📄 দাসের সম্পর্ক
মেঘে মেঘে বেলা গড়িয়েছে অনেক দূর। সেদিনের কচি হাত-পা শক্তপোক্ত হয়ে এত দিনে হাড় হয়তো ক্ষয়েও যেতে শুরু করেছে। ১৫ বছর বয়স থেকে শুরু হওয়া আমলনামার পাতায় পাতায় পাপ, অপকর্ম, অশ্লীলতা, অবাধ্যতা, অহংকার ছাড়া আর কিছুই নেই! আজ অবধি পুরো হিসাব মেলাতে বসলে কোনোভাবে কি মুক্তির আশা করা যায়?
এরপরেও সবচেয়ে বড় সুখের বিষয় হলো, তুমি-আমি এখনও পৃথিবীতে শ্বাস নিচ্ছি, এখনও আমরা বেঁচে আছি। এখনও খানিকটা বোনাস সময় আছে হাতে। তাই অন্য কিছু বা অন্য কারও কথা ভেবে নিজের অবশিষ্ট জীবনটুকু, বোনাসটুকু খরচ করে ফেলো না। এবার অন্তত তুমি 'তোমাকে' সময় দাও, নিজের কথা ভাবো, তোমার হৃদয় গহনে একবার চেয়ে 'নিজেকে' খোঁজো। দেখো এই শরীরের খাঁচার ভেতরে যে 'তুমি'-টা, সে কেমন আছে।
তারই সাথে আরেকটি ভাবনা যোগ করে নাও। তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে তিল তিল করে সাজানোর পেছনে, তোমাকে শ্রেষ্ঠ গড়নে সৃষ্টি করার পেছনে, তোমাকে পৃথিবীতে এখনও রাখার পেছনে যে কারণ, যে উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন, তাও ক্ষণিকের তরে অনুভব করে দেখো। তিনি তাঁর পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ.
'আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদাত করবে।'[৪]
তুমি হয়তো এই কারণটা জানোই আগে থেকে, কিন্তু মানতে পারছ না। অথচ মানতে না পারার পেছনের কারণটা কখনও খুঁজেও দেখলে না। কীসে তোমাকে নিজের মহান স্রষ্টা থেকে দূরে সরিয়ে দিলো, তা নিয়ে আজ পর্যন্ত কি একটুও ভেবেছিলে?
থাক! অতীত ভুলে যাও। চাইলেও যেটা বদলে ফেলা যায় না, তা নিয়ে পড়ে থাকাটা বোকামি। আর ভবিষ্যৎকে তো ছুঁয়ে দেওয়াই যায় না; তার কাছে পৌঁছানোর আশা করেও বা কী লাভ! তুমি বরং আজকের কথা ভাবো। এ মুহূর্তেই বইয়ের পাতা হতে চোখটা সরিয়ে ভেবে দেখো তো-কী এমন আছে, যা তোমার আর তোমার স্রষ্টার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বারবার; কেন তুমি ইচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর দিকে যেতে পারছ না; কেন কারও অন্তরে নিজের রবের দিকে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাটাও জাগ্রত হয় না। ভাবতে থাকো...।
এরপর ভাবনাগুলো গুটিয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নাও। কোনটা তোমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? আল্লাহ, না কি তোমার অন্তরের সেই বিশেষ ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা-অনুভূতি-যেটা তোমার মহান স্রষ্টা আর তোমার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
সবার সমস্যা ভিন্ন ভিন্ন। তাই নিজ থেকেই তোমার সমস্যাটা খুঁজে বের করে রাখো। সমাধান করতে পারো বা না পারো, অন্তত তুমি এইটুকু তো জানবে, কী তোমার থেকে তোমার সব সুখ কেড়ে নিল। যার অন্তর থেকে স্রষ্টা হারিয়ে যায়, তার কি সত্যিই আর কিছু হারানোর বাকি থাকে?
তোমার স্রষ্টা মহান আল্লাহ তাআলা তোমাকে ভালোবাসেন তাঁর সকল সৃষ্টির চাইতে বেশি। সবাই তাঁর সৃষ্টি হলেও তুমি হচ্ছো তাঁর 'দাস' বা 'গোলাম'। শব্দটা দেখেই ঘাবড়ে যেয়ো না যেন। এই 'দাস' শব্দের মাঝেই স্রষ্টার সাথে তোমার সম্পর্কের বিশাল গভীরতা লুকিয়ে আছে।
ভেবে বলো তো, রোজ কর্মক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসাথে সময় কাটানো মানুষটা তোমার কতটা প্রিয় হবে? ছেলেবেলা থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা কেমন হবে? স্ত্রীর সাথে মানুষের ঘনিষ্ঠতা কত বেশি হয়? আর সন্তানের প্রতি স্নেহ? পিতামাতার সাথে সন্তানের বন্ধন কি কেউ ভাঙতে পারে?
তবে পৃথিবীতে আরেকটা সম্পর্ক ছিল, যুগের পালাবদলে যা আজ হারিয়ে গেছে।
এ যুগের মানুষ যদিও দাসপ্রথার সাথে এখন আর পরিচিত নয়। তবে তোমাকে জানিয়ে রাখি, পৃথিবীর অন্য সব সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, আবেগ, মায়া। কিন্তু মনিব আর দাসের সম্পর্কে লুকিয়ে রয়েছে হাজারো রহস্য।
যেমন দেখো, একজন দাস কমবয়সি হলে মনিব তাকে সন্তানের মতোই ভালোবাসে, সমবয়সি হলে মনিব তার সাথে বন্ধুর মতোই আচরণ করে, নারী হলে তার সাথে স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে তোলে। একজন অনুগত দাস তার মনিবের সাথে সারাক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকে। ঘরে কিংবা বাইরে মনিব তার আপনজন থেকে দূরে গেলেও দাসকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যায়। মনিব থেকে তার দাস কখনও আর কোনো অবস্থাতেই পৃথক হয় না।
পৃথিবীর সবাই স্বার্থ খুঁজলেও একজন দাস হয় নিঃস্বার্থ। সবাই সম্পদে সুখ পেলেও দাস কেবল তার মনিবের সামান্য ভালোবাসা আর গুরুত্ব পেলেই আকাশ-সমান সুখ লাভ করে। মৃত্যু ছাড়া মনিব তার দাসের সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারণ করে। মনিবের সকল আদেশ সে নির্দ্বিধায় মেনে নেয়, ভালোবাসা দিয়ে তা সম্পন্ন করে। পৃথিবীতে একজন দাসের মনিব ছাড়া আর কেউ থাকে না, মনিব হয় তার পৃথিবী। তাকে কেন্দ্র করেই তার সমস্ত জীবন আবর্তিত হতে থাকে। তাকে সন্তুষ্ট করতেই সে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেয়।
মরুভূমির তপ্ত বালুতে মাইলের পর মাইল উটের রশি ধরে সে হেঁটে যেতে থাকে, কিন্তু তার মনিবকে একমুহূর্তের জন্যও কষ্ট পেতে দিতে চায় না। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, মনিবের জন্য কষ্ট ভোগ করাই তার কাছে সর্বোচ্চ সুখ! সত্যিই এই দাসত্ব বড় রহস্যের!
কিন্তু এটা তো মানুষে মানুষে মনিব-দাস সম্পর্ক। মনিব যদি হন স্বয়ং রব্বুল আলামিন, তাহলে তার ভালোবাসা কেমন হবে? আর দাস যখন মানুষ, তার দাসত্বের মাঝে কতটা আনুগত্য আর ভালোবাসা থাকা উচিত?
পৃথিবীতে বাজার থেকে 'কেনা' দাসের ওপর মনিবের যদি 'মৃত্যু ব্যতীত' অন্য সব অধিকার থাকে, তবে যে মনিব তোমাকে আর আমাকে 'সৃষ্টি' করেছেন দাসত্বের জন্য, আমাদের 'মৃত্যুও যিনি নির্ধারণ করেন'- আমাদের ওপর তাঁর অধিকার কত বেশি?
পৃথিবীর মনিব মুখে কিছু বলার আগেই যদি দাস তাকে সন্তুষ্ট করতে তার ইচ্ছা পূরণ করে দেয়। দাস-মনিব সম্পর্ক বাদ দাও। অফিসের বস, বড় নেতা, এমপি সাহেব, মন্ত্রী সাহেবদের কথাই ভেবে দেখো। মুখ থেকে হুকুম পড়তে দেরি, হুকুম তামিল করতে দেরি নেই। হরদম তক্কে তক্কে থাকে সবাই: স্যারের এখন কী দরকার, মন বুঝে মন জয় করার কী প্রতিযোগিতা! সেখানে আল্লাহ, আমাদের স্রষ্টা, আমরা যার বানানো সৃষ্টি, তিনি আদেশ দিয়ে দিয়েছেন তাঁর ইসলাম মানতে, জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর সন্তুষ্টির উপায়। এর পরেও এত অবাধ্যতা? তুমিই বলো, এই অবাধ্যতা কি সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে করা যায়? যিনি চাওয়ামাত্র আমার জীবন হয়ে যেতে পারে দোজখ, সেই মহাশক্তিধরের সাথে এই ঔদ্ধত্য কি নিদারুণ বোকামি, ভেবেছ কখনো?
আনুগত্যের এত অধিকারের পরেও তিনি কখনও আমাদের বাধ্য করেননি তাঁর আদেশ মানতে। দাস হিসেবে বানিয়েও দাসত্ব করাতে নিজের কাছে আটকে রাখেননি। পৃথিবীতে একটু রেখে বিশ্বস্ততার পরীক্ষা নিতে চেয়েছেন কেবল। তাতেই দাসেরা বিশ্বাসঘাতকতা করছে নিজ মনিবের সাথে! দুনিয়ায় এসে সামান্য ছাড়া পেয়েই তাকে আর মনিব হিসাবে মানতে চাচ্ছে না। তাঁরই খেয়ে, তাঁরই পরে, তাঁরই দেওয়া অক্সিজেন গ্রহণ করে, তাঁর সূর্যের আলোয় ফসল ফলিয়ে একটু হাত পা চালানোর শক্তি পেয়ে মানুষ এখন নিজেই মনিব হতে চায়। কিন্তু বোকা মানুষের দাসত্ব করার অভ্যাসটা কোনো দিনও যাবে না। তার সফটওয়্যার তো দাসের, বানানো হয়েছেই দাসত্বের জন্য। তাই মালিককে সে অস্বীকার করেছে ঠিকই, কিন্তু নিজের ভেতরে থাকা প্রবৃত্তির দাসত্ব করেই যাচ্ছে! নিজে মালিক হতে গিয়ে হয়েছে নিজেরই দাস!
এতকিছুর পরেও মহান রব্বুল আলামিন মানুষকে ছাড় দিয়ে রেখেছেন। তাঁর চূড়ান্ত অবাধ্যতা সত্ত্বেও তিনি মানুষের ওপর নিজের অধিকার প্রয়োগ করেননি। ক্ষমতাবান হয়েও মিছে ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর দুর্বল দাসগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেননি। কারণ আমরা তাঁর ভালোবাসার সৃষ্টি। মানুষের প্রতি এত অসীম যাঁর ভালোবাসা, মানুষ তাকেই ভালোবাসতে চায় না! মানুষের প্রতি যাঁর এত মায়া, মানুষ তাকে বাদ দিয়ে মজে আছে অন্য কোনো মায়ায়!
আচ্ছা, তুমিও কি বাকি সবার মতোই অকৃতজ্ঞতাকেই বেছে নিলে? না কি বেছে নেবে মহান মনিবের আনুগত্যকে?
