📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 তাঁর চরিত্র কেমন ছিল?

📄 তাঁর চরিত্র কেমন ছিল?


তিনি ছিলেন মধ্যম গড়নের; অতিলম্বাও না আবার একেবারে বেঁটেও না, যা দর্শনে বিরক্তি ও হাসি পায়। যেন তিনি দুটো শাখার (আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আমির ইবনু ফুহাইরা) মাঝখানে সদ্য পল্লবিত সতেজ ও সুদর্শন নবীন প্রশাখা।

তাঁর দেহাবয়ব বড় আকর্ষণীয়।

তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে বেষ্টন করে রাখে, তিনি কিছু বললে তা মনোযোগ দিয়ে শোনে আর কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে তা আনন্দচিত্তে পালন করে, তাঁর সাহাবাগণ তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান করে এবং তাঁর খেদমতে জান কোরবান করে দেয়, তাঁর সান্নিধ্যলাভে ধন্য হতে লোকজন তাঁর নিকট সমবেত হয়।

তিনি রূঢ় স্বভাবের নন এবং উপহাসকারীও নন।'

তার স্বামী আবু মাবাদ বললো, 'আল্লাহর শপথ! ইনিই হলেন কুরাইশের সেই মহান ব্যক্তি, যাকে তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে। যদি আমি তাঁকে পাই তাহলে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করব এবং তাঁর সঙ্গী হয়ে যাব, আর এর জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব।'[৬৮]

তাঁর চরিত্র কেমন ছিল?

জুরারাহ থেকে বর্ণিত, উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্র ছিল আল-কুরআন।' [৬৯]

কুরআন যার চরিত্র, তাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা কুরআনের মতোই করা অসম্ভব। তিনি মানুষিক গুণাবলির উচ্চতম চূড়ার অধিকারী ছিলেন।

তাঁর ব্যক্তিসত্তা সম্পর্কে আরেকটু বেশি বর্ণনা করে হাসান ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি (আমার) মামা হিন্দ ইবনু আবি হালা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবয়ব ও চরিত্র সম্পর্কে সুন্দররূপে বর্ণনা করতেন। আমি বললাম, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাচনভঙ্গি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন।' তিনি বললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা আখিরাতে উম্মতের মুক্তির চিন্তায় বিভোর থাকতেন। এ কারণে তাঁর কোনো স্বস্তি ছিল না।

তিনি অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না।

তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতেন। তাঁর কথা ছিল একটি থেকে অপরটি পৃথক।

তিনি ব্যাপক অর্থবোধক সীমিত বাক্যালাপ করতেন। তাঁর কথাবার্তা অধিক বিস্তারিত ছিল না, কিংবা অতি-সংক্ষিপ্তও ছিল না। অর্থাৎ তাঁর কথার মর্মার্থ অনুধাবনে কোনো প্রকার অসুবিধা হতো না।

তাঁর কথায় কঠোরতার ছাপ ছিল না, থাকত না তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভাব।

আল্লাহর নিয়ামত যত সামান্যই হতো, তাকে তিনি অনেক বড় মনে করতেন। এতে তিনি কোনো দোষত্রুটি খুঁজতেন না। তিনি অপরিহার্য খাদ্যসামগ্রীর ত্রুটি খতিয়ে দেখতেন না এবং উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করতেন না।

পার্থিব কোনো বিষয় বা কাজের ওপর ক্রোধ প্রকাশ করতেন না এবং তার জন্য আক্ষেপও করতেন না।

অবশ্য যখন কেউ দীনি কোনো বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করত, তখন তাঁর রাগের সীমা থাকত না। এমনকি তখন কেউ তাঁকে বশে রাখতে পারত না।

তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কারণে ক্রোধান্বিত হতেন না এবং এজন্য কারও সাহায্য গ্রহণ করতেন না।

কোনো বিষয়ের প্রতি ইশারা করলে সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন।

তিনি কোনো বিস্ময় প্রকাশ করলে হাত ওলটাতেন।

যখন কথাবার্তা বলতেন, তখন ডান হাতের তালুতে বাম হাতের আঙুলের অভ্যন্তরীণ ভাগ দ্বারা আঘাত করতেন।

কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হলে তার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিতেন এবং অমনোযোগী হতেন।

• যখন তিনি আনন্দ-উৎফুল্ল হতেন, তখন তাঁর চোখের কিনারা নিম্নমুখী করতেন。

• অধিকাংশ সময় তিনি মুচকি হাসতেন। তখন তাঁর দাঁতগুলো বরফের ন্যায় উজ্জ্বল সাদারূপে শোভা পেত।'[১০]

এ ছাড়াও তাঁর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, যা আজ এই উম্মত থেকে হারিয়ে গেছে। তা হলো, হায়া বা লজ্জাশীলতা।

এ সম্পর্কে আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্দানশিন কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। কোনো কিছু তাঁর অপছন্দ হলে তাঁর চেহারা দেখেই আমরা তা বুঝতে পারতাম।”

অথচ আজ আমাদের সমাজে লজ্জাকে দুর্বলতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়; চশমখোর, গায়রতহীন ও নির্লজ্জদের উৎকৃষ্ট হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু লজ্জা কোনো দুর্বলতা নয়। কেননা সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহসের ব্যাপারে বর্ণনা করেন:

আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব লোকের মাঝে অতি সুন্দর, অতি দানশীল এবং শ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন। কোনো এক রাত্রে মদিনাবাসীরা ভীত হয়ে পড়েছিল। অতঃপর যেদিক থেকে শব্দ আসছিল, লোকেরা সেদিকে ছুটে চললো। রাস্তায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে তাদের দেখা হয়, তখন তিনি ফিরে আসছিলেন। কারণ শব্দের দিকে প্রথম তিনিই দৌড়ে গিয়েছিলেন। তখন তিনি আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর গদিবিহীন ঘোড়ায় চড়ে ছিলেন। তাঁর কাঁধে তলোয়ার ছিল। তিনি বলছিলেন, তোমরা ভয় পেয়ো না; তোমরা আতঙ্কিত হোয়ো না। তিনি আরও বললেন, আমি এ ঘোড়াকে পেয়েছি সমুদ্রের মতো, কিংবা বললেন, এ তো সমুদ্র। অথচ ইতিপূর্বে এ ঘোড়ার গতি ছিল মন্থর!'[৭২]

হজরত ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,
'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপেক্ষা না কোনো বীর, সবল ও উদারপ্রাণ ব্যক্তি দেখেছি এবং না অন্যান্য চরিত্রগুণেও তাঁর চেয়ে পছন্দনীয় কাউকে দেখেছি। বদরযুদ্ধে আমরা তাঁর আড়ালে আশ্রয় নিতাম। কারণ, বড় বীর তাঁকেই মনে করা হতো, যে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর সন্নিকেটে থাকত। কারণ, তখন তিনিই ছিলেন কাফেরদের নিকটবর্তী।' [৭৩]

হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'ঘনঘোর যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। তিনিই সর্বদা শত্রুর নিকটবর্তী থাকতেন।' [৭৪]

একটু কল্পনার চোখে দেখো তো: একজন মানুষ, যিনি সিংহের মতো বীর, আবার একই সাথে নারীর চেয়েও লাজুক; আবার একই সাথে বিনয়ের চূড়ান্ত, ধৈর্যের চূড়ান্ত; দেখামাত্র মন কেড়ে নেয়, মিশলেই তার ব্যক্তিত্ব প্রাণ কেড়ে নেয়— সাহাবিগণ পাগলপারা হবেন না কেন? এমন একজন মানুষকে তো সর্বস্ব দিয়ে দিতে মন চায়। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম。

টিকাঃ
[৬৮] সনদ: সহিহ, আল-মুসতাদরাক, আল-হাকিম: ৪২৭৪।
[৬৯] সহিহ মুসলিম: ১৬২৪。
[৭০] শুআবুল ইমান: ১৩৬২।
[৭১] সহিহুল বুখারি: ৬১০২; সহিহ মুসলিম: ৬১৭৬।
[৭২] সহিহ মুসলিম: ৫৯০০。
[৭৩] নাশরুত তীব।
[৭৪] মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৪, সনদ: সহিহ।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 তিনি আমাদের কে হন?

