📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 দীনের ব্যাপারে শ্রান্তি

📄 দীনের ব্যাপারে শ্রান্তি


আমাদের মধ্যে কিছু মানুষ অজ্ঞতাবশত দীন সম্পর্কে ভুল বুঝে থাকে, যা দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মানুষ যখন কোনো বিষয় জানার ক্ষেত্রে সেই বিষয়ের পারদর্শী বা জ্ঞানীদের সাহায্য ছাড়াই নিজ থেকে তা বুঝতে যায়, তখন সে ভুল করে।

মানুষ তার দীর্ঘ আশার অভ্যাসকে দীনের ক্ষেত্রেও টেনে নিয়ে আসে। অনবরত পাপে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও বলে, আল্লাহ তো গফুরুর-রহিম বা ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।

এর দ্বারা সে বোঝাতে চায়, মানুষ যতই পাপ করুক না কেন, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। তাই সে ক্ষমার দীর্ঘ আশা নিয়ে নিজের অপকর্মের ওপর অবিচল থাকে।

কিন্তু আমার ভাই/বোন! আমি তোমাকে সতর্ক করে দিতে চাই। মাত্রাতিরিক্ত যে-কোনো বিষয় মানুষের জন্য ক্ষতিকর। হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই গফুরুর রহিম, অবশ্যই তিনি ক্ষমা করবেন, দয়া করবেন। কিন্তু এর জন্যও নির্দিষ্ট কিছু শর্ত রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র রয়েছে, নির্দিষ্ট অবস্থা রয়েছে।

কোনো বিষয়কে ক্ষুদ্র একটা ছিদ্র দিয়ে দেখে বা তার সম্পর্কে সামান্য কিছু জেনেই কেউ যদি নিজ থেকে সব সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তাহলে সে নিজেই নিজের ধ্বংসের কারণ হয়। যেমন: কোনো মাদক-বিক্রেতা তার কর্মকে নিজের জন্য রিজিক মনে করে। সে ভাবতে থাকে, আল্লাহ তো সকলের জন্য রিজিক নির্ধারণ করেছেন, আর আমার জন্য মাদক বিক্রয়ের মধ্যেই রিজিক রাখা হয়েছে। নাউজুবিল্লাহ!

কিন্তু ইসলাম মাদককে সম্পূর্ণ হারাম করেছে, তাও কিন্তু সে জানে। শুধু একটা দিক থেকে বিবেচনা করার কারণে, ইসলামকে নিজের ইচ্ছা অনুসারে বুঝতে যাওয়ার কারণে সে নিজেকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

তাই দীনের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে। কেননা তুমি আর আমি যা ভাবি, বাকি দুনিয়া যা ভাবে, সমাজ বা রাষ্ট্র যা ভাবে—তা কখনো দীন নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিগণ যা বুঝেছেন, যেভাবে বুঝেছেন, তাদের সেই বুঝটাই মূলত দীন।

তাদের ওপরে আল্লাহ স্বয়ং সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। তারা আল্লাহর বিধানকে পূর্ণাঙ্গভাবে পালন না করলে, তাঁর পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য না করলে তিনি কিন্তু তাদের প্রতি সন্তুষ্টির কথা জানাতেন না। যেহেতু তিনি নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারাই সঠিক পন্থায় এবং ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করেছে, সুতরাং আমাদেরও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইলে তাদের মতো করেই ইসলাম অনুসরণ করতে হবে।

আর তারা কীভাবে ইসলাম বুঝেছিলেন, তা খানিকটা জেনে নাও, তাহলে ভুল ধারণাগুলো দূর হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ।

আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে 'মাকামে মাহমুদ'- এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর, যার সম্মানের ওপরে সৃষ্টিকুলের আর কারও সম্মান নেই, যিনি আল্লাহর সবচাইতে অধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত। এরপরেও তুমি যদি তার প্রাত্যহিক জীবনের দিকে লক্ষ করো, তাহলে দেখবে, তিনিও আখিরাত সম্পর্কে চিন্তিত থাকতেন।

অথচ তুমি আর আমি কোনোকিছু না করেও মনে করি, আমরা অবশ্যই জান্নাতেই যাব। কীভাবে এত নিশ্চিত হও বলো তো? যিনি ছাড়া জান্নাতের দরজা খোলা হবে না, যাকে ছাড়া মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে না, সেই রাসুল যখন চিন্তিত থাকেন, তাহলে তুমি আর আমি এত নিশ্চিন্ত হই কী করে?!

আমাদের অনেকে দু-একটা হাদিস পড়ে কোনো ইবাদত করা ছাড়াই জান্নাতের হুরদের নিয়ে কল্পনায় ডুবে যায়। তারা বলে, আপনি কি শোনেননি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'যে ব্যক্তি খাঁটি অন্তরে এই কালিমা সাক্ষ্য দেওয়া অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল—আল্লাহ অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দেবেন।'[১১৫]

এই হাদিস আমাদের অনেকের নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ। কিন্তু আমার ভাই! আমি তোমাকে সতর্ক করছি, এই হাদিস যদিও সহিহ, কিন্তু তুমি যদি সঠিক দিক থেকে হাদিস না বোঝো, তবে এই হাদিস তোমার ধ্বংসের কারণ হবে। হাদিস তার জায়গাতে ঠিকই আছে, তবে তাকে বোঝার জ্ঞান না থাকলে তুমি ভ্রষ্টতার দিকে ধাবিত হবে।

তাই হাদিস দেখেই লাফানোর আগে আলিমদের থেকে তার ব্যাখ্যা জেনে নাও। ইসলামের মধ্যে নিজ থেকে কিছুই বুঝতে যেয়ো না, কিছুই না। তুমি শিখে নাও, বুঝে নাও। কেউ তোমাকে ভুল শেখালে সে দায়ী হবে, তুমি নও। কিন্তু তবুও নিজ থেকে দু লাইনও বুঝতে যেয়ো না; নতুবা নিজেই নিজের অনেক বড় ক্ষতি করতে ফেলবে।

