📄 পার্থিব জীবন এক সফর
তুমি যখন কোথাও ভ্রমণের ইচ্ছা করো, তখন নিজের সাথে কী কী নাও? কেবল প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো, তাই না?
তুমি কিন্তু নিজের ঘরের সমস্ত কিছু নিয়ে ভ্রমণ করতে বের হও না। তোমার ব্যাগে কেবল প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকে। কিন্তু সেখানেও কেবল বাছাই করা অপরিহার্য উপকরণগুলোই স্থান পায়। তুমি কখনো গ্রীষ্মের মৌসুমে শীতের পুরু কাপড় সাথে নেবে না। তুমি কেবল তোমার সাথে ততটুকুই বহন করবে, যতটা তোমার অপরিহার্যভাবে প্রয়োজন।
এটাই হলো পৃথিবী এবং এর প্রয়োজনের সঠিক মাত্রা! কিছু বিষয় থাকে মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন, কিছু বিষয় বেশি প্রয়োজন, আর কিছু থাকে অপরিহার্য প্রয়োজন। তোমার কাছে সবগুলো ক্রয়ের সামর্থ্য থাকলেও অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করাই সুন্নাহর অনুসরণ। আজকের পৃথিবীতে না চাইলেও মানুষকে এ বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কেননা বাজারের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোও সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। যেখানে তারা স্বাভাবিক প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো নিত্যদিনই ক্রয় করত, সেখানে আজ কেবল অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করছে। আর তুমি যদি মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ হও, তবে তোমার জন্য অবস্থা আরও করুণ। তাই হিসাব করেই চলো, তবে চলার উদ্দেশ্য রাখো 'সুন্নাহ'। তাহলে বাধ্য হয়ে অপরিহার্য প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকাটাও তোমার জন্য সুন্নাহের অনুসরণ হিসাবে লিখিত হবে。
📄 দুনিয়া একটা যাত্রাবিরতি মাত্র
তোমার যদি দূরে কোথাও বাসে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে দেখবে, কিছু দূর অতিক্রম করার পর যাত্রীদের যাবতীয় প্রয়োজন, ক্ষুধা আর ক্লান্তি নিরসনে কিছু সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। এখানে একটা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বাস থেমে যায়। এ-রকম জায়গাকে সাধারণত 'ফুড ভিলেজ' নামেই আমরা চিনি। দামি দামি সব রেস্তোরাঁ, উজ্জ্বল আলো, চারদিকে চাকচিক্য আর সৌন্দর্য দিয়ে মোড়ানো একটা জায়গা। একবার এখানে নামলে আর ফিরে আসতে ইচ্ছা হয় না।
এই দুনিয়া তোমার আমার জন্য সেই ফুড ভিলেজের কিছু মুহূর্ত মাত্র। যেখানে পূর্বে থেকে অবস্থানরত বাসগুলো সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার যাত্রা শুরু করে, কেউ মাত্র প্রবেশ করে। কিন্তু কেউই এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যায় না। কারণ এখানে তোমার কিছুই নেই, কেউ নেই। একইভাবে নির্দিষ্ট সময় ফুরিয়ে গেলেই তোমাকেও ফিরে যেতে হবে—নিজের প্রকৃত গন্তব্যের দিকে, তোমার মূল উদ্দেশ্যের দিকে। সেটা মোটেই ফুড ভিলেজে অবস্থান করা নয়; বরং নিজ শহরে বা বাড়িতে পৌঁছানো।
একজন মানুষের প্রকৃত বাড়ি হলো জান্নাত। এখান থেকেই তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। একজন মুসলমান যেখানেই যাক না কেন, জান্নাতে গিয়েই তার সমাপ্তি ঘটবে। মধ্যবর্তী দুনিয়ার জীবনটা হলো, ফুড ভিলেজে কাটানো কিছু মুহূর্তের মতো। আট-দশ কিংবা পনেরো ঘণ্টার যাত্রাপথের তুলনায় মাত্র দশ-বিশ মিনিট।
তবে ফুড ভিলেজের সাথে দুনিয়ার পার্থক্য হলো—ফুড ভিলেজ মানুষের জন্য স্বস্তি, সতেজতা, আর খাবার গ্রহণ; কিন্তু দুনিয়া মানুষের জন্য কষ্ট, যন্ত্রণা, আর ক্ষুধা। কেননা দুনিয়াকে গড়া হয়েছে পরীক্ষার স্থান হিসাবে, আর ফুড ভিলেজকে স্বস্তির।
তুমি কি কখনো ফুড ভিলেজে পৌঁছে সেখানেই থেকে যাবে?
