📄 প্রশান্তির সালাত
কোনোকিছু জানা, শোনা বা পাঠ করা ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষকে সফলতার দিকে চালিত করতে পারে না, যতক্ষণ না সেই জ্ঞানগুলোকে সে তার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে।
সালাতের গুরুত্ব আমরা জেনেছি। সালাত তোমাকে কী দিতে পারে সেটাও তুমি বুঝেছ। কিন্তু কথাগুলো এভাবে তথ্য হিসাবে মস্তিষ্কে জমা করে রেখে দিলে হবে না। বাস্তবতায় প্রয়োগ না করলে এই জ্ঞান, এই তথ্য আর তোমার এই প্রচেষ্টা অর্থহীন।
সালাতের প্রতি আরেকটু বেশি মনোযোগী হওয়ার জন্য কিছু নসিহত পেশ করছি। যদি এগুলো প্রয়োগের হিম্মত করতে পারো, তবে তোমার সালাত এক ভিন্ন স্তরে পৌঁছে যাবে। ইবাদতের সঠিক মর্ম উপলব্ধি করতে পারা যাবে ইন-শা-আল্লাহ। চলো, শুরু করা যাক।
* প্রথমেই বেশ ভালোভাবে অজু করে নাও। একটু সময় নিয়ে একদম ধীরে ধীরে বসে অজু করো; তাড়াহুড়ো কোরো না。
* এরপর নিজের ইচ্ছা বা নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নাও। কেননা ইচ্ছা বা নিয়তের বিশুদ্ধতা ব্যতীত কোনো কর্মই কবুল বা গ্রহণ করা হয় না।
তুমি যেহেতু একজন দাস, সুতরাং তোমার ইচ্ছা হবে দাসত্ব, তোমার মনিবের সন্তুষ্টি, তাঁর আদেশপালন।
এবার 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনির মাধ্যমে তোমার রবের বড়ত্ব স্বীকার করে দাঁড়িয়ে যাও। তবে স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় দাঁড়াতে যেয়ো না। কার সামনে দাঁড়িয়েছ, সেটাও তো ভেবে দেখো। পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যাও যে, তোমার এই দাঁড়ানোটা তিনি দেখছেন। তাই এমনভাবে দাঁড়াও, যেমনভাবে দাঁড়ালে তোমাকে সবচাইতে দুর্বল মনে হয়।
হাত আর পা দুটোকে আঁটোসাঁটো করে,
পূর্ণ বিনয়ের সাথে,
মহান করুণাময়ের নিকট করুণার আশায়,
মনিবের সামনে দাস হয়ে,
মহান ক্ষমতাশালীর সামনে নিঃস্ব হয়ে,
মহান সম্পৎশালীর সামনে ভিখারি হয়ে,
মহান শাস্তিদাতার সামনে শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে,
মহান প্রেমময়ের সামনে ভালোবাসা পাওয়ার প্রবল বাসনা নিয়ে দাঁড়িয়ে যাও।
এমনভাবে দাঁড়াও, যেন দূর থেকেও তোমাকে দেখে মনে হয়, তুমি কারও সামনে আছ, কিছু চাইছ। কীভাবে দাঁড়ালে তোমাকে এমন দেখতে লাগে, সেটা তুমি নিজেই খুঁজে নাও।
মানুষ সাধারণত তার রবের সামনে দুইবার দাঁড়ায়: একবার তো কিয়ামতের দিন হিসাব দেওয়ার সময়, আরেকবার আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ মেলে সালাতে। হাশরের ময়দানে পৌঁছানোর আগেই নিজের রবের সামনে দাঁড়ানোর অভ্যাস করে নাও। আজ যদি দাঁড়িয়ে থাকাটা অভ্যাস হয়ে যায়, আজ যদি তাঁর সামনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তাঁকে চিনে ফেলো, ভালোবেসে ফেলো; তাহলে কাল কিয়ামতের ময়দানে হিসাব গ্রহণের সময় তুমি ভীত হবে না। পালিয়ে যাওয়ার চাইতে তাঁর কাছাকাছি গিয়েই তুমি বেশি শান্তি পাবে। শাস্তির সংবাদে আহাজারির বদলে নিজ মালিকের কাছে রহমত প্রত্যাশা করতে পারবে।
এটাই সালাত। এটা স্বাভাবিক কোনো ওঠাবসা নয়। এটা মালিকের প্রতি তাঁর দাসের আনুগত্য, বিশ্বস্ততা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তাই এ বিশেষ মুহূর্তে অন্য কারও বা অন্য কিছুর কথা অন্তরে আসতে দিয়ো না। এটা তোমার আর তোমার রবের একান্ত মুহূর্ত।
এবার সানা পাঠের মাধ্যমে তোমার রবের গুণকীর্তন করো। কোনো রাজদরবারে প্রবেশ করেই রাজার সামনে যেভাবে তার প্রশংসা করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, 'আপনি প্রকৃত মালিক আর আমি আপনার রাজ্যের একজন নগণ্য বাসিন্দা মাত্র', সেভাবেই মহান অধিপতির স্তুতি করে তাঁর সন্তুষ্টি হাসিল করে নাও।
অর্থটা জেনে নিয়ো, নতুবা এর মর্ম বুঝতে পারবে না। নিজেকে উদাসীদের দল থেকে বের করে আনো।
* তোমাকে তোমার রবের এত নিকটবর্তী দেখে একজনের কিন্তু সহ্য হতে চাইবে না। বলো তো সে কে? ঠিক ধরেছ! সে হলো অভিশপ্ত শয়তান。
এত দিন ধরে ভুলভাল বুঝিয়ে, প্রবৃত্তির জালে আটকে তোমাকে উদাসীন করে রেখেছিল তোমার রব থেকে। কিন্তু আজ তাকে অগ্রাহ্য করে তুমি যে নিজের রবের কাছে ফিরে এলে, এটা তার সহ্য হবে না। সুতরাং এখন সেই দুআটা পড়ো। কোনটা? যেটা দিয়ে আমরা আমাদের রবের কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাই— অর্থাৎ 'আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রজিম'।
শুধু মুখস্থ বলে দিয়ো না। এমনভাবে বলো যে, সামনে বিশাল বড় শত্রুবাহিনী আর তুমি একা। এর মোকাবিলা করার মতো শক্তি বা সামর্থ্য কোনোটাই তোমার নেই। প্রচণ্ড অক্ষমতা নিয়ে একমাত্র সক্ষম সত্তার নিকট সাহায্য চাও। এমনভাবে ডাকো তোমার রবকে, যেমন করে ডাকে শিশু, যখন তাকে মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তুমি তো সত্যিই তোমার রবের কাছে যেতে চাও; কিন্তু শয়তান ও তার বাহিনী তোমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে তোমাকে। তাই তুমি নিজের মালিকের কাছে আশ্রয় চাইছ। আকুল হয়ে পাগলপারা সে ডাক: মালিক, আমাকে বাঁচাও।
এক্ষেত্রে শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ একটি সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, 'যদি কখনো পালের কোনো কুকুর তোমাকে দেখে আক্রমণের চেষ্টায় ঘেউ ঘেউ শুরু করে, তুমি তার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হোয়ো না; বরং রাখালকে ডেকে তার সাহায্য চাও। সে-ই তোমাকে কুকুরের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করবে।'
• আউজুবিল্লাহ শেষ। এবার বিসমিল্লাহ বলে ফাতিহাতে মনোযোগী হও। • নিজের রবকে সামনে রেখে • হৃদয় দিয়ে তাঁর মহত্ত্ব আর পবিত্রতা অনুভব করে • প্রতিটা শব্দকে উপলব্ধি করে • গভীর আগ্রহের সাথে • তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে... ফাতিহা পাঠ করো।
সামনে আমরা ফাতিহা সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। আপাতত ফাতিহার সাথে আরেকটা সুরা পাঠ করো। তবে প্রতিদিনের মতো নির্দিষ্ট করে রাখা ফীল-নাস থেকে নয়; বরং নিয়মের বিপরীতে গিয়ে নাবা-হুমাযাহ বা অন্যান্য সুরাগুলো হতে পড়ো, তাহলে কেরাত ধীরে ধীরে পড়তে হবে আর তুমি কুরআনের স্বাদ পেতে থাকবে। আয়াতের কারণে তোমার রাকাত দীর্ঘ হবে আর সওয়াবও বেড়ে যাবে বহুগুণ।
• এরপর রুকু। • নিঃস্ব পথিকের অসহায়ত্ব নিয়ে, • তাঁর বিশালতার সামনে নিজের তুচ্ছতা স্বীকার করে, • সকল অহংকারের চাদর ফেলে দিয়ে, • তাঁর এখতিয়ারে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে...
