📄 আল্লাহ যা দিয়েছেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো
আল্লাহ তোমাকে যে ধন-সম্পদ, রূপ-সৌন্দর্য, ঘর-বাড়ি, সন্তান- সন্ততি, মেধা-যোগ্যতা দান করেছেন, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। ঐশী আদেশও সেরকমই-
فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُنْ مِّنَ الشَّكِرِينَ﴾
আমি তোমাকে যা দিয়েছি, তা গ্রহণ করো এবং কৃতজ্ঞ হও। [সূরা আ'রাফ : ১৪৪]
আমাদের পূর্বসূরী উলামায়ে কেরাম ও ইসলামের সূচনা লগ্নের মানুষেরা গরীব ছিলেন। বাড়ি-গাড়ি, দালান- কোঠা, গোলাম-বাঁদি কিছুই ছিল না তাদের। তথাপি তারা ছিলেন সুখী ও সফল। মানবতার কল্যাণে তারা কাজ করে গেছেন নিরলস। কারণ, আল্লাহ তাদেরকে কল্যাণের যতটুকু তওফীক দিয়েছিলেন, তার যথাযথ প্রয়োগ তারা করেছিলেন। ফলে তারা সকল কাজকর্মে পেয়েছিলেন প্রভূত বরকত।
অপরপক্ষে এমনকিছু মানুষ ছিল যাদেরকে ধন-ঐশ্বর্য, সন্তান- সন্ততিসহ সব ধরণের নেয়ামত দ্বারা ভূষিত করা হয়েছিল। কিন্তু সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে সেসকল নেয়ামত তাদের কোনো কাজেই আসেনি। দুর্ভাগ্য ও অস্থিরতা কখনও তাদের পিছু ছাড়েনি। পার্থিব উপায়-উপকরণই যে সব কিছু নয়- এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
তুমি দেখবে, এমন অনেক মানুষে রয়েছে, যারা বড় বড় বহু ডিগ্রী বগলদাবা করে ঘুরছে। কিন্তু তাদের মেধা, ও যোগ্যতা অকেজোই থেকে গেছে। এর বিপরীতে তুমি এমনও বহু মানুষ দেখতে পাবে, যাদের ইলম ও জ্ঞান সীমিত। কিন্তু সেটুকুতেই তারা মানবজাতির উপকার ও কল্যাণের জন্য নির্ঝরিনী বানিয়ে প্রবাহিত করছে।
যদি তুমি সুখী হতে চাও, তা হলে আল্লাহ প্রদত্ত তোমার রূপ-সৌন্দর্য যেমনই হোক; যে বংশেই হোক তোমার জন্ম, যেমনই হোক তোমার কণ্ঠ, তাতেই থাকো তুমি সন্তুষ্ট। নিজের আয়-উন্নতির উপরই থাকো পরিতৃপ্ত।
ইতিহাস পড়ে দেখো, সেখানে এমন বহু মানুষের কথা উল্লেখ রয়েছে, যাদের জীবন কেটেছে অল্পেতুষ্টিতে। ফলে তারা অর্জন করতে পেরেছিলেন জগতজোড়া সুনাম-সুখ্যাতি।
উদাহরণত:
আতা ইবনে আবী রাবাহ : তিনি তার সময়ের সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন। অথচ তিনি পূর্বে ক্রীতদাস ছিলেন। তার গায়ের রঙ ছিল কালো। নাক ছিল চেপ্টা। তদুপরি তিনি ছিলেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত।
আহনাফ ইবনে কাইস : ধৈর্য ও সহনশীলতায় সমগ্র আরবে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। ছিলেন শীর্ণকায়, কুঁজো, দুর্বল ও ন্যুব্জ। তার এক পায়ের গোছা ছিল আরেক পায়ের তুলনায় বেশ খাটো।
আ'মাশ : তিনি তার সময়ের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন একজন আযাদকৃত গোলাম। তার দৃষ্টিশক্তি ছিল ক্ষীণ। ছিলেন হতদরিদ্র। ছেঁড়া-ফাটা ছিল তার পোশাক।
এছাড়াও আম্বিয়ায়ে কেরামের জীবনও আমাদের সামনে উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অনেক নবী-রাসুলই মেষ চড়িয়েছিলেন। দাউদ ছিলেন কর্মকার। যাকারিয়া ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। ইদরিস ছিলেন দর্জি। অথচ তাঁরা সবাই ছিলেন শ্রেষ্ঠ মানব।
মনে রেখো, তোমার মূল্য ও মর্যাদা নির্ণিত হয় তোমার যোগ্যতা ও কর্মে। তাই, রূপ-লাবণ্য, ধন-সম্পদ কিংবা পরিবারে কোনো ঘাটতি দেখা দিলে সেজন্য দুঃখ করো না। আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো।
نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا
আমিই তাদের মাঝে তাদের জীবিকা বন্টন করে দিয়েছি পার্থিব জীবনে। [সূরা যুখরুফ: ৩২]
📄 জান্নাতের কথা স্মরণ করো
পৃথিবীতে যদি তুমি অভুক্ত, অসুখী, মুখাপেক্ষী, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, অসুস্থ, প্রতারিত ও অত্যাচারিত হও, তা হলে স্মরণ করো চিরস্থায়ী জান্নাতে কথা। যখন তুমি এমনটি করা শুরু করবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করবে, তখন দেখবে, তোমার লোকসানগুলো পরিণত হবে লাভে। বিপদ-আপদগুলো পরিণত হবে উপহারে।
