📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 সকল অশান্তির মূল

📄 সকল অশান্তির মূল


সুখ এবং দুঃখ-মানুষের অভ্যন্তরীণ সত্তার দুটি অবস্থা। অন্তরে তৈরি হওয়া দুই প্রকার অনুভূতি। এ দুটি অনুভূতিকেই কেন্দ্র করে একটা মানুষের পুরো জীবন চালিত হয়।

তবে এই অনুভূতি আপনা-আপনি তৈরি হয় না। এর কোনো ক্রয়-বিক্রয় নেই। মানুষের অন্তরে এই সুখ-দুখের অনুভূতি পৌঁছানোকে কেন্দ্র করেই সাজানো হয়েছে বিশাল এক পরিকল্পনা।

(স্রষ্টা+মানুষ=সুখ) আর (স্রষ্টা-মানুষ=দুঃখ) মানবসত্তার এ দুটি অনুভূতির নকশা।

সুখ স্রষ্টার সাথে সম্পর্কিত। দুঃখের অনুভূতিও স্রষ্টার সাথেই সম্পর্কিত। যা কিছু স্রষ্টার সাথে যুক্ত করে-তা-ই সুখ, স্বস্তি বা প্রশান্তি। আর যা কিছু স্রষ্টা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়-তা দুঃখ, কষ্ট বা যন্ত্রণায় প্রকাশ পায়।

সুখ-দুঃখের সংমিশ্রণেই পৃথিবী। দুনিয়ার প্রত্যেক ধাপে ধাপে বিভিন্নভাবে অনুভূতি দুটোকে বিন্যাস করা হয়েছে। সুখগুলোকে উত্তম কর্মের সাথে এবং দুঃখগুলোকে রাখা হয়েছে অপকর্মের মধ্যে। মানুষ স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেদিকেই পা ফেলবে, তার মধ্যকার সুখ বা দুঃখের অনুভূতি তার অন্তরকে প্রভাবিত করবে। এভাবেই মানুষ নিয়মের অনিবার্য পরিণতিতে পড়ে যায়।

তবে কোথায়, কোন পন্থায়, কোন কর্মে, কোন স্থানে সুখ আছে এবং কোথায় অসুখের ঘর, তা মানুষকে আসমানি বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মানুষ তার সিদ্ধান্তে স্বাধীন; তাকে নির্দিষ্ট কোনো দিকে যেতে, কোনোকিছু গ্রহণ করতে বা পন্থানুসরণ করতে বাধ্য করা হয়নি। মানুষ এই পৃথিবীতে ইচ্ছামতো থাকবে, চলবে, ফিরবে, খাবে, ঘুমাবে। সে কখন কী করবে, তা একান্ত তার ব্যাপার। তাই মানুষের সুখের দায়িত্ব তার নিজের, আবার দুঃখের সব দায়ভারও তার নিজের।

সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ নানা রকম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এর মধ্যে 'ভুল করা' বা 'ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা' মানুষের একটি স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার অস্তিত্বের সূচনালগ্ন হতেই ভুল করতে অভ্যস্ত। তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি শেখাতে মহান রব্বুল আলামিন যুগে যুগে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ, ভয়ভীতি জাগ্রত করতে চেয়েছেন। তাকে সুখী হওয়ার পথ দেখিয়েছেন। কিন্তু স্রষ্টাকে গ্রহণ না-করার মাধ্যমে সে আবারও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে দুঃখের কালো মেঘে মেঘে ছেয়ে গেছে তার অন্তর।

মানুষের সিদ্ধান্ত দ্বারা তার অন্তর প্রভাবিত হওয়ার মূল কারণ হলো—পাপ আর পুণ্য। পাপ হলো স্রষ্টার অবাধ্যতা, আর পুণ্য হলো স্রষ্টার আনুগত্য। স্রষ্টার সাথে সম্পর্কের এই তারতম্য মানুষের সকল উন্নতি বা ধ্বংসের মূল কারণ। মানুষ-সহ পৃথিবী, আকাশ, গ্রহ, নক্ষত্রের মূল পরিচালক হলেন স্রষ্টা—মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তাকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টিকুল আবর্তিত হয়।

