📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 উপদেশ খোঁজ

📄 উপদেশ খোঁজ


মানুষ হিসেবে আমাদের এই মনুষ্যজন্মের একটা উদ্দেশ্য আছে। ভাসমান শ্যাওলার জীবন রেখে উদ্দেশ্যময় জীবনের দিকে চলার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো—সালাত।

আত্মসমর্পণের পর রবের আনুগত্যের এই আনুষ্ঠানিক প্রকাশ এক অপরিহার্য শর্ত। যার জীবনে সালাতের কোনো অংশ নেই, তার আত্মসমর্পণ হয়নি। তার সমস্ত বিশ্বাস শুধু মুখে মুখে, প্রলাপের মতোই তা অর্থহীন।

• নির্দ্বিধায় রবের চূড়ান্ত আনুগত্য সালাত।
• দাসত্বের প্রধান দায়িত্ব সালাত।
• জান্নাতে প্রবেশের পূর্বশর্ত সালাত।
• আকাশ আর জমিনের মাঝে ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয় সালাত।
• সৃষ্টি আর স্রষ্টার মাঝে দূরত্ব কমিয়ে আনে সালাত।
• মনুষ্যগঠনের সর্বোত্তম ব্যবহার সালাত।
• আর মুমিনের জন্য প্রকৃত জীবন হলো সালাত।

আফসোস! এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আর নিজ স্রষ্টার সাথে দাসত্বের অঙ্গীকার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে মানুষ, অথচ এই সালাত ছিল তার নিজেরই 'কল্যাণের জন্য'। কারণ জন্মের সাথে সাথেই তাকে আজানের ধ্বনি শোনানো হয়নি, জানিয়ে দেওয়া হয়নি সালাতই তার সফলতা। তাওহিদের সুধার পরিবর্তে তার কর্ণকুহর হয়ে অন্তরে পৌঁছেছে গীতিকাব্য আর সংগীতের বিষ।

জন্মের পর থেকেই শুরু হওয়া দূরত্ব ধীরে ধীরে একটা মানুষকে ভুলিয়ে দিয়েছে তার প্রকৃত সত্তা। কী কেন কীভাবে—এই প্রশ্ন উত্থাপন করার সক্ষমতাও তার নেই। স্রষ্টা কে, তার জানা নেই; স্রষ্টা কী, সেটাও সে বোঝে না। এ-রকম একটা মানুষ কী করে আনুগত্য করবে? কী করে বুঝবে আনুগত্যের অর্থ? তার জন্য স্রষ্টাকে স্বীকার করাই তো সবচাইতে বড় ব্যাপার!

আমাদের সমাজেও অনেক আত্মভোলা মানুষ আছে, যারা নিজেকেই এখনো চেনে না, জানে না। তাদের থেকে আনুগত্যের আশা করা অর্থহীন। আর আনুগত্যের কথা কেউ মনে করিয়ে দিলে তার কাছে মনে হয় জোরপূর্বক বোঝা চাপানোর মতো। 'ভাই, ধর্ম যার যার ব্যাপার' বলে সে এড়িয়ে যেতে চায়। তাই আনুগত্যের আহ্বানের আগে জরুরি হলো: তার নিজের পরিচয় তাকে জানানো, আত্মপরিচয় তুলে ধরা। এরপর তাকে জানাতে হবে তার মালিক স্রষ্টার পরিচয়। তারপরেই না সে বুঝবে, তাকে কী করতে হবে, কার আনুগত্য করতে হবে!

সে যাই হোক! তোমার কী খবর বলো? সালাত পড়া হয় ঠিকমতো? না কি অন্যদের মতোই তুমিও আত্মভোলা রয়ে গেলে সারাটা জীবন?

তোমার ১৫ বছর বয়স পেরিয়েছে কত দিন হয়, বলতে পারো? আজ বয়স কত হলো তোমার?

দিনে পাঁচবার করে একটু হিসাব মিলিয়ে দেখো তো, ফেলে আসা বছরগুলোতে কতবার নিজের রবের সামনে দাঁড়ানোর কথা ছিল আর কতবার দাঁড়িয়েছিলে!

এটা কেমন জীবন আমার ভাই/বোন?

দিনরাত ঘুম, খাওয়া, ইচ্ছাপূরণ, চাহিদা পূরণ, আকাঙ্ক্ষা পূরণ—ব্যস শেষ! এইটুকু কি একটা মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হতে পারে? একটা মানুষ কি শুধু নিজের শখ-আহ্লাদ পূরণ করতেই পৃথিবীতে এসেছে?

তুমি কি জানো, প্রথম থেকেই বারবার 'উদ্দেশ্য উদ্দেশ্য' বলে তোমাকে বোঝাতে চাওয়া 'উদ্দেশ্য'-টা মূলত কী?

সেই উদ্দেশ্যটা হলো—'ইবাদত', যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তোমাকে আমাকে এবং সমস্ত মানবজাতিকে। এক্ষেত্রে শুধু সালাত, সাওম, হজ, জাকাত ইবাদত নয়। ইবাদত হলো—আনুগত্য করা, প্রাধান্য দেওয়া বা বেছে নেওয়া। তোমার ব্যক্তিজীবন থেকে রাষ্ট্রীয়জীবন যেখানেই তুমি পৃথিবীর আনুগত্য, মানুষের আনুগত্য কিংবা সম্পদ-স্বার্থ-প্রবৃত্তির আনুগত্য ছেড়ে তোমার রবের আনুগত্যকে অধিক গুরুত্ব দেবে—সেটাই ইবাদত। যেখানেই তুমি শত নিয়মের মধ্যে এর-ওর চোখরাঙানিকে ছাপিয়ে তোমার রবের আদেশকে প্রাধান্য দেবে—সেটাই তোমার ইবাদত। শত ব্যস্ততার ভিড় ঠেলে, হাজারো কাজের অজুহাত ছেড়ে, নানান প্রয়োজনীয়তার তালিকায় ১ নং রাখবে ‘আল্লাহকে খুশি করা’—সেটাই তোমার ইবাদত।

কিন্তু তুমি তো তোমার রবকেই এখনও চিনতে পারোনি, জানতে পারোনি, ভালোবাসতে পারোনি—এর জন্য কি তোমার দুঃখ হয় না?