দুনিয়ার বুকে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী তিনিই, যিনি আখেরাতের জন্য কাজ করেন। কেননা, আখেরাতই উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।
সৃষ্টিজীকুলের মধ্যে সর্বাধিক নির্বোধ সে-ই, যে দুনিয়ার সুখ-শোভা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেয়। এ শ্রেণির লোকেরা যখনই কোনো বিপদে পড়ে, তখন ভীষণ রকম ঘাবড়ে যায়। সীমাতিরিক্ত অস্থিরতায় ভোগে। কেননা, তাদের দৃষ্টির সীমা জুড়ে রয়েছে কেবল এই তুচ্ছ-নগণ্য দুনিয়া। তাদের সকল কার্যাদির কেন্দ্র জুড়ে রয়েছে এই পার্থিব জীবন। দুনিয়া ছাড়া তাদের ভাবনায় নেই অন্যকিছুই।
إِنَّ الْآخِرَةَ قَدْ ارْتَحَلتْ مقْبِلَةً ، وَإِنَّ الدُّنْيَا قَدْ ارْتَحَلَتْ مُدْبِرَةٌ
আখেরাত এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে, আর দুনিয়া যাচ্ছে দূরে সরে।
فَكُونُوا مِن أَبناء الآخِرَةِ ، وَلَا تَكُونُوا مِن أَبناء الدُّنْيا ،
তাই হও আখেরাতমুখী; দুনিয়ামুখী হয়োনা।
فَإِنَّ الْيَوْمَ عَمَلُ ولا حساب ، وغَداً حساب ولا عَمَلُ.
মনে রেখো, দুনিয়া আমলের জায়গা, হিসাব-নিকাসের জায়গা নয়; আর আখেরাত হিসাব-নিকাসের জায়গা আমলের জায়গা নয়।
নির্বিঘ্ন জগত-জীবন, নির্ঝঞ্ঝাট সুখ-শান্তিই তাদের একমাত্র কাম্য। অথচ তাদের দিলের মরিচা যদি দূর হতো, তাদের চোখ থেকে যদি মূর্খতার পর্দা সরে যেতো, তা হলে তারা চিরস্থায়ী জান্নাত, তার অফুরন্ত নেয়ামত, সুরম্য অট্টালিকা ও চিরস্থায়ী জীবনের কথা ভাবতো। পবিত্র কোরআনে জান্নাতের যে সকল গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যাবলির কথা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতো।
জান্নাতের সেই নেয়ামতরাজি পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজন কঠোর ত্যাগ ও পরিশ্রমের। জান্নাতের সুখ-শোভা, আরাম-আয়েশ হবে অসীম। আমারা কি ভেবে দেখেছি যে, জান্নাতবাসীরা কখনও হবে না রোগাক্রান্ত। হবে না দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তারা সেখানে অমর ও চিরকুমার হয়ে থাকবে। তাদের পরিধানের কাপড় কখনো হবে না পুরোনো। জান্নাতের কক্ষগুলো এমন হবে যে, বাইরে থেকে ভেতরে এবং ভেতর থেকে বাইরে দেখা যাবে। সেখানে থাকবে এমনসব নেয়ামত, কোনো চক্ষু যা কখনও দেখেনি, কোনো কান যা কখনও শোনেনি, কোনো অন্তর যার কল্পনাও কখনও করেনি।
আরোহী ব্যক্তি একশ' বছরেও জান্নাতের একটি গাছের ছায়া অতিক্রম করতে পারবে না। জান্নাতের একটি তাবুর দৈর্ঘ হবে ষাট মাইল। জান্নাতের নদীগুলো থাকবে সদা প্রবাহমান।
প্রাসাদগুলো হবে সুরম্য ও সুবিশাল। গাছের ফলগুলো থাকবে সন্নিকটে ঝুলন্ত। নির্ঝরিনী প্রবাহিত হতে থাকবে অবিরাম। হাতের কাছেই প্রস্তুত থাকবে পানপাত্র। বিছানো থাকবে কোমল আসন ও অমূল্য গালিচা। থাকবে আনন্দ-সুখের পূর্ণ আয়োজন। চারপাশ সুবাসে করবে মৌ মৌ। জান্নাতের সবকিছুই হবে সতেজ-সজীব। এক কথায়, জান্নাতের গুণ-বৈশিষ্ট বর্ণনাতীত।
কী হলো আমাদের বিবেক-বুদ্ধির? কেন আমরা তা নিয়ে চিন্তা-ফিকির করছি না? আমরা সবাই যেহেতু চাই জান্নাতে প্রবেশ করতে, তা হলে রুগ্ন, দরিদ্র, দুর্দশাগ্রস্তদের কিসের দুশ্চিন্তা? শেষ পরিণতি শুভ হবে-এই ভেবে বরং তাদের খুশিই হওয়া উচিত। আমদের সকলেরই উচিত, পার্থিব দুঃখ-কষ্টের প্রতি লক্ষ না করে নেক আমল করে যাওয়া। যাতে পেতে পারি আল্লাহ -র নেয়ামতরাজি। হতে পারি তাঁর জান্নাতে হকদার।
سَلْمٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ
তোমরা যে ধৈর্য ধারণ করেছ, সেজন্য তোমাদের উপর শান্তি; কতই না উত্তম এই পরিণাম। [সূরা রা'দ : ২৪]
