📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 দান করলে সম্পদ বাড়ে

📄 দান করলে সম্পদ বাড়ে


আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘দান করায় সম্পদ কমে যায় না।’[৩৯]

কিন্তু আমাদের অনেকে অসহায়দের সাহায্য করার ক্ষেত্রে কৃপণতা করে বা অনীহা প্রকাশ করে। এখানেও মূল পরীক্ষাটা হলো বিশ্বাসের।

মনে করো, তোমার কাছে ১০০ টাকা আছে আর তুমি এর থেকে ৫০ টাকা সদকা করলে। এমতাবস্থায় তোমার চোখ, মস্তিষ্ক, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবকিছু বলছে, তোমার ৫০ টাকা চলে গেল। তোমার হাতের বাকি ৫০ টাকা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে, তুমি ৫০ টাকা হারিয়েছ।

কিন্তু একজন মুসলমান এ অবস্থাতেও তার বিশ্বাসের অর্থাৎ ইমানের পরিচয় দেয়। সে নিজের চোখ, কান, বিবেকের চাইতেও তার রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথাকে বিশ্বাস করে। সে সবটা জানার এবং দেখার পরেও বিশ্বাস করে, সে ৫০ টাকা হারায়নি। কেননা তার রাসুলের কথা কখনও মিথ্যা হতে পারে না। সে বুঝুক আর না-ই বুঝুক, সে অবশ্যই লাভ করেছে। তবে এখানেও শুধু দুর্বল বিশ্বাসীরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথার চাইতে নিজের বিবেককে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে কৃপণতা করে বসে।

টিকাঃ
[৩৯] সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৬।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 আল্লাহ ও রাসুলের নিঃশর্ত আনুগত্য

📄 আল্লাহ ও রাসুলের নিঃশর্ত আনুগত্য


এবার চলো, একটা আয়াতের দিকে লক্ষ করি। এর মাধ্যমে ইমানের ও আনুগত্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব হবে ইন-শা-আল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা তাঁর কুরআনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণের অনেক প্রশংসা করেছেন। পবিত্র কুরআনের এক স্থানে এই প্রশংসার কারণ বর্ণনা করে বলেছেন,

إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ.
‘মুমিনদের যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি এ মর্মে আহ্বান করা হয় যে, তিনি তাদের মধ্যে বিচার মীমাংসা করবেন, তাদের কথা তো এই
হয় যে, তখন তারা বলে, "আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম।” আর তাঁরা-ই সফলকাম।'[৪০]

তারা বলে, 'আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।' তারা কখনোই বলে না, 'শুনলাম, কিন্তু কেন?' তারা বলে না, 'থামো একটু যাচাই-বাছাই করে দেখি, এর কোনো কল্যাণ আছে কি না।' তারা নির্দ্বিধায় আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের আদেশ মান্য করে। এজন্যই তারা বলে, 'শুনলাম এবং মেনে নিলাম।' আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই গুণের কারণেই তাদের প্রশংসা করেছেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের জন্য প্রকৃত মুমিন হওয়ার পথ বলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا۟ فِىٓ أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا۟ تَسْلِيمًا.
'অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে; তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে, সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়।'[৪১]

এটা কুরআনের আয়াত। এটা আল্লাহর সাথে তোমার বিশ্বাসের অংশ, এটাই তোমার ইমান। এখানে আল্লাহ রব্বুল আলামিন তার নিজের কসম করে বলছেন, لَا يُؤْمِنُونَ.

অর্থাৎ 'তারা মুমিন হতে পারবে না।'

আরেকটু ভালো করে তাকিয়ে দেখো, কথাটা কে বলেছেন!

