📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পৃথিবীর সাথে নবিদের আচরণ

📄 পৃথিবীর সাথে নবিদের আচরণ


গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে! কিন্তু গল্পটা যদি হয় নবি-রাসুলের, তাহলে তো আর কথাই নেই। কেননা নবি-রাসুলগণের গল্পে এমন সব শিক্ষা রয়েছে, পৃথিবীর এমন সব বাস্তবতা রয়েছে, যা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। চলো এবার গল্পে গল্পে জেনে নেওয়া যাক, পৃথিবীর প্রকৃত চিত্র আর পৃথিবীর মূল বাস্তবতা।

আমাদের গল্পটা আল্লাহ তাআলার একজন সম্মানিত নবি হজরত ইসা আলাইহিস সালাম এবং তার অনুসারীদের একটা যাত্রার। আমি চাই, তুমি এই গল্পটির একেবারে ভেতরে প্রবেশ করো। বিনোদনের সাথে এর শিক্ষাগুলোকেও একটু উপলব্ধির চেষ্টা করো।

একবার জনৈক ব্যক্তি হজরত ইসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বললো, 'আমি আপনার সাথে কিছুদিন থাকতে চাই।' ইসা আলাইহিস সালাম বললেন, 'ঠিক আছে।' এরপর থেকে তার দুজন একসঙ্গে অবস্থান করতে লাগলেন। একদিন তারা সফরে বের হলেন। চলতে চলতে তারা একটি নদীর তীরে গিয়ে পৌঁছলেন। ততক্ষণে ক্ষুধা ও ক্লান্তি তাদের পেয়ে বসেছে। ইসা আলাইহিস সালাম সঙ্গীকে খাবার বের করতে বললেন। তাদের সাথে তিনটি রুটি ছিল। তারা দুজনে দুটি রুটি খেয়ে একটি রুটি রেখে দিলেন। খাওয়ার পরে ইসা আলাইহিস সালাম নদীতে পানি পান করতে গেলেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখলেন, রেখে যাওয়া রুটিটি নেই। ইসা আলাইহিস সালাম তখন সফরসঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাই, ওই রুটিটা কোথায়?' সে উত্তর দিলো, 'আমি জানি না।'

ইসা আলাইহিস সালাম কোনো মন্তব্য না-করে গন্তব্য অভিমুখে চলতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূরে যাওয়ার পর সুন্দর একটি হরিণ দেখতে পেলেন। হরিণের সাথে দুটি বাচ্চাও ছিল। ইসা আলাইহিস সালাম একটি হরিণের বাচ্চাকে
ডেকে জবাই করলেন। এরপরে হরিণের গোস্ত ভুনা করে দুজনে আহার করলেন। আহার শেষে হরিণের বাচ্চার হাড্ডিগুলো একত্রিত করে বললেন, 'হে হরিণশাবক, আল্লাহর হুকুমে তুমি জীবিত হয়ে যাও।' ব্যস, সাথে সাথে বাচ্চাটি জীবিত হয়ে তার মায়ের সাথে চলে গেল।

ঈসা আলাইহিস সালাম তখন তাঁর সঙ্গীকে বললেন, 'আল্লাহর অলৌকিক ঘটনা তো তুমি নিজ চোখেই দেখলে, এবার বলো, ওই রুটিটি কে খেয়েছে।' কিন্তু এবারও সে পূর্বের মতো একই উত্তর দিলো। বললো, 'আমি জানি না।'

ঈসা আলাইহিস সালাম কথা না-বাড়িয়ে সঙ্গীকে নিয়ে আবারও সামনে চলতে লাগলেন। অনেকক্ষণ চলার পরে তারা একটি পানিভরা উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছলেন। ঈসা আলাইহিস সালাম লোকটির হাত ধরে পানির ওপর দিয়ে উপত্যকা পার হলেন।

