📄 ইবাদতে একনিষ্ঠ হও
* ইবাদতের ব্যাপারে নিজের উপর অধিক বাড়াবাড়ি করো না। সুন্নতের অনুসরণ করো। আল্লাহ-র আদেশ মেনে চলো। বাড়াবাড়ি পরিহার করো। সর্বক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো।
* খালেস একত্ববাদ অবলম্বন করো। এতে হৃদয় হয় প্রশস্ত। একত্ববাদে তুমি যতটা খাঁটি হবে, ইবাদতে ততটা একনিষ্ঠ হবে; সে অনুযায়ী তোমার সৌভাগ্যের দুয়ার উন্মোচিত হবে।
* রাতের শেষ প্রহরে এমন বার্তা পাঠাও, অশ্রু হবে যার কালি, কপোল হবে যার কাগজ, কবুলিয়্যত হবে যার ডাক, রবের আরশ হবে যার গন্তব্য। তারপর অপেক্ষায় থাকো প্রতিউত্তরের।
* সেজদায় লুটিয়ে পড়ে মনের গোপন কথাগুলো খুলে বলো তাঁর কাছে। তাঁর কাছে যে, গোপন নেই কিছুই। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছুই জানেন তিনি। তবে সেসব কথা কারো কাছে বলবে না। কারণ, ভালোবাসার গোপন ভেদ ফাঁস করতে নেই। আর এ ভেদ তো তোমার আর প্রভুর মাঝে। স্রষ্টা আর সৃষ্টির মাঝে। তাছাড়া মানুষের মাঝে কল্যাণকামী ও হিংসুক সব ধরনের লোকই থাকে।
* শেষ রাতে উঠো। হাত প্রসারিত করো। একাগ্রচিত্তে বলো- 'দয়াময় প্রভু! সামান্য পুঁজি নিয়ে তোমার দরবারে হাজির হয়েছি। তুমি পুরোপুরি দান করো।
* ইবাদতই সৌভাগ্য। যোগ্যতাই সাফল্য। যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখে, সর্বদা করতে থাকে দোআ-ইস্তেগফার, আল্লাহর কাছে তুলে ধরে মুখাপেক্ষিতা তার- সেই তো নেককার।
📄 তওবার অশ্রুতে পরিচ্ছন্ন হও
* তোমার প্রভুর অনুগ্রহ ও ক্ষমার ব্যাপ্তি সুবিশাল। তিনি তওবা কবুল করেন। ক্ষমা করেন তার বান্দাদের। বান্দার পাপগুলোকে পরিবর্তন করে দেন পূণ্য দ্বারা।
* খাঁটি তওবা দূর্ভাগ্য পীড়ার নিরাময়ী পথ্য। বিপদগ্রস্ত মোমিন বান্দার জন্য উচিত, তার বিপদের কারণ বাইরে তালাশ না করে নিজের ভেতরে খোঁজ করা। কারণ, মোমিন বান্দার সৌভাগ্যের লক্ষণ হচ্ছে, সে তার নিজের নফস ও গুনাহসমূহের হিসাব নেবে এবং সেগুলোকে সংশোধন করতে সচেষ্ট থাকবে। বিপদে পড়া মাত্রই কারণ খোঁজার পেছনে অযথা সময় নষ্ট না করে তৎক্ষণাৎ তওবা ও আত্মসংশোধনে ব্রত হবে।
* তওবার অশ্রুতে দিল পরিচ্ছন্ন হয়। আর এ হচ্ছে অনুশোচনার আগুন, যা অন্তরে প্রজ্বলিত হয়। তা ছাড়া এ হচ্ছে লজ্জার অনুভূতি, যা চোখ থেকে প্রতিক্রিয়ার বন্যা প্রবাহিত করে। এ হচ্ছে আল্লাহ -র পথে প্রথম পদক্ষেপ এবং পরকালীন জীবনে সফলতা অর্জনকারীদের মূলধন। আল্লাহ -র দিকে যাত্রাকারীদের প্রথম ধাপ। আল্লাহ -র দিকে ধাবমানদের অবিচলতার চাবি।
