবেসেও আমার সমস্ত সত্তাই অপূর্ণ।
আমি ক্লান্ত, শ্রান্ত, পরিশ্রান্ত। নিজের প্রতিও আর কোনো ইচ্ছা নেই। সব আশা হারিয়ে ফেলেছি। এই নরকের যন্ত্রণা সইতে পারছি না ইয়া রব!
পাপে পূর্ণ এই পাথর হওয়া অন্তরটা এখন বেশ ভারী মনে হচ্ছে। এর ওজন বইতে গিয়ে আমি যেন মাটিতে মিশে যাচ্ছি! আমার এই সত্তা বাইরের পৃথিবীতে হাঁটাচলা করলেও তুমি তো জানো, ভেতরে ভেতরে আমি মরে গেছি!
ইয়া আল্লাহ! এবার আমাকে ফিরিয়ে নাও। এই যে দেখো, নিজের সবকিছু ছেড়ে এসেছি। না আছে আর কোনো ভালোবাসা, না কোনো আসক্তি, না অবাধ্য হওয়ার কোনো ইচ্ছা। আজ আমি পুরোটাই শূন্য, নিঃস্ব, অসহায়। তোমার ভালোবাসা রাখব বলে ভেতর থেকে সব অপবিত্রতা মুছে ফেলেছি।
কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ তোমাকে ডাকার মতো বিশ্বাসও আমার অবশিষ্ট নেই। আমার সমস্ত সত্তা সদ্যোজাত শিশুর মতোই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এবার নিজেকে তোমার সামনে রেখে দিলাম। তুমি তোমার সৃষ্টির সাথে যা ইচ্ছা করো।
এই অসহায়ের প্রতি একটু করুণা করো, এই দুর্বলকে একটু সাহায্য করো, এই পথহারাকে একটু পথ দেখিয়ে দাও! ইয়া রব্বাল আলামিন!
আমি তোমার কাছে ফিরে আসতে চাই, তোমাকেই ভালোবাসতে চাই আর পুরোটাই শুধু তোমার হয়ে যেতে চাই। একান্ত তোমার। তোমার অনুগত গোলামেরা যেভাবে তোমাকে ভালোবাসে, আমিও সেভাবেই তোমাকে ভালোবাসতে চাই। তুমি যেভাবে বলবে, সেভাবেই এই হাত-পা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহার করতে চাই। তোমার রাসুলের আদর্শকে জীবনের উদ্দেশ্য বানাতে চাই।
ইয়া রব! আমার অন্তর থেকে এই পাপের বোঝাগুলো নামিয়ে দাও! আমার পায়ের দুনিয়ার শেকলটা তুমি ভেঙে দাও! আমাকে দুনিয়া থেকে মুক্ত করো! আমার ভেতরের প্রবৃত্তির প্রাসাদ তুমি ভেঙে দাও! আমাকে আমার থেকে রক্ষা করো, ইয়া আল্লাহ!
ইয়া রব! তুমি যদি আমাকে নিজের কাছে টেনে নাও, আর কে আছে তোমার বান্দাকে তোমার থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে?
আমি নিজেকে তোমার কাছে সমর্পণ করে দিলাম। এরপর আমি নিজেকেও আর বিশ্বাস করব না। তুমি আমার জন্য যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমি তাতেই সন্তুষ্ট থাকব। আমাকে এই আঁধারে আর ফেলে রেখো না! আমাকে আলোর দিকে নিয়ে যাও!
ইয়া রব! আজ হয় তুমি আমাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নাও, নতুবা মাটির সাথে মিশিয়ে দাও। নিজ থেকে তোমার দিকে ফিরে যাওয়ার শক্তি আমার নেই। যেটুকু বিশ্বাস বাকি আছে, তা দিয়ে তোমার ঘরে আসা-যাওয়া করছি মাত্র। বাইরে বের হলেই আবারও তোমাকে ভুলে যাই, দুনিয়ায় ডুবে যাই।
ইয়া রব! আমাকে সৃষ্টি করার পর থেকে আজ পর্যন্ত যেভাবে নিজের কাছে আগলে রেখেছিলে, এই দুনিয়ার নোংরা পরিবেশেও আগলে রাখো। না হয় যেটুকু পাপ জমিয়েছি, তা থেকে পবিত্র করে আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। আমি তোমার অবাধ্যতায় এই পৃথিবীর বুকে আর একটা নিঃশ্বাসও ফেলতে চাই না!
