📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 প্রতিবন্ধকতা

📄 প্রতিবন্ধকতা


পৃথিবী পরীক্ষাকেন্দ্র। পরীক্ষা দিয়েই এখানে প্রতিটা ধাপ অতিক্রম করতে হয়। দীনের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা আবশ্যক।

ফিরতে চেয়েছ, ফিরেও আসবে। তবে কিছু প্রতিবন্ধকতা তোমাকে পেরোতেই হবে। বাস্তবতায় জীবনের গতিপথ বদলে ফেলতে চাইলে বাধা আসবেই। সব বাধা পেরিয়ে সামনে এগোতে পারাই সফলতা।

★ দীনের ক্ষেত্রে প্রথমেই যে প্রতিবন্ধকতা সামনে আসে, তা মূলত একটা সামাজিক চিন্তা। যেখানে মনে করা হয়, দীন আর দুনিয়া দুটো আলাদা আলাদা বিষয়।

জন্ম থেকেই সামাজিক শৃঙ্খলে বেড়ে ওঠা একটা মানুষের মস্তিষ্কে কেবল সমাজ ছেয়ে থাকে। ধর্মের চাইতে তাকে সমাজকে অধিক প্রাধান্য দিতে শেখানো হয়। ধর্ম থেকে হাজার মাইল দূরে থাকা এই কাল্পনিক সুখী সমাজের কোনো মানুষ যদি বাস্তবতায় ফিরতে চায়, নিজেকে জানতে চায়, তখন এই কল্পনা তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তাই সকল ঘোর কাটিয়ে কল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে সামাজিকতার সাথে একটা লড়াই প্রয়োজন। লড়াই না করে, 'স্ট্যাটাস কুয়ো' (বিদ্যমান অবস্থা) বজায় রেখে দীনে ফেরা অসম্ভব। অনেক সময় ইচ্ছার দৃঢ়তা না-থাকায়, বাস্তবতা গ্রহণের সৎসাহসের অভাবে একাকী এই যুদ্ধ সামলানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই সবকিছু সহ্য করে, সব ঘোর কাটিয়ে, সব আঁধার পেরিয়ে আলোর দিকে ছুটে আসা আর হয় না। অধিকাংশ মানুষ এই কারণে সব বুঝেশুনেও ইসলামী জীবন বেছে নেয় না, বা কিছুদিন মানার পর ছিটকে পড়ে।

★ দীন হলো প্রকৃত বাস্তবতা। আর সমাজ একটা কাল্পনিক গন্তব্যে চালিত করে। বর্তমানে দুইয়ের দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছেছে।

সমাজের চিন্তা হলো, দীন একটা অন্ধকার জগৎ। আদিমকালের কোনো রীতি। দীন অনুসরণকারীরা জাগতিক কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না। তাদের দলে যারাই যাবে, তাদের জন্য কোনো সুখ নেই।

আর দীন এই নির্বোধগুলোকে সরাসরি পশু বলেছে। দীনের কাছে সমাজের কল্পিত সুখের এই উদ্দেশ্যহীন জীবন পশুর চাইতেও নিকৃষ্ট জীবন।

আর তুমিই বলো, যারা নিজেকেই চেনে না, নিজের জীবনের অর্থই জানে না, তারা আবার মানুষ হয় কী করে? যারা প্রশান্তির পূর্ণতা আর প্রবৃত্তির পরিতৃপ্তির মাঝে পার্থক্য বোঝে না, তারা তোমাকে কোন সুখের সন্ধান দিতে পারবে?

কিন্তু অনেক সাধারণ মুসলমান এই সত্য না-জানার কারণে দীন থেকে দূরে সরে থাকে। সামাজিক চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা সত্যিই সূর্যের আলোর চাইতে দীপ্তিমান দীনকে আঁধারের জগৎ মনে করে সেদিকে পা বাড়ায় না।

★ পৃথিবীর পথ ধরে এগোতে এগোতে অনেকে তার একেবারে গহ্বরে প্রবেশ করে। সময়ের কোনো এক অধ্যায়ে তার বিবেক সত্য নিরূপণে সক্ষম হলেও প্রবৃত্তি এসে তাকে বাধা দেয়। দারিদ্র্যের ভয় দেখায়। সে মনে করে, দীনে ফিরে এলে দুনিয়াকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে।

