📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 তোমার শেকড়

📄 তোমার শেকড়


অমানিশার ঘোর আঁধারে ডুবে গিয়েছিল পৃথিবী。

মানবিক সত্তার গুণাবলি বিলুপ্ত হয়ে পশুত্বের গুণাবলি ধারণ করেছিল এই মানুষ। দাম্ভিকতার রাজত্ব কেড়ে নিয়েছিল পৃথিবীর সব স্বাধীনতা। প্রবৃত্তির উপাসনায় মত্ত মানবজাতি। বাহ্যিক আনুগত্যের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল নিষ্প্রাণ মাটি, সূর্য আর তারকাদের। অপকর্মের চাপে সুখ আর প্রশান্তি নামক অনুভূতি তলিয়ে গিয়েছিল প্রবৃত্তির গহ্বরে।

পৃথিবীর এই অবস্থা দেখে মহান করুণাময় স্রষ্টা নিজ সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে চাইলেন। শেষবারের মতো পৃথিবীকে শান্তিময় করে তুলতে চাইলেন। পৃথিবীকে দিলেন আকাশ আর জমিনের শ্রেষ্ঠ উপহার। আগমন ঘটল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর।

তার মাধ্যমে মানবিক গুণাবলি পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হলো। এরপর পাঠানো হলো চূড়ান্ত আসমানি বার্তা। স্রষ্টার পক্ষ হতে সৃষ্টিকে জানিয়ে দেওয়া হলো, মানুষ হয়ে জীবন কাটানোর সর্বোত্তম পন্থা। জানিয়ে দেওয়া হলো, সৃষ্টিকুল সজ্জিত করার মূল উদ্দেশ্য। আর প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হলো। বলা হলো অনন্তকালের শাস্তি থেকে বাঁচার প্রস্তুতি নিতে। পৃথিবীর শুরু থেকে একটু একটু করে প্রেরিত নির্দেশনাকে দেওয়া হলো পূর্ণতা। আর মানুষের একমাত্র পথ, একমাত্র উদ্দেশ্য, একমাত্র সফলতা হিসাবে নির্ধারণ করা হলো-ইসলাম।

এরপর নিমিষেই অমানিশার ঘোর কেটে গিয়ে মুক্তি পেল পৃথিবী। চন্দ্র আর সূর্যের চাইতেও অধিক উজ্জ্বল কিরণ পৃথিবীর বুকেই জ্বলজ্বল করতে লাগল। মানুষ আবারও মানুষ হয়ে উঠল। কিন্তু এবার মানুষ পৌঁছে গেল তার মানবিক চরিত্রের চূড়ায়। ফেরেশতা আর মানুষের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে গেল। আসমানের সাথে জমিনের সৃষ্টিকুলের তৈরি হলো বন্ধুত্ব। সব অহংকার ধূলিসাৎ হয়ে পশু আর মানুষ ফিরে পেল স্বাধীনতা। সুখ আর প্রশান্তির বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়ে গেল পৃথিবী।

আর এই নতুন প্রশান্তিময় পৃথিবীর একমাত্র কারণ—ইসলাম; যে পথ, যে মত, যে উদ্দেশ্য মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।

স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক এবং তার নৈকট্যলাভের একমাত্র পন্থা। পৃথিবীর প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির একমাত্র পথ। মানুষের জন্য নির্ধারিত একমাত্র উদ্দেশ্য। সকল অপূর্ণতার পূর্ণতা, সব আঁধারের বিপরীতে একমাত্র প্রদীপ্ত সূর্য—ইসলাম।

ইসলামের পূর্ণতার প্রায় দেড় হাজার বছর পরের পৃথিবীতে জন্ম হয়েছে তোমার আর আমার। একই উদ্দেশ্য পূরণের স্বার্থে পাঠানো হয়েছে তোমাকেও। তুমি মূলত নিজের কেউ নও। তোমার ওপর তোমার কোনো অধিকার নেই। তুমি তো একটা নিমিত্ত মাত্র। স্রষ্টার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণের ক্ষুদ্র এক উপকরণ।

আমাদের এই একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবী আবারও সেই আগের নিকৃষ্ট অবস্থায় ফিরে গেছে। আগেকার সীমিত উপায়-উপকরণে মানুষ পৃথিবীকে যতটা অপবিত্র করেছিল, তাতেই মহান স্রষ্টা অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। আর আজকের সীমাহীন উপকরণে (প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) পৃথিবীর প্রতিটা কোণে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অপবিত্রতা।

তবুও মানুষের স্বস্তি হয়নি। অবাধ্যতা আর অহংকারের আরও চূড়ান্ত স্তরের খোঁজে মানুষ গবেষণা চালাচ্ছে। কীভাবে পৃথিবীকে আরও বেশি অপবিত্র করা যায় সেই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। এসবের উদ্দেশ্য একটাই—সৃষ্টিকে স্রষ্টা হতে দূরে আরো দূরে নিয়ে যাওয়া।

মানুষ জেনেবুঝে অন্য আরেকটা মানুষের দুর্বল মস্তিষ্কজাত চিন্তা গ্রহণ করে নিজের শ্রেষ্ঠ জীবনকে অর্থহীন সাব্যস্ত করছে। নিজ ইচ্ছা পূরণকেই বানিয়ে নিচ্ছে জীবনের উদ্দেশ্য। স্রষ্টার নির্দেশনা ভুলে গিয়ে মানুষ আবারও 'মানুষ' হতে ভুলে গেছে। নিজেকে 'বিবর্তিত উন্নত পশু' প্রমাণে হাজার হাজার রিসার্চ করছে। পশুসত্তাকেই আমাদের মৌলিক সত্তা ধরে নিয়ে তার প্রয়োজন মেটানোকেই জীবনের সফলতা মনে করছে।

নিত্যনতুন উপভোগের অবৈধ উত্তেজনা জাস্টিফাই করতে এই পন্থা সেই পন্থাকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে নিয়েছে। মানুষ আবারও এলোমেলো হয়ে পড়েছে। এবারও মানুষের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এই দফা মানুষ নিজেও তার পরাধীনতার কথা জানে না!"

