📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পাপের পরিচিতি

📄 পাপের পরিচিতি


আজকে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে পাপ। ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং সমস্ত পৃথিবীতে পাপেরই জয়জয়কার। এই দুনিয়ায় নিজেকে পবিত্র রাখা অনেক বেশি কষ্টসাধ্য। মানুষ আর পৃথিবীর মধ্যকার ভারসাম্য হারিয়ে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। মানুষ কেড়ে নিয়েছে পৃথিবীর প্রকৃত সত্তা আর পৃথিবী কেড়ে নিয়েছে মানুষের মানবিক আত্মা। অশান্তি আর অস্বস্তির মেঘে ঢেকে গেছে পৃথিবীর সুখের আকাশ।

পৃথিবী আর মানুষের মাঝে সকল ভারসাম্যহীনতার প্রকৃত কারণ হলো পাপ। তোমার অন্তরের অশান্তির কারণ পাপ, তোমার পরিবারের দুর্দশার কারণ পাপ, তোমার সমাজের নিকৃষ্টতার কারণ পাপ, তোমার দেশের করুণ পরিণতির কারণ পাপ, পৃথিবীর সমস্ত হানাহানি-জুলুমের কারণ পাপ। আর পাপ হলো-স্রষ্টার অবাধ্যতা, স্রষ্টার সাথে অহংকার, স্রষ্টার সাথে দূরত্ব।

কিন্তু তোমার জন্য সবচাইতে বড় ক্ষতি কি, জানো? তোমার উদ্দেশ্যহীনতা। তুমি দীন থেকে দূরে থাকার মূল কারণও তোমার পাপ। দীন আর তোমার মধ্যে একমাত্র প্রতিবন্ধকতা হলো-পাপ। তুমি এখনো নিজের রবের কাছে ফিরে না-আসার কারণ-পাপ।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ছোট পাপ, বড় পাপ

📄 ছোট পাপ, বড় পাপ


ইসলাম এই সমস্ত অপকর্ম বা পাপকে দু-ভাগে ভাগ করেছে। তন্মধ্যে একটি হলো কবিরা বা বড় পাপ, আর অন্যটি সগিরা বা ছোট পাপ।

শিরক, পিতামাতার অবাধ্যতা, সালাত ত্যাগ, হত্যা, জিনা, ব্যভিচার, মিথ্যা বলা, সুদ, ঘুস, গিবত, অশ্লীলতা ইত্যাদি হলো কবিরা বা বড় পাপের অন্তর্ভুক্ত। তার জন্য পরিপূর্ণ তাওবা অপরিহার্য। তাওবা (প্রত্যাবর্তনের সংকল্প) ছাড়া বড় পাপ মাফ হয় না। এ ছাড়াও কিছু সগিরা বা ছোট পাপ রয়েছে। তার জন্য তাওবা করা অপরিহার্য না হলেও তাওবা করাই উত্তম। মানুষের ইবাদতের মাধ্যমে এই ছোট ছোট পাপগুলোকে মুছে দেওয়া হয়।

কিন্তু অপরাধ ছোট হোক বা বড়, অপরাধকে অপরাধ হিসাবেই স্বীকার করতে হবে। অপরাধ থেকে দূরে থাকতে হবে। আমাদের মধ্যে অনেকেই সচরাচর খুব বড় পাপের সাথে যুক্ত হয় না। কিন্তু বড় বড় পাপ থেকে দূরে থাকলেও সে ছোট পাপের প্রতি পুরোপুরি উদাসীন থাকে। এমনকি সেই ছোট পাপগুলোকে পাপ হিসাবে স্বীকারও করে না অথবা গ্রহণ করতে চায় না। তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হলেও অনবরত এই সীমালঙ্ঘন তার জন্য ধ্বংসের কারণ হয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু। আর এটাই মূলত বড় পাপীদের সাথে সাথে সাধারণ অল্প পাপ করা ব্যক্তিদের হিদায়াত না-পাওয়ার মূল কারণ। তারা খুব বড় অবাধ্যতা হয়তো করে না, কিন্তু নিয়মিতভাবে ছোট পাপের ওপর অবিচল থাকে। এর ক্ষতি উল্লেখ করে আলিমগণ বলেন,

'কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ছোট গুনাহকে তুচ্ছ মনে তা বারবার করতে থাকে, তবে একসময় তা কবিরা গুনাহে পরিণত হয়।'

যদিও শুরুতে তোমার অবাধ্যতার মাত্রা অনেক ক্ষুদ্র ছিল, তবে এর ওপর অবিচলতার কারণে তোমার অন্তরে অহংকার তৈরি হয়। তুমি তখন আর পাপকে পাপ হিসাবে স্বীকার করতে চাও না, তোমার কাছে নিজ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই অধিক জরুরি হয়ে পড়ে। আর এভাবেই তোমার জীবনের সমস্ত সুখ হারিয়ে যেতে থাকে, যার কারণ তুমি সেটা খুঁজতে গিয়েও পাও না।

তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, 'তোমরা ছোট গুনাহ থেকেও দূরে থাকবে। কেননা, এগুলো জমা হয়ে মানুষকে ধ্বংস করে ছাড়ে।[৯৯]

এ ছাড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য একটি হাদিসে বলেছেন, 'তোমরা ছোট ছোট বা তুচ্ছ পাপ থেকেও দূরে থেকো। কেননা, ছোট ও তুচ্ছ গুনাহসমূহের উপমা হলো এরূপ, যেরূপ একদল লোক (সফরে গিয়ে) এক উপত্যকার মাঝে (বিশ্রাম নিতে) নামল। অতঃপর এ একটা কাঠ, ও একটা কাঠ এনে জমা করলো। এভাবে অবশেষে তারা এত কাঠ জমা করলো, যা দ্বারা তারা তাদের রুটি পাকিয়ে নিতে পারল। আর ছোট ছোট তুচ্ছ পাপের পাপীকে যখন ধরা হবে, তখন তা তাকে ধ্বংস করে ছাড়বে।'[১০০]

ক্ষুদ্র পাপের প্রতি এই উদাসীনতা কাটানোর উপায় হিসাবে হাসান আল-বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পাপের ক্ষুদ্রতার দিকে না তাকিয়ে যার অবাধ্যতা করছ, তাঁর বিশালত্বের দিকে তাকাও।'

সুতরাং তুমি মহান আল্লাহর বিশালত্ব ও শক্তি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করো। তুমি যদি নিজের প্রতিপালকের দয়া আর শাস্তি সম্পর্কে জেনে নাও, তবে তোমার অবাধ্যতার পরিমাণ কমে যাবে।

টিকাঃ
[৯৯] সহিহুল জামি: ২৬৮৭।
[১০০] মুসনাদু আহমাদ: ২২৮০৮。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 প্রকাশ্য পাপ

📄 প্রকাশ্য পাপ


পাপ মানুষের ক্ষতি করে, পাপ মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু ব্যক্তিগত অবাধ্যতার তুলনায় প্রকাশ্য অবাধ্যতার ক্ষতি মারাত্মক ভয়ংকর। কেননা একজন ব্যক্তি গোপনে অবাধ্যতা বা সীমালঙ্ঘন করলে সে শুধু নিজের ক্ষতি করে,
নিজেকেই কষ্ট দেয়। আর প্রকাশ্যে সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের সাথে সাথে আশেপাশের মানুষ এবং সমাজের সকলের ক্ষতি করে। তাই প্রকাশ্যে পাপ প্রদর্শনকারীর সাথে আল্লাহর আচরণ একটু বেশি কঠিন হবে। কুরআনে তিনি বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ ءَامَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْ ءَاخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
'যারা ইমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার পছন্দ করে, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।'[১০১]

