📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পৃথিবীকে তার প্রাপ্য গুরুত্বের বেশি দিয়ো না

📄 পৃথিবীকে তার প্রাপ্য গুরুত্বের বেশি দিয়ো না


আমি দুনিয়াকে ঘৃণা করতে বলছি না। তবে দুনিয়া যে-রকম তাকে ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করো। অর্থাৎ ক্ষণিকের দুনিয়াতে ক্ষণিকের পথচারী হয়ে থাকো। নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, চাহিদা, কামনা-বাসনাকে সামান্য সময়ের জন্য যেভাবে প্রয়োজন সেভাবেই সাজাও। এর অতিরিক্ত চাইতে যেয়ো না, এর অতিরিক্ত ভাবতেও যেয়ো না; নতুবা এটা তোমাকে তোমার উদ্দেশ্য থেকে নিজের ভেতরে গ্রাস করে নেবে।

পৃথিবীর এই ব্যস্ততা তার ধ্বংসের দিন পর্যন্ত চলমান থাকবে। শুধু এতে তোমার আর আমার কোনো অংশ থাকবে না। আমরা হারিয়ে যাচ্ছি রোজ, আমরা চিরতরেই হারিয়ে যাব। নির্দিষ্ট একটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এরপরেই পৃথিবী এবং এর মধ্যকার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু তুমি তো এরপরেও পৃথিবীকেও নিজ গন্তব্য মনে করছ, নাহলে অনবরত এই ছুটে চলা কীসের?

দৈনিক ১৩-১৪ ঘণ্টার হাড়ভাঙা পরিশ্রম শুধু আরেকটু বেশি অর্থ জমানোর আশায়। অথচ আমাদের জন্য তো সামান্য বেঁচে থাকার মতো উপকরণ হলেই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু উচ্চ প্রত্যাশা আমাদের চোখে কাঠের চশমা পরিয়ে রেখেছে। মানবতা আর মনুষ্যত্ব হারিয়ে আমরা কেবল কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। এক ইলাহের ইবাদত পরিত্যাগ করে ঠুনকো কাগজের আনুগত্য করে যাচ্ছি।

আমার কথা বিশ্বাস না হলে ফজরের সময় যে-কোনো মসজিদে যাও। দেখো ফজরের জামায়াতে মুসল্লিদের অবস্থা কি! দেখো, কয়জন তাদের প্রেমময়ী দুনিয়ার উষ্ণ কোল ছেড়ে আল্লাহর দাসত্বকে বেছে নিয়েছে।

মুখে মুখে সকলেই স্বীকার করে যে, আল্লাহ প্রকৃত রিজিকদাতা, আল্লাহ তাআলাই মানুষের জীবন এবং মৃত্যু নির্ধারণ করেন। কিন্তু দিনের বেলা আল্লাহকে প্রতিপালক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ফজরের সময় সে নাক ডেকে ঘুমিয়ে থাকে। আজান কানে এলে, কানে বালিশ চেপে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সকাল ৬টা বাজার সাথে সাথেই সে তার সমস্ত সুখ ফেলে বিছানা থেকে জাগ্রত হয়। সিগারেট জ্বালিয়ে হাঁটতে বের হয়। কেউ অফিসের কাজে বেরিয়ে যায়। তার গন্তব্যের বাস যদি রাত ৩টায় ছাড়ে, তবুও সে নিজের সমস্ত ঘুম আর কাজ ছেড়ে ১টা বাজার পূর্বেই বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে যায়। কারও এই আচরণ থেকে কী বোঝা যায়? সে কি আল্লাহকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে না কি দুনিয়াকে?

আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি, যারা সপ্তাহে সাত দিনই কাজ করে, দিনে বারো ঘণ্টা। দীনের জন্য তার কোনো সময় নেই, সালাতের জন্য তার কোনো সময় নেই। দীনের কথা বললেই সবসময় 'আমি ব্যস্ত, আমি ব্যস্ত আর আমি ব্যস্ত'। কিন্তু কেন এত ব্যস্ততা?