এরপর পুনরায় লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'তুমি আল্লাহর মুজিযা দেখলে তো, আমি এই মুজিযার দোহাই দিয়ে বলছি, সত্যি করে বলো, ওই রুটিটি কে নিয়েছে?' লোকটি এবারও আগের উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলো। বললো, 'আমি জানি না।'

তারা আবার সামনে চলতে শুরু করলেন। এবার তারা হাঁটতে হাঁটতে একটি জঙ্গলে গিয়ে পৌঁছলেন। ঈসা আলাইহিস সালাম গহিন জঙ্গলের এক জায়গা থেকে এক মুঠো মাটি তুলে বললেন, 'হে মাটি, তুমি আল্লাহর হুকুমে স্বর্ণ হয়ে যাও।' তার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই হাতের মাটিগুলো স্বর্ণ হয়ে গেল। এবার ঈসা আলাইহিস সালাম স্বর্ণগুলোকে তিন ভাগ করে বললেন, 'এই স্বর্ণগুলোর এক ভাগ তোমার, এক ভাগ আমার, আর অন্য ভাগ যে তৃতীয় রুটিটি নিয়েছিল তার।'

এবার লোকটি আবেগের সুরে বললো, 'তৃতীয় রুটিটি তো আমি নিয়েছিলাম।' প্রত্যুত্তরে ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, 'তাহলে সব স্বর্ণ আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম।' এ কথা বলে তিনি লোকটিকে সেখানে একাকী রেখে অন্যত্র চলে গেলেন।

ঈসা আলাইহিস সালাম সেখান থেকে যেতে না যেতেই দুই জন লোক এসে সেখানে হাজির হলো। তারা এত স্বর্ণ দেখে লোভ সামলাতে পারল না। তাই স্বর্ণের মালিককে বললো, তোমার স্বর্ণ আমাকে দিয়ে দাও, অন্যথায় আমরা তোমাকে খুন করে ফেলব। মালিক তখন কৌশল খাটিয়ে বললো, খুনখারাবির দরকার নেই। এই স্বর্ণ আমরা তিনজনে সমানভাবে ভাগ করে নেব। তার এই প্রস্তাব ডাকাতদের মনে ধরল। তারা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল।

এরপর তারা খাবার কেনার জন্য একজনকে বাজারে পাঠাল। লোকটি বাজারে যেতে যেতে মনে মনে ভাবল, সমস্ত স্বর্ণ সে একাই নেবে। তাই সে ফন্দি করে খাবারে বিষ মিশিয়ে নিয়ে গেল।

ওদিকে অপর দুইজন ভাবল, আমরা একটি অংশ শুধুশুধু অন্য একজনকে কেন দিতে যাব? এর চেয়ে বরং লোকটি বাজার থেকে ফেরামাত্রই আমরা তাকে হত্যা করে ফেলব এবং সমস্ত স্বর্ণ দুভাগে ভাগ করে নিয়ে নেব।

ব্যস, যেই কথা, সেই কাজ। লোকটি খাবার নিয়ে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তারা তাকে হত্যা করে ফেলল। এরপর তারা মনের সুখে খাবার খেতে বসল। খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেল এবং ধীরে ধীরে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এভাবে তারা তিনজনই মারা পড়ল।

ইসা আলাইহিস সালাম সফর থেকে ফেরার পথে তাদের এই অবস্থা দেখে স্বগতোক্তির মতো করে মন্তব্য করলেন, 'এটাই হলো দুনিয়া, যার লোভে পতিত হয়ে কত মানুষ নিজের জীবন ধ্বংস করে দেয়।'[২২]

দেখলে তো, লোভ মানুষকে কীভাবে ধ্বংস করে?

প্রথমবার সেই ব্যক্তি রুটি খেয়ে ফেলেছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ভুল সংশোধন না করে সে মিথ্যার আশ্রয় নিতে থাকে। ফলে শেষমেষ সেই মিথ্যা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এবং তার মৃত্যু ঘটে।

আমরাও একই কাজটি করি। প্রথমবার ভুল করেও তা শোধরাতে চেষ্টা না-করে নতুন করে আরেকটা ভুল করে ফেলি। ফলে পাপ থেকে বিরত না-থেকে আমরা পাপের আরও গভীরে ডুবে যাই। আর স্বর্ণের লোভ কীভাবে তাদের তিন জনকে ধ্বংস করলো, দেখলে তো? দিনশেষে সব সম্পদ ধুলোয় মিশে গেল, আর তারা পড়ে রইল লাশ হয়ে!

