📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ইসলামের পরিচিতি

📄 ইসলামের পরিচিতি


ইসলামের প্রয়োজনীয়তা বোঝা সত্ত্বেও মানুষ সেই সমাধানকে গ্রহণ না করার বড় একটি কারণ হলো—অজ্ঞতা। ইসলামের সৌন্দর্য, ইসলামের উদ্দেশ্য এবং প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে না-জানার কারণে মুসলমান হয়েও অনেকে ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকে। তাই আমাদের প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে জানা দরকার। বোঝা দরকার এর সঠিক পরিভাষা এবং পদ্ধতি。

'ইসলাম' শব্দের অর্থ কী?

ইবনু মানজুর রচিত লিসানুল আরব-এ বলা হয়েছে, ইসলাম শব্দটি 'ইসতিসলাম' (استسلاما) শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে, কারও কাছে নত হওয়া, আত্মসমর্পণ করা।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ইসলাম কাকে বলে? এর সঠিক পরিভাষা কী?

📄 ইসলাম কাকে বলে? এর সঠিক পরিভাষা কী?


এ ছাড়া ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন : فَالْإِسْلَامُ يَتَضَمَّنُ الْإِسْتِسْلَامَ لِلَّهِ وَحْدَهُ.

অর্থাৎ, 'ইসলাম-এর অর্থের মধ্যে রয়েছে, এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা।' ৩২

আজকে অনেক মুসলমান সঠিক ব্যাপারটা না-জানার কারণে ইসলাম অর্থ 'শান্তি' বলে থাকে। মূলত ইংরেজরা কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার সময় তৎকালীন ইংরেজ গভর্নর লর্ড মেকোলে-কে (Macaulay) আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস তৈরির দায়িত্ব দেয়।

এই সুযোগে তারা ইসলামের অনেক মৌলিক পরিভাষা, যেমন : ইসলাম, ইলাহ, রব, তাওহিদ, শিরক, তাগুত, জিহাদ ইত্যাদিতে পরিবর্তন আনে। তন্মধ্যে বাতিলের সাথে ইসলামের অনিবার্য দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে এড়ানোর জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলামের অর্থ 'শান্তি' হিসাবে প্রচার করে।

ইসলাম কাকে বলে? এর সঠিক পরিভাষা কী?

এখানে একটি হাদিস উল্লেখযোগ্য। এই হাদিসে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং মনোযোগ দিয়ে হাদিসটি পড়ি চলো। আর পারলে মুখস্থ করে রেখো।

হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

আমরা একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে বসে ছিলাম। হঠাৎ একটি লোক আমাদের কাছে এলো। তার পরনে ধবধবে সাদা কাপড় এবং তার চুল ছিল কুচকুচে কালো। (বাহ্যত) সফরের কোনো চিহ্ন তার ওপর দেখা যাচ্ছিল না (যাতে বুঝা যেত সে দূর থেকে এসেছে) এবং আমাদের কেউ তাকে চিনছিল না (যাতে বুঝা যেত সে কাছাকাছিই থাকে)। শেষপর্যন্ত সে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বসল; তার দুই হাঁটু তাঁর (নবির) হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলো এবং তার হাতের দুই করতলকে নিজ জানুর ওপরে রেখে বললো, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইসলাম হলো এই যে, তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) উপাস্য নেই, আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত প্রদান করবে, রমজানের রোজা রাখবে এবং কাবাঘরের হজ করবে; যদি সেখানে যাওয়ার সংগতি রাখো। সে বললো, আপনি ঠিকই বলেছেন।

সে (আবার) বললো, আপনি আমাকে ইমান সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, পরকাল ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখবে। সে বললো, আপনি যথার্থ বলেছেন।

এরপর সে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! ইহসান কী? তিনি বললেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহকে ভয় করো, যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তুমি তাঁকে না দেখো, তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করো। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন।

কোনো সৃষ্টির পক্ষে নিজ স্রষ্টার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা কেবল তাঁর সম্পর্কে ততটুকু জানি, যতটুকু তিনি আমাদের জানিয়েছেন।

এক বেদুইন সাহাবি তার দুআতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিচয়কে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

তিনি নিজ প্রার্থনায় তার রবের প্রশংসা করে বলেন,

'হে এমন সত্তা! যাকে কোনো চোখ দেখতে পারে না, ভাবনাতে যাকে ধারণ করা যায় না, যাকে বর্ণনা করার সক্ষমতা কারও নেই, যার ওপর কোনোকিছুই প্রভাব ফেলতে পারে না এবং যিনি কোনো বিপদকে ভয় পান না। যিনি পাহাড়সমূহের ওজন জানেন, সমুদ্রের আয়তন জানেন, সকল পাতার সংখ্যা জানেন, আরও জানেন পৃথিবীর আবর্তনে পরিবর্তিত হওয়া দিন-রাতের সঠিক পরিমাপ। তিনি সেই সত্তা, যার থেকে আকাশ আকাশকে লুকাতে পারে না (অর্থাৎ সাত আসমানের সবকিছুই তাঁর জ্ঞাত), পৃথিবী আরেক পৃথিবীকে ঢাকতে পারে না (অর্থাৎ পৃথিবীর সাতটি স্তরের কোনোকিছুই তাঁর অজানা নয়), না সাগর তার গভীরের জিনিস লুকোতে পারে, আর না পাহাড় কোনোকিছুকে তাঁর থেকে আড়াল করতে পারে...।[৩৪]

