📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 কেমন ছিলেন তিনি?

📄 কেমন ছিলেন তিনি?


মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার আমার মতোই একজন মানুষ ছিলেন। তবে সম্মান মর্যাদার দিক থেকে আল্লাহর পরেই তাঁর অবস্থান। মানুষ হিসাবে কাউকে জানার প্রথম বিষয়টি হলো, তার শারীরিক গড়ন বা আকৃতি。

দেখতে কেমন ছিলেন তোমার-আমার নবি? আল্লাহর প্রিয় হাবিব? হাদিসের ভাষায়:
* তাঁর ছিল মধ্যম গড়নের দেহাবয়বের সাথে উজ্জ্বল ফরসা ত্বক।
* এবং প্রশস্ত মুখমণ্ডলের মাঝে ঘন পাপড়িযুক্ত চোখযুগল।
* লম্বা ঘাড় এবং মাথায় ঘন কালো চুল।
* চুলগুলো অধিক কোঁকড়ানো নয়, আবার একদম সোজা নয়;
* বাবরিকাটা চুল। কখনো কাঁধ অবধি, কখনো কানের লতি পর্যন্ত।
* মৃত্যু অবধি তাঁর মাথার মাঝখানের কিছু চুল, ঠোঁটের নিম্নদেশের এবং চোখ ও কানের মধ্যবর্তী দাড়ির ও কানের মধ্যকার কিছু চুল সাদা হয়েছিল।
* সে কারণে তিনি চুলে খেজাব লাগাতেন না। মৃত্যুকালে তাঁর চুল ও দাড়ির মধ্যে বিশটি চুলও পাকেনি।
তিনি নিয়মিত চিরুনি ব্যবহার করতেন এবং মাথার চুল দুদিকে ভাগ করে দিতেন (তাতে মাঝখানে সিঁথি হয়ে যেত)। ৫৫

তাঁর গোঁফ ছিল ছোট এবং দাড়িগুলো ছিল দীর্ঘ, ঘন। ৫৬

তিনি ছিলেন প্রশস্ত কাঁধবিশিষ্ট। ৫৭

আর কাঁধের বাম দিকে ছিল কবুতরের ডিম্বাকৃতির ন্যায় ছোট্ট একটি গোশতপিণ্ড, এটাই ‘মোহরে নবুয়ত’ বা নবুয়তের সমাপ্তির চিহ্ন, যা ছিল সবুজ বা কালচে চর্মতিলের সমষ্টি। ৫৮

তাঁর প্রসারিত বক্ষ হতে নাভিদেশ পর্যন্ত স্বল্প লোমের প্রলম্বিত একটা রেখা ছিল। ৫৯

দেহের অস্থিসন্ধিগুলো ছিল বড় আকারের, বলিষ্ঠ। পায়ের পাতা ও হাতের তালু ছিল মাংসল এবং প্রশস্ত ও মোলায়েম। ৬০

তাঁর পায়ের গোড়ালি ছিল পাতলা। ৬২

চলার সময় তিনি সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে চলতেন, যেন কোনো ঢালু স্থানে নামছেন। ৬০

তাঁর দেহ হতে নিঃসৃত ঘাম মুক্তার মতো দেখা যেত, যা ছিল মিশকে আম্বরের চাইতেও সুগন্ধময়। ৬৩

প্রফুল্ল অবস্থায় তাঁর মুখমণ্ডল চন্দ্রের ন্যায় ঝলমল করত। ৬৪
রাগান্বিত হলে তাঁর চেহারা ডালিমের মতো লাল হয়ে যেত। ৬৬

শক্ত, সমর্থ ও শক্তিশালী দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী এই সুন্দর মানুষটির দেহ বৃদ্ধবয়সে কিছুটা ভারী হয়ে গিয়েছিল। ৬৭

উম্মু মাবাদ সবচাইতে সুন্দরভাবে তাঁর বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, 'আমি এমন একজন মহাপুরুষকে দেখেছি...

যার চেহারা আলোকময়, যেন পূর্ণিমার চাঁদ। সুদর্শন, প্রফুল্ল মুখমণ্ডল।

উদর স্ফীত ছিল না।

মাথা ছোট ছিল না। (যেটা শরীরের সাথে বেমানান)

খুব সুন্দর ও সুদর্শন, যাকে শুধু দেখতেই মনে চায়।

ডাগর চোখ এবং চোখের মণি অত্যন্ত কালো।

চোখের কালো অংশ অধিক কালো এবং সাদা অংশ অধিক সাদা। মনে হয় চোখে সুরমা লাগানো।

লম্বা ভ্রুযুক্ত। ভ্রুযুগল নাতিসূক্ষ্ম এবং পরস্পরে মিলিত।

তাঁর গ্রীবা সুউচ্চ।

ঘন দাড়িবিশিষ্ট।

যখন নীরব থাকতেন তখন গাম্ভীর্য ছেয়ে যেত, আর যখন কথা বলতেন তখন সর্বত্র নুর ছড়িয়ে পড়ত।