সারাদিন লাশঘরে শবদেহ ছিন্নভিন্ন করা যার পেশা, সেই পাষাণ হৃদয়ের মানুষটাও দিনশেষে ঘরে ফিরে নিজ সন্তানকে কোলে তুলে নেয়, স্ত্রীকে আগলে রাখে ভালোবাসায়, মায়ের মমতা খুঁজতে তার কোলে মাথা গুঁজে দেয়। তোমার-আমার হৃদয় তো অতটাও কঠিন নয়। তবুও কেন আমাদের অন্তর এখনও তার রবের দিকে ফিরতে চায় না? কেন আমরা নিজের ভেতরের পবিত্র সত্তাকে প্রবৃত্তির বন্দিশালা থেকে মুক্ত করতে পারছি না?
যে আমাকে ভালোবাসে না, তার ভালোবাসা পেতেই আমি ব্যস্ত। যা কিছু আমার হতে চায় না, আমি তাকেই আমার মনে করে বসে আছি। কিন্তু যিনি রোজ রাতে ডেকে ডেকে বলেন, 'ও আমার বান্দারা! ও আমার গোলামেরা! কার কী লাগবে নিয়ে যাও।' আমরা তাকে শুনতেই চাই না, দুনিয়াপ্রীতি আর বেঘোর ঘুম আমাকে কী সুখ থেকে বঞ্চিত করে প্রতিরাতে, যদি তা আমরা জানতাম! যেন জান্নাতের চাবি হাতে তুলে দেওয়ার পরেও তা ফেলে জাহান্নামের চাবি হাতে নিয়ে বলছি, 'আমি আগে জাহান্নাম ঘুরে আসতে চাই!'
এখন 'তুমি' কী করবে বলো? নিজের চিরঞ্জীব প্রকৃত মনিবের দাসত্ব করবে, যিনি সব প্রয়োজন পুরা করেন? না কি তোমার ক্ষণস্থায়ী আকাঙ্ক্ষার, যা তোমাকে দিনশেষে অনুতাপই এনে দেয়?
আমি বলি কি, বেশি ভাবতে যেয়ো না। ভাবনার জালে আটকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই না-জানি কখন তোমার ভাবতে পারার শক্তি কেড়ে নেওয়া হয়। তুমি বরং এই মুহূর্তেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও। সংকল্প করে নাও। পা বাড়ানোর আগে যদি তোমাকে পৃথিবী থেকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়, অন্তত ফিরে আসার সেই সংকল্পটাই তোমাকে মুক্ত করে নেবে ইন-শা-আল্লাহ।
পৃথিবীর সব সুখ যদি ইসলামেই থাকে, তবে কখনো কি ভেবেছ, অনেক মুসলমানও অসুখী কেন?
আচ্ছা, সাইকেল কেনা হলেই কি কেউ গন্তব্যে পৌঁছে যায়, না কি তাকে গন্তব্য পর্যন্ত যেতে হয় সেটাকে চালিয়ে?
আজ ইসলামকে, ইসলামের আদর্শকে মৌখিকভাবে মেনে নিলেও মুসলিমরা নিজেদের ভেতরে তা ধারণ করতে পারেনি। সেজন্যই আমাদের মতো অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে রোজ। পৃথিবীতে থেকেও তারা যেন নেই। কৃত্রিম রঙচঙা জগৎগুলোকেই তারা নিজের জীবন বানিয়ে নিয়েছে। সে জীবনের সবকিছুই কেমন এলোমেলো। কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কেন করছে, কার জন্য করছে— কিছুই সে জানে না। তার ভেতরে যখন যে ইচ্ছা জাগে, তা পূরণ করতে পারাই যেন এই জীবনের উদ্দেশ্য। জীবন যেন একটা আবর্জনার গাদা।
আমার অবস্থাও বেশ করুণ ছিল শুরুর দিকে। নিজের ভাবনার জগতে আমার নিজেরই প্রবেশের অনুমতি ছিল না। কে যেন ভাবনার দরজা থেকেই আমাকে মিথ্যা আশা দেখিয়ে অন্য কোথাও ডেকে নিয়ে যেত। চিন্তাহীন জিজ্ঞাসাহীন এক চতুষ্পদ জীবন। কিন্তু স্রষ্টার ইচ্ছাকে রোখার সাধ্য কার?
সব আঁধার ভেদ করেই আমি আলোর খোঁজ করতে লাগলাম। সব বাধার দেয়াল ভেঙে নিজের রবের কাছে ফিরতে চাইলাম। তারপর?
একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে সূর্যরশ্মি প্রবেশ করে যেভাবে সমস্ত ঘর প্লাবিত করে দেয়, আমার ভেতরে থাকা সামান্য পবিত্রতার ছিদ্র দিয়ে তেমনই হুড়মুড়িয়ে অন্তরে প্রবেশ করতে লাগল নূরের ছটা। হিদায়াতের নুর। একটা সময় কালরাত্রির আঁধার কেটে গিয়ে চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল সত্যরা।
কিন্তু আমার অবস্থা ততক্ষণ অবধি বদলায়নি, যতক্ষণ না আমি অবাধ্যতা ছেড়ে দিয়ে অনুশোচনার আগুনে পুড়ে নিজেকে নিজে শোধরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অন্ধকার থেকে বের হওয়ার জন্য যতক্ষণ না প্রথম কদমটা আমি নিজে ফেলেছি; আলোর খোঁজ ততক্ষণ পর্যন্ত আমার মেলেনি।
তুমিও কেবল বাহ্যিক দু-একটা বিষয় পরিবর্তন করেই নিজের ভেতরে আলোর অনুভব পাবে না। ভেতরের যে অপবিত্রতা তোমাকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, তার সবটুকু বিসর্জন দিয়ে দাও। এবার দেখো-অন্তর-বাহির জোছনায় সয়লাব, আলোর বান।
ইমানের আলো পবিত্র জিনিস। সবার অন্তর এই পবিত্র আলোকে ধারণ করতে পারে না। ধারণ করার অর্থ হলো, মৃত্যু পর্যন্ত এই নুরকে নিজের ভেতরে ধরে রাখা। এই নুর তোমার ভেতরে প্রবেশের পর তাকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে তোমার সমগ্র সত্তাকেই পবিত্র করে ফেলতে হবে; নতুবা অপবিত্রতার ঝড়ো হাওয়ায় দ্রুতই নিভে যাবে তোমার পবিত্র আলো।
ধরো, তোমার পুরো দেহটা হলো একটা চিমনি (হারিকেনের কাচ), ভেতরে থাকা অন্তর হলো প্রদীপ; আর সেই প্রদীপের জন্য প্রয়োজনীয় পবিত্র তেল হলো তোমার অশ্রুকণা। তোমার অন্তরের প্রদীপে ইমানের পবিত্র আলো সংরক্ষণ করতে চাইলে তোমার সমস্ত সত্তার পবিত্রতা প্রয়োজন。
* দেহের অপবিত্রতা হলো—হারাম খাদ্যগ্রহণ। হারাম খাবারের ফলে দেহ অপবিত্র হয়ে যায়, তাই হালাল খাবার গ্রহণ করো。
* অন্তরের অপবিত্রতা হলো—পাপ। পাপের কারণে তোমার অন্তরের প্রদীপ আলোধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তাই পাপ থেকে বিরত থাকো।
আর অশ্রুর অপবিত্রতা হলো— অবৈধ দৃষ্টি ও নিষিদ্ধ অনুভূতির অশ্রু। তাই অন্তরের পবিত্র তেলের জন্য তোমাকে আল্লাহর কাছে কাঁদার চেষ্টা করতে হবে, দীনে ফেরার আকুতি নিয়ে কাঁদতে হবে; নতুবা চিমনি আর প্রদীপ থাকার পরেও তেলের অভাবে কিংবা নোংরা ভেজাল তেল দিয়ে ইমানের আলো জ্বলবে না।
এভাবে যখন তোমার সমগ্র সত্তা দীনের আলো ধারণ করতে তৈরি হয়ে যাবে, তখন এই পবিত্র আলো তোমার ভেতরে স্থায়ী হবে ইন-শা-আল্লাহ। অর্থাৎ তুমি দীনের ওপর অবিচল থাকতে পারবে।
কিন্তু সতর্ক থেকো, কেননা তুমি এমন পরিবেশে আছ, যেখানে বাইরে অনবরত ফিতনার ঝড়। কখন কোত্থেকে কী উড়ে এসে তোমার সত্তাকে অপবিত্র করে দেয়, তোমার অন্তর নষ্ট করে দেয়, চোখের পবিত্র অশ্রুর মাঝে আবর্জনা মিশিয়ে দেয়— তা তুমি জানো না। তাই ঝড়ের মাঝে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে ঘরে থাকাই উত্তম।
তবে বাইরে না গিয়ে যেহেতু আজকের পৃথিবীতে চলা অসম্ভব, তাই বের হওয়ার আগে নিজের চারপাশে দুআ এবং ইবাদতের সুরক্ষাপ্রাচীর দিয়ে নিয়ো। খোলা চিমনি নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ো না; নয়তো সকালে আলো নিয়ে বেড়িয়ে গেলেও বিকেলে আলো খুইয়ে ঘরে ফিরতে হবে অন্ধকার নিয়ে।
টিকাঃ
৪. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১: ৫৬।
৫. ইউরোপ আমেরিকা দাসপ্রথার নিকৃষ্টতম নজির স্থাপন করেছে। দাসকে কেবল পুঁজি বৃদ্ধির মেশিন হিসেবে অমানবিক আচরণ করেছে, ফলে দাস শব্দটার অর্থই গেছে বদলে। মুসলিমবিশ্বে দাস-মনিব সম্পর্কটা ছিল ১৮০ ডিগ্রি উলটো। বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন : 'ইসলামে দাস-দাসী ব্যবস্থা', ডা. শামসুল আরেফীন, মাকতাবাতুল আযহার।
৬. অবিশ্বাস্য মনে হলেও মুসলিমবিশ্বে দাসপ্রথাটা ছিল এমন। ইতিহাসবিদ Gustave le Bon, Anthony Reid, Yale University-র ইতিহাসের প্রফেসর Robert Harms, তেল-আবিব ইউনিভার্সিটির প্রফেসর Ehud Toledano, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপিকা Shaun Marmon, Ohio state University-র ইতিহাসের প্রফেসর Robert C. Davis, ইহুদি প্রাচ্যবিদ Ignaz Goldziher, সুইডেনের গটেনবার্গ ইউনিভার্সিটির আরবি সাহিত্য ও ইতিহাসের অধ্যাপক Pernilla Myrne, প্রফেসর Suzanne Miers এবং Igor Kopytoff সহ Slavery Studies এর আধুনিক স্কলারদের মত এটা। এ ছাড়াও ফরাসি ফটোগ্রাফার Jules Gervais-Courtellement, ব্রিটিশ পর্যটক Charles Montagu Doughty, পর্যটক Wilfred Thesiger, ব্রিটিশ পর্যটক রিচার্ড বার্টন ও Eldon Rutter, কলোনিয়াল আলজেরিয়ার প্রথম ফরাসি গভর্নর Thomas Bugeaud-সহ বিভিন্ন পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনিতে এমন চিত্রই উঠে এসেছে মুসলিমবিশ্বে দাসপ্রথার। বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন: 'ইসলামে দাস-দাসী ব্যবস্থা', ডা. শামসুল আরেফীন, মাকতাবাতুল আযহার।
📄 বোন! কেন তুমি গন্তব্যহীন?
