📄 প্রতি মুহূর্তকে মূল্য দাও, হও সময় সচেতন
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অনেক অনেক মুল্যবান। এক মুহূর্তের সাথে যুক্ত আরেকটি মুহূর্ত। যার প্রতিটি অংশই দামি। জীবনের প্রকৃত আবেদনই হলো- প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো। তাই এই মুহূর্তগুলোকে অনর্থক কাজে বিনষ্ট করা, প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ হওয়া এবং বেকার বিষয়াদি নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া সমীচীন নয়।
(সময়ের মূল্য বোঝাতে জনৈক জ্ঞানী সুন্দর কিছু উপমা দিয়েছেন- যদি এমন কোনো ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হতো- যা প্রতিদিন তোমার একাউন্টে দিনের সেকেন্ডের হিসাব মতে ৮৬৪০০ টাকা জমা করে। কিন্তু ব্যাংকটির নীতি হলো, দিন শেষে তোমার একাউন্টে যা থেকে যাবে-যা তুমি ব্যবহার করতে পারোনি তা ব্যাংক কেটে নেয়। ব্যাংক তোমাকে অবশিষ্ট মুদ্রাগুলো আরেকদিনের জন্য রেখে দেওয়ার অনুমতি দেয় না এবং তোমাকে আগামী দিনের টাকা আজ তুলে নেওয়ারও অনুমতি দেয় না। তা হলে তুমি কী করবে? অবশ্যই প্রতিদিন সূর্যাস্তের পূর্বেই তোমার একাউন্টে থাকা প্রতিটি পয়সা তুমি তুলে নিতে চাইবে!
তোমার কি জানা আছে- আমাদের প্রত্যেকের কাছে এমন একটি ব্যাংক আছে- সেটা হলো সময়। সে প্রতিনি ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে তোমাকে ৮৬৪০০ সেকেন্ড দেয়। দিন শেষে যে সেকেন্ডগুলো তুমি কোনো গঠনমূলক ফলদায়ক কাজে ব্যবহার করতে পারোনি সেগুলো হারালে।
• একটি বছরের মূল্য জানতে একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করো- যে পরীক্ষায় ফেল করেছে!
• একটি মাসের মূল্য জানতে একজন মাকে জিজ্ঞেস করো- যিনি অষ্টম মাসে সন্তান প্রসব করেছেন!
• একটি সপ্তাহের মূল্য জানতে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদককে জিজ্ঞেস করো!
• একটি দিনের মূল্য জানতে একজন দিনমজুরকে জিজ্ঞেস করো- যে দশটি সন্তান লালন পালন করে!
• একটি ঘন্টার মূল্য জানতে একজন নববধূকে জিজ্ঞেস করো- যে বাসর রাতে স্বামীর অপেক্ষায় থাকে!
• একটি মিনিটের মূল্য জানতে সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করো- যে রেলগাড়ি ফেল করেছে!
• একটি সেকেন্ডের মূল্য জানতে ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করো- যে অল্পের জন্য সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছে!