তুমি আর আমি এদিক থেকে খুব সাধারণ মানুষ। পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরাই উলটো পৃথিবীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। মানুষের অপকর্ম আজ আমাদেরও প্রভাবিত করছে। পাপের ভারে কাঁধ ভারী হয়ে উঠেছে। তার ওপর জোরপূর্বক বাড়তি পাপ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই অসহনীয় ভারে মাটির সাথে মিশে যাওয়ার উপক্রম।

কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। কেননা আমাদের কাছে এখনও সেই আলো আছে, যা ইতিপূর্বেও দুনিয়া থেকে অন্ধকার দূর করতে সক্ষম হয়েছিল। আমাদের আছে সেই পন্থা, যা অনুসরণ করে মানুষ নিজ মর্যাদাকে আকাশে উন্নীত করেছিল। আমাদের আছে সেই পথ, যেদিকে হাঁটলে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। আমাদের আছে সেই উদ্দেশ্য, যা সৃষ্টিকে তার স্রষ্টার নিকটবর্তী করে দেয়। আমাদের কাছে আছে সূর্যের চেয়েও দীপ্তিমান-ইসলাম।

তবে চাল কিনে ঘরের এক কোণে সাজিয়ে রেখে ক্ষুধার জ্বালায় কাতরানো মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা শুধু চাল মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না। চালকে পানিতে চুবিয়ে আগুনের ওপর রাখতে হয়। এরপর পানি উত্তপ্ত হয়ে তা ভাতে রূপান্তরিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তারপরেই এর থেকে উপকৃত হওয়া যায়।

অথচ আমরা নিজের অন্তরে ইসলাম রেখেও যন্ত্রণায় কাতরাই। নিজের ভেতরে উজ্জ্বল সূর্য ধারণ করে আঁধারের বাজারে গিয়ে আলোর খোঁজ করি। নিজের ভেতরে সুখ রেখে, অন্য কোথাও ছুটে যাই সুখের আশায়!

চাল ঘরে থাকলেই যেমন ক্ষুধা মেটানো যায় না, তেমনই অন্তরে ইসলাম সজ্জিত করে রাখলেও সুখী হওয়া যায় না। কারণ ইসলাম কেবল কোনো অনুভূতি নয়; ইসলাম বাহ্যিক পন্থা, যাকে অনুভব নয়, অনুসরণ করতে হয়।

সমস্যাটা কোথায় এবার বুঝলে তো?

ইসলাম থেকে উপকৃত হতে হলে তা অনুভব নয়; বরং অনুসরণ করতে হবে। অথচ এইটুকু না-জানার কারণেই দেখো, আজকে মুসলমানের অন্তরের কী অবস্থা! তার শরীরটার কী অবস্থা! পরিবারের কী অবস্থা! রাষ্ট্রের কী অবস্থা! আর সমস্ত মুসলিমজাতির কী করুণ অবস্থা!

তবে আমরা নিজ পথ স্বেচ্ছায় হারাইনি। আমাদের পথ হারাতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রবৃত্তির আকাঙ্ক্ষার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে, চাহিদা পূরণের উপকরণের সহজলভ্যতা আমাদের নিজ পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কেননা মানুষ দুর্বল। চাহিদার প্রবল উত্তেজনা দমন করতে সে অক্ষম।

মুসলমানদের অন্তর থেকে ইসলামের আলো নিভিয়ে দিতে কৃত্রিম সুখের মোড়কে কৃত্রিম এক ঝড় সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানেও নিজ দুর্বলতার দরুন বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি আগ্রহ সামলাতে না পেরে আমরা সেই ঝড়ে গা ভেজাতে গিয়েছিলাম মাত্র। কিন্তু এরপর তার মোহের ঘূর্ণিপাকে এমনভাবে হারিয়ে গিয়েছি যে, এখন নিঃশ্বাসের চেয়েও কৃত্রিমতার স্বাদ বেশি জরুরি মনে হয়।

এই ষড়যন্ত্র আর আঘাতের মূল উদ্দেশ্য তুমি বা কোনো মুসলমান নয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো ইসলাম। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করাই তাবৎ ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, এখনও সেটাই চলছে। তবে এতে সফল হতে তারা পারবে না। কেননা এর সুরক্ষা স্বয়ং স্রষ্টার পক্ষ হতে নির্ধারিত।

তাই ইসলামের আলো নেভাতে না পেরে, তোমাকে সরাসরি ধ্বংস করতে না পেরে পরোক্ষভাবে তারা তোমার বিশ্বাসের ওপর আঘাত করছে। ধর্মের প্রতি আনুগত্য থেকে তোমাকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছে। আর তোমার জীবনের এই উদ্দেশ্যহীনতা বুঝিয়ে দেয়, তারা তাদের পরিকল্পনায় সফল।

ধর্মকে মুছে ফেলতে না পেরে ধর্মীয় মূল্যবোধকে মানুষের অন্তর থেকে মুছে ফেলার এটা এক নতুন যুদ্ধ। এটা অস্ত্রের লড়াই নয়; লড়াইটা বুদ্ধির-চিন্তা-আদর্শের। এটা নতুন শতাব্দীর বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্ব। যেখানে...
* আঘাতে জর্জরিত হওয়া ব্যক্তি জানে না, তাকে কোত্থেকে আঘাত করা হচ্ছে。
* সর্বস্ব হারানো মানুষটাও বোঝে না, তার সবকিছু হারায়নি; বরং ঋণের বোঝা চাপিয়ে তার সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
বিষণ্ণতায় ডুবে আত্মহত্যাকারী জানে না, সে স্বেচ্ছায় মরেনি; বরং তাকে মিথ্যে সহানুভূতির কল্পনা শিখিয়ে তাকে তার হাত দিয়েই মেরে ফেলা হয়েছে।