তুমি ছাড়া আজ আমার কোনো সাহায্যকারী নেই। আমার অন্তরে যদি এক ফোঁটা পবিত্রতা অবশিষ্ট থাকে, তবে আমাকে বাকিটুকু পবিত্র করার শক্তি দাও।
এই মূর্খের এর চাইতে বেশি বলতে পারার ক্ষমতা নেই। ইয়া আল্লাহ! আমাকে তুমি মাফ করে দাও। আমিন।'
এভাবে আর যা কিছু তোমার ভেতরে জমে আছে, বলে দাও। শব্দ সাজাতে না পারো, অনুশোচনার অশ্রু তো ঝরাও। তোমার রবকে বুঝিয়ে দাও, তাঁকে ছাড়া তুমি ভালো নেই। ভেতরের সব মায়া একত্র করে তাঁর রহমতের চাদর বিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করো। চাওয়ার মতো করে চাও, তিনি অবশ্যই তোমাকে দেবেন।
উত্তপ্ত রৌদ্রে মা যেভাবে তার সন্তানকে নিজ আঁচলের নিচে লুকিয়ে রাখেন, তোমাকেও এই পৃথিবীর সকল ফিতনা আর যন্ত্রণার উত্তাপ থেকে তিনি আড়াল করে রাখবেন। সবার মাঝে থেকেও তুমি থাকবে না। যন্ত্রণার মাঝে চলাফেরা করেও কোনো যন্ত্রণা তোমাকে ছুঁয়ে দিতে পারবে না।
এই যে 'রব' বলে এত আকুতি কেন, জানো? এর পেছনে একটা কারণ আছে। চলো, আগে তোমাকে শব্দটার সাথে একটু পরিচয় করিয়ে দিই।
'রব' শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো, প্রতিপালক। আর প্রতিপালক শব্দটি বুঝতে হলে পিতামাতার প্রতিপালন বুঝতে হবে।
একটা সন্তান জন্মের পর থেকে তাকে উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানো পর্যন্ত পিতামাতার সকল প্রচেষ্টা, ত্যাগ, শিক্ষাদান, প্রয়োজনীয়তা পূরণ, কষ্ট সহ্য করা-সব মিলিয়েই সন্তানের প্রতিপালন।
তোমাকে মায়ের গর্ভে প্রেরণ করে সেখানে তোমার শরীরের অস্তিত্ব দান, তোমার রিজিকের ব্যবস্থা করা, পৃথিবীর সবটাই তোমার জন্য সজ্জিত করা, তোমার শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা, পিতামাতার মাধ্যমে তোমার লালনপালন, তোমার চাহিদা পূরণের জন্য স্ত্রী দান, তোমাকে আরও সুখী করতে সন্তানের নিয়ামত দান, মৃত্যু, কবর, আখিরাত-এভাবে জান্নাত পর্যন্ত তোমার সত্তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি বিষয় যথাযথ সময়ে, যথাযথ নিয়মে প্রদান করা এক অসীম দয়াবান সত্তা হলেন প্রতিপালক। আর তিনিই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
তাহলে একবার 'রব' বলে তুমি তোমার সমস্ত নিয়ামতের স্বীকৃতি দিচ্ছ, এবং বুঝিয়ে দিচ্ছ, আল্লাহ তাআলাই তোমার সৃষ্টিকর্তা এবং তোমার প্রতিপালক।
এই 'রব' শব্দটার মাঝে এক গভীর মায়া আর মমতা লুকিয়ে রয়েছে। প্রচণ্ড ভালোবাসা দিয়ে ঠিকমতো একবার ডাকতে পারলে তুমি এর মাঝেই নিজেকে হারিয়ে ফেলবে।
তুমি যদি ঠিকমতো শব্দ সাজিয়ে প্রার্থনা করতে না পারো, হাত তুলে তাকে ডাকতেও যদি তোমার ইতস্তত বোধ হয়, তবে তোমার জন্য কেবল এই 'রব' বলাই যথেষ্ট।
'মা' বলে ডাকলেই মা যেমন বুঝে যান তোমার কি প্রয়োজন, তোমার রবকে 'রব' বলে ডেকে দেখো, তিনি শুধু প্রয়োজন জেনেই বসে থাকবেন না, সেই প্রয়োজন পূরণও করে দেবেন।
সদ্য 'মা' বলতে শেখা কোনো শিশুর সমস্ত কথাই হয়-মা। আর কিছু উচ্চারণের শক্তি তার নেই। কিছু প্রয়োজন হোক বা না হোক, সে শুধু মা মা বলতে থাকে।
