📄 কার গন্তব্য কেমন?
তোমার জীবনে প্রশান্তি থাকা মানে তুমি সীমারেখার ভেতরেই আছ, এখানেই থেকে যাও। আর যদি শূন্যতা থাকে তবে জেনে রাখো, এটাই সীমারেখার লঙ্ঘন। এ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন অপরিহার্য।
শুধু সম্পদের অভাব, সঙ্গীর অভাব, সম্মানের অভাব, বা সুখের অভাবই শূন্যতা নয়; বরং জাগতিক সমস্ত উপভোগের উপকরণ থাকা সত্ত্বেও স্বস্তি না-পাওয়া শূন্যতা।
পৃথিবীতে ফেরাউনের তো সবকিছুই ছিল। তুমি কি তাকেও সুখী বলবে?
ফেরাউনকে সুখী হিসাবে স্বীকৃতি না দিলেও তুমি কিন্তু তার মতোই জাগতিক সুখ অর্জনের জন্য নিজেকে বিসর্জন দিচ্ছ। যে মিথ্যা মরীচিকার পেছনে মরণ পর্যন্ত ছুটে যাচ্ছ, তাকে মরীচিকা হিসাবে মেনে নিতেও তুমি প্রস্তুত নও। কারণ মিথ্যা আলোয় ঝলঝল করা সেই কল্পনার চিত্রকে তুমি ভালোবেসে ফেলেছ। আর মানুষ চাইলেও সহজেই নিজের অন্তর থেকে ভালোবাসা মুছে ফেলতে পারে না।
কার গন্তব্য কেমন?
জেনে রাখো, তুমি যে পথে হাঁটবে, সেই পথের গন্তব্যই তোমাকে গ্রহণ করতে হবে। তুমি যদি নবি-রাসুলগণের পথ বেছে নাও, তবে তোমার সমাপ্তিও তাদের মতোই হবে; তোমার পথের শেষে থাকবে চিরস্থায়ী সুখের জান্নাত। আর যদি তুমি ফেরাউনের পথ বেছে নাও, তবে তোমার সমাপ্তিও তার মতোই ধ্বংসাত্মক হবে; সেই পথের শেষে থাকবে চিরস্থায়ী শান্তির জাহান্নাম।
একজন শায়খের মুখে শুনেছিলাম। তিনি একবার কোনো এক বৃদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ করতে তার বাসায় গিয়েছিলেন। সেই বৃদ্ধ সারাজীবন গান শুনেই কাটিয়েছে। গান-বাদ্যকে সে তার জীবন বানিয়ে নিয়েছিল। এখন তার শেষ মুহূর্ত। মৃত্যুর ফেরেশতা যে-কোনো মুহূর্তে তাকে নিয়ে যেতে আসবে। কিন্ত এমন সময় সে কী করছিল জানো?
সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মিশরীয় সংগীতশিল্পী কুলসুমের গান শুনছিল। শায়খ তার বাসায় প্রবেশ করলে বাড়ির অন্য লোকেরা শায়খের সম্মানার্থে গানটা বন্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে দিলো।
কিন্তু এরপর কী হলো শুনবে? এক লোমহর্ষক চিত্র!
সেই বৃদ্ধ ঘর থেকে চিৎকার করে বলতে লাগল, 'কুরআন বন্ধ করো, আর কুলসুম ছেড়ে দাও। কারণ সে আমার আত্মাকে স্বস্তি দেয়।'
তুমিই বলো, এটা কোন পথ? আর এই পথের গন্তব্য কোথায়?
তোমার হয়তো কারও চাকচিক্যময় জীবন দেখে নিজের উদ্দেশ্য পরিবর্তনের ইচ্ছা করতে পারে। তবে জেনে রাখো, এটা একটা মিথ্যা প্রতিচ্ছবি মাত্র। এই চাকচিক্য মূলত আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তুমি যাদের অবস্থানে পৌঁছতে চাও, যাদের মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখো, আমি তাদের সাথে মিশেছি, তাদের কথা শুনেছি, তাদের সমস্যার সমাধান খুঁজেছি। তারা আলাদা আলাদা করে নিজেদের অবস্থার কথা আমাকে জানিয়েছে। তাদের বাহ্যিক চাকচিক্য কেবল একটা আবরণ মাত্র। নির্দিষ্ট তারিখ শেষ হওয়া কোনো নষ্ট পণ্যের প্যাকেটের মতোই তারা কেবল বাইরের দিক থেকে সুন্দর। কিন্তু ভেতরের অবস্থা সেই পণ্যের মতোই পচা, যার কোনো মূল্য নেই।
কিন্তু আমাদের যুবকেরা এই উচ্চবিত্ত অভ্যাস আর ব্র্যান্ডেড পোশাকে আকৃষ্ট হয়ে নিজের উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে নেয়। নিজের জন্য বাঁচতে চায়। তার অন্তর গাড়ি চায়, বাড়ি চায়, ভালো ক্যারিয়ার চায়, সুন্দরী স্ত্রী চায়। কিন্তু সবকিছু অর্জনের পর আবেগটুকু কেটে গিয়ে যখন বাস্তবতা সামনে আসে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়!