মাঝবয়সি তরুণ-তরুণীরা জানে না, তাদের বাল্যকালের সুখ কোথায় হারিয়ে গেল। অথচ তাদের সুখ কোথাও হারায়নি, অবৈধতাকে সাজিয়ে আরাধ্য করে দেখিয়ে তার ভেতরে সেই সরল সুখকে দাফন করে দেওয়া হয়েছে।

যন্ত্রণাকাতর স্ত্রী জানে না, তার স্বামী কেন পরনারীতে আসক্ত। অথচ তার অন্তরে জাগতিক আকাঙ্ক্ষা এবং স্বামীর অন্তরে প্রেমের ফ্যান্টাসি ঢুকিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে তাদের পবিত্র ভালোবাসা।

নিজেকে অন্ধকারে হারিয়ে ফেলা সন্তান আর পিতামাতা জানে না, কেন তাদের এই দূরত্ব, অথচ লোকদেখানো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে জরুরি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়েছে।

আর যত উদাহরণ হয় অশান্তির; যদিও সবটার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। তবে এসব অন্য কারও পরিকল্পনা, যা আমাদের হাত দিয়েই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব করছে মানুষের সবচাইতে বড় শত্রু শয়তান এবং তার অনুচরেরা। নিকৃষ্টকে উৎকৃষ্ট হিসাবে উপস্থাপন করা শুধু তারই চরিত্র।

এই যুদ্ধ থামবার নয়। এ যুদ্ধের কোনো মোকাবেলাও হয় না। কেননা যুদ্ধটা মাত্র একপক্ষের। তারা একাই ময়দানের সবকিছু নির্ধারণ করছে। সবচেয়ে বড় সত্য হলো, এই যুদ্ধ যেন যুদ্ধ হিসাবে প্রকাশ না পায়, সেজন্য ছোট ছোট আরও যুদ্ধ চলমান রয়েছে।

যার দরুন এই মুসলিম উম্মাহর রাখালদের (আলিমগণ) পেছনে এত বাঘের থাবা। রাখাল হত্যা, রাখালকে তার পাল থেকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা রাখালকে তার পাল সম্পর্কে উদাসীন করাও সেই যুদ্ধেরই অংশ। ফলে পালের ভেড়া-বকরি নিজেদের ভেতরে ঢুসাঢুসি করতে করতে এলোপাথাড়ি চারিদিকে ছুটোছুটি করছে। আর দূর থেকে সেই শিকারীর দল এসব দলচ্যুত ভেড়া-বকরিদের ইচ্ছামতো শিকার করে করে উল্লাসে মেতে উঠছে।

এই যুদ্ধের ডামাডোলে অন্তরে ইমানের আলোটুকু অক্ষুণ্ণ রেখে টিকে থাকতে হলে স্রষ্টার সাহায্যের বিকল্প কোনো কিছুই নয়। আর খুব ভালোভাবে গেঁথে নাও: আল্লাহর সাহায্যের পূর্বশর্ত হলো, 'চূড়ান্ত' আনুগত্য, 'চূড়ান্ত' দাসত্ব এবং তাঁর নির্দেশিত পন্থার 'পূর্ণাঙ্গ' অনুসরণ। তোমাকে নিজ শেকড়ে ফিরতে হবে যত দ্রুত সম্ভব; নতুবা দল থেকে তোমার এই বিচ্ছিন্নতার সুযোগে শিকারির জালে আটকে সর্বস্ব (দুনিয়া এবং আখিরাত) হারানোর প্রবল আশঙ্কা। দীন হলো তোমার মূল শেকড়। তাই খুব ভাবাভাবির কিছু নেই, আর বেশি দেরি করার মতো সময় নেই। কেননা তোমার বিলম্ব করার ভেতরেও রয়েছে অন্য কারও সফলতা।

টিকাঃ
৩১. হিটলারের প্রচারমন্ত্রী (Reich Minister of Propaganda, ১৯৩৩-১৯৪৫) Joseph Goebbels এর একটা কথা খুব মশহুর: "Propaganda works best when those who are being manipulated are confident they are acting on their own free will." (যখন লোকে আত্মবিশ্বাসের সাথে মনে করবে 'তারা যা করছে স্ব- ইচ্ছায়ই করছে', তখন বুঝতে হবে প্রোপাগান্ডা ভালো কাজ করছে।)

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ইসলামের পরিচিতি

📄 ইসলামের পরিচিতি


ইসলামের প্রয়োজনীয়তা বোঝা সত্ত্বেও মানুষ সেই সমাধানকে গ্রহণ না করার বড় একটি কারণ হলো—অজ্ঞতা। ইসলামের সৌন্দর্য, ইসলামের উদ্দেশ্য এবং প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে না-জানার কারণে মুসলমান হয়েও অনেকে ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকে। তাই আমাদের প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে জানা দরকার। বোঝা দরকার এর সঠিক পরিভাষা এবং পদ্ধতি。

'ইসলাম' শব্দের অর্থ কী?

ইবনু মানজুর রচিত লিসানুল আরব-এ বলা হয়েছে, ইসলাম শব্দটি 'ইসতিসলাম' (استسلاما) শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে, কারও কাছে নত হওয়া, আত্মসমর্পণ করা।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ইসলাম কাকে বলে? এর সঠিক পরিভাষা কী?

📄 ইসলাম কাকে বলে? এর সঠিক পরিভাষা কী?


এ ছাড়া ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন : فَالْإِسْلَامُ يَتَضَمَّنُ الْإِسْتِسْلَامَ لِلَّهِ وَحْدَهُ.