এটাই তো পৃথিবীর বাস্তবতা, এটাই তো পৃথিবীর প্রকৃত চিত্র। এর সম্পদ মানুষকে অন্ধ করে দেয়, এই সম্পদ মানুষের নিজেকেই ভুলিয়ে রাখে, এই সম্পদ মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। তুমি পৃথিবীর যা কিছু আর যত কিছুই অর্জন করো না কেন, দিনশেষে সবটা ফেলে রেখে একদম শূন্য হাতেই ফিরে যেতে হবে।

একবার পৃথিবীর কোনো এক ক্ষমতাবান রাজা (আলেকজান্ডার) মৃত্যুর পূর্বে তার সৈন্যদের বললেন, 'তোমরা আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় দাফন করবে। আর কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় আমার হাতদুটো বের করে রাখবে।'

তারা বিস্মিত হয়ে বললো, 'হাত কেন বাইরে রাখব?'

তিনি বললেন, 'যাতে সকলে বুঝতে পারে, এত মহান রাজা পৃথিবী থেকে কিছুই নিয়ে যেতে পারেনি!'

দুই সপ্তাহ আগে আমি আমার দাদাকে দাফন করেছি। তার বয়স আনুমানিক ১০৫ এর মতো হবে। তিনি অনেক পরিশ্রমী ছিলেন। সম্পদও বেশ সঞ্চয় করেছেন। তবে পুরোনো দিনের মানুষ হওয়ায় কাউকে তেমন একটা বিশ্বাস করতেন না। তাই নিজের টাকাগুলোকে কাঠের বাক্সের মধ্যে জমা করে সেই বাক্সগুলো লুকিয়ে রাখতেন। এই বাক্স কোথায় আছে, তিনি ছাড়া আর কেউই জানত না।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে একটা সময়ে তিনি নিজের স্বাভাবিক স্মরণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এখন আর কেউই জানে না, সেই টাকাভরতি বাক্সগুলো কোথায়। তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও বলতে পারতেন না। তাহলে কী লাভ হলো তার এই সম্পদের?!

তুমি যদি বলো, সম্পদ থাকলেও আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানি। তাহলে জেনে রাখো, শয়তানের ষড়যন্ত্র তোমার নিয়ন্ত্রণক্ষমতার থেকেও বেশি শক্তিশালী। আর তুমি যদি বলো, আমার সম্পদের প্রতি অতটা আগ্রহ নেই। তবে এটাও তোমার ভুল ধারণা। কেননা মহান আল্লাহ তাআলা সম্পদের ব্যাপারে স্বয়ং বলেছেন,

وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمًّا. 'আর তোমরা ধনসম্পদকে অতিশয় ভালোবাসো।' [২৩]

তুমি প্রকাশ করো বা না করো, সম্পদকে তুমি ভালোবাসো। মানুষকে পরীক্ষা করতে মহান আল্লাহ মানুষের অন্তরে পৃথিবীর প্রতি দুর্বলতা দিয়েছেন। তবে যে এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে, সম্পদ যাকে নিয়ন্ত্রণ করবে না, সম্পদকে যে নিজের রব বানিয়ে ফেলবে না-সে-ই প্রকৃত সফলকাম।
মহান আল্লাহ এই আকাশ আর জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনি এই দুনিয়ার বাস্তবতা আর মানুষের দুর্বলতা সম্পর্কে সবচাইতে বেশি জানেন। তাই তো দুনিয়ার জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে তিনি বলেন,