আজকের পৃথিবীতে পুরুষের মতো নারীরাও ভালো নেই। পুরুষের থেকে নারীদের অবস্থা আরও বেশি করুণ। পুরুষ নিজেকে ভুলে গিয়েও পৃথিবী কামিয়ে নিতে পারে। কিন্তু নারী পুরোপুরিভাবে নিঃশেষ হয়ে যায় একসাথে নিজের সত্তা আর শরীর হারিয়ে।
শেষমেশ স্রোতে ভেসে চলা মৃত তিমির মতো নারীও নিজেকে ভাসিয়ে দেয় জীবনের স্রোতে। ধীরে ধীরে অস্তিত্বে পচন ধরে। এত বেশি নিকৃষ্ট অবস্থায় পৌঁছায় যে, আশপাশের অন্য প্রাণগুলো পর্যন্ত তার দুর্গন্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমাদের অনেক বোন আজ উদ্দেশ্যহীন হয়ে এভাবেই জীবনস্রোতে ভেসে বেড়াচ্ছে। স্রোত তাকে যখন যেভাবে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে, কচুরিপানার মতো সেও বয়ে যাচ্ছে স্রোতের সাথে। কিন্তু এই বয়ে চলাটাকে জীবন বলে না। এটা অস্বাভাবিক, অসুস্থ, বিকৃত ও বিক্রীত এক জীবন। দুনিয়ার আবর্জনা এসে জোটে কচুরিপানার এঁদো ডোবায়।
তবে বিশাল সমুদ্রে মৃত তিমির পচনের চেয়ে জীবনসমুদ্রে নারীসত্তার পচন ঢের বেশি ক্ষতিকর। তিমির গলিত দেহ তো সমুদ্রের সামান্য অংশকে নষ্ট করে। আর নারীসত্তার পচনে নষ্ট হয় পুরো দুনিয়া। কেননা নারীই পুরো দুনিয়া।
আমার মুসলমান বোনকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, পৃথিবীর আকাশ-বাতাস বিষাক্ত করার মতো অতটা খারাপ পর্যায়ে বোন তুমি এখনও পৌঁছাওনি বটে। কিন্তু যে রাস্তা তুমি বেছে নিয়েছ, উদ্ভ্রান্তের মতো যে হ্যামিলনের বাঁশির পেছনে ছুটে চলেছ, সেই রাস্তা তোমাকে নিয়ে ফেলবে সেই ভাগাড়েই।
তুমিও আজ ভেতরে ভেতরে মৃতপ্রায়। পুরুষের মতো তুমিও নিজেকে হারিয়ে ফেলেছ। তোমার বাইরের চাকচিক্যময় এই রঙিন আবরণটাই প্রকাশ করে দিচ্ছে, তোমার ভেতরে কতটা আঁধার তুমি বয়ে চলেছ। সুখের নাটক মঞ্চায়নের বাইরে গ্রিনরুমে তুমি কতটা অসুখী। তোমার হেঁচড়ে চলা সুখের অভিনয় দেখে সবাই হাততালি দিলেও তুমি একেলাই শোনো নিজের বালিশ-চাপা কান্না।
শৈশব থেকেই অতিরিক্ত শাসন, অবজ্ঞা আর অসম্মানের বিষাদময় স্মৃতি তোমার সত্তাকে হত্যা করেছে। আপন মানুষগুলোও হয়তো তোমাকে আপন করতে চায়নি কখনো। খানিক মুক্তি পেয়েই সামান্য কিছুটা সুখের আশায় নিজের অন্তরকে তুমি অন্য কারও হাতে তুলে দিচ্ছ। কারও মিষ্টি কথা তোমার তপ্ত মনে যে এক পশলা বৃষ্টি নামায়, তার লোভে তুমি নিজেকে সঁপে দিচ্ছ পুরোপুরি। বিষণ্ণ মনে একটু সুখ আর স্নেহের পরশ পেতে তুমি ভেঙে ফেলছ সব সীমারেখা।
কিন্তু আফসোস! তুমি যাকে বিনামূল্যে নিজের এত দামি অন্তরটা দিয়ে দিয়েছ, সে তো তোমার পূর্ণতা চায় না; সে চায় তার নিজের চাহিদার পূর্ণতা। তার মাঝে তোমার অঙ্গের রূপ নিয়ে পাগলামো থাকলেও অবহেলিতই রয়ে যায় তোমার অন্তর।
আচ্ছা! তুমি এখনও কেন বুঝছ না, কোনো রকম দায়িত্ব ছাড়াই যে তোমাকে পেতে চায়, তার চাওয়া কখনোই 'পুরো তুমি' নও, বা তোমার অন্তর নয়। দায়িত্বের বন্ধন থাকলে তোমার সকল অধিকার পূরণ করা তার জন্য অনিবার্য ছিল। অথচ এই সম্পর্কের ভেতরে তো কোনো দায়দায়িত্ব নেই, বাঁধন নেই। যে- কোনো মুহূর্তেই তোমাকে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে।
এভাবে তোমার কাছে ছুটে আসার উদ্দেশ্য তুমি বা তোমার সুখ নয়; বরং সে নিজের জন্যই তোমাকে চায়। এই মিথ্যা প্রেম আলাদা কোনো অনুভূতির টান নয়। শরীর চলে শরীরের নিয়মে। হিংস্র পশু তার খাবারের চাহিদা পূরণের জন্য যেভাবে শিকারের পেছনে ছুটে যায়, এটা সেই একই কামনার ছুটে আসা—জৈবিক, আদিম, দেহজ তাড়না।
এই আবেগ তো দেহজ আকর্ষণেরই আরেক নাম। পরিণত বয়সে হরমোনের উচ্ছ্বাস। এ-রকম একটা ঠুনকো শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাঝে 'তোমার' গুরুত্ব কোথায়? আর কোথায় শরীর ও শারীরিক মিথস্ক্রিয়া পেরিয়ে 'তোমার অন্তরের অনুভূতির' মূল্য?
স্বার্থের জন্য তোমাকে যে কাছে টেনে নিল, সে স্বার্থ মিটে গেলে তোমাকে আজকের মতো সস্নেহে আগলে রাখবে, এ আশা কীভাবে করছ তুমি? কী তোমার এই দাবির ভিত্তি? এটা তো কামনার জোয়ার মাত্র, যাতে ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা হলো চূড়ান্ত প্রাপ্তি।
তবে তোমার সম্পর্কটা যদি অতটাও খারাপ অবস্থায় না থাকে, তুমি যদি মনে করো, তার সাথে সত্যিই তুমি সুখী, তাহলে শুনে রাখো, যে পুরুষ তার নিজের সত্তাকেই চেনে না, সে কী করে তোমার সত্তাকে পুরোপুরি গুরুত্ব দেবে? যে নিজের স্রষ্টার অধিকার পূরণ করে না, যার প্রতি সে সবচেয়ে বেশি ঠ্যাকা, সে কী করে তোমাকে তোমার অধিকার দেবে? যে নিজের আত্মতৃপ্তির জন্য তোমাকে দেখিয়ে লোকের প্রশংসা শুনতে চায়, তার কাছে সামনের জীবনে তুমি কীসের সম্মান আশা করছ?
পুরুষকেন্দ্রিক সমস্যা ছাড়াও আরও হাজার রকমের সমস্যা থাকে একজন নারীর জীবনে। কিন্তু যুগ অনুসারে আজকের নারীদের অধিকাংশ সমস্যাই পুরুষকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এর কারণটা পরে বলছি।
শৈশব থেকে নির্দিষ্ট একটা গণ্ডিতে আমরা বড় হই। সেই ছকেই ভাবতে শিখি, সেই সীমাকেই ভেবে নিই আমার দুনিয়া। নিজ ছাঁচেই সুখকে চিনি, চেনা সুখই খুঁজি। ফলে সুখী হওয়ার খুব বেশি উপায় বা উপকরণের কথা তোমার জানা হয়নি। সব ধরনের সুখ না চিনলেও সব ধরনের কষ্টের সাথে তোমাকে পরিচিত করাতে জীবন কিন্তু থেমে ছিল না। এইসব কষ্ট আর অবহেলারা তোমার অন্তরে ভিড় করে বাঁধিয়েছে নানা রকম অসুখ, অন্তরের অসুখ। না তুমি সেই অসুখগুলো মুছে ফেলতে পারছ, আর না পারছ চেনা পদ্ধতিতে একটু সুখী হতে। সব মিলিয়ে তোমার জীবন এক মস্ত বড় শূন্য—যাতে সুখ নেই, স্নেহ নেই, ভালোবাসা নেই, স্বস্তি নেই, যত্ন নেই, কিচ্ছু নেই। কখনো কখনো মনে হয়, এ-রকম জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে তো বরং মৃত্যুই শ্রেয়। তাই না, বলো?
না! মোটেই তা নয়। মৃত্যুর সাথে সাথেই মুক্তি, এ ধারণা চরম ভুল। মৃত্যুর পরের জীবনের যে যন্ত্রণা, তা সহ্য করার সাধ্য আমাদের কারোর নেই। আর চোখের সামনে সুখী হওয়ার উপায় থেকেও তা চিনতে না-পারাটা আমাদের নিজের অন্ধত্ব; এখানে জীবনের কোনো দোষ নেই।
বেশি জ্ঞানের কথা বাদ দিয়ে চলো, এবার তোমার জীবনের হিসাবটা একটু মিলিয়ে দেখি, ভুলটা আসলে কোথায় হয়েছে। কেন মানুষ হয়েও তুমি এখনও মানবিক সুখগুলোকে পুরোপুরি অনুভব করতে পারছ না। তোমার ভেতরে পৃথিবী বদলে ফেলার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন আজ তুমি নিজেকেই বদলাতে পারছ না। কীসের অভাবে নারী হয়ে জন্ম নিয়েও ঠিকভাবে নারী হয়ে উঠতে পারছ না।
সময়ের কাঁটায় কিছুটা পেছনে চলে যাই, চলো। ফুটফুটে চেহারা নিয়ে তোমাকে যে দিন প্রথমবার মায়ের কোলে রাখা হলো, বাবার চাইতে আর বেশি খুশি কেউ হয়নি। কন্যাসন্তানের প্রতি বাবাদের ভালোবাসা একটু বেশিই হয়। এরপর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেই তোমাকে নিয়ে শুরু শত আয়োজন। পুরো বাড়ি ব্যস্ত এই ছোট্ট মানুষটাকে নিয়ে। কিন্তু... একটু থামো তো এখানে!
তোমার জন্ম তো মুসলমান পরিবারে, তাই না?