📄 তিনি আমাদের কে হন?


এবারের হাদিসটি তোমার জন্য। হাদিসটি একটু মায়া নিয়ে পড়ে দেখো। হাদিসের কথাগুলো থেকে তাঁর কাছে তোমার অবস্থানটুকু খুঁজে নাও। উপলব্ধি করো সেই সময়টা, যখন তিনি তোমার কথাই বলেছিলেন! কীভাবে হাজার বছর পূর্বেই এক মায়ার টানে তোমাকে খুঁজেছেন! তোমাকে দেখতে চেয়েছিলেন একনজর! এই ব্যাকুল ভালোবাসার টানে হলেও তো তাকে ভালোবাসা উচিত। দুদিনের ভালোবাসায় তুমি যেখানে সবকিছু ভুলে যাও, তাহলে এই হাজার বছরের ভালোবাসার জন্য কী করা উচিত? ভেবে ভেবে পড়ো, তিনি কী বলেছেন তোমার ব্যাপারে!

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার কবরস্থানে (অর্থাৎ মদিনার জান্নাতুল বাকি-তে) উপস্থিত হলেন এবং সেখানে (মৃতদের উদ্দেশে) বললেন, আসসালামু আলাইকুম, (তোমাদের প্রতি আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক) হে মুমিন অধিবাসীগণ! আমরা ইনশা-আল্লাহ তোমাদের সাথে এসে মিলিত হচ্ছি। আমরা আশা করি, আমরা যেন আমাদের ভাইদের দেখতে পাই। সাহাবিগণ আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বললেন, তোমরা আমার বন্ধু; আমার ভাই তারা, যারা এখনো দুনিয়ায় আসেনি (পরে আসবে)। সাহাবিগণ আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার উম্মতের যারা এখনো আসেনি, তাদের আপনি কিয়ামতের দিন কীভাবে চিনবেন? উত্তরে তিনি বললেন, বলো দেখি, যদি কোনো ব্যক্তির একপাল মিশমিশে কালো রঙের ঘোড়ার মধ্যে ধবধবে সাদা কপাল ও সাদা হাত-পা-সম্পন্ন ঘোড়া থাকে, সে কি তার ঘোড়াগুলো চিনতে পারবে না? তারা বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই চিনতে পারবে, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি তখন বললেন, আমার উম্মত অজুর কারণে কিয়ামতের দিন সাদা ধবধবে কপাল ও সাদা হাত-পা নিয়ে উপস্থিত হবে এবং আমি হাউজে কাওসারের নিকট তাদের অগ্রগামী হিসাবে উপস্থিত থাকব।'[৭৫]

তোমাকে দেখতে চাওয়াটা তাঁর ভালোবাসা। কিন্তু পরকালে জাহান্নام থেকে তোমাকে রক্ষা করার চিন্তাটা কী?

আমাদের ভালোবাসায় তো কত স্বার্থ থাকে, অনুভূতির পূর্ণতা দানের আকাঙ্ক্ষা থাকে, ইচ্ছাপূরণের নানান স্বপ্ন থাকে। কিন্তু তিনি তো তোমার থেকে কিছুই চাননি; উলটো তোমাকে জান্নাতের নিয়ামত উপভোগ করানোর জন্য সব রকম প্রচেষ্টা করেছেন। রবের নৈকট্যলাভের সকল উপায় উপকরণ শিখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর অবর্তমানে কীভাবে তুমি-আমি আল্লাহর সাথে সংযোগ করব, তার সকল পথ বাতলে দিয়েছেন, যেন আমরা অসহায় জীবন না কাটাই। এই ভালোবাসা কী দিয়ে পরিমাপ করবে তুমি?

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'সকল নবির জন্য এমন একটি দুআ রয়েছে, যা আল্লাহ কবুল করবেন। দুনিয়াতে সকল নবি আল্লাহর কাছে দুআ করে নিয়েছেন। আর আমি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের সুপারিশের জন্য দুআটি রেখে দিয়েছি। আমার উম্মতের যে ব্যক্তি শিরক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে ব্যক্তি ইন-শা-আল্লাহ তার ফল পাবে।'[১৬]

তোমার মুক্তির জন্য তিনি পৃথিবীকেও গ্রহণ করেননি, আর তুমি এখনও তাঁর জন্য সামান্য ভালোবাসাও অনুভব করো না! তাকে ঠিকমতো জানোই না! আহ! আর কবে ঘুচবে এই দূরত্ব! কবে মেটাবে এই প্রেমের দায়!

টিকাঃ
[৭৫] সহিহ 'লিম: ২৪৯。
[৭৬] সহিহুল বুখারি: ৬৩০৪。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 তাঁকে জানার শুকর

📄 তাঁকে জানার শুকর


তুমি তোমার রাসুলকে কতটুকু চেনো, তার একটা পরীক্ষা করে দেখি চলো। এভাবে তাঁর সাথে তোমার দূরত্বের সঠিক পরিমাপটা নিরূপণ করা যাবে। ফলে কত দ্রুত আর কত বেশি গুরুত্ব দিয়ে এই দূরত্ব ঘোচাতে চেষ্টা তোমার করা উচিত, তা তুমি বুঝতে পারবে। একদম শুরু থেকেই শুরু করি。

* পৃথিবীর সর্বশেষ রাসুলের নাম কী, বলো তো?
তাঁর নাম, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এটা আমরা সকলেই জানি。

* কিন্তু 'মুহাম্মদ'-এর পরে কী? তার পদবি কী ছিল? তুমি কি তার পদবি সম্পর্কে জানো? আদৌ তার কি কোনো পদবি ছিল?
* তার ভাই-বোন কত জন ছিল? তার পিতা এবং মাতার নাম কী? তুমি কি তাদের পরিচয় জানো?
* তিনি কোথায় জন্মেছেন? কোথায় বেড়ে উঠেছেন? তার গোত্র কী ছিল?
* কোথায় তাকে পাথর নিক্ষেপ করে কষ্ট দেওয়া হয়েছিল বলতে পারবে? কোন পাহাড়ে তাকে আবদ্ধ থাকতে হয়েছিল?
* তুমি কি তার স্ত্রীদের সম্পর্কে জানো?
* তারা প্রত্যেক মুমিনের মাতা। কিন্তু তুমি কি তোমার সেই মায়েদের সবার নাম বলতে পারবে?

তুমি কোনো ছোট্ট শিশুকে তার পিতামাতার নাম জিজ্ঞেস করলে সে যদি উত্তর দেয়, আমি জানি না। তবে তার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী হবে বলো তো?

কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ মুসলমান তাদের মাতাদের সবার নাম বলতে পারবে না।

আচ্ছা, তুমি কি তোমার রাসুলের সন্তানদের ব্যাপারে কিছু জানো? বা তাদের নাম?

উত্তরগুলো মেলাও। আর যদি তোমার মস্তিষ্কে এর কোনো উত্তর খুঁজে না পাও, তাহলে তোমার জীবন অর্থহীন। এসব না-জানার অর্থ হলো পৃথিবীতে এখনও তোমার জন্মানোর উদ্দেশ্য অপূর্ণ রয়ে গেছে। তুমি এখনও জানো না—এই দুনিয়ায় তুমি কেন এসেছ, কেন আছ, এরপর কোথায় যাবে। এবং এর উত্তর জানাকে তুমি গুরুত্বপূর্ণও মনে করোনি। এর মানে, তোমার জীবন আর একটা বেড়াল-ফড়িং-পাখির জীবনের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। ওদের মতোই মৌলিক ও জৈবিক চাহিদা পূরণ ছাড়া তোমার জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তুমি এখনও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়েই উঠতে পারোনি।

মানুষ হিসেবে আমাদের সত্তার শতভাগ বিকাশ যেন হয়, মানবজনম যেন পূর্ণতা পায়, সেই বার্তা নিয়ে যিনি এসেছিলেন, নিজে মডেল হয়ে সত্তাকে পরিপূর্ণ করে যিনি দেখিয়েছেন মুক্তির পথ, সেই কান্ডারি-দিশারি সম্পর্কে এত অজ্ঞতা কেন? কেন আমরা এখনও তাকে চিনি না, জানি না?! কেন এই অনীহা?