তাঁর কণ্ঠে ছিল জাদু ও মায়া।

ভাষা প্রাঞ্জল, তাতে কোনো ত্রুটি নেই, আবার অতিরিক্ততাও নেই। যেন তাঁর বাক্যমালা বিরামহীন গড়িয়ে পড়া মুক্তার দানা।

তিনি দূর থেকেও সুন্দর, সুদর্শন ও প্রীতিকর। এবং কাছে থেকেও মধুর, মোহন ও মনোমুগ্ধকর।

টিকাঃ
[৪৭] সহিহুল বুখারি: ৩৫৪৭; সহিহ মুসলিম: ১২৩৪০, ২৩৪৭।
[৪৮] সহিহ মুসলিম: ২৩৩৯; মিশকাত: ৫৭৮৪, সহিহুল জামি: ৪৬২১।
[৪৯] সুনানুত তিরমিজি: ৩৬৩৭; মিশকাত: ৫৭৯০।
[৫০] সহিহুল বুখারি: ৩৫৪৭; সহিহ মুসলিম: ২৩৪৭।
[৫১] সহিহ মুসলিম: ২৩৩৮; মিশকাত: ৫৭৮২।
[৫২] সহিহুল বুখারি: ১৩৫৪৫; সহিহ মুসলিম: ২৩৪১; সুনানুন নাসায়ি: ৫০৮৭।
[৫৩] মুসনাদু আহমাদ: ১৩৩৯৬, সনদ: সহিহ।
[৫৪] সহিহুল বুখারি: ৩৫৪৭; সহিহ মুসলিম: ২৩৪৭।
[৫৫] সহিহুল বুখারি: ৩৫৫৮; সহিহ মুসলিম: ২৩৩৬; মিশকাত: ৪৪২৫।
[৫৬] সহিহ মুসলিম: ২৩৪৪; সুনানুন নাসায়ি: ৫২৩২; মিশকাত: ৫৭৭৯।
[৫৭] সহিহুল বুখারি: ৩৫৫১; সহিহ মুসলিম: ২৩৩৭; মিশকাত: ৫৭৮৩।
[৫৮] সহিহ মুসলিম: ২৩৪৪, ২৩৪৬; মিশকাত: ৫৭৮০।
[৫৯] সুনানুত তিরমিজি: ৩৬৩৭; মিশকাত: ৫৭৯০।
[৬০] সুনানুত তিরমিজি: ১৩৬৩৭; মিশকাত: ৫৭৯০।
[৬১] সহিহুল বুখারি: ৩৫৬১, ৫৯০৭।
[৬২] সহিহ মুসলিম: ২৩৩৯।
[৬৩] সুনানুত তিরমিজি: ৩৬৩৭; সহিহ মুসলিম: ২৩৩০; মিশকাত: ৫৭৮৭, ৫৭৯০।
[৬৪] সহিহুল বুখারি: ১৯৭৩; সহিহ মুসলিম: ২৩৩০; মিশকাত: ৫৭৮৭。
[৬৫] সহিহুল বুখারি: ৩৫৫৬; সহিহ মুসলিম: ২৭৬৯; মিশকাত: ৫৭৯৮।
[৬৬] সুনানুত তিরমিজি: ২১৩৩; মিশকাত: ৯৮।
[৬৭] সহিহ মুসলিম: ৭৩২; মিশকাত: ১১৯৮।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 তাঁর চরিত্র কেমন ছিল?

📄 তাঁর চরিত্র কেমন ছিল?


তিনি ছিলেন মধ্যম গড়নের; অতিলম্বাও না আবার একেবারে বেঁটেও না, যা দর্শনে বিরক্তি ও হাসি পায়। যেন তিনি দুটো শাখার (আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আমির ইবনু ফুহাইরা) মাঝখানে সদ্য পল্লবিত সতেজ ও সুদর্শন নবীন প্রশাখা।

তাঁর দেহাবয়ব বড় আকর্ষণীয়।

তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে বেষ্টন করে রাখে, তিনি কিছু বললে তা মনোযোগ দিয়ে শোনে আর কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে তা আনন্দচিত্তে পালন করে, তাঁর সাহাবাগণ তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান করে এবং তাঁর খেদমতে জান কোরবান করে দেয়, তাঁর সান্নিধ্যলাভে ধন্য হতে লোকজন তাঁর নিকট সমবেত হয়।

তিনি রূঢ় স্বভাবের নন এবং উপহাসকারীও নন।'

তার স্বামী আবু মাবাদ বললো, 'আল্লাহর শপথ! ইনিই হলেন কুরাইশের সেই মহান ব্যক্তি, যাকে তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে। যদি আমি তাঁকে পাই তাহলে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করব এবং তাঁর সঙ্গী হয়ে যাব, আর এর জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব।'[৬৮]

তাঁর চরিত্র কেমন ছিল?