বড় আশ্চর্যের ব্যাপার! জন্মের পর কেউ আজান কেন দিলো না? আহা! জীবনের সূচনালগ্নে নিজ স্রষ্টার নামটাও তোমার কানে দেওয়া হয়নি। চুম্বক যেমন উত্তর-দক্ষিণ বরাবর যতক্ষণ না হতে পারবে, ততক্ষণ অস্থির, অশান্ত; তেমনই মানুষের এই দেহ-মনের সিস্টেমটা যতক্ষণ তার স্রষ্টাকে চিনে নিজের এলাইনমেন্ট ঠিক করে নেবে, ততক্ষণ অশান্ত-অস্থির-অসুখী থাকবে। তোমার জীবনের শুরুটাই হয়েছে দিগ্ভ্রান্তি দিয়ে। এজন্যই মুসলিম পরিবারের সন্তান হয়েও তুমি সুখী হতে পারোনি। আসলে পরিবার মুসলিম হলেও ঘরের ভেতরে মনের ভেতরে ইসলামটা ঠিক 'থাকার মতো' ছিল না।
ঘরের ভেতর সব ভাইবোনেদের সাথে তুমি একসাথে বড় হয়েছ, একসাথে নাওয়া-খাওয়া-ঘুম-ওঠাবসা সব হচ্ছে। এর মধ্যে নারী-পুরুষের মধ্যকার স্বাভাবিক পার্থক্যটুকু তোমাকে কখনো বুঝতে দেওয়াই হয়নি। কানের কাছে রেকর্ড বাজানো হয়েছে: সবাই সমান। মীনা কার্টুনে দেখেছ: ছেলেরা যা, মেয়েরাও তা-ই; সব একই, কোনো পার্থক্য নেই।
একটু বড় হতেই শুরু হলো তোমার 'শিক্ষা'। তুমি এই প্রথমবার একা একা বাইরের দুনিয়ায় সময় কাটাবে। মাথার দুপাশে দুটো ঝুঁটি বেঁধে তোমাকে নিয়ে যাত্রা হল ক্লাসরুমে। নতুন এই পরিবেশ তোমার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। জানালা দিয়ে বার বার মায়ের দিকে তাকাচ্ছিলে। মা একটু আড়াল হতেই প্রচণ্ড ভয়ে কেঁদে দিয়েছিলে। এক দৌড়ে ক্লাসের বাইরে চলে গিয়েছিলে মায়ের কাছে। তুমি যে মা ছাড়া কিছুই বুঝতে না কোনো দিন।
তোমাকে ক্লাসের ভেতরে মন বসানোর জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হলো। অন্যান্য শিশুর সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো, তারা নাকি তোমার বন্ধু। তোমাকে তাদের সাথেই ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকতে হবে, খেলতে হবে। এখানেও কে পুরুষ, আর কে নারী — তা তোমাকে বোঝানো হয়নি। ফলে ছোট মেয়েদের সাথে সাথে ছোট ছেলেগুলোকেও তুমি নিজের বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিলে; যদিও তোমার আর তাদের মাঝে ছিল বিশাল এক স্বাভাবিক অনিবার্য পার্থক্য।
ধীরে ধীরে তুমি বেড়ে উঠতে থাকলে। স্কুল এখন তোমার সবচাইতে প্রিয় জায়গা। কেননা ওখানকার বন্ধুরা তোমাকে যতটা সুখ দেয়, গুরুত্ব দেয়; বাড়িতে তুমি অতটা গুরুত্ব পাও না। পড়াশোনার জন্য এবার তোমাকে স্কুলের বাইরের আলাদা কোথাও যেতে হয়, কোচিং ইত্যাদিতে। সেখানে আরও সব একাকার। ক্লাসরুমে তোমার থেকে দূরের বেঞ্চে বসা ছেলেটা এখন তোমার সাথেই বসতে পারে। এখানে তোমাদের বাঁধা দেওয়ার সাধ্য কারও নেই।
এভাবে শৈশব থেকেই জীবনের প্রতিটা ধাপে ধাপে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তুমি পুরুষের সংস্পর্শ পেয়েছো। ফলে তোমার অন্তরে গেঁথে গেছে — পুরুষ। তুমি তাদের পারকাটা হয়তো জানতে না, কিন্তু মেয়েবন্ধুদের চাইতে তাদের অতিরিক্ত দুষ্টুমি আর চটপটে স্বভাবটা তোমাকে মুগ্ধ করেছিল। তাই মেয়েবন্ধুর চাইতে ছেলেবন্ধু টাই তোমার বেশি প্রিয়।
আমাদের সমাজে কিছু বছর আগেও একাদশ শ্রেণিতে পড়া মেয়েরা পৃথিবীর কিছুই বুঝত না। আমাদের মায়েদের দিকেই দেখো, জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েও এখনও কতটা বোকা বোকা!
কিন্তু আজ! আজকে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া ছোট মেয়েটির মাঝেও বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অনুভূতি জেগে ওঠে। বয়ঃসন্ধি যেন একটু আগেই তাদের ছুঁয়ে দেয়। তাই সময়ের কিছুটা আগেই তাদের ভেতরেও জন্ম নেয় প্রয়োজন পূরণের আগ্রহ; যদিও এটা স্বাভাবিক। কিন্তু পিতামাতা এসব বুঝতে চায় না। তারা জানে, তুমি এখনো শিশু। তাই আছো। তোমার ভেতরের সেই অনুভূতিটা কে-বা বুঝতে চায়। তুমি যে বড় হয়েছো, কে-বা আর খুঁজতে যায়!
কিন্তু ভেতরের পরিবর্তনটা তো আর মিথ্যা নয়। তাই যাদের সাথে শৈশব কাটিয়েছ, হরমোনের পরিবর্তনের ফলে সেই ছেলেগুলোকে হঠাৎ তোমার কাছে আলাদা মনে হতে লাগল। তাদের সংস্পর্শ তোমাকে আলাদা কিছু বলতে চাইল। কিন্তু তোমার ভেতরের অনুভূতির কী নাম, তুমি তো সেটাও এখনও জানো না। তোমার ভেতরের এত আবেগের কারণটাও তুমি বোঝো না। তাই নিজের মনকে বুঝিয়ে সুজিয়ে তুমি সবাইকে নিয়েই জীবনের পথে এগিয়ে চলতে থাকলে।
এভাবেই জীবনের প্রতিটা ধাপে ধাপে পুরুষের সাথে তোমার বেড়ে ওঠা। ঘর থেকে তোমাকে কখনও নারী হয়ে ওঠার উপায় বলে দেওয়া হয়নি; উলটো বোঝানো হয়েছে, তুমিও নাকি পুরুষের মতোই। প্রথমবার স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তোমার মন থেকে লজ্জার যে পর্দাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল, তা আর কখনোই তোমার ভেতরে প্রবেশ করেনি। ফলে সমান সমান একটা নীতিতে তোমার বেড়ে ওঠা। নারী আর পুরুষ—একই তো।
এসব তো তোমার ঘরের অবস্থা। এবার বাইরের চিত্রটা একটু দেখে আসি চলো। একটা ছেলের জন্য তোমার পর্যন্ত পৌঁছানোর সব ব্যবস্থাই করে রেখেছে আধুনিক পৃথিবী। আগেকার দিনে তোমাকে পাওয়া কিন্তু এতটা সহজ ছিল না, তোমাকে নীল-খাম-চিঠি লিখতে গেলেও একটা ছেলেকে দশবার ভাবতে হতো, মারধরের আশঙ্কা করতে হতো। আর আজ? আজ তুমি নিজেই পুরুষকে লিখে উত্তরের আহ্বান করছ! নিজেই নিজেকে তুলে দিচ্ছ তার হাতে!
যখন তুমি নিজের নারীত্ব সম্পর্কে নিতান্ত অজ্ঞ অবস্থায় বাইরের দুনিয়ায় গিয়েছ, নানান কৃত্রিম বা বাস্তব চিত্র দেখতে কেবল শুরু করেছ, তখন তোমার সামনে নারীত্ব সম্পর্কে হরেক কিসিমের ধ্যানধারণা তুলে ধরা হলো。
- গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা দিয়ে কেউ বোঝাতে চাইল—তুমি মূলত একটা অনুভূতি, যাকে অনুভব করতে সারা পৃথিবী ছুটে আসে。
- কেউ বললো : না, তুমি অনুভূতি নও; তুমি হলে একটা পাখি, যার ইচ্ছামতো আকাশে উড়ে বেড়ানোর অধিকার আছে。
- কেউ এসে বললো, পাখি হলে হারিয়ে যেতে পারো; তুমি হলে শিকারী। তুমি নিজেই অন্য পাখিদের পোষ মানিয়ে রাখো。
- কেউ বললো, তুমি একটা যন্ত্র, যাকে চালনা করা না হলে সম্পদের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেবে।
কেউ তো সরাসরি তোমাকে পণ্যই বলে দিলো, প্রয়োজনের সময়ে যাকে ব্যবহার করা হয়।
অনেকে বললো, তুমিও পুরুষ; তোমারও পুরুষের মতোই সামর্থ্য আছে।
কিন্তু কেউ আবার বললো, তুমি নারীও নও, পুরুষও নও; তুমি হলে একটা প্রয়োজন মাত্র, ইচ্ছামতো যার স্বাদ নেওয়া যায়।
আবার কেউ তোমাকে নিজের দিকে আরও বেশি আকৃষ্ট করতে বললো, তুমি ছায়া, যাকে কখনো ধরা যায় না। কেউ বললো, তুমি পাহাড়, যাকে জয় করতে হয়।
কেউ আবার বললো, তুমি আকাশ, যার মধ্যে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।
কেউ এসে বললো, তুমি পৃথিবী, তোমার ভেতরে হাজারটা উপকারী উপাদান আছে। তাই তুমি সকলকেই সমানভাবে সুখী করতে পারো।
আবার কেউ বললো, না, তুমি হলে মহাশূন্য, যার রহস্য কেউই বুঝতে পারে না।
এত এত বলাবলির ভিড়ে আর হরেক রকম প্রদর্শনীর রঙিন চিত্র দেখে তুমি যে নিজেকে হারিয়ে বসবে, তা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু তুমি কি জানো, এসব বিভিন্ন মানসিকতার নারীরা আলাদা আলাদা ঢঙে নিজেকে উপস্থাপন করে তোমাকে যা কিছু বলছে, সেগুলো মূলত তাদের ভাষা নয়? কেউ নিজের লাভের জন্য তাদের দিয়ে বলাচ্ছে। তুমি কি জানো, তাদের এভাবে আকাশে উড়তে পারাটা আদৌ কোনো 'স্বাধীনতা'-ই নয়? তারা হলো একদল শিকারীর ছেড়ে দেওয়া পোষা পায়রা, যারা অন্য পায়রাদের আকৃষ্ট করে শিকারীর ফাঁদে টেনে নিয়ে যায়।
এভাবেই ঘরের উদাসীনতা আর বাইরের এসব আলোচনা, প্রদর্শনী, পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র আর ফাঁদগুলো মিলেমিশে তোমার ভেতরের সত্তাকে কেড়ে নিয়েছে। তুমি নিজেও বুঝতে পারোনি যে, কখন তারা একটু একটু করে তোমার সমস্ত সত্তাকে বন্দি করে ফেলেছে তাদের কথার জালে! তুমি তাদের দেখানো জীবন পেতে গিয়ে নিজেকেই বঞ্চিত করেছ; নারীসত্তাকেই বিকশিত হতে দাওনি। সবমিলিয়েই আজ তুমি অসুখী। নিজেকে হারানোর কারণেই এত যন্ত্রণা।
তোমার জীবনের পেছনের সব হিসাব বলছে, কেউ তোমাকে 'তোমার মূল্য'-টা বুঝিয়ে দেয়নি। তুমি যে অন্যদের মতো নও, এই সত্যটা কখনও তোমাকে জানানো হয়নি। তাই তুমিও নিজেকে আর দশজনের মতো, বাকি সবার মতো মনে করেই এতগুলো বছর অতিবাহিত করেছ। সবার মতো হতে গিয়ে 'নিজে'-কে পদে পদে কষ্ট দিয়েছ। সকলের মাঝে 'নিজে'-কেই হারিয়ে ফেলেছ। এবার বুঝলে তো?
তুমি কিন্তু নিজ ইচ্ছায় হারিয়ে যাওনি। তুমি তো ফুটফুটে চেহারার নিষ্পাপ শিশু ছিলে; কিছুই বুঝতে না। তোমার সত্তাকে কলঙ্কিত করে দিয়েছে পরিবার আর পৃথিবীর সব ভুল ধ্যানধারণা। সুস্থ অন্তরের মাঝে গেঁথে দিয়েছে বিষাক্ত ক্যানসার।
কিন্তু এভাবে আর কত দিন জীবনস্রোতে শুকনো কাঠের টুকরোর মতো ভেসে বেড়াবে? এই জীবনসমুদ্রে কে তোমাকে নামিয়ে দিলো আর এই স্রোত তোমাকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেটা তো অন্তত শুনে নাও। তোমার সত্তার জন্য সঠিক উদ্দেশ্য আর গন্তব্য কী, তা একটু জেনে নাও। অনেক তো হলো, এবার নাহয় বাকি জীবনটা একটু 'তুমি' হয়েই বাঁচো। কত দিন আর অন্য কারও জীবনে বাঁচবে? কত দিন আর গন্তব্যহীন স্রোতগুলোর সাথে এভাবে ভাসতে থাকবে?
