📄 ঈমান কি?
ইমান-সালাত-সাওম-হজ-জাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ। অর্থাৎ পাঁচটি মূলভিত্তি। এর অন্যতম হলো ইমান, অর্থাৎ অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস।
একটি তাঁবু টাঙাতে প্রথমেই এর চারদিকে চারটি খুঁটির প্রয়োজন হয়। তবে এই চারটি খুঁটি তাঁবুকে পুরোপুরি দাঁড় করানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। তাই মাঝখানে আরেকটি প্রধান খুঁটি দেওয়া হয়। যার ওপর ভিত্তি করে সমস্ত তাঁবুটি দাঁড়িয়ে থাকে।
থাকে। ইসলামের ক্ষেত্রেও সালাত-রোজা-হজ-জাকাত হলো চারদিকের চারটি খুঁটি। আর 'ইমান' হলো তাঁবুর মধ্যখানের মূল খুঁটি। ইসলামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও পয়লা অংশ, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষের অন্তরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে।
ইমান হলো জ্বালানি। ইমানের দুর্বলতার কারণেই একজন মানুষ সালাত থেকে দূরে থাকে, সাওম পালনে বিরত থাকে, হজ করতে চায় না কিংবা জাকাত প্রদানে অনীহা করে।
'ইমান' কী?
ইমান হলো—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, পরকাল ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস। আর এর সবই আমাদের নিকট অদৃশ্য। না দেখেও এসবের প্রতি বিশ্বাস করাই হলো ইমান।
আমাদের ভেতরে ইসলাম থাকা সত্ত্বেও ইমানের যথাযথ ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ আমরা অদৃশ্যের সবকিছু স্বীকার করলেও তা পুরোপুরি মেনে নিতে পারি না। যার কারণে মুসলমান হয়েও মানুষ আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে থাকে, মুসলমান হয়েও অপকর্মে লিপ্ত হয়, মুসলমান হয়েও অন্যকে কষ্ট দেয়—এটাই ইমানের দুর্বলতা।
ইমান হলো অন্তরের বিষয়। এটা মানুষের মূল চালিকাশক্তি। তোমার দুঃখ, কষ্ট, হাসি, কান্নার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। তোমার অন্তরের মধ্যকার উত্থান-পতনের মূল কারণ হলো ইমান।
যদি তোমার ভেতরে ইমান থাকে, তবে এটা তোমাকে সুখের কাছাকাছি রাখবে। তুমি সর্বদা থাকবে সন্তুষ্ট, প্রশান্ত, পরিতৃপ্ত। ইমান তোমার আত্মবিশ্বাস জোগাবে। যন্ত্রণার সময় তোমার ইমান তোমাকে আস্থা, ধৈর্য, সহ্যক্ষমতার জোগান দেবে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, পাপের প্রভাবে অন্তর থেকে ইমান হারিয়ে যায়। আর সেই মুহূর্তে অন্তরের শূন্যস্থান দখল করে নেয় প্রবৃত্তি। তোমার এই ইমানের অভাবের সুযোগ নিয়ে সে তোমাকে আরও বেশি অপকর্মের মাঝে ডুবিয়ে দেয়। ফলে অবশিষ্ট ইমান হারিয়ে তুমি পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাও।
এর বাস্তব উদাহরণ দেখো, জুমার সালাত শেষে দেখবে তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন হয়? অন্তরে কেমন একটা স্বস্তি অনুভব করো, তাই না?
