📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 উদাসীনতার ঘোর

📄 উদাসীনতার ঘোর


সময় বদলে গেছে। মানুষের চাওয়া-পাওয়া বেড়েছে বহুগুণ। একইসাথে দৃঢ় হয়েছে থেকে যাওয়ার ইচ্ছাটাও। দীর্ঘ একটা সময় ধরে এই পৃথিবীতে থাকতে থাকতে মানুষ কখন যে পৃথিবীর হয়ে গিয়েছে, সে নিজেও জানে না। তাই তো পৃথিবীকে নিয়ে বোনা স্বপ্নের সামনে বাকি সবকিছু তার কাছে ঠুনকো, অনর্থক আর অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।

আমি যদি তোমাকে বলি, দীন বা দুনিয়ার যে-কোনো একটা বেছে নাও! তুমি কী করবে?

তুমি কিন্তু অবশ্যই দীন বেছে নেবে। কেননা ইসলামের প্রতি তোমার আনুগত্য না থাকলেও আস্থা আছে।

তবে মুখের উচ্চারিত ধ্বনিকে বাস্তবতায় ধারণ করাটা একটু কষ্টসাধ্য। যে কারণে আমাদের সমাজের মুসলমানেরা আইনগতভাবে আত্মসমর্পণকারী হিসাবে বিবেচিত হলেও অন্তরের দিক থেকে স্বেচ্ছাচারী হয়ে গেছে। আনুগত্যের সিজদায় দেহকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েও কেউ কেউ অন্তরে আকাশে চড়ার কামনা করতে থাকে। কিন্তু মানুষ যতই তার অভ্যন্তরীণ অহংকার লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করুক না কেন, কর্ম একটা সময় তার প্রকৃত অবস্থার চিত্র প্রকাশ করে দেয়।

পৃথিবী নিকৃষ্ট। একটা মৃত জন্তুর গলিত দেহের মতোই দুর্গন্ধযুক্ত। মশার ডানার চাইতেও মূল্যহীন। তবে প্রকৃত সত্য হলো, সবাই এই বাস্তবতা ধারণ করতে পারে না। বাস্তবতা দেখার সাধ্য সবার থাকে না। বাস্তবতা সবাই মেনেও নিতে পারে না।

কিন্তু একটা বিষয় স্মরণ রাখা দরকার। মহান আল্লাহর কোনো সৃষ্টিই অনর্থক নয়। পৃথিবীর বাস্তবতা যাই হোক না কেন, পৃথিবী যতই মূল্যহীন হোক না কেন, এর অবশ্যই একটা উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য পূরণের স্বার্থেই একে দুর্গন্ধময় করে সৃষ্টি করা হয়েছে। মহান রব্বুল আলামিন কুরআনে বলেছেন, وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَعِبِينَ.
'আসমান-জমিন এবং এ দুইটির মাঝে যা কিছু আছে, সেসব আমি তামাশা করে সৃষ্টি করিনি।[১৩২]

পৃথিবী যদি অনর্থক কোনো সৃষ্টি না-ই হয়, তবে মানুষের মতো এত রহস্যপূর্ণ সৃষ্টির সত্যিই কি কোনো উদ্দেশ্য নেই?

তুমি আর আমি মূলত কে? ইতিপূর্বে তো পৃথিবী বলতে আমরা কিছু জানতাম না, চিনতাম না। হঠাৎ কোত্থেকে এলাম আমরা? কেউ কি আমাদের এখানে পাঠিয়েছে, না কি নিজ থেকেই এসেছি? কিন্তু পৃথিবীর পূর্বেকার কিছুই তো আমাদের স্মরণ নেই, নিজ সত্তার প্রতি অধিকারও নেই। তাহলে কি এমন কেউ আছেন, যিনি আমাকে পরিচালনা করছেন? আমার এই আসা-যাওয়া নির্ধারণ করে দিচ্ছেন?

প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা প্রয়োজন; নতুবা যে এখনও নিজ সত্তাকেই চেনে না, সে কী করে মানুষ হবে? যাকে অন্য আরেকটা মানুষ চালনা করে, সে কী করে তার উদ্দেশ্য জানবে?