ধরো, তোমাকে ফুড ভিলেজে নামিয়ে দিয়ে আধ ঘণ্টার একটা বিরতি দেওয়া হলো। এবং নামার সময় বলে দেওয়া হলো, অমুক স্থানে গাড়ি দাঁড়ানো আছে, যথাসময়ে চলে আসবেন।
তুমি ফুড ভিলেজের চকচকে রেস্তোঁরা, নানারকম খাবার আর সাজসজ্জা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলে। সারি সারি রংবেরঙের, দই, মিষ্টি আর মাংসের গন্ধে হারিয়ে গেলে।
এভাবে সৌন্দর্য উপভোগের মধ্যেই দশ মিনিট চলে গেল। অথচ তুমি এখনো পরবর্তী যাত্রার জন্য কিছু গ্রহণ করোনি। এরপর কেউ একজন তোমার হুঁশ ফেরাতে বললো, 'হাতে বেশি সময় নেই, তাড়াতাড়ি নিজের প্রয়োজন সেরে নিন। একটু পরেই গাড়ি ছেড়ে দেবে।'
তুমি বললে, 'আমার হাতে যেটুকু সময় রয়েছে তা খানিকটা উপভোগ করে নিই। এই জায়গাটা আমার অনেক বেশি পছন্দ হয়েছে। আমি ভাবছি এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যাব।' লোকটা তোমার কথা শুনে হাসল। ফুড ভিলেজে থাকতে চাওয়া সত্যিই হাস্যকর!
অথচ তুমি দুনিয়ার ক্ষেত্রেও একই বিষয় করে যাচ্ছ। কিছুক্ষণের জন্য এসে এখানেই থেকে যেতে চাইছ। শুধু চাইলেই হতো; তুমি এখানে স্থায়ীভাবে থাকার সব ব্যবস্থাও করছ!
কিন্তু জেনে রাখো, বিরতিকাল শেষে যেমন একজন যাত্রী তার মূল গন্তব্যের দিকে ফিরে যায়, প্রত্যেক মানুষকেই তার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই চিরস্থায়ী গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। চাই এতে তার ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক।
কিন্তু আমার ভাই/বোন! ওয়াল্লাহি! এই ত্রিশ মিনিটও অনেক বেশি সময়। অথচ মানুষ তার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা জানেও না। সুতরাং দুনিয়ার প্রতি এত বেশি আসক্ত হোয়ো না যে, গন্তব্যে ফেরার সময় ঘনিয়ে এলে নিজের উদাসীনতার জন্য আফসোস করতে হয়।
📄 দুনিয়া স্বল্পকালীন পরীক্ষাক্ষেত্র
দুনিয়া এমন এক জায়গা, যা 'বাই ডিফল্ট' কখনোই মানুষকে সুখী রাখতে সক্ষম নয়। যার বাস্তবতা হলো পরীক্ষার হলে অবস্থানরত কোনো পরীক্ষার্থীর মতোই। যে সর্বদা চিন্তিত, আর উৎকণ্ঠিত থাকে—কী লিখব, কী লিখছি, যা লিখছি ঠিক লিখছি কি না! পরীক্ষার খাতায় সব লেখার পরেও তার চিন্তা কমে না এই ভেবে যে, পরীক্ষক পাশ করাবে কি না। এভাবে রেজাল্ট আউট হওয়ার আগপর্যন্ত একজন পরীক্ষার্থীর উৎকণ্ঠা কাটে না, স্বস্তি আসে না।