তার ডাকের স্বর শুনে মা বুঝে যান সে খাবার চায়, ঘুমাতে চায়, না কি খেলতে খেলতে এমনিতেই রাগ করে মা মা ডেকে যাচ্ছে। একটা শিশুর সবকিছুই তার মায়ের ওপর নির্ভরশীল। মা তার ডাকে সাড়া না দিলে, তার প্রয়োজন পূরণ না করলে, সে পুরোপুরি অসহায়। এজন্য মাঝে মাঝে আধঘণ্টা ধরে বাবার কোলে কাঁদার পরেও মা তার কান্না শুনে বুঝে ফেলেন, খাবার নয়, তার ঘুম প্রয়োজন।
আমাদের জন্য আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'ইয়া রব' ডাকটাও সেই ছোট্ট শিশুর মতোই। তুমি হয়তো দুআ করতে জানো না, কীভাবে ক্ষমা চাইতে হয় সেটাও এখনো শেখা হয়নি; কিন্তু তাই বলে কি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ছেড়ে দেবে?
কক্ষনো নয়। বরং তুমি সেই শব্দ উচ্চারণ করতে না-পারা অবুঝ শিশুর 'মা মা' ডাকের মতোই 'ইয়া রব, ইয়া রব' বলে ডাকতে থাকো। কতক্ষণ?
যতক্ষণ তোমার সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস না হয় যে, তুমি আল্লাহর কাছে পুরোপুরি নির্ভরশীল, তিনি ব্যতীত আর কেউই তোমাকে সাহায্য করতে পারেন না।
আরেকটা বিষয় দেখো, মা কিন্তু শিশুর কান্না বা শব্দের মাধ্যমেই তার ভাষা বোঝেন। শব্দ না করলে স্বাভাবিকভাবে মা-ও সন্তানের প্রয়োজন বোঝেন না। কিন্তু তুমি এমন এক সত্তার সামনে হাত পেতেছ, যিনি শব্দ ছাড়াও অনুভূতির ভাষা বোঝেন। অনুভূতিও না থাকলে, তুমি কী চাইতে পারো বা তোমার কী প্রয়োজন হতে পারে, সেটাও তিনি জানেন। আর তার সমাধান করতেও সক্ষম।
সুতরাং আর কী তোমাকে তোমার এত করুণাময়, এত মহান রব থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে?
📄 সালাতের প্রতি গুরুত্ব
তুমি যদি এমন পরিবেশে বাস করো যেখানে প্রকৃত দীনদার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, বা এমন কোথাও থাকো, যেখানে নেককারদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ নেই। তোমার পূর্ববর্তী চরিত্রের কারণে হয়তো নেককার কেউ তোমার সাথে মিশতে চাচ্ছে না। তারা হয়তো তোমার পরিবর্তনকে এখনো লোকদেখানো মনে করছে। তোমার হয়তো পড়াশোনার চাপ বেশি, এ কারণে দীনের সাথে পরিপূর্ণ সম্পৃক্ত থাকাও তোমার পক্ষে হয়ে ওঠে না।
মূলকথা, জাগতিক জীবনের ব্যস্ততা বা নানান অপারগতার কারণে তুমি যদি দীনের প্রতি পুরোপুরি আসতে না পারো, তোমার জন্য দীন অনুসরণের একমাত্র পথ-সালাত।
সালাতের উপকারিতা বা গুরুত্ব আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি। এখানে কেবল তোমার জীবনে সালাতকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছাকে দৃঢ়তা দিতে চাই।
আমি এমন অনেক যুবকের কথা জানি, আজ যাদের ইমান দেখলে ঈর্ষা হয়। তাদের প্রত্যাবর্তনের শুরুতে কেউ ছিল না, কিচ্ছু ছিল না, দীনের কিছুই তারা জানত না। সালাতের ক্ষেত্রেও কুরআনের হাতে-গোনা কয়েকটা সুরা জানত। কিন্তু এরপর তারা ভাবল, যেহেতু সালাত ব্যতীত দীনের আর কিছুই করতে পারছি না, তাই সালাতকেই আরও সুন্দর করে তুলি। সব নিয়মনীতি যথাযথভাবে আদায় করে আরও সুন্দরভাবে রবের ইবাদত করি।
এভাবে আল্লাহর ইবাদতের অধিক গুরুত্বের কারণে কী হলো জানো?