সেই মহান সত্তার সামনে নিজেকে ঝুঁকিয়ে দাও। দাসের বৈশিষ্ট্যই হলো, মনিবের সামনে নিজেকে অবনমিত করে রাখা।
এটা তোমার রুকুর অংশ। কিন্তু তিনবার তাসবিহ পাঠ করেই উঠে যেয়ো না। এত মহত্ত্বের অধিকারী রবের সম্মানে, তোমার প্রতি এত এত করুণা আর রহমতের বিনিময়ে, জান্নাতের মতো মহাপ্রতিদানের পরেও মাত্র তিনবার প্রশংসা সমীচীন নয়। আর তিনবার পাঠ করাটা সর্বস্তরের দাসদের অভ্যাস; তুমি বরং আরেকটু বেশি করো, তাহলে দয়া ও করুণাও আরেকটু বেশি পাবে। কেননা অধিক প্রশংসাকারীর প্রতি সন্তুষ্টির পরিমাণও একটু বেশি হয়।
এরপর রুকু থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাও। তবে এই দাঁড়িয়ে থাকাও সাধারণ কোনো দাঁড়িয়ে থাকা নয়। এটা এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
কাঁধের ওপর পাপের পাহাড় নিয়ে, ক্লান্ত শ্রান্ত অবস্থায় ক্ষমা ও করুণার আশায় দাঁড়িয়ে থাকা। এখন হয়তো অন্য কারও হিসাব গ্রহণ চলছে। আর কিছুক্ষণ বাদে তোমাকেও ডাকা হবে। ফলাফল জানার জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এক অপেক্ষা। সুতরাং ক্ষমা ও রহমত লাভের জন্য রুকু থেকে দাঁড়িয়ে বেশি বেশি প্রশংসা করো, এতে যদি সেদিনের দুশ্চিন্তা খানিকটা কমানো যায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর তাহাজ্জুদের রুকু হতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়কে দীর্ঘ করতেন। তিনি স্থির হয়েই দাঁড়িয়ে থাকতেন। আর বারবার বলতেন,
لِرَبِّي الْحَمْدُ لِرَبِّي الْحَمْدُ.
'প্রশংসা কেবল আমার প্রতিপালকের জন্য।[৮৬]
এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা তোমাকে দাসত্ব উপলব্ধি করাবে। আর অনুতাপের প্রবল অগ্নি তোমার ভেতরের সব অবাধ্যতার আকাঙ্ক্ষা পুড়িয়ে ফেলবে। তোমার অন্তর ছিঁড়ে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে চাইবে।
ভেতরের সব অহমিকা ত্যাগ করে... অনুগ্রহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, করুণার প্রার্থনা আর অনুতাপ নিয়ে... পূর্ণ ভক্তির সাথে, তুমি নিজের সমস্ত অস্তিত্বকে মাটির সাথে মিশিয়ে দাও। তোমার কপাল আল্লাহর সামনে ধুলোতে লুটাও, তোমার মুখমণ্ডলকে মাটিতে বিছিয়ে দাও। তোমার নাক, মুখ, হাঁটু, মাথা ও পা যেন মাটিতে মিশে থাকে।
সালাতের মধ্যে সিজদা হলো দাসত্বের স্বীকৃতি প্রদানের সর্বোত্তম প্রকাশ। নিজেকে মাটির সাথে মিশিয়ে তোমার রবকে জানিয়ে যাও, তুমি এখন তাঁর কাছে ফিরে আসার জন্য তৈরি। এত দিন যা করেছ, যেথায় গিয়েছ, সবটা ছিল তোমার ভুল।
রাজদরবারকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান করে, বাদশাহের উপস্থিতির দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে তুমি সিজদায় চলে যাও। বাদশাহের একবারে কাছাকাছি গিয়ে তাঁর দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে ফেলা বা তাকে গুরুত্ব না দিয়ে অন্য কিছু করা যেমন অপরাধ,
সিজদায় গিয়ে মহান রবের চূড়ান্ত নৈকট্যলাভের পর তোমার অন্তর অন্য কোথাও পড়ে থাকা, অন্যকিছু চিন্তা করাও তাঁর মর্যাদার সামনে বেয়াদবি।
জেনে রেখো, সিজদা কেবল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য নয়; সিজদা হতে হবে অন্তর থেকেও। তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঝুঁকিয়ে দেওয়াটা বাহ্যিক সিজদা আর বাহ্যিক সালাতের অংশ। তুমি যদি সালাতের প্রকৃত স্বাদ পেতে চাও, তবে শরীরের সাথে তোমার অন্তরকেও মাটিতে লুটিয়ে দিতে হবে।
মানুষের অন্তর বড় অবাধ্য! অবাধ্যতা করাটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই সে হয়তো আপনি-আপসে আসতে চাইবে না। সে আসতে না চাক বা পালিয়ে যাক, ধরে বেঁধে হলেও জোর করে তাকে মাটিতে নত করে রাখো।
সিজদায় গিয়ে চোখ বন্ধ রেখো না; খুলে দাও। দৃষ্টিকে নাকের ডগার দিকে একত্র রেখো; আশেপাশে বা সরাসরি মাটিতে ফেলো না। মাটিতে মিশে যাওয়া এই ঝাপসা দৃষ্টি তোমাকে বুঝিয়ে দেবে, সত্যিই তুমি গোলাম। মস্তিষ্কে নিজের এই নতুন পরিচয়টা গেঁথে রাখবে, যাতে পরবর্তীকালে সে তোমার অবাধ্যতার সময় তোমাকে সতর্কবার্তা পাঠায়। এরপর তাসবিহ পাঠ করো। কেবল তিনবার নয় কিন্তু, আরেকটু বেশি—পাঁচবার, সাতবার।
সিজদায় মনোযোগ রাখাটা একটু কষ্টসাধ্য। এজন্য যদি পারো আরবিতে দু-একটা ছোট দুআ অর্থসহ মুখস্থ করো। সিজদায় তাসবিহ পাঠের পর দুআগুলো পড়তে থাকো, তাহলে কিছুটা হলেও মনোযোগী হতে পারবে ইন-শা-আল্লাহ। এটা শরীয়তসম্মত। এর অনুমতি রয়েছে। তবে দুআ অবশ্যই আরবিতেই করতে হবে। এই ছোট্ট দুআ দুটি তোমার জন্য উপকারী হতে পারে :
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ.
'হে আল্লাহ! আপনার স্মরণে, আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে এবং আপনার উত্তম ইবাদাতে আমাকে সাহায্য করুন।[৮৭]
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَاهْدِنِي وَارْزُقْنِي.
'হে আল্লাহ! আপনি আমাকে মাফ করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথপ্রদর্শন করুন এবং আমাকে জীবিকা দান করুন।[৮৮]
এভাবে তুমি যদি যথাযথ গুরুত্বের সাথে সালাত আদায় করতে পারো, সিজদার মর্ম অনুধাবনে সক্ষম হও আর সিজদার মধ্যে লুকিয়ে রাখা নৈকট্যের স্বাদ একবার আস্বাদন করতে পারো, তবে তোমার শরীর বরফের মতো জমে যাবে, তোমার মস্তিষ্কের ভাবনারা থেমে যাবে, তোমার অঙ্গগুলো সিজদা থেকে ওঠার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলবে, একপর্যায়ে তুমি নিজেকেও ভুলে যাবে। আর এইভাবে কিয়ামত পর্যন্ত সিজদায় পড়ে থাকলেও তোমার বিন্দুমাত্র কষ্ট অনুভব হবে না।
সাহল ইবনু আব্দিল্লাহ ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'অন্তরও কি সিজদা করে?' তিনি বলেছিলেন, 'অবশ্যই! আল্লাহর কসম! কেউ যদি পূর্ণাঙ্গ খুশু-খুজুর সাথে সিজদা করার মজা পেয়ে যেত, তাহলে সে কিয়ামত পর্যন্ত আর সিজদা হতে মাথা তুলতে চাইত না।'[৮৯]
ফরজ সালাতে এত কিছু ভাবার সময় থাকে না। কেননা এটা আনুগত্য ও অনুসরণের প্রশিক্ষণ। ফরজ সালাত তোমাকে নির্দ্বিধায় মান্য করতে শেখায়, এখানে ইমামের অনুসরণ অপরিহার্য। তুমি অন্যান্য সুন্নাত বা নফল সালাত এভাবে ভেবে ভেবে উপলব্ধির সাথে আদায় করতে পারো।
মনে রেখো, প্রথাগতভাবে দায়সারা সালাত আদায়ের মাধ্যমে ইবাদতের মর্ম বোঝা সম্ভব নয়। সালাতে এই উদাসীনতার জন্য আল্লাহর নিকট জবাবদিহিও করতে হবে। তুমি শুধু রীতিনীতিগুলো পালন করে কোনোমতে সালাতের দায়িত্ব সারতে চাইলে সালাত থেকে কিছুই খুঁজে পাবে না।
সালাতের পরিপূর্ণ স্বাদ গ্রহণ, প্রকৃত দাসত্ব অনুভব এবং ইবাদতের দায়িত্ব পূরণ করতে চাইলে তোমাকে সালাত আদায় করাকে ভালোবাসতে হবে। দাসত্ব করাকে ভালোবাসতে হবে, ইবাদত করাকে ভালোবাসতে হবে। কেননা মানুষ যা করতে ভালোবাসে, সেটাই সে সবচাইতে বেশি গুরুত্বের সাথে পালন করে।
তাই তুমি তোমার রবের ঘরকে ভালোবাসো, সালাতে তোমার রবের সম্মুখে দাঁড়ানোকে ভালোবাসো, রুকুতে ঝুঁকে থাকাকে ভালোবাসো, রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাকে ভালোবাসো, সিজদায় নিজেকে লুটিয়ে রাখাকে ভালোবাসো, তোমার রবের সামনে বসে থাকাকে ভালোবাসো। এভাবে ভালোবাসার মাধ্যমে চেষ্টা করলে সালাতের প্রতি উদাসীনতা কাটিয়ে উঠতে পারবে ইন-শা-আল্লাহ。
টিকাঃ
[৮৬] সুনানুন নাসায়ি: ১০৬৯。
[৮৭] সুনান বি দাউদ: ১৫২২。
[৮৮] সহিহ মুসলিম: ৬৭৪২।
[৮৯] মাজমুউল ফাতাওয়া: ২১/২৮৭。
📄 সালাতের উপলব্ধি
সালাতের মধ্যে কিরাআত বা সূরাপাঠের মুহূর্তটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর কালাম বা বাণীগুলো পাঠের মাধ্যমে মানুষ তাঁর নিকটবর্তী হয়; নিজের সৃষ্টি- উদ্দেশ্যের প্রতি অবিচলতা আসে।
কিন্তু আমরা আরবি ভাষা জানি না। তরজমা পড়ে নিতে পারতাম, তাও পড়া হয় না। নিজের রবের পাঠানো বার্তার গুরুত্ব আমাদের কাছে এতই কম। আল্লাহ আমাকে কী বলতে চান, তা বুঝতে চেষ্টা না-করার কারণে মুখে আল্লাহকে স্বীকৃতি দেওয়া সত্ত্বেও, নিজের মুখে আখিরাতের কথা বলে, জান্নাত জাহান্নামের আজাবের কথা উচ্চারণ করেও মানুষ সালাম ফিরিয়েই দুনিয়ার আলোচনা জুড়ে দেয়! সালাতে পাপের শাস্তির করুণ দৃশ্যের কথা বলেও সালাত শেষে মসজিদে বসেই সম্পদের হিসাব, চাকুরির হিসাব, ব্যাবসার হিসাব, দুনিয়াবি অর্জন-ক্ষতির হিসাব কষতে থাকে! মসজিদ থেকে বেরিয়েই সুদ-ঘুস-মাপে কম দেওয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে!