দুনিয়াও একটা পরীক্ষাকেন্দ্র। তাই এখানে পরীক্ষার সব উপকরণ রয়েছে। সুখভোগ, স্বস্তি ও আয়েশের কিছুই এখানে রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীকে যেমনি ভাঙা টেবিলে বসে একটানা তিন-চার ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে হয়। পানি পান করা ছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাবের জন্য বাইরে যাওয়া ছাড়া অন্যকিছু করার কোনো সুযোগ রাখা হয় না। অনেক সময় এটুকুরও ফুরসত মেলে না। বা পরিবেশটাই এমন যে, বাইরের কিছু ভাবার বা করার মানসিকতাও থাকে না। এখানে কে কেমন পোশাক পরিধান করলো, কে কী মেখে এলো না এলো, কার কতটুকু সম্মান বা সম্পত্তি রয়েছে—তা দেখা হয় না; বরং খাতায় কে কতটুকু লিখতে পারছে, কার উত্তর কত সুন্দর হলো, সে অনুপাতেই ফলাফল আসে।
কিন্তু আমাদের অবস্থা এতটাই হাস্যকর যে, আমরা আজকে পরীক্ষা শুরুর পর পরীক্ষার হলে কোল্ড ড্রিংক্স খুঁজছি, পোশাকের ভাঁজ ঠিক করছি, খাবারের স্বাদ নিয়ে সময় পার করছি, টেবিল সাজাচ্ছি শোপিস দিয়ে, স্যারদের সাথে গল্প করে সম্পর্ক তৈরি করছি। ওদিকে সময় কিন্তু চলে যাচ্ছে।
রেজাল্টের পরের উন্নত শিক্ষার সুযোগ কিংবা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠের সুখের চাইতে আমরা এই পরীক্ষার হলের কিছু মুহূর্ত সুখে কাটাতে বেশি আগ্রহী। আমরা ভুলে গেছি এই অমোঘ বাস্তবতা: পৃথিবীর কোনো পরীক্ষাকেন্দ্র বা আল্লাহর সৃষ্টি করা দুনিয়া নামক এই পরীক্ষাকেন্দ্রে সুখ-আয়েশের কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানে যা আছে তা কেবল পরীক্ষার্থীদের প্রয়োজনমাফিক সামান্য পানি, টেবিল-চেয়ারের মতোই মানুষের বেঁচে থাকার উপকরণমাত্র।
মূল সুখ তো ফলাফলের পর। পৃথিবীর ক্ষেত্রে সেটা হলো: আরও উন্নত অবস্থান। আর আখিরাতে সেটা হলো: মানুষের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে শ্রেষ্ঠ প্রতিদান—জান্নাত।
আজকের পৃথিবী এবং মানুষ দুনিয়াকেন্দ্রিক। এখানের দৈনন্দিন অবস্থা এত বেশি কঠিন করে তোলা হয়েছে যে, দুবেলা দুমুঠো খেয়ে অনাড়ম্বর জীবনযাপনের জন্যও যতটুকু উপকরণ প্রয়োজন হয়, তা জোগাড় করে আনতেও সারাদিন আল্লাহকে ভুলে থাকতে হয়। সাধারণ মানুষের জন্য জীবন বলতে এখানে কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই; আছে শুধুই পয়সা আর প্রচুর চাহিদা। তাই সকলের মুখে তুমি কেবল শুনতে পাবে—এতদূর পড়াশোনা করো, এইদিকে যাও, এই এই স্কিল শেখো, এই ব্যবসায় এত লাভ, ওখানে পড়লে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে ইত্যাদি। যেন মানুষকে পৃথিবীর গহ্বরে প্রবেশ করিয়ে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চাইলেও সে আজ আর পৃথিবীকেন্দ্রিক না হয়ে পারবে না।
তবে পৃথিবী যেমনই থাকুক, তুমি তো এখনও মুসলমান। পৃথিবীর অবস্থা যা-ই হোক, আল্লাহ তো এখনও বিদ্যমান, তাই না?