জীবনের পুরোটা সময় নষ্ট করে আফসোসের ঝুলি নিয়ে সে প্রবেশ করে মসজিদে। কিন্তু আফসোস! মাটিতে ঝুঁকে সিজদা করার শক্তিটুকুও আল্লাহ তার থেকে কেড়ে নেন। খুব বেশি বয়স কিন্তু নয়। তবুও মাটিতে ঝুঁকে সিজদা করার অবস্থা তার নেই, যেন মহান রব্বুল আলামিন তাকে আর নিজের কাছাকাছি আসতে দিতে চান না!
আমাদের বোনেরাও এই বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি মোহিত হয়ে পড়েছে। যে কারণে কোনো সদ্য দীনে ফেরা পুরুষ; যে প্রতিনিয়ত নিজেকে শোধরাতে প্রচেষ্টা করছে, সাদাসিধা জীবন চাচ্ছে, দীনের জন্য কাজ করছে, উম্মাহর কল্যাণে সময় ব্যয় করছে—তাকে সে বিবাহ করতে চায় না। কিছু বোন সঠিকটা বুঝলেও আজকের অধিকাংশ নারীরাই নিজেদের জন্য উত্তম পুরুষের চাইতে উচ্চবিত্তশালী পুরুষকে বেছে নেয়। কিন্তু আমার বোন! তুমি কি মনে করো, এ-রকম একটা পুরুষ তোমাকে সুখী রাখতে সক্ষম?
তাহলে শোনো, আমি এরকম এক নারীর ব্যাপারে জানি। পরিচিত সকলেই তার সাথে ঈর্ষা করত।
তুমি যে গাড়ির কথাই বলবে, সেটাই তার কাছে ছিল। শুধু সেলিব্রেটিরা যা পরিধান করে, সেটাই ছিল তার পোশাক। প্রত্যেক সপ্তাহে নতুন জুতা আর হাতব্যাগ পরিবর্তন করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সে যখন আমাকে ফোন দিয়ে বলে, 'তার স্বামী তাকে ধোঁকা দিচ্ছে এবং তা জানা সত্ত্বেও সে কিছুই করতে পারবে না। তার স্বামী নিজের বন্ধুদের সাথে বের হয়ে তিন-চার দিন পরেও ঘরে ফেরে না।' তখন তুমি কী বলবে?
হ্যাঁ, বাইরের দিক থেকে তাদের অবস্থা অনেক সুন্দর আর চমৎকার মনে হবে, কিন্তু ভেতরের দিক থেকে তারা পুরোপুরি শূন্য।
📄 প্রশান্তির গ্যারান্টি
তুমি বলতে পারো, উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে গেলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? আমার দুর্দশা কি ঠিক হবে? যন্ত্রণাগুলো কি কমে যাবে?
হ্যাঁ অবশ্যই! জীবনের সীমারেখা লঙ্ঘনে দুঃখ যেমন নির্ধারিত, তেমনই সঠিক সীমারেখার ভেতরে থাকলে সুখও অপরিহার্য। যার উদাসীনতা দুঃখ এনেছে, তাঁর স্মরণেই রয়েছে প্রশান্তি। যেমন কুরআনে তিনি বলেছেন,
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ.
'জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়।' [১৩৪]
এই আয়াতটি আমার খুব প্রিয়। আয়াতটির দিকে একটু লক্ষ করো। আল্লাহ কিন্তু এখানে বলেননি, 'তাঁর স্মরণে অন্তর সুখী হয়।'
কারণ সুখের অনুভূতি সর্বজনীন। মস্তিষ্কের বিভিন্ন হরমোন, শারীরিক কাম, প্রবৃত্তির পরিতৃপ্তি কিংবা অন্তরের অবৈধ আসক্তির টানও একপ্রকার সুখ।
এই মুহূর্তে যে পুরুষ বা নারী কোনো পাপ করছে, যে ক্লাবে নেশা করছে, যে গান শুনছে, যে জিনা করছে, যে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করছে, তারও শরীর সুখ
অনুভব করছে। কেমন সুখ তা পরের ব্যাপার, সাময়িক সময়ের জন্য হলেও সে কিন্তু সুখী।
তবে এই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কেননা মানুষ তার কোনো চাহিদাকে সারাক্ষণ পূরণ করতে সক্ষম নয়। জাগতিক সুখের নির্দিষ্ট একটা মাত্রা আছে, যার পর মানুষের শরীর বা অন্তর আর গ্রহণ করতে পারে না।
তাই নির্দিষ্ট মাত্রার সুখ শেষ হয়ে গেলেই তার অন্তরে শূন্যতা জাগ্রত হয়। আরও আরও সুখের নেশায় তার সমস্ত সত্তা অস্থির হয়ে ওঠে। আর তা পূরণ না-করার ফলে অন্তর দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অশান্তি ছেয়ে যায় তার সমস্ত সত্তায়। একটু আগেও যে সুখী ছিল, এখন তার সবকিছু বিরক্ত লাগতে শুরু করে।
তাই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেছেন, 'তার স্মরণে অন্তর প্রশান্ত হয়।' আর প্রশান্তি হলো সুখের সর্বোচ্চ স্তর, সর্বোচ্চ পূর্ণতা। তা আল্লাহ তাআলার স্মরণ, তাঁর ইবাদত, তাঁর আনুগত্য, তাঁর দীনের নির্দিষ্ট সীমানা ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
টিকাঃ
[১৩৪] সুরা আর-রাদ ১৩: ২৮।
📄 দ্বীনের GPS
এ যুগের মানুষের জন্য সত্য মিথ্যার পার্থক্য করাটা কঠিন কিছু নয়। সবাই আজ সবকিছু জানে বোঝে। মিথ্যার মতোই সত্যটাও এখন অনেক বেশি সহজলভ্য। চাইলেই যে-কেউ পৃথিবীর গভীর জ্ঞানও অর্জন করতে পারে। তাই হাতের নাগালের সত্যকে গ্রহণ করা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু এরপরেও কিছু মানুষ প্রশ্ন করে, দীনের কি সত্যিই প্রয়োজন আছে?