অনেকে হাদিস একটু কম বোঝে। তাই কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে নিজের অপকর্মের অবিচলতার পথ খুঁজে বেড়ায়। আর সবকিছুই ক্ষমার যোগ্য মনে করে। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,

وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ.
'আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে।'[১১৬]

এটা তো কুরআন! কেউ এর বিরোধিতাও করতে পারবে না। তাই সে আয়াতের সামান্য কিছু অংশ বের করে এনে লাফানো শুরু করে। কিন্তু আমার ভাই! এই আয়াত যেভাবে আছে তুমি যদি এর প্রেক্ষাপট বা প্রসঙ্গ ঠিকমতো না বুঝে এটা গ্রহণ করো, তবে ওয়াল্লাহি! এটা তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।

আমার এই কথাকে অন্তরে দৃঢ়ভাবে গেঁথে নাও, তোমার বা আমার চিন্তাভাবনা দীন নয়। কোন দাঈ কী বললো, কোন আলেম কী বললো, তা দীন নয়। আল্লাহর রাসুলের সাহাবিগণ যা করেছেন, যেভাবে করেছেন, যেভাবে তারা জীবন অতিবাহিত করেছেন-সেটাই দীন।

রাসুলুল্লাহর থেকে অতিরিক্ত কিছু করলে তুমি চরমপন্থী, আবার তার থেকে কোনো কিছু কম করতে চাইলেও তুমি সমানভাবে চরমপন্থী বা পথভ্রষ্ট বিবেচিত হবে।

একজন সাধারণ মুসলমানের এই ভুল বোঝার কারণ হলো, সে মূলত দীনকে একটা সুচের ছিদ্র দিয়ে লক্ষ করে। সে দীনের পুরোটা না জেনে সামান্য কিছু অংশ পড়েই দীনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে যায়। ফলে কী হয় জানো?

ধরো, কোনো দরজার ক্ষুদ্র একটা ছিদ্র দিয়ে কেউ ভেতরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করছে। অনেক চেষ্টার পরেও সে খুব অল্পই দেখতে পারছে। কিছু ক্ষেত্রে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।

এরপর দেখল, ঘরের ভেতরে একটা ছোট্ট শিশু শুয়ে আছে। তার বুক থেকে পেট পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। বুকের চারপাশ রক্তাক্ত। এই দৃশ্য দেখে তার শরীরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল, শিশুটির জন্য অন্তরে ভয় জাগ্রত হলো। সে আরও ভালোভাবে দেখতে চেষ্টা করলো। ঝাপসা চোখে দেখল, ছুরি হাতে একটা লোক শিশুটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তার মনে হলো, দরজার ওপারে একটা শিশু প্রচণ্ড বিপদে আছে। কেউ একজন তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। যেহেতু সে নিজ চোখে দেখেছে, সুতরাং এই ঘটনা মিথ্যা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাই সে শিশুটিকে হত্যাকারীর হাত থেকে বাঁচাতে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলো।

তার উদ্দেশ্য অবশ্যই ভালো ছিল। কিন্তু দরজা খোলার সাথে সাথেই তার সামনে পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠল। এতক্ষণ দরজার ওপাশের ছিদ্র দিয়ে সে যা দেখছিল, ভেতরের চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সে যেই দরজার ছিদ্র দিয়ে দেখছিল, সেটা আসলে একটা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের দরজা। যেই বাচ্চাটিকে বাঁচানোর জন্য সে প্রবেশ করেছে, সে মূলত অসুস্থ। আর যাকে সে হত্যাকারী মনে করছিল, তিনি মূলত একজন চিকিৎসক। ছুরি দিয়ে তিনি শিশুটির সার্জারি করছিলেন।

এবার তুমিই বলো, তার দেখা বাইরের চিত্র আর ভেতরের চিত্রের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু?

একেবারে বিপরীত, তাই না? এর কারণ, সে ক্ষুদ্র একটা ছিদ্র দিয়ে সমস্ত চিত্র দেখতে চেয়েছিল। যেটা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং সে শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে সার্জারির বিঘ্ন ঘটিয়ে উলটো শিশুটির প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

একইভাবে কোনো সাধারণ মুসলমান যখন লক্ষ লক্ষ হাদিস, সুবিশাল সিরাত, সমস্ত কুরআন ও তার হাজারো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, সাহাবায়ে কিরামের জীবনী, তাদের মতামত ও ব্যাখ্যা এবং আরবি ভাষার বিশাল ভান্ডারকে একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল একটা আয়াত বা হাদিস বেছে নেয়, এরপর নিজ জ্ঞানে তা ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, সে মূলত নিজেকেই ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।

হ্যাঁ, সে অবশ্যই যা দেখছে তা সহিহ হাদিস, সত্য। কিন্তু এই দুই লাইনের হাদিসের পেছনে যে বিশাল ত্যাগ, শিক্ষাদান আর কষ্ট রয়েছে, তা হতে সে পুরোপুরি অজ্ঞ। এই দুই লাইনের পেছনের চিত্রটা সমস্ত পৃথিবীকে ঢেকে দেওয়ার মতোই বড়। কিন্তু নিজ অজ্ঞতা আর মূর্খতার কারণে মানুষ নিজের ক্ষতি করে। সেই ব্যক্তি যেমন হাসপাতালে অবস্থান করেও অপারেশন থিয়েটার কি তা বুঝতে পারেনি, আমরা মুসলমানেরাও আজকে কুরআন হাদিস দেখি; কিন্তু এর পেছনের সত্যতা, এর ক্রমধারা, বর্ণনাকারীর বিশাল এক জগৎকে বুঝতে চাই না।