اِعْلَمُوْا أَنَّمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَّلَهْوٌ وَّزِيْنَةٌ وَّتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِى الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَبٰهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُوْنُ حُطَامًا وَّفِى الْاٰخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيْدٌ وَّمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللّٰهِ وَرِضْوَانٌ وَّمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ.
'তোমরা জেনে রাখো যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়াকৌতুক, শোভাসৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহংকার এবং ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হলো বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়; তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আজাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি; দুনিয়ার জীবনটা তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।'[২৪]

একবার ইবনু সিমাক রাহিমাহুল্লাহ এলেন খলিফা হারুনুর রশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। হারুনুর রশিদের পিপাসা পেল। তিনি পানি আনালেন এবং তা পান করতে থাকলেন।

ইবনু সিমাক বললেন, আমিরুল মুমিনিন, একটু থামুন। একটু ভেবেচিন্তে বলুন তো, এই অবস্থায় যদি আপনি পানি না পান, তা পাওয়ার জন্য আপনি কি কিছু দেবেন?

হারুন বললেন, অর্ধেক সালতানাত।

ইবনু সিমাক বললেন, যদি এই পানি পান করার পর তা বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় (প্রস্রাবের পথ), তাহলে এই সমস্যার সমাধানের জন্য আপনি কী করবেন?

হারুন বললেন, বাকি অর্ধেক সালতানাত দিয়ে দেবো।

এই কথা শুনে ইবনু সিমাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
সুতরাং যে সালতানাতের মূল্য এক পেয়ালা পানির সমপরিমাণ, সেটার এমন যোগ্যতা কোথায়, যার প্রতি লোভ করা যায়।

এই কথা শুনে বাদশা হারুন কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে গেলেন।"

টিকাঃ
২২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৪২।
২৩. সুরা আল-ফজর ৮৯: ২০।
২৪. সুরা আল-হাদিদ ৫৭: ২০।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পৃথিবীকে তার প্রাপ্য গুরুত্বের বেশি দিয়ো না

📄 পৃথিবীকে তার প্রাপ্য গুরুত্বের বেশি দিয়ো না


আমি দুনিয়াকে ঘৃণা করতে বলছি না। তবে দুনিয়া যে-রকম তাকে ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করো। অর্থাৎ ক্ষণিকের দুনিয়াতে ক্ষণিকের পথচারী হয়ে থাকো। নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, চাহিদা, কামনা-বাসনাকে সামান্য সময়ের জন্য যেভাবে প্রয়োজন সেভাবেই সাজাও। এর অতিরিক্ত চাইতে যেয়ো না, এর অতিরিক্ত ভাবতেও যেয়ো না; নতুবা এটা তোমাকে তোমার উদ্দেশ্য থেকে নিজের ভেতরে গ্রাস করে নেবে।

পৃথিবীর এই ব্যস্ততা তার ধ্বংসের দিন পর্যন্ত চলমান থাকবে। শুধু এতে তোমার আর আমার কোনো অংশ থাকবে না। আমরা হারিয়ে যাচ্ছি রোজ, আমরা চিরতরেই হারিয়ে যাব। নির্দিষ্ট একটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এরপরেই পৃথিবী এবং এর মধ্যকার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু তুমি তো এরপরেও পৃথিবীকেও নিজ গন্তব্য মনে করছ, নাহলে অনবরত এই ছুটে চলা কীসের?

দৈনিক ১৩-১৪ ঘণ্টার হাড়ভাঙা পরিশ্রম শুধু আরেকটু বেশি অর্থ জমানোর আশায়। অথচ আমাদের জন্য তো সামান্য বেঁচে থাকার মতো উপকরণ হলেই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু উচ্চ প্রত্যাশা আমাদের চোখে কাঠের চশমা পরিয়ে রেখেছে। মানবতা আর মনুষ্যত্ব হারিয়ে আমরা কেবল কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। এক ইলাহের ইবাদত পরিত্যাগ করে ঠুনকো কাগজের আনুগত্য করে যাচ্ছি।