তোমাকে তোমার ভাষাতেই বলি, দীন হলো তোমার জন্য GPS। আর দীন ছাড়া তুমি একটা Lost Soul বা পথভ্রষ্ট সত্তা।
তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে বর্তমান পৃথিবীতে ফিতনা বা পাপের ক্ষেত্র বেড়ে গেছে বহুগুণ। সবচাইতে বড় ক্ষতির বিষয় হলো, পূর্বের চাইতে এখন মানুষের জন্য নতুন নতুন অনেক ক্যারিয়ার বা জীবন অতিবাহিত করার পথ সৃষ্টি হয়েছে। যেমন: পূর্বে ইউটিউব ছিল না, তাই ইউটিউবারও ছিল না। অথচ বর্তমানে ইউটিউবিং একটা ক্যারিয়ার। পূর্বে গেমিং এতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না, বর্তমানে গেমিং একটা ক্যারিয়ার।
এরপর পূর্বে অশ্লীলতার এত প্রচার প্রসার ছিল না, তাই নারীরা চাইলেও নিজেকে পৃথিবীর সামনে প্রকাশের সুযোগ পেত না, কিন্তু এখন নিজেকে পৃথিবীর সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়াই নতুন জীবন।
অনেক অনেক পথ তৈরি হয়েছে। তাই মানুষগুলোও দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী থেকে নয়; বরং নিজেদের মাঝ থেকে। ঘরে থেকেও তারা যেন থাকছে না, ভালোবেসেও যেন ভালোবাসছে না, স্বামীকে সব দিয়েও নারী নিজেকে দিচ্ছে না, পুরুষেরা সব দায়িত্ব পূরণ করেও যেন কিছুই করছে না, শিশুরা বেড়ে উঠেও ঠিকমতো গড়ে উঠছে না, সমাজে সুখী হওয়ার নানান প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কেউই আজ সুখ খুঁজে পাচ্ছে না। আর এর কারণ হলো—সঠিক পথে না-চলা, সঠিক দিকে না-যাওয়া, সঠিক কর্ম না-করা।
তুমি যদি হারিয়ে গিয়ে থাকো, মোবাইলের লোকেশন অন করার মতোই দীনের সাথে নিজেকে যুক্ত করে তোমার দাসত্বের মুডটা অন করে নাও।
তাহলে মোবাইলের ম্যাপ যেমন পৃথিবীর যে-কোনো স্থান থেকে তোমাকে ঘরে ফিরে আসতে সাহায্য করে, দীনও তোমাকে সকল পথের মধ্য হতে সঠিক পথ বেছে নিয়ে সুখের দিকে নিয়ে যাবে, তোমাকে তোমার প্রকৃত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাবে। এর শেষ হলো জান্নাতে।
তবে তুমি সঠিক পথে যেতে ম্যাপের নির্দেশনার যেভাবে অন্ধ অনুসরণ করো, সেভাবেই দীনের ক্ষেত্রেও অন্ধ হয়ে যাও। দীন যা বলবে, যেদিকে বলবে, যেভাবে বলবে, সেদিকেই চলতে থাকো—তাহলে সহজেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। বেশি ভাবতে গেলে মূল পথ থেকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
📄 জীবনের অঙ্ক
আমার প্রিয় ভাই-বোনেরা! এটা কেমন জীবন, যেখানে থাকতে চাওয়ার আগেই ফিরিয়ে নেওয়া হয়? এটা কেমন সুখ, যা অনুভবের আগেই অন্তরের অনুভবশক্তি কেড়ে নেওয়া হয়?
একটা মানুষের জন্য ৫০-৬০ বা ৭০ বছরের জীবন কি খুব বেশি সময়?
একবার পঞ্চাশোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের সাথে কথা হচ্ছিল। সেদিন তার সবচাইতে ছোট ছেলেটাও কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছে।
তাকে বললাম, 'কেমন অনুভব করছেন?'