📄 মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো
তোমার বিবেক ও শরীয়ত দুটোই তোমাকে বলে- মধ্যমপন্থী হতে। বলে বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি কোনোটিই না করতে। চরমপন্থা কিংবা নরমপন্থা কোনোটিই অবলম্বন না করতে। সুখ-অন্বেষী ব্যক্তির উচিত নিজের কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করা; সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি, হাসি-আনন্দ, দুঃখ-কষ্ট সর্বাবস্থায়ই মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা। কেননা, পরিস্থিতির প্রভাবে আচার-আচরণে বাড়াবাড়ি কিংবা অপরিমিত শিথিলতা নফসের উপর জুলুম করার নামান্তর। মধ্যমপন্থাই সর্বোত্তম পন্থা। শরীয়ত অবতীর্ণ হয়েছে নির্দিষ্ট একটি মানদন্ড নিয়ে। জীবনের ভারসাম্যতা ন্যায়ানুগের উপর প্রতিষ্ঠিত।
সর্বাধিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সেই ব্যক্তি যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে। তুচ্ছ বিষয়ও তার কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়। আলোকে অন্ধকার মনে হয়। ঈর্ষা, কপটতা ও হিংসা-বিদ্বেষের চতুর্মুখী লড়াইয়ে তার মন ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে। সে কল্পনা-বিলাসে মোহগ্রস্ত থাকে। দুনিয়ার সবাইকে সে তার বিরুদ্ধবাদী জ্ঞান করতে থাকে। সবাই তাকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত- এমনটি ভাবতে থাকে। এ কারণে সে দুশ্চিন্তা ও পেরেশানীর আবর্তে সে ঘুরপাক খেতে থাকে। এমনটা কেবল সে-ই করে, যে আত্মিক শক্তি থেকে বঞ্চিত ও ঐশী হুকুম আহকাম সম্পর্কে অজ্ঞ।
﴿ يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ ﴾ *
প্রত্যেক শোরগোলকেই তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। [সূরা মুনাফিকুন : ৪]
অতএব, তোমার মনকে আপন অবস্থায় থাকতে দাও। প্রায়ই এমন হয় যে, যে বিষয় নিয়ে অধিক আশঙ্কা করা হয়, তা ঘটে না। তাই তুমি যে বিষয়টি নিয়ে ভয় পাচ্ছো তার সর্বাপেক্ষা অশুভ পরিণতির কথা ভেবে সে পরিণতিতে নিজেকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকো। এভাবে তুমি নিজেকে সেসকল আতঙ্ক ও অমূলক ধ্যান-ধারণা থেকে রক্ষা করতে পারবে, যেগুলো ঘটার আশঙ্কায় তুমি ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলে।
অতএব, প্রতিটি বিষয়কে তার বাস্তবতা ও প্রয়োজন অনুপাতে মূল্যায়ন করো। এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি করো না। বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো। অহেতুক সন্দেহপ্রবণ ও কল্পবিলাসী হয়ো না। অলীক ধ্যান-ধারণার পেছনে পড়ো না। ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা-উভয় ক্ষেত্রেই হাদিসে বর্ণিত মাপকাঠি মেনে চলো-
أَحْبِبْ حَبِيْبَكَ هَوْناً مَا ، فَعَسَى أَن يَكُوْنَ بَغِيضَكَ يَوْماً مَا ، وَأَبَعْضُ بَغِيْضَكَ هَوْناً مَا ، فَعَسَى أَن يَكُونَ حَبِيبَكَ يَوْماً مَا
যাকে তুমি ভালোবাস তাকে পরিমিত পরিমাণে ভালোবাসো, কেননা হতে পারে এমন একদিন আসবে, যেদিন সে তোমার ঘৃণার পাত্রে পরিণত হবে। আর যাকে তুমি ঘৃণা করো, তাকে সংযত পরিমাণে ঘৃণা করো। কারণ, হতে পারে এমন একদিন আসবে, যেদিন সে তোমার প্রিয়পাত্রে পরিণত হবে।
عَسَى اللَّهُ أَن يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُم مِّنْهُم مَّوَدَّةً وَاللَّهُ قَدِيرٌ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
যারা তোমাদের শত্রু, আল্লাহ্ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে হয়তো বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন, আল্লাহ সবই করতে পারেন এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। [সূরা মুমতাহিনাহ: ৭]
মনে রেখো, অধিকাংশ আশঙ্কা ও গুজব বাস্তব হয় না。