অথচ এই ধারণা অবাস্তব এবং দীনের সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা একজন মুসলমানের জন্য দুনিয়াই হলো তার আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়ার কাজকর্ম ছেড়ে দেওয়াটা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। দুনিয়ার উত্তম কর্মগুলোই আখিরাতের কল্যাণের মূল পাথেয়।

হ্যাঁ, যা কিছু নিষিদ্ধ, অবৈধ, নিকৃষ্ট তা অবশ্যই ছাড়তে হবে। তা বাদে বৈধভাবে সমস্ত দুনিয়া অর্জনের ক্ষেত্রেও বাধা নেই।

★ কিছু মানুষের অন্তরের অহমিকা তাকে দীনে ফিরে আসতে বাধা দেয়। সে মনে করে, 'দীন কেবল একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা জাতির কর্ম। আমি তো দুনিয়ার মানুষ। দুনিয়া নিয়েই আমার থাকতে হয়। ওসব ধর্মকর্ম করে কি আর পয়সা কামানো যাবে? এত বিধিনিষেধ মেনে কি আর মানুষের জীবন চলে? নিজের শখ-আহ্লাদও একটু পূরণ করতে হয়। মানুষ পৃথিবীতে একবারই আসে। উপভোগের এই সুযোগ হাতছাড়া করাটা মূর্খতা।'

বুক ফুলিয়ে পৃথিবীকে নিজের অস্তিত্ব জানাতে চাওয়া মানুষদের তাই পবিত্রতা লাভ করা আর হয়ে ওঠে না।

★ কিছু মানুষের স্বপ্ন অনেক বড়। আশা-আকাঙ্ক্ষা দিয়ে ঠাসা তার বুকের প্রতিটা কোণ। পৃথিবীর প্রতিটা সুখের সাধ মেটানোর প্রচেষ্টায় উন্মাদপ্রায়। তাই দীনের মাধ্যমে তাকে দুনিয়ার বাস্তবতা জানিয়ে দেওয়া হলে সে পালিয়ে যায়। সে নিজের কল্পনাগুলো হারাতে চায় না। দীনের সত্যতা গ্রহণ করতে সে ভয় পায়। আশার ঘোর ভেঙে তার কল্পনা মিথ্যা হওয়ার আশঙ্কায় আর স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা মেনে নেওয়ার আগেই সে চোখে কাপড় বেঁধে নেয়। কানে তুলো দিয়ে বলে, 'আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।'

ফলে স্বপ্ন আর সত্যের মধ্যকার দূরত্ব ঘোচাতে না পেরে দীনের দিকে তারও আর ফিরে আসা হয় না।

কিন্তু এরপরেও কিছু দুঃসাহসী মানুষ আলোর সন্ধানে বেড়িয়ে পড়ে। সব দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করে, সব অহমিকা মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে, আশা-আকাঙ্ক্ষা আর কল্পনার ঘোর কাটিয়ে, বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তারা সামনে অগ্রসর হয়। চিন্তার ভেলায় নিজ সত্তা থেকে ভ্রমণ শুরু করে সৃষ্টিজগতে বিচরণের পর তার বিবেক সত্যকে স্বীকার করে নেয়। সে সিদ্ধান্ত নেয় স্রষ্টার আনুগত্যের। নিজের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণের সংকল্পে ভেতরের কামনার দরজাতে পাহারাদার দাঁড় করিয়ে রাখে। বাহ্যিক পৃথিবীর ঝড় থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখে জীবনের শেষ পর্যন্ত ইমানের আলো সংরক্ষণ করে।

আমরা এমন কিছু মানুষের জন্যই অপেক্ষা করছি। আমরা এমন দুঃসাহসীদের খুঁজে ফিরছি। আছ কি এমন কেউ?

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ভয়

📄 ভয়


দীন গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক সময় জাগতিক সকল প্রতিবন্ধকতার চাইতেও বড় বাধা হয় পরিবার। অন্তরের সাহসকে তাড়িয়ে দিয়ে বারবার প্রবেশ করে ভয়। একদিকে পরিবার, অন্যদিকে প্রত্যাবর্তন; কী করবে এবার, তাই তো?