তোমার এই দূরে দূরে সরে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করেছেন তোমার রব কত দরদি অভিমানী সুরে :

يَٰٓأَيُّهَا ٱلْإِنسَٰنُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ ٱلْكَرِيمِ.
‘হে মানুষ, কীসে তোমাকে তোমার মহান রব সম্পর্কে ধোঁকা দিয়েছে?’[৮০]

অর্থটার দিকে একটু গভীর মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখো তো, ভালোবাসাটুকু টের পাও কি না। এত শক্তিমান পরাক্রমশালী সৃষ্টিকর্তা হয়েও তিনি যেন তোমাকে মিস করছেন। যেন তুমি বউয়ের পাল্লায় পড়ে মা-কে ভুলে যাওয়া ছেলে। শত কষ্ট দেওয়ার পরও মা অসহায়ভাবে পিছু ডেকে বলছে: বাবা রে, কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলি? কীসে তোকে আমার থেকে দূরে নিয়ে গেল?

এখানেও এই সুর মহান আল্লাহর বাণীতে, যিনি অসহায়দের সহায়, যিনি ‘কুন’ বললেই হয়ে যায়, যাঁর জালালে পুড়ে ছাই হয়ে যায় পর্বতমালা, যাঁর ভয়ে সপ্তাকাশে ফেরেশতারা সিজদায় মাথা নুয়ে রাখে। এত এত সৃষ্টি থাকতেও তিনি যেন তোমাকেই নিজের কাছে ডাকছেন। দরকার নেই তবু তোমাকেই চাচ্ছেন বান্দা হিসেবে। রহমান তিনি, ওয়াদুদ তিনি, রাউফ তিনি; তাঁর কাছে সবার জন্য ভালোবাসার অংশ আছে, যেমন মায়ের কাছে তার সন্তান, তার চেয়ে অসীম গুণ বেশি। তোমার জন্য রাখা ভালোবাসাটুকু তোমাকে দিতেই তিনি আকুল হয়ে ডেকে যাচ্ছেন, অথচ তুমিই তাঁর কাছে যাচ্ছ না, তাঁকে পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছ না?
মানুষ কিন্তু তার একমাত্র ইবাদতকারী বান্দা নয়। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি সর্বদা তাঁর জিকিরে রত থাকে। যেমনটি তিনি কুরআনে বলেছেন,

تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَوتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا.
'সাত আসমান ও জমিন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছু তাঁর তাসবিহ পাঠ করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসায় তাসবিহ পাঠ করে না; কিন্তু তাদের তাসবিহ তোমরা বোঝো না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।[৮১]

কিন্তু তারপরও তিনি তোমার জন্য রোজ রাত্রিবেলা প্রথম আসমানে নিজের রহমতের দরজা খুলে দেন। আসমানি সুখের সব দরজা খুলে তোমাকে তাঁর ভান্ডার থেকে যা খুশি নিয়ে যেতে আহ্বান করেন, কিন্তু তুমি তো তাঁর কাছে যাওয়ার সময় পাও না!

তাঁর ফেরেশতাদের কথা তুমি শুনেছ। কিন্তু তাদের সংখ্যা কত, জানো?

আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'আমি (অদৃশ্য জগতের) যা দেখি তোমরা তা দেখো না, আর আমি যা শুনতে পাই তোমরা তা শুনতে পাও না। আসমান তো চড়চড় শব্দ করছে, আর সে এই শব্দ করার যোগ্য, তাতে এমন চার আঙুল পরিমাণ জায়গাও নেই যেখানে কোনো ফেরেশতা আল্লাহ তাআলার জন্য অবনত মস্তকে সিজদায় পড়ে না আছে!'[৮২]

কিতাবপত্রে উপমা এসেছে: ২য় আসমানের তুলনায় ১ম আসমান এত ছোট্ট, যেন বিশাল মাঠের এক কোণে একটি বল। প্রতিটি আসমান তার আগের আসমানের তুলনায় এত্ত বিশাল। আমাদের বিলিয়ন আলোকবর্ষের দৃশ্যমান আকাশ হলো ১ম আসমান। এবার কল্পনাকে ছোটাও পরতের পর পরত আকাশে। কী বিশাল এই আকাশমালা! তাহলে এই সাত আসমানে চার আঙুল পরিমাণ জায়গা যদি খালি না থাকে তবে ফেরেশতাগণের সংখ্যা কত? এখানে 'অগণিত' শব্দটাও কেমন ছোট ছোট মনে হয়। 'অসীম' নামে তো আমরা আকাশের বিশালতাকেই সংজ্ঞায়িত করি। তাহলে ফেরেশতাগণের সংখ্যাকে কী বলব?

এত বিপুল সৃষ্টি যার, এত এত ফেরেশতা যার, তিনি কত বড়! এত ফেরেশতা মিলে অনবরত যার প্রশংসা করছে, ইবাদত করছে, তার মহিমা কত বিশাল!