আমার কথা বিশ্বাস না হলে ফজরের সময় যে-কোনো মসজিদে যাও। দেখো ফজরের জামায়াতে মুসল্লিদের অবস্থা কি! দেখো, কয়জন তাদের প্রেমময়ী দুনিয়ার উষ্ণ কোল ছেড়ে আল্লাহর দাসত্বকে বেছে নিয়েছে।

মুখে মুখে সকলেই স্বীকার করে যে, আল্লাহ প্রকৃত রিজিকদাতা, আল্লাহ তাআলাই মানুষের জীবন এবং মৃত্যু নির্ধারণ করেন। কিন্তু দিনের বেলা আল্লাহকে প্রতিপালক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ফজরের সময় সে নাক ডেকে ঘুমিয়ে থাকে। আজান কানে এলে, কানে বালিশ চেপে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সকাল ৬টা বাজার সাথে সাথেই সে তার সমস্ত সুখ ফেলে বিছানা থেকে জাগ্রত হয়। সিগারেট জ্বালিয়ে হাঁটতে বের হয়। কেউ অফিসের কাজে বেরিয়ে যায়। তার গন্তব্যের বাস যদি রাত ৩টায় ছাড়ে, তবুও সে নিজের সমস্ত ঘুম আর কাজ ছেড়ে ১টা বাজার পূর্বেই বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে যায়। কারও এই আচরণ থেকে কী বোঝা যায়? সে কি আল্লাহকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে না কি দুনিয়াকে?

আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি, যারা সপ্তাহে সাত দিনই কাজ করে, দিনে বারো ঘণ্টা। দীনের জন্য তার কোনো সময় নেই, সালাতের জন্য তার কোনো সময় নেই। দীনের কথা বললেই সবসময় 'আমি ব্যস্ত, আমি ব্যস্ত আর আমি ব্যস্ত'। কিন্তু কেন এত ব্যস্ততা?

আলহামদুলিল্লাহ, তোমার তো থাকার জন্য ঘর আছে। বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট খাবার আছে। কিন্তু তবুও তুমি নিজের জন্য সম্পদ জমিয়েই সন্তুষ্ট নও কেন?

এখন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি সম্পদ প্রয়োজন, আরও ভালো ঘর বানিয়ে রেখে যেতে হবে। যেন সন্তান তার চাইতে আরেকটু বেশি দুনিয়াকে ভোগ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তো তোমার থেকে এসব চান না। তবুও যদি তুমি আল্লাহর চাওয়ার বিপরীতে যাও, তখন কী হবে জানো?

তোমার সন্তানের জন্য রেখে যাওয়া সম্পদ, ঘরবাড়ি তোমার পরিবারকে ধ্বংস করে দেবে। আমি এমন পরিবারের কথা জানি, যেখানে বাড়িসংক্রান্ত সমস্যা নিয়েই ২০ বছর ধরে এক ভাই আরেক ভাইয়ের সাথে কোনো কথা বলেনি। মানুষ তো নিজেকেই পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারে না, সেখানে কীভাবে সে অর্থসম্পদ ধরে রাখার কল্পনা করতে পারে!

এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় হলো, পরস্পরের মাঝে দুনিয়ার বাস্তবতা নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করা। দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষা কমানোর জন্য দুনিয়াবিমুখ আলিমদের মজলিসে বসা। প্রজ্ঞার সাথে নিজের চিন্তা-চেতনাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলতে চেষ্টা করা। পুরোপুরি দুনিয়া ছেড়ে দিতে কেউ বলছে না। তবে যতটুকু প্রয়োজন তার জন্য প্রচেষ্টা করতে থাকো। অধিক আশা করা থেকে বিরত থাকো।

একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন, আমার কথার ভুল বিশ্লেষণ করে অনেকে ভাবতে পারো, দীন অনুসরণ করতে হলে দুনিয়াকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে।
আসলে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, দুনিয়াকে ছেড়ে দিলে তুমি আখিরাতের পাথেয় জমাবে কীভাবে?