আজকে আমাদের সব চিন্তাগুলোকে একটা নির্দিষ্ট বাক্সের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছে। বাক্সের বাইরে গিয়ে ভাবতে সবদিক থেকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এই বাক্স থেকে বেড়িয়ে আসাও খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু এর ভেতরে থাকতে থাকতে, অল্পস্বল্প চিন্তা করতে করতেই আমরা অভ্যস্ত। তাই এখনও নিজের সাথেই ঠিকমতো পরিচিত হতে পারিনি।

পৃথিবীতে আসার পর এখানকার মূর্খ অধিবাসীরা আমাকে বলেছিল, পৃথিবীই তোমার সব, এর জন্যই তুমি এসেছ।

আমিও বোকার মতো তাদের কথা মেনে নিলাম। এরপর তাদের মতোই পৃথিবীকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম; তার জন্য স্বপ্ন, তার জন্য বেঁচে থাকা, তাকে নিয়েই শুরু হলো আমার মানবজীবন। এটাকে ঠিক মানুষের জীবন বলা চলে না। মানুষ তো সে-ই, যে নিজের মানুষ হওয়াটা জানে। মানুষ তো সে-ই, যে মানুষ হওয়ার উদ্দেশ্যটা মানে।

কিন্তু আমি আর মানুষ হলাম কই? মূর্খদের মতোই অন্ধত্ব বরণ করে পৃথিবীর গোলাম হয়েই থেকে গেলাম। কিন্তু যেই মূর্খেরা ষাট-সত্তর বছর ধরে পৃথিবীতে থেকেও নিজের থাকার কারণটা জানে না, সে কী করে আমাকে আমার উদ্দেশ্য শেখাতে পারে? যে এখনও নিজেই নিজের কাছে অপরিচিত, সে কী করে আমাকে আমার পরিচয় জানাতে পারে?

কিন্তু সবটা জানার পর, বোঝার পরেও যদি আমি মূর্খ রয়ে যাই, তাহলে কী অর্থ এই জীবনের? এখনও যদি উদ্দেশ্যহীনতা আমার সঙ্গী হয়, এখনও যদি ভেতরের অনুভূতিগুলোর নাম না জানি, তাহলে কী লাভ এত দিন পৃথিবীতে থাকার?

আচ্ছা, তুমিও কি ওদের মতোই মনে করো যে, নির্দিষ্ট কিছু বছর পূর্বে দুজন মানুষের মিলনের ফলে তোমার অস্তিত্ব পৃথিবীতে এসেছে? এর পেছনে কি আর কোনো কারণ নেই?

যদি তা-ই হয়, তবে শুক্রাণু ডিম্বাণুর মাঝে প্রবেশ করে মাতৃগর্ভের ছাদে আটকে যাওয়ার সাথে সাথেই কেন সেখানে কোনো প্রাণ ছিল না?

কেন মায়ের গর্ভে প্রথম কিছু মাসের মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়ায় তোমার সত্তা কেউ খুঁজে পায়নি? কেন তোমাকে ধারণ করতে বিশেষ আরেকটা মাংসপিণ্ডের প্রয়োজন হয়? হৃৎপিণ্ড ছাড়াও তো হাতে, পায়ে, মাথায় তুমি থেকে যেতে পারতে? শরীরটা যেহেতু তোমার, এখানে আধিপত্য তো তোমারই হওয়ার কথা, তাই না?

এই ভাবনাহীন জীবনের ব্যস্ততা ছেড়ে নিজের প্রতি একটু মনোযোগ দাও। মূর্খদের জীবন দেখে দেখে আর মূর্খ হয়ে থেকো না। নিজেকে খানিকটা সময় দাও। প্রশ্নগুলোর উদ্দেশ্য খুঁজে নাও। যেই জীবন তোমার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা খুঁজে বের করো। তোমার প্রকৃত স্বার্থ কী, প্রকৃত তুমি কী, তা বের করো।

বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। শুধু পৃথিবী থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে নিজের দিকে দৃষ্টি দাও। দেখো এই শরীরটা কী দিয়ে সাজানো? বুকে হাত রেখে দেখো, এখানে কীসের সব অনুভূতি জমা হচ্ছে! চোখ বন্ধ করে দেখো, দেখার শক্তি পাও কি না! নাক চেপে শ্বাস বন্ধ করে দেখো, বাঁচা যায় কি না! তবুও নিজেকে বুঝে নাও। নিজের থেকে আর উদাসীন থেকো না। ওই বাইরের পৃথিবীটা তুমি নও। এই শরীরটাও তোমার নয়। তুমি তাহলে কে, সেই উত্তর খুঁজে নাও।
স্বীকার করো বা না করো, তোমার একজন স্রষ্টা আছে। তোমাকে নিয়ে তার একটা উদ্দেশ্য সাজানো আছে। তার সত্তা একক। আর এই সৃষ্টিকুল সজ্জিত করার সকল উদ্দেশ্য পূর্বনির্ধারিত।

যখন কোনো মানুষ পৃথিবীতে আসেনি, যখন পৃথিবী বলতে কোনো গ্রহের অস্তিত্ব ছিল না, যখন না ছিল কোনো সূর্য আর না ছিল চাঁদ, মহাজাগতিক বিশাল এই গ্রহ নক্ষত্রেরও কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখনই সব নির্ধারণ করা হয়েছে। পৃথিবী নেই, কোনো মানুষ নেই, আকাশ নেই, মাটি নেই, সূর্য নেই, তারারা নেই, গ্যালাক্সি নেই। কিন্তু পৃথিবী সৃষ্টির পর তুমি নামক একটা সত্তা পৃথিবীতে আসবে, মানুষের চলমান ক্রমধারার কততম অধ্যায়ে তোমার জন্ম হবে, সমুদ্র-মাটি-পাহাড়-গাছপালায় সজ্জিত পৃথিবীর কোথায় তুমি থাকবে, তোমার মানবীয় খোলসের আকার-আকৃতি কেমন হবে-এর সবটাই পূর্বনির্ধারিত। সৃষ্টিকুলের ৫০ হাজার বছর পূর্বে মহান স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সকল সৃষ্টির উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন।

কিন্তু সৃষ্টি যখন স্রষ্টার কথা ভুলে যায়, আল্লাহর দেওয়া উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে মানুষ যখন মানবীয় উদ্দেশ্যকে গ্রহণ করে, তখন তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যায়। একটা কোটি টাকার দামি গাড়িতে বাজারের খোলা তেল ব্যবহার করা যেমন ক্ষতিকর, মানুষের জন্য স্রষ্টার উদ্দেশ্য বাদ পৃথিবীর নোংরা দর্শন গ্রহণ করাও ক্ষতিকর। খোলা তেলে গাড়ি চালানো যাবে ঠিকই, কিন্তু ইঞ্জিনের সঠিক কার্যক্ষমতা পাওয়া হবে না, দামি ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব কমে যাবে। একইভাবে ভিন্ন উদ্দেশ্য দিয়ে মানুষের জীবন কেটে গেলেও শেষপর্যন্ত তাতে যথার্থ মানবীয় চরিত্র আর থাকবে না।

আমি এ-রকম একজনকে জানি, যার জন্য বিশ ত্রিশজন মানুষের প্রয়োজন মেটানো কিছুই না। এরপরও তার সম্পদ অবশিষ্ট থাকবে। জাগতিক উপকরণের সবকিছুই তার আছে। বাড়ি-গাড়ি-নারী যেন তার কাছে কিছুই নয়। কিন্তু এরপরেও তার মাঝে সুখ নেই। কারণ কী?

কারণ জাগতিক উপকরণ কেবল প্রয়োজন মেটায়। সুখী করতে পারে না। কোনোোকিছু অর্জনের সামান্য কিছু মুহূর্তের স্বস্তিকে সুখ মনে করাটা বোকামি। কেননা অর্জনের এই ধারা কখনোই শেষ হয় না, আর মানুষের অন্তরের স্বস্তিও স্থায়ী হয় না।

তাই আমার তরুণ ভাই-বোনদের বলব, তোমরা এই উচ্চ অবস্থান আর উন্নত জীবনের চিত্র দেখে মোহিত হোয়ো না। কাউকে পৃথিবী অর্জন করতে দেখে ধোঁকায় পোড়ো না।
জাগতিক উপকরণ, সৌন্দর্য ও সম্পদ অবশ্যই মানুষের দুর্বলতা। কিন্তু তুমি জানো না, পর্দার আড়ালের চিত্রটা কত যন্ত্রণার! তোমার সামনে সুখী হওয়ার অভিনয় শেষে তারা কী করে, তুমি জানো না।

যদি বলো, সুখ কী?

