📄 সাহাবিদের মানসিকতা
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কথা কে না জানে! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তার ভালোবাসা এত বেশি ছিল যে তাকে 'মাজনুনুস সুন্নাহ' উপাধি দেওয়া হয়েছিল, যার অর্থ হলো, সুন্নাহপ্রেমী।
আমাদের মতো দু-একটা সুন্নাহ অনুসরণ করে তৃপ্তিতে ভোগার মতো ভালোবাসা তার ছিল না। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল আদেশ-নিষেধ পালনের সাথে সাথে তাঁর প্রতিটি আচরণ এবং পদচিহ্নকেও অনুসরণ করতেন। হজের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেখানে বিশ্রাম নিতেন, তিনিও সেখানে বিশ্রাম নেন। রাসুল যেভাবে মেহেদি মাখতেন, তিনিও সেভাবে মেহেদি মাখেন। রাসুলের অনুসরণ করতে গিয়ে তিনি পশমবিহীন জুতো পরতেন।
তিনি একবার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কোনো এক স্থানে পৌঁছানোর পর হুট করেই মাথা নিচের দিকে নামিয়ে আবার ওপরে তুললেন।
অথচ এই স্থান সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল। তার সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করলো, এ-রকম আচরণের কারণ কী?
তিনি বলেন, অনেকদিন আগে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর সঙ্গে এই পথ ধরে যাচ্ছিলাম, তখন এই স্থানে একটা গাছ ছিল। গাছের একটা ডাল নিচের দিকে ঝুঁকে থাকায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মাথা নিচু করে এই পথ অতিক্রম করেছিলেন। আজকে এখানে গাছটি আর নেই। তবুও আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই ছোট্ট পদচিহ্ন অনুসরণ না করে সামনে এগোতে চাই না।
📄 পার্থিব জীবন এক সফর
তুমি যখন কোথাও ভ্রমণের ইচ্ছা করো, তখন নিজের সাথে কী কী নাও? কেবল প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো, তাই না?
তুমি কিন্তু নিজের ঘরের সমস্ত কিছু নিয়ে ভ্রমণ করতে বের হও না। তোমার ব্যাগে কেবল প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকে। কিন্তু সেখানেও কেবল বাছাই করা অপরিহার্য উপকরণগুলোই স্থান পায়। তুমি কখনো গ্রীষ্মের মৌসুমে শীতের পুরু কাপড় সাথে নেবে না। তুমি কেবল তোমার সাথে ততটুকুই বহন করবে, যতটা তোমার অপরিহার্যভাবে প্রয়োজন।
এটাই হলো পৃথিবী এবং এর প্রয়োজনের সঠিক মাত্রা! কিছু বিষয় থাকে মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন, কিছু বিষয় বেশি প্রয়োজন, আর কিছু থাকে অপরিহার্য প্রয়োজন। তোমার কাছে সবগুলো ক্রয়ের সামর্থ্য থাকলেও অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করাই সুন্নাহর অনুসরণ। আজকের পৃথিবীতে না চাইলেও মানুষকে এ বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কেননা বাজারের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোও সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। যেখানে তারা স্বাভাবিক প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো নিত্যদিনই ক্রয় করত, সেখানে আজ কেবল অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করছে। আর তুমি যদি মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ হও, তবে তোমার জন্য অবস্থা আরও করুণ। তাই হিসাব করেই চলো, তবে চলার উদ্দেশ্য রাখো 'সুন্নাহ'। তাহলে বাধ্য হয়ে অপরিহার্য প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকাটাও তোমার জন্য সুন্নাহের অনুসরণ হিসাবে লিখিত হবে。
📄 দুনিয়া একটা যাত্রাবিরতি মাত্র
তোমার যদি দূরে কোথাও বাসে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে দেখবে, কিছু দূর অতিক্রম করার পর যাত্রীদের যাবতীয় প্রয়োজন, ক্ষুধা আর ক্লান্তি নিরসনে কিছু সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। এখানে একটা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বাস থেমে যায়। এ-রকম জায়গাকে সাধারণত 'ফুড ভিলেজ' নামেই আমরা চিনি। দামি দামি সব রেস্তোরাঁ, উজ্জ্বল আলো, চারদিকে চাকচিক্য আর সৌন্দর্য দিয়ে মোড়ানো একটা জায়গা। একবার এখানে নামলে আর ফিরে আসতে ইচ্ছা হয় না।
এই দুনিয়া তোমার আমার জন্য সেই ফুড ভিলেজের কিছু মুহূর্ত মাত্র। যেখানে পূর্বে থেকে অবস্থানরত বাসগুলো সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার যাত্রা শুরু করে, কেউ মাত্র প্রবেশ করে। কিন্তু কেউই এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যায় না। কারণ এখানে তোমার কিছুই নেই, কেউ নেই। একইভাবে নির্দিষ্ট সময় ফুরিয়ে গেলেই তোমাকেও ফিরে যেতে হবে—নিজের প্রকৃত গন্তব্যের দিকে, তোমার মূল উদ্দেশ্যের দিকে। সেটা মোটেই ফুড ভিলেজে অবস্থান করা নয়; বরং নিজ শহরে বা বাড়িতে পৌঁছানো।
একজন মানুষের প্রকৃত বাড়ি হলো জান্নাত। এখান থেকেই তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। একজন মুসলমান যেখানেই যাক না কেন, জান্নাতে গিয়েই তার সমাপ্তি ঘটবে। মধ্যবর্তী দুনিয়ার জীবনটা হলো, ফুড ভিলেজে কাটানো কিছু মুহূর্তের মতো। আট-দশ কিংবা পনেরো ঘণ্টার যাত্রাপথের তুলনায় মাত্র দশ-বিশ মিনিট।
তবে ফুড ভিলেজের সাথে দুনিয়ার পার্থক্য হলো—ফুড ভিলেজ মানুষের জন্য স্বস্তি, সতেজতা, আর খাবার গ্রহণ; কিন্তু দুনিয়া মানুষের জন্য কষ্ট, যন্ত্রণা, আর ক্ষুধা। কেননা দুনিয়াকে গড়া হয়েছে পরীক্ষার স্থান হিসাবে, আর ফুড ভিলেজকে স্বস্তির।
তুমি কি কখনো ফুড ভিলেজে পৌঁছে সেখানেই থেকে যাবে?