তওবাকারী কাঁদে; কাকুতি-মিনতি করে এবং আল্লাহ -র কাছে মাগফেরাতের দোআ করে। যখন লোকজন সুস্তিতে জীবন যাপন করতে থাকে, তখন তওবাকারীর দিল আল্লাহ -র ভয়ে অস্থির থাকে। যখন আল্লাহ-র সৃষ্টি আয়েশ করতে থাকে, তখন তওবাকারী আরাম-আয়েশ থেকে বঞ্চিত থাকে। ভগ্ন হৃদয়ে পেরেশান হয়ে সে নিজের রবের সামনে দাঁড়ায় এবং অনুশোচনার ভারে মাথা নত করে। নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করে ভয়ে কেঁপে ওঠে। তার মাঝে তৈরী হয় পেরেশানী ও অস্থিরতার ভাব। তার অন্তরে জ্বলতে থাকে এক প্রকারের আগুন। চোখ থেকে বইতে থাকে অশ্রুর বন্যা। তার অন্তর অপেক্ষা করতে থাকে আগামী কালের সাফল্যের। কেননা, গুনাহের ভার থেকে সে নিজেকে মুক্ত করে নেয়, যাতে পুলসিরাত পার হতে পারে সহজে।
* আল্লাহ-র নিকট বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করো। এতে রিযিক, সন্তানাদি, উপকারী এলেম ও সহজতা অর্জন হয় এবং পাপ হ্রাস পায়।
* সৎ কাজ, বিপদে ধৈর্য ধারণ, তওবা, মুসলমানদের দোআ, আল্লাহ -র রহমত ও রাসুল -র সুপারিশ গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়। অতএব, এগুলোর প্রতি যত্নবান হও।
* আল্লাহ-র কাছে দয়া ও ক্ষমা চাও। যদি এ দুটি পেয়ে যাও, তবে মনে করবে পেয়ে গেছো সবই। বেঁচে গেছো সর্বপ্রকার অকল্যাণ থেকে।
* তওবা করার দ্বারা খুলে যায় মনের বন্ধ তালা। উন্মোচিত হয় বক্ষ। পেরেশানী হয় বিদূরিত। তওবা রিযিকের জানালা ও তাওফীকের দরজা।
* إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ - 'তোমার প্রতিপালক অত্যন্ত ক্ষমাশীল।' [সূরা নাজম: ৩২] তিনি গুনাহগারদের ক্ষমা করেন। ভুলত্রুটি মাফ করেন। ত্রুটি-বিচ্যুতি মিটিয়ে দেন। মন্দকে ঢেকে রাখেন এবং তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করেন।
* আমাদের আদি পিতা আদম গুনাহ থেকে তাওবা করেছেন। আর আল্লাহ তাঁকে নির্বাচন করেছেন, হেদায়েত দিয়েছেন এবং তাঁর ঔরস থেকে নবী-রাসুল, শহীদান, উলামায়ে কেরাম ও বুযুর্গানে দীন সৃষ্টি করেছেন। অতএব, দেখা যাচ্ছে গুনাহের পূর্বের তুলনায় পরেই উন্নত হয়েছেন।
* নূহ ফরিয়াদ করেছেন। তুফান তখন চরম আকার ধারণ করেছে। 'হে দয়াময়! হে অনুগ্রহকারী!' বলে তিনি আহ্বান করেছেন। চোখের পলকেই আল্লাহ -র সাহায্য নেমে এসেছে এবং তিনি কামিয়াব হয়েছেন। পক্ষান্তরে যারা কুফরি করেছে, তারা ধ্বংস হয়েছে।
* ইউনুস সমুদ্রে তিন স্তরের অন্ধকারে ছিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি দয়াময়ের দরবারে দয়ার আবেদন করেছিলেন। আবেদনে ছিল ভুলের স্বীকারোক্তি ও ওজর প্রকাশ। সর্বোপরি তাঁর যোগযোগের মাধ্যমও উন্নত ছিল। ফলে সাহায্যও এসেছিল বিজলীর ন্যায় অতি দ্রুত。
* দাউদ ভুল করে অনুতপ্ত হয়েছেন। আল্লাহ -র দরবারে কান্নাকাটি করেছেন। ফলে সেই ভুল তাঁর জন্য এক মহামূল্যবান নেয়ামতে পরিণত হয়েছে। কারণ, তিনি তাঁর প্রভুকে যথাযথভাবে চিনতে পেরেছিলেন। তাঁর কাছে নিজের অপারগতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করেছিলেন। আর এটাই দাসত্বের মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ -র সামনে দীনতা, হীনতা, অপারগতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করা দাসত্বের মূল স্তম্ভ।