তবে মানুষকে তার কেন্দ্র বেছে নেওয়ারও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। যার কারণে সকল মানুষ সমানভাবে স্রষ্টার নিকটবর্তী নয়। কেউ কাছে, কেউ একটু দূরে, কেউ আরেকটু দূরে, কেউ পুরোপুরি দূরে। আর কিছু মানুষ তো তার কেন্দ্রকেই বদলে ফেলেছে। তবে সব মানুষই অজ্ঞ নয়। যারা ভুল আর সঠিকের পার্থক্যটা বোঝে, যারা সুখ আর দুঃখের ক্ষেত্রগুলো জানে, যারা বাস্তবতা আর কল্পনার রহস্যটা জানে, যারা জানে যে তারা আসলে কী জানে না—তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে। কোনোভাবে ভুল করে স্রষ্টার সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে ফেললেও তারা পুনরায় আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নিজেকে স্রষ্টার আনুগত্যের সুতোয় বেঁধে ফেলে। কারণ তারা সুখের আসমানে উড়ে গন্তব্যের দিকে যেতে চায়, উদ্দেশ্যহীন হয়ে দুঃখের সমুদ্রে ভেসে বেড়াতে চায় না।

তুমি কি এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছ? না কি এখনও নিজের পুরোনো অভ্যাসগুলোই ধরে বসে আছ? ভাবছ আল্লাহর অবাধ্যতাগুলোই তোমাকে সুখ এনে দেবে, অথচ তার মধ্যে রয়েছে দুঃখ-যন্ত্রণা?

শোনো, তোমার অন্তরের সব কষ্ট-যন্ত্রণা ও দুঃখ-দুর্দশার কারণ হলো, তোমার ভুল সিদ্ধান্ত। এত দিন তুমি ভুল স্থানে গিয়েছ, ভুল কিছু বেছে নিয়েছ, ভুল পথে চলেছ; যার প্রভাবে অটোম্যাটিক নেমে এসেছে দুর্দশার বৃষ্টি। তুমি আল্লাহর অমোঘ নিয়মে পড়ে গেছ। একটার পর একটা যন্ত্রণা, একটার পর একটা কষ্ট সইতে সইতে তুমি ক্লান্ত। উঠে দাঁড়িয়ে নতুন করে চলার শক্তিও তোমার নেই। তবুও একটু সাহস করে এবার অন্তত নিজেকে এই অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করো। সঠিক পথটা বেছে নাও।

যা ভুল করে ফেলেছ, তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। চাইলেও কি আর সময়কে বদলে ফেলা যায়? হয়তো তোমার পাপের ভার পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়েছে, তাও বিশেষ সমস্যা নয়। কিন্তু তুমি যদি অনবরত পাপের মাঝেই ডুবে থাকতে চাও, ফিরতেই না চাও, ইচ্ছা করে বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নাও, ভুলের ওপর থাকার হঠকারিতা করো-তাহলেই সমস্যা।

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'প্রত্যেক আদমসন্তানই পাপী। আর সকল পাপীর মধ্যে উত্তম হলো তওবাকারীগণ।[৯৮]

তুমি কেবল পাপ হতে সতর্ক থাকবে, উন্নতির জন্য চেষ্টা করতে পারবে, অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার সংকল্প করতে পারবে। কিন্তু এরপরেও তুমি ভুল করবে। কেননা মানুষের অন্তরের ইমান আর বাহ্যিক অবস্থা সবসময় এক রকম থাকে না।

হজরত আদম আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে মানুষের সূচনা হয়। তাকেও সৃষ্টির পর বলে দেওয়া হয়েছিল, স্রষ্টাই তার মূল কেন্দ্র। কিন্তু শয়তান তাকেও বিভ্রান্ত করে নিজ স্রষ্টার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সর্বোচ্চ নৈকট্য থেকে তার এই দূরত্ব বেড়ে হয় সাত আসমান সমান! স্রষ্টা থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি যে ভুল করেছিলেন, তার সন্তানেরা এখনও তা-ই অনুসরণ করে চলেছে।