শোনো আমার ভাই/বোন! দুনিয়াকে যেমন গুরুত্ব দিচ্ছ, দুনিয়ার স্রষ্টাকেও গুরুত্ব দাও। কে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার হকদার, বলো? রিযিক না কি রিযিকদাতা? মাখলুক না কি খালিক? চিকিৎসা না কি শিফাদাতা? অবশ্যই আল্লাহকে প্রাধান্য দাও। আল্লাহ না চাইলে তোমার সব চেষ্টা ব্যর্থ। দুনিয়ার মালিকের অনুমতি ছাড়া দুনিয়া তোমার হবে না। সুতরাং দুনিয়ার রব্বকে সন্তুষ্ট করার কাজে লেগে পড়ো। দীন অনুসরণ করো। দীনের খাতিরে আপাতদৃষ্টে দামি দুনিয়ার স্বার্থগুলোকে বিসর্জন দিয়ে দেখো। দুনিয়ার মাখলুকদেরকে নয়, বরং খালিককে একবার খুশি করে দেখো। নিজের আখিরাতের প্রতি একটু সজাগ হয়েই দেখো কীভাবে পোষা বিড়ালের মতো দুনিয়া তোমার আশপাশে ঘুরঘুর করে। তোমার রবের সামনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আর উদাসীন থেকো না। জান্নাতকে ঘিরেই তোমার স্বপ্ন সাজাও, আর দেখো কীভাবে দুনিয়াও সেজে ওঠে জান্নাতের ঢঙে।
📄 ফ্যান্টাসি অব ম্যারেজ
পৃথিবীকে পেছনে রেখে আখিরাতের দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলা তরুণ-তরুণীরা অন্তর থেকে উন্নততর বাহ্যিক উপকরণের আসক্তিকে সরিয়ে রাখতে পারলেও এখনও একটা আসক্তি থেকে বের হতে পারছে না। এই আসক্তিকে আসক্তি হিসাবে স্বীকার করা তো দূরে থাকুক, উলটো এই চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার জন্য নানাবিধ প্রচেষ্টাও করা হচ্ছে।
এই আসক্তি তাকে শেখাচ্ছে দুনিয়াকে বৈধভাবে ভালোবাসতে, যার অনুভূতি এবং উপকরণ বৈধ হলেও এর ক্ষতি পৃথিবীর অন্যান্য উপকরণের প্রতি আসক্তির মতোই। কেননা এটা এক দীর্ঘ আশার ফাঁদ, কল্পনার ফাঁদ, মিথ্যা ঘোরের মাঝে ডুবে থাকার ফাঁদ।
বিয়েকে কেন্দ্র করে অবিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য শয়তানের সাজানো সেই ফাঁদের নাম-বিয়ে ফ্যান্টাসি বা কল্পনার বিবাহ। যাতে নারী-পুরুষ কল্পনাতেই পাত্র/পাত্রী দেখে, কল্পনায় তাদের বাসর হয়, কল্পনাতেই হয় মিলন, কল্পনায় সন্তানও জন্ম নেয়, আর কল্পনাতেই চলতে থাকে সংসার!
আল্লাহ তাআলা বৈধ স্ত্রী আর সন্তানকেই যেখানে ফিতনা বলেছেন, সেখানে তারা বিবাহের পূর্বেই অনাগত, অপরিচিত, অজ্ঞাত কল্পনার এক স্বামী/স্ত্রীর প্রতি আসক্ত। তাহলে বিয়ের পরে অবস্থাটা কী হবে, ভেবে দেখো তো!