শুনে রাখো, আজ যদি পিতামাতার সিদ্ধান্তকে আল্লাহর চাইতে বেশি প্রাধান্য দাও, তবে দুনিয়া হয়তো যেমন-তেমন করে চলে যাবে, ওপারে তোমার জন্য সুখের কোনো অংশ থাকবে না। আর যদি আল্লাহর ইচ্ছাকে পিতামাতার চাইতে বেশি প্রাধান্য দাও, তবে কয়েক দিন, কয়েক মাস বা কয়েক বছর হয়তো তোমাকে একটু সইতে হবে, কিন্তু তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ। আর ওপারে তো অসীমের সুখ আছেই।

তুমি পৃথিবীর ৫০-৬০ বছরের সুখ অসীমের দামে বিক্রি করবে, না কি অসীমের সুখগুলো ৫০ বছরের সুখের আশায় ছেড়ে দেবে, তা তোমার ব্যাপার।

তবে জেনে রাখো, এমন একটা দিন পৃথিবীর বুকে আসবে, যেদিন তোমার এই পিতামাতাও তোমাকে সন্তান বলে স্বীকার করবে না। আর তুমিও তাদের পিতামাতা হিসাবে স্বীকার করতে চাইবে না।

জীবনের অর্ধেকটা তারা পেরিয়ে গেছেন। আর কিছু বছর পর বয়সের ভারে, আর দীনের প্রভাবে সব শাসন বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং তাদের ভয়ে আল্লাহর থেকে অন্তত দূরে থেকো না। এভাবে নিজের আখিরাত ধ্বংস করে দিয়ো না।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পরিবর্তন

📄 পরিবর্তন


প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে পেছনের পাপের অভ্যাস পরিবর্তন করা অপরিহার্য। তোমাকে জীবনের সকল অপবিত্রতা মুছে ফেলতে হবে। কিন্তু এর মানে তোমার নিজস্ব ইচ্ছা, আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্নগুলো পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে হবে, তা নয়। তুমি সবকিছু পরিবর্তনের নিয়ত করে নাও। পরিবর্তন হলো একটার পরিবর্তে আরেকটা গ্রহণ।

তোমার পূর্বের অশ্লীল ইচ্ছাগুলো পবিত্র ইচ্ছা দিয়ে পরিবর্তন করো, তোমার অপবিত্র আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো পবিত্র কামনা বাসনা দিয়ে পরিবর্তন করো, তোমার অবৈধ উপভোগের স্বপ্নগুলোকে বৈধ পন্থার স্বপ্ন দিয়ে সজ্জিত করো। অনুভূতিগুলোও থাকুক, কিন্তু তা প্রকাশ ও প্রয়োগের মাধ্যমটা বৈধ হোক।

এভাবে তোমার ইচ্ছাগুলো পূর্ণ হয়ে যাবে, স্বপ্ন পূরণের স্বাদও নেওয়া যাবে, অনুভূতিগুলোও আর জমে থাকবে না। একদিকে বৈধতার সীমায় থেকে তোমারও সুখ পাওয়া হলো, অন্যদিকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিও পাওয়া হলো। সবদিক থেকেই লাভ। ইসলাম এমনই। বৈধতার সীমায় মানবীয় আবেগ-অনুভূতি চরিতার্থ করাই ইসলাম।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 আত্মা

📄 আত্মা


মানুষের জীবন সর্বদা একই অবস্থায় থাকে না। জীবনের সব মুহূর্ত সুখের হয় না। কিছু সময় তাকে অসীম দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকতে হয়। কিছু সময় একাকী নিঃসঙ্গতায় সময় কাটাতে হয়। তাই সে সর্বদা একটা আস্থার খোঁজ করে, যার ওপর ভরসা করে সে জীবনের সকল চড়াই-উতরাই পেরোতে পারবে।

আর দীন মানুষকে সেই আস্থাটা দেয়। সেই আস্থা হলেন সাত আসমানের অধিপতি মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। যেই আস্থার চাইতে যোগ্য আকাশ-জমিনে অন্য কেউ নেই। যার ইশারায় মুহূর্তেই পৃথিবীর সব নিয়ম বদলে যেতে সক্ষম, যার নিয়ন্ত্রণে তোমার অন্তর, সেই মহান রব্বুল আলামিন যদি কারও আস্থা হয়ে যান, তাহলে আর কার প্রয়োজন হতে পারে? আর কীসের চিন্তা থাকতে পারে?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00