কিন্তু যখনই তুমি মসজিদ থেকে বের হয়ে অসৎ আর অপদার্থ সঙ্গীদের নিকট যাও, মোবাইলের নেট চালু করে অনর্থক ভিডিও দেখতে শুরু করো, তখন ভেতরের সেই অনুভূতিটা আর থাকে না। এভাবে একটার পর একটা অশ্লীল ভিডিও, পোস্ট বা ছবি তোমার অন্তরে প্রবেশ করা ইমানটুকু কেড়ে নিয়ে তোমাকে পুরোপুরি শূন্য করে দেয়। ফলে তুমি বাহ্যিক জীবনে কখন কী করতে হবে তা আর বুঝতে পারো না, কোনোকিছুতে তোমার মন বসতে চায় না, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাও না।
দিনশেষে সারাদিনের পাপের প্রভাবে তোমার অন্তর ভারী হয়ে ওঠে, শারীরিক সুস্থতা সত্ত্বেও কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়ো। কোনো প্রকার কষ্টের কারণ ছাড়াই তোমার অন্তর মরে যেতে চায়। জাগতিক সব সুখ তোমার কাছে থাকা সত্ত্বেও তুমি একটা অভাববোধ নিয়ে ঘুমোতে যাও।
এরপর সকালে সেই শূন্যতা নিয়েই তোমার দিন শুরু হয়। ফলে কি খারাপ কি ভালো, কোনটা সঠিক কোনটা মন্দ—এসব আর তুমি দেখতে যাও না। জুমার দিন ছাড়া মসজিদের প্রতি তোমার অতটা আগ্রহ থাকে না। সালাতের সময়ে কখনো মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভেতরে প্রবেশের জন্য তোমার অন্তর ছিঁড়ে গেলেও প্রবৃত্তি তোমাকে বাইরের পৃথিবীতে টেনে নিয়ে যায়। তুমি সুখী হতে চাইলেও প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করার শক্তি তোমার থাকে না। ফলে অভ্যন্তরীণ শূন্যতা আর প্রচণ্ড অসুখ নিয়ে তুমি সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকো। কাউকে বোঝাতে গিয়েও পারো না যে, তুমি আসলে ভালো নেই। মৃতেরা কী করে অন্য আরেকটা লাশের অবস্থা জানবে বলো? তোমাকে তো জীবন্ত মানুষের কাছে যেতে হবে, যে তোমাকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনতে পারবে। তবে এসবের কারণ কিন্তু একটাই—তোমার অন্তরে ইমানের অভাব, ইমানের দুর্বলতা।
আজকে ইমানের গুরুত্ব না-বোঝার কারণেই বাহ্যিক জীবনে ইসলামের রীতিনীতি অনুসরণ করার পরেও অন্তরের দিক থেকে আমরা নিজেকে পূর্ণতা দিতে পারছি না। তাই ইমানের ক্ষেত্রেও একটু গুরুত্ব দাও।
আজকের পৃথিবীতে কেবল দৃশ্যমান বিষয়গুলোকেই বিশ্বাস করা হয়। অদেখা, অস্পর্শনীয় বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসের মানসিকতা এই আধুনিক সমাজে 'আদিম যুগের চিন্তাধারা' হিসাবে বিবেচিত। তবে একজন মানুষকে মুসলমান হতে হলে তার ওপর 'অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস' করা অপরিহার্য। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রকৃত সফলকাম মানুষদের ব্যাপারে বলেছেন,
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ.