বললেন, 'আমি যেন কোন ঘোরের মধ্যে আছি।' বললাম, 'কীসের ঘোর?'
তিনি বললেন, 'এই তো সেদিন ছেলেটার জন্ম হলো। আজ এত বড় হয়ে গেল যে, তাকেও কেউ বাবা ডাকবে। অথচ আমার কাছে তার জন্মটাই তো কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মনে হচ্ছে।'
এটাই পৃথিবী। ক্ষণিকের এই মরীচিকা ছুঁয়ে দেখার কত স্বপ্ন, আর আশা- আকাঙ্ক্ষা আমাদের অন্তরে। কিন্তু আমরা কেন বুঝতে পারি না, মরীচিকা ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছাটাও আরেকটা মরীচিকা?
অর্থাৎ না কেউ তার ইচ্ছাটা কখনো ধরতে পারে, আর না সেই ইচ্ছার ডানায় ভর করে পৃথিবী নামক মরীচিকা ছোঁয়া হয়।
যাই হোক! এবার আমাদের জীবনের হিসাবটা একটু মেলাই চলো। বাস্তবতার আতশকাচে দেখে আসি, প্রকৃত অর্থেই জীবন আসলে কতটুকু? পৃথিবী ছোঁয়ার সময়টুকু ঠিক কতক্ষণ!
সরকারি হিসাবমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের একজন মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছর। তুমি যদি এই পুরোটা সময় বেঁচেও থাকো, তবে তুমি নিজের জন্য কতটুকু সময় পাবে জানো?
স্বাভাবিকভাবে একজন পুরুষের সাবালক হয়ে উঠতে সময় লাগে ১৫ বছর। যদিও আজকের বাচ্চারা জন্মের পর থেকেই সাবালক। ৬-৭ বছরের শিশুটাও যেন পৃথিবীর সব বোঝে। তবে এসব কেবলই পরিবেশের অবস্থা, অতিরিক্ত তথ্য গ্রহণ, আর শিক্ষার সহজলভ্যতার প্রভাব। এটা কখনোই বড় হওয়া নয়। ইসলামে ১৫ বছর বয়সের পর থেকেই হিসাবের খাতায় জীবনের অঙ্ক লেখা শুরু হয়।
এই বেড়ে ওঠার সময়ে বাস্তবতার পৃথিবী এবং এর সুখ সম্পর্কে তুমি পুরোপুরি অজ্ঞ থাকো। চাইলেও তোমার কাছে পৃথিবীর সবকিছু গ্রহণ করার সামর্থ্য থাকে না। তোমার কোনো ইচ্ছাকেও এই সময়ে প্রাধান্য দেওয়া হয় না।
অপরদিকে স্বাভাবিক মানুষের বয়সের শেষ অংশে অর্থাৎ ৩৫ বছরের পর থেকে ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে যৌন সক্ষমতা। ৪০ বছরে একজন মানুষ পৃথিবীর বাস্তবতা পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হয়। এরপর সে বাস্তব বোধসম্পন্ন হয়ে ওঠে। বয়সের সাথে সাথে তার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, রুচি, কামনা, বাসনা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এরপর ৫০ বছরের পর থেকে একটা মানুষের জাগতিক চাহিদা পূরণের ইচ্ছাগুলো অন্তর থেকে হারিয়ে যেতে থাকে, শরীরে বার্ধক্যজনিত নানান সমস্যা দেখা দেয়, সন্তানেরা নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, স্ত্রীর সৌন্দর্য মলিন হয়ে যায়, অর্থ-সম্পদ থাকলেও তা ব্যয় করার আগ্রহ থাকে না।
সুতরাং প্রথম ১৫ বছর (+) শেষের ২৩ বছর= ৩৮ বছর। পৃথিবীতে থেকেও এই ৩৮ বছর পৃথিবীর সুখ গ্রহণের অধিকার বা মানসিকতা তোমার থাকে না বা পৃথিবীর প্রতি তোমার আগ্রহ হারিয়ে যায়।
বাকি থাকে, ৭৩ বছর (-) ৩৮ বছর = ৩৫ বছর। তুমি তো ৭৩ বছরের জীবন ভেবেছিলে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এই ৩৫ বছর হলো তোমার মোটামুটি একটা জীবন। তুমি যদি চাও, আরও কিছু বছর বাড়াতেও পারো। ধরলাম ৪০ বছর তোমার পৃথিবী উপভোগের জন্য সুস্থতা এবং পূর্ণ সক্ষমতা থাকল। তবুও তুমি কি পৃথিবী থেকে খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারবে?
সবার কথা বাদ দাও। তোমার নিজের কথা ভাবো। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী ১৭ বছর বয়সে তুমি কেবল দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। এ সময় পৃথিবী কতটুকু তোমার হবে?
এরপর ২৪-২৫ বছর বয়স লাগে এই দেশের মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করতে। স্বাভাবিক একটা নিয়মে তোমার পড়াশোনা শেষ। কিন্তু এ মুহূর্তে তোমার কাছে পৃথিবী উপভোগের কতটুকু সামর্থ্য থাকবে?