তাকে পুরোপুরি জানি না, তা নয়। তাঁর কথা ততটুকুই জানি যতটুকু দু-তিন মিনিটের ভিডিও কিংবা আধ ঘণ্টার কোনো বক্তব্যে শোনা যায়। মাঝে মাঝে ছিটেফোঁটা কানে এসেছে তাঁর বাণীগুলো। যার প্রতি সাধারণ মানুষ খুব কমই গুরুত্ব দেয়!

এর মূল কারণ তাঁর জীবনী (সিরাত) আলোচনার অভাব। 'কী বলছি' তা বোঝাতে হলে 'কার ব্যাপারে' বলছি (মানে, এগুলো 'কার বাণী') সেটা মানুষকে আগে জানানো দরকার। মানুষের স্বভাব হলো : যাকে চেনে, তার কথাকে পাত্তা দেয়। যার মর্যাদা-গুরুত্ব জানে, তার কথাকে ওজনের সাথে নেয়। 'কাকে অনুসরণ করতে হবে' তা জানা থাকলে 'কী বা কেন অনুসরণ করব', তা নিয়ে আর প্রশ্ন-দ্বিধা-সংশয় থাকবে না। রাসুল সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি কী করে তাঁর হাদিসের মূল্য বুঝবে, কী করে সুন্নাহের অনুসরণ করতে চাইবে!

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির পুরো জীবনটিকে কয়েক পৃষ্ঠায় এঁকে দেওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য আলাদা গ্রন্থ রয়েছে। তার মধ্যে সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া (মুফতি শফি রাহ.), নবীয়ে রহমত (আবুল হাসান আলী নদবী রাহ.), সীরাতে মুস্তফা (ইদরীস রাহ.)।

কান্ধলভী রাহ.), আর-রাহীকুল মাখতুম (শফিউর রহমান মুবারকপুরী রহ.) উল্লেখযোগ্য। এগুলো পড়ে নিয়ো।

কিন্তু এক্ষেত্রেও আমাদের নানান সমস্যা দেখা যায়। আইনস্টাইন, নিউটন কিংবা ডারউইনের জীবনীর প্রতি যতটা আগ্রহ থাকে, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনীর প্রতি অতটা আগ্রহ কাজ করে না। কারণ একটাই। ওই যে তাকে বোঝানোর অভাব। তাকে জানানোর অভাব। কাকে পড়ছ সেটাও তো তুমি জানো না, আগ্রহ তৈরি হবে কী করে?

ক্ষমতাশালী ইউরোপ এসব বিজ্ঞানীদের কথা প্রচার প্রসার করে করে তাদের বিস্ময় হিসাবে তুলে ধরেছে, তাদের কর্মকাণ্ড আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে দিয়েছে। ফলে আগ্রহ নিয়ে তুমি তাদের জীবনী পাঠ করো। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্রকে, তাঁর জীবনকে তারা উপস্থাপন করেছে বিকৃতভাবে, আর আমরা উপস্থাপন করেছি অনাগ্রহ, হীনম্মন্যতার সাথে। ব্যাপকহারে উপস্থাপনের ব্যর্থতা এবং নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যাটফরমের মাঝে সীমাবদ্ধ আলোচনা-আমাদের সন্তানদের আজকের এই অনীহার মূল কারণ।

কিন্তু এবার অন্তর থেকে সব অনাগ্রহ দূর করতে হবে। এর বদলে জাগ্রত করতে হবে ভালোবাসা, নইলে আর উপায় নেই। দুনিয়া-আখিরাতে বাঁচতে চাইলে তাকে জানতেই হবে, মানতেই হবে।

ভালো খবর হলো, প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই আল্লাহর এবং মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভালোবাসা সৃষ্টিগতভাবেই দেওয়া হয়েছে। তবে মানুষের অপকর্ম আর ভিন্ন আদর্শের ভেতর নিজ আসক্তির আশ্রয় খোঁজা এই অনুভূতিকে চেপে রাখে। কোনো খেলোয়াড়, নেতা, নায়ক বা নোংরা চরিত্রকে নিজের মন-মগজে ধারণ করতে করতে রাসুলের প্রতি তোমার অনুভূতি দুর্বল হয়ে গেছে। সারাক্ষণ তাদের দেখে, তাদের কথা শুনে আর তাদের সম্পর্কে বলতে বলতে রাসুলের প্রতি তোমার আকাঙ্ক্ষা কমে গেছে।

তবে পরিবর্তনটা এখনই প্রয়োজন। যেহেতু দীনের প্রতি তোমার আগ্রহ সামান্য হলেও বাকি আছে, সুতরাং সেইটুকু শক্তি দিয়ে জেঁকে বসা ভিন্ন আদর্শগুলোকে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখো। আর সবকিছু খালি করে একবার প্রবেশ করো 'সিরাত'-এ।

একজন মানুষের অন্তরে ভালোবাসার তখন অনুভূতি শুরু হয়, যখন সে কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য (যা তার পছন্দ) কারও মাঝে পেয়ে যায়। গুণটির মুগ্ধতাটাই ব্যক্তির প্রতি মুগ্ধতায় রূপ নেয়। মানুষের অন্তরের প্রকৃত চরিত্রই এমন।

প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে তোমার অন্তরের দুর্বলতা কোন গুণের প্রতি, যা অন্য কারও মাঝে পেলে তুমি তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ো। সৌন্দর্য, চরিত্র, সক্ষমতা, উত্তম বৈশিষ্ট্য, দক্ষতা, সাহায্য-কোনটা? এককথায়, কী তোমাকে অন্য আরেকটা মানুষের দিকে আকৃষ্ট করে, তোমার ভেতরের সেই দুর্বলতা বের করো। এরপর সেই অনুপাতে রাসুলের জীবনীতে ডুব দাও।

আমি এখনই তোমাকে ভালোবাসতে বলছি না। ভালোবাসা চলে আসে; জোর করে আনা যায় না। তুমি পৃথিবীর সর্বত্র যেভাবে ভালোবাসা খুঁজে ফিরেছ, নিজের মূল্য খুঁজে ফিরেছ; শুধু একবার তোমার রাসুলের কাছেও ভালোবাসার তালাশ করে দেখো, দেখো কত মূল্যবান তুমি তাঁর কাছে। অন্যদের সামান্য কিছু দক্ষতা দেখেই যেভাবে মুগ্ধ হও, তোমার রাসুলের কারিশমা কেমন ছিল সেটাও একটু জেনে নাও। অন্যদের ভালোবাসা দেখে যেমন বিস্মিত হও, তোমার রাসুলের ভালোবাসার চিত্রগুলোও একটু দেখে নাও।

সহজ ভাষায়...
* তোমার যদি সৌন্দর্যের প্রতি আসক্তি থাকে, তুমি তোমার রাসুলের সৌন্দর্য খুঁজে দেখো; তাঁর চেয়ে আরও সুন্দর কাউকে পাও কি না।
* তোমার হয়তো গুরুত্ব প্রয়োজন, কেউ তোমাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চায় না। তুমি তোমার রাসুলের কাছে যাও, বিষণ্ণ মনে তাঁর সিরাতে খুঁজে দেখো। বিদায় হজের ভাষণ... রাত্রিবেলা জান্নাতুল বাকি-তে তোমাকে খোঁজা... প্রতিনিয়ত তোমার মাগফিরাতের প্রার্থনা... কিংবা হাশরের কঠিন ময়দানে তোমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা-তাঁর জীবনের কোথায় 'তুমি' নেই!