'যারা অদৃশ্যের প্রতি ইমান আনে।'[৩৬]
সফল হতে চাইলে ইমানের বিকল্প কিছু নেই। সাধারণভাবে থার্মোমিটারের পারদের মতোই মানুষের অন্তরেও ইমানের স্তর ওঠানামা করতে থাকে। কারণ মানুষের বাহ্যিক অবস্থা সর্বদা এক রকম থাকে না। একজন মানুষ হয়তো মসজিদে ইমানের আলোচনা শোনে, কিন্তু বাইরে এসে দুনিয়ার ফিতনায় জড়িয়ে পড়ে। বাড়িতে তার অবস্থা এক রকম, কর্মক্ষেত্রে আরেক রকম; বন্ধুদের সাথে এক রকম, একাকিত্বের সময় আরেক রকম। মানুষ যেহেতু একই অবস্থায় স্থায়ীভাবে থাকে না, তাই পরিবেশ, মানুষ, পাপ কিংবা উত্তম কর্মের প্রভাবে তার ইমান সর্বদা ওঠানামার মধ্যে থাকে।
ইমানের স্তর কখন কেমন আছে তা বোঝার উপায় হলো, অন্তরের পূর্ণতা যাচাই করা। কেননা ইমান মানুষের অন্তরে পূর্ণতা দেয়। তোমার যদি কখনো নিজেকে অধিক পরিমাণে একলা মনে হয় বা কোনোকিছুই ভালো না লাগে, তবে বুঝবে অন্তরে ইমানের স্তর নিম্নে অবস্থান করছে। তখন আর কোনোকিছুতেই মন বসে না। এর অর্থ-তোমার ইমান দুর্বল হয়ে গেছে।
আর যখন দেখবে পৃথিবীর সকল দুঃখ, যন্ত্রণা, বিপদের মুহূর্ত কিংবা চরম অসহায়ত্বের পরেও তোমার অন্তরে মনে হবে—ভালোই তো আছি। অন্তরে কোনোরূপ যন্ত্রণা বা ব্যথা অনুভব হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না; সব হারিয়ে ফেলা সত্ত্বেও তুমি শান্ত থাকবে—এটাই তোমার ইমান।
তবে ইমানের স্তর নিম্নে থাকার অর্থ এই নয় যে, তুমি আল্লাহকে বিশ্বাস করো না। অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করে। ইবাদতের মাধ্যমে তোমার ইমান বৃদ্ধি হয়, বিশ্বাসে দৃঢ়তা আসে, অদৃশ্যের প্রতি আস্থার সক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করে। আর পাপের প্রভাবে ইমান হারিয়ে যায়, ইমানের স্তর নিম্নগামী হয়। তাই ইমান বৃদ্ধিতে ইবাদতের বিকল্প কিছু নেই।
তুমি বলতে পারো, কেন আমাদের থেকে সবকিছু লুকিয়ে রাখা হয়েছে?
সহজ উত্তর হলো, তুমি না দেখেই তোমার সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর অন্যান্য সৃষ্টিকে কতটা বেশি বিশ্বাস করতে পারো, তা পরীক্ষা করতে।
তোমার আমার সামনে যদি অদৃশ্যের সব প্রকাশ করেই দেওয়া হয়, তাহলে তো পৃথিবী আর পরীক্ষাকেন্দ্র থাকবে না। এই সাজানো গোছানো সবকিছুই তো কেবল পরীক্ষা; তোমার বিশ্বাসের পরীক্ষা, তোমার কর্মের পরীক্ষা, তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে চলমান সময়ে গৃহীত সিদ্ধান্তের পরীক্ষা। পূর্বেই সবকিছু প্রকাশ করা হলে এই পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যাবে।
সুতরাং অপেক্ষা করো! অবশ্যই যা চাও তার চাইতেও অনেক বেশি কিছু দেখতে পারবে। কিন্তু এখনও দেখার সময়টা আসেনি। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পূর্বেই ফলাফলের আশা করাটা বোকামি। তোমার কাছে যা এসেছে তা পরীক্ষার কারণ, স্থান, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয় সকল উত্তর। সবার পরীক্ষা শেষ হওয়া ছাড়া কারও জন্যেই আলাদাভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হবে না। ফলাফলের জন্য একট নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং অদৃশ্য প্রকাশ হওয়ার পূর্বেই বিশ্বাসে দৃঢ়তা দাও। ফলাফল প্রকাশের পূর্বেই উত্তরপত্র লেখায় মনোযোগী হও।
টিকাঃ
৩৬. সুরা আল-বাকারা ২: ৩।
📄 দীনের বিষয়ে নিজের মতামত
মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই আনুগত্যপ্রবণ। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, জেনে না-জেনেই সে কারও অনুগত হয়ে থাকতে চায়। নিজ সত্তাকে অন্য কারও নিকট নির্ভরশীল করে তোলে। ফলে কেউ পিতামাতার আনুগত্য করে তাদের কথামতো চলছে, কেউ অফিসের বসের আনুগত্য করে তার দুর্ব্যবহার সহ্য করছে, কেউ স্ত্রীর আনুগত্য করে তার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করছে, কেউ স্বামীর আনুগত্য করে নিজের আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিচ্ছে।
কিন্তু দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সবকিছুর আনুগত্যকে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নেওয়া মানুষটাও তার স্রষ্টাকে স্বীকার করতে চাচ্ছে না। সবার অনুগত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তার প্রতিপালকের অনুগত হচ্ছে না। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের আনুগত্যের আসমানি নির্দেশনা জানানো হলেও সে তা গ্রহণ করছে না। নিজ স্রষ্টার আনুগত্য থেকে পলায়ন করতে চাচ্ছে। আসমানি সিদ্ধান্ত জানানো হলে সে নিজের সীমাবদ্ধ বিচারবুদ্ধি আর হিসাবনিকাশ করে তার উপযুক্ততা যাচাই করতে চায়। অনেকে আবার ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কেন আমি এটা করব? এতে আমার লাভ কী? এসব করে আমার কী হবে? আমাকে কেন এসব মানতে হবে?
এই অহংকার সে কেবল স্রষ্টার ক্ষেত্রেই প্রদর্শন করে। তার প্রিয় কোনো কার্টুন চরিত্র, খেলোয়াড়, প্রিয় নেতা বা সুপারহিরোকে নির্দ্বিধায় অনুসরণ করতে তার বিশেষ সমস্যা হয় না। তখন কোনো অজুহাত থাকে না। পছন্দের গায়কের মতো গান গাওয়ায়, পছন্দের ব্র্যান্ডের টি-শার্ট গায়ে চড়াতে, পছন্দের ইউটিউবারের ব্র্যান্ড ব্যবহার করতে বিশেষ সমস্যা হয় না। প্রশ্ন ছাড়াই স্টাইলিশ জুতা, সানগ্লাস কিংবা ব্রেসলেট কিনে শরীরে ঝুলিয়ে রাখে। তারা যতই উদ্ভট কিছু করুক না কেন, সামাজিকভাবেও তাদের গ্রহণ করা হয়। সকলেই জানে, তারা কোনো ব্যক্তি বা আদর্শের প্রতি ভালোবাসার কারণে তাকে অনুসরণ করছে।
কিন্তু যখনই তাকে ইসলামের কথা বলা হয়, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কান বন্ধ করে রাখে, অনুধাবনের অন্তর তালাবদ্ধ করে ইসলামকে বিবেকের কাঠগড়ায় বিচার করতে থাকে। যখন বলা হয় নবির মতো দাড়ি রাখতে, টাখনুর ওপর কাপড় পড়তে, যত যুক্তিতর্ক তখন এসে হাজির হয়।
তুমি অন্তত এসব থেকে বিরত থাকতে চেষ্টা কোরো। নিজের ভেতরের অবস্থাকে আরেকবার যাচাই করে নাও। তুমি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছ তো? তাঁর মহিমার সামনে নিজেকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছ কি না? তার মর্যাদা সম্পর্কে নিশ্চিত জেনেছ কি না? ব্যস।
• এবার তুমি বলো, তার নির্দেশিত কোনো বিধান কি তোমার জন্য ভালো হবে, না কি খারাপ?
হ্যাঁ, অবশ্যই ভালো। নিঃসন্দেহে কল্যাণ ছাড়া আর কিছু নেই আল্লাহর বিধানে।
এটা মনে হতে পারে অত্যন্ত সহজ একটা প্রশ্ন, তবে অনর্থক নয়। বাইরের পৃথিবীর অবস্থা অনেক করুণ। অনেকেই মুখে মুসলিম দাবি করলেও কুরআনের বিধানকে সেকেলে-মধ্যযুগীয়-অচল মনে করে। সবার কথা বাদ দাও, তোমার অন্তরে হয়তো এখনও গোপন কোনো ভ্রান্তি লুকিয়ে আছে, অথচ তুমিও তা জানো না!
• আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দাও। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কি না?
হ্যাঁ, অবশ্যই, তিনি মহাপবিত্র।
তুমি হয়তো ভাববে, কেন এসব বলছি। কারণ আমাদের ভেতরের বিশ্বাসকে পুনরায় যাচাই করতে হবে। আল্লাহ তাআলার পবিত্রতার প্রতি বিশ্বাসকে আরও দৃঢ়ভাবে নিজের ভেতরে গেঁথে রাখতে হবে।
• এরপর বলো, আল্লাহ সবকিছু জানেন কি না?
হ্যাঁ! তিনি সমস্ত কিছু সম্পর্কে জ্ঞাত।
আল্লাহ কি ভুল করেন? নাউজুবিল্লাহ! যিনি এই বিস্ময়কর আকাশ-জমিন-গ্রহ-নক্ষত্র এত নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন, সেই সৃষ্টিকর্তা কীভাবে ভুল করতে পারেন! না, তিনি কখনোই ভুল করতে পারেন না।
তাহলে যখন সেই মহান আল্লাহ নিজ দয়া ও করুণা হতে মানুষের জন্য তার নির্দেশনা-সংবলিত কিতাব এবং শরিয়াহ নাজিল করলেন, যেখানে তিনি মানবজীবনের জন্য হালাল-হারাম, ভালো-মন্দ, করণীয়-বর্জনীয় নির্ধারণ করে দিলেন, তিনি কি তাতে কোনো ভুল করতে পারেন? না! কখনোই নয়; বরং তিনি এইসব বিধিনিষেধ কেবল মানবজাতির কল্যাণের জন্য প্রেরণ করেছেন, যা ইমানদারদের জন্য দুনিয়ার সমাধান এবং জান্নাত লাভের একমাত্র পথনির্দেশক।
মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করে তাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন ঠিকই, তবে তাকে নিজের ওপর ছেড়ে দেননি। তাঁর অসীম দয়া, করুণা ও ভালোবাসা থেকে তিনি সর্বদা মানুষকে সঠিক পথ বা হিদায়াতের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। যুগে যুগে অসংখ্য নবি-রাসুল তাঁর সেই ভালোবাসার প্রমাণ, যাদের মাধ্যমে মানুষকে মানুষের মতো করে বাঁচতে শিখিয়েছেন, পৃথিবীর স্বল্প সময়ের জীবনে সুখী হওয়ার উপায় জানিয়ে দিয়েছেন।
তবে কোনো যুগের সকল মানুষ এই নির্দেশনাকে গ্রহণ করেনি। তারা নিজেদের পছন্দ, ইচ্ছা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বিচার করে তার রবের প্রেরিত নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। আর আমাদের সমাজের কিছু মানুষও আজ একই পথ বেছে নিচ্ছে। সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট হওয়া সত্যকে তারা গ্রহণ করতে চাচ্ছে না।
এসব বলার উদ্দেশ্য কী জানো? এর উদ্দেশ্য হলো, তোমাকে সতর্ক করে দেওয়া। ইসলামের কোনো অংশের ব্যাপারে হোক, দীনের কোনো বিধানের ক্ষেত্রে হোক, বা শরিয়ার ক্ষেত্রে হোক—এখানে মতামত প্রদানের অধিকার কারও নেই। আল্লাহ নিজ সিদ্ধান্তের ওপর কারও প্রশ্ন শুনতে আগ্রহী নন। তিনি নিজ প্রজ্ঞায় তাঁর সৃষ্টির জন্য যা কল্যাণ মনে করেছেন, সেগুলো নির্দেশনা হিসাবে জানিয়ে দিয়েছেন। আর তোমার কর্তব্য হলো, কোনোরূপ প্রশ্ন ব্যতীত তা মান্য করা। প্রশ্ন করাটা ইসলাম নয়। দীনের ব্যাপারে প্রশ্ন করা কোনো সমর্পিত সত্তার চরিত্র হতে পারে না। একজন মুসলমান পুরোপুরিভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে এবং তাঁর দীনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে। সে কেবল আল্লাহর নির্দেশ শোনে এবং সাথে সাথেই তা মেনে নেয়।