সালাতে ফাতিহা হলো আল্লাহ এবং বান্দার কথোপকথন। অথচ আমরা ফাতিহাকে কখনও তার যথাযথ গুরুত্ব দিইনি। সে কারণে আমরা এখনও সালাতের গভীরতা বা খুশু-খুজু অর্জন করতে পারিনি। তাই এবার চলো, ফাতিহাকে একটু গভীর থেকে জেনে আসি, যাতে সালাতের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা যায়।
যারা নিয়মিত সালাত আদায় করো, তারা হয়তো জানো, ফাতিহা ছাড়া সালাত অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু তুমি কখনো ভেবে দেখেছ কি, কুরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে শুধু ফাতিহাকেই কেন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলো?
আমি যদি আমার সালাতের শুরুতে আজকে ফাতিহা, কাল ইখলাস, পরের দিন ভিন্ন কোনো সুরা পাঠ করি, তাহলে সমস্যা কী? সবগুলোই তো কুরআনের সুরা, তাই না?
মহান আল্লাহ তাআলা কেন তাহলে আমাদের সবার জন্য সমস্ত ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল সব সালাতেই সুরা ফাতিহা পাঠকে আবশ্যক করে দিলেন?
কোনো বিষয়ের অধিক পুনরাবৃত্তিতে মানুষের বিরক্তবোধ হয়। অথচ প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যে শুধু ফরজ সালাতেই সুরা ফাতিহাকে ১৭ বার পাঠ করা হয়। সেক্ষেত্রে ১৭ বার একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি মানুষের বিরক্তির কারণ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু দৈনিক এতবার ফাতিহা পাঠ করা সত্ত্বেও কখনো কি তোমার এর প্রতি বিরক্তি এসেছে?
তুমি স্বাভাবিকভাবে যেখানে একটা কথা দ্বিতীয়বার পছন্দ করো না, একটা কাজ বারবার করতে বললে রাগান্বিত হও, কোনো নিয়ম বারবার পালন করতে গিয়ে তোমার অনীহা জন্মায়, একই অধ্যায় বারবার পড়তে তোমার ভালো লাগে না, জোরপূর্বক দ্বিতীয়বার একই কাজ করতে তুমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলো—সেখানে কোনো অর্থ জানা ছাড়াই তুমি দিনে ১৭ বার ফাতিহা পাঠ করছ; তবুও এর প্রতি তোমার বিরক্তি আসছে না। ব্যাপারটা খেয়াল করেছ কি?
তবে একটা সুরাকে দৈনিক ১৭ বার পাঠের পরেও কিন্তু তুমি কী পড়ছ, তা এখনও জানো না। তোমার মতো বোকা আর কে আছে বলো তো?
প্রযুক্তির দুনিয়ার কোনো নতুন আপডেট কিংবা সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার পুরোটা না-জানা পর্যন্ত যেখানে তোমার স্বস্তি হয় না, সেখানে কী করে অর্থ না-জেনেই ফাতিহা পাঠ করে যাচ্ছ? ভেবেছ? তাও একবার-দুবার না, প্রতিদিন ১৭ বার!
তাই এবার অন্তত ফাতিহাকে জানতে চেষ্টা করো, গুরুত্বের সাথে উপলব্ধি করো। এর মধ্যকার মুক্তোগুলোকে জেনে তোমার সালাতকে সুন্দর করে তোলো। চলো, শুরু করা যাক।
ফাতিহা কেন আল্লাহ এবং তাঁর বান্দার কথোপকথন, বলতে পারবে? এর কারণ হলো, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তোমার পাঠ করা ফাতিহার জবাব দেন। সুবহানাল্লাহ!
নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মহান আল্লাহ বলেছেন, আমার এবং বান্দার মাঝে আমি সালাতকে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে নিয়েছি এবং আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চায়। বান্দা যখন বলে,
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।
আল্লাহ তাআলা তখন বলেন,
حَمِدَنِي عَبْدِي. আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।
বান্দা যখন বলে,
الرَّحْمَنِ الرَّحِيم.
তিনি অতিশয় দয়ালু এবং করুণাময়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, أَثْنَى عَلَى عَبْدِي. বান্দা আমার প্রশংসা করেছে, গুণগান করেছে।
বান্দা যখন বলে, مَالِكِ يَوْمِ الدِّين. তখন আল্লাহ বলেন, তিনি বিচারদিনের মালিক।
مَجَدَنِي عَبْدِي. আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে। আল্লাহ আরও বলেন,
مَرَّةً فَوَّضَ إِلَى عَبْدِي. বান্দা তার সমস্ত কাজ আমার ওপর সমর্পণ করেছে। এরপর বান্দা যখন বলে,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِين. আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তখন আল্লাহ বলেন,
هَذَا بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ. এটা আমার এবং আমার বান্দার মধ্যকার ব্যাপার। (এখন) আমার বান্দার জন্য রয়েছে, সে যা চায়। আর যখন বান্দা বলে,
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ.
আমাদের সরল-সঠিক পথে পরিচালনা করুন, যে-সব লোকদের আপনি নিয়ামত দান করেছেন; তাদের পথে নয়, যাদের ওপর আপনার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।
তখন আল্লাহ বলেন,
هَذَا لِعَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ.
'এসবই আমার বান্দার জন্য এবং আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চায়।[৯০]
অনেকে এটা জানা সত্ত্বেও ফাতিহা পাঠের সময় নিজের উদাসীনতা ছাড়তে পারে না! অথচ তুমি যদি ফাতিহাকে জানো, ফাতিহাকে বোঝো, এর ওপর পূর্ণ মনোযোগী হও, অনুধাবন আর উপলব্ধির মাধ্যমে তোমার সালাতের মধ্যে এর প্রতিটি আয়াত পাঠ করতে থাকো—তবেই তুমি ইবাদতের প্রকৃত স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে।
আমরা ফাতিহা শুরুর পূর্বেই বলি,
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ.
অর্থাৎ, পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।
এখানে بِسْمِ শব্দের অর্থ: ‘নামে’।
এরপর রয়েছে الله এখানে একটু লক্ষ করো, আল্লাহ তাআলা তাঁর সমস্ত গুণবাচক নামের মধ্যে ‘আল্লাহ’ নামকে নির্দিষ্ট করেছেন। তোমার সালাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুমি বারবার এই নাম উচ্চারণ করতে থাকো।
আর কুরআনের একমাত্র সুরা আত-তাওবা ব্যতীত বাকি সকল সুরার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আরম্ভ করতে হয়।
এরপর রয়েছে,
الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ.
যার অর্থ হলো, যিনি সবচাইতে অধিক করুণাময় আর সবচাইতে অধিক দয়ালু।
এই শব্দদুটো উচ্চারণের সময় তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন হচ্ছে, তুমি কি আল্লাহ তাআলার রহমত অনুভব করতে পারছ কি না-তা দেখে নাও। আল্লাহ তাআলা তাঁর দয়ার মাধ্যমে তোমাকে সালাত শুরু করতে বলেছেন। তিনি চান, তুমি তাঁর মহত্ত্বের সাথে সাথে তাঁর দয়া ও রহমতেরও স্বীকৃতি দাও।
আল্লাহ তাআলার দয়া কেমন, জানো?