ধীরে ধীরে তাদের ইমান, আমল এবং দীনের সাথে সম্পৃক্তি বেড়ে গেল এবং একটা সময়ে ইমানের সকল দুর্বলতা কাটিয়ে তারা আল্লাহর নৈকট্যলাভে সক্ষম হলো।
শুধু 'সালাত' দীনের বাকি অংশের সাথে তাদের জুড়ে দিয়েছে। আজ তারা প্রজ্ঞাবান আলিমদের ছায়াতলে উত্তম আদর্শ ধারণ করে বেশ স্বস্তিতে পৃথিবীতে বাস করছে।
তাদের এই সুউচ্চ ইমানের স্তরে পৌঁছানোর প্রথম ধাপ ছিল-সালাত। শুধু ওঠাবসা আর মাটিতে মাথা রাখা নয়; বরং তারা স্রষ্টার প্রকৃত ইবাদত করতে চেয়েছিল। যে সিজদা আরশে পৌঁছে যায়, তারা সেই সিজদার জন্য অনবরত চেষ্টা করেছিল। আর তাদের রব সন্তুষ্ট হয়ে তাদের নিজের নৈকট্য দান করেছে।
সুতরাং তুমি আজ বা এখন দীনের আর কিছু নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারো বা না পারো, সালাতটুকু গুরুত্বের সাথে আদায় করো। সালাত সুন্দর করো। সালাতের প্রতি মনোযোগী হও। সালাতকে সময় দাও। সালাতের মাধ্যমে বিচার দিবসের পূর্বেই আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যাও। তখন তিনি কাহহার হলেও আজকে কিন্তু তিনি রহমান। অনুগ্রহ কুড়ানোর এই সুযোগ কিছুতেই নিষ্ফল হতে দিয়ো না।
📄 আলিমের প্রয়োজনীয়তা
একটা বিষয় মাথায় গেঁথে নাও। দীনপালন বা দীন গ্রহণের ক্ষেত্রে আলিমের সাহচর্য অপরিহার্য।
ইসলাম এমন এক দীন, যা দেড় হাজার বছর পরেও পৃথিবীতে তার পূর্বের অবস্থাতেই আছে। এর মধ্যে একটুও কমবেশ হয়নি। সেই সুযোগ রাখাও হয়নি। তুমি আজকে একজন প্রকৃত নেককার আলিমের মাঝে যে ইসলাম দেখবে, সেটাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নাজিল হয়েছিল।
কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, ইসলামের এই চির নবীন হওয়ার রহস্য কী? আসলে এটা কোনো রহস্যই না। এর মূলে রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরক্ষার একটি শেকল, যা যুগ যুগ ধরে পরস্পর সংযুক্তির মাধ্যমে এখনও মূল কেন্দ্রের সাথে যুক্ত রয়েছে।
ধরো, তোমার থেকে আমি কোনো কলম নিলাম। সেটা আমি আরেকজনকে দিলাম। সে আরেকজনকে দিলো। সে আবার আরেকজনকে দিলো। এভাবে কলম কিন্তু একটাই থাকছে। তবে তার অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে।
যুগের পালাবর্তনে যদি অন্য কেউ একই কলম তৈরি করে, বা আরও উন্নত কালিসমৃদ্ধ কলম নিয়ে আসে, তা যতই দামি আর উত্তম হোক না কেন, তোমার কলম বলে বিবেচিত হবে না। কেননা তুমি আমাকে একটিই কলম দিয়েছিলে। আমার মাধ্যমে যে কলমটি কেউ পেয়েছে, সেটিই তোমার।
তাই অন্য একটি কলম দেখিয়ে কেউ যেমন তোমার কলম বলতে পারবে না, আজকে কোনো মুসলমানও ইচ্ছামতো মিশ্রিত কিছু অনুসরণ করে তাকে ইসলাম বললেও তা ইসলাম হিসাবে গণ্য হবে না। কেউ যদি তোমার কলমটিই পেতে চায়, তাকে তোমার পরে আমার এবং আমার পরে আরেকজন, এভাবে আমাদের মাধ্যমে এক এক করে পৌঁছে যাওয়া ব্যক্তির খোঁজ করতে হবে।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নাজিল হওয়া ইসলাম তাঁর সাহাবাদের কাছে, তারপর তাবেয়ি এবং তাবে তাবেয়ি, এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মাধ্যমে অপরিবর্তনীয় অবস্থায় আজকের সময়ে এসে পৌঁছেছে।