এই দীনকে আলোচনা সমালোচনার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়নি। দীন নিয়ে কাউকে মতামত প্রদানের বিন্দুমাত্র অধিকার দেওয়া হয়নি। আল্লাহর পক্ষ হতে ইসলামের পূর্ণতা দেওয়া হয়েছে। এখানে কমবেশি করার আর কোনো সুযোগ নেই। তোমার যদি এই পূর্ণাঙ্গ এবং নিখুঁত শরিয়ত ভালো না লাগে, এই রাসুল পছন্দ না হয়, যদি নিজেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করতে ইচ্ছা না করে, তুমি যদি এর চাইতেও উত্তম কিছু খুঁজে পাও, তা গ্রহণ করো। কিংবা নিজের মতো করে কিছু বানিয়ে নাও। তবুও ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলা থেকে বিরত থাকো।
ইসলাম আল্লাহর দীন। আর আল্লাহর দীনের মধ্যে কোনো মানুষের মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এতে যা আছে, যেভাবে আছে, সেভাবেই গ্রহণ করতে পারলে করো, না পারলে অন্য কোথাও চলে যাও। আল্লাহ তোমার মতামতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ রাখেন না। তিনি সব স্পষ্ট করে দিয়েছেন, 'This is my way, This is my path, This is my Book and This is my Prophet' এখন এটা গ্রহণ করা না-করা তোমার ব্যাপার।
এই অজ্ঞদের সাথে সাথে আমাদের সমাজের তথাকথিত কিছু দীনদার ব্যক্তিও অজ্ঞতাবশত আজকে ইসলামের সর্বনাশ করছে। তাদের নিকট দীন কেবল পারস্পরিক আলাপচারিতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যার ফলে তারা খাওয়ার টেবিলে বসে দীন সম্পর্কে এমনভাবে আলোচনা করে, যেন তা কোনো বিনোদনের বিষয়। দীন সম্পর্কে ইচ্ছামতো কল্পনা করে এবং নিজ ইচ্ছানুসারে তা উপস্থাপন করতে থাকে। নিজেকে বিজ্ঞ প্রমাণ করতে গিয়ে অপরকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, ইসলামের এই বিষয়ে তুমি কী মনে করো? দীনের এই ব্যাপারটাকে তুমি কীভাবে দেখো? তোমার ভাবনা কী? এরপর সে নিজেই উত্তর দেয়, দ্যাখো, আমি মনে করি না যে, দীনের অমুক বিষয়টি সঠিক!
আচ্ছা আমার ভাই! তুমি যে বলছ, 'আমি অমুক বিষয়কে সঠিক মনে করি না।' এটা কীসের ওপর ভিত্তি করে বললে? একটু নিজের গহিনে ডুব দিয়ে দেখো তো, আল্লাহর দীন সম্পর্কে অমন বাক্য ঠিক কেন তুমি উচ্চারণ করলে?
• তোমার 'মনোমতো' না হওয়ায়?
• ব্যক্তিগত আবেগের সাথে মেলেনি, তাই?
• কতটুকু জানো তুমি এ ব্যাপারে?
• না কি নিজেকে উত্তম, চিন্তক, 'অন্যদের মতো না', ব্যালেন্সিং প্রমাণ করতে চাও? কোনটা?