কিয়ামতের দিনের অনেকগুলো নাম রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, 'প্রকাশের দিন', যেদিন মানুষের সকল কর্ম প্রকাশ করে দেওয়া হবে। পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগত সকল মানুষ, সকল জিন এবং সকল ফেরেশতার সামনে মানুষের পাপগুলো প্রকাশ করে দেওয়া হবে। এর থেকে চূড়ান্ত লাঞ্ছনা বা চূড়ান্ত অপমান আর নেই।

এ ছাড়াও প্রকাশ্যে পাপ প্রদর্শনকারীর সবচাইতে বড় ক্ষতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'আমার উম্মতের সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে; তবে ওই সব লোককে ক্ষমা করা হবে না, যারা পাপ করার পর তা অন্যের কাছে প্রকাশ করে দেয়। অন্যের কাছে প্রকাশ করার একটি দিক হলো, কোনো ব্যক্তি রাতের আঁধারে কোনো গুনাহ করলো এবং মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তির গুনাহটিকে গোপন রাখলেন। কিন্তু ভোর হলে সে নিজেই অন্য মানুষের কাছে বললো, হে অমুক! জানো, রাতে আমি এই এই কাজ করেছি। সারারাত মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তির পাপটি গোপন রাখলেন, আর ভোর হওয়ামাত্রই আল্লাহর ঢেকে রাখা পাপের বিষয়টি সে ব্যক্তি নিজেই প্রকাশ করে দিলো।'[১০২]

আমরা সকলেই পাপী। আমরা ভুল করি। তবে যে নিজের পাপগুলো সকলের সামনে প্রকাশ করে দেয়, তার ওপর দয়া করা হবে না। কেননা তার পাপ দ্বারা
প্রভাবিত হয়ে অনেক পবিত্র মানুষও পাপের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। তার কারণে অনেক মানুষ জাহান্নামের পথ বেছে নিয়েছে। সুতরাং বাহ্যিক পৃথিবীতে প্রদর্শিত পাপের পরিমাণ স্বল্প হলেও তার প্রভাব অনেক বেশি। তাই এর শাস্তিও অনেক কঠিন।

ধূমপান করা একটি পাপ। বড় পাপ না ছোট, তা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তুমি সেদিকে না গিয়ে কেবল এইটুকু জেনে রাখো, এটা একটা পাপ।

তবে কেউ যখন সবার সামনে প্রকাশ্যে একটা সিগারেট মুখে রেখে আগুন জ্বালায়, ধোঁয়া উড়িয়ে নিজের ধূমপানকারী হওয়ার কথা সমাজকে জানিয়ে দেয়, তখন তার ধূমপান করাটা যদিও ছোট অপরাধ ধরা হতো, কিন্তু এই অভ্যাস প্রকাশ করার কারণে তা বড় পাপে পরিণত হয়ে যায়।

অনেকে এমনভাবে ধূমপানের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যেন অক্সিজেনের পর এটাই তার দ্বিতীয় প্রয়োজন। তাই বন্ধুদের সাথে আড্ডায়, বাজারে, রাস্তায় বা যেখানে খুশি সেখানেই দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় ধূমপান করে। এখানে তার ধূমপান করার চাইতে তা প্রকাশ করাই মারাত্মক অপরাধ।

তাই বলে কি গোপনে ধূমপান করা যাবে? না। কারণ গোপনেও কেউ যদি অনবরত ধূমপানের মাধ্যমে পাপের ওপর অবিচল থাকাকে আল্লাহর ইচ্ছার চাইতে অধিক প্রাধান্য দেয়, এটা তার আমলনামায় কবিরা গুনাহ হিসাবে লিখে রাখা হয়।

এভাবে নিজের ক্ষুদ্র অপকর্মের প্রতি উদাসীনতাও মানুষকে মহান আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর বাহ্যিক প্রদর্শন পাপের জন্য ক্ষমার দরজা বন্ধ করে দেয়। তাই নিজের অবাধ্যতার জন্য আল্লাহর দয়া পেতে চাইলে ক্ষুদ্র পাপ এবং তা প্রকাশিত হওয়ার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।