মানুষের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জানেন, মানুষ ভুল করবেই। তাই নিজ করুণা ও দয়া থেকে তিনি মানুষের জন্য রেখেছেন অগণিত সুযোগ। বলেছেন, যে-কোনো সময় নিঃশর্ত প্রত্যাবর্তন গ্রহণ করা হবে। তাওবার দরজা খুলে রেখেছেন মানুষের মৃত্যুক্ষণ পর্যন্ত। কিন্তু এরপরেও মানুষ অলসতা করে, উন্মুক্ত দরজা দেখে প্রত্যাবর্তনে বিলম্ব করতে থাকে। অথচ তার মৃত্যুর ক্ষণ আর এই উন্মুক্ত দরজার স্থায়িত্ব কতক্ষণ, তা তো সে জানে না! তিনি ফিরিয়ে নিতে চাইলেও মানুষ তার কাছে ফিরে আসতে চায় না!

শোনো আমার প্রিয় ভাই/বোন! হ্যাঁ, আমরা সকলেই পাপী। আমরা সকলেই ভুলে যাই। কিন্তু তাওবার দরজা খোলা থাকা সত্ত্বেও ফিরে না-যাওয়া আরেকটা পাপ, আরেকটা ভুল সিদ্ধান্ত। কিছু ক্ষেত্রে আমাদের পাপের অবাধ্যতার চাইতে 'পাপ-পরবর্তী কর্মকাণ্ড বা অবাধ্যতা' আরও বেশি মারাত্মক অপরাধের কারণ হয়। আমাদের পাপের চাইতে প্রত্যাবর্তনের অলসতা আরও বেশি ক্ষতির কারণ হয়।

তাই একটু সতর্ক থাকো। দুর্বলতা আসবেই। তবে তা যেন তোমার ধ্বংসের কারণ না বনে যায়। যন্ত্রণার পীড়া থেকে বাঁচতে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা থাকতে হবে।

সাধারণ দুর্বলতার কারণে প্রাথমিক অবস্থায় ছোট্ট একটা নিয়ম ভাঙা থেকেই অবাধ্যতা শুরু হয়। কিন্তু কেউ যদি একবার নিয়ম ভাঙার পর না শোধরায়, প্রত্যাবর্তন না করে, তখন পূর্বের পাপের প্রভাব এবং বর্তমানের দুর্বলতা একত্রে মিলে তাকে মূল কেন্দ্র থেকে আরও বেশি দূরে সরিয়ে দেয়। আরও বড় পাপের সাহস জোগায়। তার বিশ্বাসকে আরও দুর্বল করে দেয়। এভাবে সে চূড়ান্ত অবাধ্যতার দিকে ধাবিত হয়।

সর্বাবস্থায় তোমার জন্য প্রত্যাবর্তন অপরিহার্য। আর এটাই আলোর পথে চলার প্রথম ধাপ, সুখের প্রথম দরজা, স্রষ্টাকে জীবনের কেন্দ্র হিসাবে গ্রহণ করার প্রথম পদক্ষেপ। আর এই প্রত্যাবর্তন হতে পারে তোমার জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত।

টিকাঃ
[৯৮] সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫১।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পাপের পরিচিতি

📄 পাপের পরিচিতি


আজকে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে পাপ। ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং সমস্ত পৃথিবীতে পাপেরই জয়জয়কার। এই দুনিয়ায় নিজেকে পবিত্র রাখা অনেক বেশি কষ্টসাধ্য। মানুষ আর পৃথিবীর মধ্যকার ভারসাম্য হারিয়ে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। মানুষ কেড়ে নিয়েছে পৃথিবীর প্রকৃত সত্তা আর পৃথিবী কেড়ে নিয়েছে মানুষের মানবিক আত্মা। অশান্তি আর অস্বস্তির মেঘে ঢেকে গেছে পৃথিবীর সুখের আকাশ।

পৃথিবী আর মানুষের মাঝে সকল ভারসাম্যহীনতার প্রকৃত কারণ হলো পাপ। তোমার অন্তরের অশান্তির কারণ পাপ, তোমার পরিবারের দুর্দশার কারণ পাপ, তোমার সমাজের নিকৃষ্টতার কারণ পাপ, তোমার দেশের করুণ পরিণতির কারণ পাপ, পৃথিবীর সমস্ত হানাহানি-জুলুমের কারণ পাপ। আর পাপ হলো-স্রষ্টার অবাধ্যতা, স্রষ্টার সাথে অহংকার, স্রষ্টার সাথে দূরত্ব।