সিরাতের সব অংশে প্রবেশের আগ্রহ না থাকলে তোমার আসক্তি যেখানে সেখান থেকেই পড়ো। তুমি সত্যিই তোমার কাঙ্ক্ষিত সুখ পেয়ে যাবে। রাসুলের আবেগের তরঙ্গ থেকে নিজের হাহাকারগুলো পূর্ণ করে নাও।
* তোমার হয়তো সাধারণ বিষয় পছন্দ না-ও হতে পারে। তুমি তাহলে টানটান উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধের অধ্যায়ে যাও। দেখো তাঁর বীরত্ব, দেখো তাঁর সাহস! যে যুদ্ধে ফেরেশতা এসেছিল, তার চিত্রটা কেমন ছিল দেখো। যুদ্ধের ময়দানে সাহাবাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা দেখো। তোমার অন্তরেও ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।

তুমি যদি একটু আবেগী হও, একটু প্রেম-প্রেম স্বভাব হয়; তবে যাও না, যাও, তাঁর স্ত্রী আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে খুনশুটির চিত্রগুলো দেখো। দেখো না, কত মায়া দিয়ে কত আবেগ দিয়ে তিনি বলেন, 'আয়িশা! যে-দিন থেকে শুনেছি জান্নাতেও তুমি আমার স্ত্রী হবে, মৃত্যুকেও যেন প্রিয় মনে হচ্ছে!' তাঁর অন্য স্ত্রীদের মধ্যকার আটা মাখামাখির চিত্র দেখে ভালোবাসা বুঝে নাও। ভালোবাসা-রা যাঁকে দেখে ভালোবাসতে শিখেছে, কী করে তাঁর কাছে গিয়ে তোমার আবেগের পিয়াস মিটবে না!

তুমি যদি হও একটু পড়ুয়া স্বভাবের, তাহলে তো পুরো জীবনীতেই তোমার জন্য লুকিয়ে আছে মুক্তা। খুঁজে খুঁজে বের করতে থাকো। তোমার জন্যই মূলত সিরাত। তুমি যদি পড়ার মতন পড়তে পারো, তবে পৃথিবীর অন্য সব গল্প পড়তে ভুলে যাবে।

এ ছাড়া তুমি যদি নারী হও, তাহলে তাকিয়ে দেখো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকে কতটা সম্মান দিয়েছেন। নিজ কন্যা ফাতিমার আগমনে কীভাবে তিনি উঠে গিয়ে হাতে চুমু দিয়ে দরজা হতে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। উহুদের ময়দানে তাকে রক্ষা করতে সন্তানসহ যুদ্ধ করা বীরাঙ্গনা সাহাবিয়ার ভালোবাসা দেখো। সবই আছে তোমার রাসুলের জীবনে। অন্যদের চোখে নয়, তুমি নিজের রাসুলকে তোমার মতো করেই খুঁজে নাও।

আর হ্যাঁ, বই পড়তে অস্বস্তি হলে লেকচার শোনো। সব লেকচার নয়; যেখানে উম্মতের প্রতি তাঁর দরদ আর মায়া উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো আগে শোনো। হাশরের দিন কীভাবে তিনি তোমার শাফায়াত করবেন, তার বর্ণনাগুলো শোনো। তোমার যে যে বিষয় পছন্দ, তা দিয়েও খুঁজে দেখো। আধুনিক যুগের মানুষ হয়ে যদি এইটুকু না করো, তবে কী জবাব দেবে তোমার রবের কাছে?

তোমার এই খোঁজাখুঁজি আর জানাশোনার মাধ্যমে তাঁর প্রতি তোমার আবেগ তৈরি হবে। ধীরে ধীরে ভালোলাগা পেরিয়ে তুমি প্রবেশ করবে ভালোবাসায়। তাঁর জীবনের সামান্য অংশের মুগ্ধতা তোমাকে পুরো জীবনের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। তখন কিছু মিনিটের আলোচনা আর কয়েক পৃষ্ঠা তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।

না। তুমি হাজার পৃষ্ঠার সমুদ্রে ডুব দেবে, কয়েক ঘণ্টার বিস্তর আলোচনা তোমাকে দুনিয়া ভুলিয়ে দেবে।

এভাবে একটা সময় কী হবে জানো? তোমাকে আর সুন্নাহ অনুসরণের কথা বলে দিতে হবে না। তুমি মাত্র একটা সুন্নাহের পরিবর্তে পৃথিবীকেই ছেড়ে দিতে দ্বিতীয়বার আর ভাববে না।

আর জান্নাত যেহেতু তোমার প্রয়োজন, শাফায়াত যেহেতু তোমার প্রয়োজন, জাহান্নাম থেকে যেহেতু তুমি মুক্ত হতে চাও, তুমি যেহেতু দুনিয়াতে প্রকৃত ভালোবাসা অনুভব করতে চাও, তাই তোমাকেই নিজের প্রবৃত্তির অনীহাকে দমিয়ে সিরাতের দিকে যেতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানার জন্য আগ্রহী হতে হবে।

সিরাতের প্রতি অনাগ্রহের আরেকটি কারণ হলো, এটা কেবল নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার বর্ণনা এবং তথ্য হিসাবে গ্রহণ করা। এ কারণে অনেকে সিরাত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও এর প্রতি কোনো বিশেষ টান অনুভব করে না। অনেকে হয়তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমস্ত জীবনীকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ করেছে। জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন, মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি তাঁর মাতাকে হারান। তারপর দাদা তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব দেন, তারপর চাচা, এভাবে একটার পর একটা ঘটনা ক্রমানুসারে সে বলতেই থাকবে। কিন্তু এটা পরীক্ষার আগমুহূর্তের প্রয়োজনে বেখেয়ালি মুখস্থ ছাড়া কিছুই নয়।

অথচ বর্তমান পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে, তোমার দেশে, তোমার শহরে, তোমার সঙ্গে যা কিছু ঘটছে—এর প্রতিটার কারণ এবং সমাধান সিরাতের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু হাতের নাগালে সমাধান থাকা সত্ত্বেও আমরা তা গ্রহণ করছি না। সিরাত সম্পর্কে অজ্ঞতা আমাদের বিভ্রান্তির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে। ব্যর্থতায় আশাহত হয়ে বিষণ্ণ জীবন অতিবাহিত করছে মানুষ। অথচ সিরাত আমাদের ব্যর্থতার মাঝেও বিজয়ী হতে শেখায়, সুস্পষ্টভাবে বিজয়ের সংবাদ দেয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনী বা সিরাত হলো তোমার জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ। তোমার বাহ্যিক জীবনে কুরআনের বিধানগুলো বাস্তবায়নের সঠিক মাধ্যম। তাঁর প্রতিটি পদচিহ্ন এই উম্মতের জন্য গচ্ছিত এক 'ম্যানুয়াল স্ক্রিপ্ট'। তাতে জীবনের প্রতিটা ধাপে ধাপে করণীয় আর বর্জনীয় বিষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। তা অনুসরণ করাই মানুষের চরিত্রকে পূর্ণতা দেয়। সুতরাং সিরাতের প্রতি মনোযোগী হও。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 তাঁর জীবনের সাথে সাদৃশ্য

📄 তাঁর জীবনের সাথে সাদৃশ্য


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মুগ্ধতা, তাকে ভালোবাসা, সিরাত পাঠ আর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের মাধ্যমে তুমি নিজের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছ। এবার তুমি নিজের উদ্দেশ্যের দিকেই অগ্রসর হবে ইন-শা-আল্লাহ। জেনে রাখো, এটাই জীবন পরিচালনার সঠিক পথ। এই পথটা মানুষকে দেখানোর জন্যই আল্লাহ যুগে যুগে জাতিতে জাতিতে নবি-রাসুলগণকে পাঠান।

তবে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের আগে সিরাতের আরেকটা দিক তোমার জেনে রাখা প্রয়োজন। যার প্রভাব তোমার বাহ্যিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। তা হলো, প্রতিবন্ধকতা বা বাধা।

তুমি যদি তোমার রাসুলের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ অনুকরণ শুরু করো, তুমি যদি পৃথিবীর ভুলভাল আদর্শ ছেড়ে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ ধারণ করতে চাও, তবে তোমার পছন্দ হোক বা না হোক, রাসুলুল্লাহর সাথে যা কিছু ঘটেছে, তিনি যেসকল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন, তিনি যেভাবে আঘাত পেয়েছেন, প্রিয়জনরা যেভাবে তাঁকে কষ্ট দিয়েছে-তোমার সাথেও তা ঘটবে।