ধরো, তোমাকে ফুড ভিলেজে নামিয়ে দিয়ে আধ ঘণ্টার একটা বিরতি দেওয়া হলো। এবং নামার সময় বলে দেওয়া হলো, অমুক স্থানে গাড়ি দাঁড়ানো আছে, যথাসময়ে চলে আসবেন।
তুমি ফুড ভিলেজের চকচকে রেস্তোঁরা, নানারকম খাবার আর সাজসজ্জা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলে। সারি সারি রংবেরঙের, দই, মিষ্টি আর মাংসের গন্ধে হারিয়ে গেলে।
এভাবে সৌন্দর্য উপভোগের মধ্যেই দশ মিনিট চলে গেল। অথচ তুমি এখনো পরবর্তী যাত্রার জন্য কিছু গ্রহণ করোনি। এরপর কেউ একজন তোমার হুঁশ ফেরাতে বললো, 'হাতে বেশি সময় নেই, তাড়াতাড়ি নিজের প্রয়োজন সেরে নিন। একটু পরেই গাড়ি ছেড়ে দেবে।'
তুমি বললে, 'আমার হাতে যেটুকু সময় রয়েছে তা খানিকটা উপভোগ করে নিই। এই জায়গাটা আমার অনেক বেশি পছন্দ হয়েছে। আমি ভাবছি এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যাব।' লোকটা তোমার কথা শুনে হাসল। ফুড ভিলেজে থাকতে চাওয়া সত্যিই হাস্যকর!
অথচ তুমি দুনিয়ার ক্ষেত্রেও একই বিষয় করে যাচ্ছ। কিছুক্ষণের জন্য এসে এখানেই থেকে যেতে চাইছ। শুধু চাইলেই হতো; তুমি এখানে স্থায়ীভাবে থাকার সব ব্যবস্থাও করছ!
কিন্তু জেনে রাখো, বিরতিকাল শেষে যেমন একজন যাত্রী তার মূল গন্তব্যের দিকে ফিরে যায়, প্রত্যেক মানুষকেই তার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই চিরস্থায়ী গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। চাই এতে তার ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক।
কিন্তু আমার ভাই/বোন! ওয়াল্লাহি! এই ত্রিশ মিনিটও অনেক বেশি সময়। অথচ মানুষ তার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা জানেও না। সুতরাং দুনিয়ার প্রতি এত বেশি আসক্ত হোয়ো না যে, গন্তব্যে ফেরার সময় ঘনিয়ে এলে নিজের উদাসীনতার জন্য আফসোস করতে হয়।
📄 দুনিয়া স্বল্পকালীন পরীক্ষাক্ষেত্র
দুনিয়া এমন এক জায়গা, যা 'বাই ডিফল্ট' কখনোই মানুষকে সুখী রাখতে সক্ষম নয়। যার বাস্তবতা হলো পরীক্ষার হলে অবস্থানরত কোনো পরীক্ষার্থীর মতোই। যে সর্বদা চিন্তিত, আর উৎকণ্ঠিত থাকে—কী লিখব, কী লিখছি, যা লিখছি ঠিক লিখছি কি না! পরীক্ষার খাতায় সব লেখার পরেও তার চিন্তা কমে না এই ভেবে যে, পরীক্ষক পাশ করাবে কি না। এভাবে রেজাল্ট আউট হওয়ার আগপর্যন্ত একজন পরীক্ষার্থীর উৎকণ্ঠা কাটে না, স্বস্তি আসে না।
দুনিয়াও একটা পরীক্ষাকেন্দ্র। তাই এখানে পরীক্ষার সব উপকরণ রয়েছে। সুখভোগ, স্বস্তি ও আয়েশের কিছুই এখানে রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীকে যেমনি ভাঙা টেবিলে বসে একটানা তিন-চার ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে হয়। পানি পান করা ছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাবের জন্য বাইরে যাওয়া ছাড়া অন্যকিছু করার কোনো সুযোগ রাখা হয় না। অনেক সময় এটুকুরও ফুরসত মেলে না। বা পরিবেশটাই এমন যে, বাইরের কিছু ভাবার বা করার মানসিকতাও থাকে না। এখানে কে কেমন পোশাক পরিধান করলো, কে কী মেখে এলো না এলো, কার কতটুকু সম্মান বা সম্পত্তি রয়েছে—তা দেখা হয় না; বরং খাতায় কে কতটুকু লিখতে পারছে, কার উত্তর কত সুন্দর হলো, সে অনুপাতেই ফলাফল আসে।