জুরারাহ থেকে বর্ণিত, উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্র ছিল আল-কুরআন।' [৬৯]

কুরআন যার চরিত্র, তাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা কুরআনের মতোই করা অসম্ভব। তিনি মানুষিক গুণাবলির উচ্চতম চূড়ার অধিকারী ছিলেন।

তাঁর ব্যক্তিসত্তা সম্পর্কে আরেকটু বেশি বর্ণনা করে হাসান ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি (আমার) মামা হিন্দ ইবনু আবি হালা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবয়ব ও চরিত্র সম্পর্কে সুন্দররূপে বর্ণনা করতেন। আমি বললাম, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাচনভঙ্গি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন।' তিনি বললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা আখিরাতে উম্মতের মুক্তির চিন্তায় বিভোর থাকতেন। এ কারণে তাঁর কোনো স্বস্তি ছিল না।

তিনি অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না।

তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতেন। তাঁর কথা ছিল একটি থেকে অপরটি পৃথক।

তিনি ব্যাপক অর্থবোধক সীমিত বাক্যালাপ করতেন। তাঁর কথাবার্তা অধিক বিস্তারিত ছিল না, কিংবা অতি-সংক্ষিপ্তও ছিল না। অর্থাৎ তাঁর কথার মর্মার্থ অনুধাবনে কোনো প্রকার অসুবিধা হতো না।

তাঁর কথায় কঠোরতার ছাপ ছিল না, থাকত না তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভাব।

আল্লাহর নিয়ামত যত সামান্যই হতো, তাকে তিনি অনেক বড় মনে করতেন। এতে তিনি কোনো দোষত্রুটি খুঁজতেন না। তিনি অপরিহার্য খাদ্যসামগ্রীর ত্রুটি খতিয়ে দেখতেন না এবং উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করতেন না।

পার্থিব কোনো বিষয় বা কাজের ওপর ক্রোধ প্রকাশ করতেন না এবং তার জন্য আক্ষেপও করতেন না।

অবশ্য যখন কেউ দীনি কোনো বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করত, তখন তাঁর রাগের সীমা থাকত না। এমনকি তখন কেউ তাঁকে বশে রাখতে পারত না।

তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কারণে ক্রোধান্বিত হতেন না এবং এজন্য কারও সাহায্য গ্রহণ করতেন না।

কোনো বিষয়ের প্রতি ইশারা করলে সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন।

তিনি কোনো বিস্ময় প্রকাশ করলে হাত ওলটাতেন।

যখন কথাবার্তা বলতেন, তখন ডান হাতের তালুতে বাম হাতের আঙুলের অভ্যন্তরীণ ভাগ দ্বারা আঘাত করতেন।

কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হলে তার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিতেন এবং অমনোযোগী হতেন।

• যখন তিনি আনন্দ-উৎফুল্ল হতেন, তখন তাঁর চোখের কিনারা নিম্নমুখী করতেন。

• অধিকাংশ সময় তিনি মুচকি হাসতেন। তখন তাঁর দাঁতগুলো বরফের ন্যায় উজ্জ্বল সাদারূপে শোভা পেত।'[১০]

এ ছাড়াও তাঁর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, যা আজ এই উম্মত থেকে হারিয়ে গেছে। তা হলো, হায়া বা লজ্জাশীলতা।

এ সম্পর্কে আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্দানশিন কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। কোনো কিছু তাঁর অপছন্দ হলে তাঁর চেহারা দেখেই আমরা তা বুঝতে পারতাম।”

অথচ আজ আমাদের সমাজে লজ্জাকে দুর্বলতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়; চশমখোর, গায়রতহীন ও নির্লজ্জদের উৎকৃষ্ট হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু লজ্জা কোনো দুর্বলতা নয়। কেননা সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহসের ব্যাপারে বর্ণনা করেন:

আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব লোকের মাঝে অতি সুন্দর, অতি দানশীল এবং শ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন। কোনো এক রাত্রে মদিনাবাসীরা ভীত হয়ে পড়েছিল। অতঃপর যেদিক থেকে শব্দ আসছিল, লোকেরা সেদিকে ছুটে চললো। রাস্তায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে তাদের দেখা হয়, তখন তিনি ফিরে আসছিলেন। কারণ শব্দের দিকে প্রথম তিনিই দৌড়ে গিয়েছিলেন। তখন তিনি আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর গদিবিহীন ঘোড়ায় চড়ে ছিলেন। তাঁর কাঁধে তলোয়ার ছিল। তিনি বলছিলেন, তোমরা ভয় পেয়ো না; তোমরা আতঙ্কিত হোয়ো না। তিনি আরও বললেন, আমি এ ঘোড়াকে পেয়েছি সমুদ্রের মতো, কিংবা বললেন, এ তো সমুদ্র। অথচ ইতিপূর্বে এ ঘোড়ার গতি ছিল মন্থর!'[৭২]