ভয় পেয়ো না। অনিশ্চিত পৃথিবীকে ভালোবাসতে গিয়ে যেমন তোমার অন্তরে ভয় ছিল না, আজকেও যেন নিশ্চিত সত্যকে ভালোবাসতে গিয়ে শয়তান নতুন কোনো ভয় জাগ্রত না করে। এসব আগেভাগে বলার কারণ হলো, শুধু সুখের দিক আলোচনা করাটা বাস্তবতা নয়; কল্পনার জগৎ, সুখ আর দুঃখ মিলেই মানুষের জীবন। আমি যদি কেবলই সুখের কথা শোনাই, তখন দুঃখ এলে তুমি ইসলাম সম্পর্কে ভুল বুঝতে পারো, তাই দুটো দিক তোমার জেনে রাখা প্রয়োজন। যাতে বাস্তবে যখন প্রতিবন্ধকতা সামনে আসবে, তখন তুমি নিজের বিশ্বাসের ওপর যেন অটল থাকতে পারো।

ভালোবাসলে ভয় পেতে নেই। এ ছাড়া যে ভালোবাসায় ত্যাগ থাকে না, তা তো ভালোবাসা নয়, স্বার্থ। আর তুমি তো তোমার রাসুলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসো। সুতরাং তাঁর জন্য যে-কোনো ত্যাগ স্বীকার করার সংকল্প করে নাও। দুঃখগুলো সয়ে নাও, দুর্দশা মেনে নাও, আঘাত পেয়েও চুপ থেকো, রাগ যেন না আসে।

তোমার এই ত্যাগের মাঝেও রয়েছে স্বস্তি। সিরাতের মধ্যে যেমন তোমার রাসুলের স্বস্তি পাওয়ার ঘটনাগুলো আছে, কুরআনে তাঁর দুঃখ দূর করতে স্বয়ং তাঁর রব। যেভাবে সঙ্গ দিয়েছেন, পাথরের আঘাতে কাতর অবস্থায় যেভাবে জিবরাইল আলাইহিস সালাম নেমে এসেছিলেন, তোমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। তবে তিনি নবি, তাঁর মর্যাদা অনুসারে তাকে সাহায্য করা হয়েছিল। তুমি সেই নবির উম্মত, তোমাকেও তোমার ভালোবাসার গভীরতা অনুপাতে, তোমার মর্যাদা অনুসারে সাহায্য করা হবে ইন-শা-আল্লাহ। বাহ্যিক সাহায্য না পেলেও তোমারে অন্তরে দেওয়া হবে দৃঢ়তা, ইসতিকামাত, যা মুমিনের জন্য বিরাট এক সাহায্য। ফলে তুমিও সকল যন্ত্রণার উলটো পিঠে খুঁজে পাবে জান্নাত।

শোনো, এই যে সিরাতপাঠের কথা বলছি, এটা কিন্তু কোনো বিনোদন বা সময় অতিবাহিত করার মাধ্যম নয়। এটা কোনো গল্প বা উপন্যাস হিসাবে পড়ার জন্য নয়। এটা কিন্তু নিছক পাঠ্যবইয়ের কোনো জরুরি পৃষ্ঠা নয় যে, তুমি পরীক্ষায় মার্ক ওঠানোর জন্য হড়বড় করে মুখস্থ করবে, দ্রুতপঠনের মতো পড়া চালু করার জন্য পড়বে, বা স্রেফ কিছু ইনফরমেশন জানবে। ...তারপর তিনি মদিনায় গেলেন... সেখানে এই এই করেছেন... তারপর এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে...। না, এজন্য সিরাত নয়; ইসলামে এর গুরুত্ব শুধু এটুকুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি।
* সিরাত আমাদের এবং আমাদের সন্তানের বুকে দীন মানার সাহস সঞ্চার করে,
* প্রজন্মান্তরে আমাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও বিশ্বাস সৃষ্টি করে,
* দীনের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার ও যে-কোনো কুরবানি করার মানসিকতা তৈরি করে。

সিরাতকে অবশ্যই এর যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে।

তাঁর হিজরতের ঘটনা পড়েই পৃষ্ঠা উলটে চলে যেয়ো না। পরের অধ্যায়ে যাওয়ার আগে জেনে নাও—
* নিজের শহর ছেড়ে এভাবে তাঁর চলে যাওয়ার কারণ কী কী? মদিনায় তিনি কেন গিয়েছিলেন?
* আর এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর মদিনায় হিজরত করার সাথে তোমার সম্পর্ক কী?

তাঁর এই হিজরত করা তোমাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, তুমি যে-কোনো যুগেই পৃথিবীর যে-কোনো দেশে, যে-কোনো শহর বা গ্রামেই থাকো না কেন; যদি তুমিও তাঁর নির্দেশিত পন্থায় জীবন অতিবাহিত করতে চাও, কুরআনকে আঁকড়ে ধরতে চাও, দীনের দাওয়াত প্রচারে বের হও, তবে অবশ্যই এমন একটা সময় আসবে, যখন তোমাকেও নিজ শহর ছাড়তে হবে। তা না হলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। সন্তানদের মুখ না দেখে কাটিয়ে দিতে হবে অজানা অনেক দিন। আজকে কারাগারে থাকা আলিমগণ তার বাস্তব প্রমাণ।

আমরা কেউই মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শ্রেষ্ঠ নই। তাঁর থেকে কেউই দীনকে অধিক বুঝতে সক্ষম নই, পৃথিবীতে তাঁর চাইতে উত্তম চরিত্রের ব্যক্তিত্ব দ্বিতীয় কেউ নেই। তারপরেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাহলে তুমি সেই একই দীনকে অনুসরণ করে, একই দীনের জন্য কাজ করে, কী করে নিজ ঘরে চিরকাল সুখে বসবাসের কথা ভাবতে পারবে?

অনেকে এসব কথা শুনে বলে, ভাই! এখন একটু শান্ত হও। এই সকল ষড়যন্ত্র একটা ঝড় মাত্র। একবার থেমে গেলেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তারা বলে: সকলে যদি শান্ত থাকি, নিজেদের দায়িত্বগুলো পালন করি, ঠিকমতো সালাত আদায় করি, তাহলেই সব সমস্যা চলে যাবে। হায়! কত অসহায় তুমি! এ-রকম কথা সিরাত সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই কেউ বলতে পারে।

তুমি ভেবে দেখো, এই সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় ছিলেন তাঁর হাবিব এবং তাঁর সাহাবাগণ, তাই তো? যাঁদের সম্পর্কে তিনি সন্তুষ্টির আয়াতও নাজিল করেছেন। কিন্তু এরপরেও দীনের জন্য তাদের দুঃসহ যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে, মাতৃভূমি ছাড়তে হয়েছে। তাহলে তুমি আর আমি কী করে সামান্য মসজিদে যাওয়া-আসা করেই জান্নাত লাভের আশা করি?

দীনের পথে অবশ্যই পরীক্ষা আসবে। তবে সিরাত আমাদের সে পরীক্ষাতেও ধৈর্যধারণ করতে শেখায়। এই পরীক্ষার বিনিময়ে অসীম সুখের জান্নাত লাভের আগ্রহ জ্বেলে দেয়। শাহাদাতের অমিয় সুধাপানে উৎসাহিত করে। সুতরাং কষ্ট যেমনই হোক, যন্ত্রণা যে স্তরেই থাকুক, তুমি সিরাতের সমুদ্রে ডুব দাও বারবার। বারে বারে হারিয়ে যাও মদিনার অলিগলিতে।

আমার ভাই/ বোন! যুগটা নতুন হলেও শয়তান কিন্তু পুরোনোটাই আছে। শত্রুতাও সে ছেড়ে দেয়নি। সুতরাং তোমাকে তোমার রাসুল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে সে এবং তার অনুসারীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কিন্তু এখানেই তোমার ভালোবাসার সত্যতা পরীক্ষা হয়ে যাবে। হয়তো অবস্থা আর সত্তা অনুসারে কষ্টের স্তরের কমবেশি হবে, তবে তোমাকে দীনের জন্য একটু হলেও কষ্ট ভোগ করতেই হবে।

দাড়িওয়ালা মুরুব্বি বলে, বোরকাওয়ালি বলে, আড়চোখের মাধ্যমে কিংবা সরাসরি তোমাকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তোমাকে কষ্ট দেওয়া হবেই। তোমার পূর্ববর্তীদের সাথে যা ঘটেছে, তোমার ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটবে। এর কোনো পরিবর্তন নেই।