ধরে নিলাম, তুমি নিজের সমস্যাটা ধরতে পেরেছ। এবার নিজেকে তুমি বদলে ফেলতে চাও, তোমার ভাগের অধরা সুখগুলো তুমি পেতে চাও, কিন্তু এই পৃথিবীতে অনেক পথই তো হাতছানি দিয়ে ডাকে। তুমি যাবে কোন দিকে?
চোখ বুজে সরাসরি যে-কোনো একটা পথের দিকে চলতে শুরু করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু? বরং একটু ভাবনা-চিন্তা করে এগোও। যেহেতু এটা তোমার জীবনের ব্যাপার, যেহেতু এটা তোমার হারানো সুখ খুঁজে পাওয়ার ব্যাপার, যেহেতু একটা সময় অলরেডি পার হয়ে গেছে ভুল সুখের পেছনে, তাই সব হাতছানিগুলোর বাস্তবতা পরখ করে নিতে হবে। একই ভুল বারবার করা যাবে না। কেননা এই বেহাত দুনিয়া তোমাকে অন্ধকারে গিলে নিতে সবগুলো দরজাই চাকচিক্যময় করে সাজিয়ে রেখেছে।
চলো তবে দেখি, তোমার জন্য সুখ কোন পথে মিলবে-
★ প্রথমেই আমরা পাই সমাজের দেখানো রাস্তা। যেটা আমাদের এই সমাজে প্রচলিত। যে পথ আর মতের অনুসরণ করে তোমাকে প্রতিপালন করা হয়েছে। যার সারসংক্ষেপ হলো: জন্ম-শিক্ষাদান-বিবাহ-সন্তান-মৃত্যু। যেহেতু আমরা সামাজিক জীব, সমাজেই আমরা বাস করি। পারিবারিক শিক্ষায় সমাজের ধ্যানধারণা প্রভাব ফেলে, সেটা তো জানা কথাই। পরিবার থেকে মুক্ত হয়ে পরের জীবনে সমাজ তোমাকে কী দেয়, তাও একটু দেখে আসি চলো।
তুমি প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছ। শিক্ষাগ্রহণ অনেকটা শেষ। সামাজিক নিয়ম হলো, এই মুহূর্তে একটু যাচাই-বাছাই ও হিসাবনিকাশ করে উপযুক্ত কোনো পুরুষের হাতে তোমার দায়িত্ব তুলে দেওয়া। সেই পুরুষের চরিত্র তুমি জানো না, তার আচরণ তুমি জানো না, মানুষের অনুভূতি সে কতটুকু বোঝে তুমি জানো না; সম্পর্কের প্রতি তার গুরুত্ব কেমন, তাও তোমাকে জানানো হয় না। তোমার শিক্ষাগত যোগ্যতা আর বাহ্যিক চেহারা দেখেই সে কেবল 'নিজের প্রয়োজন' হিসাবে তোমাকে পছন্দ করে নেয়। এরপর চলতে থাকে তোমার বিবাহ, সন্তান, সংসার—এটাই সমাজের নিয়ম। সব পাওয়া হয়ে গেলেও জীবনের বিশাল একটা অভাব কিন্তু তোমার তখনও থেকেই যায়। তা হলো, তোমার জীবনে তোমার স্রষ্টার অনুপস্থিতি। কেননা এই সমাজ কখনোই স্রষ্টাকে পুরোপুরি গুরুত্ব দেয় না। সমাজ কেবল তার মধ্যে বাস করা মানুষগুলোর সন্তুষ্টির প্রতি গুরুত্ব দেয়। ফলে সামাজিক নিয়মের সাথে বৈধতা যুক্ত করে কিছু সুখ পাওয়া তো হয়, কিন্তু এই জীবনে থাকে না সুখের পুরোটা।
★ এরপর যে পথটা নজরে আসে, সেটা মিডিয়া বা পশ্চিমা সভ্যতার সাজানো একটা ঝলমলে কানাগলি। পশ্চিমা অসভ্যতার নগ্ন আর নিকৃষ্ট এক হাতছানি।
এখানে তুমি শুধুই একটা পণ্য। তুমি বললে ঠিক ভুল বলা হবে। কেননা তারা তোমার সত্তাটাকে কখনো গণ্যই করে না; তাদের হিসাবে তোমার বাহ্যিক অবয়ব হলো—'পুরুষের প্রয়োজন পূরণকারী পণ্য।'
আর পণ্যের সাথে মানুষের কখনোই স্থায়ী সম্পর্ক থাকে না। প্রয়োজনের সময় চেয়ে নেয়, প্রয়োজন মিটে গেলে ছুড়ে ফেলে দেয়। এখানে কেবল গুরুত্ব দেওয়া হয় তোমার বাহ্যিক অঙ্গের গড়ন-চাকচিক্যের প্রতি। এ এক আজব দুনিয়া, এখানে পণ্যের মোড়ক যত সুন্দর, তার চাহিদাও তত বেশি।
এ পথের বিবরণ দিয়ে নিজের শব্দগুলোকে আর অপবিত্র করতে চাই না। শুধু জেনে রাখো, এই পথের শুরুটাও আগুন, এর শেষেও রয়েছে আগুন। এ পথে যে-ই প্রবেশ করতে গেছে, সে-ই আগুনে দগ্ধ হয়েছে। আর তাদের বাহ্যিক সৌন্দর্যগুলো আগুনের সৌন্দর্যের মতোই মায়াবী। কিন্তু দূর থেকে তো আর আগুনের উত্তাপ বোঝা যায় না; কাছে গেলেই আগুন তার ধ্বংসাত্মক রূপ প্রকাশ করে দেয়।
তুমি ছাড়া আগুনের চরিত্র আর কে-বা অধিক জানে। তুমি তো জীবনের পুরোটা সময় রান্নাঘরে আগুনের সাথেই কাটাও। তোমার চুলোর আগুনের সাথে বাইরের এই পোষা পায়রাদের জীবনের অবস্থা মিলিয়ে নিয়ো। তাহলেই বুঝে যাবে, ধীরে ধীরে আগুন তাদের কীভাবে পুড়িয়ে কয়লা বানিয়ে ফেলে।
★ আরেকটা পথ হলো, সমান-সমান দর্শনের পথ। এ পথের নারীরা নিজেকে পুরুষের সমান ভাবতে চায়। শৈশব থেকেই তার চিন্তা হলো, শিক্ষা অর্জনের পর নিজ পায়ে দাঁড়ানো।
হ্যাঁ, নারীর বিশাল এক সক্ষমতা রয়েছে নিজের ভেতরে আরেকটা প্রাণের ভার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার, যেটা পুরুষের মাঝে নেই।
কিন্তু বোন আমার! বাইরের দুনিয়ার ঘূর্ণিঝড় ঠেলে দাঁড়িয়ে থাকা আর গর্ভে সন্তানের ভার নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে বিরাট পার্থক্য। আরেকটা প্রাণের দেখাশোনার জন্য তোমাকে দেওয়া হয়েছে কোমলতা, আর পৃথিবীর হিংস্রতার মাঝে টিকে থাকতে পুরুষকে দেওয়া হয়েছে কঠোরতা। তুমি যদি তোমার কোমলতা নিয়ে পৃথিবীর কাছে আসো, চাইলেও কঠোর হতে পারবে না। ফলে হিংস্র হায়নার দল থেকে নিজেকে মুক্ত করাটা তোমার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আর আজকের পৃথিবীর অবস্থা তো তুমি জানোই। যার অংশ করে তোমার সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমারই অর্ধেক হিসাবে যার জন্ম, তোমাকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা যার, সেই স্বামীর হাতেও আজ তুমি পুরোপুরি নিরাপদ নও। তাহলে বাইরের পৃথিবীতে আর কোন পুরুষকে তুমি বিশ্বাস করবে? হিংস্র হায়েনাদের মাঝে থেকে কীভাবে তুমি আত্মসম্মানের সাথে নিজের ভাগ বুঝে নেবে?
এর চেয়ে বরং তোমাকে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব যার, তাকেই হায়েনাদের সামনে যেতে দাও। যার গর্জনে হায়েনারাও ভয় পায়, তুমি বরং তার ছায়া হয়ে থাকো। তাকে কখনো ছায়া বানাতে যেয়ো না; নয়তো জেনে রাখো, সাহসী হলেও তোমার ভেতর লাগাতার লড়াইয়ের সক্ষমতা নেই।
এ ছাড়া নিজের ভেতরের কোমলতা নষ্ট হয়ে গেলে তোমার ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শারীরিক, মানসিক, আবেগিকভাবে, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আনফিট হয়ে বেড়ে উঠবে। অন্তরে কখনও ভালোবাসা জাগ্রত হবে না। সারাটা দিন ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের সাথে ইন্টারেকশন তোমাকে স্বামীর প্রতি অসংবেদনশীল করে তুলবে, তোমার স্বাভাবিক আকর্ষণকে ফিকে করে তুলবে। সারা দিনের ধকল শেষে ক্লান্ত দুর্বল শরীরটা নিয়ে কী করে তুমি বুঝবে স্বামীর চোখের ভাষা? পরপুরুষের মুগ্ধতায় অপবিত্র অন্তরে কী করে পবিত্র ভালোবাসা জাগবে স্বামীর জন্য?১০
আর যত পথ আমরা চিনি, সবগুলোর মাঝেই কেবল অপূর্ণতা। কিন্তু এই পৃথিবীতে এখনও এমন একটা পথ বাকি আছে, যেদিক দিয়ে প্রবেশের সাথে সাথে সুখের চাদরে মুড়িয়ে বরণ করা হবে তোমাকে। যে পথে হাঁটলে জীবনের প্রতিটি কদমে। আকাশ থেকে প্রশান্তির বৃষ্টি ঝরতে থাকবে তোমার জন্য। এই সুখ, এই আনন্দ, এই তৃপ্তি দুনিয়ার অন্য কোনো পথে নেই। সেই পথটার খবর তুমিও জানো, কিন্তু এই স্বার্থপর পৃথিবী তোমাকে সেদিক পানে যেতেই দেয়নি এত দিন। সেই একমাত্র সুখের পথটি হলো-ইসলাম।
তবে এটা সে ইসলাম নয়, যা তুমি তোমার পরিবারকে মানতে দেখেছ। সে ইসলাম নয়, যা তোমার সমাজ তোমাকে মানার অনুমতি দিয়েছে। সেই ইসলাম নয়, যার দাবি আমরা করি। যে ইসলাম আমাদের সুদ-ঘুস-যিনা-প্রতারণা থেকে ফেরাতে অক্ষম, এটা সেই ইসলাম নয়। বাকি দুনিয়া তোমাকে এত দিন কী বলেছে জানি না। যদি ইসলামের সুমহান আদর্শ তোমাকে সামান্য বুঝিয়ে বলত, তবে আজ নিজেকে নিয়ে তোমার ও পুরো উম্মাহর এত দুশ্চিন্তা থাকত না। সে যাই হোক, চলো দেখা যাক, ইসলামের এই রাজপথে তোমার জন্য কী অপেক্ষা করছে!
১.
পৃথিবী তো তোমাকে নানান নামে ডাকল। কিন্তু তুমি জন্ম নেওয়ামাত্রই ইসলাম বললো, তুমি হলে পিতামাতার জান্নাত, হবু স্বামীর জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। সন্তানের জন্য ইসলাম তোমার পায়ের নিচেই জান্নাত রেখেছে। তুমি পৃথিবীতে আসার সাথে সাথেই ইসলাম তোমার জন্য একটা সুন্দর শৈশব, উত্তম পিতামাতা, পবিত্র স্বামী এবং নেককার সন্তানের ব্যবস্থা করে রেখেছে।
তোমাকে গুরুত্বের সাথে প্রতিপালন করা আর তোমার সাথে উত্তম আচরণ পিতামাতাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। আর তোমার প্রতি উদাসীনতা দেখালে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
২.