হজরত ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,
'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপেক্ষা না কোনো বীর, সবল ও উদারপ্রাণ ব্যক্তি দেখেছি এবং না অন্যান্য চরিত্রগুণেও তাঁর চেয়ে পছন্দনীয় কাউকে দেখেছি। বদরযুদ্ধে আমরা তাঁর আড়ালে আশ্রয় নিতাম। কারণ, বড় বীর তাঁকেই মনে করা হতো, যে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর সন্নিকেটে থাকত। কারণ, তখন তিনিই ছিলেন কাফেরদের নিকটবর্তী।' [৭৩]

হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'ঘনঘোর যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। তিনিই সর্বদা শত্রুর নিকটবর্তী থাকতেন।' [৭৪]

একটু কল্পনার চোখে দেখো তো: একজন মানুষ, যিনি সিংহের মতো বীর, আবার একই সাথে নারীর চেয়েও লাজুক; আবার একই সাথে বিনয়ের চূড়ান্ত, ধৈর্যের চূড়ান্ত; দেখামাত্র মন কেড়ে নেয়, মিশলেই তার ব্যক্তিত্ব প্রাণ কেড়ে নেয়— সাহাবিগণ পাগলপারা হবেন না কেন? এমন একজন মানুষকে তো সর্বস্ব দিয়ে দিতে মন চায়। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম。

টিকাঃ
[৬৮] সনদ: সহিহ, আল-মুসতাদরাক, আল-হাকিম: ৪২৭৪।
[৬৯] সহিহ মুসলিম: ১৬২৪。
[৭০] শুআবুল ইমান: ১৩৬২।
[৭১] সহিহুল বুখারি: ৬১০২; সহিহ মুসলিম: ৬১৭৬।
[৭২] সহিহ মুসলিম: ৫৯০০。
[৭৩] নাশরুত তীব।
[৭৪] মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৪, সনদ: সহিহ।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 তিনি আমাদের কে হন?

📄 তিনি আমাদের কে হন?


এবারের হাদিসটি তোমার জন্য। হাদিসটি একটু মায়া নিয়ে পড়ে দেখো। হাদিসের কথাগুলো থেকে তাঁর কাছে তোমার অবস্থানটুকু খুঁজে নাও। উপলব্ধি করো সেই সময়টা, যখন তিনি তোমার কথাই বলেছিলেন! কীভাবে হাজার বছর পূর্বেই এক মায়ার টানে তোমাকে খুঁজেছেন! তোমাকে দেখতে চেয়েছিলেন একনজর! এই ব্যাকুল ভালোবাসার টানে হলেও তো তাকে ভালোবাসা উচিত। দুদিনের ভালোবাসায় তুমি যেখানে সবকিছু ভুলে যাও, তাহলে এই হাজার বছরের ভালোবাসার জন্য কী করা উচিত? ভেবে ভেবে পড়ো, তিনি কী বলেছেন তোমার ব্যাপারে!

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার কবরস্থানে (অর্থাৎ মদিনার জান্নাতুল বাকি-তে) উপস্থিত হলেন এবং সেখানে (মৃতদের উদ্দেশে) বললেন, আসসালামু আলাইকুম, (তোমাদের প্রতি আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক) হে মুমিন অধিবাসীগণ! আমরা ইনশা-আল্লাহ তোমাদের সাথে এসে মিলিত হচ্ছি। আমরা আশা করি, আমরা যেন আমাদের ভাইদের দেখতে পাই। সাহাবিগণ আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বললেন, তোমরা আমার বন্ধু; আমার ভাই তারা, যারা এখনো দুনিয়ায় আসেনি (পরে আসবে)। সাহাবিগণ আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার উম্মতের যারা এখনো আসেনি, তাদের আপনি কিয়ামতের দিন কীভাবে চিনবেন? উত্তরে তিনি বললেন, বলো দেখি, যদি কোনো ব্যক্তির একপাল মিশমিশে কালো রঙের ঘোড়ার মধ্যে ধবধবে সাদা কপাল ও সাদা হাত-পা-সম্পন্ন ঘোড়া থাকে, সে কি তার ঘোড়াগুলো চিনতে পারবে না? তারা বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই চিনতে পারবে, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি তখন বললেন, আমার উম্মত অজুর কারণে কিয়ামতের দিন সাদা ধবধবে কপাল ও সাদা হাত-পা নিয়ে উপস্থিত হবে এবং আমি হাউজে কাওসারের নিকট তাদের অগ্রগামী হিসাবে উপস্থিত থাকব।'[৭৫]

তোমাকে দেখতে চাওয়াটা তাঁর ভালোবাসা। কিন্তু পরকালে জাহান্নام থেকে তোমাকে রক্ষা করার চিন্তাটা কী?