আজকের যুগেও তোমার রাসুল এবং তাঁর সাহাবাদের মতো বিপদ কীভাবে তোমাকেও আচ্ছন্ন করছে এবং করবে, তা দেখে আসি চলো।

অনেকে বলে, ভাই আমরা একটা আধুনিক সমাজে বাস করছি, যেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত এবং বাক্স্বাধীনতা বর্তমান। কিন্তু আল্লাহর কসম! তাদের এসকল শ্রুতিমধুর নীতি পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য, মুসলমান বাদে। কেননা এই 'কথিত স্বাধীনতা'-র কথা বলে ইসলামকে কোণঠাসা করে জুলুমের ময়দান টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে এসব মিষ্টি মিষ্টি শব্দ ব্যবহার করে। অথচ যখন মুসলিমদের মতামতের বিষয় আসে, মুসলিমদের বাস্বাধীনতার বিষয় আসে, তখন এরাই ভুলে যায় নিজেদের বানানো নীতি।

তবে এটাও কোনো নতুন বিষয় নয়। কেননা মক্কার ভেতরেও এই সো-কল্ড স্বাধীনতা ছিল। তুমি আজকের যুগের কথিত গণতন্ত্রকে বাহ্যিকভাবে কতটুকু বাস্তবায়ন হতে দেখো? মক্কায় এর চাইতে বেশি গুরুত্বের সাথে গণতন্ত্রকে বাস্তবায়ন করা হতো। সকলের অধিকার রক্ষা করা হতো, যা বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি। সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের জন্য মক্কায় প্রবেশের অনুমতি ছিল। ইহুদি, খ্রিষ্টান, মূর্তিপূজারি, অগ্নি উপাসক, নাস্তিক—সকলেই সেখানে একসাথে মিলেমিশে থাকত। পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্ত থেকে যে-ই আসুক না কেন, তাকে আপ্যায়নের কমতি ছিল না। সকলেই শান্তিপূর্ণ অবস্থায় ছিল।

কিন্তু হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন যখন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর প্রচারের সিদ্ধান্ত নিল, আজকের মতোই তাদের সকল অধিকারের ঠুনকো নীতিগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কেড়ে নেওয়া হলো মুসলমানদের স্বাধীনতা, অধিকার; খাবার এবং পানি থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হলো। শেষমেশ এই 'স্বাধীনতার শহরে' মুসলমানদের থাকতেই দেওয়া হলো না।

আজকে ক্ষমতাধারীরা নিজ ইচ্ছামতো আইন প্রণয়ন করছে। বানানো সংবিধান তার স্বার্থের বিপরীত হলে সেই সংবিধানকে আবার পরিবর্তন করে ফেলছে। তাদের ইচ্ছাকে, তাদের সুবিধাকে আইন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে জনগণের স্বীকৃতি নিচ্ছে। জনগণও সায় দিচ্ছে জনগণের স্বার্থরক্ষা হলে। নতুন আইনে মুসলমানের কোনো ক্ষতি হলে সেটা কারও দেখার বিষয় নয়। হিজাব নিষিদ্ধ করা, হালাল ট্যাগ নিষিদ্ধ করা, টয়লেটে পানির ব্যবস্থা না রাখা, স্কুলে এলজিবিটি ক্লাস করতে বাধ্য করা, ফেমিনিজমকে রাষ্ট্রীয় পলিসিতে নিয়ে আসা—তুমি কি মনে করো, মুসলমানদের বিপক্ষে আইন প্রণয়নের এই কর্মকাণ্ড নতুন?

তাহলে শোনো, মক্কায় আগত সকলেই মক্কাবাসীর জন্য অতিথি ছিল। তাদের আপ্যায়ন করা পবিত্র হারামের সুন্নাহ বা রীতি ধরা হতো। এখানে দূরদূরান্ত থেকে আসা সব রকম মানুষ নিরাপদ ছিল। তাদের জানমালের সুরক্ষাকে মক্কাবাসী নিজের জন্য কর্তব্য মনে করত।

তবে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের দীনের দাওয়াত দিতে চাইলেন, তারা সেই পবিত্র হারামের ভূখণ্ডেই বসে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলো। শুধু ষড়যন্ত্র নয়; মাঝরাতে সব গোত্রের যুবকদের একসাথে পাঠিয়ে দিলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আল্লাহর রহমত তাকে বাঁচিয়ে দেয়। তখন কোথায় ছিল তাদের সুরক্ষা আইন? কোথায় গেল সকলের জন্য সমান অধিকার আর আতিথেয়তা? সবসময় মুসলমানদের জন্যই এই পৃথিবীর সকল আইন আর অধিকার যেন মিথ্যা হয়ে যায়!

তোমাকে দীনের অনুসরণ করতে দেখে কেউ কেউ তোমার সাথে বোঝাপড়া করতে চাইবে। তারা হয়তো বলবে, 'দেখো! তোমার সাথে আমাদের বিশেষ কোনো সমস্যা নেই। তোমার মসজিদ প্রয়োজন, আমরা মসজিদ বানিয়ে দেবো। তুমি সালাত আদায় করতে চাও, করো। রোজা পালন করতে চাও, করো। তবে তোমার ইসলামকে রাস্তায় নিয়ে এসো না, আমাদের সমাজে নিজেকে হুজুর হিসাবে প্রদর্শনের দরকার নেই। কর্মক্ষেত্রে হুজুর না হলেও চলে, বাসায় গিয়ে সালাত পড়তে পারবে, রাষ্ট্রের মধ্যে ইসলাম টেনে আনতে যেয়ো না ইত্যাদি।'

এবারও ভেবো না এটা নতুন কিছু। যুগের পরিবর্তনের ফলে তারা ইসলামকে সহ্য করে না, আগের যুগে করত—ব্যাপারটা এমন নয়। এই শত্রুতা ইসলামের শুরু থেকেই চলমান। আজ হতে ঠিক ১৪৪৩ বছর পূর্বেও তাদের পূর্বপুরুষরাও তোমার রাসুলের সামনে একই বিষয় উপস্থাপন করেছিল। তারা দীনের ব্যাপারে নবিজির সাথে আপস-মীমাংসায় আসতে চেয়েছিল: 'ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করো; কাবার চত্বরে এসো না, দাওয়াত দিয়ো না।'

ইসলামের অগ্রগতি দেখে মক্কার মুশরিকদের অন্তরে ক্ষমতা হারানোর ভয় দেখা দিলো। নিজেদের পাথরের প্রভুদের ইবাদত করা ছেড়ে নতুন এই ধর্ম গ্রহণ করতে তারা অস্বীকার করলো। নানাভাবে অত্যাচার-অপমান-ষড়যন্ত্রের পরেও তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে থামাতে পারল না। পারতই-বা কীভাবে; যাকে আল্লাহ সাহায্য করেন, কে আছে তাকে থামিয়ে দিতে পারে?

কুরাইশরা তখন মাস্টারপ্লান হাতে নিল। তারা পরস্পর পরামর্শ করে দেখল, মানুষ সাধারণত সম্পদ, নারী আর রাজত্বের প্রতি দুর্বল হয়ে থাকে। তাই কুরাইশের প্রতিনিধি হয়ে উতবাহ ইবনু রাবিআহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রস্তাব দিলো: • 'যদি তুমি দারিদ্র্যের কারণে এমনটা করে থাকো, তাহলে আমরা অর্থ দিয়ে সমগ্র কুরাইশদের মধ্যে তোমাকে ধনী বানিয়ে দিই। • কিংবা যদি তুমি রাজত্ব চাও, ক্ষমতাশালী হতে চাও, তবে আমরা তোমাকে বাদশাহ হিসাবে স্বীকার করে নিই। • আর যদি তুমি নারী চাও, তবে কুরাইশদের মধ্যে যাকে খুশি পছন্দ করো। আমরা দশ জন নারীকে তোমার হাতে তুলে দেবো।' [৭৭]

তবে তিনি তো আল্লাহর রাসুল। আর দুনিয়ার জন্য তো রাসুলগণ কাজ করেন না। তারা কেবল সতর্ককারী এবং সুসংবাদদাতা হিসাবে প্রেরিত হয়ে থাকেন। নির্দিষ্ট সময় পর আবার ফিরে যান রব্বের কাছে।

আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে কী বলেছিলেন জানো? তিনি বলেছেন,

'আল্লাহর কসম! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দিয়ে এর বিনিময়ে আমাকে এই দীনের দাওয়াত ছেড়ে দিতে বলে, তবুও আমি রাজি হব না। আল্লাহ তাআলা এ দীনকে বিজয়ী না-করা পর্যন্ত অথবা আমরণ আমি এ দাওয়াত চালিয়ে যাব।' [৭৮]

অথচ আজকে কত মুসলমান সামান্য একটা চাকরির জন্য সন্তুষ্টচিত্তে নিজের দাড়ি কামিয়ে ফেলে! আবার অজুহাত দেখিয়ে বলে, 'আরে ভাই! বোঝো না কেন? আমাদের তো বড় বড় মানুষদের সাথে চলাফেরা করতে হয়, নানা রকম কাজ করতে হয়, নানা জায়গায় যেতে হয়।'

অনেক ভাই স্ত্রীকে পর্দায় রাখতে চায়। পর্দাকে সে যথেষ্ট সম্মানও করে। সে জানে পর্দাতেই স্ত্রীর জন্য মঙ্গল। তবুও তার যুক্তি হলো, আমি বুঝলে কি হবে, 'আমার সমাজ তো এখনও বোঝে না!'

একদিকে তার রাসুল চন্দ্র-সূর্যের বিনিময়েও দীন থেকে সরে আসতে রাজি নন, অন্যদিকে রাসুলের উম্মত ঠুনকো কিছু স্বার্থের আশায় নিজের দীন বিক্রি করে দিচ্ছে। সব জেনেবুঝেও যারা নিজেই ভ্রষ্টতা বেছে নেয়, তাদের আর কীই-বা বলার থাকতে পারে!

আমার প্রিয় ভাইয়েরা! আমি পরিষ্কারভাবে তোমাদের বলে দিতে চাই, আমার কথার অর্থ এই নয় যে, এখনই পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে। এমনটা কখনোই আমার উদ্দেশ্য নয়। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কুরআনে বলেছেন,
وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَلَمِينَ.
'আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।' [৭৯]

তাঁর জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখো, তিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলের মাঝে রহমত হয়ে এসেও কত দুঃখ সয়েছেন নিজে। আমি শুধু তোমাকে এতটুকুই বলে দিতে চাই, তোমার বা আমার জন্য পূর্ণাঙ্গ দীন অনুসরণ করে এই সমাজ থেকে উত্তম আচরণের প্রত্যাশা করাটা বোকামি হবে। সুতরাং তোমাকে হয় সমাজকে খুশি করে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করতে হবে, নতুবা সমাজকে ত্যাগ করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে হবে। তুমি কী করবে তা তোমার ব্যাপার।

আমার নিজের কথা বলি। আমি যখন তরুণ আর কমবয়েসি ছিলাম। আমার গালে ক্লিনশেভ আর মাথার চুল ওপরের দিকে স্পাইক করা থাকত। এই অবস্থায় যেখানেই যেতাম সকলেই আমাকে পছন্দ করত, উৎসাহ দিত। আমার অনেক বিধর্মী বন্ধুও ছিল। আমি তাদের সাথে বিভিন্ন ক্লাবে যেতাম, একসাথে মজা করতাম। সবকিছুই ঠিক ছিল। সকলের ভালোবাসাও প্রবল ছিল।

তবে এসবই কেবল ততক্ষণ স্থায়ী হলো, যতক্ষণ না আমার মুখের দাড়ি সামান্য একটু বাড়তে শুরু করলো, যতক্ষণ না আমি পাশের জনের থেকে একটু আলাদা দেখাতে শুরু করলাম। এরপর তারা সবাই আমাকে দেখে কেমন আতঙ্কিত হয়ে উঠল। এই হোবলোসের কী হলো? সে কার সাথে চলাফেরা করছে আজকাল?

আল্লাহু আকবার! গত সপ্তাহেও তো আমরা একসাথে একই ক্লাবে ছিলাম। গত সপ্তাহে তোমার সাথে একসাথে অফিসে বসে গল্প করলাম, গত সপ্তাহেও আমরা প্রিয় বন্ধু ছিলাম। তাহলে হঠাৎ করে কী এমন হলো! আমার সামান্য দাড়ি আজ তোমাকে ভীত করে দিচ্ছে?

অনেক যুবক আমাকে বলেছে, 'ভাই! যখন আমি তিন দিন ধরে বাসায় না ফিরে ক্লাবেই পড়ে থাকতাম। বাসায় ফিরে এলে আমাকে শুভেচ্ছা জানানো হতো। আর এখন আমার দাড়ি একটু বেড়েছে বলে মসজিদে গিয়ে সামান্য দেরি হলেই আসামির মতো জেরা করতে শুরু করে—কোথায় ছিলে, কার সাথে মেলামেশা করছ, কী হচ্ছে এসব ইত্যাদি!'

তবে আমি তোমাকে জানাতে চাই, এই পরিবর্তনটাও নতুন কিছু নয়। তাকিয়ে দেখো তোমার হাবিবের দিকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও নবুয়তের পূর্বে 'আল-আমিন' বা বিশ্বস্ত বলে সম্বোধন করা হতো। সকলেই তাকে ভালোবাসত, সম্মান করত। তিনি ছিলেন মক্কার সবচাইতে প্রিয় তরুণ।

কিন্তু যখনই তার কাছে নবুয়ত এলো, আর তিনি দীনের দাওয়াত প্রচার শুরু করলেন, তাদেরই প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে গেল তাদের গলার কাঁটা। তাকে সরিয়ে না-দেওয়া পর্যন্ত তাদের স্বস্তি হচ্ছিল না। তিনিও মক্কায় একই বিষয়গুলোই সহ্য করেছেন, যা আমরা দীনে ফেরার পর সহ্য করি।

তুমি সবার প্রিয় হয়ে থাকতে পারো। কিন্তু আমার ভাই/বোন! যখনই তোমার মধ্যে দীনের কোনো চিহ্ন প্রকাশ পাবে, যখনই তুমি আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর রাসুলের অনুসরণ করতে চাইবে, জেনে রাখো, সমস্ত পৃথিবী তোমার শত্রু হয়ে যাবে। এমনকি মুসলমান নামধারী মুনাফিকেরাও; তারা সকলেই তোমার সাথে যুদ্ধ করতে ছুটে আসবে।

তবে ভয় পেয়ো না। মনে রাখবে, ভালোবাসলে ভয় পেতে নেই। তুমি সাহাবাদের বরকতময় কাফেলায় যোগ দাও। যে কাফেলার নেতৃত্ব দেয় খালিদ ইবনু ওয়ালিদ, যেখানে আসমানের ফেরেশতাগণ সাহায্যের জন্য অপেক্ষমাণ, যেখানে জান্নাত আর তোমার মাঝে কেবল মৃত্যুর ব্যবধান, যেখানে বিজয় অবশ্যম্ভাবী, সেখানে ভয় পাওয়া সাজে না। তুমি তো একা নও। তুমি দীনের পথে পা দিয়ে এমন কাফেলার অংশ হয়েছ, যারা সর্বদা বিজয়ী, যাদের সাহায্যের ওয়াদা স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত। সুতরাং নির্ভয়ে দীনকে বুকে নিয়ে এগিয়ে যাও। যদি তুমি বিশ্বাসী হও, তবে তোমাকে আটকে রাখার শক্তি কারোর নেই।

তোমার কষ্টের স্বস্তি রয়েছে তোমার রাসুলের জীবনে। সাহাবিদের মতো তাঁকে প্রশ্ন করো। তোমার উত্তরগুলো রয়েছে নবি-সাহাবিদের কথোপকথনে, সিরাতের পাতায় পাতায়। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর অভাবের শূন্যতা নিজের মাঝে উপলব্ধি করো। তাঁর এই না-থাকাকে ঘিরে জল্পনা-কল্পনা সাজাও। খুঁজে নাও কল্পনায় তাঁর সান্নিধ্যের সুখ।

খুব বেশি বিষণ্ণ লাগলে তাঁর সাহাবিদের কাছে ছুটে যাও। সাহাবিদের জীবনী চষে তুলে আনো প্রেমের মডেল। প্রিয় আল্লাহ-রাসুলের জন্য যে-কোনো কষ্টও তো সুখের পরש! কষ্ট করতে পারাও তো পরম সৌভাগ্যের!