আলহামদুলিল্লাহ, তোমার তো থাকার জন্য ঘর আছে। বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট খাবার আছে। কিন্তু তবুও তুমি নিজের জন্য সম্পদ জমিয়েই সন্তুষ্ট নও কেন?

এখন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি সম্পদ প্রয়োজন, আরও ভালো ঘর বানিয়ে রেখে যেতে হবে। যেন সন্তান তার চাইতে আরেকটু বেশি দুনিয়াকে ভোগ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তো তোমার থেকে এসব চান না। তবুও যদি তুমি আল্লাহর চাওয়ার বিপরীতে যাও, তখন কী হবে জানো?

তোমার সন্তানের জন্য রেখে যাওয়া সম্পদ, ঘরবাড়ি তোমার পরিবারকে ধ্বংস করে দেবে। আমি এমন পরিবারের কথা জানি, যেখানে বাড়িসংক্রান্ত সমস্যা নিয়েই ২০ বছর ধরে এক ভাই আরেক ভাইয়ের সাথে কোনো কথা বলেনি। মানুষ তো নিজেকেই পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারে না, সেখানে কীভাবে সে অর্থসম্পদ ধরে রাখার কল্পনা করতে পারে!

এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় হলো, পরস্পরের মাঝে দুনিয়ার বাস্তবতা নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করা। দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষা কমানোর জন্য দুনিয়াবিমুখ আলিমদের মজলিসে বসা। প্রজ্ঞার সাথে নিজের চিন্তা-চেতনাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলতে চেষ্টা করা। পুরোপুরি দুনিয়া ছেড়ে দিতে কেউ বলছে না। তবে যতটুকু প্রয়োজন তার জন্য প্রচেষ্টা করতে থাকো। অধিক আশা করা থেকে বিরত থাকো।

একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন, আমার কথার ভুল বিশ্লেষণ করে অনেকে ভাবতে পারো, দীন অনুসরণ করতে হলে দুনিয়াকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে।
আসলে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, দুনিয়াকে ছেড়ে দিলে তুমি আখিরাতের পাথেয় জমাবে কীভাবে?

দুনিয়াতে থেকেই, দুনিয়ার উপকরণ গ্রহণ করেই তোমাকে আখিরাতের জন্য পাথেয় জমাতে হবে। আরও সহজ ভাষায় বললে, তোমার শরীর থাকবে দুনিয়াতে, কিন্তু তোমার অন্তর থাকবে আল্লাহর কাছে। যেমন:
* তুমি স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে যাচ্ছ, যাও। কিন্তু হাত পা চালিয়ে এগিয়ে যাও; অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জীবন্ত রাখো। সেখানে গিয়ে যাতে তুমি কোনো পাপকর্মে লিপ্ত না হও, সেদিকে লক্ষ রাখো, তোমার চোখ সংযত রাখো。
* অফিসে যাচ্ছ, যাও। কিন্তু শরীরকে রিকশা বা গাড়ির ওপর রাখো; অন্তরে আল্লাহর স্মরণ করো। তোমাকে দিয়ে যেন কোনো খেয়ানত না হয়, তার খেয়াল রাখো。
* ব্যবসা করছ, করো। কিন্তু কাউকে যেন ধোঁকা না দাও, খেয়াল রাখো。

এই যে খেয়াল রাখাটা, এই যে অন্তরে অন্তরে আল্লাহকে প্রাধান্য দেওয়াটা— এটাই তোমার আখিরাত, এটাই হলো দীন। ইসলাম কাউকে বলেনি, সবকিছু ছেড়ে জঙ্গলে যাও। এই বৈরাগ্যবাদকে শরিয়ত হারাম করে দিয়েছে।