তুমি এবং আমি 'এই মহান আল্লাহকে' আমাদের রব হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছি। তাঁর মহিমা ও অসীম ক্ষমতার কাছে নিজেকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছি। তাঁর নিকট পুরোপুরিভাবে নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছি। এই আত্মসমর্পণ হলো-ইসলাম। প্রতিপালকের কাছে ফিরে গিয়ে তাঁর নিকট নিজের দেহমনকে ঝুঁকিয়ে দেওয়াই ইসলামের প্রথম শর্ত বা অ-আ-ক-খ। যদি যাত্রা শুরু করতে চাও, তবে এখান থেকেই শুরু করো। তুমি তো এমনিতেই মুসলমান। তুমি এখনো মূল পথেই আছ, তবে সামান্য এদিক-ওদিক মোড় নিয়ে ফেলেছ। এটা ব্যাপার না। তুমি একটা দীর্ঘশ্বাসে বলে দাও-'আসলামতু' অর্থাৎ আমি সমর্পণ করলাম। আমি ফিরে এলাম। আমি দিক পরিবর্তন করে নিলাম।

তবে কেবল আল্লাহর নিকট সমর্পণ শুরুর মাধ্যমেই তুমি পুরোপুরি আত্মসমর্পণকারী হতে পারবে না। আল্লাহর সাথে সাথে তোমাকে তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছেও নিজেকে সমর্পণ করতে হবে।

অনেকে হয়তো বলবে, আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ক্ষমতা ও দয়া দেখে আমি তাঁর আনুগত্য করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু তাঁর রাসুলকে কেন ভালোবাসব? রাসুলের আনুগত্য কেন করতে হবে?

না, না, না। এখানে তোমার বা অন্য কারও প্রশ্ন করার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। তোমাকে বুঝতে হবে, রাসুলের নিকট সমর্পণ বা তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহর। তাঁকে অনুসরণ-অনুকরণ করার পেছনে অবশ্যই আমাদের ভালোবাসা এবং তাঁর চরিত্রের প্রতি মুগ্ধতা মিশে থাকে। কিন্তু তাঁর আনুগত্যের প্রধান কারণ হলো, এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশ। আর তাঁর আদেশের সামনে প্রশ্ন তোলার কোনো অধিকার কারও নেই। তুমি যেহেতু ইতিমধ্যেই তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করে ফেলেছ। সুতরাং এখন তাঁর সকল আদেশ নির্দ্বিধায় মান্য করা তোমার জন্য অপরিহার্য।

আরেকটা বিষয় তোমার জেনে রাখা প্রয়োজন। তুমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের নিকট নিজেকে কতটুকু সমর্পণ করবে?

আত্মসমর্পণের কোনো পরিমাপ হয় না। কিন্তু তবুও অনেকেই সমর্পণকে বিভক্ত করে ফেলেছে (কিছু ক্ষেত্রে করছে, কিছু ক্ষেত্রে করছে না)। যার ফলে আজকের সমাজে আমরা 'মিশ্রিত ইসলাম' দেখছি। যেখানে লোকেরা ইসলামের কিছু অংশের সাথে নিজের ইচ্ছাকে মিলিয়ে নিজস্ব আলাদা আদর্শ বানিয়ে নিয়েছে (আইন-রাষ্ট্র-অর্থনীতি)। নিজস্ব স্বার্থ আর সুবিধা অনুসারে তারা ইসলাম অনুসরণ করছে।

সুতরাং তোমার জানা দরকার, ইসলামের সাথে নিজস্ব ইচ্ছাকে মিশ্রিত করার অধিকার কারও আছে কি না?

এর উত্তর হলো: না, কোনোভাবেই কারও জন্য ইসলামের সাথে নিজ ইচ্ছা সংযুক্ত করার অনুমতি বা অধিকার নেই। ইসলামে প্রবেশ করতে হলে তোমাকে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ এবং পুরোপুরি প্রবেশ করতে হবে। তুমি ১০ ভাগ, ৫০ ভাগ, বা ৮০ ভাগ ইসলাম মানবে আর বাকি অংশতে নিজের ইচ্ছা পূরণ করবে, এর কোনো সুযোগ নেই। মানুষের এই কপটতা রুখে দিতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পূর্বেই তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱدْخُلُوا۟ فِى ٱلسِّلْمِ كَآفَّةً.
'হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ করো।'[৩৬]

ইসলাম হলো আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের কাছে পূর্ণাঙ্গ সমর্পণ। আল্লাহর তোমাকে কোনো প্রয়োজন নেই, তোমার সালাত পড়া বা না-পড়াতে তার কোনো যায় আসে না, তুমি তাকে বিশ্বাস না করলেও তার ক্ষমতায় বিন্দুমাত্র কমতি হয় না। তিনি সবকিছু থেকে পবিত্র। আকাশ আর জমিনের কোনোকিছুই তার কল্যাণ বা ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। কিন্তু তিনি এর মধ্যকার সকল কল্যাণ ও ক্ষতির সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। তোমাকে তোমার সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তোমার কাছে ইসলাম পাঠানো হয়েছে। এখন তা গ্রহণ করা না-করা তোমার ব্যাপার। ইসলামের অনুসরণ করলে তুমি নিজের ভালোর জন্যই করলে। তোমার আমার আংশিক ইসলাম পালনে আল্লাহর কোনো লাভ নেই। পূর্ণাঙ্গ ইসলামে প্রবেশ করলে আমি নিজেই পূর্ণ লাভবান হবো।

এখানে একেবারে শুরুর ধাপ নিয়ে আলোচনা করেছি, যাতে তুমি প্রাথমিক পথটা বুঝতে পারো। সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছেড়ে নিজ থেকেই যেন শুরুটা শুরু করতে পারো। এসব ইসলামের একদম প্রাথমিক ধাপ।

এরপর রয়েছে মূল পন্থা বা পরের ধাপ। যা তোমার জন্য নির্দেশিত নিয়মকানুন বা বিধিবিধান। ইসলাম অনুসরণের জন্য তোমার বাহ্যিক জীবনে...
* কোথায়, কখন, কীভাবে?
* কী করতে হবে?
* কোন বিষয়গুলো মানতে হবে?
* কোন বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকতে হবে?