• মক্কার উত্তপ্ত ধুলোয় মাখামাখি হয়ে বিলালের 'আহাদ আহাদ' শোনো কান পেতে।
• কিংবা আবু বকরের সাথে সাওর গুহায় সাপের দংশনের আঘাত চেপে রাখার যন্ত্রণা অনুভব করো।
• মুসআবের বিলাসিতা আর মাকে ছেড়ে আসার বিসর্জন দেখো।

দুঃখই কিন্তু দুঃখ কমায়। তাদের কষ্ট থেকে তোমার-আমার কষ্ট অনেক অনেক কম। সুতরাং আমরা এখনো সুখী, আলহামদুলিল্লাহ। তাই পুনরায় নতুন উদ্যমে তোমার রবের আনুগত্যের দিকে অগ্রসর হও। সিরাত এভাবেই প্রতিমুহূর্তে তোমাকে সাহায্য করবে, আত্মবিশ্বাসে দৃঢ়তা জোগাবে—এজন্যই সিরাত।

দীনের জন্য কষ্ট

তোমার স্ত্রীকে কি ওরা উত্ত্যক্ত করছে দীন পালনের কারণে?

কষ্ট পেয়ো না। শুধু তোমার নয়; সাহাবাদের স্ত্রীগণকেও তাদের কটুবাক্যের শিকার হতে হয়েছিল। আর আমাদের মাতা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কে তো মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল নবিজির জীবদ্দশায়। পরিশেষে আম্মাজানের পবিত্রতার ঘোষণা স্বয়ং রব্বুল আলামিন দিয়ে দিয়েছেন। এর মাঝের চিত্রটা কী সীমাহীন যন্ত্রণার! যাও গিয়ে দেখো সিরাতে। তুমি আমি তো বিশেষ কেউ নই, আমাদের স্ত্রীরা কখনোই মা আয়েশার থেকে উত্তম নয়। তাই ধৈর্যধারণ করো, আর তোমার রবের নিকট প্রার্থনা করো, যেমনটি করেছিলেন আম্মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা।

আমার বোন! তোমাকে কি ওরা উত্ত্যক্ত করছে? কষ্ট দিচ্ছে?

তাহলে ইসলামের জন্য প্রথম শহিদ হজরত সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার যন্ত্রণা দেখে নাও। কীভাবে আবু জাহেল তাকে যন্ত্রণা দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত শহিদই করে ফেলেছে! মা আয়েশার মর্যাদা যত ঘৃণ্যভাবে ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, তোমাকে তো তারা ততটাও বলেনি। এই সামান্যতেই যদি হাল ছেড়ে দাও, তবে কীভাবে আল্লাহর সাহায্য পাবে?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে দূরে বাবার বাড়ি থাকার পরেও আল্লাহর প্রতি আম্মাজানের বিশ্বাস এতটুকু দুর্বল হয়নি। বরং এমনভাবে আল্লাহকে ডেকেছেন যে, রব স্বয়ং কুরআনের আয়াত নাজিল করে তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করেছেন। আজকে তুমি কেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছ? মা আয়েশার রব কি তোমার ডাক শোনেন না? তোমার দীনের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা তার জন্য কি খুব কঠিন কিছু?

তুমি ধৈর্যের সাথে দীনের ওপর অবিচল থাকো আর প্রার্থনা করতে থাকো। অবশ্যই সাহায্য আসবে। অবশ্যই তোমাকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।

মূল কথা হলো, দীনের মূল্য ঢুকাতেই হবে। 'আমি কষ্ট সইতে পারি না' এ-কথা দীনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা এই দীন সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এটাই মানুষের মূল উদ্দেশ্য এবং এ অনুপাতেই পরকালের হিসাব হবে। অথচ আমাদের অবস্থা হলো, আমরা সকলেই জান্নাতে যেতে চাই, কিন্তু কেউই মরতে চাই না! সবাই পৃথিবীতে ইসলাম ছড়িয়ে দিতে চাই, কিন্তু কেউ নিজের অর্থ-শ্রম ব্যয় করতে রাজি নই!

আমি চাই না তুমি সিরাত বা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্ম-মৃত্যু, আর এর মাঝের কর্মকাণ্ডগুলো মুখস্থ করো; বরং সিরাতকে তুমি অনুভব করো এবং নিজের মধ্যে ধারণ করো। সন্তানদেরও সিরাত অনুভবের শিক্ষা দাও, যাতে দীন সম্পর্কে সে সঠিক অনুভূতি পায়, সে যাতে ইসলাম সম্পর্কে হীনম্মন্যতায় না ভোগে। সে যেন জানতে পারে, তার রাসুলের সাথে যা ঘটেছে তার সাথেও তা-ই ঘটবে; সেই অবস্থায় তিনি যা করেছেন সেও তা-ই করবে। তুমি যত বেশি তোমার রাসুল সম্পর্কে পড়বে-জানবে-শুনবে, তুমি তত বেশি তাকে ভালোবেসে ফেলবে। আর যত বেশি ভালোবাসা বাড়বে, তাঁর আদর্শগুলো অবচেতনেই তুমি অনুসরণ করবে।

তাঁর সুন্নাহর অনুসরণের ক্ষেত্রেও অনেকে যাচাই বাছাই করে, বা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে নিজ মূর্খতা, আর রাসুলের প্রতি তার অন্তরে অনুভূতিশূন্যতার প্রমাণ দিয়ে থাকে। তারা বলে, আমার কি দাড়ি রাখতেই হবে? আমার কি সাদা পোশাক পরতেই হবে? সুন্নত সালাত না পড়লে হয় না? আরও এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে? ইত্যাদি।

আমি একজন শায়েখের নিকট এ ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম। আমি বললাম, শায়েখ! আমাদের এবং সাহাবাদের মধ্যে পার্থক্য কী? তিনি বললেন, সাহাবাগণ প্রতিটি সুন্নাহকে সুন্নাহ হওয়ার কারণেই তা পালন করতেন, অথচ আমরা সুন্নাহ হওয়ার কারণেই সুন্নাহগুলো ছেড়ে দিই!

আমার ভাই-বোনেরা! তুমি নিজে সিরাত শিখে স্ত্রী-সন্তানদেরও সিরাত শেখাও। পরিবারে সিরাতচর্চা না-থাকার দরুন আজ আমাদের সন্তানরা জাস্টিন বিবারের আদর্শ ধারণ করেছে। তাদেরকে একজন মাতাল গায়কের মতো দেখায়; মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মতো নয়।

যে গায়ক-নায়ক-খেলোয়াড়ের আদর্শ তুমি এবং তোমার সন্তানেরা অনুসরণ করছ, সে কি তোমাকে চেনে? তোমার নামটাও তো সে জানে না। অথচ তোমার রাসুল তোমাকে দেখতে উদ্‌গ্রীব ছিলেন, বেচাইন ছিলেন। প্রতিদিন সালাতের শেষে শুধু তোমার জন্য দুআ করতেন। তোমার অস্তিত্ব পৃথিবীতে আসার পূর্বেই যিনি তোমার পাপের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, তাঁর চাইতে আর কে তোমাকে অধিক ভালোবাসতে পারে? পৃথিবীতে এর চাইতে গভীর ভালোবাসা আর কী হতে পারে? বলো?

টিকাঃ
[৭৭] হাকিম, ইবনে আবি শাইবা, আবু ইয়ালা, ইবনে হিশাম, বাইহাকি-সূত্রে সীরাতুন নবি, শাইখ ইবরাহীম আলী, মাকতাবাতুল বায়ান, ১ম সংস্করণ, পৃ. ১০৯।
[৭৮] বাইহাকি থেকে বর্ণিত, হায়াতুস সাহাবাহ, দারুল কিতাব ৩/৬৪।
[৭৯] সুরা আল-আম্বিয়া ২১: ১০৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00