• এক সেকেন্ডের হাজার ভাগের একভাগের মূল্য জানতে সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করো- যে অলিম্পিক খেলায় রূপার মেডেল পেয়েছে! - [সংগৃহীত- অনুবাদক])
📄 আল্লাহ-র সব ফয়সালাতেই কল্যাণ নিহিত
* বান্দার জন্য আল্লাহ ﷻ যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তাতেই তার কল্যাণ। কেননা, তিনি তার ব্যাপারে তার চেয়েও বেশি জানেন এবং তার প্রতি তার মায়ের চেয়েও বেশি দরদী। অতএব, বান্দার উচিত আপন প্রভুর হুকুমের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, সবকিছু তাঁরই হাতে সোপর্দ করে দেওয়া এবং নিজের জন্য তাঁকেই যথেষ্ট মনে করা।
* রসূলুল্লাহ ﷺ-র সঙ্গে মানুষ যে আচরণই করেছে, ফলাফলের দিক থেকে থেকে তা কল্যাণকরই হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। ফলে তা জিহাদের কারণ হয়েছে; আল্লাহ ﷻ-র সাহায্যলাভ ও আল্লাহ ﷻ-র পথে কুরবানী দেওয়ার মাধ্যম হয়েছে। গাযওয়া ও যুদ্ধগুলো তাঁর জন্য বিজয়ের কারণ হয়েছে। সে সকল যুদ্ধে যেসব ঈমানদারগণ শহীদ হয়েছেন, তাঁরা জান্নাতের হকদার হয়েছেন। যদি কাফেরদের সাথে যুদ্ধ সংঘটিত না হত, তা হলে মহা কল্যাণ ও মহা সাফল্য লাভ হত না。
রসূলুল্লাহ ﷺ-কে মক্কা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বাহ্যত বিষয়টি অপছন্দনীয় ছিল। কিন্তু পরোক্ষভাবে তাতে কল্যাণ ও বিজয় নিহিত ছিল। কেননা, হিজরতের পরই নবীজী ﷺ ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি রচনা করেছিলেন। আনসারগণ ইসলামের ছায়াতলে এসেছিলেন। ঈমানদার ও কাফেরদের পরিচয় স্পষ্ট হয়েছিল। ঈমান, হিজরত ও জিহাদের কারণেই খাঁটি ঈমানদার ও ঈমানের মিথ্যা দাবিদারদের মাঝে পার্থক্য রচিত হয়েছিল。
উহুদের যুদ্ধে মুসলমানগণ পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন। ঘটনাটি তখন বাহ্যত অপছন্দনীয় ছিল। কিন্তু তাতেও কল্যাণ নিহিত ছিল। বদরের বিজয়ের কারণে অনেকের মাঝে আত্মগৌরব ও নিজেদের ব্যক্তিত্বের উপর এক ধরনের ভরসা জন্মে গিয়েছিল। উহুদের যুদ্ধের মাধ্যমে তা সংশোধন হয়েছে। অনেকেই শাহাদাতের মহা নেয়ামত লাভ করেছিলেন。
উহুদের যুদ্ধের মাধ্যমেই মুনাফিকদের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আল্লাহ তাদের ভেতরের অবস্থা প্রকাশ করে দিয়েছিলেন。
এ ঘটনাগুলোর উপর ভিত্তি করে তুমি সেসব ঘটনা ও অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারো, যেসব অবস্থা ও ঘটনাসমূহ বাহ্যত অপছন্দনীয় হলেও রাসুলুল্লাহ -সহ সমগ্র মুসলমানদের জন্য ছিল কল্যাণকর।
* ইবরাহীম -কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য সেই আগুনকে শীতল ও আরামদায়ক বানিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁকে নমরূদের কবল থেকে এবং স্বজাতির চক্রান্ত থেকে হেফাজত করেছিলেন। তাঁর দীনকে জমিনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
* ফেরআউন মুসা -র বিরুদ্ধে অনবরত ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছিল এবং বিভিন্নভাবে কষ্ট দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে আল্লাহ -র সাহায্য এসেছে। তাঁকে লাঠি দান করেছেন; যা তাদের সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। এই লাঠির মাধ্যমেই তিনি সাগরে পথ পেয়েছিলেন, যে পথে বনী ইসরাঈল ও তিনি নিজে সাগর পার হয়েছিলেন। পক্ষান্তরে তাঁর শত্রুদেরকে আল্লাহ লাঞ্ছিত করেছেন। চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছেন।
* ঈসা -এর সঙ্গে বনী ইসরাঈল যুদ্ধ করেছিল। তাঁর মা, তাঁর কর্ম, তাঁর মিশন- সবকিছুর ব্যাপারেই প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল। এমনকি তাঁকে হত্যাও করে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছেন এবং আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। পক্ষান্তরে তাঁর দুশমনদেরকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন।