দেশের বেকারত্বের হার কত জানো তো? 'বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যায়, স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশ, অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশই বেকার। ওই প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি পায় এবং মাত্র ৩ শতাংশ স্ব উদ্যোগে কিছু করছে। দুই বছর আগেও বিশ্বব্যাংক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর জরিপ করেছিল। তাতেও দেখা গেছে, স্নাতক পাশ করা শিক্ষার্থীদের ৪৬ শতাংশ বেকার, যারা তিন বছর ধরে চাকরি খুঁজছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই বেকারের হার বেশি, যেখানে ৪৭ শতাংশ শিক্ষিতই বেকার। অন্যদিকে দেশে প্রতিবছর শ্রমশক্তিতে যোগ হচ্ছে ২০ লাখ মানুষ। কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ফলে বড় একটি অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে।'
তাহলে তোমার অবস্থা কেমন হবে?
এ অবস্থায় অনেকে ছোটখাট চাকুরি করে। তবে তা কেবল ইন্টার্নশিপ, স্থায়ী নয়। এ ছাড়া ছাত্রজীবন থেকেই অনেকে ৫/৬/৭/৮ হাজার টাকার চাকুরি করতে থাকে।
ধরলাম, মাস্টার্স শেষ করে তোমার চাকুরির বেতন হলো ১৫-২০ হাজার টাকা। তবে বাড়িভাড়া, যাতায়াত, পরিবারে পাঠানোসহ যাবতীয় খরচ হিসাব করে আর কতটুকুই-বা তোমার নিজের জন্য অবশিষ্ট থাকবে, যা দিয়ে তুমি দুনিয়াকে পুরোপুরি উপভোগ করতে পারবে?
এভাবে কিছু সময় চলার পর তোমার বয়স হবে ২৭-২৮। এরপর পরিবার থেকে তোমার বিবাহ দেওয়া হবে। তুমি এখন আর একা নও; বরং একজন দায়িত্বশীল পুরুষ। তোমার মাসিক আয় এখন ধরলাম ২৫-৩০ বা ৩৫ হাজার। এর কম বা বেশিও হতে পারে। তবুও ৩০ হাজারের বেতন দিয়ে তোমার থেকে ৫০ হাজারের কাজ করিয়ে নেওয়া হবে।
এই সময় তোমার কাছে একটু বেশি অর্থ থাকলেও নিজের জন্য বা বন্ধুদের দেওয়ার মতো সময় নেই। শখ পূরণের সুযোগ নেই। ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা নেই। কেননা তোমার কাঁধে হাজারো দায়িত্ব। এরপর ক্রমান্বয়ে সন্তান, সন্তানের ব্যয়, পিতামাতার ওষুধ, সংসারের বাজার, অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়ে জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। সব মিলিয়ে তুমি প্রচণ্ড রকম ব্যস্ত।
এভাবেই ব্যস্ততা, দায়িত্ব, উপার্জন, চিন্তা, সুখ সব মিলিয়ে তুমি পঞ্চাশের দিকে ধাবিত হতে থাকো।
কিন্তু এখানে তোমার নিজের জীবন কোথায়? কোথায় তোমার বেঁচে থাকা? তোমার 'তুমি' হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলো কোথায়?
হ্যাঁ, কেবল স্কুলজীবন, কলেজজীবন, বা ইউনিভার্সিটির সময়গুলোতে তুমি খানিকটা সুযোগ পাও। আর এ সময়েই পৃথিবীর রঙে মেতে, পৃথিবীর মোহে আসক্ত হয়ে তুমি পৃথিবীকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকো, হাজারো পরিকল্পনা সাজাও। অথচ এগুলো কেবল কল্পনা; বাস্তবতা নয়।
স্বীকার করো বা না-ই করো, ওপরের এই হিসাবটা তোমার জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা। তোমার প্রকৃত উদ্দেশ্যহীনতা, তোমার অবাধ্যতা, তোমার অপকর্মের সূচনা হয় এই পড়াশোনার সামান্য কিছু বছরেই। এই সময়ে তুমি যেদিকে চলতে শুরু করো, যে আদর্শ ধারণ করো, যে স্বপ্ন দেখো; তোমার সারাটা জীবন সেদিকেই যায়, সেই আদর্শেই চলতে থাকে। কেননা বাকি সময়ে জীবনের জন্য নতুন করে ভাবার সুযোগ তোমার হয় না।
এই সময়ে আল্লাহর দিকে মুখ না ফেরালে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর, মস্তিষ্কে ভিন্ন আদর্শ আর ভিন্ন জীবনদর্শন স্থাপন করার পর, হাজারো দায়িত্বের মাঝে, সংসারের টানাপোড়েনে, জীবনের দুর্দশায় দীন নিয়ে ভাবার কোনো সুযোগ তুমি পাবে না। সুযোগ পেলেও দীনের সত্যতা উপলব্ধি করার মতো অন্তর তোমার থাকবে না। আর কোনোভাবে ইসলামে ফিরে এলেও আল্লাহর প্রতি পুরোপুরি আগ্রহ, গুরুত্ব, ইচ্ছা, প্রাধান্য, আর আনুগত্য থাকবে না। ফলে পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামেও প্রবেশ করতে পারবে না। কেননা তত দিনে তুমি দুনিয়াতে আসক্ত, সম্পদ অর্জনের নেশায় মত্ত, অতিরিক্ত ব্যস্ত, আর দুনিয়াতে অভ্যস্ত। এ অবস্থায় নিজের অবৈধ অভ্যাস, আসক্তি, ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে থাকার চাইতে তুমি ইসলাম থেকে দূরে থাকাকেই বেছে নেবে। গ্রহণ করো বা না করো—এটাই বাস্তবতা।