* 'মুমিনের বিষয়টি কতই না উত্তম যে, আল্লাহ তার জন্য যে ফায়সালাই করেন, তা-ই তার জন্য কল্যাণকর হয়ে থাকে'-রাসুল -র এই বাণীটির ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া -কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, মুমিন বান্দা যদি কোনো গুনাহ করে ফেলে, তা হলেও কি তা তার জন্য কল্যাণকর হবে? তিনি জওয়াব দিয়েছিলেন, হাঁ; তবে শর্ত হচ্ছে গুনাহের পর লজ্জিত হতে হবে। তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে গুনাহ মুমিনের জন্য অপছন্দনীয় বিষয় হলেও অভ্যন্তরীণভাবে গুনাহও কল্যাণকর হতে পারে, যদি তার শর্ত পূরণ হয়ে থাকে।
* সব সময় তওবা-ইস্তিগফার করতে থাকো। কারণ, দিন-রাত সব সময়ই আল্লাহ-র রহমতের বাতাস বইতে থাকে। হতে পারে তা থেকে এক ঝাপটা তুমিও পেয়ে যাবে আর তা-ই কেয়ামতের দিন তোমার মুক্তির কারণ হয়ে যাবে।
📄 বই-কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো
* ভালো বই এমন এক সঙ্গী, যা অমঙ্গল, অকল্যাণ ও ক্ষতির দিকে তোমাকে প্রলোভন দেখায় না। এটা এমন এক বন্ধু যা তোমাকে বিরক্ত করে না। এটা এমন এক প্রতিবেশি, যে তোমার ক্ষতি করে না। এটা এমন এক অপরিচিত ব্যক্তি যে তোষামোদ করে তোমার থেকে কোনো সুবিধা বাগিয়ে নিতে চায় না। এটা ছলনা ও মিথ্যার মাধ্যমে তোমাকে প্রতারণা করে না। বই তোমার অনুভূতিকে শক্তিশালী ও মেধাকে তীক্ষ্ণ করে।
* বই-পুস্তক অধ্যয়ন করে যদি সঠিকরূপে উপকৃত হতে চাও, তবে অনেক বিষয় একসাথে পড়ে মস্তিষ্ককে বিক্ষিপ্ত করো না। বরং প্রথমে সুন্দর একটি রুটিন তৈরি করে নাও। অতঃপর সে অনুযায়ী সামনে অগ্রসর হও। যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।
* বই পড়ার সুযোগ যিনি পান, তিনিই সৌভাগ্যবান। কারণ, পৃথিবীর বাগান থেকে তিনি ফল সংগ্রহ করেন এবং জগতের বিস্ময়াবলি অবলোকন করেন। কালের গন্ডি পেরিয়ে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান।
* মানুষের সর্বোত্তম সঙ্গী- বই। তাই বই, জ্ঞান ও জ্ঞানীকে স্থায়ী বন্ধুরূপে গ্রহণ করো।
* সেসব বই-পুস্তক পাঠ করো না, যা উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতা নৈরাশ্য ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
* তোমার ঘরের গ্রন্থাগারটি তোমার জন্য সবুজ-শ্যামল বাগিচা স্বরূপ। তুমি সেখানে, বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ, জ্ঞানী-গুণী আলেম-উলামা, কবি- সাহিত্যিকদের সঙ্গে বিচরণ করো।
* সব সময় বই সাথে রেখো। সময়ের সংরক্ষণ ও অবসরকে কাজে লাগাতে বইয়ের বিকল্প নেই।
* পাঠের কিছু উপকারিতা হলো, এতে জবান খোলে, জ্ঞান বৃদ্ধি পায়, অন্তর পরিষ্কার হয়, দুশ্চিন্তা দূর হয়।
* দালান-কোঠা ও ধন-ঐশ্বর্য থেকে সেই বই উত্তম, যা দ্বারা বোধশক্তি শাণিত হয়, হৃদয়ে আনন্দ জাগে, নফসে শক্তি সঞ্চার হয়; যা বক্ষকে করে উন্মুক্ত ও চিন্তা-চেতনাকে করে পরিচ্ছন্ন।