এসব শিখে নেওয়া তোমার জন্য অপরিহার্য। সুতরাং আগ্রহ নিয়ে সেই নিয়মনীতিগুলো শিখে নিয়ো। তোমার নিজের কল্যাণের জন্য। নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে। আর মনে রেখো, তা কোনো আলিম, ব্যক্তি বা মানুষের আদেশ নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য নির্দেশিত বিধান। তুমি রাস্তায় কীভাবে হাঁটলে তোমার ভালো হবে, সেদিকেও যে রব খেয়াল রেখেছেন, তিনি তোমাকে কতটা ভালোবাসেন বলতে পারো? সুতরাং হুট করেই এত নিয়ম দেখে ঘাবড়ে যেয়ো না। ইসলামের বিধিমালাকে নিজের জন্য বোঝা মনে কোরো না। কীভাবে কাজগুলো করলে তুমি ভালো থাকবে, তুমি বিপদাপদ-সমস্যা থেকে বাঁচবে, তা রব্ব ভালোবেসে বাতলে দিয়েছেন। এসব তোমার রবের ভালোবাসা মনে করবে, তাহলে তা অনুসরণ করাও সহজ হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ।
আর মনে রেখো, পৃথিবীতে ইসলামের বিধিনিষেধ মান্য করাই তোমার জন্মের নির্ধারিত উদ্দেশ্য। এগুলোই ইসলাম, এগুলো মেনে নেওয়াই তোমার আত্মসমর্পণ। তোমাকে যেভাবে জীবনের প্রতিটা কদম আর প্রতিটা ধাপ অগ্রসর হতে বলা হয়েছে, এগুলোই তোমাকে পৃথিবীতে আনার ও রাখার মূল উদ্দেশ্য।

তাই যা কিছু যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাকে সেভাবেই তোমার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে থাকো। দেখবে, অন্তরের ওপর থেকে আঁধারের পর্দা সরে গিয়ে তোমার জীবন আলোকিত হয়ে যাবে।

আর যদি ইসলাম মানতে গিয়ে কোনো বাধা বা কটু বাক্যের সম্মুখীন হও, তবে বিষণ্ণ হোয়ো না। তুমি কিন্তু অতটা নরম মানুষও নও, দুনিয়ার জন্য আমরা কত অপছন্দনীয় পরিস্থিতি সহ্য করি, ঠিক না? এমন মুহূর্তে তোমাকে ইসলাম চুপ থাকতে শিখিয়েছে। সুতরাং চুপ থাকো আর শোনো-

তুমি কিন্তু একটা সময় স্বার্থ ছাড়া কিছুই করোনি, নিজ ইচ্ছাপূরণে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করোনি। আজকে তোমার স্বার্থ ইসলাম। আজকে তোমার সুখ ইসলাম। অন্ধ অনুসরণ নয়; তুমি স্বার্থপরের মতোই ইসলামের মধ্যকার সুখ আহরণ করো। কোন নিয়ম মানলে, কীভাবে চললে, কোন দুআ, কোন হাদিস, কোন বই, কোন আয়াত তোমাকে সুখ দিতে পারে খুঁজতে থাকো। কোন দিন কে এসে বলে দেবে, তখন সে অনুযায়ী একটু একটু করে ইসলাম পালন করবে—এই আশায় বসে থেকো না। নিজে পড়ো আর জেনে নাও, কী আছে ইসলামে! ইসলামকে নিয়ে স্বার্থপর হও; একে নিজের স্বার্থ মনে করো।

এত দিন দুনিয়ার স্বার্থলাভের ক্ষেত্রে যেভাবে কাউকে তোয়াক্কা করোনি, আকাঙ্ক্ষা পূরণে কারও কিছু বলা-না-বলার চিন্তা মাথায় আনোনি; আজকেও যখন ইসলামের মাধ্যমে নিজের সুখটুকু বুঝে নিতে যাচ্ছ, কাউকে হিসেবে রেখো না। যখন তোমার রবের অবাধ্যতা করতে, তখন যেমন বাকি পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলে, আজকে রবের আনুগত্যের ক্ষেত্রেও বাকি পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো। হ্যাঁ, সেদিন তোমাকে কেউ হয়তো কিছু বলার সাহস করেনি। কিন্তু আজ তোমার ভদ্রতার সুযোগ নিয়ে কত কথাই-না শোনাচ্ছে একেকজন। বলুক! সে তোমাকে কথা শুনিয়ে নিজ স্রষ্টার অবাধ্যতার করছে, আর তোমার চুপ থাকা তো স্রষ্টার আনুগত্য। লাভটা কার হলো?