কিন্তু তোমার জন্য সবচাইতে বড় ক্ষতি কি, জানো? তোমার উদ্দেশ্যহীনতা। তুমি দীন থেকে দূরে থাকার মূল কারণও তোমার পাপ। দীন আর তোমার মধ্যে একমাত্র প্রতিবন্ধকতা হলো-পাপ। তুমি এখনো নিজের রবের কাছে ফিরে না-আসার কারণ-পাপ।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ছোট পাপ, বড় পাপ

📄 ছোট পাপ, বড় পাপ


ইসলাম এই সমস্ত অপকর্ম বা পাপকে দু-ভাগে ভাগ করেছে। তন্মধ্যে একটি হলো কবিরা বা বড় পাপ, আর অন্যটি সগিরা বা ছোট পাপ।

শিরক, পিতামাতার অবাধ্যতা, সালাত ত্যাগ, হত্যা, জিনা, ব্যভিচার, মিথ্যা বলা, সুদ, ঘুস, গিবত, অশ্লীলতা ইত্যাদি হলো কবিরা বা বড় পাপের অন্তর্ভুক্ত। তার জন্য পরিপূর্ণ তাওবা অপরিহার্য। তাওবা (প্রত্যাবর্তনের সংকল্প) ছাড়া বড় পাপ মাফ হয় না। এ ছাড়াও কিছু সগিরা বা ছোট পাপ রয়েছে। তার জন্য তাওবা করা অপরিহার্য না হলেও তাওবা করাই উত্তম। মানুষের ইবাদতের মাধ্যমে এই ছোট ছোট পাপগুলোকে মুছে দেওয়া হয়।

কিন্তু অপরাধ ছোট হোক বা বড়, অপরাধকে অপরাধ হিসাবেই স্বীকার করতে হবে। অপরাধ থেকে দূরে থাকতে হবে। আমাদের মধ্যে অনেকেই সচরাচর খুব বড় পাপের সাথে যুক্ত হয় না। কিন্তু বড় বড় পাপ থেকে দূরে থাকলেও সে ছোট পাপের প্রতি পুরোপুরি উদাসীন থাকে। এমনকি সেই ছোট পাপগুলোকে পাপ হিসাবে স্বীকারও করে না অথবা গ্রহণ করতে চায় না। তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হলেও অনবরত এই সীমালঙ্ঘন তার জন্য ধ্বংসের কারণ হয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু। আর এটাই মূলত বড় পাপীদের সাথে সাথে সাধারণ অল্প পাপ করা ব্যক্তিদের হিদায়াত না-পাওয়ার মূল কারণ। তারা খুব বড় অবাধ্যতা হয়তো করে না, কিন্তু নিয়মিতভাবে ছোট পাপের ওপর অবিচল থাকে। এর ক্ষতি উল্লেখ করে আলিমগণ বলেন,

'কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ছোট গুনাহকে তুচ্ছ মনে তা বারবার করতে থাকে, তবে একসময় তা কবিরা গুনাহে পরিণত হয়।'

যদিও শুরুতে তোমার অবাধ্যতার মাত্রা অনেক ক্ষুদ্র ছিল, তবে এর ওপর অবিচলতার কারণে তোমার অন্তরে অহংকার তৈরি হয়। তুমি তখন আর পাপকে পাপ হিসাবে স্বীকার করতে চাও না, তোমার কাছে নিজ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই অধিক জরুরি হয়ে পড়ে। আর এভাবেই তোমার জীবনের সমস্ত সুখ হারিয়ে যেতে থাকে, যার কারণ তুমি সেটা খুঁজতে গিয়েও পাও না।

তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, 'তোমরা ছোট গুনাহ থেকেও দূরে থাকবে। কেননা, এগুলো জমা হয়ে মানুষকে ধ্বংস করে ছাড়ে।[৯৯]