তুমি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নাজিল হওয়া প্রকৃত ইসলাম অনুসরণ করতে চাও, তবে সেটা কেবল তাদের কাছে পাবে, যারা ক্রমান্বয়ে তা বহন করে এই যুগ পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন, এবং এখনও বহন করে যাচ্ছেন। আজকের সময়ের সেই রাহবার বা ইসলামের ধারক-বাহক হলেন— হক্কানি আলিমগণ।
এবার আরেকটা উদাহরণ লক্ষ করো।
তোমার যদি চাল প্রয়োজন হয়, তুমি কোথায় যাবে? অবশ্যই চালের দোকানে। তোমার যদি মাংস প্রয়োজন হয়, তুমি মাংসের দোকানেই যাবে। তোমার শিক্ষা প্রয়োজন হলে তুমি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। তোমার কাপড় দরকার হলে তুমি কাপড়ের দোকানেই যাবে।
বোঝা গেল, পৃথিবীর প্রতিটা বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট একটা স্থান রয়েছে। তুমি চালের জন্য কখনোই কাপড়ের দোকানে যাবে না, কাপড়ের জন্য স্কুলে যাবে না, তাহলে ইসলাম পেতে হলে কোথায় যেতে হবে, বুঝেছ তো?
কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল রেখো। তুমি উন্নত শিক্ষা চাইলে কিন্তু যেনতেন কোনো স্কুলে যাবে না, ভ্যানগাড়ি থেকে দামি কিছু কিনবে না, সব দোকান থেকে কাপড় নেবে না। কেননা প্রত্যেক বিষয়ের ক্ষেত্রে তার অবস্থা, গুণমান, কার্যকারিতাও দেখে নেওয়া জরুরি।
এই পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার শ্রেষ্ঠ জীবনপদ্ধতি হলো, ইসলাম। সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে একমাত্র পদ্ধতি। আর এর ওপরেই তোমার আখিরাত নির্ভর করছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে প্রকৃত দীন খুঁজে পাওয়া মুশকিল। রাস্তার ভ্যানওয়ালার মতোই এখন সবাই দীন ফেরি করছে। সবাই আজকে দীনদার। এক্ষেত্রে কারও সম্পর্কে পুরোটা না জেনেই তার থেকে দীন গ্রহণ করাটা বোকামি হবে।
হ্যাঁ, কেউ তোমাকে তার কথা বা লেখার দ্বারা দীনের প্রতি আকৃষ্ট করতেই পারে। তবুও বাইরের চাকচিক্য দেখে কোনো রকম গ্যারান্টি ছাড়াই তুমি যেমন ভ্যানওয়ালা থেকে দামি পণ্য ক্রয় করবে না, তেমনই অজানা অচেনা কারও থেকে, জনপ্রিয়তা দেখে, ইউটিউব দেখে, বা অনলাইন কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হয়ে কারও থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিষয় গ্রহণ করা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আজকের সময়ে ফিতনা তার সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছে। একই কোম্পানির প্যাকেট ব্যবহার করে ভেজাল ওষুধ বিক্রির মতোই আজকে অনেকে দীনের আবরণে ভিন্ন কিছু বিতরণের চেষ্টা করছে। অনেকে প্রকৃত দীন ধারণ করেও তার মাঝে নিজ প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা যুক্ত করে এক মিশ্রিত ইসলাম তুলে ধরতে চাচ্ছে। তাই দীন শেখার ক্ষেত্রে সতর্ক থেকো।