তুমি যদি পড়াশোনার জীবনের অল্প কিছু দিনের স্বাধীনতা পেয়ে অবাধ্যতায় মেতে উদ্দেশ্যহীন হও, যদি ইসলাম থেকে দূরে সরে যাও, তবে এভাবেই পৃথিবীর বাকি সময়গুলো তোমার জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এ ছাড়া আখিরাতের শান্তি তো আছেই।
আর যদি এই স্বল্প সময়ের অবাধ্যতা ছেড়ে নিজেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করতে পারো, তবে পৃথিবীর জীবনটাও সুখী হবে এবং আখিরাতে তোমার জন্য রয়েছে জান্নাত।
আরেকটু বাস্তবতার চিত্র দেখো,
বর্তমান পৃথিবীর অবস্থা তো জানোই। অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বক্ষেত্রে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। শুধু তোমার গ্রাম, শহর বা দেশ নয়; বরং গোটা পৃথিবীর কোথাও আজকে শান্তি নেই।
মানুষকে পশুতে রূপান্তর করার বিশাল বিশাল কারখানা সাজানো হয়েছে। সেখানে জন্মের পর থেকেই একটা মানুষকে পশু হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। কারিকুলামে পড়ানো হয়, সে কেবলই একটা উদ্দেশ্যহীন ‘উন্নত পশু’। গাধার খাটুনি খেটে, বেতের পিটুনি খেয়ে একজন মানুষ পূর্ণাঙ্গ পশু হয়ে ওঠে। মানুষিক চরিত্র নষ্ট করে তার মাঝে প্রবেশ করানো হয় হিংস্রতা। এরপর পশুত্বের স্বীকৃতিপত্র নিয়ে নিজের উপভোগের সামগ্রী খোঁজার জন্য সে পৃথিবীতে প্রবেশ করে। পশুরা কি কখনো মানুষের আচরণ করবে? পশুরা পশুদের মতোই আচরণ করে। আশেপাশে কোনো প্রাণী, মানুষ বা অন্য কে থাকে থাকুক, তার ভাবার সময় নেই। পশু কেবল তার নিজের শখ, নিজের চাহিদা, নিজের ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করে।
সবমিলিয়ে মানুষের পৃথিবীতে এখন পশুদের শাসন চলছে। দু-একটা মানুষ যা আছে, তারা কোনোমতে পশুদের ফেলে দেওয়া অবশিষ্টাংশ খুঁজে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকছে মাত্র। কবে এই হিংস্রতা শেষ হবে, আমরা জানি না। কিন্তু এই পশুত্বের প্রভাব পড়েছে তোমার ও আমার পরিবারে, আমাদের খাবারে, আমাদের ঘরে, আমাদের প্রয়োজনে, আমাদের ইবাদতে, আমাদের আখিরাতে আর আমাদের বেঁচে থাকায়।
আরও ভালোমতো বুঝতে বাবার হাতের বাজারব্যাগের অবস্থাটাও দেখে নিয়ো। হিসাবনিকাশ করেও সংসার সামলাতে না-পারা মায়ের দুশ্চিন্তার কারণটাও সময় হলে জেনে নিয়ো।
এই পশুরা চায়, আমরাও যেন মানুষিক গুণাবলি ত্যাগ করে পশুদের খাতায় নাম লিখিয়ে নিই, আমরা যেন পশুদের মতো জীবন কাটিয়ে স্রষ্টার স্মরণ থেকে দূরে সরে যাই। তাহলে জঙ্গলের রাজত্ব পরিচালনা বেশ সহজ হবে। অনেকেই তাদের কথায় পশু হয়ে বেশ সুখেই আছে। আর যারা একটু মানুষ হতে চায়, তাদের জন্যই সব সমস্যা।
কিন্তু একজন মুসলমান কখনোই পশুত্বকে স্বীকার করে না। মুসলমান সবসময় মানুষ হয়েই বাঁচে। আর যেই ইসলাম সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বের পশুত্বকে পৃথিবী থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, আজকেও সেই ইসলামের অনুসরণ করে ভেতরের পশুত্ব দূর করা সম্ভব। ইসলাম সেই মশাল, যাকে ভয় করে পশুরাও।
মূলকথা হলো, প্রতিষ্ঠিত পশুত্বের এই নতুন প্রজন্মেও মানুষ হওয়ার একমাত্র সমাধান ইসলাম। এই প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা আর দুর্দশার ঘোরে সুখ শুধুই ইসলাম। এই দরিদ্রতা কিংবা নিঃস্ব অবস্থায় সম্বল শুধুই ইসলাম। এই অমানিশার ঘোর আঁধারে একমাত্র কিরণ যে সূর্যের, তার নাম ইসলাম।
আর তাই একটা ইসলাম পালনকারী দীনদার পরিবার এবং ইসলাম থেকে দূরে থাকা ক্যারিয়ারিস্ট সেক্যুলার পরিবারের চিত্র কখনও এক হয় না, আর কখনও এক হবেও না।