যে মহান রবের এত এত সৃষ্টি, যার ইবাদতকারী বান্দার কোনো অভাব নেই, যে রবের তুমি ছাড়াও এই আসমান-জমিনে অগণিত ইবাদতকারী ফেরেশতা রয়েছে, সেই রব সকলের সাথে তোমাকেও দরদ দিয়ে চাচ্ছেন। তিনি তোমারও নত হওয়া দেখতে চান, নত হওয়াতেই তোমার সুখ-কল্যাণ-উন্নতি; যেমন বাবা নিজ সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চায়। তিনি অন্যদের সাথে সাথে তোমাকেও নিজের অনুগত বান্দা হিসাবে নিজের নৈকট্য দিতে চান। অথচ তোমার ইবাদত করা না-করা, তোমার প্রশংসা করা বা না-করায় তাঁর মর্যাদায় বিন্দু পরিমাণ বাড়ে-কমে না। তোমার ভালোর জন্য তিনি তোমাকে চান। এভাবে ডাকার কারণ হলো, তিনি তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসেন। তিনি চান না তার সৃষ্টি করা জাহান্নামে তুমি কষ্ট ভোগ করো। তিনি চান না তুমি শান্তি পাও। তিনি তোমাকে সুখেই রাখতে চান। কিন্তু তুমিই তো এখনো নিজের সুখ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছ!

এভাবে নিজের মহান করুণাময় মালিক হতে আর দূরে দূরে থেকো না। ফেরারি জীবন ছেড়ে আত্মসমর্পণ করে ফেলো। দৌড়ে যাও মসজিদে। দাঁড়িয়ে যাও সালাতে। তোমার রবের সাথে সকল দূরত্ব ঘুচিয়ে তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার প্রথম ধাপ, তোমার আনুগত্যের প্রথম পদক্ষেপ, তোমার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, তোমার দাসত্বের প্রধান ভঙ্গিমা হলো এই সালাত।

কিন্তু সালাত মানে কি শুধু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নির্দিষ্ট ভঙ্গিমায় ওঠাবসা? সালাত কি কেবল মুখস্থ সুরা দিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সালামের মাধ্যমে সম্পন্ন করা কোনো উদাস কর্ম? যা মনোযোগ দিয়ে করার চেয়ে শেষ করাটাই জরুরি? না কি সালাত কেবল আল্লাহর আদেশ, যা তিনি পালন করতে বলেছেন বলেই মানুষ জোর করে পড়ে?

শোনো, প্রতিটা বিষয়ের দুটো অংশ থাকে—একটা বাহ্যিক, আরেকটা অভ্যন্তরীণ। সালাতের মধ্যেও তা-ই।

এই যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভঙ্গিমা, সুরাপাঠ, সালাম ফেরানো, নিজেকে নত করা সালাতের একেকটা অংশ। তবে এগুলো সালাতের দেহ, বাহ্যিক রূপ। সালাতের প্রাণ আলাদা জিনিস। মানুষ শুধু সালাতের বাহ্যিক রূপটা জানে, ভেতরগত প্রাণের আলোচনা নেই বলেই এর প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিতে পারে না।

তাই চলো, এর অভ্যন্তরীণ দিক নিয়ে কথা বলা যাক। আশা করি, এর পর সালাতের প্রতি অনীহা দূর হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ।

প্রথমেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই হাদিসের দিকে লক্ষ করো, যেখানে তিনি বলেছেন,

'সালাতের মধ্যে রাখা হয়েছে আমার চোখের শীতলতা।'[৮৩]

এখানে তিনি কিন্তু 'সালাতকে' তার শীতলতা বলেননি; বরং তিনি বলেছেন, 'সালাতের মধ্যে' রয়েছে শীতলতা। আর 'মধ্যে' শব্দ দ্বারা সাধারণত অভ্যন্তরীণ বিষয় বোঝানো হয়। তাই সালাতে দেহের বাহ্যিক ভঙ্গিমা কেবল নয়; বরং এর প্রাণের মাঝে ডুবে যাওয়াতেই প্রকৃত শীতলতা বা প্রশান্তি।

টিকাঃ
[৮০] সুরা আল-ইনফিতার ৮২: ৬।
[৮১] সুরা আল-ইসরা ১৭: ৪৪।
[৮২] জামিউত তিরমিজি: ২৩১২。
[৮৩] সুনানুন নাসায়ি: ৩৯৩৯。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ‘সালাত’ কী?

📄 ‘সালাত’ কী?


ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ যুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের একজন ছিলেন। তিনি সালাতের অভ্যন্তরীণ দিকগুলোর মাধ্যমে সালাতকে সংজ্ঞায়িত করে বলেন, 'যারা তাদের রবকে ভালোবাসে, তাদের জন্য সালাত প্রশান্তির আবাসস্থল। যারা কেবল একক সত্তায় বিশ্বাস করে, তাদের সত্তার জন্য সালাত পরিতৃপ্তি। যারা তাদের রবের ইবাদতকেই জীবন বানিয়ে ফেলেছে, তাদের জন্য সালাত হলো উর্বর বাগান। যারা দাসত্বের দুর্বলতা নিয়ে রবের নিকট নিজেকে অবনমিত করেছে, তাদের জন্য সালাত আনন্দের নির্যাস। সত্যবাদী একনিষ্ঠ বান্দাদের জন্য সালাত একটা পরীক্ষা আর সত্যের পথে যাত্রা করা পথিকদের জন্য নিজের অবস্থান যাচাইয়ের উপযুক্ত মানদণ্ড।'

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 সালাতের মাধ্যমে রুহের চিকিৎসা

📄 সালাতের মাধ্যমে রুহের চিকিৎসা


সালাতে প্রবেশের আগে একজন মানুষের অন্তর থাকে ক্ষুধার্ত। পেটের ক্ষুধা যেমন খাদ্য, প্রবৃত্তির ক্ষুধা যেমন কামনা-বাসনা, তেমনই অন্তরের ক্ষুধা হলো ভালোবাসা। আর অন্তর ক্ষুধায় তার রবের ভালোবাসার অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

সালাত আদায়ের আগে মানুষের অন্তর থাকে অসুস্থ। প্রতিটা পাপ আমাদের অন্তরের জন্য একেকটা বিষফোঁড়া। এর জ্বলন ও পীড়ায় সে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