এরপর গান-বাজনার কথাই ধরো। গান-বাজনা সরাসরি হারাম; এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর হারাম কিছু শ্রবণ করাও হারাম।

তবে আমাদের সমাজের বড় একটি অংশ গানের প্রতি আসক্ত। ভিখারি থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা, ঘরহারা নিঃস্ব মানুষ থেকে শুরু করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী- গানের আসক্তি সকল স্তরের মানুষের মধ্যে সমানভাবে বিদ্যমান।

তবে পাপ আর পুণ্যের অবস্থান বদলে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামে যা কিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সবাই করছে বলে তাকে বৈধতা দানের অধিকার কারও নেই। তাই ব্যক্তিগত আসক্তিকে সকলের সামনে প্রকাশকারী ব্যক্তির জন্য অকল্যাণের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এখানেও নিজে গান শোনার চাইতে অন্য কাউকে তা শোনানো বেশি গুরুতর অপরাধ।

তোমাদের কারও যদি গানের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি থেকে থাকে, তবে সে যেন তার পাপকে নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখে। সবার থেকে আড়ালে, ভলিউম কমিয়ে নিজে নিজেই শোনে। অন্য কেউ তার পাপের মাধ্যমে যেন প্রভাবিত না হয়। কিন্তু এর ওপরে অবিচলতাও অবশ্যই ধ্বংসাত্মক।

গান মানুষের অন্তরকে দ্রুত প্রভাবিত করে। এর মাধ্যমে পবিত্র অন্তরে অপবিত্রতা প্রবেশ করে। ইমানের স্তর কমে যায়। গানের প্রভাবে ইবাদতের প্রতিও তৈরি হয় উদাসীনতা।

এক্ষেত্রে এয়ারফোন, হেডফোন, এয়ারবার্ড বা TWS ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা উচিত। কেননা এগুলো গান শোনার উপকরণ হিসাবেই সমাজে প্রচলিত, যা ব্যবহার করা তোমার জন্য গান শোনার থেকেও বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে। কেননা এসব কানে থাকার দ্বারা বাহ্যিকভাবে তোমার গান শোনা প্রকাশ করে। তুমি যদি গান না-ও শুনে থাকো, তবে অন্যেরা বাহ্যিকভাবে তোমাকে গান শুনতে দেখে প্রভাবিত হয়ে গানের প্রতি আগ্রহী হতে পারে।

বোনদের মধ্যে অনেকেই এখনো হিজাব পরিধান করো না। অনেকেই পুরোপুরিভাবে পর্দা পালন করো না। আমরা তোমাকে তোমার রবের দিকে ফিরে এসে তাঁর আনুগত্য করার আহ্বান ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না। কেননা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দীনের ক্ষেত্রে সকলকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন।

আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে তাঁর অপছন্দের বিষয়গুলো তোমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। এখন তুমি তা মানবে কি না, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। আল্লাহ কখনোই তার দীনকে কারও ওপর চাপিয়ে দেননি; তোমার ওপরেও দেবেন না। এটা মূলত তার পরীক্ষার একটা অংশ, যাতে উত্তীর্ণ হতে চাইলে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের বিকল্প কিছু নেই।

নারীদের জন্য আজকে এমন অনেক পোশাক বেরিয়েছে, যা তার শরীরের সাথে সেঁটে থাকে। এর মাধ্যমে তার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আকার-আকৃতি প্রকাশ হয়ে যায়। কিন্তু এই অবস্থাতেও যতক্ষণ সে নিজ ঘরে অবস্থান করবে, ততক্ষণ সে কোনো প্রকার পাপে নিমজ্জিত হবে না।