আমাদের সেভাবেই দীন বুঝতে হবে, যেভাবে প্রথম সারির মুসলমানগণ বুঝেছিলেন। আর তারা আখিরাতের শাস্তিকে প্রচণ্ড ভয় করতেন। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে সর্বদা চিন্তিত থাকতেন।

আখিরাতের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকা মূলত ইমানের দুর্বলতা প্রকাশ করে। কেননা আল্লাহ তাআলা কুরআনে আমাদের সতর্ক করে বলেছেন,

أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ.
'তারা কি আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে? ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও থেকে কেউ নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারে না।'[১১৯]

আমরা আজকে চিন্তিত থাকার বদলে নিশ্চিন্ত থাকি। অথচ যেই আবু বকর রাদিআল্লাহুকে বারবার জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসন দেওয়া হয়েছে, তিনি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়ে চিন্তিত থাকতেন। আচ্ছা, তিনি কি সেই হাদিসটা জানতেন না, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, লা ইলাহা ইল্লালাহ পড়লেই জান্নাতে যাওয়া যাবে? তিনি কি সেই আয়াতের কথা জানতেন না, যেখানে আল্লাহ তাআলা নিজের রহমতের কথা বলেছেন?

যেখানে তুমি একটা নিশ্চিন্ত জীবন অতিবাহিত করছ, আর সমগ্র মুসলিম উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু চিন্তিত, ভীত-সন্ত্রস্ত!

হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কথাই ভাবো। তার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'আমার পরে কেউ নবি হলে অবশ্যই উমর ইবনুল খাত্তাবই নবি হতো।' [১১৮]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং যাকে জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। আল্লাহর সিদ্ধান্তের সাথে যার সিদ্ধান্ত মিলে যায়। যার ইচ্ছার প্রতি সম্মতিসূচক আল্লাহ মদ নিষিদ্ধ করে দেন। যার ইচ্ছার ওপর নারীদের জন্য পর্দার বিধান নাজিল করা হয়েছে। যেমন, একদা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন,
'হে আল্লাহর রাসুল! আপনার স্ত্রীগণের নিকট ভালো-মন্দ সব ধরনের লোক প্রবেশ করে। অতএব আপনি যদি তাদের পর্দা করার নির্দেশ দিতেন...! এরপর উম্মাহাতুল মুমিনিনের ওপর পর্দা ফরজ করে সুরা আল-আহজাবের ৫৩ নং আয়াতটি নাজিল হয়।' [১১৯]

মদিনায় মুসলমানদের খলিফা থাকাকালীন ফজরের সালাতের ইমামতি করা অবস্থায় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এক মুশরিকের দ্বারা ছুরিকাহত হন।

ছুরির আঘাতে পেট ও বুকে গভীর ক্ষত নিয়ে তিনি মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছেন। পুত্র আবদুল্লাহ ইবনু উমরের কোলে মাথা রেখেছিলেন।

একজন সাহাবি এসে বললেন, 'উমর, মৃত্যুকে কি ভয় পাচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'না, মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছি না; বরং মৃত্যুর পরে আমার সঙ্গে কী আচরণ করা হবে সেটা ভেবেই ভয় পাচ্ছি!' অধিক রক্তক্ষরণের কারণে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পুত্র আবদুল্লাহকে বললেন, 'আমার মাথাটা নামিয়ে দাও।'

আবদুল্লাহ বাবার মাথা নিজের কোল থেকে নামিয়ে উরুর ওপর রাখলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবার বললেন, 'এখানে নয়, আমার মাথা মাটিতে রাখো।' আবদুল্লাহ তাঁর মাথা মাটিতে রেখে দিলেন।

এরপর তিনি কী বলেছেন তা শুনে রাখো। আর নিজের দিকে তাকাও।

হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মাটিতে নিজের কপাল ঘষে ঘষে বলতে লাগলেন, ‘হায় উমর! তোমার কী হবে, যদি মৃত্যুর পর তোমার প্রতিপালক তোমাকে ক্ষমা না করেন!’ তিনি বললেন, ‘যদি আমাকে এই অবস্থায় দেখে আল্লাহর আমার ওপর একটু দয়া হয়, আর তিনি আমাকে মাফ করে দেন।’

এই কথা বলে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।

তাহলে তুমি আর আমি কী এমন করেছি যে, এত বেশি নিশ্চিন্ত হতে পারছি?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় সাহাবিগণের একজন ছিলেন মুয়াজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় হওয়া কিন্তু পৃথিবীতে সাধারণ কোনো বিষয় নয়। তিনি কেবল তাঁর পছন্দের নয়, ভালোবাসারও পাত্র ছিলেন। এই কারণে নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে কত মায়া করেই-না বলেছিলেন, ‘হে মুয়াজ! আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে ভালোবাসি।’[১২০]

তার জ্ঞান সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে হালাল-হারামের ব্যাপারে সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী হলেন মুয়াজ ইবনু জাবাল।’[১২১]

সেই মুয়াজ ইবনু জাবাল পর্যন্ত তাহাজ্জুদের সময় কেঁদে কেঁদে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! এখন সবার চোখ ঘুমিয়ে পড়েছে। সব নক্ষত্র অস্তমিত হয়েছে। আর আপনি হচ্ছেন চিরঞ্জীব। আপনার কাছে আমার জান্নাত প্রার্থনার গতি বড় ধীর। জাহান্নাম থেকে বাঁচার আকুতিও দুর্বল। আমার হিদায়াতের জন্য একটা আলোকবর্তিকা বানিয়ে রাখুন; কিয়ামতের দিন সেটা আমাকে দেবেন। আপনি কখনও অঙ্গীকারের বরখেলাপ করেন না।’[১২২]

মৃত্যুশয্যায় তিনি বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন। জ্ঞান ফিরে পেলেই বলছিলেন,
'হে আল্লাহ, আপনার সামনে দাঁড়ানোর চিন্তা আমাকে চিন্তিত করে তুলেছে। আপনার সম্মানের কসম করে বলছি! আমি আপনাকে ভালোবাসি। এখন আপনার ইচ্ছামতো আমার শ্বাস বন্ধ করুন।'

মৃত্যুর পূর্বক্ষণে তাকে এভাবে কাঁদতে দেখে লোকেরা বললো, 'আপনি কেন কাঁদছেন?'