মনে রাখবে, সেদিন তোমার স্বার্থ ছিল দুনিয়া, আর তুমি ছিলে স্বার্থপর। আজ ইসলাম হলো তোমার স্বার্থ, আর তুমি হবে স্বার্থপর। স্বার্থপূরণে এত দিন যেমন তোমাকে কেউ আটকে রাখতে পারেনি, বাধা দিতে পারেনি; আজকেও কোনো কথা বা বাধা যেন তোমাকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। তোমার স্বার্থ লাভে কেউ যেন তোমাকে দমিয়ে রাখতে না পারে।

আগে উদ্দেশ্য ছিল নিজের সন্তুষ্টি। আর এখন তোমার ইসলাম অনুসরণের মূল উদ্দেশ্য হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি। তোমার লক্ষ্য হবে জান্নাত।

যেই জেদের বশে পৃথিবীর সব নিয়ম উলটে ফেলতে এত দিন দ্বিধা করোনি, আজকেও জেদ করে সুন্নাহগুলো পালন করো। পাঞ্জাবি-টুপি পরে, দাড়িটা রেখে বেরিয়ে পড়ো পৃথিবীতে। তোয়াক্কা কোরো না আর জাগতিক স্বার্থের; তোমার স্বার্থ এখন ইসলাম।

উপার্জনের চিন্তা কোরো না। এ অবস্থাতেই কেউ চাকরি দিলে দেবে, নাহলে না খেয়েই মরে যাও। তবুও সুন্নাহর দাড়িটা যেন তোমার মুখে থাকে। পৃথিবীর কেউ তোমার জীবন সম্পর্কে কথা বলার অধিকার রাখে না। ছেঁড়াফাটা শার্ট প্যান্টে তাদের সমস্যা হয় না, পাঞ্জাবিতেই সমস্যা। দেখিয়ে দাও, রাসুলের প্রতি তোমার ভালোবাসা কত বেশি! উমরের মতো বুঝিয়ে দাও, তুমিও সবকিছুর চাইতে তোমার রাসুলকেই বেশি ভালোবাসো!

এত দিন তুমি যেভাবে চেয়েছ সেভাবেই জীবন কাটিয়েছ। আজ থেকে তোমার রব যেভাবে চান, তুমি সেভাবেই জীবন কাটাবে। সুতরাং মানুষ এবং শয়তানের এসব অনুচরদের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ কোরো না। অন্য কারও কথা ভাবার সময় তোমার নেই। তোমার সুখ দরকার, পূর্ণতা দরকার। আর ইসলাম তোমাকে তার চেয়েও বেশি কিছু দিয়েছে, দেবে। সুতরাং তুমি তোমার জীবনের সাথে ইসলামকে নিয়েই অগ্রসর হও।

প্রতিকূল বাতাস দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছ! ভয় নেই, বাতাস বিক্ষুব্ধ হয় তোমাকে ওড়াবে বলে!

টিকাঃ
৩২. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩/৯১।
৩৪. মুসনাদু আহমদ: ১৫১৯৪।
৩৬. সুরা আল-বাকারা ২: ২০৮।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ঈমান কি?

📄 ঈমান কি?


ইমান-সালাত-সাওম-হজ-জাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ। অর্থাৎ পাঁচটি মূলভিত্তি। এর অন্যতম হলো ইমান, অর্থাৎ অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস।

একটি তাঁবু টাঙাতে প্রথমেই এর চারদিকে চারটি খুঁটির প্রয়োজন হয়। তবে এই চারটি খুঁটি তাঁবুকে পুরোপুরি দাঁড় করানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। তাই মাঝখানে আরেকটি প্রধান খুঁটি দেওয়া হয়। যার ওপর ভিত্তি করে সমস্ত তাঁবুটি দাঁড়িয়ে থাকে।
থাকে। ইসলামের ক্ষেত্রেও সালাত-রোজা-হজ-জাকাত হলো চারদিকের চারটি খুঁটি। আর 'ইমান' হলো তাঁবুর মধ্যখানের মূল খুঁটি। ইসলামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও পয়লা অংশ, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষের অন্তরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে।

ইমান হলো জ্বালানি। ইমানের দুর্বলতার কারণেই একজন মানুষ সালাত থেকে দূরে থাকে, সাওম পালনে বিরত থাকে, হজ করতে চায় না কিংবা জাকাত প্রদানে অনীহা করে।
'ইমান' কী?

ইমান হলো—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, পরকাল ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস। আর এর সবই আমাদের নিকট অদৃশ্য। না দেখেও এসবের প্রতি বিশ্বাস করাই হলো ইমান।

আমাদের ভেতরে ইসলাম থাকা সত্ত্বেও ইমানের যথাযথ ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ আমরা অদৃশ্যের সবকিছু স্বীকার করলেও তা পুরোপুরি মেনে নিতে পারি না। যার কারণে মুসলমান হয়েও মানুষ আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে থাকে, মুসলমান হয়েও অপকর্মে লিপ্ত হয়, মুসলমান হয়েও অন্যকে কষ্ট দেয়—এটাই ইমানের দুর্বলতা।

ইমান হলো অন্তরের বিষয়। এটা মানুষের মূল চালিকাশক্তি। তোমার দুঃখ, কষ্ট, হাসি, কান্নার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। তোমার অন্তরের মধ্যকার উত্থান-পতনের মূল কারণ হলো ইমান।

যদি তোমার ভেতরে ইমান থাকে, তবে এটা তোমাকে সুখের কাছাকাছি রাখবে। তুমি সর্বদা থাকবে সন্তুষ্ট, প্রশান্ত, পরিতৃপ্ত। ইমান তোমার আত্মবিশ্বাস জোগাবে। যন্ত্রণার সময় তোমার ইমান তোমাকে আস্থা, ধৈর্য, সহ্যক্ষমতার জোগান দেবে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, পাপের প্রভাবে অন্তর থেকে ইমান হারিয়ে যায়। আর সেই মুহূর্তে অন্তরের শূন্যস্থান দখল করে নেয় প্রবৃত্তি। তোমার এই ইমানের অভাবের সুযোগ নিয়ে সে তোমাকে আরও বেশি অপকর্মের মাঝে ডুবিয়ে দেয়। ফলে অবশিষ্ট ইমান হারিয়ে তুমি পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাও।

এর বাস্তব উদাহরণ দেখো, জুমার সালাত শেষে দেখবে তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন হয়? অন্তরে কেমন একটা স্বস্তি অনুভব করো, তাই না?