আমাদের ভালোবাসায় তো কত স্বার্থ থাকে, অনুভূতির পূর্ণতা দানের আকাঙ্ক্ষা থাকে, ইচ্ছাপূরণের নানান স্বপ্ন থাকে। কিন্তু তিনি তো তোমার থেকে কিছুই চাননি; উলটো তোমাকে জান্নাতের নিয়ামত উপভোগ করানোর জন্য সব রকম প্রচেষ্টা করেছেন। রবের নৈকট্যলাভের সকল উপায় উপকরণ শিখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর অবর্তমানে কীভাবে তুমি-আমি আল্লাহর সাথে সংযোগ করব, তার সকল পথ বাতলে দিয়েছেন, যেন আমরা অসহায় জীবন না কাটাই। এই ভালোবাসা কী দিয়ে পরিমাপ করবে তুমি?

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'সকল নবির জন্য এমন একটি দুআ রয়েছে, যা আল্লাহ কবুল করবেন। দুনিয়াতে সকল নবি আল্লাহর কাছে দুআ করে নিয়েছেন। আর আমি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের সুপারিশের জন্য দুআটি রেখে দিয়েছি। আমার উম্মতের যে ব্যক্তি শিরক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে ব্যক্তি ইন-শা-আল্লাহ তার ফল পাবে।'[১৬]

তোমার মুক্তির জন্য তিনি পৃথিবীকেও গ্রহণ করেননি, আর তুমি এখনও তাঁর জন্য সামান্য ভালোবাসাও অনুভব করো না! তাকে ঠিকমতো জানোই না! আহ! আর কবে ঘুচবে এই দূরত্ব! কবে মেটাবে এই প্রেমের দায়!

টিকাঃ
[৭৫] সহিহ 'লিম: ২৪৯。
[৭৬] সহিহুল বুখারি: ৬৩০৪。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 তাঁকে জানার শুকর

📄 তাঁকে জানার শুকর


তুমি তোমার রাসুলকে কতটুকু চেনো, তার একটা পরীক্ষা করে দেখি চলো। এভাবে তাঁর সাথে তোমার দূরত্বের সঠিক পরিমাপটা নিরূপণ করা যাবে। ফলে কত দ্রুত আর কত বেশি গুরুত্ব দিয়ে এই দূরত্ব ঘোচাতে চেষ্টা তোমার করা উচিত, তা তুমি বুঝতে পারবে। একদম শুরু থেকেই শুরু করি。

* পৃথিবীর সর্বশেষ রাসুলের নাম কী, বলো তো?
তাঁর নাম, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এটা আমরা সকলেই জানি。

* কিন্তু 'মুহাম্মদ'-এর পরে কী? তার পদবি কী ছিল? তুমি কি তার পদবি সম্পর্কে জানো? আদৌ তার কি কোনো পদবি ছিল?
* তার ভাই-বোন কত জন ছিল? তার পিতা এবং মাতার নাম কী? তুমি কি তাদের পরিচয় জানো?
* তিনি কোথায় জন্মেছেন? কোথায় বেড়ে উঠেছেন? তার গোত্র কী ছিল?
* কোথায় তাকে পাথর নিক্ষেপ করে কষ্ট দেওয়া হয়েছিল বলতে পারবে? কোন পাহাড়ে তাকে আবদ্ধ থাকতে হয়েছিল?
* তুমি কি তার স্ত্রীদের সম্পর্কে জানো?
* তারা প্রত্যেক মুমিনের মাতা। কিন্তু তুমি কি তোমার সেই মায়েদের সবার নাম বলতে পারবে?

তুমি কোনো ছোট্ট শিশুকে তার পিতামাতার নাম জিজ্ঞেস করলে সে যদি উত্তর দেয়, আমি জানি না। তবে তার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী হবে বলো তো?

কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ মুসলমান তাদের মাতাদের সবার নাম বলতে পারবে না।

আচ্ছা, তুমি কি তোমার রাসুলের সন্তানদের ব্যাপারে কিছু জানো? বা তাদের নাম?

উত্তরগুলো মেলাও। আর যদি তোমার মস্তিষ্কে এর কোনো উত্তর খুঁজে না পাও, তাহলে তোমার জীবন অর্থহীন। এসব না-জানার অর্থ হলো পৃথিবীতে এখনও তোমার জন্মানোর উদ্দেশ্য অপূর্ণ রয়ে গেছে। তুমি এখনও জানো না—এই দুনিয়ায় তুমি কেন এসেছ, কেন আছ, এরপর কোথায় যাবে। এবং এর উত্তর জানাকে তুমি গুরুত্বপূর্ণও মনে করোনি। এর মানে, তোমার জীবন আর একটা বেড়াল-ফড়িং-পাখির জীবনের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। ওদের মতোই মৌলিক ও জৈবিক চাহিদা পূরণ ছাড়া তোমার জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তুমি এখনও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়েই উঠতে পারোনি।

মানুষ হিসেবে আমাদের সত্তার শতভাগ বিকাশ যেন হয়, মানবজনম যেন পূর্ণতা পায়, সেই বার্তা নিয়ে যিনি এসেছিলেন, নিজে মডেল হয়ে সত্তাকে পরিপূর্ণ করে যিনি দেখিয়েছেন মুক্তির পথ, সেই কান্ডারি-দিশারি সম্পর্কে এত অজ্ঞতা কেন? কেন আমরা এখনও তাকে চিনি না, জানি না?! কেন এই অনীহা?