চলো একটা গবেষণা জেনে আসি। যেখানে বলা হয়েছে, মা এবং তার সদ্যঃপ্রসূত শিশুর মধ্যকার বন্ধন হলো পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী বন্ধন।
এখানে সকল মা ও শিশুর কথা বলা হয়নি। শুধু সেই সন্তানের সাথে তার মায়ের বন্ধন শক্তিশালী, যে এখনো তার মায়ের দুধ পান করে। তারা বলে, এর চাইতে শক্ত বন্ধন আর একটাও নেই।”
অন্য আরেকটি গবেষণা বলছে, একই মায়ের যদি দুটো সন্তান থাকে, তবে যার দুধপানের বয়স পেরিয়ে গেছে, তার তুলনায় দুগ্ধপোষ্য সন্তানের সম্পর্ক অধিক গাঢ় হয়।
এই পৃথিবীতে মা এবং সন্তানের বন্ধন সবচাইতে সুদৃঢ়। মা তোমাকে সবচাইতে বেশি ভালোবাসেন। তিনি তোমার জন্য নির্ঘুম রাত অতিবাহিত করেন, তোমাকে দুধপান করাতে মাঝরাতে জাগ্রত হন, তোমার অসুস্থতায় রাতভর চিন্তায় ডুবে থাকেন। মা এই পৃথিবীতে অতুলনীয় এক নিয়ামত।
কিন্তু এত ভালোবাসা সত্ত্বেও তুমি যদি তোমার মাকে এমন কোনো কষ্ট দাও, যা তিনি সহ্য করতে পারবেন না-তাহলে সেই মমতাময়ী মা-ও তোমাকে ত্যাগ করবেন, তোমাকে সন্তান হিসাবে স্বীকার করতে চাইবেন না।
তোমার বাবা! যিনি সারাক্ষণ তোমাকে নিয়ে গর্ব করে বলেন: এটা আমার সন্তান। যিনি নিজের কাঁধের ওপর বসিয়ে সারা জগৎকে জানিয়ে দিতে চান, তুমি তার সন্তান। তোমার জন্য যিনি নিজের জীবন-যৌবন সবকিছুই ক্ষয় করেছেন। সেই বাবাকেও যদি তুমি তার সহ্যক্ষমতার অধিক কষ্ট দাও, বা তার অন্তর ভেঙে দাও-তিনিও তোমাকে অস্বীকার করবেন, তোমাকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবেন।
তোমার সবচাইতে প্রিয় বন্ধু, জন্মের পর থেকে যার সাথে তুমি বেড়ে উঠেছ, যার কাঁধে হাত রেখে তুমি জীবনের সকল সুখী মুহূর্ত পেরিয়েছ, যাকে ছাড়া তুমি নিজের জীবন অসম্পূর্ণ মনে করো—সেই বন্ধুকে একবার কষ্ট দাও, বা তার সাথে অন্যায় করে দেখো, সেও তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে।
মূলকথা, এই পৃথিবীতে যারাই তোমাকে বেশি ভালোবাসুক না কেন, তোমাকে এত দিন গুরুত্ব দিয়ে আসুক না কেন, তোমার বড় কোনো ভুলের জন্য তারাও তোমাকে ছেড়ে যেতে পারে; কিন্তু তোমার রব মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর ভালোবাসা মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু-স্বজন সকলের চেয়ে বেশি।
তিনি বলেছেন, 'আমার বান্দা! তুমি যা কিছু করেছ, যা কিছু করছ আর যা কিছু করার ইচ্ছা করছ, তা ছেড়ে দিয়ে শুধু আমার কাছে পরিবর্তনের ইচ্ছা নিয়ে ফিরে আসো, আমার আনুগত্য করো, আমার কাছে ক্ষমা চাও—আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো।'
তোমার রব তোমাকে বলেছেন, 'আমার বান্দা! পাপ করতে করতে তোমার গুনাহ যদি আকাশ পর্যন্ত পৌঁছায়, কিন্তু তুমি যদি আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক না করো, তবে আমি তোমার সব গুনাহ মাফ করে দেবো। তুমি যদি আকাশসমান গুনাহ নিয়ে আমার কাছে ফিরে আসো, আমি সেই পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে আসব, যা তোমার সকল পাপ ক্ষমা করার জন্য যথেষ্ট হয়।'
এরপর তিনি তাঁর সকল মায়া, সকল আবেগ, সকল দয়া এবং অনুগ্রহ মিশ্রিত করে বলেছেন, قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
'বলো, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'
একজন অবাধ্য পাপী ব্যক্তির জন্য কুরআনের এই আয়াতটা সবচেয়ে সান্ত্বনার এবং স্বস্তির। এখানে আল্লাহ কিন্তু বলেননি, 'হে মানুষেরা'; বরং তিনি বলেছেন, 'হে আমার বান্দারা'!
এই 'আমার বান্দা' শব্দের মধ্যে তিনি তোমার-আমার মতো পাপীদেরও আপন করে নিয়েছেন। তিনি তাঁর রহমতের চাদর মেলে ধরে বলছেন, 'যদি তুমি নিজের ওপর বাড়াবাড়ি করে থাকো, তুমি যদি অবাধ্যতা করে থাকো, অনবরত পাপে লিপ্ত হও, তুমি যদি এখনো পাপের মাঝেই ডুবে থাকো, তোমার যদি আজ রাতেও পাপ করার ইচ্ছা থাকে—তবুও তুমি আমার রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। তুমি যদি জিনাকারী হও, তবুও নিরাশ হোয়ো না; তুমি যদি মাদকাসক্ত হও, তবুও নিরাশ হোয়ো না; তুমি যদি অশ্লীলতায় আসক্ত হও, তবুও নিরাশ হোয়ো না; তুমি যদি শিরক ব্যতীত অবাধ্যতার সকল স্তর পেরিয়ে যাও, তবুও নিরাশ হোয়ো না—আমি তোমার সকল পাপ ক্ষমা করে দেবো।'
তবে তাঁর ক্ষমা করার পেছনে অবশ্যই শর্ত রয়েছে। তা হলো, তাওবা করা বা ফিরে আসা। কেননা আল্লাহ তাআলা কোনো পাপী বান্দাকে তাওবা করা ব্যতীত ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করতে চেয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তুমি আগে ক্ষমা চাও, আমার কাছে ফিরে এসো—তবেই সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
হ্যাঁ! আল্লাহ সকল কবিরা বা বড় পাপকেও ক্ষমা করে দেন। তবে তা কেবল সেই পাপ হতে পুরোপুরি তাওবার মাধ্যমে।
আর তাওবা কিংবা প্রত্যাবর্তনের জন্যও কিছু শর্ত রয়েছে। যার মধ্যে একটি হলো: যে পাপ থেকে তাওবা করা হবে, তার দিকে আর ফিরে না-যাওয়া। অর্থাৎ পুরোপুরিভাবে নিজের অপকর্ম ছেড়ে দেওয়া; আর পুরোপুরি ছাড়তে না-পারা তাওবা কবুল না-হওয়ার লক্ষণ।
সুতরাং ইচ্ছামতো কুরআনের আয়াতের অর্থ করে পাপ করতে থাকা আর ক্ষমা চাইলেই ক্ষমা পেয়ে যাব—এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন, তবে পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তনের পর।
আল্লাহ তাআলা সেই সত্তা—যিনি তোমার এক অজু থেকে আরেক অজুর মধ্যবর্তী সময়ের পাপ (সগিরা গুনাহ) এমনিতেই ক্ষমা করে দেন, এক সালাত থেকে অন্য সালাতের মধ্যবর্তী সময়ের পাপ অটোমেটিক ক্ষমা করে দেন, এক জুমআ থেকে আরেক জুমআর মধ্যবর্তী সময়ের পাপ ক্ষমা করে দেন, রমজান থেকে অন্য রমজান-মধ্যবর্তী পাপ ক্ষমা করে দেন, এক হজ থেকে আরেক হজের মধ্যবর্তী সময়ের পাপ ক্ষমা করে দেন। (ফুটনোট: সগিরা গুনাহ এইসব আমলের দ্বারা অটোমেটিক মাফ হতে থাকে। কিন্তু কবিরা গুনাহ মাফ হয় না তাওবা ছাড়া। ওদিকে সগিরা গুনাহ বারবার করতে থাকলে তা কবিরা গুনাহের সমতুল্য হয়ে যায়।)
তিনি বলেন,
‘আমার বান্দা! যদি তুমি আমাকে মনে মনে স্মরণ করো, তবে আমিও মনে মনে তোমাকে স্মরণ করব। তিনি তোমাকে ডেকে বলেন, আমার বান্দা! তুমি যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসো, আমি তোমার দিকে এক হাত অগ্রসর হব; তুমি যদি আমার দিকে হেঁটে আসো, আমি তোমার দিকে দৌড়ে ছুটে যাব।[৯৩]
এটাই আল্লাহর দয়া এবং করুণা। আর এটাই الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ-এর প্রকাশ। এরপর আমরা বলি,
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ. সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব।
আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকিছুর প্রশংসা করাটা নিজের সময় নষ্ট করা ছাড়া কিছুই নয়। যেজন্য কারও প্রশংসা করছি, সেটাও আল্লাহরই দান, আল্লাহরই তাওফিক; সুতরাং অধিক প্রশংসার যোগ্য আসমান-জমিনে মূলত আল্লাহই। আমরা তাঁকে চিনে উঠতে পারিনি, চেনার চেষ্টাও করিনি। আল্লাহর পরিচয়-বিশালত্ব-গুরুত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতার দরুন তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে আমরা উদাসীন।
ছোট্ট একটা গ্রাম বা শহরে বাস করে এটাকেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর ভাবতে থাকি। আমরা ভুলে যাই, এই দেশের আয়তন কত বড়! এই দেশের তুলনায় সমস্ত পৃথিবী কত বড়! আর আল্লাহ তাআলা বললেন, তিনি رَبِّ الْعُلَمِينَ অর্থাৎ, সৃষ্টিকুলের রব। এর মাধ্যমে কী কী বোঝাতে চেয়েছেন, ভাবো তো!