কিন্তু যখনই তুমি মসজিদ থেকে বের হয়ে অসৎ আর অপদার্থ সঙ্গীদের নিকট যাও, মোবাইলের নেট চালু করে অনর্থক ভিডিও দেখতে শুরু করো, তখন ভেতরের সেই অনুভূতিটা আর থাকে না। এভাবে একটার পর একটা অশ্লীল ভিডিও, পোস্ট বা ছবি তোমার অন্তরে প্রবেশ করা ইমানটুকু কেড়ে নিয়ে তোমাকে পুরোপুরি শূন্য করে দেয়। ফলে তুমি বাহ্যিক জীবনে কখন কী করতে হবে তা আর বুঝতে পারো না, কোনোকিছুতে তোমার মন বসতে চায় না, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাও না।

দিনশেষে সারাদিনের পাপের প্রভাবে তোমার অন্তর ভারী হয়ে ওঠে, শারীরিক সুস্থতা সত্ত্বেও কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়ো। কোনো প্রকার কষ্টের কারণ ছাড়াই তোমার অন্তর মরে যেতে চায়। জাগতিক সব সুখ তোমার কাছে থাকা সত্ত্বেও তুমি একটা অভাববোধ নিয়ে ঘুমোতে যাও।

এরপর সকালে সেই শূন্যতা নিয়েই তোমার দিন শুরু হয়। ফলে কি খারাপ কি ভালো, কোনটা সঠিক কোনটা মন্দ—এসব আর তুমি দেখতে যাও না। জুমার দিন ছাড়া মসজিদের প্রতি তোমার অতটা আগ্রহ থাকে না। সালাতের সময়ে কখনো মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভেতরে প্রবেশের জন্য তোমার অন্তর ছিঁড়ে গেলেও প্রবৃত্তি তোমাকে বাইরের পৃথিবীতে টেনে নিয়ে যায়। তুমি সুখী হতে চাইলেও প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করার শক্তি তোমার থাকে না। ফলে অভ্যন্তরীণ শূন্যতা আর প্রচণ্ড অসুখ নিয়ে তুমি সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকো। কাউকে বোঝাতে গিয়েও পারো না যে, তুমি আসলে ভালো নেই। মৃতেরা কী করে অন্য আরেকটা লাশের অবস্থা জানবে বলো? তোমাকে তো জীবন্ত মানুষের কাছে যেতে হবে, যে তোমাকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনতে পারবে। তবে এসবের কারণ কিন্তু একটাই—তোমার অন্তরে ইমানের অভাব, ইমানের দুর্বলতা।

আজকে ইমানের গুরুত্ব না-বোঝার কারণেই বাহ্যিক জীবনে ইসলামের রীতিনীতি অনুসরণ করার পরেও অন্তরের দিক থেকে আমরা নিজেকে পূর্ণতা দিতে পারছি না। তাই ইমানের ক্ষেত্রেও একটু গুরুত্ব দাও।

আজকের পৃথিবীতে কেবল দৃশ্যমান বিষয়গুলোকেই বিশ্বাস করা হয়। অদেখা, অস্পর্শনীয় বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসের মানসিকতা এই আধুনিক সমাজে 'আদিম যুগের চিন্তাধারা' হিসাবে বিবেচিত। তবে একজন মানুষকে মুসলমান হতে হলে তার ওপর 'অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস' করা অপরিহার্য। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রকৃত সফলকাম মানুষদের ব্যাপারে বলেছেন,

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ.
'যারা অদৃশ্যের প্রতি ইমান আনে।'[৩৬]

সফল হতে চাইলে ইমানের বিকল্প কিছু নেই। সাধারণভাবে থার্মোমিটারের পারদের মতোই মানুষের অন্তরেও ইমানের স্তর ওঠানামা করতে থাকে। কারণ মানুষের বাহ্যিক অবস্থা সর্বদা এক রকম থাকে না। একজন মানুষ হয়তো মসজিদে ইমানের আলোচনা শোনে, কিন্তু বাইরে এসে দুনিয়ার ফিতনায় জড়িয়ে পড়ে। বাড়িতে তার অবস্থা এক রকম, কর্মক্ষেত্রে আরেক রকম; বন্ধুদের সাথে এক রকম, একাকিত্বের সময় আরেক রকম। মানুষ যেহেতু একই অবস্থায় স্থায়ীভাবে থাকে না, তাই পরিবেশ, মানুষ, পাপ কিংবা উত্তম কর্মের প্রভাবে তার ইমান সর্বদা ওঠানামার মধ্যে থাকে।

ইমানের স্তর কখন কেমন আছে তা বোঝার উপায় হলো, অন্তরের পূর্ণতা যাচাই করা। কেননা ইমান মানুষের অন্তরে পূর্ণতা দেয়। তোমার যদি কখনো নিজেকে অধিক পরিমাণে একলা মনে হয় বা কোনোকিছুই ভালো না লাগে, তবে বুঝবে অন্তরে ইমানের স্তর নিম্নে অবস্থান করছে। তখন আর কোনোকিছুতেই মন বসে না। এর অর্থ-তোমার ইমান দুর্বল হয়ে গেছে।