সালাতের আগে অন্তর হয় তৃষ্ণার্ত। এই তৃষ্ণা পানির জন্য নয়। ইবাদতের সুশীতল অমিয় সুধাপান থেকে বিরত থাকার কারণে অন্তর তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে।

সালাতের আগে মানুষের অন্তর থাকে দুর্ভিক্ষপীড়িত। অর্থাৎ পাপের প্রভাবে সে একে একে নিজের সমস্ত সুখ হারিয়ে ফেলে। সুখ আর রবের সাথে সম্পর্ক হারিয়ে সে এক হাহাকারের মধ্যে পড়ে যায়। ফলে সুখ গ্রহণ করার সাধ্য তার থাকে না, আর দুঃখ সইবার ক্ষমতাও থাকে না।

সালাতের অভাবে মানুষের অন্তর খরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ অন্তর তার সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দূরে থাকার ফলে জমির উর্বরতার মতোই তার মধ্যকার সকল উত্তম গুণ নষ্ট হয়ে যায়। সে নিজের ভেতরে ভালো কাজের আগ্রহ জন্ম দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। একমাত্র ইবাদতের পবিত্র বারিধারাই তাকে এই অবস্থা হতে মুক্তি দিতে পারে। তার হৃদয়কে করতে পারে সরস-সতেজ-সুজলা-সুফলা।

সালাত ছাড়া একজন ব্যক্তির অন্তর যেন বস্ত্রহীন লাঞ্ছিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ পরিবার-সমাজে তার কোনো সম্মান থাকে না। সমাজে তার পরিচিতি হয় একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তি হিসাবে। আল্লাহর অধিকার আদায় না-করায় তার ওপর থেকে সমস্ত রহমত উঠিয়ে নেওয়া হয়, তাকে তার নিজের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে সে নিজের ইচ্ছামতো জীবন অতিবাহিত করে। আর মানুষের ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি কখনোই তাকে উত্তম কাজের আদেশ করে না। তাই সে অশ্লীল ও নিকৃষ্ট কর্মে জড়িয়ে সমস্ত সম্মান-মর্যাদা হারিয়ে বস্ত্রহীন হয়ে পড়ে। এমনকি শিরক-কুফর পর্যন্ত তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যায়। এজন্যই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন: 'ইমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্যকারী হলো সালাত।' সালাতের বেড়া উঠিয়ে দিলে ইমান হারানো মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র।

এভাবেই একজন মুসল্লি প্রতিবার তার রবের সামনে রোগজর্জর, ক্ষুধার্ত, দুর্ভিক্ষপীড়িত, বস্ত্রহীন অন্তর আর প্রবল অনুশোচনাবোধ নিয়ে জড়সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে সেই ফেরারি দাস বুঝিয়ে দেয়, সে তার মনিবের নিকট ফিরে এসেছে সারেন্ডার করার জন্য।

এরপর ফাতিহা পাঠ করে সে নিজের রবের কাছে পুনরায় সাহায্য চায়, নিজের জন্য সঠিক পথের দিশা চায়।

এরপর যখন সে রুকুতে যায়, সে বুঝিয়ে দেয়, সে এক অযোগ্য আর দুর্বল সত্তা। সে পালিয়ে গিয়ে ভুল করেছিল, তার নিজ মালিক থেকে দূরে থাকা উচিত হয়নি।

রুকু হতে মাথা ওঠানোর সাথে সাথে তার রব তাকে জানিয়ে দেন, তিনি তার অবস্থা জেনেছেন, তিনি তার প্রশংসাও শুনেছেন। সুতরাং আর চিন্তার কোনো কারণ নেই। তার এই ফিরে আসা তার রবের পছন্দ হয়েছে।

এতে সে নিজেকে আরও বিনয়ী করে তোলে, অনুশোচনায় ভারাক্রান্ত অন্তর আর অশ্রুসিক্ত চোখে সে নিজেকে তার রবের সামনে লুটিয়ে দেয়। নিজেকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, তার ভুল ক্ষমার অযোগ্য হলেও তাকে যেন ক্ষমা করা হয়। সে তার রবের মহত্ত্ব-বড়ত্ব স্বীকার করে নেয়।

তার অন্তরের সকল ক্ষুধা মিটে যায়, হৃদয়ের খরা কেটে যায়। রবের সন্তুষ্টির এক বিশেষ রহমতের চাদর যেন তাকে আগলে নেয়, সে অনুভব করে তার জীবনের উদ্দেশ্য। তার মনে পড়ে যায়, বাকি পৃথিবী তার জন্য অনর্থক; সে কেবল এইভাবে তার মালিকের সামনে পড়ে থাকতেই সৃষ্টি হয়েছিল। রবের প্রশংসার তাসবিহের সাথে মিশে যায় তার আনুগত্য আর সমর্পণ। ক্ষমার আলোয় তার অন্তরের সব আঁধার দূরীভূত হয়ে যায়, অন্তরের ওপরের কালো পর্দা সরে গিয়ে তার সামনে উন্মুক্ত হয় বাস্তবতা। চোখের সামনে থেকেও যা দেখার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছিল। এই সিজদা তার নিকট সবকিছু স্পষ্ট করে দেয়। এভাবে সে তার সালাতের ভেতরে হারিয়ে গিয়ে খুঁজে পায় নিজেকে।

সালাম ফেরানোর পর পৃথিবীকে সে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। তার অন্তর কাঁপতে কাঁপতে মোমের মতো গলে পড়তে থাকে সমস্ত অহমিকা। সব যন্ত্রণা মুছে গিয়ে অন্তরে নামে এক পশলা সুখ। অপূর্ণতার তিতে ব্যথা মিটে গিয়ে অন্তর ভরে ওঠে কানায় কানায়। তৃপ্তি, প্রশান্তি, পূর্ণতা, ভরাট হৃদয়ের সাথে সে নতুনভাবে পরিচিত হয়। আর এভাবেই প্রতিবার সালাতের মাধ্যমে সে একটা করে নতুন জীবন ফিরে পায়।

তার ভেতর-বাহির এখন পূর্ণাঙ্গ সুস্থ, পরিতৃপ্ত। সম্মানের পোশাক তার শরীরে পরিয়ে দেওয়া হয়। দাসত্বের সিলমোহর মেরে তাকে মুমিনের খাতায় স্থান দেওয়া হয়। এভাবেই সালাত একটা পালিয়ে যাওয়া গোলামকেও পূর্ণতা দান করে। কিন্তু এই পূর্ণতা পেতে চাইই-বা আর কজন?