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মধ্যে সবচাইতে ক্ষুদ্র নক্ষত্র হলো সূর্য, যা আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহের কয়েক লক্ষ গুণ বড়। সূর্যের সাথে আরও অসংখ্য (বিলিয়ন বিলিয়ন) নক্ষত্র-গ্রহ-উপগ্রহের সমন্বয়ে তৈরি হয় মাত্র একটা গ্যালাক্সি। আর এরকম বড়-ছোট অগণিত (বিলিয়ন বিলিয়ন) গ্যালাক্সির সমন্বয়ে তৈরি এই মহাবিশ্ব!
যদি কোনো মানুষ শুধু আমাদের গ্যালাক্সিতে অবস্থিত নক্ষত্রগুলোর নাম বলতে চায়, আর প্রতিটার নাম বলতে যদি তার ১ সেকেন্ড সময় লাগে; তবুও ৬০০ লক্ষ কোটি বছরেও সে এই নক্ষত্রগুলোর নাম বলে শেষ করতে পারবে না!
আমাদের জানা-অজানা আরও অগণিত বিস্ময় রয়েছে এই মহাবিশ্বে, অথচ এর সবই কেবল প্রথম আসমানে। আর এই সৃষ্টিকুল সাতটি আসমান দ্বারা সজ্জিত, যার প্রতিটি নিচেরটির তুলনায় অকল্পনীয় পরিমাণ বড় (যেন মাঠের কোণে একটি বল)। এক আসমান থেকে আরেক আসমানের দূরত্ব কত জানো?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'আসমান ও জমিনের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশত বছরের পথ। এক আকাশ থেকে অন্য আকাশের দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশত বছরের পথ। প্রত্যেক আকাশের ঘনত্বও (পুরুত্ব) পাঁচশত বছরের পথ। সপ্তমাকাশ ও আরশের মধ্যখানে রয়েছে একটি সাগর। যার উপরিভাগ ও তলদেশের মাঝে দূরত্ব হচ্ছে আকাশ ও জমিনের মধ্যকার দূরত্বের সমান। আল্লাহ তাআলা এর ওপরে রয়েছেন। [৯৪]
তাহলে তুমি আর আমি কোথায়? এই বিশাল সৃষ্টিকুলের সামনে আমাদের আয়তন কী?
হায়! কত ক্ষুদ্র আমরা, তা যদি খানিকটা বুঝতাম!
কতজন আজকে রাস্তায় বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করে, আর নিজেকে কিছু একটা মনে করে। দামি পোশাক, দামি বাইক চালিয়ে সে নিজেকে কেউকেটা ভাবতে থাকে। একটু সম্পদ আর একটু গায়ের জোর আছে বলে অহংকারে মাটিতেই পা পড়তে চায় না। অথচ তুমি তো কিছুই নও। আজ থেকে ১০০ বছর আগে কোথায় ছিলে তুমি? আর কোথায় ছিল এই অহংকার?
আল্লাহ তোমার প্রকৃত পরিচয় জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি তোমার ব্যাপারে বলেছেন, لَمْ يَكُن شَيْئًا مَّذْكُورًا.
যার অর্থ হলো, 'উল্লেখযোগ্য কিছুই না'। অর্থাৎ তুমি এত নগণ্য সৃষ্টি, যাকে উল্লেখ করাও যায় না। একটা ধূলিকণাও হয়তো দেখিয়ে দেওয়া যায়, উল্লেখ করা যায়; কিন্তু এই বিশাল সৃষ্টির কাছে তুমি ধূলিকণার সমানও নও।
তোমার শুরু একটা অপবিত্র বীর্য থেকে। তুমি যদি আমার সামনে মেঝেতে পড়ে থাকতে, তবে হাজার টাকা দিলেও আমি তোমাকে ছুঁয়ে দেখতাম না। আমরা কেন নিজেদের প্রকৃত উৎসের কথা ভুলে যাই?
একদা একজন নেককার ব্যক্তি বসে ছিল। সবাই তার সাথে দেখা করতে আসছিল, তার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি প্রদর্শন করছিল। হঠাৎ একজন সাদাসিধা মানুষ তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেল, অথচ তার দিকে ফিরেও তাকাল না। তার উপস্থিতির কোনো তোয়াক্কা না করেই সে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
বিষয়টি নেককার ব্যক্তির সামান্য বাধল। সে নিজেকে উপেক্ষা করা মেনে নিতে পারছিল না। তাই উঠে গিয়ে সেই লোকটাকে বললো, 'তুমি জানো, আমি কে?'
সে উত্তর দিলো, 'আমি খুব ভালোভাবেই জানি, তুমি কে।' সে বললো, 'আমি তোমার থেকেও তোমাকে ভালোভাবে চিনি।'
নেককার ব্যক্তি প্রচণ্ড আগ্রহের সাথে বললো, 'তুমি কীভাবে আমাকে আমার থেকেও বেশি জানো?'
এরপর সে বললো, 'তোমার শুরু হলো একটা অপবিত্র বীর্য এবং তোমার শেষ একটা ঘৃণ্য গলিত মৃতদেহ। আর এর মাঝখানে তুমি মলমূত্র বয়ে বেড়ানো একটা বাহন মাত্র!'
চিন্তা করো, এই যদি হয় আমাদের পরিচয়, তাহলে মহান রব্বুল আলামিনের সত্তার সামনে তুমি কী?!
তাই আমরা যখন الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينِ পাঠ করি, এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন, তিনি আকাশ ও জমিনের একমাত্র মহান রব। সকল ক্ষমতা কেবল তাঁর।
জীবনের মোহে পড়ে আমরা যাতে আমাদের রবকে ভুলে না যাই, আমরা যাতে নিজের ক্ষুদ্রতা ভুলে গিয়ে অহংকার না করি, এজন্য তিনি একটু পরপর ফাতিহার মাধ্যমে তাঁর বিশালতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। বুঝিয়ে দিচ্ছেন, আকাশ-জমিনে একমাত্র তাঁর আধিপত্য।
এরপর দিনের কোনো এক অংশে দুর্বল মুহূর্তে যদি আমরা অবাধ্যতায় ডুবে যাই, তাঁর দেখানো পথ থেকে সরে গিয়ে গুনাহে লিপ্ত হই, তবে তাঁর থেকে কখনো যেন নিরাশ না হই, এজন্য তিনি পরের আয়াতে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন,
الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
দয়াময়, পরম দয়ালু; পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
তিনি যেন বারবার মনে করিয়ে দিতে চান, তাঁর রহমত অনেক বড়। আমরা যাতে কখনও তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হই। আমরা যখন আমাদের রবের মহত্ত্বের কথা স্বীকার করলাম, তাঁর বড়ত্বের ভয়ে ভীত হলাম, তিনি সাথে সাথেই তাঁর দয়ার গুণাবলি যুক্ত করে দিয়ে বোঝালেন, তাঁর দয়া অনেক বেশি। আর তিনি তাঁর বান্দাদের ভালোবাসেন।
তাই যারা ফজরের পর নিজের ওপর জুলুম করেছে, তাঁর অবাধ্য হয়েছে, তারা যেন জোহরে পুনরায় তাঁর কাছে ফিরে আসে, নিজেকে সমর্পণ করে দেয়।
যারা জোহর আদায় করে দুনিয়ায় মোহমত্ত হয়েছে, তারা যেন আসরে তাঁর দয়ার সামনে ক্ষমার আশায় নিজেকে ঝুঁকিয়ে দিতে ছুটে আসে।
যারা আসরের পর নিজের নফসের চাহিদা পূরণ করেছে, তারা যেন মাগরিবে তাঁর রবের সামনে দাঁড়িয়ে নফস থেকে বেঁচে থাকার শক্তি চায়।
যারা মাগরিবের পর নিজের রবের আইন ভঙ্গ করেছে, তারা যেন ইশায় আবারও তাঁর কাছেই ফিরে আসে।
আর যারা ইশার পরে অশ্লীলতার অতল সমুদ্রে ডুব দিয়েছে, রাতের আঁধারে সকল সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে, তারাও যেন মালিকের দয়া থেকে নিরাশ না হয়। তারাও যেন অসীম করুণা আর অসীম দয়া নিয়ে বান্দাকে নিজের কাছে টেনে নেওয়ার প্রতীক্ষা করা সেই মহান করুণাময়ের নিকট নিজের ভুলগুলো স্বীকার করে নেয়।
কিন্তু যে এখনো সালাতই আদায় করে না, যে এখনো ফাতিহাই জানে না, সে তো নিজের রবের দয়ার কথাই জানে না। যে রব দিনে ১৭ বার তাঁর দয়ার কথা স্মরণ করিয়ে নিজের বান্দাকে ভালোবাসতে চান, বান্দাকে নিজের দিকে ডাকেন, তারা সেই মহান রব হতেই মুখ ফিরিয়ে রাখে। হায় হতভাগা!