আর যখন দেখবে পৃথিবীর সকল দুঃখ, যন্ত্রণা, বিপদের মুহূর্ত কিংবা চরম অসহায়ত্বের পরেও তোমার অন্তরে মনে হবে—ভালোই তো আছি। অন্তরে কোনোরূপ যন্ত্রণা বা ব্যথা অনুভব হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না; সব হারিয়ে ফেলা সত্ত্বেও তুমি শান্ত থাকবে—এটাই তোমার ইমান।

তবে ইমানের স্তর নিম্নে থাকার অর্থ এই নয় যে, তুমি আল্লাহকে বিশ্বাস করো না। অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করে। ইবাদতের মাধ্যমে তোমার ইমান বৃদ্ধি হয়, বিশ্বাসে দৃঢ়তা আসে, অদৃশ্যের প্রতি আস্থার সক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করে। আর পাপের প্রভাবে ইমান হারিয়ে যায়, ইমানের স্তর নিম্নগামী হয়। তাই ইমান বৃদ্ধিতে ইবাদতের বিকল্প কিছু নেই।

তুমি বলতে পারো, কেন আমাদের থেকে সবকিছু লুকিয়ে রাখা হয়েছে?

সহজ উত্তর হলো, তুমি না দেখেই তোমার সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর অন্যান্য সৃষ্টিকে কতটা বেশি বিশ্বাস করতে পারো, তা পরীক্ষা করতে।

তোমার আমার সামনে যদি অদৃশ্যের সব প্রকাশ করেই দেওয়া হয়, তাহলে তো পৃথিবী আর পরীক্ষাকেন্দ্র থাকবে না। এই সাজানো গোছানো সবকিছুই তো কেবল পরীক্ষা; তোমার বিশ্বাসের পরীক্ষা, তোমার কর্মের পরীক্ষা, তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে চলমান সময়ে গৃহীত সিদ্ধান্তের পরীক্ষা। পূর্বেই সবকিছু প্রকাশ করা হলে এই পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যাবে।

সুতরাং অপেক্ষা করো! অবশ্যই যা চাও তার চাইতেও অনেক বেশি কিছু দেখতে পারবে। কিন্তু এখনও দেখার সময়টা আসেনি। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পূর্বেই ফলাফলের আশা করাটা বোকামি। তোমার কাছে যা এসেছে তা পরীক্ষার কারণ, স্থান, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয় সকল উত্তর। সবার পরীক্ষা শেষ হওয়া ছাড়া কারও জন্যেই আলাদাভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হবে না। ফলাফলের জন্য একট নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং অদৃশ্য প্রকাশ হওয়ার পূর্বেই বিশ্বাসে দৃঢ়তা দাও। ফলাফল প্রকাশের পূর্বেই উত্তরপত্র লেখায় মনোযোগী হও।

টিকাঃ
৩৬. সুরা আল-বাকারা ২: ৩।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 দীনের বিষয়ে নিজের মতামত

📄 দীনের বিষয়ে নিজের মতামত


মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই আনুগত্যপ্রবণ। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, জেনে না-জেনেই সে কারও অনুগত হয়ে থাকতে চায়। নিজ সত্তাকে অন্য কারও নিকট নির্ভরশীল করে তোলে। ফলে কেউ পিতামাতার আনুগত্য করে তাদের কথামতো চলছে, কেউ অফিসের বসের আনুগত্য করে তার দুর্ব্যবহার সহ্য করছে, কেউ স্ত্রীর আনুগত্য করে তার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করছে, কেউ স্বামীর আনুগত্য করে নিজের আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিচ্ছে।

কিন্তু দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সবকিছুর আনুগত্যকে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নেওয়া মানুষটাও তার স্রষ্টাকে স্বীকার করতে চাচ্ছে না। সবার অনুগত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তার প্রতিপালকের অনুগত হচ্ছে না। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের আনুগত্যের আসমানি নির্দেশনা জানানো হলেও সে তা গ্রহণ করছে না। নিজ স্রষ্টার আনুগত্য থেকে পলায়ন করতে চাচ্ছে। আসমানি সিদ্ধান্ত জানানো হলে সে নিজের সীমাবদ্ধ বিচারবুদ্ধি আর হিসাবনিকাশ করে তার উপযুক্ততা যাচাই করতে চায়। অনেকে আবার ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কেন আমি এটা করব? এতে আমার লাভ কী? এসব করে আমার কী হবে? আমাকে কেন এসব মানতে হবে?

এই অহংকার সে কেবল স্রষ্টার ক্ষেত্রেই প্রদর্শন করে। তার প্রিয় কোনো কার্টুন চরিত্র, খেলোয়াড়, প্রিয় নেতা বা সুপারহিরোকে নির্দ্বিধায় অনুসরণ করতে তার বিশেষ সমস্যা হয় না। তখন কোনো অজুহাত থাকে না। পছন্দের গায়কের মতো গান গাওয়ায়, পছন্দের ব্র্যান্ডের টি-শার্ট গায়ে চড়াতে, পছন্দের ইউটিউবারের ব্র্যান্ড ব্যবহার করতে বিশেষ সমস্যা হয় না। প্রশ্ন ছাড়াই স্টাইলিশ জুতা, সানগ্লাস কিংবা ব্রেসলেট কিনে শরীরে ঝুলিয়ে রাখে। তারা যতই উদ্ভট কিছু করুক না কেন, সামাজিকভাবেও তাদের গ্রহণ করা হয়। সকলেই জানে, তারা কোনো ব্যক্তি বা আদর্শের প্রতি ভালোবাসার কারণে তাকে অনুসরণ করছে।