তিনি জবাব দিলেন,

'মৃত্যু এসে পড়েছে বা দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে, এই ভয়ে আমি কাঁদছি না। আমার ভয়, সেখানে তো দুটি দল—জান্নাতি ও জাহান্নামি; আমি কোন দলের অন্তর্ভুক্ত তা এখনও জানি না।'[১২৩]

কিন্তু তুমি এখনো তরুণ, সুস্থ, সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দীনের পথে ফিরে আসতে পারছ না। আল্লাহর আজাবের কথা ভুলে গিয়ে তুমি রহমত পাওয়ার আশা করছ। এর মাধ্যমে তুমি কী বোঝাতে চাও? তাদের থেকেও ইসলাম তুমি বেশি বুঝেছ? (নাউজুবিল্লাহ!)

তুমি আর আমি এমনভাবে পৃথিবীতে আছি, যেন আমাদের সবকিছুই ঠিক আছে। 'আমি আখিরাতের ওসব ব্যাপার দেখে নেব, সমস্যা নাই।' কেন? কারণ গত বছর তুমি হজ করেছ বলে? না কি একটু বেশি সম্পদ দান করেছ এজন্য?

তাহলে আল্লাহ তাআলা যাদের ব্যাপারে নিজের সন্তুষ্টির কথা দুনিয়াতেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, তারা কেন এতটা চিন্তিত ছিলেন?

কারণ এটাই দীনের ভারসাম্য। খুব বেশি আশা কিংবা খুব বেশি ভয় নয়। পাখির দুটো ডানার মতো আশা আর ভয়কে সমান সমান রাখতে হবে; নতুবা ডানার কমবেশি হলে পাখি যেমন আকাশে উড়তে পারে না, তুমিও অধিক আশা বা অধিক ভয়ের কারণে দীন থেকে দূরে সরে যাবে।

তাহলে আল্লাহ কি দয়াশীল নন? অবশ্যই তিনি দয়াশীল। অবশ্যই আল্লাহ ক্ষমা করবেন; কিন্তু কাকে, কেন, কখন ক্ষমা করবেন—সেটা তো অন্তত জেনে নাও। যাতে সবসময় ক্ষমার আশায় তুমি ভুল দিকে অগ্রসর না হও, আবার অতিরিক্ত ভয়ে আশাও না হারিয়ে ফেলো। Be a Realistic Man... বাস্তবতায় থাকো। দীন বাস্তব জীবনের জন্য; কল্পনার জন্য নয়।

টিকাঃ
[১১৫] মুসনাদু আহমাদ: ২১৯৯৮।
[১১৬] সুরা আল-আরাফ ৭: ১৫৬।
[১১৭] সুরা আল-আরাফ ৭: ৯৯।
[১১৮] জামিউত তিরমিজি: ৩৬৮৬।
[১১৯] সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৭০; সুনানুত তিরমিজি: ৫৫৪০。
[১২০] সুনানু আবি দাউদ: ১৫২৪।
[১২১] সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৯০।
[১২২] উসুদুল গাবা: ৪/৩৭৭。
[১২৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩৯২, তাবাকাতু ইবনি সাদ: ৩/৫৮৩।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ভুলে যাওয়া জাহান্নাম

📄 ভুলে যাওয়া জাহান্নাম


আমাদের আলোচনাগুলো আজকে কেবল আশা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। যার ফলে শুধু জান্নাত, জান্নাত আর জান্নাতের আশায় আমরা পাগলপ্রায়; যদিও এটাই প্রত্যেক মুসলমানের স্বপ্ন এবং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তবে শুধু সুখের আলোচনার ফলে মানুষ আজ আল্লাহকে ভয় করতে ভুলে গেছে। মুসলমান মনে করছে, সে যা-ই করুক না কেন, তার শেষ গন্তব্য তো জান্নাত।

কিন্তু জান্নাতে পৌঁছানোর আগেই যে-সকল দুর্ভোগ পোহাতে হবে, যে বিশাল বিশাল সব প্রতিবন্ধকতা, তা হতে মানুষ বেখবর। শেষ গন্তব্য জান্নাত হলেও এর পূর্বের অবস্থা কেমন হবে, একমুহূর্তের জাহান্নাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তাও মানুষের জানা নেই।

তাই মানুষ কেবল ক্ষমাকারী আল্লাহকে চেনে, শাস্তিদাতা আর হিসাবগ্রহণকারী আল্লাহর পরিচয়টা ঠিকমতো জানে না, যার ফলে অনবরত পাপে ডুবে থেকেও সে জান্নাত কামনা করছে!

আমার ভাই/বোন! আখিরাত কোনো খেলতামাশার বিষয় নয়, এটা চূড়ান্ত বাস্তবতা। এটাই তোমার জীবনের প্রকৃত সত্য। সেই সত্যটা মেনে নাও। কিয়ামতের প্রকৃত অবস্থা কেমন হবে, তা খানিকটা জেনে নাও।

দয়া করে হাদিস থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ো না, এটা তোমার অন্তরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে। বাকি সব কল্পনা সরিয়ে রেখে নিচের হাদিসের লাইনগুলো থেকে বাস্তবতা অনুধাবন করতে চেষ্টা করো। নিজেকে বুঝিয়ে দাও: যদি উদ্দেশ্য ছাড়া থাকো, তবে এই অবস্থা তোমারও হতে পারে।

মাথার ওপরের বিশাল ওই সূর্যটা প্রতিদিন কত নিয়ম করে আলো দিয়ে যায়। সে যদি একমুহূর্ত বিলম্ব করে, তবে পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম বদলে যাবে। কিন্তু কখনো কি ভেবেছ, কেন সে সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দিন পৃথিবীতে আলো পাঠাতে এক সেকেন্ডও দেরি করলো না?

