📄 তাওয়াফ কেন করি?
আরেকটি উদাহরণ লক্ষ করো। আমরা পবিত্র কাবার চারপাশে সাতবার তাওয়াফ করি কেন বলতে পারবে? এটা কি বিজ্ঞানীদের বিশেষ কোনো পর্যালোচনা বা বিশ্লেষণের কারণে? কখনোই নয়। এর একমাত্র কারণ হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের সাতবার তাওয়াফ করতে আদেশ করা হয়েছে তাই। অথচ অনেকে এটা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তায় ডুবে থেকে তাদের হজ ও উমরা পুরোপুরি অনুভব করতে পারে না। তারা কাবার সামনে দাঁড়িয়ে, জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি মুহূর্তেও ভাবতে থাকে, কেন সবাই ঘড়ির বিপরীতে তাওয়াফ করে, ঘড়ির কাঁটার দিকে কেন নয়! কেন সাতবার তাওয়াফ করা হয়, পাঁচবার কেন নয় ইত্যাদি।
📄 তালাকে পর ইদ্দত পালন
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোনো বোনের স্বামী মারা গেলে বা তাদের বিচ্ছেদ হলে, তাকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালত করতে হয়। অর্থাৎ এ সময়ে তাকে পরবর্তী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়। এটা নিয়েও অনেক বোনের প্রশ্নের শেষ নেই। তারা বলে, কেন আমার এই সময় অপেক্ষা করতে হবে? কেন আমি সাথে সাথেই বিবাহ করতে পারব না? চার মাস দশ দিন দীর্ঘ সময়, এটা নারীদের প্রতি অবিচার ইত্যাদি।
আমার বোন! মহান আল্লাহ কি কারও ওপর অবিচার করতে পারেন বলে তোমার মনে হয়? তোমাকে আদেশ করা হয়েছে তুমি তা গ্রহণ করে নেবে। কেন? কারণ তুমি মুসলিম। তুমি নিজেই তো এই দীন গ্রহণ করে নিয়েছ। সুতরাং এর বিধিবিধান মানতে তোমার আপত্তি থাকার সুযোগ নেই।
হ্যাঁ, ইদ্দত সম্পর্কে গবেষণা করে কিছু বিজ্ঞানীরা এর অনেক ভালো দিক বর্ণনা করেছে। তারা বলেছে, 'সাধারণভাবে নারী পুরুষের মিলনের মাধ্যমে তাদের শুক্রাণুর আদানপ্রদান ঘটে থাকে। আর চার মাস পরেই মূলত সেই শুক্রাণু থেকে সন্তান ধারণের অবস্থা ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হয়।' হ্যাঁ, অবশ্যই এটা উত্তম দিক; কিন্তু একজন মুসলিম নারী কি বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার কারণে তার ইদ্দত পালন করবে? কখনোই নয়; বরং এটা আল্লাহর সিদ্ধান্ত। সুতরাং আল্লাহর আদেশ হিসাবেই পালন করতে হবে।
অনেক বোন হয়তো বলতে পারে, বিভিন্ন কারণবশত ছয় মাস ধরে আমার স্বামীর সাথে মিলন হয়নি। তাহলে তো এই বিধান আমার ওপর প্রয়োগ হবে না। এই ছলচাতুরী রুখে দিতেই আল্লাহ সকলের জন্য তাঁর সিদ্ধান্ত পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছেন। আরেকটা উদাহরণ দিই。
টিকাঃ
[৩৮] সুরা আল-বাকারা: ২৩৪।
📄 ডাক্তারকে অন্ধবিশ্বাস
তুমি যখন চিকিৎসার জন্য কোনো চিকিৎসকের কাছে যাও, তার ব্যাপারে কিন্তু তোমার বিন্দুমাত্র ধারণা থাকে না। তিনি কে, তার বাড়ি কোথায়, তিনি কি সৎ না অসৎ তুমি জানো না। সুট-প্যান্ট পরিহিত এক ভদ্রলোক চেয়ারের ওপর বসা থাকেন, তার চারপাশের দেয়ালে হাড়গোড়ের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক চিত্র। দরজায় বা দেয়ালে তার বিভিন্ন ডিগ্রি লেখা। তবে এসব ডিগ্রি সম্পর্কে তুমি কিছুই জানো না। তুমি তার কলেজে গিয়ে তার সম্পর্কে কোনো খোঁজও নাও না।
একজন ব্যক্তির সম্পর্কে কোনোকিছু না জেনেই তুমি নিজের সকল সমস্যা তার কাছে প্রকাশ করে দাও। যে সমস্যার কথা তোমার স্বামী/স্ত্রী বা পরিবারের অন্য কেউও জানে না, তুমি নির্দ্বিধায় তাকে বলে দাও। কিন্তু এখানে তোমার কোনো যুক্তি থাকে না। নিজের গোপনীয়তা জানতে চাওয়া সত্ত্বেও তুমি কিন্তু সেই চিকিৎসকের কাছে কোনো প্রশ্ন ছুঁড়ে দাও না।