তাকে পুরোপুরি জানি না, তা নয়। তাঁর কথা ততটুকুই জানি যতটুকু দু-তিন মিনিটের ভিডিও কিংবা আধ ঘণ্টার কোনো বক্তব্যে শোনা যায়। মাঝে মাঝে ছিটেফোঁটা কানে এসেছে তাঁর বাণীগুলো। যার প্রতি সাধারণ মানুষ খুব কমই গুরুত্ব দেয়!

এর মূল কারণ তাঁর জীবনী (সিরাত) আলোচনার অভাব। 'কী বলছি' তা বোঝাতে হলে 'কার ব্যাপারে' বলছি (মানে, এগুলো 'কার বাণী') সেটা মানুষকে আগে জানানো দরকার। মানুষের স্বভাব হলো : যাকে চেনে, তার কথাকে পাত্তা দেয়। যার মর্যাদা-গুরুত্ব জানে, তার কথাকে ওজনের সাথে নেয়। 'কাকে অনুসরণ করতে হবে' তা জানা থাকলে 'কী বা কেন অনুসরণ করব', তা নিয়ে আর প্রশ্ন-দ্বিধা-সংশয় থাকবে না। রাসুল সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি কী করে তাঁর হাদিসের মূল্য বুঝবে, কী করে সুন্নাহের অনুসরণ করতে চাইবে!

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির পুরো জীবনটিকে কয়েক পৃষ্ঠায় এঁকে দেওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য আলাদা গ্রন্থ রয়েছে। তার মধ্যে সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া (মুফতি শফি রাহ.), নবীয়ে রহমত (আবুল হাসান আলী নদবী রাহ.), সীরাতে মুস্তফা (ইদরীস রাহ.)।

কান্ধলভী রাহ.), আর-রাহীকুল মাখতুম (শফিউর রহমান মুবারকপুরী রহ.) উল্লেখযোগ্য। এগুলো পড়ে নিয়ো।

কিন্তু এক্ষেত্রেও আমাদের নানান সমস্যা দেখা যায়। আইনস্টাইন, নিউটন কিংবা ডারউইনের জীবনীর প্রতি যতটা আগ্রহ থাকে, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনীর প্রতি অতটা আগ্রহ কাজ করে না। কারণ একটাই। ওই যে তাকে বোঝানোর অভাব। তাকে জানানোর অভাব। কাকে পড়ছ সেটাও তো তুমি জানো না, আগ্রহ তৈরি হবে কী করে?

ক্ষমতাশালী ইউরোপ এসব বিজ্ঞানীদের কথা প্রচার প্রসার করে করে তাদের বিস্ময় হিসাবে তুলে ধরেছে, তাদের কর্মকাণ্ড আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে দিয়েছে। ফলে আগ্রহ নিয়ে তুমি তাদের জীবনী পাঠ করো। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্রকে, তাঁর জীবনকে তারা উপস্থাপন করেছে বিকৃতভাবে, আর আমরা উপস্থাপন করেছি অনাগ্রহ, হীনম্মন্যতার সাথে। ব্যাপকহারে উপস্থাপনের ব্যর্থতা এবং নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যাটফরমের মাঝে সীমাবদ্ধ আলোচনা-আমাদের সন্তানদের আজকের এই অনীহার মূল কারণ।

কিন্তু এবার অন্তর থেকে সব অনাগ্রহ দূর করতে হবে। এর বদলে জাগ্রত করতে হবে ভালোবাসা, নইলে আর উপায় নেই। দুনিয়া-আখিরাতে বাঁচতে চাইলে তাকে জানতেই হবে, মানতেই হবে।

ভালো খবর হলো, প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই আল্লাহর এবং মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভালোবাসা সৃষ্টিগতভাবেই দেওয়া হয়েছে। তবে মানুষের অপকর্ম আর ভিন্ন আদর্শের ভেতর নিজ আসক্তির আশ্রয় খোঁজা এই অনুভূতিকে চেপে রাখে। কোনো খেলোয়াড়, নেতা, নায়ক বা নোংরা চরিত্রকে নিজের মন-মগজে ধারণ করতে করতে রাসুলের প্রতি তোমার অনুভূতি দুর্বল হয়ে গেছে। সারাক্ষণ তাদের দেখে, তাদের কথা শুনে আর তাদের সম্পর্কে বলতে বলতে রাসুলের প্রতি তোমার আকাঙ্ক্ষা কমে গেছে।

তবে পরিবর্তনটা এখনই প্রয়োজন। যেহেতু দীনের প্রতি তোমার আগ্রহ সামান্য হলেও বাকি আছে, সুতরাং সেইটুকু শক্তি দিয়ে জেঁকে বসা ভিন্ন আদর্শগুলোকে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখো। আর সবকিছু খালি করে একবার প্রবেশ করো 'সিরাত'-এ।