অর্থাৎ, 'ইসলাম-এর অর্থের মধ্যে রয়েছে, এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা।' ৩২

আজকে অনেক মুসলমান সঠিক ব্যাপারটা না-জানার কারণে ইসলাম অর্থ 'শান্তি' বলে থাকে। মূলত ইংরেজরা কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার সময় তৎকালীন ইংরেজ গভর্নর লর্ড মেকোলে-কে (Macaulay) আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস তৈরির দায়িত্ব দেয়।

এই সুযোগে তারা ইসলামের অনেক মৌলিক পরিভাষা, যেমন : ইসলাম, ইলাহ, রব, তাওহিদ, শিরক, তাগুত, জিহাদ ইত্যাদিতে পরিবর্তন আনে। তন্মধ্যে বাতিলের সাথে ইসলামের অনিবার্য দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে এড়ানোর জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলামের অর্থ 'শান্তি' হিসাবে প্রচার করে।

ইসলাম কাকে বলে? এর সঠিক পরিভাষা কী?

এখানে একটি হাদিস উল্লেখযোগ্য। এই হাদিসে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং মনোযোগ দিয়ে হাদিসটি পড়ি চলো। আর পারলে মুখস্থ করে রেখো।

হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

আমরা একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে বসে ছিলাম। হঠাৎ একটি লোক আমাদের কাছে এলো। তার পরনে ধবধবে সাদা কাপড় এবং তার চুল ছিল কুচকুচে কালো। (বাহ্যত) সফরের কোনো চিহ্ন তার ওপর দেখা যাচ্ছিল না (যাতে বুঝা যেত সে দূর থেকে এসেছে) এবং আমাদের কেউ তাকে চিনছিল না (যাতে বুঝা যেত সে কাছাকাছিই থাকে)। শেষপর্যন্ত সে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বসল; তার দুই হাঁটু তাঁর (নবির) হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলো এবং তার হাতের দুই করতলকে নিজ জানুর ওপরে রেখে বললো, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইসলাম হলো এই যে, তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) উপাস্য নেই, আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত প্রদান করবে, রমজানের রোজা রাখবে এবং কাবাঘরের হজ করবে; যদি সেখানে যাওয়ার সংগতি রাখো। সে বললো, আপনি ঠিকই বলেছেন।

সে (আবার) বললো, আপনি আমাকে ইমান সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, পরকাল ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখবে। সে বললো, আপনি যথার্থ বলেছেন।

এরপর সে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! ইহসান কী? তিনি বললেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহকে ভয় করো, যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তুমি তাঁকে না দেখো, তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করো। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন।

কোনো সৃষ্টির পক্ষে নিজ স্রষ্টার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা কেবল তাঁর সম্পর্কে ততটুকু জানি, যতটুকু তিনি আমাদের জানিয়েছেন।

এক বেদুইন সাহাবি তার দুআতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিচয়কে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

তিনি নিজ প্রার্থনায় তার রবের প্রশংসা করে বলেন,

'হে এমন সত্তা! যাকে কোনো চোখ দেখতে পারে না, ভাবনাতে যাকে ধারণ করা যায় না, যাকে বর্ণনা করার সক্ষমতা কারও নেই, যার ওপর কোনোকিছুই প্রভাব ফেলতে পারে না এবং যিনি কোনো বিপদকে ভয় পান না। যিনি পাহাড়সমূহের ওজন জানেন, সমুদ্রের আয়তন জানেন, সকল পাতার সংখ্যা জানেন, আরও জানেন পৃথিবীর আবর্তনে পরিবর্তিত হওয়া দিন-রাতের সঠিক পরিমাপ। তিনি সেই সত্তা, যার থেকে আকাশ আকাশকে লুকাতে পারে না (অর্থাৎ সাত আসমানের সবকিছুই তাঁর জ্ঞাত), পৃথিবী আরেক পৃথিবীকে ঢাকতে পারে না (অর্থাৎ পৃথিবীর সাতটি স্তরের কোনোকিছুই তাঁর অজানা নয়), না সাগর তার গভীরের জিনিস লুকোতে পারে, আর না পাহাড় কোনোকিছুকে তাঁর থেকে আড়াল করতে পারে...।[৩৪]

তুমি এবং আমি 'এই মহান আল্লাহকে' আমাদের রব হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছি। তাঁর মহিমা ও অসীম ক্ষমতার কাছে নিজেকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছি। তাঁর নিকট পুরোপুরিভাবে নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছি। এই আত্মসমর্পণ হলো-ইসলাম। প্রতিপালকের কাছে ফিরে গিয়ে তাঁর নিকট নিজের দেহমনকে ঝুঁকিয়ে দেওয়াই ইসলামের প্রথম শর্ত বা অ-আ-ক-খ। যদি যাত্রা শুরু করতে চাও, তবে এখান থেকেই শুরু করো। তুমি তো এমনিতেই মুসলমান। তুমি এখনো মূল পথেই আছ, তবে সামান্য এদিক-ওদিক মোড় নিয়ে ফেলেছ। এটা ব্যাপার না। তুমি একটা দীর্ঘশ্বাসে বলে দাও-'আসলামতু' অর্থাৎ আমি সমর্পণ করলাম। আমি ফিরে এলাম। আমি দিক পরিবর্তন করে নিলাম।

তবে কেবল আল্লাহর নিকট সমর্পণ শুরুর মাধ্যমেই তুমি পুরোপুরি আত্মসমর্পণকারী হতে পারবে না। আল্লাহর সাথে সাথে তোমাকে তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছেও নিজেকে সমর্পণ করতে হবে।

অনেকে হয়তো বলবে, আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ক্ষমতা ও দয়া দেখে আমি তাঁর আনুগত্য করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু তাঁর রাসুলকে কেন ভালোবাসব? রাসুলের আনুগত্য কেন করতে হবে?