সকল অবস্থায় সন্তোষ প্রকাশ করাই হলো সুখ। সকল পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল থাকতে পারাই হলো সুখ।

ইংরেজিতে বলা হয়, "Happiness is not how much you have, The real happiness is how much you live without." -Charles Spurgeon

আরেকটা বিষয় তোমাকে জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। উদ্দেশ্যের সাথে উদ্দেশ্যহীনতার পরিণতিও পূর্বনির্ধারিত। এ সম্পর্কে তোমার স্রষ্টা বলেন,
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا.
'আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন।'[১৩৩]

এটাই বাস্তবতা। অপরিবর্তনীয় সত্য। এটাই মূল পরিণতি। যে মানুষ তার উদ্দেশ্য থেকে সরে যাবে, সে কখনোই পৃথিবীতে সুখী হতে পারবে না। এই কথাকে তুমি কতটুকু বিশ্বাস করো?

আজকে ছন্দ মেলানো গানের লাইনে তুমি মোহিত হও, অশ্লীলতাপূর্ণ শব্দে তোমার কামভাব জাগ্রত হয়, বিরহের সুরে তোমার অন্তর বিষণ্ণতায় ডুবে যায়, কারও অভাবের কথায় তোমার ভেতরে পূর্ণতার ইচ্ছা জাগ্রত হয়।

কিন্তু তোমার স্রষ্টা যখন তোমাকে কিছু বলেন, তুমি প্রাণহীন শরীরের মৃত কর্ণের বধিরতা ধারণ করো। কেন আজ মানুষের লাইনগুলো তোমাকে নিজ স্রষ্টার কালামের চাইতে অধিক প্রভাবিত করে?

আয়াতের মধ্যকার প্রশস্ত জীবন আর সংকুচিত জীবনের পার্থক্যটা জানা দরকার। সহজ ভাষায়-প্রশান্তি হলো প্রশস্ততা, আর শূন্যতা হলো সংকোচন; আর এই দুটো মানবীয় জীবনের সীমারেখা।

টিকাঃ
[১৩২] সুরা আল-আম্বিয়া ২১: ১৬।
[১৩৩] সুরা ত্বহা ২০: ১২৪।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 কার গন্তব্য কেমন?

📄 কার গন্তব্য কেমন?


তোমার জীবনে প্রশান্তি থাকা মানে তুমি সীমারেখার ভেতরেই আছ, এখানেই থেকে যাও। আর যদি শূন্যতা থাকে তবে জেনে রাখো, এটাই সীমারেখার লঙ্ঘন। এ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন অপরিহার্য।

শুধু সম্পদের অভাব, সঙ্গীর অভাব, সম্মানের অভাব, বা সুখের অভাবই শূন্যতা নয়; বরং জাগতিক সমস্ত উপভোগের উপকরণ থাকা সত্ত্বেও স্বস্তি না-পাওয়া শূন্যতা।

পৃথিবীতে ফেরাউনের তো সবকিছুই ছিল। তুমি কি তাকেও সুখী বলবে?

ফেরাউনকে সুখী হিসাবে স্বীকৃতি না দিলেও তুমি কিন্তু তার মতোই জাগতিক সুখ অর্জনের জন্য নিজেকে বিসর্জন দিচ্ছ। যে মিথ্যা মরীচিকার পেছনে মরণ পর্যন্ত ছুটে যাচ্ছ, তাকে মরীচিকা হিসাবে মেনে নিতেও তুমি প্রস্তুত নও। কারণ মিথ্যা আলোয় ঝলঝল করা সেই কল্পনার চিত্রকে তুমি ভালোবেসে ফেলেছ। আর মানুষ চাইলেও সহজেই নিজের অন্তর থেকে ভালোবাসা মুছে ফেলতে পারে না।

কার গন্তব্য কেমন?