* ধর্মদ্রোহীদের বই-পুস্তক পড়ো না। তাদের বই-পুস্তকে সেই সব ময়লা-আবর্জনা ও নোংরামি থাকে, যা অন্তরকে কলুষিত করে; এমন বিষ থাকে, যা আত্মাকে হত্যা করে ফেলে। এ সবের চিকিৎসা হচ্ছে ইলমে ওহী; যার দ্বারা আত্মা সুস্থতা লাভ করে।
* ইতিহাস পড়ো। ইতিহাসের বিস্ময়কর বিষয়গুলো নিয়ে ভাবো। তার দূর্লভ-দুস্প্রাপ্য বিষয় নিয়ে গবেষণা করো। উপভোগ করো ও উপকৃত হও ইতিহাসের ঘটনাবলি ও বৃত্তান্ত থেকে।
اقْرَأ التَّارِيخَ إِذْ فِيهِ الْعِبْرُ * ضَلَّ قَومُ لَيْسَ يَدْرُونَ الخَبر
ইতিহাস পড়ো কেননা এতে রয়েছে শিক্ষণীয় ঘটনাবলি, কেননা, যে জাতি নিজের খবর রাখে না, সে জাতি ধ্বংস হয়ে যায়।
📄 আচারিক সৌন্দর্যে বলিয়ান হও
সাধারণ মানুষ অন্যদের জন্য আয়নাস্বরূপ। যদি মানুষ অন্যদের সাথে উত্তম আচরণের সাথে ওঠাবসা করে, তা হলে অন্যরাও তার সাথে উত্তম আচরণ দেখায়। তার শিরা-উপশিরা কোমলতা অনুভব করে; হৃদয় শান্ত হয়। তার কাছে মনে হয় যে, সে বন্ধুত্বের অনুপম পরিবেশে জীবন অতিবাহিত করছে।
পক্ষান্তরে যখন একজন মানুষ অন্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, তখন অন্যরাও তার সাথে খারাপভাবে মেশে এবং রুক্ষ আচরণ করে। যে ব্যক্তি অন্যদের আদব-এহতেরাম করে না, অন্যরাও তার আদব- এহতেরাম করে না।
উত্তম আচরণের ব্যক্তি আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে। সংকট, সমস্যা ও পেরেশানী থেকে দূরে থাকে। তা ছাড়া উত্তম আচরণ হচ্ছে এবাদত। এর উপর নবী ﷺ অনেক বেশি তাগিদ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের বাণী হলো-
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَهِلِينَ
'মার্জনার পথ অবলম্বন করো; নেক কাজের হুকুম করো এবং জাহেলদেরকে এড়িয়ে চলো। [সূরা আ'রাফ : ১৯৯]
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرُهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
(হে নবী!) আল্লাহর রহমতের কারণে তুমি তাদের জন্য কোমলহৃদয় হয়েছ। অন্যথায় তুমি যদি দুর্ব্যবহারকারী ও পাষাণ- হতে, তা হলে এরা সবাই তোমার আশপাশ থেকে সরে যেত। সুতরাং তুমি তাদের ত্রুটিবিচ্যুতি মাফ করে দাও। তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং দীনের কাজে তাদেরকেও পরামর্শে রাখো। এরপর যখন তুমি কোন কাজের সংকল্প করো, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা (তাঁর উপর) ভরসা করে। [সূরা আলে ইমরান : ১৫৯]
নবী বলেছেন, তোমাদের মধ্য থেকে তারা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়, যারা আচার-ব্যবহারে সবচেয়ে ভালো; যারা সমন্বিত হৃদয়ের অধিকারী; যারা অন্যদেরকে চায় এবং অন্যরাও যাদেরকে চায়। আমার কাছে সবচেয়ে অপছন্দের লোক হচ্ছে তারা, যারা এর কাছে ওর কাছে কথাবার্তা লাগায় এবং পরস্পর মহব্বতকারীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং নেককারদের দোষ অনুসন্ধান করে।