না, না, না। এখানে তোমার বা অন্য কারও প্রশ্ন করার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। তোমাকে বুঝতে হবে, রাসুলের নিকট সমর্পণ বা তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহর। তাঁকে অনুসরণ-অনুকরণ করার পেছনে অবশ্যই আমাদের ভালোবাসা এবং তাঁর চরিত্রের প্রতি মুগ্ধতা মিশে থাকে। কিন্তু তাঁর আনুগত্যের প্রধান কারণ হলো, এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশ। আর তাঁর আদেশের সামনে প্রশ্ন তোলার কোনো অধিকার কারও নেই। তুমি যেহেতু ইতিমধ্যেই তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করে ফেলেছ। সুতরাং এখন তাঁর সকল আদেশ নির্দ্বিধায় মান্য করা তোমার জন্য অপরিহার্য।

আরেকটা বিষয় তোমার জেনে রাখা প্রয়োজন। তুমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের নিকট নিজেকে কতটুকু সমর্পণ করবে?

আত্মসমর্পণের কোনো পরিমাপ হয় না। কিন্তু তবুও অনেকেই সমর্পণকে বিভক্ত করে ফেলেছে (কিছু ক্ষেত্রে করছে, কিছু ক্ষেত্রে করছে না)। যার ফলে আজকের সমাজে আমরা 'মিশ্রিত ইসলাম' দেখছি। যেখানে লোকেরা ইসলামের কিছু অংশের সাথে নিজের ইচ্ছাকে মিলিয়ে নিজস্ব আলাদা আদর্শ বানিয়ে নিয়েছে (আইন-রাষ্ট্র-অর্থনীতি)। নিজস্ব স্বার্থ আর সুবিধা অনুসারে তারা ইসলাম অনুসরণ করছে।

সুতরাং তোমার জানা দরকার, ইসলামের সাথে নিজস্ব ইচ্ছাকে মিশ্রিত করার অধিকার কারও আছে কি না?

এর উত্তর হলো: না, কোনোভাবেই কারও জন্য ইসলামের সাথে নিজ ইচ্ছা সংযুক্ত করার অনুমতি বা অধিকার নেই। ইসলামে প্রবেশ করতে হলে তোমাকে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ এবং পুরোপুরি প্রবেশ করতে হবে। তুমি ১০ ভাগ, ৫০ ভাগ, বা ৮০ ভাগ ইসলাম মানবে আর বাকি অংশতে নিজের ইচ্ছা পূরণ করবে, এর কোনো সুযোগ নেই। মানুষের এই কপটতা রুখে দিতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পূর্বেই তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱدْخُلُوا۟ فِى ٱلسِّلْمِ كَآفَّةً.
'হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ করো।'[৩৬]

ইসলাম হলো আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের কাছে পূর্ণাঙ্গ সমর্পণ। আল্লাহর তোমাকে কোনো প্রয়োজন নেই, তোমার সালাত পড়া বা না-পড়াতে তার কোনো যায় আসে না, তুমি তাকে বিশ্বাস না করলেও তার ক্ষমতায় বিন্দুমাত্র কমতি হয় না। তিনি সবকিছু থেকে পবিত্র। আকাশ আর জমিনের কোনোকিছুই তার কল্যাণ বা ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। কিন্তু তিনি এর মধ্যকার সকল কল্যাণ ও ক্ষতির সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। তোমাকে তোমার সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তোমার কাছে ইসলাম পাঠানো হয়েছে। এখন তা গ্রহণ করা না-করা তোমার ব্যাপার। ইসলামের অনুসরণ করলে তুমি নিজের ভালোর জন্যই করলে। তোমার আমার আংশিক ইসলাম পালনে আল্লাহর কোনো লাভ নেই। পূর্ণাঙ্গ ইসলামে প্রবেশ করলে আমি নিজেই পূর্ণ লাভবান হবো।

এখানে একেবারে শুরুর ধাপ নিয়ে আলোচনা করেছি, যাতে তুমি প্রাথমিক পথটা বুঝতে পারো। সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছেড়ে নিজ থেকেই যেন শুরুটা শুরু করতে পারো। এসব ইসলামের একদম প্রাথমিক ধাপ।

এরপর রয়েছে মূল পন্থা বা পরের ধাপ। যা তোমার জন্য নির্দেশিত নিয়মকানুন বা বিধিবিধান। ইসলাম অনুসরণের জন্য তোমার বাহ্যিক জীবনে...
* কোথায়, কখন, কীভাবে?
* কী করতে হবে?
* কোন বিষয়গুলো মানতে হবে?
* কোন বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকতে হবে?

এসব শিখে নেওয়া তোমার জন্য অপরিহার্য। সুতরাং আগ্রহ নিয়ে সেই নিয়মনীতিগুলো শিখে নিয়ো। তোমার নিজের কল্যাণের জন্য। নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে। আর মনে রেখো, তা কোনো আলিম, ব্যক্তি বা মানুষের আদেশ নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য নির্দেশিত বিধান। তুমি রাস্তায় কীভাবে হাঁটলে তোমার ভালো হবে, সেদিকেও যে রব খেয়াল রেখেছেন, তিনি তোমাকে কতটা ভালোবাসেন বলতে পারো? সুতরাং হুট করেই এত নিয়ম দেখে ঘাবড়ে যেয়ো না। ইসলামের বিধিমালাকে নিজের জন্য বোঝা মনে কোরো না। কীভাবে কাজগুলো করলে তুমি ভালো থাকবে, তুমি বিপদাপদ-সমস্যা থেকে বাঁচবে, তা রব্ব ভালোবেসে বাতলে দিয়েছেন। এসব তোমার রবের ভালোবাসা মনে করবে, তাহলে তা অনুসরণ করাও সহজ হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ।
আর মনে রেখো, পৃথিবীতে ইসলামের বিধিনিষেধ মান্য করাই তোমার জন্মের নির্ধারিত উদ্দেশ্য। এগুলোই ইসলাম, এগুলো মেনে নেওয়াই তোমার আত্মসমর্পণ। তোমাকে যেভাবে জীবনের প্রতিটা কদম আর প্রতিটা ধাপ অগ্রসর হতে বলা হয়েছে, এগুলোই তোমাকে পৃথিবীতে আনার ও রাখার মূল উদ্দেশ্য।