একজন মানুষের অন্তরে ভালোবাসার তখন অনুভূতি শুরু হয়, যখন সে কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য (যা তার পছন্দ) কারও মাঝে পেয়ে যায়। গুণটির মুগ্ধতাটাই ব্যক্তির প্রতি মুগ্ধতায় রূপ নেয়। মানুষের অন্তরের প্রকৃত চরিত্রই এমন।

প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে তোমার অন্তরের দুর্বলতা কোন গুণের প্রতি, যা অন্য কারও মাঝে পেলে তুমি তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ো। সৌন্দর্য, চরিত্র, সক্ষমতা, উত্তম বৈশিষ্ট্য, দক্ষতা, সাহায্য-কোনটা? এককথায়, কী তোমাকে অন্য আরেকটা মানুষের দিকে আকৃষ্ট করে, তোমার ভেতরের সেই দুর্বলতা বের করো। এরপর সেই অনুপাতে রাসুলের জীবনীতে ডুব দাও।

আমি এখনই তোমাকে ভালোবাসতে বলছি না। ভালোবাসা চলে আসে; জোর করে আনা যায় না। তুমি পৃথিবীর সর্বত্র যেভাবে ভালোবাসা খুঁজে ফিরেছ, নিজের মূল্য খুঁজে ফিরেছ; শুধু একবার তোমার রাসুলের কাছেও ভালোবাসার তালাশ করে দেখো, দেখো কত মূল্যবান তুমি তাঁর কাছে। অন্যদের সামান্য কিছু দক্ষতা দেখেই যেভাবে মুগ্ধ হও, তোমার রাসুলের কারিশমা কেমন ছিল সেটাও একটু জেনে নাও। অন্যদের ভালোবাসা দেখে যেমন বিস্মিত হও, তোমার রাসুলের ভালোবাসার চিত্রগুলোও একটু দেখে নাও।

সহজ ভাষায়...
* তোমার যদি সৌন্দর্যের প্রতি আসক্তি থাকে, তুমি তোমার রাসুলের সৌন্দর্য খুঁজে দেখো; তাঁর চেয়ে আরও সুন্দর কাউকে পাও কি না।
* তোমার হয়তো গুরুত্ব প্রয়োজন, কেউ তোমাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চায় না। তুমি তোমার রাসুলের কাছে যাও, বিষণ্ণ মনে তাঁর সিরাতে খুঁজে দেখো। বিদায় হজের ভাষণ... রাত্রিবেলা জান্নাতুল বাকি-তে তোমাকে খোঁজা... প্রতিনিয়ত তোমার মাগফিরাতের প্রার্থনা... কিংবা হাশরের কঠিন ময়দানে তোমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা-তাঁর জীবনের কোথায় 'তুমি' নেই!

সিরাতের সব অংশে প্রবেশের আগ্রহ না থাকলে তোমার আসক্তি যেখানে সেখান থেকেই পড়ো। তুমি সত্যিই তোমার কাঙ্ক্ষিত সুখ পেয়ে যাবে। রাসুলের আবেগের তরঙ্গ থেকে নিজের হাহাকারগুলো পূর্ণ করে নাও।
* তোমার হয়তো সাধারণ বিষয় পছন্দ না-ও হতে পারে। তুমি তাহলে টানটান উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধের অধ্যায়ে যাও। দেখো তাঁর বীরত্ব, দেখো তাঁর সাহস! যে যুদ্ধে ফেরেশতা এসেছিল, তার চিত্রটা কেমন ছিল দেখো। যুদ্ধের ময়দানে সাহাবাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা দেখো। তোমার অন্তরেও ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।

তুমি যদি একটু আবেগী হও, একটু প্রেম-প্রেম স্বভাব হয়; তবে যাও না, যাও, তাঁর স্ত্রী আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে খুনশুটির চিত্রগুলো দেখো। দেখো না, কত মায়া দিয়ে কত আবেগ দিয়ে তিনি বলেন, 'আয়িশা! যে-দিন থেকে শুনেছি জান্নাতেও তুমি আমার স্ত্রী হবে, মৃত্যুকেও যেন প্রিয় মনে হচ্ছে!' তাঁর অন্য স্ত্রীদের মধ্যকার আটা মাখামাখির চিত্র দেখে ভালোবাসা বুঝে নাও। ভালোবাসা-রা যাঁকে দেখে ভালোবাসতে শিখেছে, কী করে তাঁর কাছে গিয়ে তোমার আবেগের পিয়াস মিটবে না!