এরপর তোমার শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলাম বলেছে, তোমাকে শুধু নারীদের স্কুলে পড়াতে হবে। পুরুষের সংস্পর্শে থাকা বা তার সাথে একই ঘরে অবস্থান করা তোমার শরীর-মনের জন্য স্ট্রেসের। এর অনুমতিও ইসলাম দেয় না। ফলে তুমি পাচ্ছ শিক্ষার একটি সুন্দর পরিবেশ। আর তোমার জীবন হবে পুরুষের সংস্পর্শ থেকে পুরোপুরি মুক্ত। ফলে শুরু থেকেই তুমি নিজের পবিত্রতা রক্ষা করতে পারবে।”
এরপর বয়ঃসন্ধিকাল এলে তুমি যাতে একজন নারী হয়ে উঠতে পারো, মনোদৈহিক সমস্যাগুলো নিয়ে সঠিক নির্দেশনা পাও, এজন্য তোমার সাথে সরাসরি কথা বলতে ইসলাম তোমার মাকে উপদেশ দিয়েছে। ইসলাম বাবাকে বলেছে, তোমার শারীরিক প্রয়োজনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পূর্বেই যেন তা পূরণের ব্যবস্থা করা হয়—বিবাহের বন্দোবস্তের দ্বারা।
ইসলাম তোমাকে কখনোই অন্য কারও শারীরিক চাহিদার বস্তু বানাতে চায়নি। তাই নিছক শরীরগত চাহিদার জন্য কেউ তোমাকে পেতে চাইলে ইসলাম তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তোমাকে পেতে হলে একজন পুরুষের সার্বিক যোগ্যতা কেমন হবে, ইসলাম তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ইসলাম জীবনসাথি হিসেবে এমন কাউকে বেছে নিতে বলেছে—যে তোমাকে মূল্য দিতে জানে, যে জানে সে কী পেয়েছে, যার চরিত্র হবে উন্নত, যে স্রষ্টার প্রতি হবে আনুগত্যশীল। ফলে তুমি পাবে এমন একজন জীবনসঙ্গী, যে তোমার মূল্যটা বোঝে, জীবনের পরম লক্ষ্য জান্নাত থাকে তার কল্পনাজুড়ে, তোমাকে নিয়ে যার স্বপ্নগুলো দুনিয়ার জীবন পেরিয়ে পরকালের অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। তারপর কী, জানো?
নিজের যোগ্যতা দেখিয়ে তোমাকে নিয়ে গেলেই কেবল হবে না; নতুন পরিবার এবং নতুন পরিবেশে তুমি যাতে কোনো কষ্ট না পাও, তুমি যাতে সুরক্ষিত থাকো, তোমার সুখের যেন গুরুত্ব দেওয়া হয়— সেজন্য ইসলাম স্বামীর ওপর এত বেশি বিধিনিষেধ আর সীমারেখা নির্ধারণ করেছে যে, তোমার ওপর স্বামীর সব অধিকার থাকা সত্ত্বেও সে তোমাকে কখনও কষ্ট দিতে পারবে না। কষ্ট দেওয়া তো দূরে।
থাকুক, তোমার সাথে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার জন্যও ইসলাম আলাদা ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে দিয়েছে।১২
তোমার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ না করতে পারলে তোমাকে পাওয়ার আশা করাও পুরুষের জন্য অন্যায়। এত সম্মান আর কোথায় পাবে তুমি? এত গুরুত্ব আর কে দেবে তোমাকে? পশ্চিমাসমাজ? নারীবাদ?
আমার বোন! ইসলাম ছাড়া আর কেউ তোমার মূল্য বোঝে না। তোমার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক ভালোবাসার নাম ইসলাম। তোমার প্রকৃত সুখী জীবনের একমাত্র পথপ্রদর্শক হলো ইসলাম। ইসলাম ছাড়া বাকি সবাই তোমার শ্রম পেয়ে লাভ করতে চায়, তোমাকে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়, তোমাকে ব্যবহার করে। অন্য সকল পথের দুর্দশা তুমি দেখেছ, তোমার হিসেব মেলেনি এটা তুমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছ। আর বিপরীতে ইসলামের সৌন্দর্যের যেটুকু তুমি এখন দেখলে, এটা এক্কেবারে সামান্য মাত্র। এবার তুমি নিজের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও। একটাই তো জীবন, এইটুকুতেও যদি সুখী হতে না পারো, এইটুকু যদি স্রষ্টার আনুগত্যে ব্যয় না করো—তবে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েই-বা কী লাভ হলো?
অন্যদের মতো ইসলামকে কেবল মুখে মুখে মেনে নিয়ে সুখী হওয়ার আশা কোরো না, তাহলে আবার রাস্তা হারিয়ে ফেলবে; বরং ইসলামকে নিজের ভেতরে ধারণ করো, ইসলামের রঙে ভেতর থেকে রাঙিয়ে তোলো নিজেকে। একমলাটে তো সবটা বলা যায় না। আমি তোমাকে পথটা চিনিয়ে দিলাম, পথটা চলার উপায়গুলো অন্য বোনদের থেকে নাহয় জেনে নিয়ো। কীভাবে পৃথিবীর সমস্ত ভুল দর্শনকে ছুঁড়ে ফেলে আল্লাহর পথে টিকে থাকা যায়, সেসব শিখে নিয়ো পরে।
এখনো যেসব বোন অবিবাহিতা, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি—যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে পড়ে থেকে বাকি সময়গুলো আর নষ্ট কোরো না; ফিরে এসো তোমার রবের দিকে, তাকেই নিজের দুঃখের দিনের সঙ্গী বানিয়ে নাও। সেইসাথে একটা সুখবর শুনে রাখো, নিজেকে অন্য কারও কাছে তুলে দেওয়ার আর বেশি সময় হয়তো বাকি নেই। এর মধ্যেই তুমি যদি নিজেকে বদলে ফেলতে পারো, ইসলামকে নিজের ভেতরে পুরোটা ধারণ করতে পারো—তবে তোমার স্রষ্টা বলেছেন:
وَالطَّيِّبَتُ لِلطَّيِّبِينَ.
'সচ্চরিত্রা নারীরা সচ্চরিত্র পুরুষদের জন্য।'১৩
অর্থাৎ অপবিত্র আর চরিত্রহীন কেউ তোমাকে নিতে এলেও তোমার রব তার হাতে তোমাকে তুলে দেবেন না। সৃষ্টিগতভাবেই তোমার জন্য যে পুরুষকে পৃথিবীতে আনা হয়েছে, তোমার পবিত্র জীবনের কারণে তাকেও পবিত্রতা দেওয়া হবে।
সবমিলিয়ে পেছনের জীবনটা যেমনই হোক না কেন, সামনের সময়ে কিন্তু সুখী হওয়ার একটা বিশাল সুযোগ রয়েছে। এইটুকুও যদি হাতছাড়া করে ফেলো, তাহলে আর জানি না, কীভাবে তার মাশুল দেবে! অনৈসলামিক একটা পরিবারে প্রবেশের পর ইসলাম পালন করা আজকের দিনে প্রায় অসম্ভব।
তাই নিজেকে একটু শুধরে নাও। বাকি পৃথিবীর কথা আপাতত ভুলে যাও। আর একটু শক্ত থেকো। তোমাকে ভেঙে ফেলতে অনেক চেষ্টা করা হবে। তুমি নিজেকে ওদের বন্দিশালা থেকে মুক্ত করতে চাইলেও ওরা কখনোই তোমাকে তোমার কাছে ফিরে আসতে দেবে না। কিন্তু হাল ছেড়ো না। তোমার রবের কাছে ফিরে আসার সুযোগ চেয়ে নাও কাকুতি-মিনতিভরা কান্নায়। কেননা তিনি যদি ফিরিয়ে নিতে চান, তার থেকে তোমাকে কেড়ে নেওয়ার সাধ্য কারও নেই।
টিকাঃ
৭. নারীদের স্ট্রেসের মূল কারণ:
অফিসে ও বাসায় নারীর দ্বৈত ভূমিকাই তাদের কর্মস্থলে পুরুষের চেয়ে বেশি স্ট্রেস অনুভব করার মূল কারণ। (Prasad, ২০১৬)
পুরুষের মাঝে কাজ করতে সে বেশি স্ট্রেস ফিল করে, সেখানেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে ২২,০০০ নারীর ওপর এক রিসার্চে এসেছে, যেসব নারীদের চাকুরি-কেন্দ্রিক স্ট্রেস (job-related stress) বেশি, তাদের ৪০% বেশি আশঙ্কা রয়েছে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক (cardiovascular event) হওয়ার [Alexandra Sifferlin (August ২৫, ২০১৫) Women in Male-Dominated Jobs Have More Stress, TIME]
নারী কর্মকর্তারা বেশি স্ট্রেস, উদ্বেগ ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হন [Why Women Feel More Stress at Work (Harvard Business Review ২০১৬)]
ব্রিটেনের মতো দেশেই ৭৯% নারী কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেসে ভুগছেন, ৭৮% নারী কর্মজীবীর ঘুমে সমস্যা, মোটের ওপর ৮৭% নারী চাকরি নিয়ে স্ট্রেসে আছেন বলে জানিয়েছেন। [Louise Chunn (Mar ২৬, ২০১৯) Women Are at Breaking Point Because of Workplace Stress: Wellbeing Survey from Cigna, Forbes.com]
ফলে নারীর নিজের ক্ষতি:
পুরুষের চেয়ে স্ট্রেসে থাকা একজন নারীর শারীরিক ক্ষতি বেশি হয়, মানসিক অসুখও বেশি হয়। [Stress and your health, Office on Women's Health, U.S. Department of Health and Human Services]
স্ট্রেসের প্রভাবে লক্ষণগুলো নারীদের বেশি প্রকাশ পায়। কারণ, একই স্ট্রেসে নারীদের স্ট্রেস-হরমোন কর্টিসল বেশি বের হতে থাকে। (Verma, ২০১১)
ফলে টেনশন-জাতীয় মাথাব্যথা ও মানসিক রোগগুলো নারীদের বেশি হয়। (Hammen, ২০০৯)
কমবয়েসি নারীদের হার্টের সমস্যাগুলো মূলত হার্টের ওপর এই স্ট্রেসের কারণেই হয়। (Vaccarino, ২০১৪)
লম্বা সময় নিয়ে স্ট্রেস থেকে IBS নামক অসুখ হতে পারে। পুরুষের চেয়ে নারীদের এই রোগের হার দ্বিগুণ। (Grundmann, ২০১০)
স্ট্রেসের কারণে মুটিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নারীদের অনেক বেশি পুরুষের চেয়ে। (Michopoulos, ২০১৬)
লাগাতার স্ট্রেসে থাকা নারীদের PMS-এর সমস্যা বেশি মারাত্মক লেভেলের হয়। (Gollenberg, ২০১০)
৮. ফলে সন্তানের ক্ষতি : [University of Missouri-Columbia. (২০১৬, June ৭). Stress exposure during pregnancy observed in mothers of children with autism: More research needed to understand gene-stress interaction. ScienceDaily.]