সুতরাং আমি তোমাকে বাহ্যিক দিক থেকে দুনিয়াবিমুখ করতে চাচ্ছি না। আমি চাই তুমি অন্তরের দিক থেকে দুনিয়াবিমুখ হও। কেননা আসক্তি অন্তর থেকে হয়; শরীর দিয়ে নয়। এই আলোচনা দ্বারা অন্তরের আসক্তি দূর করাই আমার মূল উদ্দেশ্য; বাহ্যিক কাজকর্ম থেকে তোমাকে সরিয়ে দেওয়া নয়।

আর আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনোই আমাদের দুনিয়াকে ঘৃণা করা শেখাননি; বরং এর প্রকৃত বাস্তবতা বুঝিয়ে তিনি আমাদের দুনিয়ার প্রতি অন্তর পুরোপুরি ঝুঁকে যাওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। কীভাবে উত্তম বিষয়গুলো গ্রহণ এবং অনর্থক কর্ম বর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, তিনি আমাদের তা শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন, একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'অবশ্যই তুমি তোমার পরিবারকে (মোটামুটি) সচ্ছল বানিয়ে যাও, যা তাদের জন্য মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে উত্তম।'[২৬]

এ ছাড়া আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,

'দুনিয়া ও তার মাঝের সকল কিছুই অভিশপ্ত। কিন্তু আল্লাহ তাআলার জিকির এবং তার সাথে সংগতিপূর্ণ অন্যান্য আমল, আলিম ও ইলম অন্বেষণকারী এর ব্যতিক্রম।' [২৭]

সুতরাং দুনিয়াকে কেবল তোমার প্রয়োজন বানাও; প্রিয়জন নয়।

হাসান আল-বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

'হে যুবকেরা! তোমরা অবশ্যই আখিরাত অর্জনে মনোযোগী হও। তোমরা এটাই মনেপ্রাণে কামনা করো। কেননা আমরা দেখেছি, যারা আখিরাত কামনা করেছে, তার অধিকাংশই আখিরাতের সাথে সাথে দুনিয়াও পেয়ে গেছে। তবে এমন কাউকে দেখিনি, যে দুনিয়া কামনা করেছে আর তার সাথে আখিরাতও পেয়েছে।' [২৮]

টিকাঃ
২৫. তারিখে তাবারি: ৮/৩৫৭১।
২৬. সহিহুল বুখারি: ১২৯০; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮।
২৭. সুনানুত তিরমিজি: ২৩২২; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১১২।
২৮. সুনানুল বায়হাকি, কিতাবুয যুহদ: ১২।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 সাহাবিদের মানসিকতা

📄 সাহাবিদের মানসিকতা


আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কথা কে না জানে! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তার ভালোবাসা এত বেশি ছিল যে তাকে 'মাজনুনুস সুন্নাহ' উপাধি দেওয়া হয়েছিল, যার অর্থ হলো, সুন্নাহপ্রেমী।

আমাদের মতো দু-একটা সুন্নাহ অনুসরণ করে তৃপ্তিতে ভোগার মতো ভালোবাসা তার ছিল না। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল আদেশ-নিষেধ পালনের সাথে সাথে তাঁর প্রতিটি আচরণ এবং পদচিহ্নকেও অনুসরণ করতেন। হজের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেখানে বিশ্রাম নিতেন, তিনিও সেখানে বিশ্রাম নেন। রাসুল যেভাবে মেহেদি মাখতেন, তিনিও সেভাবে মেহেদি মাখেন। রাসুলের অনুসরণ করতে গিয়ে তিনি পশমবিহীন জুতো পরতেন।

তিনি একবার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কোনো এক স্থানে পৌঁছানোর পর হুট করেই মাথা নিচের দিকে নামিয়ে আবার ওপরে তুললেন।

অথচ এই স্থান সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল। তার সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করলো, এ-রকম আচরণের কারণ কী?