এই আসক্তির ফলে তারা সারাদিন কল্পনার ঘোরে মেতে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে, লজ্জাহীন হয়ে নিজের ভবিষ্যৎ-স্ত্রী সম্পর্কে লিখতে থাকে। এরা মূলত অবৈধ প্রেমের সম্পর্কের পরিবর্তে বিবাহকে দাঁড় করাতে চায়। কিন্তু আল্লাহ বিবাহকে এ কারণে তৈরি করেননি। ইসলামে বিবাহের সম্মান ও মর্যাদা অনেক বেশি।
ইসলামকে পুরোপুরি না-বোঝার কারণে, দু-একটা আবেগপূর্ণ বই পড়ে, বা ছবি বা ভিডিও দেখেই তারা বিবাহের প্রতি উৎসাহ লাভ করে। আবেগের বশে অসচ্ছল অবস্থায় একটা সম্পর্কে জড়িয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করতে চায়। অথচ ইসলামে সামান্য একটা শব্দের পেছনেও হাজারটা শর্ত থাকে, ক্ষেত্র এবং পন্থা থাকে; এটা তারা বোঝে না। আর গণহারে সবার জন্য আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত নয়। নিয়ামত পাওয়ার যোগ্য না হয়েই মিথ্যা আশায় ডুবে তারা নিজের সাথে সাথে অন্য আরেকটা মানুষের সুখ কেড়ে নেয়।
আজ থেকে দু-তিন-চার বছর পর তোমার স্বামী/স্ত্রী তোমার কাছে আসবে, তার সাথে তুমি কী করবে না করবে, তা এখনই ভেবে ভেবে নিজের বর্তমানকে অপবিত্র করে কী লাভ?
এভাবে কোনো নারীকে না-দেখে, না-জেনে তার জন্য ছটফট করতে থাকা পুরুষের অনুভূতির তীব্রতা নয়, বরং চাহিদার অপূর্ণতা। তার প্রয়োজন পূরণের বৈধ উপকরণ না-থাকায় সে শব্দ দিয়ে নিজের কামোদ্দীপনা প্রকাশ করছে মাত্র।
তবে মানুষ দুর্বল। অন্তরে অন্তরে কেউ যা ইচ্ছা ভাবতেই পারে। কিন্তু কেউ যখন নিজের অন্তরের এই বিষাক্ত অনুভূতিকে বৈধ শব্দে সাজিয়ে সকলের সামনে উপস্থাপন করে, সকলে তাকে বাহবা দেয়, অথচ এটা আত্মমর্যাদাহীনতার পরিচয়। কেননা একটা বোধসম্পন্ন ব্যক্তি এবং প্রকৃত পুরুষ কখনোই নিজের ভেতরের গোপন অনুভূতি প্রকাশ করে না। যে পুরুষ নিজের গোপন অনুভূতিকে অন্য হাজারো নারীর সামনে প্রকাশ করছে, তার লজ্জা নেই। আর যার লজ্জা নেই, তার ইমানের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং এই আবেগী নারী বা পুরুষের সাথে নিজেকে যুক্ত করা থেকে বেঁচে থাকো।
প্রতিনিয়ত কল্পনার ঘোরে ডুবে থাকা পুরুষ বা নারীদের ঘোর ভাঙতে সময় লাগেনি বেশি দিন। এসব তথাকথিত আবেগী দীনদার স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্যজীবনের চিত্র এখন আর কুয়াশাচ্ছন্ন নয়; বরং উন্মুক্ত আকাশের মতোই পরিষ্কার, যার বাস্তবতা হলো-যন্ত্রণা, নির্যাতন আর সবশেষে বিচ্ছেদ।