* গর্ভকালীন জটিলতা—যেমন আগেই ব্যথা ওঠা, আগে আগেই বাচ্চা হয়ে যাওয়া, কম ওজনের বাচ্চা, প্রি-এক্লাম্পশিয়া, গর্ভকালীন ডায়বেটিস ইত্যাদি এখন বেশি হচ্ছে (Coussons-Read, ২০১৩),
* বাচ্চাদের জন্মগত ত্রুটিও বেশি হচ্ছে, বাচ্চা হওয়ার পরও বাচ্চার সমস্যা রয়ে যাচ্ছে তার গর্ভকালীন স্ট্রেসের ফল হিসেবে। (Carmichael, ২০০৭)
* অটিজম রোগাক্রান্ত শিশুও বেশি জন্মাচ্ছে। (Varcin, ২০১৭)
৯. বাচ্চার ১ম বছরে যেসব মায়েরা জবে থাকে ফুলটাইম, সেসব বাচ্চার ৩ বছর, ৪ বছর ও গ্রেড-১ এ বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রোথ তুলনামূলক কম। এবং এসব মায়েদের ডিপ্রেশন হওয়ার হার 'বেকার' মায়েদের চেয়ে বেশি। ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯০ সালে পরপর ৩টি রিসার্চের ফলাফলের ওপর University of London-এর প্রোফেসর Jay Belsky সিদ্ধান্তে আসেন: 'মানে হলো: ছোটবয়স থেকে দীর্ঘসময় বাচ্চাকে মা ছাড়া অন্য কারও কাছে রেখে পাললে (early and extensive nonmaternal care), পরবর্তী সময়ে পিতামাতার সাথে সন্তানের দূরত্ব বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সন্তানের ভেতরে রাগ-জেদ ইত্যাদি আগ্রাসি স্বভাব বৃদ্ধি পায়। বাচ্চা বয়সে, স্কুলে যাওয়ার আগের বয়সে এবং প্রাথমিক ক্লাসগুলোতে কাঙ্ক্ষিত স্বাভাবিক বিকাশ হয় না (noncompliance) l' পুঁজিবাদী-নারীবাদী মতের বিরুদ্ধে হওয়ায় এরপর বেচারাকে ধুয়ে দেওয়া হয়। তারপরও ২০০১ সালে Journal of Child Psychiatry and Psychology-তে তিনি নিজ মতের ওপর অটল থাকেন।
১০. নারী ওই পুরুষের দিকে আকৃষ্ট হয় যে সফল, প্রভাবশালী, কর্তৃত্বশীল (Kruger, ২০১১)। বহু পুরুষের সাথে মেলামেশা নারীকে অবচেতনে ঠেলে দেয় 'তুলনার' দিকে, নিজ স্বামীর সাথে অফিসের কলিগ-বসদের তুলনা। অধিক অধিক নতুন আরও অপশন, যা তাকে নিজের ব্যাপারে আরও অসুখী করে তোলে।
১১. কো-অ্যাডুকেশনের চেয়ে বয়েজ-অনলি কিংবা গার্লস-অনলি ক্যাম্পাসে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট ভালো হয়। University College London-এর অর্থনীতির প্রোফেসর Christian Dustmann-এর রিসার্চে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক কালে। তিনি মনে করেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সহশিক্ষা বর্জন করবে।
Dustmann, C, H Ku and D W Kwak (২০১৭), "Why are single-sex schools successful?", CEPR, Discussion paper no DP১২১০১. এ ছাড়াও সুইজারল্যান্ডের এক স্টাডিতেও একই ফলাফল এসেছে।
Eisenkopf, G., Hessami, Z., Fischbacher, U., & Ursprung, H. W. (২০১৫). Academic performance and single-sex schooling: Evidence from a natural experiment in Switzerland. Journal of economic behavior & organization, ১১৫, ১২৩-১৪৩.
Hill, A J (২০১৫), "The girl next door: The effect of opposite gender friends on high school achievement", American Economic Journal: Applied Economics ৭(৩): ১৪৭-১৭৭.
Park, H, J R Behrman and J Choi (২০১৩), "Causal effects of single-sex schools on college entrance exams and college attendance: Random assignment in Seoul high schools", Demography ৫০: ৪৪৭-৪৬৯.
১২. বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পেতে সম্পাদক রচিত 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২' বইটি দেখতে পা।
১৩. সুরা আন নূর ২৪: ২৬।
📄 জীবনের প্রয়োজন
আমাদের সমাজের কিছু মানুষ আছে, যারা খুব বেশি সুখীও নয়, আবার খুব বেশি দুঃখও তাদের নেই। চরিত্রের দিক থেকে খুব বেশি ভালোও নয়, আবার খুব বেশি মন্দও নয়। খুব বেশি ধার্মিকও নয়, আবার ধর্মকে অধিক গুরুত্ব দেন, তাও নয়। পার্থিব বিষয়-আশয়কে কেন্দ্র করেই মূলত তাদের সমস্ত জীবন পরিচালিত হয়। পরকাল তাদের কাছে 'যখন হবে তখন দেখা যাবে'-এর মতন সামান্য একটা বিষয়। নিজ স্বার্থ ছাড়া আর কোনো কিছুকেই তারা গুরুত্ব দেয় না, আর কিছুই বুঝতে চায় না, আর কিছুই শুনতে চায় না, স্বার্থে আঘাত লাগে এমন কিছু বিশ্বাসও করতে চায় না। আমাদের সমাজে এই মানুষগুলোকেই স্বাভাবিক-সুন্দর-'সফল জীবনের অধিকারী বলা হয়ে থাকে। তুমিও নিশ্চয়ই এটাই বিশ্বাস করো। এর জন্যই তোমার সব ব্যস্ততা, চিন্তা, আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন, হতাশা। সবকিছু পার্থিব বৈষয়িক অর্জনকে ঘিরেই আবর্তিত। সুখের জন্যই সব ব্যস্ততা。
আচ্ছা, তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, কর্মজীবী, উদ্যোক্তা— কোনটা? তুমি এর যে-কোনো একটা হয়তো বলবে।
আমি ধরে নিলাম, তুমি ভালোভাবে পড়াশোনা করে একজন সফল ব্যবসায়ী হলে, কিংবা সরকারি মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেলে বা সফল উদ্যোক্তা হলে। তারপর? তোমার উদ্দেশ্য তো পূরণ হলো তাই না, এখন আর কী চাও?
এবার হয়তো বলবে, ভালো ক্যারিয়ার দরকার। এখনো সব ঠিকমতো গুছিয়ে নিতে পারলাম না। আচ্ছা নাও, গুছিয়ে নাও। তোমার সবকিছু গুছিয়ে নেওয়া শেষ? এখন তো তোমার একটা উন্নত ক্যারিয়ারও আছে। তারপর?
তুমি এবার হয়তো বলবে, আমার একটা ভালো বাড়ি নেই। একটা ভালো বাড়ি দরকার। ঠিক আছে, বানাও বাড়ি। ধরে নিলাম, তোমার বাড়ির সমস্যাও শেষ। তারপর?
স্ত্রী প্রয়োজন, তাই তো? ঠিক আছে। তোমার উন্নত ক্যারিয়ার দেখিয়ে একটা সুন্দরী নারীকে তুমি বিবাহ করে ফেলেছ। তারপর?
ও হ্যাঁ! তুমি তো এখন বাবা। তোমার সন্তান হয়েছে। তার দায়িত্ব আছে। আচ্ছা, তারপর?
এখন তোমার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বলবে তো? ধরে নিলাম, তোমার সন্তানও তোমার মতো শিক্ষা অর্জন করে ভালো ক্যারিয়ার পেয়ে গেল। তারপর? এবার কী বলবে?
সন্তানের বিবাহের বিষয়টা তো এখনও বাকি। আচ্ছা ধরে নাও, তোমার সন্তানের বিবাহের কাজটাও তুমি ঠিকঠাকমতো সম্পন্ন করে ফেলেছ। কিন্তু তারপর কী? তারপর আর কী করতে চাইবে?
কীভাবে ক্যারিয়ার, স্ত্রী, সন্তান, সম্পদকে তুমি নিজের উদ্দেশ্য বানিয়ে রেখেছ— দেখলে? আর এই উপর্যুপরি পৌনঃপুনিক চাহিদার তোড়ে একটার পর একটা উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে কখন যে তুমি জীবন-সায়াহ্নে এসে দাঁড়িয়েছ, বেলা ডুবে গেছে—টেরই পাওনি!
জীবন হলো পথ, আর তুমি হলে পথিক। জীবন বয়ে চলে, তাকে থামিয়ে রাখা যায় না। তোমাকে হেঁটে যেতেই হবে, থামানো যায় না। সময়ের ধাক্কায় জীবনের চাকার সাথে তোমাকে চলমান থাকতে হয়। তুমি কখনো শৈশবে আটকে থাকতে পারবে না, সময়ই তোমাকে তারুণ্যে পৌঁছে দেবে। আবার তরুণ অবস্থায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। সময় তোমাকে ঠেলে বার্ধক্যে নিয়ে যাবে। বৃদ্ধ হয়েও।
দীর্ঘক্ষণ পৃথিবীতে বসে থাকার তোমার সুযোগ নেই। বেজে ওঠে বিদায়ঘণ্টা। এবার সময় আর তোমাকে ঠেলবে দেবে না; বরং পরকালের দরজা দিয়ে ধাক্কা মেরে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ থেকে বের করে দেবে। আর এরপরেই তোমার মূল গন্তব্য। এরপর আর কোনো তাড়া নেই, শুধুই অপেক্ষা—এক নিঃসীম অপেক্ষা।
আজ তুমি এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ। আমি যদি বলি, এরপর কী? আর কোথায় যাবে, আর কী করবে? আর কোন নতুন উদ্দেশ্যের কথা বলবে?
ভেবে দেখো, এরপর জীবন তোমাকে কোথায় নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে। নিজের সব সময় তুমি পেরিয়ে এসেছ। পৃথিবীকে উপভোগের সাধ্য থাকলেও শরীরে শক্তি নেই। সম্পদের দিক থেকে সক্ষম হলেও তোমার কাছে আর সময় নেই। শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর ফেরেশতার জন্য প্রতীক্ষা। কিন্তু যখন এই শুয়ে থাকারও সমাপ্তি ঘটবে? মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাকে নিয়ে চলে যাবে, তারপর কী? তখন কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? আর কী করবে সেখানে গিয়ে?