ইসলামের অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে সালাতের গুরুত্ব সবচাইতে বেশি। তুমি যদি সালাতকে সালাতের মতো করে আদায় করতে পারো, তবে মাত্র দু রাকাত সালাতই তোমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দীনে ফেরার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে সালাতের বিকল্প কিছু নেই।
* তুমি যদি দীন অনুসরণ করতে চাও আর দীনের কোনোকিছুই না জানো, দীন সম্পর্কে তোমার বিশেষ কোনো ধারণা না থাকে;
* কিংবা তোমার আশেপাশে এমন কেউ না থাকে, যার মাধ্যমে তুমি দীন শিখতে পারো;
* অথবা তোমার পরিস্থিতি এমন যে, কারও কাছে গিয়ে দীন শেখার সুযোগ নেই, তোমার কাঁধের দায়িত্বের কারণে দীনের জন্য আলাদা সময় দিতেও তোমার অসুবিধা হবে

-এমন প্রত্যেক অবস্থানের ব্যক্তির জন্য একমাত্র সমাধান হলো সালাত। তুমি জাস্ট গুরুত্বের সাথে সালাত আদায় করতে থাকো। আরেকবার বলি, 'গুরুত্বের সাথে'; স্বাভাবিক প্রথাগত সালাত নয়। রবের সাথে বান্দার নৈকট্যের সালাত, আনুগত্যের সালাত, দাসত্বের দায়িত্ব পালনের সালাত। আর সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও, যেমনটি তিনি নিজেই শিখিয়ে দিয়েছেন :

وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةُ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ.
'আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় তা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন।'[৮৪]

তবে এই আয়াতের শেষ কথাটি ভুলো না। আল্লাহ তাআলা বলেই দিয়েছেন, বিনয়ী ছাড়া অন্যদের জন্য সালাত আদায় করা এবং আল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া বড় কঠিন। সুতরাং তোমার অন্তরকে নরম করে রাখো। পাপ থেকে বিরত থাকো। কেননা পাপ মানুষের অন্তরকে পাথরের মতো শক্ত করে দেয়। এই শক্ত অন্তর আল্লাহর আয়াত দ্বারা প্রভাবিত হয় না, আল্লাহর সাহায্য চাইতেও পারে না।

তবে কখনও নিরাশ হোয়ো না! কেননা তুমি যখন যেভাবে তোমার রবকে ডাকবে, তিনি তোমার ডাক শুনবেন। আর তিনি যদি তোমাকে শোনেন, আর কারও প্রয়োজন আছে কি? তিনি তো বলেই দিয়েছেন,

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّى فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ.
'আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ইমান আনে। আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে চলবে।'[৮৫]

তুমি ফিরলেই তিনিও তোমাকে ফিরিয়ে নেবেন। আর ফিরে আসার সর্বোত্তম মাধ্যম হলো সালাত। তাই তোমার সালাতকে যেনতেন কিছু ভেবো না। আর উদাসীনতা নয়, এবার থেকে যথাযথ গুরুত্বের সাথে সালাত আদায় করতে চেষ্টা করো ইন-শা-আল্লাহ。

টিকাঃ
[৮৪] সুরা আল-বাকারা ২ : ৪৫。
[৮৫] সুরা আল-বাকারা ২: ১৮৬。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 প্রশান্তির সালাত

📄 প্রশান্তির সালাত


কোনোকিছু জানা, শোনা বা পাঠ করা ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষকে সফলতার দিকে চালিত করতে পারে না, যতক্ষণ না সেই জ্ঞানগুলোকে সে তার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে।

সালাতের গুরুত্ব আমরা জেনেছি। সালাত তোমাকে কী দিতে পারে সেটাও তুমি বুঝেছ। কিন্তু কথাগুলো এভাবে তথ্য হিসাবে মস্তিষ্কে জমা করে রেখে দিলে হবে না। বাস্তবতায় প্রয়োগ না করলে এই জ্ঞান, এই তথ্য আর তোমার এই প্রচেষ্টা অর্থহীন।

সালাতের প্রতি আরেকটু বেশি মনোযোগী হওয়ার জন্য কিছু নসিহত পেশ করছি। যদি এগুলো প্রয়োগের হিম্মত করতে পারো, তবে তোমার সালাত এক ভিন্ন স্তরে পৌঁছে যাবে। ইবাদতের সঠিক মর্ম উপলব্ধি করতে পারা যাবে ইন-শা-আল্লাহ। চলো, শুরু করা যাক।
* প্রথমেই বেশ ভালোভাবে অজু করে নাও। একটু সময় নিয়ে একদম ধীরে ধীরে বসে অজু করো; তাড়াহুড়ো কোরো না。
* এরপর নিজের ইচ্ছা বা নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নাও। কেননা ইচ্ছা বা নিয়তের বিশুদ্ধতা ব্যতীত কোনো কর্মই কবুল বা গ্রহণ করা হয় না।

তুমি যেহেতু একজন দাস, সুতরাং তোমার ইচ্ছা হবে দাসত্ব, তোমার মনিবের সন্তুষ্টি, তাঁর আদেশপালন।