কেননা তারা সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর চাইতে নিজ কল্পনাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের কল্পনা নিয়েই থেকেছে। জান্নাতের আশা বাদ দিয়ে তারা দুনিয়াকেই জান্নাত বানাতে চেয়েছে।
তারা মনে করেছে, একটা সম্পর্কে বৈধভাবে যুক্ত হতে পারলেই হলো। এতেই যেন সব সুখ নেমে আসবে। বস্তুত এভাবে কল্পনাপ্রবণ নারীরা অন্তরের স্বস্তি চায়, আর পুরুষ চায় তার চাহিদা মেটাতে। ফলে কোনোভাবে বিবাহবন্ধনে যুক্ত হয়ে নারীর কল্পনা সত্য হলে সে স্বস্তি পায়, আর পুরুষ পায় কামনার পূর্ণতা। কিন্তু তারপরের সময়গুলো কীভাবে কাটাবে, সে সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা থাকে না। তাদের কল্পনা কেবল বাসর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে বাস্তবতার মোকাবেলায় জীবন সামলাতে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
অনেকে আবার বিয়ের আগে দীন অনুসরণ করতে চায় না। তারা অতি-আবেগের ফলে বিয়েকেই নিজের মূল উদ্দেশ্য বানিয়ে রাখে। কিছু না-জেনেই আবেগের সমুদ্রে ডুবে থেকে বলে, ভাই! বিয়েটা হলেই জীবনকে পুরোপুরি দীনের পথে উৎসর্গ করে দেবো। অনেক বোন বলে, আমি এখন হয়তো পর্দা করতে পারছি না, তবে বিয়ের পর স্বামীর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই পূর্ণাঙ্গ পর্দা শুরু করব। অথচ এই মুহূর্তে সে কিন্তু বেপর্দা। একজন প্রকৃত নেককার পুরুষ পর্দাহীন নারীকে 'নারী' বলেই স্বীকার করে না। কেননা নারীর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য হলো লজ্জা। আর যার লজ্জা নেই, তার ইমান নেই। ইমানহীনা কোনো নারীকে আল্লাহ তাআলা কখনও তাঁর নেককার বান্দার কাছে রাখবেন না-এটাই নিয়ম।
আমার বোন! আরেকটা বাস্তবতা শুনে রাখো, একজন পর্দাহীন নারী একজন পুরুষের জন্য ধ্বংসাত্মক, তার জন্য জাহান্নামের কারণ। কীভাবে বেপর্দা তুমি কোনো পুরুষকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারো?
যারা স্বপ্নে সংসার পেতে রাখে, তাদের ঘরে তিন-চারটা সন্তান হওয়ার পরেও তারা পূর্ণাঙ্গভাবে দীন পালন করতে পারে না। কেননা বিবাহের দায়িত্বগুলো পূর্বে থেকেই না-জানার কারণে সবকিছু তাদের কাছে নতুন মনে হয়। সেগুলো সামলাতে গিয়ে তারা খোদ দীনের প্রতিই চাহিদা হারিয়ে ফেলে, যেটার জন্য তারা বিয়ে বসেছিল।
আচ্ছা আমি যদি তোমাকে প্রশ্ন করি, বিয়ে জিনিসটা কী? তাহলে তোমার উত্তর কী হবে?
তুমি হয়তো শুরুতেই বলবে, দীনের অর্ধেক পূরণ, এরপর চাহিদা মেটানো, ফিতনা থেকে বাঁচার উত্তম উপায়, একাকিত্ব দূর করা, নতুন উম্মতের ভিত্তি, আর কত শত উত্তর। অথচ বাস্তবতায় বিবাহ হলো-একটা দায়িত্ব!