তাই যারা নিজের অজ্ঞতা এবং উদাসীনতার কারণে নিজ মালিক থেকে দূরে দূরে সরে থাকে, যারা ফিরে না-এসে পালিয়ে বেড়াতে থাকে, তাদের জন্য ফাতিহার পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের আরেকটা বিশেষ পরিচয় তুলে ধরেছেন। তাঁর এত অসীম দয়ার পরেও যারা নিজের দাম্ভিকতার কারণে ফিরে আসতে চায় না, দীন হতে মুখ ফিরিয়ে রাখে, তাদের জন্য এই আয়াত একটা বিশেষ সতর্কবার্তা-
مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ. বিচার দিবসের মালিক।
আমার ভাইয়েরা! মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এখানে জানিয়েছেন, তিনি বিচার দিবস অর্থাৎ কিয়ামতের হিসাবনিকাশের কঠিন মুহূর্তের একমাত্র অধিপতি। যে-দিন এই ছোট্ট জগৎটা তুলোর মতো উড়তে থাকবে।
যে-দিন নবি-রাসুলগণ, শহিদগণ, সিদ্দিকগণ ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকবেন; যে-দিন প্রাণধারী সকল সত্তাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে; যে-দিন ওই আকাশটা ভেঙে জমিনের ওপর ধসে পড়বে; যে-দিন ফেরেশতাদেরও মৃত্যু দিয়ে দেওয়া হবে- তিনি সেই দিনের একমাত্র মালিক। সেদিন সকল সিদ্ধান্ত কেবল তাঁর। তাঁর সামনে আর কারও কিছু বলার কোনো অধিকার থাকবে না।
একটু কল্পনা করো সেই দিনটা। আমরা কত স্বাভাবিকভাবে নিশ্চিন্ত মনে পৃথিবীতে চলাফেরা করছি, অনবরত পাপ করে যাচ্ছি। সেই মহান অধিপতির বারবার অবাধ্য হচ্ছি। তাঁর পৃথিবীতে থেকে, তাঁর দেওয়া নিয়ামত খেয়ে, তাঁর বিধানকেই উপেক্ষা করছি। তাঁর পাঠানো রাসুলকে অবজ্ঞা করছি। অথচ আমাদের অন্তরে সামান্য পরিমাণ ভয়ও নেই! সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার কোনো চিন্তাও নেই! সেই হিসাবনিকাশের সময়ের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু প্রতিটা রাত শেষে ভোর হলে পৃথিবীর জন্য নির্দিষ্ট করা সময় থেকে একটা দিন কমে যায়। তোমার সাথে সাথে পৃথিবীরও যে বাড়ছে বয়স, তুমি কি তার খবর রেখেছ?
আজকে আমরা নিজেদের মনপছন্দ জীবন কাটাচ্ছি, নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো চালাচ্ছি। উন্মাদের মতো পরিণতি না ভেবে যেদিকে ইচ্ছা ছুটছি। যে পথ পছন্দ হয়, তাকেই নিজের উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলছি। কারও পরামর্শ, দিক-নির্দেশনা নেওয়ার বদলে স্পর্ধা দেখাচ্ছি:
'আমাকে শুধু আমার স্রষ্টা বিচার করতে পারবে, আর কাউকে আমি হিসাব দিতে পারব না। অনলি গড ক্যান জাজ মি!'
এ ধরনের বাক্যগুলো এখন আমাদের মুখে মুখে উড়ে বেড়ায় সারাক্ষণ। কী বলছি সেটাও জানি না। কার উদ্দেশ্যে বলছি তাও দেখি না। যা মনে আসছে ব্যস! বলে দিলেই হলো। নিজেকে 'কিছু একটা' প্রমাণ করতে পারলেই যেন আমি পৃথিবী কিনে ফেললাম। ওদিকে আল্লাহর বিপরীতে কিছু চলে যাক বা আমার কথা তাকে অসন্তুষ্ট করুক, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না।
'আমি যেটা ভালো মনে করি, আমার বুঝে যেটা আসে, সেটাই আমার জন্য ভালো। আমার ভালো-মন্দ দেখার অধিকার আমি কাউকে দিইনি, আর দিতে চাইও না।'
এ-রকমটাই আজকের যুবসমাজের মস্তিষ্কের চিন্তা-চেতনা। তবে এমন একটা দিন এই সময়ের ক্যালেন্ডারে আসবে, সেদিন প্রতিটি কর্মের হিসাব দিতে হবে।
মানুষ মনে করেছে, তার এই জাগতিক সুখ কখনও শেষ হবে না। সে বিনা হিসাবেই যেন সুখের সমুদ্রে ভেসে বেড়ানোর অধিকার পাবে। অথচ সেদিন প্রত্যেক মানুষ, প্রত্যেক জিন, প্রত্যেক প্রাণী, প্রত্যেক রাষ্ট্র, প্রত্যেক শাসক ধ্বংস হয়ে যাবে। এমনকি প্রত্যেক ফেরেশতার সমাপ্তি হবে। এরপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করবেন, 'আজ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব কার?' সেই দিন কার এমন ক্ষমতা হবে যে, তাঁর এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারে?
সুতরাং তিনি নিজেই প্রশ্নের জবাবে বলবেন, 'আজ কর্তৃত্ব ও রাজত্ব হলো এক পরাক্রমশালী আল্লাহরই।'
আল্লাহ তাআলা আসমান ও জমিনকে জড়িয়ে নিয়ে স্বীয় ডান হাতে রাখবেন এবং বলবেন, '(আজ) আমিই বাদশাহ, আমিই গর্বকারী; দুনিয়ার বাদশাহ, প্রতাপশালী ও অহংকারীরা আজ কোথায়?'
মহামহিমান্বিত আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টজীবের রুহ কবজ করে নেবেন এবং আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জীবিত থাকবে না। ওই সময় তিনি তিনবার বলবেন, 'আজ রাজত্ব কার?' অতঃপর তিনি নিজেই জবাব দেবেন, 'আজ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব এক পরাক্রমশালী আল্লাহরই।' অর্থাৎ আজ ওই আল্লাহর কর্তৃত্ব—যিনি এক, সর্ববিজয়ী এবং যার হাতে রয়েছে সবকিছুরই আধিপত্য।"[৯৫]
তাই যখন مُلِكِ يَوْمِ الدِّينِ বলছ, তা একটু উপলব্ধির সাথে বলবে।
কেননা এই ফাতিহা তোমাকে বারবার যেমন মহান আল্লাহর দয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, সেই সাথে দিনে ১৭ বার এটাও মনে করিয়ে দেয়, তিনি শুধুই দয়ালু নন; বরং অসীম শাস্তিদাতাও। তাঁর দেওয়া শাস্তির সাথে দুনিয়ার কোনো কষ্টের কোনো যন্ত্রণার তুলনা হয় না।
ফাতিহা তোমাকে তোমার অন্তিম সময়ের আজাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আরও মনে করিয়ে দেয়-আল্লাহর দিকে ফিরে না-আসার পরিণামের কথা, অবাধ্য হয়ে নিজ ইচ্ছানুসারে চলার পরিণতির কথা।
এরপর আমরা বলি,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ.
আপনারই আমরা ইবাদাত করি এবং আপনারই নিকট আমরা সাহায্য চাই।
সাধারণত একটি বাক্যের অবজেক্ট বা উদ্দেশ্য সেই বাক্যের শেষে থাকে। যেমন: আমরা হেঁটে হেঁটে গাড়িটির দিকে গেলাম।
আমরা কিন্তু বলি না যে, গাড়িটির দিকে আমরা হেঁটে হেঁটে গেলাম। এটা কোনো শব্দের সঠিক বিন্যাস হতে পারে না। আর এভাবে বলাটা বাক্যটিকে জটিল করে তোলে।
কিন্তু আল্লাহ এই আয়াতের প্রথমেই বলেছেন, আমরা তাঁরই ইবাদত করি এবং তাঁরই নিকট সাহায্য চাই।
তুমি যার আনুগত্য করবে বা যার আইন মানবে, তুমি তার দাস। আর একজন মুমিন মুসলমান যেহেতু সর্বদা আল্লাহর আনুগত্য করে এবং তাঁরই বিধিবিধানকে পালন করে, তাই তাকে আল্লাহর দাস বলা হয়। তবে আমরা কজন আজ আল্লাহর প্রকৃত দাস হতে পেরেছি? কজন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর আনুগত্য করছি?
তুমি 'টাকার গোলাম' কথাটি হয়তো শুনেছ। কিন্তু একজন মানুষকে কেন এভাবে সম্বোধন করা হয়, বলতে পারবে?