*আমাদের নবী -কে ইহুদী-খ্রিস্টান-মুশরিকসহ অবিশ্বাসীরা সীমাহীন কষ্ট দিয়েছিল। তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। তাঁর বিরোধিতা করেছিল। তাঁর দাওয়াতের কাজে বাধা প্রদান করেছিল। তাঁকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও উপহাস করেছিল। তাঁকে গালি-গালাজ করেছিল। তাঁকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। তাঁর সাথি-সঙ্গীদের হত্যা করেছিল। বিভিন্নভাবে কষ্ট দিয়েছিল। তাঁর স্ত্রীর ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছিল。
নবীজী সারা জীবন বহু নির্যাতন সহ্য করেছেন। চতুর্মুখী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। আহত হয়েছেন। সামনের দাঁত শহীদ করেছেন। মাথায় আঘাত পেয়েছেন। সংকীর্ণ উপত্যকায় অবরুদ্ধ হয়েছেন। এমনকি সেখানে গাছের পাতা খেতে বাধ্য হয়েছেন。
উহুদের যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়েছেন। ক্ষুধার প্রচণ্ডতায় পেটে একাধিক পাথর বেঁধেছেন। কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদ-আপদের সম্মুখীন হয়েছেন。
জালিমদের আত্মম্ভরিতা, অহংকারীদের অবাধ্যতা, বুদ্দুদের বেয়াদবি, ইহুদীদের চক্রান্ত, মুনাফিকদের ধোঁকাবাজি- সবই তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। পরিশেষে বিজয় তাঁরই হয়েছে। সফলতা তাঁরই পদচুম্বন করেছে। দীনের বিজয় হয়েছে। আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছেন। সমস্ত বাতিল দল-উপদলকে পরাজিত করেছেন। সমস্ত দুশমনদের পরাজিত, লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেছেন。
আল্লাহই বিজয়ী। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না。
* দেখুন, আবু বকর সিদ্দীক কত কষ্ট করেছেন! কত নির্যাতন সহ্য করেছেন! আল্লাহ -র রাস্তায় সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এক পর্যায়ে তিনি 'সিদ্দীক' উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
* উমর ইবনুল খাত্তাব মেহরাবে রক্তে রঞ্জিত হয়েছেন। অথচ তিনি তাঁর সারা জীবন কাটিয়েছেন দুনিয়াবিমুখতা, দানশীলতা ও মানুষের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
* উসমান -কে কোরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় শহীদ করে দেওয়া হয়েছে।
* আলী -কে মসজিদে আকস্মিকভাবে শহীদ করা হয়েছে।
* হুসাইন -কে জুলুম করে শহীদ করা হয়েছে।
* হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ সাঈদ ইবনে জুবাইর -র মতো জ্ঞানী-গুণী, ইবাদতগুজার ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিত্বকে হত্যা করেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর -কে হারাম শরীফের ভিতর শহীদ করেছে।
* ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল -কে হক কথা বলার অপরাধে জেলখানায় বন্দি করা হয়েছিল। অকথ্য নির্যাতন করা হয়েছিল।
* শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া -কে জেলখানায় নিক্ষেপ করা হয়েছিল। পরিবার-পরিজন, সাথি-সঙ্গী ও কিতাবাদি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।
* ইমাম আযম আবু হানীফা -কে খলীফা আবু জা'ফর আল মানসুর বেত্রাঘাত করিয়েছিল।
* আলেমে রব্বানী সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব -কে মদীনার গভর্নর চাবুক মারিয়েছিল।
* ইমাম মালেক ইবনে আনাস -কেও মদীনার গভর্নর চাবুক মারিয়েছিল।
* ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে আউন -র মতো এত বড় আলেম ও মুহাদ্দিসকে বেলাল ইবনে আবু বুরদাহ প্রহার করেছিল。
যেসকল ব্যক্তিবর্গ ও মনীষীদেরক বিভিন্নভাবে কষ্ট দেওয়া হয়েছিল, নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করে ফেলা হয়েছিল, যদি আমি এখানে তাঁদের সকলের নাম উল্লেখ করতে থাকি, তা হলে সে তালিকা অনেক অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে; এ পুস্তকের কলেবর বহুগুণ বেড়ে যাবে। তাই আমি তা না করে এখানে উদাহরনস্বরূপ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছি। জ্ঞানীদের জন্য এ-ই যথেষ্ট।