এজন্য সর্বাবস্থায় দীনের জন্য প্রজ্ঞাবান আলিমের সাহচর্য অপরিহার্য। মোবাইলে ফেসবুক আর ইউটিউব দেখে জ্ঞান অর্জিত হলেও দীন অর্জিত হয় না। প্রকৃত দীনের জন্য অবশ্যই একজন নেক প্রজ্ঞাবান আলিমের সংস্পর্শ অপরিহার্য। কোনো সাধারণ মানুষ নয়, নেককার কেউ নয়—আলিম, মাথায় রেখো।
তাদের কোথায় পাবে? খুঁজতে হবে, আল্লাহর থেকে তাদের সংস্পর্শ চাইতে হবে। যেভাবেই হোক তাদের সান্নিধ্য অর্জন করতেই হবে। কারণ বই বা ইউটিউব তোমাকে শুধু জ্ঞান শেখাবে; তার প্রয়োগ নয়।
শুধু বই মানুষকে সঠিক পথে চালিত করতে যথেষ্ট হলে মহান আল্লাহ তাআলাও কুরআনকে পাহাড়ের ওপর নাজিল করতে পারতেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠানোর মাধ্যমে তিনি কুরআনের বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ মানুষের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
তুমি দীনের জ্ঞান শিখলে, কিন্তু কখন কোথায় কীভাবে তা প্রয়োগ করতে হয়, তা যদি না জানো, তবে দীনের জ্ঞানই তোমাকে ধ্বংস করে দিতে পারে!
আর তুমি যদি আলিম ছাড়া দীনের জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা অর্জন করেও ফেলো, তবে নবুয়তের কেন্দ্র থেকে চলমান ধারার সাহচর্যের বিশেষ নুর থেকে বঞ্চিত থাকবে। আলিমদের মাঝে যে নববি সৌরভ রয়েছে, তা কখনো গায়ে মাখতে পারবে না। দীনের গভীরতা অর্জন করতে পারবে না।
আলিমদের উদাহরণ ঠিক বৈদ্যুতিক বাতির ন্যায়, দেয়ালের এক কোণ থেকে যা সমস্ত ঘরে আলো ছড়িয়ে দেয়। তবে বাতির কাছাকাছি থাকলে চেহারা যেমন বেশি উজ্জ্বল দেখা যায়, আলিমের কাছাকাছি থাকলেও তোমার অন্তরে তার কলবের নুরের প্রভাব পড়বে ইনশাআল্লাহ। তাই আপাতত তোমার শহরের বড় কোনো নেককার আলিমের খোঁজ করো, তারপর প্রতি জুমায় খুব কাছ থেকে তার আলোচনা শুনতে যাও।
আর বর্তমান ফিতনার সময়ে দীনের ওপর অবিচল থাকার একটা মূলনীতিও জেনে রাখো। তা হলো, আলিমদের দর্পণে দুনিয়া দেখা। জীবনের প্রতিটা ধাপে ধাপে বিজ্ঞ আলিমদের বুঝের ছায়ায় নিজের চিন্তাকে সীমাবদ্ধ রাখো। এর বাইরে গেলেই ধ্বংস অনিবার্য। বেশি বুঝতে চাওয়া বা অবুঝ হয়ে থাকা—দুটোই এসময়ে ক্ষতিকর।
একজন স্কুল, কলেজ বা ভার্সিটির শিক্ষার্থী তার ডিগ্রির জন্য কত কিছুই-না করে! তুমিও কোনো ভালো শিক্ষকের কাছে পদার্থ রসায়ন পড়তে শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হাজার হাজার টাকা খরচ করে ছুটে যাও।
আর দীনের জন্য, নিজের অসীম আখিরাতের জন্য, নিজের প্রকৃত জীবনের জন্য একজন যোগ্য আলিম যদি খুঁজতে না পারো, তাকে সময় দিয়ে দীনটা শিখে নিতে না পারো; তবে এই উদাসীনতা নিয়ে বৃহৎ কিছু আশা করা বোকামি। এরপর নিজে নিজে ইসলাম বুঝতে গিয়ে দীন আর দুনিয়াকে গুলিয়ে ফেলে 'দুনিয়াপ্রেমী দীনদার' হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
তাই কোনো নেককার আলিমের সান্নিধ্যে থাকা, আলিমের সংস্পর্শে থাকা, আলিমের সাথে পরিচয় থাকা তোমার এবং তোমার দীনের জন্য আবশ্যক।