শোনো, তুমি যদি দীনদার হও, তবে সংসারজীবন বা বাহ্যিক জীবনের প্রত্যেক ধাপে ধাপে আগত পরীক্ষায় তুমি ধৈর্যধারণ করবে, আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। কোনো দিন না খেয়ে থাকলেও 'রিজিক রাখা হয়নি' জেনে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করবে না। অসুস্থতাকে আল্লাহর পরীক্ষা মনে করে কৃতজ্ঞ হবে, চূড়ান্ত বিপদের মুহূর্তেও না ঘাবড়ে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যাবে। তোমার ঘাড়ে পৃথিবীর সমস্ত দুর্দশার বোঝা চাপিয়ে দিলেও তুমি তা আসমানে পাঠিয়ে দিয়ে শান্ত থাকবে। প্রিয়জন হারিয়ে দুঃখ পাবে, তবে পরকালে দেখা হবে জেনে আহাজারি করবে না। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছলতা সত্ত্বেও আল্লাহর বরকতে কোনোমতে পৃথিবীর দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেই তুমি স্বস্তিবোধ করবে। খুব বেশি ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা না-থাকায় অপূর্ণতা বা না-পাওয়ার যন্ত্রণায় ভুগবে না। আল্লাহর ভয়ে স্ত্রীর সাথেও খারাপ আচরণ করবে না, মনোমালিন্য হলে সমাধান করতে চেষ্টা করবে। ফলে তোমার জীবনে পারিবারিক কলহ থাকবে না। সন্তানের লালনপালনের ক্ষেত্রে তাকে আল্লাহর পথে ছেড়ে দেবে। ফলে সন্তান উন্মাদ হয়ে তোমার বাড়তি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না।
এভাবে তোমার জীবনের সমস্ত উত্তাপে ‘ইসলাম’ একটা ছাতার মতো প্রশান্তির ছায়া দিতে থাকবে। কখনো ছাতায় ছিদ্র হলেও তোমার তাওবা, তোমার প্রার্থনা সেই ছিদ্র মুড়িয়ে দেবে। ইহকালীন জীবনের দুঃখ-দুর্দশা তোমার জন্য জান্নাতের স্তর বাড়াতে থাকবে। সবশেষে একটা প্রশান্তিময় জীবন কাটিয়ে তুমি কল্যাণময় আখিরাতের দিকে ফিরে যাবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টাগুলো সেদিন তোমাকে সুখের চাদরে মুড়িয়ে রাখবে।
কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু! ইসলামের প্রতি যদি তোমার কোনো আগ্রহ না থাকে, তুমি যদি দীন অনুসরণ না করো, তাহলে কী হবে জানো?
তোমার যৌবন কাটবে শূন্যতা, নিষিদ্ধ অপকর্মে, কামুকতার অনুভূতি জাগ্রত করে, আর পুরুষত্ব ক্ষয় করে। তোমার চরিত্র ভালো না-হওয়ায় স্ত্রী হবে অসৎ, স্বার্থপর বা অকৃতজ্ঞ। পিতামাতার সাথে তোমার সম্পর্ক থাকবে ঠুনকো।
অধিক দুনিয়া কামানোর চেষ্টায় তুমি নিজেকেও ভুলে যাবে, উদ্দেশ্যহীন জীবনে সুখ বলতে কিছুই থাকবে না। আরও আরও দুনিয়া অর্জনের নেশায় তুমি আসক্ত থাকবে। ফলে সংসার, সন্তান বা সুখের ক্ষেত্রে তুমি পুরোপুরি উদাসীন হয়ে পড়বে। তোমার স্ত্রী বেদনাগ্রস্ত হয়ে কাতরাবে, সন্তানেরা পথভ্রষ্ট হয়ে ধ্বংসের দিকে যাবে। চরিত্রহীন উন্মাদ হয়ে সমাজে ঘুরে বেড়াবে। একটা প্রজন্ম ধ্বংসের দায় তোমার ঘাড়ে চাপবে।
আর তোমার আর্থিক অবস্থা স্বাভাবিক না হলে আরও করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। না থাকবে তোমার কোনো আস্থা, না থাকবে ধৈর্য। মাথায় হাজারটা দুশ্চিন্তা নিয়ে তুমি স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করবে, সারাদিন অর্থ আয়ের চিন্তায় চিন্তায় রক্তচাপ বেড়ে যাবে। কীভাবে খাবে, কীভাবে পড়বে, কী করবে—এই চিন্তায় সবকিছু এলোমেলো মনে হবে। একদিকে বাহ্যিক অবস্থার পেরেশানি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা; অন্যদিকে আল্লাহ থেকে দূরে থাকার কারণে আরও বাড়তি আজাব—বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ সবদিক থেকেই কেবল অশান্তি অশান্তি আর অশান্তি তোমাকে ঘিরে রাখবে। দীন অনুসরণ না-করা নারীদের দুবেলা খাওয়াতে না পারলেই এখন তারা ছেড়ে চলে যায়। কারণ চারপাশে অপশনের অভাব নেই। এসব চরিত্রহীনা নারীরা স্বামীর সংসার ফেলে রেখে নিজেদের চড়াদামে বিক্রি করে দেয়। ফলে সব হারিয়ে তুমি একদম নিঃস্ব হয়ে পড়বে। পৃথিবী হবে তোমার জাহান্নাম। আরও কিছু বলার প্রয়োজন আছে?
বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম হলে এর বেশি কিছু দরকার হবে না। আর কল্পনার ঘোরে ডুবে থাকলে তোমার জন্য কেবল আফসোস।
তবে মূলকথা হলো, একটা মানুষের জীবনে শান্তি আর অশান্তির মূল কারণ হলো ইসলাম। যার জীবনে ইসলাম আছে, তার শান্তি আছে; আর যার জীবনে ইসলাম নেই, তার শান্তিও নেই। এটাই পৃথিবীর জন্য নির্ধারিত নিয়ম। এরপরেও তুমি যদি মনে করো যে, ইসলাম ছাড়াও তুমি সুখী থাকতে পারবে, আল্লাহকে না মানলেও বাহ্যিকভাবে তোমার বিশেষ 'সমস্যা হবে না, সবকিছু সামলানোর যোগ্যতাও তোমার আছে, সম্পদেরও অতটা সমস্যা নেই—তবে ইসলাম ছাড়াও থাকতে পারবে। কেউ তোমাকে বাধা দেওয়ার নেই।
ইসলাম ছাড়াও তোমার জীবন চলে যাবে, ইসলাম ছাড়াও তুমি বাঁচতে পারবে, যেমনটা পৃথিবীর অনেক মানুষই বেঁচে আছে। একটু ভুল হচ্ছে। কথাটা 'অনেক পশুরাই বেঁচে আছে' হবে।
কিন্তু আমার প্রিয় ভাই/বোন! পৃথিবীর জীবনটা না হয় যেভাবেই হোক কেটে যাবে, তারপর? যে জীবন কখনোই শেষ হবে না, যেই জীবনের প্রতিটা মুহূর্তেই শাস্তির তীব্রতা আর কঠোরতা বাড়তে থাকবে, তার ক্ষেত্রে কী করবে?
পশুদের সাথে থাকতে থাকতে পশুত্বের স্বভাবটা তোমার মধ্যেও চলে এসেছে। এই আনা-খাওয়া-ঘুমানো-চাহিদা পূরণ করাটা কি কোনো মানুষের জীবন? দিন আসবে রাত যাবে, ব্যস! পৃথিবীর সবকিছুই কি এতটাই অনর্থক আর অর্থহীন?
মরা জন্তুর হাড় চিবানো পশুদের দিক থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে এবার একটু আকাশের দিকে তাকাও। তাকিয়ে দেখো তার বিশালতা, কেন ওখানে প্রতিদিন বিশাল ওই সূর্যটা আসে, আবার কোথায় সে হারিয়ে যায়? চাঁদটা আবার কী? ভেবে তো দেখো। মানুষ তো এতটাও অর্থহীন সৃষ্টি হতে পারে না। মানুষকে উদ্দেশ্য ছাড়াই সৃষ্টি করা হতে পারে না।
তুমি যদি তরুণ হও, তবে আমার প্রিয় ভাই/বোন, এখনও সময় আছে! বেঁচে থাকবে কি না সেটা যেমন জানো না, মরে যাবে কি না তাও কিন্তু তোমার জানা নেই। তুমি কেবল ইসলামটা ঠিকমতো অনুসরণ শুরু করো ব্যস, বাকি দুনিয়ার অবস্থা যা হয় হোক, অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন হয় হোক, চাকরির বাজার কেমন থাকে থাকুক; তা নিয়ে আর ভাবার প্রয়োজন হবে না। জেনে রাখো, তোমার আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তুমি তার উদ্দেশ্য অনুসরণ করলে তিনি কখনোই তোমাকে পৃথিবীর দুর্দশার চাপে পিষ্ট হতে একলা ছেড়ে দেবেন না। অবশ্যই তোমার জন্য স্বাভাবিক, সুন্দর এবং মানবোচিত জীবনের ব্যবস্থা করে দেবেন ইন-শা-আল্লাহ।
বেশি কিছু ভাবতে যেয়ো না। শুধু পৃথিবীর সাথে তোমার জীবনের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো। দুনিয়ার সাথে সাথে আখিরাতটাও প্রশান্তিময় হয়ে যাবে। সব ভুলে এবার অন্তত নিজের জন্য সুখটাকে বেছে নাও।