এই উত্তর যদি তুমিও জেনে থাকো, তবে তোমাকে শুভেচ্ছা। যদি না জেনে থাকো, তাহলে বিবাহকে দায়িত্ব হিসাবে উপলব্ধি করার আগপর্যন্ত নিজের সাথে অন্য কাউকে যুক্ত করার কথা ভাবতে যেয়ো না। কেননা যে বিবাহকে দায়িত্ব ছাড়া 'অন্য কিছু' মনে করে, সে বিবাহের পর তার সঙ্গীর সাথে সে হিসাবেই আচরণ করে।
কেউ স্বপ্ন হিসাবে বিয়ে করলে স্বপ্ন পূরণ হওয়া পর্যন্ত সে সুখী থাকে, এরপর আর পারে না। কেউ চাহিদা পূরণ হিসাবে বিয়ে করলে তো আর কথাই নেই, পশুও তার কাছে হার মানে। কেউ ইচ্ছা জমিয়ে বিবাহ করলে সঙ্গীর সাথে ইচ্ছা পূরণ করা শেষে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কেউ দীনের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ছাড়াই বিবাহের মাধ্যমে তার দীনের অর্ধেক পূরণ করতে চাইলে, সে নিজ স্ত্রীর ওপর দীনকে চাপিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যদি দায়িত্ব হিসাবে বিবাহ করা হয়, তাহলে সকলেই দায়িত্ব পূরণ করতে বাধ্য হয়। আর দায়িত্বের মাঝে জীবনের সমস্ত প্রয়োজন, চাহিদা, অনুভূতি, আনুগত্য সবই একসাথে উপস্থিত থাকে। কেউ তা পূরণ না করলে সেটা ভিন্ন কথা। তবে একজন প্রকৃত দীনদার ব্যক্তি তার দায়িত্বটাকে বোঝে। একজন দায়িত্ববোধসম্পন্ন पुरुष বাস্তবতায় বাস করে; কল্পনায় নয়।
বিবাহকে শুধু দায়িত্ব হিসাবে জানলেই তুমি বিবাহের উপযুক্ত হতে পারবে না। এখন তোমার চিন্তায় প্রশস্ততা এসেছে মাত্র। তুমি কেবল বাস্তবতায় থাকা শিখতে শুরু করেছ। উন্নত চিন্তা আর বিবেক দিয়ে কখনোই সংসারজীবন পরিচালনা করা যায় না।
এখন তোমাকে বুঝতে হবে, বিবাহের দায়িত্বগুলো কী কী। কখন, কোথায় আর কীভাবে এই দায়িত্বগুলো পালন করতে হবে, সেই সক্ষমতা তোমার আছে কি না। দায়িত্বের সকল স্তর, দায়িত্বের সঠিক মাত্রা এবং ক্ষেত্রগুলো তোমাকে জানতে হবে। তাহলে বিবাহ সম্পর্কে তুমি ভাবনার দিক থেকে পুরোপুরি যোগ্য হয়ে উঠবে। কিন্তু দাঁড়াও! আরও আছে। এখনও তুমি তৈরি নও।
এবার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই যেসকল দায়িত্ব, ক্ষেত্র এবং প্রয়োজনীয়তাগুলো দেখছ, তা পূরণের জন্য, বিবাহ-পরবর্তী জীবনের সকল উত্থান-পতন সামলে নেওয়ার জন্য তুমি কতটা যোগ্য এবং তোমার বাহ্যিক এবং আর্থিক অবস্থা কতটা উপযুক্ত—তা যাচাই করতে হবে। তোমার জ্ঞান ও উন্নত ভাবনাগুলো বাস্তবজীবনে প্রয়োগের কতটুকু সামর্থ্য বা যোগ্যতা আছে, অন্য আরেকটা মানুষকে দুনিয়া এবং আখিরাতের দিক থেকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তুমি মানসিকভাবে পুরোপুরি তৈরি কি না, তোমার ভেতরে সেই আত্মবিশ্বাস আছে কি না—তাও যাচাই করতে হবে।
তুমি হয়তো বলবে, ভাই! এত কিছু ভেবে কি বিয়েশাদি হয়? বৈবাহিক সম্পর্কে আবার এত কিছু ভাবতেও হয়?