কিন্তু যখনই তাকে ইসলামের কথা বলা হয়, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কান বন্ধ করে রাখে, অনুধাবনের অন্তর তালাবদ্ধ করে ইসলামকে বিবেকের কাঠগড়ায় বিচার করতে থাকে। যখন বলা হয় নবির মতো দাড়ি রাখতে, টাখনুর ওপর কাপড় পড়তে, যত যুক্তিতর্ক তখন এসে হাজির হয়।

তুমি অন্তত এসব থেকে বিরত থাকতে চেষ্টা কোরো। নিজের ভেতরের অবস্থাকে আরেকবার যাচাই করে নাও। তুমি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছ তো? তাঁর মহিমার সামনে নিজেকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছ কি না? তার মর্যাদা সম্পর্কে নিশ্চিত জেনেছ কি না? ব্যস।

• এবার তুমি বলো, তার নির্দেশিত কোনো বিধান কি তোমার জন্য ভালো হবে, না কি খারাপ?

হ্যাঁ, অবশ্যই ভালো। নিঃসন্দেহে কল্যাণ ছাড়া আর কিছু নেই আল্লাহর বিধানে।

এটা মনে হতে পারে অত্যন্ত সহজ একটা প্রশ্ন, তবে অনর্থক নয়। বাইরের পৃথিবীর অবস্থা অনেক করুণ। অনেকেই মুখে মুসলিম দাবি করলেও কুরআনের বিধানকে সেকেলে-মধ্যযুগীয়-অচল মনে করে। সবার কথা বাদ দাও, তোমার অন্তরে হয়তো এখনও গোপন কোনো ভ্রান্তি লুকিয়ে আছে, অথচ তুমিও তা জানো না!

• আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দাও। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কি না?
হ্যাঁ, অবশ্যই, তিনি মহাপবিত্র।

তুমি হয়তো ভাববে, কেন এসব বলছি। কারণ আমাদের ভেতরের বিশ্বাসকে পুনরায় যাচাই করতে হবে। আল্লাহ তাআলার পবিত্রতার প্রতি বিশ্বাসকে আরও দৃঢ়ভাবে নিজের ভেতরে গেঁথে রাখতে হবে।

• এরপর বলো, আল্লাহ সবকিছু জানেন কি না?
হ্যাঁ! তিনি সমস্ত কিছু সম্পর্কে জ্ঞাত।

আল্লাহ কি ভুল করেন? নাউজুবিল্লাহ! যিনি এই বিস্ময়কর আকাশ-জমিন-গ্রহ-নক্ষত্র এত নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন, সেই সৃষ্টিকর্তা কীভাবে ভুল করতে পারেন! না, তিনি কখনোই ভুল করতে পারেন না।

তাহলে যখন সেই মহান আল্লাহ নিজ দয়া ও করুণা হতে মানুষের জন্য তার নির্দেশনা-সংবলিত কিতাব এবং শরিয়াহ নাজিল করলেন, যেখানে তিনি মানবজীবনের জন্য হালাল-হারাম, ভালো-মন্দ, করণীয়-বর্জনীয় নির্ধারণ করে দিলেন, তিনি কি তাতে কোনো ভুল করতে পারেন? না! কখনোই নয়; বরং তিনি এইসব বিধিনিষেধ কেবল মানবজাতির কল্যাণের জন্য প্রেরণ করেছেন, যা ইমানদারদের জন্য দুনিয়ার সমাধান এবং জান্নাত লাভের একমাত্র পথনির্দেশক।

মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করে তাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন ঠিকই, তবে তাকে নিজের ওপর ছেড়ে দেননি। তাঁর অসীম দয়া, করুণা ও ভালোবাসা থেকে তিনি সর্বদা মানুষকে সঠিক পথ বা হিদায়াতের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। যুগে যুগে অসংখ্য নবি-রাসুল তাঁর সেই ভালোবাসার প্রমাণ, যাদের মাধ্যমে মানুষকে মানুষের মতো করে বাঁচতে শিখিয়েছেন, পৃথিবীর স্বল্প সময়ের জীবনে সুখী হওয়ার উপায় জানিয়ে দিয়েছেন।

তবে কোনো যুগের সকল মানুষ এই নির্দেশনাকে গ্রহণ করেনি। তারা নিজেদের পছন্দ, ইচ্ছা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বিচার করে তার রবের প্রেরিত নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। আর আমাদের সমাজের কিছু মানুষও আজ একই পথ বেছে নিচ্ছে। সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট হওয়া সত্যকে তারা গ্রহণ করতে চাচ্ছে না।