এরপর তোমার সকল সমস্যা শুনে সে এক টুকরো কাগজে হিজিবিজি করে কী সব লিখতে থাকে। তোমার দিকে বারবার তাকিয়ে তোমাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তুমি সেই হিজিবিজি লেখাগুলো নিয়ে একটা ওষুধের দোকানে যাও। এই লেখাগুলোর কিছুই তুমি বোঝো না। কিন্তু ওষুধের দোকানের ছেলেটা ঠিকই মুহূর্তের মধ্যেই সব বুঝে নিয়ে লিখিত ওষুধগুলো এনে দেয়। এরপর তোমাকে সেই ওষুধগুলো দেখিয়ে বলে, এটা সকালে, এটা দুপুরে, এটা রাতে। কিন্তু এখানেও তুমি কিছু না বুঝেই বাধ্য ছেলের মতো সবটা মেনে নাও। এই ওষুধ খেলে আদৌও তুমি সুস্থ হবে, না কি আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে, সেটাও তোমার জানা নেই।
তবুও এই সমস্ত কার্যক্রমে তুমি সন্তুষ্ট। এই চিকিৎসাপদ্ধতি, চিকিৎসকের হিজিবিজি লেখা এবং প্রতিষেধকের ব্যাপারে কিছু না জেনেও কোনোরূপ প্রশ্ন ছাড়াই তুমি সব গ্রহণ করে নাও। অথচ তুমি জানো না, সে আসলেই ডাক্তার কি না, তার লিখিত ওষুধগুলো তোমার জন্য উপযুক্ত কি না। তুমি খাওয়ার পরে এগুলো নিয়ম করে সেবন করো। এর কারণ কী? কারণ তুমি জানো, তিনি একজন চিকিৎসক। তিনি রোগ সম্পর্কে যা জানেন, তুমি তা জানো না। তোমার শরীরকে সুস্থ করতে হলে অবশ্যই তার কথানুযায়ী চলতে হবে।
আল্লাহ যখন তোমাকে নিকৃষ্টতর বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকতে বলেন, তখন তোমার সমস্যা হয়। কিন্তু তোমার চিকিৎসক বলেন, তোমার জন্য সকল প্রকার মাংস খাওয়া ক্ষতিকর, তোমার জন্য হাঁটাচলা ক্ষতিকর, তোমার জন্য গোসল করা ক্ষতিকর, তোমার জন্য তোমার পছন্দের বিষয়গুলো করা ক্ষতিকর। তিনি তোমার জীবনের বৈধ বিষয়গুলো এবং তোমার সব সুখ নিষিদ্ধ করে দিলেন। তবুও তুমি অনুগত ছাত্রের মতন তার সকল কথা মেনে নিচ্ছ। আর শুধু মেনেই নিচ্ছ না; তুমি তার কথাতেই নিজের আরাম আয়েশকে, নিজের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ছেড়ে, তোমার জীবনকে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছ। তবুও একবারের জন্য ভ্রু কুঁচকাও না, সেই চিকিৎসককে কোনো প্রশ্ন করো না, যুক্তি দেখিয়ে নিজের অধিকার আদায় করতে যাও না। তাহলে আল্লাহর থেকে তুমি কি একজন চিকিৎসককে অধিক বিশ্বাস করো? তাকে নিজের স্রষ্টার চাইতে অধিক গুরুত্ব দাও?
একজন চিকিৎসক তো মাত্র কিছু বছর পড়াশোনার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করেন। আর তোমার রব তো মহাজ্ঞানী। তিনিই সকল জ্ঞানের উৎস। চিকিৎসক তোমার যে শরীরের চিকিৎসা করেন, তিনিই তার সৃষ্টিকর্তা। তবুও তুমি তাঁর নির্দেশিত নিয়মের মাঝেই কারণ খুঁজে বেড়াও!
এটাই তো পরীক্ষা। তিনি এভাবেই দেখে নিচ্ছেন, না-দেখেও তুমি তাকে কতটুকু বিশ্বাস করো আর কতটুকু গুরুত্ব দাও। আহ! যদি তুমি বুঝতে—তিনিই এই সমস্ত সৃষ্টির একমাত্র সত্য, বাকি সব মিথ্যা; তিনি একমাত্র অস্তিত্বশীল, বাকি সমস্ত সৃষ্টি মাকড়সার জালে ঝুলে আছে মাত্র。
📄 দান করলে সম্পদ বাড়ে
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘দান করায় সম্পদ কমে যায় না।’[৩৯]
কিন্তু আমাদের অনেকে অসহায়দের সাহায্য করার ক্ষেত্রে কৃপণতা করে বা অনীহা প্রকাশ করে। এখানেও মূল পরীক্ষাটা হলো বিশ্বাসের।
মনে করো, তোমার কাছে ১০০ টাকা আছে আর তুমি এর থেকে ৫০ টাকা সদকা করলে। এমতাবস্থায় তোমার চোখ, মস্তিষ্ক, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবকিছু বলছে, তোমার ৫০ টাকা চলে গেল। তোমার হাতের বাকি ৫০ টাকা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে, তুমি ৫০ টাকা হারিয়েছ।
কিন্তু একজন মুসলমান এ অবস্থাতেও তার বিশ্বাসের অর্থাৎ ইমানের পরিচয় দেয়। সে নিজের চোখ, কান, বিবেকের চাইতেও তার রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথাকে বিশ্বাস করে। সে সবটা জানার এবং দেখার পরেও বিশ্বাস করে, সে ৫০ টাকা হারায়নি। কেননা তার রাসুলের কথা কখনও মিথ্যা হতে পারে না। সে বুঝুক আর না-ই বুঝুক, সে অবশ্যই লাভ করেছে। তবে এখানেও শুধু দুর্বল বিশ্বাসীরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথার চাইতে নিজের বিবেককে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে কৃপণতা করে বসে।
টিকাঃ
[৩৯] সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৬।