কিন্তু আমাদের অবস্থা এতটাই হাস্যকর যে, আমরা আজকে পরীক্ষা শুরুর পর পরীক্ষার হলে কোল্ড ড্রিংক্স খুঁজছি, পোশাকের ভাঁজ ঠিক করছি, খাবারের স্বাদ নিয়ে সময় পার করছি, টেবিল সাজাচ্ছি শোপিস দিয়ে, স্যারদের সাথে গল্প করে সম্পর্ক তৈরি করছি। ওদিকে সময় কিন্তু চলে যাচ্ছে।
রেজাল্টের পরের উন্নত শিক্ষার সুযোগ কিংবা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠের সুখের চাইতে আমরা এই পরীক্ষার হলের কিছু মুহূর্ত সুখে কাটাতে বেশি আগ্রহী। আমরা ভুলে গেছি এই অমোঘ বাস্তবতা: পৃথিবীর কোনো পরীক্ষাকেন্দ্র বা আল্লাহর সৃষ্টি করা দুনিয়া নামক এই পরীক্ষাকেন্দ্রে সুখ-আয়েশের কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানে যা আছে তা কেবল পরীক্ষার্থীদের প্রয়োজনমাফিক সামান্য পানি, টেবিল-চেয়ারের মতোই মানুষের বেঁচে থাকার উপকরণমাত্র।
মূল সুখ তো ফলাফলের পর। পৃথিবীর ক্ষেত্রে সেটা হলো: আরও উন্নত অবস্থান। আর আখিরাতে সেটা হলো: মানুষের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে শ্রেষ্ঠ প্রতিদান—জান্নাত।
আজকের পৃথিবী এবং মানুষ দুনিয়াকেন্দ্রিক। এখানের দৈনন্দিন অবস্থা এত বেশি কঠিন করে তোলা হয়েছে যে, দুবেলা দুমুঠো খেয়ে অনাড়ম্বর জীবনযাপনের জন্যও যতটুকু উপকরণ প্রয়োজন হয়, তা জোগাড় করে আনতেও সারাদিন আল্লাহকে ভুলে থাকতে হয়। সাধারণ মানুষের জন্য জীবন বলতে এখানে কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই; আছে শুধুই পয়সা আর প্রচুর চাহিদা। তাই সকলের মুখে তুমি কেবল শুনতে পাবে—এতদূর পড়াশোনা করো, এইদিকে যাও, এই এই স্কিল শেখো, এই ব্যবসায় এত লাভ, ওখানে পড়লে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে ইত্যাদি। যেন মানুষকে পৃথিবীর গহ্বরে প্রবেশ করিয়ে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চাইলেও সে আজ আর পৃথিবীকেন্দ্রিক না হয়ে পারবে না।
তবে পৃথিবী যেমনই থাকুক, তুমি তো এখনও মুসলমান। পৃথিবীর অবস্থা যা-ই হোক, আল্লাহ তো এখনও বিদ্যমান, তাই না?
শোনো আমার ভাই/বোন! দুনিয়াকে যেমন গুরুত্ব দিচ্ছ, দুনিয়ার স্রষ্টাকেও গুরুত্ব দাও। কে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার হকদার, বলো? রিযিক না কি রিযিকদাতা? মাখলুক না কি খালিক? চিকিৎসা না কি শিফাদাতা? অবশ্যই আল্লাহকে প্রাধান্য দাও। আল্লাহ না চাইলে তোমার সব চেষ্টা ব্যর্থ। দুনিয়ার মালিকের অনুমতি ছাড়া দুনিয়া তোমার হবে না। সুতরাং দুনিয়ার রব্বকে সন্তুষ্ট করার কাজে লেগে পড়ো। দীন অনুসরণ করো। দীনের খাতিরে আপাতদৃষ্টে দামি দুনিয়ার স্বার্থগুলোকে বিসর্জন দিয়ে দেখো। দুনিয়ার মাখলুকদেরকে নয়, বরং খালিককে একবার খুশি করে দেখো। নিজের আখিরাতের প্রতি একটু সজাগ হয়েই দেখো কীভাবে পোষা বিড়ালের মতো দুনিয়া তোমার আশপাশে ঘুরঘুর করে। তোমার রবের সামনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আর উদাসীন থেকো না। জান্নাতকে ঘিরেই তোমার স্বপ্ন সাজাও, আর দেখো কীভাবে দুনিয়াও সেজে ওঠে জান্নাতের ঢঙে।