এবার 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনির মাধ্যমে তোমার রবের বড়ত্ব স্বীকার করে দাঁড়িয়ে যাও। তবে স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় দাঁড়াতে যেয়ো না। কার সামনে দাঁড়িয়েছ, সেটাও তো ভেবে দেখো। পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যাও যে, তোমার এই দাঁড়ানোটা তিনি দেখছেন। তাই এমনভাবে দাঁড়াও, যেমনভাবে দাঁড়ালে তোমাকে সবচাইতে দুর্বল মনে হয়।

হাত আর পা দুটোকে আঁটোসাঁটো করে,
পূর্ণ বিনয়ের সাথে,
মহান করুণাময়ের নিকট করুণার আশায়,
মনিবের সামনে দাস হয়ে,
মহান ক্ষমতাশালীর সামনে নিঃস্ব হয়ে,
মহান সম্পৎশালীর সামনে ভিখারি হয়ে,
মহান শাস্তিদাতার সামনে শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে,
মহান প্রেমময়ের সামনে ভালোবাসা পাওয়ার প্রবল বাসনা নিয়ে দাঁড়িয়ে যাও।

এমনভাবে দাঁড়াও, যেন দূর থেকেও তোমাকে দেখে মনে হয়, তুমি কারও সামনে আছ, কিছু চাইছ। কীভাবে দাঁড়ালে তোমাকে এমন দেখতে লাগে, সেটা তুমি নিজেই খুঁজে নাও।

মানুষ সাধারণত তার রবের সামনে দুইবার দাঁড়ায়: একবার তো কিয়ামতের দিন হিসাব দেওয়ার সময়, আরেকবার আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ মেলে সালাতে। হাশরের ময়দানে পৌঁছানোর আগেই নিজের রবের সামনে দাঁড়ানোর অভ্যাস করে নাও। আজ যদি দাঁড়িয়ে থাকাটা অভ্যাস হয়ে যায়, আজ যদি তাঁর সামনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তাঁকে চিনে ফেলো, ভালোবেসে ফেলো; তাহলে কাল কিয়ামতের ময়দানে হিসাব গ্রহণের সময় তুমি ভীত হবে না। পালিয়ে যাওয়ার চাইতে তাঁর কাছাকাছি গিয়েই তুমি বেশি শান্তি পাবে। শাস্তির সংবাদে আহাজারির বদলে নিজ মালিকের কাছে রহমত প্রত্যাশা করতে পারবে।

এটাই সালাত। এটা স্বাভাবিক কোনো ওঠাবসা নয়। এটা মালিকের প্রতি তাঁর দাসের আনুগত্য, বিশ্বস্ততা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তাই এ বিশেষ মুহূর্তে অন্য কারও বা অন্য কিছুর কথা অন্তরে আসতে দিয়ো না। এটা তোমার আর তোমার রবের একান্ত মুহূর্ত।

এবার সানা পাঠের মাধ্যমে তোমার রবের গুণকীর্তন করো। কোনো রাজদরবারে প্রবেশ করেই রাজার সামনে যেভাবে তার প্রশংসা করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, 'আপনি প্রকৃত মালিক আর আমি আপনার রাজ্যের একজন নগণ্য বাসিন্দা মাত্র', সেভাবেই মহান অধিপতির স্তুতি করে তাঁর সন্তুষ্টি হাসিল করে নাও।

অর্থটা জেনে নিয়ো, নতুবা এর মর্ম বুঝতে পারবে না। নিজেকে উদাসীদের দল থেকে বের করে আনো।
* তোমাকে তোমার রবের এত নিকটবর্তী দেখে একজনের কিন্তু সহ্য হতে চাইবে না। বলো তো সে কে? ঠিক ধরেছ! সে হলো অভিশপ্ত শয়তান。

এত দিন ধরে ভুলভাল বুঝিয়ে, প্রবৃত্তির জালে আটকে তোমাকে উদাসীন করে রেখেছিল তোমার রব থেকে। কিন্তু আজ তাকে অগ্রাহ্য করে তুমি যে নিজের রবের কাছে ফিরে এলে, এটা তার সহ্য হবে না। সুতরাং এখন সেই দুআটা পড়ো। কোনটা? যেটা দিয়ে আমরা আমাদের রবের কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাই— অর্থাৎ 'আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রজিম'।

শুধু মুখস্থ বলে দিয়ো না। এমনভাবে বলো যে, সামনে বিশাল বড় শত্রুবাহিনী আর তুমি একা। এর মোকাবিলা করার মতো শক্তি বা সামর্থ্য কোনোটাই তোমার নেই। প্রচণ্ড অক্ষমতা নিয়ে একমাত্র সক্ষম সত্তার নিকট সাহায্য চাও। এমনভাবে ডাকো তোমার রবকে, যেমন করে ডাকে শিশু, যখন তাকে মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তুমি তো সত্যিই তোমার রবের কাছে যেতে চাও; কিন্তু শয়তান ও তার বাহিনী তোমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে তোমাকে। তাই তুমি নিজের মালিকের কাছে আশ্রয় চাইছ। আকুল হয়ে পাগলপারা সে ডাক: মালিক, আমাকে বাঁচাও।

এক্ষেত্রে শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ একটি সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, 'যদি কখনো পালের কোনো কুকুর তোমাকে দেখে আক্রমণের চেষ্টায় ঘেউ ঘেউ শুরু করে, তুমি তার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হোয়ো না; বরং রাখালকে ডেকে তার সাহায্য চাও। সে-ই তোমাকে কুকুরের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করবে।'

• আউজুবিল্লাহ শেষ। এবার বিসমিল্লাহ বলে ফাতিহাতে মনোযোগী হও। • নিজের রবকে সামনে রেখে • হৃদয় দিয়ে তাঁর মহত্ত্ব আর পবিত্রতা অনুভব করে • প্রতিটা শব্দকে উপলব্ধি করে • গভীর আগ্রহের সাথে • তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে... ফাতিহা পাঠ করো।