দুনিয়াতে থেকেই, দুনিয়ার উপকরণ গ্রহণ করেই তোমাকে আখিরাতের জন্য পাথেয় জমাতে হবে। আরও সহজ ভাষায় বললে, তোমার শরীর থাকবে দুনিয়াতে, কিন্তু তোমার অন্তর থাকবে আল্লাহর কাছে। যেমন:
* তুমি স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে যাচ্ছ, যাও। কিন্তু হাত পা চালিয়ে এগিয়ে যাও; অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জীবন্ত রাখো। সেখানে গিয়ে যাতে তুমি কোনো পাপকর্মে লিপ্ত না হও, সেদিকে লক্ষ রাখো, তোমার চোখ সংযত রাখো。
* অফিসে যাচ্ছ, যাও। কিন্তু শরীরকে রিকশা বা গাড়ির ওপর রাখো; অন্তরে আল্লাহর স্মরণ করো। তোমাকে দিয়ে যেন কোনো খেয়ানত না হয়, তার খেয়াল রাখো。
* ব্যবসা করছ, করো। কিন্তু কাউকে যেন ধোঁকা না দাও, খেয়াল রাখো。

এই যে খেয়াল রাখাটা, এই যে অন্তরে অন্তরে আল্লাহকে প্রাধান্য দেওয়াটা— এটাই তোমার আখিরাত, এটাই হলো দীন। ইসলাম কাউকে বলেনি, সবকিছু ছেড়ে জঙ্গলে যাও। এই বৈরাগ্যবাদকে শরিয়ত হারাম করে দিয়েছে।

সুতরাং আমি তোমাকে বাহ্যিক দিক থেকে দুনিয়াবিমুখ করতে চাচ্ছি না। আমি চাই তুমি অন্তরের দিক থেকে দুনিয়াবিমুখ হও। কেননা আসক্তি অন্তর থেকে হয়; শরীর দিয়ে নয়। এই আলোচনা দ্বারা অন্তরের আসক্তি দূর করাই আমার মূল উদ্দেশ্য; বাহ্যিক কাজকর্ম থেকে তোমাকে সরিয়ে দেওয়া নয়।

আর আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনোই আমাদের দুনিয়াকে ঘৃণা করা শেখাননি; বরং এর প্রকৃত বাস্তবতা বুঝিয়ে তিনি আমাদের দুনিয়ার প্রতি অন্তর পুরোপুরি ঝুঁকে যাওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। কীভাবে উত্তম বিষয়গুলো গ্রহণ এবং অনর্থক কর্ম বর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, তিনি আমাদের তা শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন, একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

'অবশ্যই তুমি তোমার পরিবারকে (মোটামুটি) সচ্ছল বানিয়ে যাও, যা তাদের জন্য মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে উত্তম।'[২৬]

এ ছাড়া আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,

'দুনিয়া ও তার মাঝের সকল কিছুই অভিশপ্ত। কিন্তু আল্লাহ তাআলার জিকির এবং তার সাথে সংগতিপূর্ণ অন্যান্য আমল, আলিম ও ইলম অন্বেষণকারী এর ব্যতিক্রম।' [২৭]

সুতরাং দুনিয়াকে কেবল তোমার প্রয়োজন বানাও; প্রিয়জন নয়।

হাসান আল-বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

'হে যুবকেরা! তোমরা অবশ্যই আখিরাত অর্জনে মনোযোগী হও। তোমরা এটাই মনেপ্রাণে কামনা করো। কেননা আমরা দেখেছি, যারা আখিরাত কামনা করেছে, তার অধিকাংশই আখিরাতের সাথে সাথে দুনিয়াও পেয়ে গেছে। তবে এমন কাউকে দেখিনি, যে দুনিয়া কামনা করেছে আর তার সাথে আখিরাতও পেয়েছে।' [২৮]