তাই যা কিছু যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাকে সেভাবেই তোমার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে থাকো। দেখবে, অন্তরের ওপর থেকে আঁধারের পর্দা সরে গিয়ে তোমার জীবন আলোকিত হয়ে যাবে।

আর যদি ইসলাম মানতে গিয়ে কোনো বাধা বা কটু বাক্যের সম্মুখীন হও, তবে বিষণ্ণ হোয়ো না। তুমি কিন্তু অতটা নরম মানুষও নও, দুনিয়ার জন্য আমরা কত অপছন্দনীয় পরিস্থিতি সহ্য করি, ঠিক না? এমন মুহূর্তে তোমাকে ইসলাম চুপ থাকতে শিখিয়েছে। সুতরাং চুপ থাকো আর শোনো-

তুমি কিন্তু একটা সময় স্বার্থ ছাড়া কিছুই করোনি, নিজ ইচ্ছাপূরণে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করোনি। আজকে তোমার স্বার্থ ইসলাম। আজকে তোমার সুখ ইসলাম। অন্ধ অনুসরণ নয়; তুমি স্বার্থপরের মতোই ইসলামের মধ্যকার সুখ আহরণ করো। কোন নিয়ম মানলে, কীভাবে চললে, কোন দুআ, কোন হাদিস, কোন বই, কোন আয়াত তোমাকে সুখ দিতে পারে খুঁজতে থাকো। কোন দিন কে এসে বলে দেবে, তখন সে অনুযায়ী একটু একটু করে ইসলাম পালন করবে—এই আশায় বসে থেকো না। নিজে পড়ো আর জেনে নাও, কী আছে ইসলামে! ইসলামকে নিয়ে স্বার্থপর হও; একে নিজের স্বার্থ মনে করো।

এত দিন দুনিয়ার স্বার্থলাভের ক্ষেত্রে যেভাবে কাউকে তোয়াক্কা করোনি, আকাঙ্ক্ষা পূরণে কারও কিছু বলা-না-বলার চিন্তা মাথায় আনোনি; আজকেও যখন ইসলামের মাধ্যমে নিজের সুখটুকু বুঝে নিতে যাচ্ছ, কাউকে হিসেবে রেখো না। যখন তোমার রবের অবাধ্যতা করতে, তখন যেমন বাকি পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলে, আজকে রবের আনুগত্যের ক্ষেত্রেও বাকি পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো। হ্যাঁ, সেদিন তোমাকে কেউ হয়তো কিছু বলার সাহস করেনি। কিন্তু আজ তোমার ভদ্রতার সুযোগ নিয়ে কত কথাই-না শোনাচ্ছে একেকজন। বলুক! সে তোমাকে কথা শুনিয়ে নিজ স্রষ্টার অবাধ্যতার করছে, আর তোমার চুপ থাকা তো স্রষ্টার আনুগত্য। লাভটা কার হলো?

মনে রাখবে, সেদিন তোমার স্বার্থ ছিল দুনিয়া, আর তুমি ছিলে স্বার্থপর। আজ ইসলাম হলো তোমার স্বার্থ, আর তুমি হবে স্বার্থপর। স্বার্থপূরণে এত দিন যেমন তোমাকে কেউ আটকে রাখতে পারেনি, বাধা দিতে পারেনি; আজকেও কোনো কথা বা বাধা যেন তোমাকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। তোমার স্বার্থ লাভে কেউ যেন তোমাকে দমিয়ে রাখতে না পারে।

আগে উদ্দেশ্য ছিল নিজের সন্তুষ্টি। আর এখন তোমার ইসলাম অনুসরণের মূল উদ্দেশ্য হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি। তোমার লক্ষ্য হবে জান্নাত।

যেই জেদের বশে পৃথিবীর সব নিয়ম উলটে ফেলতে এত দিন দ্বিধা করোনি, আজকেও জেদ করে সুন্নাহগুলো পালন করো। পাঞ্জাবি-টুপি পরে, দাড়িটা রেখে বেরিয়ে পড়ো পৃথিবীতে। তোয়াক্কা কোরো না আর জাগতিক স্বার্থের; তোমার স্বার্থ এখন ইসলাম।

উপার্জনের চিন্তা কোরো না। এ অবস্থাতেই কেউ চাকরি দিলে দেবে, নাহলে না খেয়েই মরে যাও। তবুও সুন্নাহর দাড়িটা যেন তোমার মুখে থাকে। পৃথিবীর কেউ তোমার জীবন সম্পর্কে কথা বলার অধিকার রাখে না। ছেঁড়াফাটা শার্ট প্যান্টে তাদের সমস্যা হয় না, পাঞ্জাবিতেই সমস্যা। দেখিয়ে দাও, রাসুলের প্রতি তোমার ভালোবাসা কত বেশি! উমরের মতো বুঝিয়ে দাও, তুমিও সবকিছুর চাইতে তোমার রাসুলকেই বেশি ভালোবাসো!

এত দিন তুমি যেভাবে চেয়েছ সেভাবেই জীবন কাটিয়েছ। আজ থেকে তোমার রব যেভাবে চান, তুমি সেভাবেই জীবন কাটাবে। সুতরাং মানুষ এবং শয়তানের এসব অনুচরদের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ কোরো না। অন্য কারও কথা ভাবার সময় তোমার নেই। তোমার সুখ দরকার, পূর্ণতা দরকার। আর ইসলাম তোমাকে তার চেয়েও বেশি কিছু দিয়েছে, দেবে। সুতরাং তুমি তোমার জীবনের সাথে ইসলামকে নিয়েই অগ্রসর হও।

প্রতিকূল বাতাস দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছ! ভয় নেই, বাতাস বিক্ষুব্ধ হয় তোমাকে ওড়াবে বলে!