সামনে আমরা ফাতিহা সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। আপাতত ফাতিহার সাথে আরেকটা সুরা পাঠ করো। তবে প্রতিদিনের মতো নির্দিষ্ট করে রাখা ফীল-নাস থেকে নয়; বরং নিয়মের বিপরীতে গিয়ে নাবা-হুমাযাহ বা অন্যান্য সুরাগুলো হতে পড়ো, তাহলে কেরাত ধীরে ধীরে পড়তে হবে আর তুমি কুরআনের স্বাদ পেতে থাকবে। আয়াতের কারণে তোমার রাকাত দীর্ঘ হবে আর সওয়াবও বেড়ে যাবে বহুগুণ।

• এরপর রুকু। • নিঃস্ব পথিকের অসহায়ত্ব নিয়ে, • তাঁর বিশালতার সামনে নিজের তুচ্ছতা স্বীকার করে, • সকল অহংকারের চাদর ফেলে দিয়ে, • তাঁর এখতিয়ারে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে...

সেই মহান সত্তার সামনে নিজেকে ঝুঁকিয়ে দাও। দাসের বৈশিষ্ট্যই হলো, মনিবের সামনে নিজেকে অবনমিত করে রাখা।

এটা তোমার রুকুর অংশ। কিন্তু তিনবার তাসবিহ পাঠ করেই উঠে যেয়ো না। এত মহত্ত্বের অধিকারী রবের সম্মানে, তোমার প্রতি এত এত করুণা আর রহমতের বিনিময়ে, জান্নাতের মতো মহাপ্রতিদানের পরেও মাত্র তিনবার প্রশংসা সমীচীন নয়। আর তিনবার পাঠ করাটা সর্বস্তরের দাসদের অভ্যাস; তুমি বরং আরেকটু বেশি করো, তাহলে দয়া ও করুণাও আরেকটু বেশি পাবে। কেননা অধিক প্রশংসাকারীর প্রতি সন্তুষ্টির পরিমাণও একটু বেশি হয়।

এরপর রুকু থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাও। তবে এই দাঁড়িয়ে থাকাও সাধারণ কোনো দাঁড়িয়ে থাকা নয়। এটা এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

কাঁধের ওপর পাপের পাহাড় নিয়ে, ক্লান্ত শ্রান্ত অবস্থায় ক্ষমা ও করুণার আশায় দাঁড়িয়ে থাকা। এখন হয়তো অন্য কারও হিসাব গ্রহণ চলছে। আর কিছুক্ষণ বাদে তোমাকেও ডাকা হবে। ফলাফল জানার জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এক অপেক্ষা। সুতরাং ক্ষমা ও রহমত লাভের জন্য রুকু থেকে দাঁড়িয়ে বেশি বেশি প্রশংসা করো, এতে যদি সেদিনের দুশ্চিন্তা খানিকটা কমানো যায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর তাহাজ্জুদের রুকু হতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়কে দীর্ঘ করতেন। তিনি স্থির হয়েই দাঁড়িয়ে থাকতেন। আর বারবার বলতেন,

لِرَبِّي الْحَمْدُ لِرَبِّي الْحَمْدُ.
'প্রশংসা কেবল আমার প্রতিপালকের জন্য।[৮৬]

এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা তোমাকে দাসত্ব উপলব্ধি করাবে। আর অনুতাপের প্রবল অগ্নি তোমার ভেতরের সব অবাধ্যতার আকাঙ্ক্ষা পুড়িয়ে ফেলবে। তোমার অন্তর ছিঁড়ে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে চাইবে।

ভেতরের সব অহমিকা ত্যাগ করে... অনুগ্রহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, করুণার প্রার্থনা আর অনুতাপ নিয়ে... পূর্ণ ভক্তির সাথে, তুমি নিজের সমস্ত অস্তিত্বকে মাটির সাথে মিশিয়ে দাও। তোমার কপাল আল্লাহর সামনে ধুলোতে লুটাও, তোমার মুখমণ্ডলকে মাটিতে বিছিয়ে দাও। তোমার নাক, মুখ, হাঁটু, মাথা ও পা যেন মাটিতে মিশে থাকে।

সালাতের মধ্যে সিজদা হলো দাসত্বের স্বীকৃতি প্রদানের সর্বোত্তম প্রকাশ। নিজেকে মাটির সাথে মিশিয়ে তোমার রবকে জানিয়ে যাও, তুমি এখন তাঁর কাছে ফিরে আসার জন্য তৈরি। এত দিন যা করেছ, যেথায় গিয়েছ, সবটা ছিল তোমার ভুল।

রাজদরবারকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান করে, বাদশাহের উপস্থিতির দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে তুমি সিজদায় চলে যাও। বাদশাহের একবারে কাছাকাছি গিয়ে তাঁর দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে ফেলা বা তাকে গুরুত্ব না দিয়ে অন্য কিছু করা যেমন অপরাধ,
সিজদায় গিয়ে মহান রবের চূড়ান্ত নৈকট্যলাভের পর তোমার অন্তর অন্য কোথাও পড়ে থাকা, অন্যকিছু চিন্তা করাও তাঁর মর্যাদার সামনে বেয়াদবি।

জেনে রেখো, সিজদা কেবল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য নয়; সিজদা হতে হবে অন্তর থেকেও। তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঝুঁকিয়ে দেওয়াটা বাহ্যিক সিজদা আর বাহ্যিক সালাতের অংশ। তুমি যদি সালাতের প্রকৃত স্বাদ পেতে চাও, তবে শরীরের সাথে তোমার অন্তরকেও মাটিতে লুটিয়ে দিতে হবে।