আয়াতের পরের অংশে তিনি বলেন, حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ.
'যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে।' অর্থাৎ তোমার (নবিজির) মতকে প্রাধান্য দেয়।
এটাই আমাদের দীন। আমাদের মুমিন হতে হলে নিজের সমস্ত বিষয়ে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে প্রাধান্য দিতে হবে।

আজকাল অনেক দীনদার ব্যক্তির মাঝে একটা সমস্যা দেখা যায়। তারা দীনপালন করে ঠিকই, কিন্তু রাসুলের সুন্নাতের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। তারা বলে, ভাই! এটা তো 'সুন্নত মাত্র'। আমি রাসুলকে তো মানি, তাকে বিশ্বাস করি, এই বয়সে দাড়ি রাখলে বুড়ো দেখা যাবে, চাকরিতে গেলে মানুষের কটু কথা সহ্য হয় না ইত্যাদি। সালাত তো ঠিকমতো পড়ছিই!

অনেকেই আবার কিছু বিষয়ে ক্ষেত্রে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে বিচারক মানে, অল্পকিছু ক্ষেত্রে তাঁদের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়। তারা কেবল ততটুকু মানে, যতটুকু তাদের পছন্দ হয়, আর বাকি বিষয়ের ক্ষেত্রে নিজের প্রবৃত্তিকেই অধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এটাই মূলত অবাধ্যতা, যা মানুষের ইহকালীন জীবনের সকল অশান্তির মূল কারণ।

এরপর আয়াতের পরের অংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ. 'তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে, সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব করে না।'

একটু ভালোভাবে লক্ষ করো, আল্লাহ তাআলা এখানে কী বলেছেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, 'তারা শুধু আপনাকে বিচারক হিসাবে মেনে নিলেই হবে না; বরং আপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার দ্বিধাবোধ করা যাবে না।' অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র চিন্তার সুযোগ নেই, এখানে লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলানো যাবে না, কোনো কারণ খোঁজা যাবে না, এর ওপর কোনো তিক্ততা অনুভব করা যাবে না। নিজের মনিবের সিদ্ধান্তকে অনুগত দাসের ন্যায় একনিষ্ঠতার সাথে পালন করতে হবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কি এইটুকুতেই আয়াত শেষ করেছেন? না, আয়াতের শেষাংশ এখনো বাকি রয়েছে। যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا. 'এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়।'

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বুঝিয়ে দিলেন, শুধু তাঁর রাসুলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিচারক হিসাবে মেনে নিলেই হবে না, তাঁর সকল সিদ্ধান্ত নির্দ্বিধায় মেনে নিলেই হবে না, তাঁর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অন্তরের কার্পণ্য ত্যাগ করলেই হবে না; বরং তোমাকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে হলে রাসুলের আদর্শের কাছে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করতে হবে। নিজস্ব ইচ্ছা পূরণের বিন্দু পরিমাণ সুযোগ এখানে নেই।

আল্লাহর আনুগত্যের প্রকৃত রূপ কেমন হবে, তা তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। কুরআনের সুরা আল-আহজাবে তিনি বলেন,

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلُّلًا مُّبِينًا.
'আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন নর-নারীর জন্য নিজেদের ব্যাপারে অন্য কিছু ইখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অমান্য করলো, সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।[১৪২]

আল্লাহর দীন কোনো ছেলেখেলা নয় আমার ভাই এবং বোন! এই দীন কোনো বিশ্বকাপ নয় যে, তুমি এর মধ্যে অমুক খেলোয়াড় বা অমুক দল বেছে নেবে। এখানে ইচ্ছামতো 'পিক অ্যান্ড চ্যুজ' করার কোনো সুযোগ নেই। এখানে যে-সকল বিধিনিষেধ রয়েছে, তা সম্পূর্ণ নিখুঁত এবং পরিপূর্ণ; আর তোমার দায়িত্ব কেবল তা শোনা এবং মান্য করা।

টিকাঃ
[৪০] সূরা আন-নূর ২৪: ৫১।
[৪১] সূরা আন-নিসা ৪: ৬৫।
[৪২] সুরা আল-আহজাব ৩৩: ৩৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00