টিকাঃ
৩২. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩/৯১।
৩৪. মুসনাদু আহমদ: ১৫১৯৪।
৩৬. সুরা আল-বাকারা ২: ২০৮।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 ঈমান কি?

📄 ঈমান কি?


ইমান-সালাত-সাওম-হজ-জাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ। অর্থাৎ পাঁচটি মূলভিত্তি। এর অন্যতম হলো ইমান, অর্থাৎ অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস।

একটি তাঁবু টাঙাতে প্রথমেই এর চারদিকে চারটি খুঁটির প্রয়োজন হয়। তবে এই চারটি খুঁটি তাঁবুকে পুরোপুরি দাঁড় করানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। তাই মাঝখানে আরেকটি প্রধান খুঁটি দেওয়া হয়। যার ওপর ভিত্তি করে সমস্ত তাঁবুটি দাঁড়িয়ে থাকে।
থাকে। ইসলামের ক্ষেত্রেও সালাত-রোজা-হজ-জাকাত হলো চারদিকের চারটি খুঁটি। আর 'ইমান' হলো তাঁবুর মধ্যখানের মূল খুঁটি। ইসলামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও পয়লা অংশ, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষের অন্তরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে।

ইমান হলো জ্বালানি। ইমানের দুর্বলতার কারণেই একজন মানুষ সালাত থেকে দূরে থাকে, সাওম পালনে বিরত থাকে, হজ করতে চায় না কিংবা জাকাত প্রদানে অনীহা করে।
'ইমান' কী?

ইমান হলো—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, পরকাল ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস। আর এর সবই আমাদের নিকট অদৃশ্য। না দেখেও এসবের প্রতি বিশ্বাস করাই হলো ইমান।

আমাদের ভেতরে ইসলাম থাকা সত্ত্বেও ইমানের যথাযথ ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ আমরা অদৃশ্যের সবকিছু স্বীকার করলেও তা পুরোপুরি মেনে নিতে পারি না। যার কারণে মুসলমান হয়েও মানুষ আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে থাকে, মুসলমান হয়েও অপকর্মে লিপ্ত হয়, মুসলমান হয়েও অন্যকে কষ্ট দেয়—এটাই ইমানের দুর্বলতা।

ইমান হলো অন্তরের বিষয়। এটা মানুষের মূল চালিকাশক্তি। তোমার দুঃখ, কষ্ট, হাসি, কান্নার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। তোমার অন্তরের মধ্যকার উত্থান-পতনের মূল কারণ হলো ইমান।

যদি তোমার ভেতরে ইমান থাকে, তবে এটা তোমাকে সুখের কাছাকাছি রাখবে। তুমি সর্বদা থাকবে সন্তুষ্ট, প্রশান্ত, পরিতৃপ্ত। ইমান তোমার আত্মবিশ্বাস জোগাবে। যন্ত্রণার সময় তোমার ইমান তোমাকে আস্থা, ধৈর্য, সহ্যক্ষমতার জোগান দেবে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, পাপের প্রভাবে অন্তর থেকে ইমান হারিয়ে যায়। আর সেই মুহূর্তে অন্তরের শূন্যস্থান দখল করে নেয় প্রবৃত্তি। তোমার এই ইমানের অভাবের সুযোগ নিয়ে সে তোমাকে আরও বেশি অপকর্মের মাঝে ডুবিয়ে দেয়। ফলে অবশিষ্ট ইমান হারিয়ে তুমি পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাও।

এর বাস্তব উদাহরণ দেখো, জুমার সালাত শেষে দেখবে তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন হয়? অন্তরে কেমন একটা স্বস্তি অনুভব করো, তাই না?

কিন্তু যখনই তুমি মসজিদ থেকে বের হয়ে অসৎ আর অপদার্থ সঙ্গীদের নিকট যাও, মোবাইলের নেট চালু করে অনর্থক ভিডিও দেখতে শুরু করো, তখন ভেতরের সেই অনুভূতিটা আর থাকে না। এভাবে একটার পর একটা অশ্লীল ভিডিও, পোস্ট বা ছবি তোমার অন্তরে প্রবেশ করা ইমানটুকু কেড়ে নিয়ে তোমাকে পুরোপুরি শূন্য করে দেয়। ফলে তুমি বাহ্যিক জীবনে কখন কী করতে হবে তা আর বুঝতে পারো না, কোনোকিছুতে তোমার মন বসতে চায় না, আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাও না।

দিনশেষে সারাদিনের পাপের প্রভাবে তোমার অন্তর ভারী হয়ে ওঠে, শারীরিক সুস্থতা সত্ত্বেও কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়ো। কোনো প্রকার কষ্টের কারণ ছাড়াই তোমার অন্তর মরে যেতে চায়। জাগতিক সব সুখ তোমার কাছে থাকা সত্ত্বেও তুমি একটা অভাববোধ নিয়ে ঘুমোতে যাও।

এরপর সকালে সেই শূন্যতা নিয়েই তোমার দিন শুরু হয়। ফলে কি খারাপ কি ভালো, কোনটা সঠিক কোনটা মন্দ—এসব আর তুমি দেখতে যাও না। জুমার দিন ছাড়া মসজিদের প্রতি তোমার অতটা আগ্রহ থাকে না। সালাতের সময়ে কখনো মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভেতরে প্রবেশের জন্য তোমার অন্তর ছিঁড়ে গেলেও প্রবৃত্তি তোমাকে বাইরের পৃথিবীতে টেনে নিয়ে যায়। তুমি সুখী হতে চাইলেও প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করার শক্তি তোমার থাকে না। ফলে অভ্যন্তরীণ শূন্যতা আর প্রচণ্ড অসুখ নিয়ে তুমি সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকো। কাউকে বোঝাতে গিয়েও পারো না যে, তুমি আসলে ভালো নেই। মৃতেরা কী করে অন্য আরেকটা লাশের অবস্থা জানবে বলো? তোমাকে তো জীবন্ত মানুষের কাছে যেতে হবে, যে তোমাকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনতে পারবে। তবে এসবের কারণ কিন্তু একটাই—তোমার অন্তরে ইমানের অভাব, ইমানের দুর্বলতা।