এর কারণ, সূর্য তোমার আমার মতোই মহান আল্লাহর একটা সৃষ্টি। আর এত বিশালতা নিয়েও সে নিজ স্রষ্টার প্রতি পূর্ণ অনুগত। স্রষ্টার অবাধ্যতা করার সাহস তার হয় না। তাই সময়ের হিসাবে এক সেকেন্ডও সে বিলম্ব করে না।

প্রতিদিন সূর্যের এই আসা-যাওয়ার সময়টা পৃথিবীর হিসাবে ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু তুমি কি জানো, কিয়ামতের দিন এই সূর্য একেবারে থমকে যাবে? সেদিন সূর্যকে নির্দিষ্ট
স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলা হবে। নিরবচ্ছিন্ন সেই আলোকরশ্মির তীব্রতায় মানুষের অবস্থা কেমন হবে ভাবতে পারছ?

সূর্যের প্রচণ্ড সেই উত্তাপে মানুষের অবস্থা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'বিচার দিবসে সূর্যকে মানুষের কাছে আনা হবে, তা হবে তাদের থেকে এক ফারসাখ (তিন মাইল) দূরে। ব্যক্তির আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে অবস্থান করবে। কারও ঘাম হবে টাখনু সমান, কারও হাঁটু সমান, কারও কোমর সমান, কারও মুখ সমান।'[১২৪]

সূর্য যেহেতু নড়াচড়া করবে না, তাহলে দিন-রাতের পালাবদলের কি কোনো সম্ভাবনা আছে? না নেই! কেননা সূর্যকে কেন্দ্র করেই এই পৃথিবীর দিন-রাত আবর্তিত হয়। আর সূর্য সেদিন এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে। এভাবে সূর্য কতক্ষণ থাকবে জানো?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'কিয়ামতের সেই দিনটা ৫০ হাজার বছরের সমান হবে।'[১২৫]

অর্থাৎ সূর্যের উত্তাপ পৃথিবীর ৫০ হাজার বছর মানুষকে সহ্য করতে হবে! মাথার ওপরে তো উত্তপ্ত সূর্য। নিচের অবস্থা কেমন হবে?

নিচে পঙ্গপালের মতো মানুষ কবরের ভেতর থেকে বের হতে থাকবে। মাটিতে মিশে যাওয়া তার শরীরের প্রতিটা অংশকে একত্র করা হবে। এরপর তার পুনরুত্থান ঘটবে। কেমন হবে সেই চিত্র?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'মানুষকে হাশরের মাঠে ওঠানো হবে নগ্নপদ, নগ্ন দেহ ও খাতনাবিহীন অবস্থায়। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! তখন তাহলে পুরুষ ও নারীগণ একে অপরের দিকে তাকাবে। তিনি বললেন, এ-রকম ইচ্ছা করার চেয়ে তখনকার অবস্থা হবে অতীব সংকটময়।'[১২৬]

একটা বিষয় লক্ষ করো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে কেবল উলঙ্গ অবস্থার কথা বললেই তো পারতেন। কিন্তু তিনি 'খাতনাবিহীন' কথাটা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন কেন জানো?

কারণ তিনি তোমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, একটা সময় তোমার শরীর থেকে যে সামান্য অংশকে পৃথক করা হয়েছিল, কিয়ামতের দিন সেইটুকুও আল্লাহর কাছ থেকে পালাতে পারবে না। তিনি সেইটুকু অংশকেও ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।

কিয়ামতের মাঠে সবচাইতে ভয়ংকর দৃশ্য কী হবে জানো? জাহান্নামের আগমন।

আকাশ আর জমিনের প্রত্যেক ভয়ংকর সত্তা, নিকৃষ্টতার চূড়ান্ত রূপ, যন্ত্রণার সর্বোচ্চ মাধ্যম, শাস্তির চূড়ান্ত ক্ষেত্র, রক্তিম অগ্নির হাজার হাজার বছরের জ্বলিত এক বিবর্ণ অগ্নি। আঁধার রঙের সেই অগ্নির উত্তাপ সমস্ত পাপীর সত্তাকে মুহূর্তেই গলিয়ে ফেলতে সক্ষম।

ভেতরে বিশাল অগ্নি ধারণ করা জাহান্নামকে সেদিন একটা হিংস্র পশুর আকৃতি দেওয়া হবে। ভেতরের মতোই তার বাইরের রূপ হবে সৃষ্টিকুলের মাঝে সবচাইতে ভয়ংকর। তার চরিত্র হবে সৃষ্টিকুলের সর্বোচ্চ হিংস্র। যার মাঝে সৃষ্টির সর্বনিকৃষ্ট সত্তা ইবলিস শয়তানকে শাস্তি দেওয়া হবে, তার নিকৃষ্টতা কেমন হবে তাও ভাবা দরকার।

চূড়ান্ত নিকৃষ্টতা, চূড়ান্ত হিংস্রতা, আর চূড়ান্ত ক্রোধের সাথে তর্জনে গর্জনে সমগ্র কিয়ামতের মাঠকে প্রকম্পিত করে হিংস্র পশুর ন্যায় ছুটে আসবে জাহান্নাম। বিচারের আগেই গিলে ফেলতে চাইবে সমস্ত পাপীদের। তার স্রষ্টার মহিমার সামনে মানুষের অবাধ্যতা আর অহংকার সে মেনে নিতে পারবে না।

সেই ভয়ংকর আগমনের চিত্র তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'যে-দিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন এর সত্তর হাজার লাগাম থাকবে। প্রতিটি লাগামের জন্য নিয়োজিত থাকবে সত্তর হাজার ফেরেশতা। তারা এগুলো ধরে এটাকে টানতে থাকবে।' [১২৭]

কুরবানির বিশাল ষাঁড়, বন্য হাতি, হিংস্র সিংহ, হিংস্র বাঘ, হিংস্র হায়না-কার হিংস্রতা তুমি জাহান্নামের সাথে মেলাবে?