এ ছাড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য একটি হাদিসে বলেছেন, 'তোমরা ছোট ছোট বা তুচ্ছ পাপ থেকেও দূরে থেকো। কেননা, ছোট ও তুচ্ছ গুনাহসমূহের উপমা হলো এরূপ, যেরূপ একদল লোক (সফরে গিয়ে) এক উপত্যকার মাঝে (বিশ্রাম নিতে) নামল। অতঃপর এ একটা কাঠ, ও একটা কাঠ এনে জমা করলো। এভাবে অবশেষে তারা এত কাঠ জমা করলো, যা দ্বারা তারা তাদের রুটি পাকিয়ে নিতে পারল। আর ছোট ছোট তুচ্ছ পাপের পাপীকে যখন ধরা হবে, তখন তা তাকে ধ্বংস করে ছাড়বে।'[১০০]

ক্ষুদ্র পাপের প্রতি এই উদাসীনতা কাটানোর উপায় হিসাবে হাসান আল-বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পাপের ক্ষুদ্রতার দিকে না তাকিয়ে যার অবাধ্যতা করছ, তাঁর বিশালত্বের দিকে তাকাও।'

সুতরাং তুমি মহান আল্লাহর বিশালত্ব ও শক্তি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করো। তুমি যদি নিজের প্রতিপালকের দয়া আর শাস্তি সম্পর্কে জেনে নাও, তবে তোমার অবাধ্যতার পরিমাণ কমে যাবে।

টিকাঃ
[৯৯] সহিহুল জামি: ২৬৮৭।
[১০০] মুসনাদু আহমাদ: ২২৮০৮。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 প্রকাশ্য পাপ

📄 প্রকাশ্য পাপ


পাপ মানুষের ক্ষতি করে, পাপ মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু ব্যক্তিগত অবাধ্যতার তুলনায় প্রকাশ্য অবাধ্যতার ক্ষতি মারাত্মক ভয়ংকর। কেননা একজন ব্যক্তি গোপনে অবাধ্যতা বা সীমালঙ্ঘন করলে সে শুধু নিজের ক্ষতি করে,
নিজেকেই কষ্ট দেয়। আর প্রকাশ্যে সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের সাথে সাথে আশেপাশের মানুষ এবং সমাজের সকলের ক্ষতি করে। তাই প্রকাশ্যে পাপ প্রদর্শনকারীর সাথে আল্লাহর আচরণ একটু বেশি কঠিন হবে। কুরআনে তিনি বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ ءَامَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْ ءَاخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
'যারা ইমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার পছন্দ করে, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।'[১০১]

কিয়ামতের দিনের অনেকগুলো নাম রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, 'প্রকাশের দিন', যেদিন মানুষের সকল কর্ম প্রকাশ করে দেওয়া হবে। পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগত সকল মানুষ, সকল জিন এবং সকল ফেরেশতার সামনে মানুষের পাপগুলো প্রকাশ করে দেওয়া হবে। এর থেকে চূড়ান্ত লাঞ্ছনা বা চূড়ান্ত অপমান আর নেই।

এ ছাড়াও প্রকাশ্যে পাপ প্রদর্শনকারীর সবচাইতে বড় ক্ষতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'আমার উম্মতের সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে; তবে ওই সব লোককে ক্ষমা করা হবে না, যারা পাপ করার পর তা অন্যের কাছে প্রকাশ করে দেয়। অন্যের কাছে প্রকাশ করার একটি দিক হলো, কোনো ব্যক্তি রাতের আঁধারে কোনো গুনাহ করলো এবং মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তির গুনাহটিকে গোপন রাখলেন। কিন্তু ভোর হলে সে নিজেই অন্য মানুষের কাছে বললো, হে অমুক! জানো, রাতে আমি এই এই কাজ করেছি। সারারাত মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তির পাপটি গোপন রাখলেন, আর ভোর হওয়ামাত্রই আল্লাহর ঢেকে রাখা পাপের বিষয়টি সে ব্যক্তি নিজেই প্রকাশ করে দিলো।'[১০২]

আমরা সকলেই পাপী। আমরা ভুল করি। তবে যে নিজের পাপগুলো সকলের সামনে প্রকাশ করে দেয়, তার ওপর দয়া করা হবে না। কেননা তার পাপ দ্বারা
প্রভাবিত হয়ে অনেক পবিত্র মানুষও পাপের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। তার কারণে অনেক মানুষ জাহান্নামের পথ বেছে নিয়েছে। সুতরাং বাহ্যিক পৃথিবীতে প্রদর্শিত পাপের পরিমাণ স্বল্প হলেও তার প্রভাব অনেক বেশি। তাই এর শাস্তিও অনেক কঠিন।