তুমি যদি হও একটু পড়ুয়া স্বভাবের, তাহলে তো পুরো জীবনীতেই তোমার জন্য লুকিয়ে আছে মুক্তা। খুঁজে খুঁজে বের করতে থাকো। তোমার জন্যই মূলত সিরাত। তুমি যদি পড়ার মতন পড়তে পারো, তবে পৃথিবীর অন্য সব গল্প পড়তে ভুলে যাবে।

এ ছাড়া তুমি যদি নারী হও, তাহলে তাকিয়ে দেখো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকে কতটা সম্মান দিয়েছেন। নিজ কন্যা ফাতিমার আগমনে কীভাবে তিনি উঠে গিয়ে হাতে চুমু দিয়ে দরজা হতে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। উহুদের ময়দানে তাকে রক্ষা করতে সন্তানসহ যুদ্ধ করা বীরাঙ্গনা সাহাবিয়ার ভালোবাসা দেখো। সবই আছে তোমার রাসুলের জীবনে। অন্যদের চোখে নয়, তুমি নিজের রাসুলকে তোমার মতো করেই খুঁজে নাও।

আর হ্যাঁ, বই পড়তে অস্বস্তি হলে লেকচার শোনো। সব লেকচার নয়; যেখানে উম্মতের প্রতি তাঁর দরদ আর মায়া উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো আগে শোনো। হাশরের দিন কীভাবে তিনি তোমার শাফায়াত করবেন, তার বর্ণনাগুলো শোনো। তোমার যে যে বিষয় পছন্দ, তা দিয়েও খুঁজে দেখো। আধুনিক যুগের মানুষ হয়ে যদি এইটুকু না করো, তবে কী জবাব দেবে তোমার রবের কাছে?

তোমার এই খোঁজাখুঁজি আর জানাশোনার মাধ্যমে তাঁর প্রতি তোমার আবেগ তৈরি হবে। ধীরে ধীরে ভালোলাগা পেরিয়ে তুমি প্রবেশ করবে ভালোবাসায়। তাঁর জীবনের সামান্য অংশের মুগ্ধতা তোমাকে পুরো জীবনের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। তখন কিছু মিনিটের আলোচনা আর কয়েক পৃষ্ঠা তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।

না। তুমি হাজার পৃষ্ঠার সমুদ্রে ডুব দেবে, কয়েক ঘণ্টার বিস্তর আলোচনা তোমাকে দুনিয়া ভুলিয়ে দেবে।

এভাবে একটা সময় কী হবে জানো? তোমাকে আর সুন্নাহ অনুসরণের কথা বলে দিতে হবে না। তুমি মাত্র একটা সুন্নাহের পরিবর্তে পৃথিবীকেই ছেড়ে দিতে দ্বিতীয়বার আর ভাববে না।

আর জান্নাত যেহেতু তোমার প্রয়োজন, শাফায়াত যেহেতু তোমার প্রয়োজন, জাহান্নাম থেকে যেহেতু তুমি মুক্ত হতে চাও, তুমি যেহেতু দুনিয়াতে প্রকৃত ভালোবাসা অনুভব করতে চাও, তাই তোমাকেই নিজের প্রবৃত্তির অনীহাকে দমিয়ে সিরাতের দিকে যেতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানার জন্য আগ্রহী হতে হবে।

সিরাতের প্রতি অনাগ্রহের আরেকটি কারণ হলো, এটা কেবল নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার বর্ণনা এবং তথ্য হিসাবে গ্রহণ করা। এ কারণে অনেকে সিরাত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও এর প্রতি কোনো বিশেষ টান অনুভব করে না। অনেকে হয়তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমস্ত জীবনীকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ করেছে। জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন, মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি তাঁর মাতাকে হারান। তারপর দাদা তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব দেন, তারপর চাচা, এভাবে একটার পর একটা ঘটনা ক্রমানুসারে সে বলতেই থাকবে। কিন্তু এটা পরীক্ষার আগমুহূর্তের প্রয়োজনে বেখেয়ালি মুখস্থ ছাড়া কিছুই নয়।

অথচ বর্তমান পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে, তোমার দেশে, তোমার শহরে, তোমার সঙ্গে যা কিছু ঘটছে—এর প্রতিটার কারণ এবং সমাধান সিরাতের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু হাতের নাগালে সমাধান থাকা সত্ত্বেও আমরা তা গ্রহণ করছি না। সিরাত সম্পর্কে অজ্ঞতা আমাদের বিভ্রান্তির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে। ব্যর্থতায় আশাহত হয়ে বিষণ্ণ জীবন অতিবাহিত করছে মানুষ। অথচ সিরাত আমাদের ব্যর্থতার মাঝেও বিজয়ী হতে শেখায়, সুস্পষ্টভাবে বিজয়ের সংবাদ দেয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনী বা সিরাত হলো তোমার জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ। তোমার বাহ্যিক জীবনে কুরআনের বিধানগুলো বাস্তবায়নের সঠিক মাধ্যম। তাঁর প্রতিটি পদচিহ্ন এই উম্মতের জন্য গচ্ছিত এক 'ম্যানুয়াল স্ক্রিপ্ট'। তাতে জীবনের প্রতিটা ধাপে ধাপে করণীয় আর বর্জনীয় বিষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। তা অনুসরণ করাই মানুষের চরিত্রকে পূর্ণতা দেয়। সুতরাং সিরাতের প্রতি মনোযোগী হও。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00