জেনে রাখো, তুমি যে পথে হাঁটবে, সেই পথের গন্তব্যই তোমাকে গ্রহণ করতে হবে। তুমি যদি নবি-রাসুলগণের পথ বেছে নাও, তবে তোমার সমাপ্তিও তাদের মতোই হবে; তোমার পথের শেষে থাকবে চিরস্থায়ী সুখের জান্নাত। আর যদি তুমি ফেরাউনের পথ বেছে নাও, তবে তোমার সমাপ্তিও তার মতোই ধ্বংসাত্মক হবে; সেই পথের শেষে থাকবে চিরস্থায়ী শান্তির জাহান্নাম।

একজন শায়খের মুখে শুনেছিলাম। তিনি একবার কোনো এক বৃদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ করতে তার বাসায় গিয়েছিলেন। সেই বৃদ্ধ সারাজীবন গান শুনেই কাটিয়েছে। গান-বাদ্যকে সে তার জীবন বানিয়ে নিয়েছিল। এখন তার শেষ মুহূর্ত। মৃত্যুর ফেরেশতা যে-কোনো মুহূর্তে তাকে নিয়ে যেতে আসবে। কিন্ত এমন সময় সে কী করছিল জানো?

সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মিশরীয় সংগীতশিল্পী কুলসুমের গান শুনছিল। শায়খ তার বাসায় প্রবেশ করলে বাড়ির অন্য লোকেরা শায়খের সম্মানার্থে গানটা বন্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে দিলো।

কিন্তু এরপর কী হলো শুনবে? এক লোমহর্ষক চিত্র!

সেই বৃদ্ধ ঘর থেকে চিৎকার করে বলতে লাগল, 'কুরআন বন্ধ করো, আর কুলসুম ছেড়ে দাও। কারণ সে আমার আত্মাকে স্বস্তি দেয়।'

তুমিই বলো, এটা কোন পথ? আর এই পথের গন্তব্য কোথায়?

তোমার হয়তো কারও চাকচিক্যময় জীবন দেখে নিজের উদ্দেশ্য পরিবর্তনের ইচ্ছা করতে পারে। তবে জেনে রাখো, এটা একটা মিথ্যা প্রতিচ্ছবি মাত্র। এই চাকচিক্য মূলত আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তুমি যাদের অবস্থানে পৌঁছতে চাও, যাদের মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখো, আমি তাদের সাথে মিশেছি, তাদের কথা শুনেছি, তাদের সমস্যার সমাধান খুঁজেছি। তারা আলাদা আলাদা করে নিজেদের অবস্থার কথা আমাকে জানিয়েছে। তাদের বাহ্যিক চাকচিক্য কেবল একটা আবরণ মাত্র। নির্দিষ্ট তারিখ শেষ হওয়া কোনো নষ্ট পণ্যের প্যাকেটের মতোই তারা কেবল বাইরের দিক থেকে সুন্দর। কিন্তু ভেতরের অবস্থা সেই পণ্যের মতোই পচা, যার কোনো মূল্য নেই।

কিন্তু আমাদের যুবকেরা এই উচ্চবিত্ত অভ্যাস আর ব্র্যান্ডেড পোশাকে আকৃষ্ট হয়ে নিজের উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে নেয়। নিজের জন্য বাঁচতে চায়। তার অন্তর গাড়ি চায়, বাড়ি চায়, ভালো ক্যারিয়ার চায়, সুন্দরী স্ত্রী চায়। কিন্তু সবকিছু অর্জনের পর আবেগটুকু কেটে গিয়ে যখন বাস্তবতা সামনে আসে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়!

জীবনের পুরোটা সময় নষ্ট করে আফসোসের ঝুলি নিয়ে সে প্রবেশ করে মসজিদে। কিন্তু আফসোস! মাটিতে ঝুঁকে সিজদা করার শক্তিটুকুও আল্লাহ তার থেকে কেড়ে নেন। খুব বেশি বয়স কিন্তু নয়। তবুও মাটিতে ঝুঁকে সিজদা করার অবস্থা তার নেই, যেন মহান রব্বুল আলামিন তাকে আর নিজের কাছাকাছি আসতে দিতে চান না!