একটা হিংস্র পশুর শরীরও তো চামড়ার, তার অন্তর হয় মাংসের। আর জাহান্নাম? জাহান্নামের সমস্ত সত্তায় তো আগুন আর আগুন। যাকে সামলাতে সত্তর হাজার ফেরেশতা লাগে, তার ভেতরে মেহমানদারিটা কেমন হবে ভেবে দেখো। মানুষ জান্নাতের সৌন্দর্য, সুখ ও সৌভাগ্য যেমন কল্পনা করতে পারবে না, তেমনই জাহান্নামের নিকৃষ্টতা, দুঃখ ও দুর্ভাগ্য কখনও কল্পনা করতে পারবে না।

এরপর মানুষ আর জাহান্নাম মুখোমুখি হয়ে যাবে। যাদের পোড়াতে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যেই মানুষেরা তার খাবার, যেই মানুষেরা তার মহান রব আল্লাহকে বিশ্বাস করেনি। তাদের সামনে পৌঁছানোর সেই মুহূর্ত কেমন হবে?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন জাহান্নাম হতে একটি গর্দান (মাথা) বের হবে। এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে, দুটি কান থাকবে যা দিয়ে সে শুনবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। সে বলবে, তিন ধরনের লোকের জন্য আমাকে নিয়োজিত করা হয়েছে- ১. প্রতিটি অবাধ্য অহংকারী জালিমের জন্য, ২. আল্লাহ তাআলার সাথে অন্য কোনো কিছুকে যে ব্যক্তি ইলাহ বলে ডাকে তার জন্য এবং ৩. ছবি নির্মাতাদের জন্য।' [১২৮]

তুমি কি জানো, পৃথিবীর কিছু মানুষ জাহান্নামের সঙ্গী হবে?

অর্থাৎ তারা এমন কিছু লোক, যারা সঙ্গীর মতোই জাহান্নামের সাথে যুক্ত থাকবে। কেউ কাউকে ছাড়তে চাইবে না। জাহান্নামের সঙ্গী হওয়া কতই-না দুর্ভোগের, কতই-না যন্ত্রণার!

কিন্তু কে হবে জাহান্নামের সঙ্গী? চলো জাহান্নামের মুখেই শুনে আসি-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন যখন মানবজাতিকে একই সমতল জমিনে (হাশরের মাঠে) সমবেত করা হবে, তখন সেখানে জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে। জাহান্নামের আগুনের লেলিহান শিখাসমূহের একটি আরেকটির ওপর উঠে যেতে থাকবে এবং ভেতরের উত্তপ্ত লাভা উদ্গিরিত হয়ে অন্য অংশকে গর্ভে চালান করে দিতে থাকবে। আর বলতে থাকবে, আমার রবের পরাক্রমের কসম! আমার আর আমার সঙ্গীর মাঝখানে এমন কিছু মানুষ বাধা হয়ে আছে, যাদের একেকটা করে গর্দান আমি চাই। হাশরের মাঠের লোকেরা তখন জিজ্ঞাসা করবে, কে তোমার সঙ্গী? জাহান্নাম বলবে, (পৃথিবীতে থাকা অবস্থায়) প্রত্যেক অহংকারী ও ক্ষমতার বাহাদুরেরা!'[১২৯]

অথচ আমরা তার মাঝেই থাকার স্বপ্ন দেখি। জান্নাতের চাইতে আমাদের যেন জাহান্নামের প্রতি আকর্ষণ বেশি। ফুলের চাইতে আমাদের অগ্নি বেশি পছন্দের। সৌরভে যেন মনে ভরে না, সব পুড়িয়ে ফেলতে ইচ্ছা হয়। আগুনের শয়তান মাটির মানুষের ভেতরেও আগুনের ভালোবাসা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। অথচ যেই অগ্নি আগুনের তৈরি জিনকেও পুড়িয়ে ফেলবে, যেই অগ্নি আগুনের শয়তানকে যন্ত্রণা দেবে, না-জানি তার উত্তাপ কত ভয়ানক!

হাসান আল-বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তোমাদের ওই জাহান্নামিদের সম্পর্কে কী ধারণা, যারা ৫০ হাজার বছর পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, যেখানে তারা কোনো খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে না এবং এক ফোঁটা পানিও পান করতে পারবে না। পানির পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হবে। তাদের পেট ক্ষুধায় আগুনের মতো জ্বলতে থাকবে। অতঃপর তাদের জাহান্নামের আগুনের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, আর সেখানে তাদের ফুটন্ত গরম পানি পান করানো হবে। যার উত্তপ্ততার কোনো তুলনা নেই; যে উষ্ণতা ও উত্তপ্ততা পরিপক্বতা পেয়েছে।'[১৩০]

ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ জাহান্নামের ভেতরকার অবস্থা সম্পর্কে বলেন, 'জাহান্নাম এমন ঘর, যার অধিবাসীদের শান্তি থেকে দূরে রাখা হয়েছে। সকল প্রকারের আনন্দ ও শান্তি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তাদের সাদা চামড়া কালো রঙে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের চেয়ে শক্ত হাতুড়ি দ্বারা তাদের পেটানো হচ্ছে। সেখানে শাস্তি দেওয়ার জন্য কঠোর হৃদয়ের ও কঠিন শাস্তিদাতা ফেরেশতা রয়েছে।