এসব বলার উদ্দেশ্য কী জানো? এর উদ্দেশ্য হলো, তোমাকে সতর্ক করে দেওয়া। ইসলামের কোনো অংশের ব্যাপারে হোক, দীনের কোনো বিধানের ক্ষেত্রে হোক, বা শরিয়ার ক্ষেত্রে হোক—এখানে মতামত প্রদানের অধিকার কারও নেই। আল্লাহ নিজ সিদ্ধান্তের ওপর কারও প্রশ্ন শুনতে আগ্রহী নন। তিনি নিজ প্রজ্ঞায় তাঁর সৃষ্টির জন্য যা কল্যাণ মনে করেছেন, সেগুলো নির্দেশনা হিসাবে জানিয়ে দিয়েছেন। আর তোমার কর্তব্য হলো, কোনোরূপ প্রশ্ন ব্যতীত তা মান্য করা। প্রশ্ন করাটা ইসলাম নয়। দীনের ব্যাপারে প্রশ্ন করা কোনো সমর্পিত সত্তার চরিত্র হতে পারে না। একজন মুসলমান পুরোপুরিভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে এবং তাঁর দীনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে। সে কেবল আল্লাহর নির্দেশ শোনে এবং সাথে সাথেই তা মেনে নেয়।
এই দীনকে আলোচনা সমালোচনার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়নি। দীন নিয়ে কাউকে মতামত প্রদানের বিন্দুমাত্র অধিকার দেওয়া হয়নি। আল্লাহর পক্ষ হতে ইসলামের পূর্ণতা দেওয়া হয়েছে। এখানে কমবেশি করার আর কোনো সুযোগ নেই। তোমার যদি এই পূর্ণাঙ্গ এবং নিখুঁত শরিয়ত ভালো না লাগে, এই রাসুল পছন্দ না হয়, যদি নিজেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করতে ইচ্ছা না করে, তুমি যদি এর চাইতেও উত্তম কিছু খুঁজে পাও, তা গ্রহণ করো। কিংবা নিজের মতো করে কিছু বানিয়ে নাও। তবুও ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলা থেকে বিরত থাকো।

ইসলাম আল্লাহর দীন। আর আল্লাহর দীনের মধ্যে কোনো মানুষের মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এতে যা আছে, যেভাবে আছে, সেভাবেই গ্রহণ করতে পারলে করো, না পারলে অন্য কোথাও চলে যাও। আল্লাহ তোমার মতামতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ রাখেন না। তিনি সব স্পষ্ট করে দিয়েছেন, 'This is my way, This is my path, This is my Book and This is my Prophet' এখন এটা গ্রহণ করা না-করা তোমার ব্যাপার।

এই অজ্ঞদের সাথে সাথে আমাদের সমাজের তথাকথিত কিছু দীনদার ব্যক্তিও অজ্ঞতাবশত আজকে ইসলামের সর্বনাশ করছে। তাদের নিকট দীন কেবল পারস্পরিক আলাপচারিতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যার ফলে তারা খাওয়ার টেবিলে বসে দীন সম্পর্কে এমনভাবে আলোচনা করে, যেন তা কোনো বিনোদনের বিষয়। দীন সম্পর্কে ইচ্ছামতো কল্পনা করে এবং নিজ ইচ্ছানুসারে তা উপস্থাপন করতে থাকে। নিজেকে বিজ্ঞ প্রমাণ করতে গিয়ে অপরকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, ইসলামের এই বিষয়ে তুমি কী মনে করো? দীনের এই ব্যাপারটাকে তুমি কীভাবে দেখো? তোমার ভাবনা কী? এরপর সে নিজেই উত্তর দেয়, দ্যাখো, আমি মনে করি না যে, দীনের অমুক বিষয়টি সঠিক!

আচ্ছা আমার ভাই! তুমি যে বলছ, 'আমি অমুক বিষয়কে সঠিক মনে করি না।' এটা কীসের ওপর ভিত্তি করে বললে? একটু নিজের গহিনে ডুব দিয়ে দেখো তো, আল্লাহর দীন সম্পর্কে অমন বাক্য ঠিক কেন তুমি উচ্চারণ করলে?
• তোমার 'মনোমতো' না হওয়ায়?
• ব্যক্তিগত আবেগের সাথে মেলেনি, তাই?
• কতটুকু জানো তুমি এ ব্যাপারে?
• না কি নিজেকে উত্তম, চিন্তক, 'অন্যদের মতো না', ব্যালেন্সিং প্রমাণ করতে চাও? কোনটা?

তুমি কি তাহলে আল্লাহর থেকেও উত্তম সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছ? না কি তাঁর নির্দেশের চাইতে আরও বেশি উপকারী কিছু পেয়েছ, যার ওপর ভিত্তি করে তুমি আল-হাকিমের (মহাপ্রজ্ঞাবান) সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করতে পারছ না? আল্লাহর দীন কি এখন তোমার আমার আবেগ অনুসারে চলবে? এটা কেমন আত্মসমর্পণ?

আমার ভাই ও বোনেরা! একটা বিষয় স্পষ্টভাবে জেনে রাখো, আল্লাহর দীন ইসলাম অন্য সকল বিষয়ের মতন সাধারণ কিছু নয়। পৃথিবীর অন্যান্য বিষয়গুলো সময়ের সাথে উন্নত পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু ইসলাম সর্বদা তার পূর্বের অবস্থাতেই থাকবে। এটাকে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।

অনেকে প্রশ্ন করে, একজন মুসলমান কেন এসব বিধিবিধান পালন করে? এসব করে কী লাভ? এসব বলে বলে مسلمانوں তার ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। ইসলামের প্রতি তোমার সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি করতে চায়। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তারা কি আল্লাহকে ভুলিয়ে দিতে চায়? না! তারা জানে, আল্লাহকে ভুলিয়ে দেওয়া সম্ভব না, কেননা আল্লাহতে বিশ্বাস আমাদের দেহমনে গ্রথিত। তারা শুধু চায়, আমরা যেন তাঁর বিধিনিষেধগুলোকে অস্বীকার করি, সেগুলো গ্রহণ না করি। তাদের সেই ষড়যন্ত্র আর প্রচারণার শিকার হয়ে অনেক অজ্ঞ মুসলমান ইসলাম নিয়ে ভুল ধারণায় ডুবে থাকে। না জেনেই কুফরি মন্তব্য করে বসে। ইসলামি আইনের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে বসে যায়!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00