জানি, এরপরের কথাগুলো তুমি ভাবতে চাইবে না। কেননা তুমিও জানো, এরপর তোমাকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হবে, তুমি সেখানকার জন্য কিছুই করোনি। সেখানে বাড়ি করোনি, মহল বানাওনি, সাজাওনি। যেখানে সাজিয়েছ, সেখানটা ছেড়ে তোমাকে চলে যেতে হচ্ছে। তুমি জানো, তুমি কখনও তোমার জীবনের উদ্দেশ্যই খুঁজে দেখোনি। লক্ষ্যে পৌঁছোতে যেসব উপকরণ দেওয়া হয়েছিল, তুমি একের পর এক এসব উপকরণকেই ‘লক্ষ্য’ বানিয়েছ। জীবনের আলাদা আলাদা অংশগুলোকেই তুমি ‘গোটা জীবন’ মনে করে ঝাঁপিয়ে পড়েছ সর্বশক্তিতে বারবার।
অথচ তুমি ভালোভাবে পড়াশোনা না করলেও শেষমেশ যে-কোনো একটা কলেজে পড়ার সুযোগ পেতে। শেষমেশ যে-কোনো একটা কর্ম তোমার জুটেই যেত। একটা স্ত্রী ঠিকই তোমার হতো। সন্তানও জন্ম নিত। তাকেও কোনোভাবে গড়ে তুলতে পারতে। হয়তো এ-রকম জীবনে কষ্ট বেশি থাকত, একটু ভোগান্তি বেশি হতো। তবে তুমি যে বিষয়গুলোর পেছনে সমস্ত জীবন ক্ষয় করে ফেলেছ, তা তোমাকে দেওয়া হতোই।
এসব বলে তোমাকে নিরুৎসাহিত করছি না; বরং আমি বোঝাতে চাইছি, তোমাকে যদি ৭০ বছরের একটা জীবন দেওয়া হয়, তবে তার মধ্যে যে বিষয়গুলো অর্জন করাকে তুমি উদ্দেশ্য বানিয়ে রেখেছ, তা প্রত্যেক মানুষকেই দেওয়া হবে। আর তুমিও তার বাইরে নও। এসব কেবল মানুষের জীবনের বিভিন্ন অংশ মাত্র, তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার সামান্য উপকরণ মাত্র; এগুলো কখনোই তোমার ‘প্রকৃত জীবন’ বা ‘জীবনের উদ্দেশ্য’ নয়।
পৃথিবীতে তোমার জন্য যা কিছু রাখা হয়েছে, তা কেউ তোমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। আর যা তোমাকে দেওয়া হবে না, তুমি হাজার চেষ্টা করলেও তা অর্জন করতে সক্ষম নও। প্রচেষ্টার মাধ্যমে 'জীবনোপকরণের ধরন' আর 'বাহ্যিক অবস্থার সামান্য কিছুটা উন্নতি' ঘটানো ব্যতীত তুমি আর কিছুই করতে পারবে না।
এ ছাড়া তুমি যদি জীবনের কোনো নির্দিষ্ট অংশ যেমন: পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, সংসার বা দায়িত্বকে তোমার সমস্ত জীবনের মূল উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলো, তবে তোমার প্রচেষ্টার পর একটা সময় হয়তো তা পূরণ হয়ে যাবে। তুমি সারাজীবন যা পেতে চেয়েছিলে, তা অর্জন করে ফেলবে। তোমার উদ্দেশ্য পৃথিবীতেই পূরণ হয়ে যাবে। ফলে কী হবে জানো? তুমি বেঁচে থাকার আর কোনো কারণ খুঁজে পাবে না। জীবনের অন্যান্য অংশগুলোকে গুরুত্ব দিতে ভুলে যাবে।
তোমার উদ্দেশ্য যদি শিক্ষা হয়, তুমি শিক্ষার জন্য পরিবারকে গুরুত্ব দিতে পারবে না। তোমার উদ্দেশ্য যদি ক্যারিয়ার হয়, তুমি নিজেকে গুরুত্ব দিতে পারবে না। তোমার উদ্দেশ্য যদি পরিবার হয়, তুমি অন্য কিছুতে সময় ব্যয় করতে চাইবে না। সবকিছু স্বাভাবিক থেকেও তোমার কাছে এলোমেলো মনে হবে। কেননা তুমি জীবনের নির্দিষ্ট একটা অংশকে তোমার উদ্দেশ্য বানিয়ে রেখেছ, যা কখনোই তোমার উদ্দেশ্য হওয়ার যোগ্য নয়। ফলে তোমার জীবনে নেমে আসবে দুর্দশা-অপ্রাপ্তি-অস্থিরতা। মহাবিশ্বের বিশাল এই সৃষ্টির মাঝে 'এতটা গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি' মানুষের জীবনের 'মূল উদ্দেশ্য' কি কখনো স্রেফ উচ্চশিক্ষা বা কতগুলো সার্টিফিকেট হতে পারে? ক্যারিয়ার, স্ত্রী, প্রতিষ্ঠিত হওয়া, বাড়ি বা বিলাসবহুল জীবন কি মানুষের 'উদ্দেশ্য' হতে পারে?
সুতরাং একটা বিষয় পরিষ্কার, জাগতিক কোনো বিষয় মানুষের উদ্দেশ্য হতে পারে না। কেননা তা এই ক্ষণস্থায়ী জীবনেই অর্জন করা সম্ভব। অর্জিত হয়ে গেলে মানুষ উদ্দেশ্যহীনতার যন্ত্রণা সইতে থাকে। সুতরাং মানুষের জীবনে এমন কোনো উদ্দেশ্য থাকা উচিত, যা এই জীবনে অর্জন করা সম্ভব নয় এবং যাতে পৌঁছানোর জন্য মানুষকে তার জীবনের প্রতিটি অংশকেই সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। এ-রকম উদ্দেশ্য কী আছে? হ্যাঁ, অবশ্যই। যার পথ হলো ইসলাম, যার গন্তব্য পৃথিবীতে নেই, ফলে অর্জন করাও সম্ভব নয়, এবং যেখানে পৌঁছাতে হলে মানুষকে তার জীবনের প্রত্যেক অংশকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে-সেই উদ্দেশ্য হলো জান্নাত।
সুতরাং আজ যারা জীবনের অংশগুলোকে 'উদ্দেশ্য' বানিয়ে রেখে স্বাভাবিক জীবনের পুরো সুখ পেতে চায়, তারা কখনোই সুখী হয় না। তবে অনেকে উদ্দেশ্যহীন জীবন অতিবাহিত করা সত্ত্বেও নিজের উদ্দেশ্যহীনতা মেনে নিতে অস্বীকার করে। তারা নিজের জীবনের সুখের অংশগুলো তুলে ধরে বলে, 'আমি তো ভালোই আছি। আমার কাছে সবকিছুই আছে। আমি কারও ক্ষতি করি না'।
কিন্তু সত্যিই তুমি ভালো নেই। তুমি ভালো থাকতে পারো না। কেননা স্রষ্টার আনুগত্যের পথ ব্যতীত কেউই পূর্ণাঙ্গ সুখী হতে পারবে না। তিনি বলে দিয়েছেন,
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا.
'আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন।'১৪
যে জীবনে আল্লাহর আনুগত্য থাকে না, সে জীবন অতিবাহিত করে কেউ যতই নিজেকে সুখী আর স্বাভাবিক জীবনের অধিকারী বলুক না কেন, সে মূলত সুখী নয়। আর তার জীবনও স্বাভাবিক নয়। যাকে স্বয়ং রব্বুল আলামিন সংকুচিত বা দুর্দশাগ্রস্ত জীবন দিতে চেয়েছেন, সে কীভাবে নিজ থেকে সুখী হতে পারে? নিজের অস্তিত্ব, নিজের উদ্দেশ্য, নিজের পরিণতি ও গন্তব্য না জেনে কীভাবে সে পথিক মনে শান্তি পেতে পারে?
মানুষ জন্ম থেকেই নিজের ভেতরে একটা শূন্যতা বা অপূর্ণতা নিয়ে বেড়ে ওঠে। একটা অপার্থিব চাহিদা সে অনুভব করে প্রতিনিয়ত। এই শূন্যতা জাগতিক কিছুর জন্য নয়; বরং মানুষের 'ভেতরের পবিত্র সত্তা'-র সাথে তার সৃষ্টিকর্তার সংযোগের এক তাড়না থেকে এই শূন্যতার জন্ম।
পৃথিবীতে ঘুমন্ত অবস্থাতে যেভাবে তোমার অক্সিজেন প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনই এই দেহে প্রবেশের পর থেকে তোমার রুহের প্রয়োজন হয় তার স্রষ্টার ভালোবাসা এবং নৈকট্যের। তাই তো তুমি চোখ বন্ধ করলে সে তার স্রষ্টার ভালোবাসার পরশ পেতে দেহের খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু দুনিয়ায় এসে মানুষের অবাধ্যতা আর অহংকারের কারণে কিংবা পরীক্ষার বিভিন্ন স্তরে স্রষ্টার সাথে সেই সত্তার দূরত্ব বেড়ে যায়। তার ভেতরে তৈরি হয় অসীম এক অপূর্ণতা, যা বস্তুগত কিছু দিয়ে মেটে না-স্রষ্টার সাথে সংযোগের অভাব।
পূর্ণতা হলো সেই অনুভূতি, যা অন্তরে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়। ফলে তার অন্তরে সেই বিষয়ের প্রতি আর কোনো অভাব জাগে না। এই পূর্ণতা নানা রকম হতে পারে, যেমন: সঙ্গীর পূর্ণতা, সম্পদের পূর্ণতা, মানুষিক চাহিদার পূর্ণতা, ইচ্ছার পূর্ণতা ইত্যাদি।
তবে মানুষের জন্য সবচাইতে বড় অভাব বা পূর্ণতা হলো—তার স্রষ্টা। দৈহিক চাহিদাগুলো পৃথিবীর উপকরণ দিয়েই পূরণ হয়; কিন্তু মানুষের শরীরের ভেতরে যে সত্তা অবস্থান করে, তা শরীরের কোনো অংশের সাথে যুক্ত থাকে না। ফলে জাগতিক কোনো উপায় বা উপকরণ তার মধ্যে প্রবেশ করানো সম্ভব হয় না। জাগতিক কোনো সুখ দিয়ে তাকে সুখী করা যায় না। তার জন্য দরকার হয় এমন সুখ, যা শরীর ভেদ করে তার ভেতরে প্রবেশ করে প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম। আর বাস্তবতা হলো, এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তাআলার রহমত এবং তাঁর কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু শরীর ভেদ করে মানুষের ভেতরের সত্তা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। তাই মানুষের সবচাইতে বড় এই শূন্যতাকে পূর্ণ করতে মহান আল্লাহর কাছে ফিরে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
তোমার দৈহিক সত্তার সমস্ত ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজন পূরণ করা সত্ত্বেও যদি তুমি আত্মার প্রয়োজন পূরণ করতে ব্যর্থ হও—তবে তুমি পূর্ণ হতে পারবে না। অর্থাৎ পৃথিবীতে থেকেও মানুষের জন্য নির্ধারিত সুখের পুরোটা লাভ করতে পারবে না।
কিন্তু যদি তোমার অন্তরে শুধু স্রষ্টার পূর্ণতা থাকে, তাহলে বাকি সবদিক থেকে পুরোপুরি শূন্য হলেও তোমার নিজেকে পূর্ণ মনে হবে।
পৃথিবীতে মানুষের অসুখী হওয়ার মূল কারণ হলো, সে নিজেকেই এখনও চেনে না, জানে না। নিজের ভেতরের সত্তা আর বাইরের সত্তার মধ্যকার পার্থক্যটা সে বোঝে না। ফলে বাইরের মতোই ভেতরের শূন্যতা পূরণে সে জাগতিক উপায়, উপকরণ প্রয়োগ করে সুখী হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু পৃথিবীর কোনোকিছুই তার শরীর ভেদ করে মূল সত্তা পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে সে নিজেকে আবিষ্কার করে অসীম শূন্যতায়। এভাবে যৌবন ক্ষয়ে বার্ধক্য চলে আসে, তবুও তার শূন্যতা পূরণ হয় না।
তারপর বলো, তোমার এই উদ্দেশ্যহীনতা আর কত দিন? অন্তরে এই শূন্যতা নিয়ে আর কত দিন যন্ত্রণা পোহাবে, বলো?
তোমার একটা উদ্দেশ্য প্রয়োজন, তোমার ইসলাম প্রয়োজন, তোমার ভেতরে পূর্ণতা প্রয়োজন, এই যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হওয়া প্রয়োজন। আর এজন্যই তোমাকে ফিরতে হবে।
এত দিন অনেক দিকেই তো ছুটলে, অনেক কিছুই তো ভাবা হলো, অনেক কর্ম তো করা হলো, অনেক দিন তো যন্ত্রণা পোহালে, অনেকবার তো ব্যর্থ হলে; এবার একটিবার নিজের রবের পথে চলো, তাঁর কথা ভেবে দেখো, তাঁর ইবাদত করো, তাঁর ভালোবাসা দিয়ে অন্তরকে পূর্ণতা দাও। এবার অন্তত সফল হও। আর কত?
টিকাঃ
১৪. সুরা তহা ২০: ১২৪।