এর কারণ হলো, সে নিজেকে টাকার কাছে সমর্পণ করে দিয়েছে। নিজেকে টাকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। টাকার জন্যই সে নিজেকে উৎসর্গ করেছে। এর ওপর ভিত্তি করেই সে তার জীবনের সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, সকল অর্জন বা বিসর্জন করছে। তার জীবনের প্রতিটা নিঃশ্বাসকে সে টাকার দাসত্বের ক্ষেত্রে ব্যয় করেছে। এ কারণে তাকে টাকার দাস বা টাকার গোলাম বলা হয়।
এ ছাড়া আমাদের মধ্যে অনেক বিবাহিত ভাই/বোন রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্যে বলব, আমার প্রিয় ভাই-বোন! জেনে রাখো, যে স্বামী তার স্ত্রীর আনুগত্য করতে গিয়ে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, সে অবশ্যই তার স্ত্রীর দাসে পরিণত হয়েছে। আর যে স্ত্রী তার স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর থেকে দূরে সরে গিয়েছে, সেও তার স্বামীর দাসে পরিণত হয়েছে।
বিবাহ মানুষের প্রয়োজন, এটি পাপ থেকে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। এর মধ্যে অবশ্যই মহান আল্লাহর বিশাল বড় প্রজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু কোনোকিছুই আল্লাহর চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।
অনেক ভাই-বোন বিবাহের পূর্বে পুরোপুরি আল্লাহর মাঝেই ডুবে থাকে, কিন্তু বিবাহের সাথে সাথেই তার ইবাদতে অলসতা শুরু হয়, মসজিদে যাওয়ার প্রতিও আগ্রহ থাকে না, তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রে অলসতা করে। স্বামী-স্ত্রী সারাক্ষণ একে অপরকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা ভুলিয়ে দেয়। জেনে রাখো, অবশ্যই স্বামী-স্ত্রীর একে অপরকে সময় দেওয়া ইবাদত। তবে আল্লাহর জন্য সময় বের করতে অনীহা, আল্লাহর ভাবনা ভুলে থেকে স্বামী/স্ত্রীর ভাবনায় ডুবে থাকাটা শুধুই স্বার্থপরতা এবং আত্মতুষ্টি।
তোমার স্বামী বা স্ত্রী যদি দীন থেকে দূরে সরে থাকে, তবে তাকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসা তোমার দায়িত্ব। আর এক্ষেত্রে আশাহত না হয়ে নিজের আপনজনের জন্য অধিক পরিমাণে দুআ করো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বলেন,
إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلْ اللَّهُ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّه.
'যদি কিছু চাওয়ার থাকে, আল্লাহর থেকে চাও; যদি সাহায্য চাইতে হয়, তবে শুধুই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও।'[৯৬]
এ ছাড়া তুমি এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝাতে চাও-
'ইয়া রব! আমি কেবল তোমার কাছে সাহায্য চাই, আমার হৃদয় তোমার জন্যই ক্রন্দন করে, আমার অন্তর তোমার জন্যই উৎফুল্ল হয়, আমার অন্তর তোমার জন্যই প্রকম্পিত হয়, আমার সমস্ত সত্তার মূল উদ্দেশ্য শুধুই তুমি; অন্য কিছু নয়।
ইয়া আল্লাহ! এই সমস্ত পৃথিবীর সবাই আমাকে কষ্ট দিতে চাইলেও তোমার ইচ্ছা ব্যতীত কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি সমস্ত পৃথিবী আমার ভালো করতে এগিয়ে আসে, তবুও তোমার ইচ্ছা ছাড়া কেউ আমাকে একফোঁটা সুখ দিতে সক্ষম নয়।'
একটা গোলাম তার মনিবের কতটা অনুগত এবং কতটা বিশ্বস্ত, তা কিন্তু সে কতটা গুরুত্ব আর যত্ন দিয়ে মনিবের আদেশ পালন করছে, এর মাধ্যমে বোঝা যায়। সুতরাং দায়সারা কর্মসম্পাদনে সন্তুষ্ট না থেকে প্রতিনিয়ত এবং প্রতিবার অধিক গুরুত্ব আর যত্নের সাথে তোমার রবের আদেশ পালনের চেষ্টা করো।
এর পরের আয়াতে তুমি আল্লাহর কাছে বলো,
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ.
আমাদের সরল পথ দেখান। পথের হিদায়াত দিন।
কুরআনের এই আয়াত একটা মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্য সর্বোত্তম দুআ। এর চাইতে উত্তম দুআ দ্বিতীয়টি আর নেই।
মধুতে যেমন হাজার রোগের প্রতিষেধকের উপাদান রয়েছে, কুরআনের এই আয়াতেও তোমার দুনিয়া এবং আখিরাতের সমস্ত কল্যাণ রয়েছে।
একটু বিশ্লেষণ করতে তুমি এর মধ্যকার কল্যাণ বুঝতে পারবে। প্রথমত এই আয়াতে اهْدِنَا দ্বারা যে 'হিদায়াত' চাওয়া হয়েছে, তা এখানে ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। যেমন:
১. সত্যকে চেনা।
২. দীনের পথ খুঁজে পাওয়া।
৩. দীনের ওপর আমল করা।
৪. দীনের পথে আহ্বানের ক্ষেত্রে সকল বাধাবিপত্তির সময় ধৈর্যধারণ করা।
৫. মৃত্যু পর্যন্ত দীনের ওপর অবিচল থাকা।
ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যার ওপর এই পাঁচটি বিষয়ের উপস্থিতি পরিপূর্ণভাবে আছে, সে পূর্ণ হিদায়াতপ্রাপ্ত। আর যার মধ্যে এই পাঁচটি বিষয়ের কোনোটা কম আছে বা উক্ত পাঁচটির কোনোটার অভাব রয়েছে, তার হিদায়াত ত্রুটিপূর্ণ। অর্থাৎ তার প্রত্যাবর্তন পূর্ণাঙ্গ নয়।'
এ ছাড়া তিনি তাঁর খুশু-খুজু গ্রন্থে হিদায়াতের আরও বিস্তারিত অর্থ বর্ণনা করেছেন। যেমন:
১. কেউ যদি ভ্রান্ত কোনো আকিদা, ভুল বিদ্যা বা অসৎ সংকল্পের ওপর থাকে, তার জন্য তাওবা করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে তাওবার পথ খুঁজে পাওয়া তার জন্য হিদায়াত।
২. যে ইসলামের সামান্য কিছু বিষয়ের জ্ঞান রাখে, তার জন্য পূর্ণাঙ্গ বা বিস্তর জ্ঞান লাভ করতে পারা হিদায়াত।
৩. যে ইসলামের কিছু অংশ মানে, আর কিছু অংশ মানার ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করে বা মানতে চেয়েও পারে না; তার জন্য পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামকে অনুসরণ করতে পারা হিদায়াত।
৪. যে ইসলামের বিধিবিধানকে যথাযথভাবে মান্য করে, তার জন্য ভবিষ্যতেও এই আমল করা বা কর্মের ওপর অবিচল থাকতে পারা হিদায়াত।
৫. যার কোনো আকিদা-বিশ্বাস নেই, তার জন্য বিশুদ্ধ আকিদা ধারণ করতে পারাই হিদায়াত।
৬. যে ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাসী, তার জন্য ভ্রান্ত আকিদা হতে বেরিয়ে এসে সহিহ আকিদা বা ইসলাম সম্পর্কে সঠিক চিন্তা লালন করাই হিদায়াত।
৭. যে ব্যক্তির সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তার অন্তরে নেক আমলের প্রতি আগ্রহ নেই, তার জন্য অন্তরে নেক কর্মের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়াই হিদায়াত।
৮. যে ব্যক্তির ইচ্ছা আছে, কিন্তু শক্তি বা সামর্থ্য নেই; তার জন্য শক্তি-সামর্থ্য লাভ করাই হিদায়াত।
৯. যে ব্যক্তির ভালো কাজের ইচ্ছাও নেই এবং ভালো কাজের কোনো প্রকার শক্তিও নেই; তার জন্য অন্তরের ইচ্ছা এবং শারীরিক সক্ষমতা লাভ করতে পারা হিদায়াত।
১০. যে ব্যক্তির আকিদা সহিহ, যথেষ্ট ইলম রয়েছে এবং আমলেও অগ্রগামী, তার জন্য এই অবস্থা ধরে রাখতে পারাই হিদায়াত।
এর সবই কিন্তু উক্ত আয়াতের 'হিদায়াত' শব্দের মধ্যে নিহিত। সুতরাং তুমি যখন একবার এই আয়াত পাঠ করবে, এর মাধ্যমে সেই সমস্ত চাওয়াগুলো তোমার বলা হয়ে যাবে।
এই আয়াতের দিকে আরেকটু গভীরভাবে লক্ষ করলে তুমি এর মর্ম অনুধাবন করতে সক্ষম হবে। এই আয়াতে আমরা আল্লাহর কাছে কী চাচ্ছি বলো তো? হিদায়াত। কিন্তু কী বলে হিদায়াত চাচ্ছি সেটা একটু দেখো,
আমরা বলছি, 'আমাদের সরল পথ দেখান।'
এখানে ভাবার বিষয় হলো, আল্লাহ আমাদের নিজের হিদায়াত চাওয়ার মাধ্যমে সমগ্র উম্মাহর হিদায়াতও চেয়ে নিচ্ছেন। আয়াতের অর্থের দিকে একটু তাকাও। আমরা যেহেতু নিজের জন্য একান্তভাবে প্রার্থনা করছি, সুতরাং আমাদের তো বলা উচিত ছিল, 'আমাকে সরল পথ দেখান'; কিন্তু আমরা বলছি, 'আমাদের সরল পথ দেখান।'
এভাবেই আল্লাহ আমার প্রার্থনাতে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য হিদায়াত বা কল্যাণ রেখে দিয়েছেন, যেন আমি নিজের জন্য চাইতে গিয়েও জেনে বা না-জেনেই সকল মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করি। কেননা আমরা সকলে একটা উম্মত বা জাতি। আমরা আলাদা আলাদা কেউ নই; আমরা সকলেই এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করি। আমরা কোনো মসজিদের অনুসারী নই, আমরা কোনো উস্তাদের অনুসারী নই, আমরা কোনো মাজহাবের অনুসারী নই; আমরা কেবল আমাদের রাসুলের অনুসারী। আমাদের এই ঐক্য আজ কোথায় হারিয়ে গেল? উম্মতের জন্য পরস্পরের চিন্তাগুলো কে কেড়ে নিল?