হায়! যদি তুমি তাদের দেখতে সেই ফুটন্ত পানিতে সাঁতার কাটতে। কঠিন শীতল পানিতে নিক্ষিপ্ত হতে। চিন্তা ও কষ্ট সর্বক্ষণ তাদের সঙ্গী হবে, ফলে তারা কখনও খুশি হতে পারবে না। তাদের অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, তাই তারা সে স্থান ত্যাগ করতেও পারবে না। স্থায়ীভাবে, চিরকাল সেখানেই তারা থাকবে, সেখান থেকে মুক্তি পাবে না। তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য যে-সকল ফেরেশতা নিযুক্ত করা হবে, তারা প্রত্যেকেই কঠোর হৃদয়ের হবে। যাদের ধমকের চিৎকার আজাব থেকেও বড় কষ্টদায়ক হবে। যাদের অনুশোচনা তাদের বিপদের চেয়েও অধিক শক্তিশালী। তারা নিজের যৌবনকালকে পাপ দ্বারা ধ্বংস করার কারণে কাঁদতে থাকবে। তারা যত কাঁদবে, কঠোর হৃদয়ের সেই ফেরেশতাগণ তাদের তত বেশি কষ্ট দিতে থাকবে। হায় আফসোস! তাদের জন্য, তারা তাদের রবের ক্রোধে পতিত হয়েছে! হায় আফসোস! তাদের বড় বিপদের জন্য! আহা! তাদের কত অপমান! যারা প্রতিনিয়ত সকল মানুষের সামনে অপমানিত হচ্ছে।

হে সৃষ্টির ঘৃণিত ব্যক্তিরা! এখন তোমাদের দুনিয়ার হারাম উপার্জন কোথায় গেল? আজ তোমাদের পাপ করার আগ্রহ কোথায় গেল? মনে হবে যেন, তা ছিল তাদের আকাশকুসুম কল্পনা। তারপর তাদের শরীরকে জাহান্নামে পোড়ানো হবে। যখনই তাদের শরীর পুড়ে যাবে, আল্লাহ তাআলা তাদের জ্বলিত দেহকে নতুন দেহ দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। যখন শরীরের চামড়া পুড়ে যাবে, নতুন চামড়া দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। সেখানে প্রতিনিয়ত তাদের শাস্তি বৃদ্ধি করতে কঠোর হৃদয়ের ফেরেশতারা সর্বক্ষণ নিযুক্ত থাকবে।'

তবে হ্যাঁ! ভয়ের সাথে সাথে আশার কথাও বলা প্রয়োজন। আর আশার কথা হলো, কিয়ামতের এই কঠিন মুহূর্তেও মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দয়া ও করুণার চাদরে ঢেকে কিছু মানুষ খুব স্বস্তিতে থাকবে। তিনি তাদের প্রশান্তি দান করবেন। ওপরের সূর্যের উত্তাপ থেকে তিনি তাদের আড়াল করে রাখবেন। মহান রব্বুল আলামিনের আরশের ছায়ায় তারা থাকবে নিরাপদ, প্রশান্তিময় অবস্থায়। আর জাহান্নাম, তারও সাধ্য নেই আরশের দিকে চোখ তুলে তাকানোর। সে শুধু তার সামনে থাকা পাপীদের দেখে ক্রোধিত হবে।

মহান রব আমাদেরও সেই আরশের ছায়ায় থাকার তাওফিক দিন। আমিন।

তবে কারা সেই সৌভাগ্যবান, তা শুনবে না?

তুমি হয়তো ভাবছ, তারা শুধুই নবি-রাসুল হবেন। কিন্তু না! তোমাকে একটা বিশেষ সুসংবাদ জানিয়ে দিই, কিয়ামতের কঠিন এই দিনে প্রশান্তির ছায়ার একটা দল হবে যুবকদের। তারা সেই সকল যুবক, যারা নিজের যৌবনে মহান আল্লাহর ইবাদত করেছে, তাঁর আনুগত্য করেছে, সর্বক্ষেত্রে তাকে এবং তাঁর দীনকে প্রাধান্য দিয়েছে।

আর সৌভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা এখন নিজেদের যৌবনকাল অতিবাহিত করছি। অর্থাৎ এই সময়টার আনুগত্য সেই হাজার বছরের যন্ত্রণাকে প্রশান্তিতে পরিণত করতে সক্ষম।

চলো, সেই সৌভাগ্যবানদের কথা জেনে আসি এবং আরশের ছায়ার জন্য প্রস্তুতি নিই।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই নেককার ব্যক্তিদের বর্ণনা দিয়ে বলেন,

'যে-দিন আল্লাহর (রহমতের) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সে দিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন:
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক।
২. যে যুবক আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে নিজের যৌবন কাটিয়েছে।
৩. সেই ব্যক্তি, যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে।
৪. সেই দু ব্যক্তি, যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য একত্র হয় এবং আল্লাহর জন্য পৃথক হয়।
৫. সেই ব্যক্তি, যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় সুন্দরী নারী নিজের দিকে আহ্বান করে; কিন্তু সে এই বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, "আমি আল্লাহকে ভয় করি।”
৬. সেই ব্যক্তি, যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করেছে বাম হাত তা জানতে পারে না।
৭. সেই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহর জিকর করে, আর তার দুচোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে। [১৩১]

এরপরেও কে আছে, ইসলামের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হবে না? এরপরেও মহান করুণাময়ের করুণা দেখে কার অন্তর বিগলিত হবে না?