আমাদের বোনেরাও এই বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি মোহিত হয়ে পড়েছে। যে কারণে কোনো সদ্য দীনে ফেরা পুরুষ; যে প্রতিনিয়ত নিজেকে শোধরাতে প্রচেষ্টা করছে, সাদাসিধা জীবন চাচ্ছে, দীনের জন্য কাজ করছে, উম্মাহর কল্যাণে সময় ব্যয় করছে—তাকে সে বিবাহ করতে চায় না। কিছু বোন সঠিকটা বুঝলেও আজকের অধিকাংশ নারীরাই নিজেদের জন্য উত্তম পুরুষের চাইতে উচ্চবিত্তশালী পুরুষকে বেছে নেয়। কিন্তু আমার বোন! তুমি কি মনে করো, এ-রকম একটা পুরুষ তোমাকে সুখী রাখতে সক্ষম?

তাহলে শোনো, আমি এরকম এক নারীর ব্যাপারে জানি। পরিচিত সকলেই তার সাথে ঈর্ষা করত।

তুমি যে গাড়ির কথাই বলবে, সেটাই তার কাছে ছিল। শুধু সেলিব্রেটিরা যা পরিধান করে, সেটাই ছিল তার পোশাক। প্রত্যেক সপ্তাহে নতুন জুতা আর হাতব্যাগ পরিবর্তন করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সে যখন আমাকে ফোন দিয়ে বলে, 'তার স্বামী তাকে ধোঁকা দিচ্ছে এবং তা জানা সত্ত্বেও সে কিছুই করতে পারবে না। তার স্বামী নিজের বন্ধুদের সাথে বের হয়ে তিন-চার দিন পরেও ঘরে ফেরে না।' তখন তুমি কী বলবে?

হ্যাঁ, বাইরের দিক থেকে তাদের অবস্থা অনেক সুন্দর আর চমৎকার মনে হবে, কিন্তু ভেতরের দিক থেকে তারা পুরোপুরি শূন্য।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 প্রশান্তির গ্যারান্টি

📄 প্রশান্তির গ্যারান্টি


তুমি বলতে পারো, উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে গেলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? আমার দুর্দশা কি ঠিক হবে? যন্ত্রণাগুলো কি কমে যাবে?

হ্যাঁ অবশ্যই! জীবনের সীমারেখা লঙ্ঘনে দুঃখ যেমন নির্ধারিত, তেমনই সঠিক সীমারেখার ভেতরে থাকলে সুখও অপরিহার্য। যার উদাসীনতা দুঃখ এনেছে, তাঁর স্মরণেই রয়েছে প্রশান্তি। যেমন কুরআনে তিনি বলেছেন,

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ.
'জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়।' [১৩৪]

এই আয়াতটি আমার খুব প্রিয়। আয়াতটির দিকে একটু লক্ষ করো। আল্লাহ কিন্তু এখানে বলেননি, 'তাঁর স্মরণে অন্তর সুখী হয়।'

কারণ সুখের অনুভূতি সর্বজনীন। মস্তিষ্কের বিভিন্ন হরমোন, শারীরিক কাম, প্রবৃত্তির পরিতৃপ্তি কিংবা অন্তরের অবৈধ আসক্তির টানও একপ্রকার সুখ।

এই মুহূর্তে যে পুরুষ বা নারী কোনো পাপ করছে, যে ক্লাবে নেশা করছে, যে গান শুনছে, যে জিনা করছে, যে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করছে, তারও শরীর সুখ
অনুভব করছে। কেমন সুখ তা পরের ব্যাপার, সাময়িক সময়ের জন্য হলেও সে কিন্তু সুখী।

তবে এই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কেননা মানুষ তার কোনো চাহিদাকে সারাক্ষণ পূরণ করতে সক্ষম নয়। জাগতিক সুখের নির্দিষ্ট একটা মাত্রা আছে, যার পর মানুষের শরীর বা অন্তর আর গ্রহণ করতে পারে না।

তাই নির্দিষ্ট মাত্রার সুখ শেষ হয়ে গেলেই তার অন্তরে শূন্যতা জাগ্রত হয়। আরও আরও সুখের নেশায় তার সমস্ত সত্তা অস্থির হয়ে ওঠে। আর তা পূরণ না-করার ফলে অন্তর দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অশান্তি ছেয়ে যায় তার সমস্ত সত্তায়। একটু আগেও যে সুখী ছিল, এখন তার সবকিছু বিরক্ত লাগতে শুরু করে।