তিনি বলেন, অনেকদিন আগে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর সঙ্গে এই পথ ধরে যাচ্ছিলাম, তখন এই স্থানে একটা গাছ ছিল। গাছের একটা ডাল নিচের দিকে ঝুঁকে থাকায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মাথা নিচু করে এই পথ অতিক্রম করেছিলেন। আজকে এখানে গাছটি আর নেই। তবুও আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই ছোট্ট পদচিহ্ন অনুসরণ না করে সামনে এগোতে চাই না।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পার্থিব জীবন এক সফর

📄 পার্থিব জীবন এক সফর


তুমি যখন কোথাও ভ্রমণের ইচ্ছা করো, তখন নিজের সাথে কী কী নাও? কেবল প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো, তাই না?

তুমি কিন্তু নিজের ঘরের সমস্ত কিছু নিয়ে ভ্রমণ করতে বের হও না। তোমার ব্যাগে কেবল প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকে। কিন্তু সেখানেও কেবল বাছাই করা অপরিহার্য উপকরণগুলোই স্থান পায়। তুমি কখনো গ্রীষ্মের মৌসুমে শীতের পুরু কাপড় সাথে নেবে না। তুমি কেবল তোমার সাথে ততটুকুই বহন করবে, যতটা তোমার অপরিহার্যভাবে প্রয়োজন।

এটাই হলো পৃথিবী এবং এর প্রয়োজনের সঠিক মাত্রা! কিছু বিষয় থাকে মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন, কিছু বিষয় বেশি প্রয়োজন, আর কিছু থাকে অপরিহার্য প্রয়োজন। তোমার কাছে সবগুলো ক্রয়ের সামর্থ্য থাকলেও অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করাই সুন্নাহর অনুসরণ। আজকের পৃথিবীতে না চাইলেও মানুষকে এ বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কেননা বাজারের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোও সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। যেখানে তারা স্বাভাবিক প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো নিত্যদিনই ক্রয় করত, সেখানে আজ কেবল অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করছে। আর তুমি যদি মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ হও, তবে তোমার জন্য অবস্থা আরও করুণ। তাই হিসাব করেই চলো, তবে চলার উদ্দেশ্য রাখো 'সুন্নাহ'। তাহলে বাধ্য হয়ে অপরিহার্য প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকাটাও তোমার জন্য সুন্নাহের অনুসরণ হিসাবে লিখিত হবে。

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 দুনিয়া একটা যাত্রাবিরতি মাত্র

📄 দুনিয়া একটা যাত্রাবিরতি মাত্র


তোমার যদি দূরে কোথাও বাসে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে দেখবে, কিছু দূর অতিক্রম করার পর যাত্রীদের যাবতীয় প্রয়োজন, ক্ষুধা আর ক্লান্তি নিরসনে কিছু সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। এখানে একটা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বাস থেমে যায়। এ-রকম জায়গাকে সাধারণত 'ফুড ভিলেজ' নামেই আমরা চিনি। দামি দামি সব রেস্তোরাঁ, উজ্জ্বল আলো, চারদিকে চাকচিক্য আর সৌন্দর্য দিয়ে মোড়ানো একটা জায়গা। একবার এখানে নামলে আর ফিরে আসতে ইচ্ছা হয় না।

এই দুনিয়া তোমার আমার জন্য সেই ফুড ভিলেজের কিছু মুহূর্ত মাত্র। যেখানে পূর্বে থেকে অবস্থানরত বাসগুলো সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার যাত্রা শুরু করে, কেউ মাত্র প্রবেশ করে। কিন্তু কেউই এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যায় না। কারণ এখানে তোমার কিছুই নেই, কেউ নেই। একইভাবে নির্দিষ্ট সময় ফুরিয়ে গেলেই তোমাকেও ফিরে যেতে হবে—নিজের প্রকৃত গন্তব্যের দিকে, তোমার মূল উদ্দেশ্যের দিকে। সেটা মোটেই ফুড ভিলেজে অবস্থান করা নয়; বরং নিজ শহরে বা বাড়িতে পৌঁছানো।