টিকাঃ
২৫. তারিখে তাবারি: ৮/৩৫৭১।
২৬. সহিহুল বুখারি: ১২৯০; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮।
২৭. সুনানুত তিরমিজি: ২৩২২; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১১২।
২৮. সুনানুল বায়হাকি, কিতাবুয যুহদ: ১২।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 সাহাবিদের মানসিকতা

📄 সাহাবিদের মানসিকতা


আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কথা কে না জানে! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তার ভালোবাসা এত বেশি ছিল যে তাকে 'মাজনুনুস সুন্নাহ' উপাধি দেওয়া হয়েছিল, যার অর্থ হলো, সুন্নাহপ্রেমী।

আমাদের মতো দু-একটা সুন্নাহ অনুসরণ করে তৃপ্তিতে ভোগার মতো ভালোবাসা তার ছিল না। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল আদেশ-নিষেধ পালনের সাথে সাথে তাঁর প্রতিটি আচরণ এবং পদচিহ্নকেও অনুসরণ করতেন। হজের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেখানে বিশ্রাম নিতেন, তিনিও সেখানে বিশ্রাম নেন। রাসুল যেভাবে মেহেদি মাখতেন, তিনিও সেভাবে মেহেদি মাখেন। রাসুলের অনুসরণ করতে গিয়ে তিনি পশমবিহীন জুতো পরতেন।

তিনি একবার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কোনো এক স্থানে পৌঁছানোর পর হুট করেই মাথা নিচের দিকে নামিয়ে আবার ওপরে তুললেন।

অথচ এই স্থান সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল। তার সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করলো, এ-রকম আচরণের কারণ কী?

তিনি বলেন, অনেকদিন আগে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর সঙ্গে এই পথ ধরে যাচ্ছিলাম, তখন এই স্থানে একটা গাছ ছিল। গাছের একটা ডাল নিচের দিকে ঝুঁকে থাকায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মাথা নিচু করে এই পথ অতিক্রম করেছিলেন। আজকে এখানে গাছটি আর নেই। তবুও আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই ছোট্ট পদচিহ্ন অনুসরণ না করে সামনে এগোতে চাই না।

📘 উদ্দেশ্যহীন আর কতদিন > 📄 পার্থিব জীবন এক সফর

📄 পার্থিব জীবন এক সফর


তুমি যখন কোথাও ভ্রমণের ইচ্ছা করো, তখন নিজের সাথে কী কী নাও? কেবল প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো, তাই না?

তুমি কিন্তু নিজের ঘরের সমস্ত কিছু নিয়ে ভ্রমণ করতে বের হও না। তোমার ব্যাগে কেবল প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকে। কিন্তু সেখানেও কেবল বাছাই করা অপরিহার্য উপকরণগুলোই স্থান পায়। তুমি কখনো গ্রীষ্মের মৌসুমে শীতের পুরু কাপড় সাথে নেবে না। তুমি কেবল তোমার সাথে ততটুকুই বহন করবে, যতটা তোমার অপরিহার্যভাবে প্রয়োজন।

এটাই হলো পৃথিবী এবং এর প্রয়োজনের সঠিক মাত্রা! কিছু বিষয় থাকে মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন, কিছু বিষয় বেশি প্রয়োজন, আর কিছু থাকে অপরিহার্য প্রয়োজন। তোমার কাছে সবগুলো ক্রয়ের সামর্থ্য থাকলেও অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করাই সুন্নাহর অনুসরণ। আজকের পৃথিবীতে না চাইলেও মানুষকে এ বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কেননা বাজারের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোও সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। যেখানে তারা স্বাভাবিক প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো নিত্যদিনই ক্রয় করত, সেখানে আজ কেবল অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করছে। আর তুমি যদি মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ হও, তবে তোমার জন্য অবস্থা আরও করুণ। তাই হিসাব করেই চলো, তবে চলার উদ্দেশ্য রাখো 'সুন্নাহ'। তাহলে বাধ্য হয়ে অপরিহার্য প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকাটাও তোমার জন্য সুন্নাহের অনুসরণ হিসাবে লিখিত হবে。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00