তাই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেছেন, 'তার স্মরণে অন্তর প্রশান্ত হয়।' আর প্রশান্তি হলো সুখের সর্বোচ্চ স্তর, সর্বোচ্চ পূর্ণতা। তা আল্লাহ তাআলার স্মরণ, তাঁর ইবাদত, তাঁর আনুগত্য, তাঁর দীনের নির্দিষ্ট সীমানা ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

টিকাঃ
[১৩৪] সুরা আর-রাদ ১৩: ২৮।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 দ্বীনের GPS

📄 দ্বীনের GPS


এ যুগের মানুষের জন্য সত্য মিথ্যার পার্থক্য করাটা কঠিন কিছু নয়। সবাই আজ সবকিছু জানে বোঝে। মিথ্যার মতোই সত্যটাও এখন অনেক বেশি সহজলভ্য। চাইলেই যে-কেউ পৃথিবীর গভীর জ্ঞানও অর্জন করতে পারে। তাই হাতের নাগালের সত্যকে গ্রহণ করা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু এরপরেও কিছু মানুষ প্রশ্ন করে, দীনের কি সত্যিই প্রয়োজন আছে?

তোমাকে তোমার ভাষাতেই বলি, দীন হলো তোমার জন্য GPS। আর দীন ছাড়া তুমি একটা Lost Soul বা পথভ্রষ্ট সত্তা।

তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে বর্তমান পৃথিবীতে ফিতনা বা পাপের ক্ষেত্র বেড়ে গেছে বহুগুণ। সবচাইতে বড় ক্ষতির বিষয় হলো, পূর্বের চাইতে এখন মানুষের জন্য নতুন নতুন অনেক ক্যারিয়ার বা জীবন অতিবাহিত করার পথ সৃষ্টি হয়েছে। যেমন: পূর্বে ইউটিউব ছিল না, তাই ইউটিউবারও ছিল না। অথচ বর্তমানে ইউটিউবিং একটা ক্যারিয়ার। পূর্বে গেমিং এতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না, বর্তমানে গেমিং একটা ক্যারিয়ার।

এরপর পূর্বে অশ্লীলতার এত প্রচার প্রসার ছিল না, তাই নারীরা চাইলেও নিজেকে পৃথিবীর সামনে প্রকাশের সুযোগ পেত না, কিন্তু এখন নিজেকে পৃথিবীর সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়াই নতুন জীবন।

অনেক অনেক পথ তৈরি হয়েছে। তাই মানুষগুলোও দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী থেকে নয়; বরং নিজেদের মাঝ থেকে। ঘরে থেকেও তারা যেন থাকছে না, ভালোবেসেও যেন ভালোবাসছে না, স্বামীকে সব দিয়েও নারী নিজেকে দিচ্ছে না, পুরুষেরা সব দায়িত্ব পূরণ করেও যেন কিছুই করছে না, শিশুরা বেড়ে উঠেও ঠিকমতো গড়ে উঠছে না, সমাজে সুখী হওয়ার নানান প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কেউই আজ সুখ খুঁজে পাচ্ছে না। আর এর কারণ হলো—সঠিক পথে না-চলা, সঠিক দিকে না-যাওয়া, সঠিক কর্ম না-করা।

তুমি যদি হারিয়ে গিয়ে থাকো, মোবাইলের লোকেশন অন করার মতোই দীনের সাথে নিজেকে যুক্ত করে তোমার দাসত্বের মুডটা অন করে নাও।

তাহলে মোবাইলের ম্যাপ যেমন পৃথিবীর যে-কোনো স্থান থেকে তোমাকে ঘরে ফিরে আসতে সাহায্য করে, দীনও তোমাকে সকল পথের মধ্য হতে সঠিক পথ বেছে নিয়ে সুখের দিকে নিয়ে যাবে, তোমাকে তোমার প্রকৃত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাবে। এর শেষ হলো জান্নাতে।

তবে তুমি সঠিক পথে যেতে ম্যাপের নির্দেশনার যেভাবে অন্ধ অনুসরণ করো, সেভাবেই দীনের ক্ষেত্রেও অন্ধ হয়ে যাও। দীন যা বলবে, যেদিকে বলবে, যেভাবে বলবে, সেদিকেই চলতে থাকো—তাহলে সহজেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। বেশি ভাবতে গেলে মূল পথ থেকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00