আজকে আমি শুধু আমার উস্তাদের দ্বারা প্রভাবিত; আমি মনে করি শুধু এই জগতে সেই একমাত্র ব্যক্তি, আর কেউ নাই। আমি এবং আমাদের জামাত, আমাদের মাজহাব একমাত্র হকের পথে আছি। শুধু আমরাই দীন বুঝি, আর বাকি সকলে যেন অবুঝ। আমাদের উম্মত হিসাবে পারস্পরিক ভালোবাসা আজ কোথায় হারিয়ে গেল?
মানুষ আজ ঐক্যের কথা বলে। কিন্তু ঐক্য বলতে তুমি কী বোঝো, বলো তো?
শুনে রাখো, ঐক্য কখনো একই মসজিদে সালাত পড়া, একই মাজহাবের অনুসরণ, আর একজন ইমামের পেছনে সালাত আদায় করা নয়। ঐক্য হলো আমি আমার মুসলমান ভাইকে কোনো কারণ ছাড়াই নিরপেক্ষভাবে ভালোবাসব। সে কোন আলেমকে অনুসরণ করে, সে কোন মাজহাব মানে, তার পছন্দ-অপছন্দ ব্যতিরেকে আমি শুধু তাকে ভালোবাসব আমাদের কালিমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ'-এর জন্য। আর এই ঐক্য আমাদের মাঝে সারাজীবনের জন্য ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে দেবে। আমি তার জন্য কাঁদব, তার জন্য হাসব। আমি তার জন্য দুআ করব। এটাই তো প্রকৃত ইসলাম।
আমরা আমাদের সালাতে اَهْدِنَا বলে এই উম্মতের সকল মানুষের জন্যই হিদায়াতের প্রার্থনা করি। অথচ সালাত থেকে বের হয়েই নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ শুরু করে দিই। আমাদের ভাইদের দু-একটা বিষয়ের পার্থক্যের কারণে আমরা তাদের দূরে ঠেলে দিই। অথচ আমরা ভুলে যাই, আমাদের মধ্যে আরও লক্ষাধিক বিষয়ের মিল রয়েছে।
এই ঠুনকো বিষয়গুলোর জন্যই আমরা নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েছি। কিন্তু আমরাই আবার দিনে ১৭ বার আল্লাহর নিকট তার জন্য হিদায়াতের প্রার্থনা করে যাচ্ছি!
আর সবশেষ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের বলতে শিখিয়েছেন,
صِرَطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ.
তাদের পথ, যাদের ওপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন, যাদের নিয়ামত দিয়েছেন; যাদের ওপর (আপনার) ক্রোধ আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়।
এখানে صِرْطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ বলতে মূলত সাহাবাদের পথকে বোঝানো হয়েছে। তাদের ওপরেই আল্লাহর সকল অনুগ্রহ এবং সন্তুষ্টি বর্ষিত হয়েছে। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে তাদের পথের বিকল্প নেই।
এরপর الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ )যাদের ওপর আল্লাহর গজব নাযিল হয়েছে) বলতে ইহুদিদের বোঝানো হয়েছে। আর ضَالِّيْن )পথভ্রষ্ট) বলতে খ্রিষ্টানদের বোঝানো হয়েছে।
আমরা আজকের পৃথিবীতে যত রকম ফিতনা এবং নিকৃষ্টতা লক্ষ করছি, তার জন্য এই দুই জাতিই দায়ী। সমস্ত পৃথিবীতে আজ তাদেরই আধিপত্য। কিন্তু তাদের অপরাধ বড় জঘন্য। এই দুই জাতি তোমার আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে এবং তাঁর প্রেরিত কিতাবের সাথে কী করেছে, তা তুমি জানো না। যদি জানতে, তাহলে তাদের আদর্শ গায়ে জড়িয়ে ঘুরতে না, তাদের পোশাকে তোমার কমফোর্ট ফিল হতো না, তাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে তুমি নিজের দীন বিক্রি করে দিতে না। তাদের দেওয়া উদ্দেশ্য গ্রহণ করে তুমি নিজের আখিরাত ধ্বংস করে দিতে না।
তোমার জানা দরকার, এই জাতির উৎস কী! এই জাতির অপকর্ম কী! ইহুদিদের সবচেয়ে বড় ভ্রষ্টতা কী ছিল জানো? তারা জেনেশুনেও সঠিক পথ মেনে নিত না। জেনেবুঝে তোমার আল্লাহর কিতাবের বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা করতে তারা কোনো প্রকার কুণ্ঠাবোধ করত না। তারা উজাইর আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর পুত্র বলার মতো দুঃসাহস করত!
অন্যদিকে খ্রিষ্টানেরা ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে করতে তাঁকে আল্লাহর পুত্র এবং তিনের এক সাব্যস্ত করেছে।
আল্লাহ তাআলা যে জাতির থেকে দূরে থাকতে তোমাকে তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে শেখালেন, কীভাবে তুমি সেই জাতিকেই নিজের বন্ধু-আদর্শ বানিয়ে নিয়েছ?
একজন ইহুদি বা খ্রিষ্টান সরাসরি তোমার বন্ধু না হলেও তাদের সকল আদর্শ, চিন্তা, বিশ্লেষণ, রাজনীতি, পরিবারব্যবস্থার নীতিগুলোকে তো তুমি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করছ। যেভাবে ইহুদিরা জেনেবুঝে তাদের রবের আনুগত্য করেনি, তুমিও তো ঠিক একই পথেই হাঁটছ!
তুমি বলো তো, তুমি কি জানো না, তুমি একজন মুসলিম, তোমার আর অন্যদের জীবন এক নয়? তুমি কি জানো না, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত তোমার জন্য আবশ্যক? তুমি কি জানো না, তোমার জন্য হালাল-হারাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে?
আজকে হাতে-গোনা কিছু মানুষ ছাড়া প্রত্যেক মুসলমান তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সামান্য হলেও জানে। কিন্তু তবুও জেনেবুঝেও তারা অবাধ্যতার পথ বেছে নেয়। খোলা চোখেই বিবেক তালাবদ্ধ করে আনুগত্য থেকে দূরে সরে যায়। এটা কি তবে সেই অভিশপ্ত ইহুদিদের অনুসরণ করা নয়?
তাই যদি তুমি সফলতা চাও, কল্যাণ পেতে চাও, তবে এই দুই জাতির অনুসরণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকো। তাদের ছড়ানো সকল ভ্রষ্টতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো।
এরপর আমরা সবশেষে বলি, 'আমিন'!
অর্থাৎ 'হে আমার রব! আমি যা চাইলাম, আমাকে সেই সকল কল্যাণ দান করো। সুরা ফাতিহাতে যা কিছু কল্যাণ রয়েছে, তা আমাকে দান করো; আর যা-কিছু হতে বিরত থাকার কথা তুমি বলেছ, তা থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখো।'
আমার ভাই/ বোন! যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার রবের মহত্ত্ব বুঝতে না পারবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি না জানবে তোমার এই ইবাদত কার জন্য, এই ফাতিহা কার জন্য, ততক্ষণ এর গভীরে প্রবেশ করতে পারবে না। তাই তোমার রব সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নাও। তাঁর তাওহিদ, তাঁর নামসমূহ, তাঁর সৃষ্টির বিশালতা দেখে নাও। তুমি তাঁর খোঁজ করলেই তিনি নিজেকে চিনিয়ে দেবেন। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তা কখনও সম্ভব নয়।
তোমার সময় আর প্রাণ থাকতেই নিজের রবকে চিনে নাও, জেনে নাও। মৃত্যুর পর আর কিয়ামতের দিন তো কাফির মুশরিকও 'ইয়া রব, ইয়া রব' বলে আল্লাহকে রব হিসাবে স্বীকৃতি দেবে। তখন তাঁর ক্রোধের সামনে পতিত হওয়ার আগেই এই মুহূর্তে তাঁর মায়ায় নিজেকে জড়িয়ে নাও। জাহান্নামের আগুনসমুদ্রে ডুবে যাওয়ার আগে এখনই তাঁর ভালোবাসায় ডুবে যাও। এটাই তোমার জন্য অধিক কল্যাণকর।
টিকাঃ
[৯০] সহিহ মুসলিম: ৭৬৪।
[৯১] Gribble, Karleen D. (২০০৬). "Mental health, attachment and breastfeeding: implications for adopted children and their mothers." International Breastfeeding Journal. ১(৫).
[৩৯] সূরা আয-যুমার ৩৯: ৫৩。
[৯৩] জামিউত তিরমিজি: ৩৬০৩。
[৯৪] মুসনাদু আহমদ: ৩/২৯২。
[৯৫] তাফসিরু ইবনি কাসির。
[৯৬] সুনা তিরমিজি: ২৫১৬。
[১৭] চার মাজহাবের কোনো একটি মানা নবিজির সুন্নাহ মানার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তবে মাজহাবকেন্দ্রিক গোঁড়ামি এবং অপরকে হেয় করাটাই সমস্যা。