এইটুকু এইটুকু কর্মের জন্য আরশের ছায়া? ভেবে দেখো একটু ব্যাপারটা ভালোমতো।

কিয়ামতের একমাত্র সুখ, একমাত্র প্রশান্তি, একমাত্র স্বস্তি—আরশের সেই ছায়া। যেখানে নবি-রাসুলগণ থাকবেন, শুহাদা, সিদ্দিকীন, আল্লাহর বড় বড় ওলিরা থাকবেন, সেখানে তোমাকেও জায়গা দেওয়া হচ্ছে। তার জন্য খুব বড় আর কঠিন কোনো শর্তও দেওয়া হয়নি। সত্যিই ইসলাম সবচাইতে সুন্দর! আর সুবহানাল্লাহ! আমাদের রব সবচাইতে মহান।

কিন্তু তুমি আমি তো এত বড় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করছি না। নিজের যৌবনকে অনর্থক কাজে নষ্ট করে ফেলছি।

বাস্তব জীবনে শর্তগুলো পূর্ণ করাও অতটা কঠিন ব্যাপার নয় কিন্তু। যেমন দেখো—

শাসক হয়তো তুমি হতে পারবে না, কিন্তু নিজের যৌবন তো আল্লাহর ইবাদতে কাটাতে পারো, তাই না?

এরপর একটি সুন্দর বিষয় লক্ষ করো, তুমি যদি আল্লাহর ইবাদতে জীবন কাটাও, অবশ্যই তোমার অন্তর মসজিদের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। কেননা প্রতিওয়াক্ত সালাতের জন্য মসজিদে যাওয়ার প্রতীক্ষা করা তোমার অভ্যাস হয়ে যাবে। আর এই সামান্য প্রতীক্ষাও কিন্তু তোমাকে আরশের ছায়ায় স্থান করে দিচ্ছে।

আরেকটা আনন্দের বিষয় হলো, তুমি যদি মসজিদে যেতে শুরু করো, তবে আপনা-আপনি তোমার সাথে আল্লাহর নেককার বা পবিত্র বান্দাদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো পূর্বপরিচয় বা বিশেষ বন্ধুত্ব ছাড়াই তারা তোমার নিকট প্রিয় হয়ে উঠবে। তাদের সাথে তোমার ভালোবাসা-টান কেবল আল্লাহর জন্য হবে। এভাবে তুমি আল্লাহর জন্য ভালোবাসার শর্তকেও কিন্তু পূরণ করতে পারছ। সুতরাং এক ঢিলে তিন পাখি।

তারপর আছে নারী। বিষয়টি নিয়ে বেশি ব্যাখ্যায় না-যাওয়াই ভালো। তবে তোমার জন্য নারীজনিত সমস্যার সবচাইতে কার্যকর সমাধান হলো, আল্লাহকে ভালোবাসা।

যে অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা থাকবে, তা কখনো কোনো নারী, দুনিয়া, বা অবৈধ কর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়বে না। হ্যাঁ, মানবিক দুর্বলতা থাকবেই। সেক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ পালন করে তোমাকে দশ হাত দূরে থেকে চোখ নামিয়ে ফেলতে হবে।

আর কোনো নারীর সাথে যদি তোমার বন্ধুত্ব, প্রেমিকা বা কথিত বোনের সম্পর্ক থেকে থাকে, তবে তাদের সঙ্গে এই মুহূর্তেই সব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার মাধ্যমে এখানে উল্লেখিত শর্তকে পূর্ণ করতে পারবে। কারণ জিনার আহ্বান পর্যন্ত পৌঁছানোর অনেক পূর্বেই যদি তুমি আল্লাহর ভয়ে ফিরে আসো, এটা আল্লাহকে আরও বেশি সন্তুষ্ট করবে।

এরপর আমরা কমবেশি দানসদকা সকলেই করি। অসহায় মানুষের প্রতি কার অন্তরেই বা মায়া থাকে না? কিন্তু সেই দান করাও যদি সামাজিক উপকার না হয়ে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, এর জন্য প্রতিদানের আশা করা হয়, তখন এটাও তোমাকে আরশের ছায়ায় স্থান করে দেবে। দান করার সময় এক হাতে মুঠ করে তার হাতে গুঁজে দিয়ে তৎক্ষণাৎ মুখ লুকিয়ে চলে আসো, যেন সে তোমার চেহারাও স্মরণ করতে না পারে। আর নিজের অপর হাতকেও বুঝতে দিয়ো না তুমি কী করেছ। এমনভাবে মানুষকে দাও, যেন এক হাত অপর হাতের দানকে স্বাভাবিক নড়াচড়া মনে করে।

আর নির্জনে কাঁদার বিষয়টি একটু প্রচেষ্টার। ওপরের সব স্তর পেরিয়ে আসা ছাড়া এই পর্যন্ত পৌঁছানো একটু কষ্টসাধ্য। তবে অধিক পরিমাণে তাওবা, নিজের পাপের প্রতি প্রবল অনুশোচনা নিয়ে তোমার রবের দয়াগুলোর কথা স্মরণ করে দেখো- অশ্রু আসতেও পারে।

মূলকথা, তুমি যদি চাও, তাহলে ৭টা শর্তের ৬টাই খুব সহজে পূরণ করে ফেলতে পারবে। শুধু একটা শর্ত পূরণ করলে তা কবুল না-ও হতে পারে। এজন্য সেফটি ফার্স্ট। তুমি ৬টাই পূরণ করে রাখো, যে-কোনো একটার বিনিময়ে আরশের ছায়ায় স্থান পেলেই তুমি মুক্ত। তখন জাহান্নামেরও সাধ্য নেই আল্লাহর কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নেয়!

টিকাঃ
[১২৪] মিশকাত, পৃষ্ঠা: ৪৮৩।
[১২৫] মুসনাদু আহমাদ: ২/১১২।
[১২৬] সহিহুল বুখারি: ৬৫২৭。
[১২৭] জামিউত তিরমিজি: ২৫৭৩。
[১২৮] জামিউত তিরমিজি: ২৫৭৪。
[১২৯] মুসনাদু আবি ইয়ালা: ২/১১৪৫।
[১৩০] উমদাতুল কারি: ২৮/৪৮৩。
[১৩১] সহি বুখারি: ৬৬০১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00