কিন্তু যখনই কোনো নারী নগ্ন পোশাকে সমাজে বেড়িয়ে পড়ে, এর মাধ্যমে সে আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা লঙ্ঘন করে, আল্লাহর রহমতের চাদর ছিঁড়ে অবাধ্য হয়ে যায়। তার দ্বারা সমাজের পুরুষেরা অশ্লীলতায় আসক্ত হয়, অন্য নারী তার আধুনিকতায় প্রভাবিত হয়, কমবয়সিরা তার মতো করে নিজেকে প্রদর্শনের সংকল্প করে। এভাবে একজনের অশ্লীলতার প্রভাব ধীরে ধীরে সমাজের সর্বস্তরে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে।

এই অশ্লীলতা-প্রদর্শনকে অনেক নারীরা আজ তাদের অধিকার বানিয়ে ফেলেছে। তবে ইসলামের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অশ্লীলতার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। ইসলাম সকল প্রকার অশ্লীলতাকে হারাম বা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কোনো বোনের জন্যও অশ্লীল পোশাক পরিধান করার চাইতে সমাজে তা প্রদর্শন করা বেশি ক্ষতিকর।

এরূপ ছোট-বড় আরও যত পাপ রয়েছে, তা সম্পাদনের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার চাইতে বাহ্যিক প্রদর্শন অধিক ধ্বংসাত্মক। কেননা মানুষের পাপ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, ঘরের পাপকে যখন রাস্তায় এনে প্রদর্শন করে, আল্লাহর দেওয়া পর্দাকে সকলের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়, তখন তার অন্তর থেকে পাপের প্রতি দ্বিধাবোধ উঠে যায়। প্রকাশ্যে অবাধ্যতা তাকে অহংকারী বানিয়ে দেয়। অহংকারের ফলে সে অপকর্মের উন্মাদনায় মেতে যায়। আর মাত্রাতিরিক্ত অবাধ্যতার কারণে একটা সময় তার অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়। তার ওপর থেকে সকল রহমত উঠিয়ে নেওয়া হয়।

এ অবস্থায় তাকে ফিরে আসার আহ্বান করা হলে সে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে বলে, 'আমি জানি এটা পাপ, তাতে কী হয়েছে?' 'My Life My Rules, তুমি বলার কে?'

এ-রকম অবস্থায় মানুষের অন্তরের অনুশোচনাবোধ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় এবং প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছাও মরে যায়। সে আর কখনও তার রবের কাছে ফিরতে পারে না। ফলে আরও আরও অবাধ্যতা করে সে নিজেকে জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

টিকাঃ
[১০১] সুরা আন-নূর ২৪: ১৯।
[১০২] সহিহুল বুখারি: ৬০৬৯。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পাপের প্রতি উৎসাহ

📄 পাপের প্রতি উৎসাহ


প্রত্যাবর্তন বা তাওবার পথে অগ্রসরের ক্ষেত্রে প্রথম যে বিষয়টির প্রয়োজন হয়, তা হলো, অনুশোচনা বা নিজের পাপের প্রতি অনুতাপ।

কিন্তু আমাদের অনেকের অন্তরে অনুশোচনার বদলে আজকে পাপ সম্পর্কে গর্ববোধ জাগ্রত হয়েছে। যে কারণে আমরা একসাথে বসে নিজেদের অতীতের নিকৃষ্টতা আর অপকর্মের ফিরিস্তি রোমন্থনের প্রতিযোগিতা শুরু করে দিই। কে কত বেশি অশ্লীলতায় জড়িয়েছে, কে কত জন নারীর সাথে অপকর্ম করতে পেরেছে, কে কতজনকে ধোঁকায় ফেলতে পেরেছে—তা নিয়েই চলে আলোচনা। নিজের সমস্ত পাপের ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে ফেলার ক্ষতি সম্পর্কে তারা উদাসীন। সদ্য দীনে ফিরে আসা অনেক ভাইদের মধ্যেও এরূপ চিত্র লক্ষ করা যায়। পূর্বেকার জাহেলিয়াত স্মরণ করে তারা গর্বিত হয়, পূর্বেকার অপকর্মগুলো সকলের সামনে প্রকাশ করে তৃপ্তি পায়।