তুমি কি তাহলে আল্লাহর থেকেও উত্তম সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছ? না কি তাঁর নির্দেশের চাইতে আরও বেশি উপকারী কিছু পেয়েছ, যার ওপর ভিত্তি করে তুমি আল-হাকিমের (মহাপ্রজ্ঞাবান) সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করতে পারছ না? আল্লাহর দীন কি এখন তোমার আমার আবেগ অনুসারে চলবে? এটা কেমন আত্মসমর্পণ?
আমার ভাই ও বোনেরা! একটা বিষয় স্পষ্টভাবে জেনে রাখো, আল্লাহর দীন ইসলাম অন্য সকল বিষয়ের মতন সাধারণ কিছু নয়। পৃথিবীর অন্যান্য বিষয়গুলো সময়ের সাথে উন্নত পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু ইসলাম সর্বদা তার পূর্বের অবস্থাতেই থাকবে। এটাকে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
অনেকে প্রশ্ন করে, একজন মুসলমান কেন এসব বিধিবিধান পালন করে? এসব করে কী লাভ? এসব বলে বলে مسلمانوں তার ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। ইসলামের প্রতি তোমার সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি করতে চায়। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তারা কি আল্লাহকে ভুলিয়ে দিতে চায়? না! তারা জানে, আল্লাহকে ভুলিয়ে দেওয়া সম্ভব না, কেননা আল্লাহতে বিশ্বাস আমাদের দেহমনে গ্রথিত। তারা শুধু চায়, আমরা যেন তাঁর বিধিনিষেধগুলোকে অস্বীকার করি, সেগুলো গ্রহণ না করি। তাদের সেই ষড়যন্ত্র আর প্রচারণার শিকার হয়ে অনেক অজ্ঞ মুসলমান ইসলাম নিয়ে ভুল ধারণায় ডুবে থাকে। না জেনেই কুফরি মন্তব্য করে বসে। ইসলামি আইনের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে বসে যায়!
📄 বিশ্বাসের বদলে যুক্তিনির্ভরতা
আল্লাহর নির্দেশিত পন্থা বাদ দিয়ে দীনের ব্যাপারে যা কিছু তোমার অন্তরে আসবে বা মস্তিষ্কে উদ্ভাবিত হবে, তার সবকিছুই শয়তানের পক্ষ থেকে। সুতরাং নিজেকে ভ্রষ্টতার মধ্যে না ফেলে তুমি সমর্পণকারী হয়ে যাও। হালালকে হালাল আর হারামকে হারাম হিসাবে সিদ্ধান্ত দেওয়া আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের ইচ্ছা। এখানে আমাদের প্রশ্ন করার কোনো অধিকার নেই। তুমি যখন দেখবে আল্লাহ বলেছেন: অমুক বিষয় হালাল বা অমুক বিষয় হারাম। এখানেই ফুলস্টপ। একদম থেমে যাও। আর এক পা আগানোর বা পেছানোর সাহস করো না। একজন আত্মসমর্পণকারী বা মুসলমান হয়েও যদি তুমি আল্লাহর সিদ্ধান্ত নিয়ে মনে কোনো প্রশ্নকে স্থান দাও, বা বিকল্পপন্থা অবলম্বন করতে চাও, তবে তুমি নিজেই নিজের ধ্বংসের কারণ হবে।
📄 শুকর খাওয়া
ইসলামে শূকর খাওয়া হারাম কেন বলতে পারবে?
মুসলমানেরা এর হাস্যকর সব উত্তর দেয়। অনেকে বলে, এতে ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, এর মাংসে সমস্যা বা বিজ্ঞানীরা এতে নানান ক্ষতিকর উপাদান পেয়েছে ইত্যাদি।
তাদের উত্তরে আমি বিস্মিত হই। কেননা আল্লাহ তাআলা তো এসব আবিষ্কারের আগেই শূকরের মাংস হারামের ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। একজন মুমিনের জন্য তো এর চেয়ে বড় কারণ দরকার নেই। "শূকর হারাম-কারণ আল্লাহ হারাম বলেছেন, তাই। নিশ্চয়ই তিনি যা জানেন, তুমি তা জানো না। এখানে আর কোনো কারণ খোঁজার তো প্রয়োজন নেই। একজন আত্মসমর্পণকারীর আবার কীসের প্রশ্ন?
একইভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যখন অশ্লীলতা, নারী, জিনা-ব্যভিচারের কাছে যেতে নিষেধ করেন, এর অর্থ এই নয় যে, তিনি তোমাকে উপভোগ করতে দিতে চান না। তিনি তোমাকে যতটা ভালোবাসেন, অন্য কেউ অতটা ভালোবাসতে পারবে না। তিনি তোমার যতটা খেয়াল রাখেন, আর কেউ তা রাখতে পারবে না। সুতরাং তিনি যখন কোনোকিছু হতে দূরে থাকতে বলেন, তা অবশ্যই তোমার কল্যাণের জন্য।
তোমার শূকর থেকে দূরে থাকা, তোমার অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকা, তোমার নিষিদ্ধ কর্মের দিকে না-যাওয়া তার ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য নয়; বরং তুমি সব অপকর্ম থেকে দূরে থাকবে, কারণ এটা আল্লাহর আদেশ। আর আল্লাহর সকল আদেশ নির্দ্বিধায় মান্য করার ব্যাপারে তুমি অঙ্গীকার করেছ। তুমি স্বেচ্ছায় তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছ। এখন তাঁর ইচ্ছাই তোমার ইচ্ছা, তাঁর সিদ্ধান্তই তোমার সিদ্ধান্ত। তুমি নিজের ইচ্ছার স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা, চোখের স্বাধীনতা, কল্পনার স্বাধীনতা স্বেচ্ছায় তার কাছে সমর্পণ করে তাঁর আনুগত্যকে বেছে নিয়েছ। তিনি কিন্তু এতে তোমাকে বাধ্য করেননি। তুমি নিজেই তাঁর বাধ্য হতে চেয়েছ। তুমি নিজের সমস্ত সত্তাকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছ। এটাই প্রকৃত দাসত্ব, যা তুমি স্ব-ইচ্ছায় বেছে নিয়েছ।
আজকে দাস হয়েও অনেকে মনিবের আদেশের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস করে। অথচ এই প্রশ্ন, যুক্তিতর্ক আর বিজ্ঞানের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ঝোঁকের কারণে অনেক মুসলমানের অন্তরে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের স্থান দখল করে রেখেছে।
এ ছাড়া এই যুক্তিতর্কের সমস্যা হলো, তুমি যদি আল্লাহর নিষেধকৃত বিষয় হতে তার ক্ষতির জন্য দূরে থাকো, তবে এটাকে অনেকে সুযোগ হিসাবে কাজে লাগিয়ে তোমাকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে। তারা বলবে, তুমি যেহেতু ব্যাকটেরিয়ার কারণে শূকর খাচ্ছ না, তাহলে আমরা এটাকে ল্যাবে নিয়ে গিয়ে ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করে দিই? কিন্তু ব্যাকটেরিয়া না থাকলেই কি শূকর হালাল হয়ে যাবে?
টিকাঃ
[৩৭] সংশয়ী, আধা সংশয়ী, অমুসলিমদের সামনে ইসলামের সত্যতা স্পষ্ট করতে অনেক সময় সেই ভাষায় কথা বলার দরকার পড়ে, যে ভাষা সে বোঝে। বিশ্বাসের ভাষা বুঝলে তো আর প্রশ্নই ওঠার কথা ছিল না। প্রশ্ন যেহেতু করেছে, তার মানে বিশ্বাসের ভাষা সে বোঝে না। তার যুক্তির ভাষা, বিজ্ঞানের ভাষা প্রয়োজন। তবে তার উদ্দেশ্য হতে হবে 'বিশ্বাসের ভাষা' পর্যন্ত তাকে পৌঁছানো; যুক্তির ভাষাতেই ঘুরপাক খাওয়া নয়।