আজকে ইমানের গুরুত্ব না-বোঝার কারণেই বাহ্যিক জীবনে ইসলামের রীতিনীতি অনুসরণ করার পরেও অন্তরের দিক থেকে আমরা নিজেকে পূর্ণতা দিতে পারছি না। তাই ইমানের ক্ষেত্রেও একটু গুরুত্ব দাও।

আজকের পৃথিবীতে কেবল দৃশ্যমান বিষয়গুলোকেই বিশ্বাস করা হয়। অদেখা, অস্পর্শনীয় বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসের মানসিকতা এই আধুনিক সমাজে 'আদিম যুগের চিন্তাধারা' হিসাবে বিবেচিত। তবে একজন মানুষকে মুসলমান হতে হলে তার ওপর 'অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস' করা অপরিহার্য। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রকৃত সফলকাম মানুষদের ব্যাপারে বলেছেন,

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ.
'যারা অদৃশ্যের প্রতি ইমান আনে।'[৩৬]

সফল হতে চাইলে ইমানের বিকল্প কিছু নেই। সাধারণভাবে থার্মোমিটারের পারদের মতোই মানুষের অন্তরেও ইমানের স্তর ওঠানামা করতে থাকে। কারণ মানুষের বাহ্যিক অবস্থা সর্বদা এক রকম থাকে না। একজন মানুষ হয়তো মসজিদে ইমানের আলোচনা শোনে, কিন্তু বাইরে এসে দুনিয়ার ফিতনায় জড়িয়ে পড়ে। বাড়িতে তার অবস্থা এক রকম, কর্মক্ষেত্রে আরেক রকম; বন্ধুদের সাথে এক রকম, একাকিত্বের সময় আরেক রকম। মানুষ যেহেতু একই অবস্থায় স্থায়ীভাবে থাকে না, তাই পরিবেশ, মানুষ, পাপ কিংবা উত্তম কর্মের প্রভাবে তার ইমান সর্বদা ওঠানামার মধ্যে থাকে।

ইমানের স্তর কখন কেমন আছে তা বোঝার উপায় হলো, অন্তরের পূর্ণতা যাচাই করা। কেননা ইমান মানুষের অন্তরে পূর্ণতা দেয়। তোমার যদি কখনো নিজেকে অধিক পরিমাণে একলা মনে হয় বা কোনোকিছুই ভালো না লাগে, তবে বুঝবে অন্তরে ইমানের স্তর নিম্নে অবস্থান করছে। তখন আর কোনোকিছুতেই মন বসে না। এর অর্থ-তোমার ইমান দুর্বল হয়ে গেছে।

আর যখন দেখবে পৃথিবীর সকল দুঃখ, যন্ত্রণা, বিপদের মুহূর্ত কিংবা চরম অসহায়ত্বের পরেও তোমার অন্তরে মনে হবে—ভালোই তো আছি। অন্তরে কোনোরূপ যন্ত্রণা বা ব্যথা অনুভব হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না; সব হারিয়ে ফেলা সত্ত্বেও তুমি শান্ত থাকবে—এটাই তোমার ইমান।

তবে ইমানের স্তর নিম্নে থাকার অর্থ এই নয় যে, তুমি আল্লাহকে বিশ্বাস করো না। অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করে। ইবাদতের মাধ্যমে তোমার ইমান বৃদ্ধি হয়, বিশ্বাসে দৃঢ়তা আসে, অদৃশ্যের প্রতি আস্থার সক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করে। আর পাপের প্রভাবে ইমান হারিয়ে যায়, ইমানের স্তর নিম্নগামী হয়। তাই ইমান বৃদ্ধিতে ইবাদতের বিকল্প কিছু নেই।

তুমি বলতে পারো, কেন আমাদের থেকে সবকিছু লুকিয়ে রাখা হয়েছে?

সহজ উত্তর হলো, তুমি না দেখেই তোমার সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর অন্যান্য সৃষ্টিকে কতটা বেশি বিশ্বাস করতে পারো, তা পরীক্ষা করতে।

তোমার আমার সামনে যদি অদৃশ্যের সব প্রকাশ করেই দেওয়া হয়, তাহলে তো পৃথিবী আর পরীক্ষাকেন্দ্র থাকবে না। এই সাজানো গোছানো সবকিছুই তো কেবল পরীক্ষা; তোমার বিশ্বাসের পরীক্ষা, তোমার কর্মের পরীক্ষা, তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে চলমান সময়ে গৃহীত সিদ্ধান্তের পরীক্ষা। পূর্বেই সবকিছু প্রকাশ করা হলে এই পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যাবে।

সুতরাং অপেক্ষা করো! অবশ্যই যা চাও তার চাইতেও অনেক বেশি কিছু দেখতে পারবে। কিন্তু এখনও দেখার সময়টা আসেনি। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পূর্বেই ফলাফলের আশা করাটা বোকামি। তোমার কাছে যা এসেছে তা পরীক্ষার কারণ, স্থান, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয় সকল উত্তর। সবার পরীক্ষা শেষ হওয়া ছাড়া কারও জন্যেই আলাদাভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হবে না। ফলাফলের জন্য একট নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং অদৃশ্য প্রকাশ হওয়ার পূর্বেই বিশ্বাসে দৃঢ়তা দাও। ফলাফল প্রকাশের পূর্বেই উত্তরপত্র লেখায় মনোযোগী হও।

টিকাঃ
৩৬. সুরা আল-বাকারা ২: ৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00