ধূমপান করা একটি পাপ। বড় পাপ না ছোট, তা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তুমি সেদিকে না গিয়ে কেবল এইটুকু জেনে রাখো, এটা একটা পাপ।

তবে কেউ যখন সবার সামনে প্রকাশ্যে একটা সিগারেট মুখে রেখে আগুন জ্বালায়, ধোঁয়া উড়িয়ে নিজের ধূমপানকারী হওয়ার কথা সমাজকে জানিয়ে দেয়, তখন তার ধূমপান করাটা যদিও ছোট অপরাধ ধরা হতো, কিন্তু এই অভ্যাস প্রকাশ করার কারণে তা বড় পাপে পরিণত হয়ে যায়।

অনেকে এমনভাবে ধূমপানের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যেন অক্সিজেনের পর এটাই তার দ্বিতীয় প্রয়োজন। তাই বন্ধুদের সাথে আড্ডায়, বাজারে, রাস্তায় বা যেখানে খুশি সেখানেই দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় ধূমপান করে। এখানে তার ধূমপান করার চাইতে তা প্রকাশ করাই মারাত্মক অপরাধ।

তাই বলে কি গোপনে ধূমপান করা যাবে? না। কারণ গোপনেও কেউ যদি অনবরত ধূমপানের মাধ্যমে পাপের ওপর অবিচল থাকাকে আল্লাহর ইচ্ছার চাইতে অধিক প্রাধান্য দেয়, এটা তার আমলনামায় কবিরা গুনাহ হিসাবে লিখে রাখা হয়।

এভাবে নিজের ক্ষুদ্র অপকর্মের প্রতি উদাসীনতাও মানুষকে মহান আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর বাহ্যিক প্রদর্শন পাপের জন্য ক্ষমার দরজা বন্ধ করে দেয়। তাই নিজের অবাধ্যতার জন্য আল্লাহর দয়া পেতে চাইলে ক্ষুদ্র পাপ এবং তা প্রকাশিত হওয়ার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।

এরপর গান-বাজনার কথাই ধরো। গান-বাজনা সরাসরি হারাম; এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর হারাম কিছু শ্রবণ করাও হারাম।

তবে আমাদের সমাজের বড় একটি অংশ গানের প্রতি আসক্ত। ভিখারি থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা, ঘরহারা নিঃস্ব মানুষ থেকে শুরু করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী- গানের আসক্তি সকল স্তরের মানুষের মধ্যে সমানভাবে বিদ্যমান।

তবে পাপ আর পুণ্যের অবস্থান বদলে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামে যা কিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সবাই করছে বলে তাকে বৈধতা দানের অধিকার কারও নেই। তাই ব্যক্তিগত আসক্তিকে সকলের সামনে প্রকাশকারী ব্যক্তির জন্য অকল্যাণের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এখানেও নিজে গান শোনার চাইতে অন্য কাউকে তা শোনানো বেশি গুরুতর অপরাধ।

তোমাদের কারও যদি গানের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি থেকে থাকে, তবে সে যেন তার পাপকে নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখে। সবার থেকে আড়ালে, ভলিউম কমিয়ে নিজে নিজেই শোনে। অন্য কেউ তার পাপের মাধ্যমে যেন প্রভাবিত না হয়। কিন্তু এর ওপরে অবিচলতাও অবশ্যই ধ্বংসাত্মক।

গান মানুষের অন্তরকে দ্রুত প্রভাবিত করে। এর মাধ্যমে পবিত্র অন্তরে অপবিত্রতা প্রবেশ করে। ইমানের স্তর কমে যায়। গানের প্রভাবে ইবাদতের প্রতিও তৈরি হয় উদাসীনতা।

এক্ষেত্রে এয়ারফোন, হেডফোন, এয়ারবার্ড বা TWS ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা উচিত। কেননা এগুলো গান শোনার উপকরণ হিসাবেই সমাজে প্রচলিত, যা ব্যবহার করা তোমার জন্য গান শোনার থেকেও বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে। কেননা এসব কানে থাকার দ্বারা বাহ্যিকভাবে তোমার গান শোনা প্রকাশ করে। তুমি যদি গান না-ও শুনে থাকো, তবে অন্যেরা বাহ্যিকভাবে তোমাকে গান শুনতে দেখে প্রভাবিত হয়ে গানের প্রতি আগ্রহী হতে পারে।