হ্যাঁ হয়! যদি তুমি বৈবাহিক জীবনের ভেতরে লুকিয়ে রাখা জান্নাতি সুখ পুরোপুরি উপভোগ করতে চাও, তবে 'এত কিছু' তোমাকে ভাবতে হবে আগেভাগেই। তোমার আবেগ কমিয়ে নিজেকে বাস্তবতার বৈবাহিক সম্পর্কের জন্য, বাস্তবতাময় জীবনের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠতে হলে 'এত কিছু' ভাবতেই হবে।
কেননা পৃথিবী আর আগের মতন নেই, এখানের মানুষগুলোও আর আগের মতন নেই। পৃথিবীর বাহ্যিক অবস্থা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সবদিক থেকেই অস্থিতিশীল। যার প্রভাব সাধারণ একটা পরিবারকেও ভোগ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া নিত্যনতুন আবিষ্কৃত পাপের উপকরণ তো আছেই। এমন একটা সময়ে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হলেও যদি বাহ্যিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা না থাকে, তবে তোমার পদস্খলনের আশঙ্কা রয়েছে। তাই জেনেবুঝে প্রতিটি কদম ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর আবেগ দিয়ে সামনে এগোনো অন্ধকারে পথচলার মতোই ভয়ংকর।
কিন্তু যদি পশুর মতো কেবল কামনা পূরণের জন্য দাম্পত্যজীবন পেতে চাও, তবে চিরাচরিত নিয়মে নিজের অযোগ্যতা লুকিয়ে চামড়ার সৌন্দর্য আর দৈহিক গঠনের প্রতি আসক্তির মাধ্যমেই বিবাহ শুরু করতে পারো। আল্লাহ তাআলা মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন, যার যেভাবে ইচ্ছা চলুক। তবে মানুষের প্রয়োজনীয় উপকরণের মধ্যে যে সামান্য সুখটুকু রয়েছে, তিনি তা পুরোপুরি অনুভব করার পন্থাও বলে দিয়েছেন। তুমি না মানলে তার জন্য তুমিই দায়ী।
কথাগুলো দ্বারা বিয়ের প্রতি কাউকে নিরুৎসাহিত করা উদ্দেশ্য নয়। আশা করি এর মূল উদ্দেশ্য তোমরা বুঝতে পেরেছ। বিবাহ করো, তবে কী করছ তা বুঝেশুনে করো। মানুষের জীবনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়, যাতে দীনের অর্ধাংশ লুকিয়ে রাখা হয়েছে; তা কি খুব সাধারণ কিছু মনে করছ? এই পৃথিবীতে ইসলামের গুরুত্ব কতখানি, ভাবো একবার। এবার নিজেই হিসাবটা মেলাও। দীন যদি মানুষের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তার অর্ধেক যদি বিবাহতে থাকে, তবে এই সম্পর্ককে আমাদের কতটা গুরুত্ব দিতে হবে?
বিবাহ মানুষের একটি প্রয়োজন। এটা মানুষের দুনিয়ার যন্ত্রণা উপশমের মাধ্যম। এর মাধ্যমে মানুষ ইহকালীন জীবনে পাপাচার থেকে মুক্ত থেকে পরকালের প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হয়। তবে মানুষের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে এই পৃথিবীর সুখের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব উপকরণ দ্বারা সে নিজের দুঃখ উপশম করবে কিংবা অন্যান্য কঠিন অবস্থায় নিজেকে সামলে রাখতে পারবে। কিন্তু কোনো উপকরণকেই যদি কেউ নিজের মূল উদ্দেশ্য বানিয়ে তা থেকে পূর্ণ সুখী হতে চায়, তবে তা হবে মারাত্মক ক্ষতিকর। যেমন: মধুর প্রথম কয়েক চামচ শিফা বা আরোগ্য, কিন্তু অতিরিক্ত মধুপানে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শোনো, সময়ের পূর্বে বিবাহ সম্পর্কে ভাবতে যেয়ো না। কেননা এই নতুন শয়তানি আবরণ বুঝতে বুঝতে তুমি এর ভেতরে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে। আর যেহেতু এটা প্রেমের অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত, তাই এই দুর্বলতা সহজে কাটিয়েও উঠতে পারবে না। ফলে দীনে প্রবেশের পূর্বেই দীন থেকে ছিটকে পড়তে পারো।
তুমি নিজের ইমান-আমল-ইলমের ওপর গুরুত্ব দাও। আর নফস থেকে সতর্ক থাকো।