মানুষের অন্তর বড় অবাধ্য! অবাধ্যতা করাটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই সে হয়তো আপনি-আপসে আসতে চাইবে না। সে আসতে না চাক বা পালিয়ে যাক, ধরে বেঁধে হলেও জোর করে তাকে মাটিতে নত করে রাখো।

সিজদায় গিয়ে চোখ বন্ধ রেখো না; খুলে দাও। দৃষ্টিকে নাকের ডগার দিকে একত্র রেখো; আশেপাশে বা সরাসরি মাটিতে ফেলো না। মাটিতে মিশে যাওয়া এই ঝাপসা দৃষ্টি তোমাকে বুঝিয়ে দেবে, সত্যিই তুমি গোলাম। মস্তিষ্কে নিজের এই নতুন পরিচয়টা গেঁথে রাখবে, যাতে পরবর্তীকালে সে তোমার অবাধ্যতার সময় তোমাকে সতর্কবার্তা পাঠায়। এরপর তাসবিহ পাঠ করো। কেবল তিনবার নয় কিন্তু, আরেকটু বেশি—পাঁচবার, সাতবার।

সিজদায় মনোযোগ রাখাটা একটু কষ্টসাধ্য। এজন্য যদি পারো আরবিতে দু-একটা ছোট দুআ অর্থসহ মুখস্থ করো। সিজদায় তাসবিহ পাঠের পর দুআগুলো পড়তে থাকো, তাহলে কিছুটা হলেও মনোযোগী হতে পারবে ইন-শা-আল্লাহ। এটা শরীয়তসম্মত। এর অনুমতি রয়েছে। তবে দুআ অবশ্যই আরবিতেই করতে হবে। এই ছোট্ট দুআ দুটি তোমার জন্য উপকারী হতে পারে :

اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ.
'হে আল্লাহ! আপনার স্মরণে, আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে এবং আপনার উত্তম ইবাদাতে আমাকে সাহায্য করুন।[৮৭]

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَاهْدِنِي وَارْزُقْنِي.
'হে আল্লাহ! আপনি আমাকে মাফ করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথপ্রদর্শন করুন এবং আমাকে জীবিকা দান করুন।[৮৮]

এভাবে তুমি যদি যথাযথ গুরুত্বের সাথে সালাত আদায় করতে পারো, সিজদার মর্ম অনুধাবনে সক্ষম হও আর সিজদার মধ্যে লুকিয়ে রাখা নৈকট্যের স্বাদ একবার আস্বাদন করতে পারো, তবে তোমার শরীর বরফের মতো জমে যাবে, তোমার মস্তিষ্কের ভাবনারা থেমে যাবে, তোমার অঙ্গগুলো সিজদা থেকে ওঠার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলবে, একপর্যায়ে তুমি নিজেকেও ভুলে যাবে। আর এইভাবে কিয়ামত পর্যন্ত সিজদায় পড়ে থাকলেও তোমার বিন্দুমাত্র কষ্ট অনুভব হবে না।

সাহল ইবনু আব্দিল্লাহ ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'অন্তরও কি সিজদা করে?' তিনি বলেছিলেন, 'অবশ্যই! আল্লাহর কসম! কেউ যদি পূর্ণাঙ্গ খুশু-খুজুর সাথে সিজদা করার মজা পেয়ে যেত, তাহলে সে কিয়ামত পর্যন্ত আর সিজদা হতে মাথা তুলতে চাইত না।'[৮৯]

ফরজ সালাতে এত কিছু ভাবার সময় থাকে না। কেননা এটা আনুগত্য ও অনুসরণের প্রশিক্ষণ। ফরজ সালাত তোমাকে নির্দ্বিধায় মান্য করতে শেখায়, এখানে ইমামের অনুসরণ অপরিহার্য। তুমি অন্যান্য সুন্নাত বা নফল সালাত এভাবে ভেবে ভেবে উপলব্ধির সাথে আদায় করতে পারো।

মনে রেখো, প্রথাগতভাবে দায়সারা সালাত আদায়ের মাধ্যমে ইবাদতের মর্ম বোঝা সম্ভব নয়। সালাতে এই উদাসীনতার জন্য আল্লাহর নিকট জবাবদিহিও করতে হবে। তুমি শুধু রীতিনীতিগুলো পালন করে কোনোমতে সালাতের দায়িত্ব সারতে চাইলে সালাত থেকে কিছুই খুঁজে পাবে না।

সালাতের পরিপূর্ণ স্বাদ গ্রহণ, প্রকৃত দাসত্ব অনুভব এবং ইবাদতের দায়িত্ব পূরণ করতে চাইলে তোমাকে সালাত আদায় করাকে ভালোবাসতে হবে। দাসত্ব করাকে ভালোবাসতে হবে, ইবাদত করাকে ভালোবাসতে হবে। কেননা মানুষ যা করতে ভালোবাসে, সেটাই সে সবচাইতে বেশি গুরুত্বের সাথে পালন করে।

তাই তুমি তোমার রবের ঘরকে ভালোবাসো, সালাতে তোমার রবের সম্মুখে দাঁড়ানোকে ভালোবাসো, রুকুতে ঝুঁকে থাকাকে ভালোবাসো, রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাকে ভালোবাসো, সিজদায় নিজেকে লুটিয়ে রাখাকে ভালোবাসো, তোমার রবের সামনে বসে থাকাকে ভালোবাসো। এভাবে ভালোবাসার মাধ্যমে চেষ্টা করলে সালাতের প্রতি উদাসীনতা কাটিয়ে উঠতে পারবে ইন-শা-আল্লাহ。

টিকাঃ
[৮৬] সুনানুন নাসায়ি: ১০৬৯。
[৮৭] সুনান বি দাউদ: ১৫২২。
[৮৮] সহিহ মুসলিম: ৬৭৪২।
[৮৯] মাজমুউল ফাতাওয়া: ২১/২৮৭。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00