কিন্তু আমার প্রিয় ভাইয়েরা! এটা সম্পূর্ণভাবে হারাম। এটা তাওবার দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে মানুষকে আটকে রাখে।

এটা কখনোই দীন নয়। আমাদের তো নিজের কৃত অপরাধের ব্যাপারে লজ্জা থাকা উচিত। কেননা লজ্জা ইমানের অঙ্গ; যার লজ্জা নেই, তার ইমানও নেই।

এ ছাড়া নিজের সাথে সাথে তোমাকে সমাজে পাপের প্রচার-প্রসার রোধেও সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যেন অজ্ঞতাবশত কাউকে পাপের প্রতি উৎসাহিত না করি, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। কারণ এর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে বিরাট প্রতিদান।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'যে লোক সঠিক পথের দিকে ডাকে, তার জন্য সেই পথের অনুসারীদের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না। আর যে লোক বিভ্রান্তির দিকে ডাকে, তার ওপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকা হবে না।'[১০৩]

অর্থাৎ তুমি যদি কাউকে দীনের পথে দাওয়াত দাও, আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করো, তবে সে আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে যে সওয়াব লাভ করবে, তোমাকেও তার প্রতিদান দেওয়া হবে। তুমি যদি কাউকে সালাতের প্রতি উৎসাহ দাও, সালাতের গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা দাও, তবে সে যত বার সালাত আদায় করবে, তোমাকেও এর প্রতিদান দেওয়া হবে।

কিন্তু এর বিপরীত দিকটাও সত্য। অর্থাৎ তুমি যদি কাউকে হারামের প্রতি উৎসাহ দাও, পাপ করতে আদেশ করো বা তোমার কারণে কেউ যদি আল্লাহর অবাধ্য হয়, তবে তার পাপের একটা অংশ তোমাকেও দেওয়া হবে। তার কৃত অপরাধের শাস্তি তোমাকেও ভোগ করতে হবে।

তাই আমার ভাই/বোন! তোমাকে নিজের কর্মের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। তোমার কোনো কথা, কাজ, চলাফেরা, আচার-আচরণ, আদর্শ, তোমার ফেসবুক পোস্ট, তোমার দেওয়া রিঅ্যাক্ট, কমেন্ট, তোমার লেখা বা ছবির মাধ্যমে কেউ যেন কোনো নেগেটিভ মেসেজ না পায়। মানুষ মূলত অন্যের কর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়। কাছের বন্ধু, ভাই বা বোনের মাধ্যমে সে আরও দ্রুত প্রভাবিত হয়ে থাকে। তাই এমন কিছু প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকো, যা তোমার রব অপছন্দ করেন।

আল্লাহ তোমার ঢেকে রাখাই বেশি পছন্দ করেন—এটা তোমার পাপ হোক কিংবা পুণ্য।

যদি তুমি লজ্জিত না হও, অন্তত এমন আচরণ করো, যেন তুমি লজ্জিত। নিজের পাপ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সতর্ক থেকো; নতুবা অন্য কারও পাপের দায়ে জান্নাতের দরজা হতেই তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

উত্তম কর্মের ক্ষেত্রেও কাউকে বলার দরকার নেই। জীবনে অন্তত কিছু কর্ম অন্তত তোমার রবের জন্যই বিশেষভাবে তোলা থাকুক; নতুবা অনেক বেশি আমল সত্ত্বেও একনিষ্ঠতা বা ইখলাসের অভাবে তা মাটিতে রূপান্তরিত করে দেওয়া হবে। সুতরাং নিজের কর্মগুলোকেও লুকিয়ে রাখো এবং পারলে নিজেও লুকিয়ে থাকো। কেননা এই কঠিন ফিতনার মুহূর্তে ইমান রক্ষা করার এটাই সর্বোত্তম পন্থা।

টিকাঃ
[১০৩] সহিহ মুসলিম: ৬৬৯৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00