একজন মানুষের প্রকৃত বাড়ি হলো জান্নাত। এখান থেকেই তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। একজন মুসলমান যেখানেই যাক না কেন, জান্নাতে গিয়েই তার সমাপ্তি ঘটবে। মধ্যবর্তী দুনিয়ার জীবনটা হলো, ফুড ভিলেজে কাটানো কিছু মুহূর্তের মতো। আট-দশ কিংবা পনেরো ঘণ্টার যাত্রাপথের তুলনায় মাত্র দশ-বিশ মিনিট।

তবে ফুড ভিলেজের সাথে দুনিয়ার পার্থক্য হলো—ফুড ভিলেজ মানুষের জন্য স্বস্তি, সতেজতা, আর খাবার গ্রহণ; কিন্তু দুনিয়া মানুষের জন্য কষ্ট, যন্ত্রণা, আর ক্ষুধা। কেননা দুনিয়াকে গড়া হয়েছে পরীক্ষার স্থান হিসাবে, আর ফুড ভিলেজকে স্বস্তির।

তুমি কি কখনো ফুড ভিলেজে পৌঁছে সেখানেই থেকে যাবে?

ধরো, তোমাকে ফুড ভিলেজে নামিয়ে দিয়ে আধ ঘণ্টার একটা বিরতি দেওয়া হলো। এবং নামার সময় বলে দেওয়া হলো, অমুক স্থানে গাড়ি দাঁড়ানো আছে, যথাসময়ে চলে আসবেন।

তুমি ফুড ভিলেজের চকচকে রেস্তোঁরা, নানারকম খাবার আর সাজসজ্জা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলে। সারি সারি রংবেরঙের, দই, মিষ্টি আর মাংসের গন্ধে হারিয়ে গেলে।

এভাবে সৌন্দর্য উপভোগের মধ্যেই দশ মিনিট চলে গেল। অথচ তুমি এখনো পরবর্তী যাত্রার জন্য কিছু গ্রহণ করোনি। এরপর কেউ একজন তোমার হুঁশ ফেরাতে বললো, 'হাতে বেশি সময় নেই, তাড়াতাড়ি নিজের প্রয়োজন সেরে নিন। একটু পরেই গাড়ি ছেড়ে দেবে।'

তুমি বললে, 'আমার হাতে যেটুকু সময় রয়েছে তা খানিকটা উপভোগ করে নিই। এই জায়গাটা আমার অনেক বেশি পছন্দ হয়েছে। আমি ভাবছি এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যাব।' লোকটা তোমার কথা শুনে হাসল। ফুড ভিলেজে থাকতে চাওয়া সত্যিই হাস্যকর!

অথচ তুমি দুনিয়ার ক্ষেত্রেও একই বিষয় করে যাচ্ছ। কিছুক্ষণের জন্য এসে এখানেই থেকে যেতে চাইছ। শুধু চাইলেই হতো; তুমি এখানে স্থায়ীভাবে থাকার সব ব্যবস্থাও করছ!

কিন্তু জেনে রাখো, বিরতিকাল শেষে যেমন একজন যাত্রী তার মূল গন্তব্যের দিকে ফিরে যায়, প্রত্যেক মানুষকেই তার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই চিরস্থায়ী গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। চাই এতে তার ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক।

কিন্তু আমার ভাই/বোন! ওয়াল্লাহি! এই ত্রিশ মিনিটও অনেক বেশি সময়। অথচ মানুষ তার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা জানেও না। সুতরাং দুনিয়ার প্রতি এত বেশি আসক্ত হোয়ো না যে, গন্তব্যে ফেরার সময় ঘনিয়ে এলে নিজের উদাসীনতার জন্য আফসোস করতে হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00