বোনদের মধ্যে অনেকেই এখনো হিজাব পরিধান করো না। অনেকেই পুরোপুরিভাবে পর্দা পালন করো না। আমরা তোমাকে তোমার রবের দিকে ফিরে এসে তাঁর আনুগত্য করার আহ্বান ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না। কেননা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দীনের ক্ষেত্রে সকলকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন।

আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে তাঁর অপছন্দের বিষয়গুলো তোমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। এখন তুমি তা মানবে কি না, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। আল্লাহ কখনোই তার দীনকে কারও ওপর চাপিয়ে দেননি; তোমার ওপরেও দেবেন না। এটা মূলত তার পরীক্ষার একটা অংশ, যাতে উত্তীর্ণ হতে চাইলে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের বিকল্প কিছু নেই।

নারীদের জন্য আজকে এমন অনেক পোশাক বেরিয়েছে, যা তার শরীরের সাথে সেঁটে থাকে। এর মাধ্যমে তার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আকার-আকৃতি প্রকাশ হয়ে যায়। কিন্তু এই অবস্থাতেও যতক্ষণ সে নিজ ঘরে অবস্থান করবে, ততক্ষণ সে কোনো প্রকার পাপে নিমজ্জিত হবে না।

কিন্তু যখনই কোনো নারী নগ্ন পোশাকে সমাজে বেড়িয়ে পড়ে, এর মাধ্যমে সে আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা লঙ্ঘন করে, আল্লাহর রহমতের চাদর ছিঁড়ে অবাধ্য হয়ে যায়। তার দ্বারা সমাজের পুরুষেরা অশ্লীলতায় আসক্ত হয়, অন্য নারী তার আধুনিকতায় প্রভাবিত হয়, কমবয়সিরা তার মতো করে নিজেকে প্রদর্শনের সংকল্প করে। এভাবে একজনের অশ্লীলতার প্রভাব ধীরে ধীরে সমাজের সর্বস্তরে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে।

এই অশ্লীলতা-প্রদর্শনকে অনেক নারীরা আজ তাদের অধিকার বানিয়ে ফেলেছে। তবে ইসলামের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অশ্লীলতার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। ইসলাম সকল প্রকার অশ্লীলতাকে হারাম বা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কোনো বোনের জন্যও অশ্লীল পোশাক পরিধান করার চাইতে সমাজে তা প্রদর্শন করা বেশি ক্ষতিকর।

এরূপ ছোট-বড় আরও যত পাপ রয়েছে, তা সম্পাদনের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার চাইতে বাহ্যিক প্রদর্শন অধিক ধ্বংসাত্মক। কেননা মানুষের পাপ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, ঘরের পাপকে যখন রাস্তায় এনে প্রদর্শন করে, আল্লাহর দেওয়া পর্দাকে সকলের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়, তখন তার অন্তর থেকে পাপের প্রতি দ্বিধাবোধ উঠে যায়। প্রকাশ্যে অবাধ্যতা তাকে অহংকারী বানিয়ে দেয়। অহংকারের ফলে সে অপকর্মের উন্মাদনায় মেতে যায়। আর মাত্রাতিরিক্ত অবাধ্যতার কারণে একটা সময় তার অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়। তার ওপর থেকে সকল রহমত উঠিয়ে নেওয়া হয়।

এ অবস্থায় তাকে ফিরে আসার আহ্বান করা হলে সে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে বলে, 'আমি জানি এটা পাপ, তাতে কী হয়েছে?' 'My Life My Rules, তুমি বলার কে?'

এ-রকম অবস্থায় মানুষের অন্তরের অনুশোচনাবোধ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় এবং প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছাও মরে যায়। সে আর কখনও তার রবের কাছে ফিরতে পারে না। ফলে আরও আরও অবাধ্যতা করে সে নিজেকে জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

টিকাঃ
[১০১] সুরা আন-নূর ২৪: ১৯।
[১০২] সহিহুল বুখারি: ৬০৬৯。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00