📄 আল্লাহমুখী হও
অসহায়ের ডাকে কে সাড়া দেয়? বিপদে-আপদে কে সাহায্য করে? বিশ্বজগতের সবাই কার মুখাপেক্ষী? কার যিকির সবার মুখে মুখে? তিনি আল্লাহ। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই。
দুঃখ-দুর্দশায়, বিপদে-আপদে স্মরণ করব তাঁকেই। সাহায্য চাইব তাঁর কাছেই। মাথা নত করব তাঁর দরবারেই। তাঁর কাছেই করব প্রার্থনা, হয়ে যাব তাঁরই। তবেই নেমে আসবে তাঁর সাহায্য। খুলে যাবে তাঁর রহমতের দুয়ার।
তিনিই ডুবন্তকে বাঁচান। বিপদগ্রস্তকে মুক্তি দেন। মজলুমকে সাহায্য করেন। পথহারাকে পথ দেখান। অসুস্থকে সুস্থ করেন। নিঃসহায়ের সহায় হন।
﴿فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ﴾
তারা যখন জলযানে আরোহণ করে, তখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকেই ডাকে। [সূরা আনকাবুত : ৬৫]
মানুষের দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য যেসব দোআ রয়েছে, সেগুলো তুমি হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে পাবে। (আমি এখানে আর তা উল্লেখ করলাম না। সেখান থেকেই শিখে নিও এবং ওগুলোর সাহায্যে) আল্লাহ -র সাথে কথা বলো। তাঁর কাছে সাহায্য চাও। মনে রেখো, তাঁকে যদি পাও তবে সবকিছুই পেলে তুমি। আর তাঁকে যদি না পাও, তবে কিছুই পেলে না তুমি।
দোআ একটি বড় এবাদত। তুমি যদি উত্তমরূপে তাঁর কাছে চাইতে পারো, তাহলে তুমি কখনও ভুগবে না হতাশায়। দুশ্চিন্তারা তোমায় ধরবে না ঘিরে। কেননা, একমাত্র তাঁর রশি ছাড়া সব রশিই যাবে ছিঁড়ে। তার দুয়ার ছাড়া সব দুয়ারই হয়ে যাবে রুদ্ধ। আমাদের অতি কাছেই তিনি আছেন। সবকিছু দেখেন। সবকিছু শোনেন।
দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি যখন তাঁর কাছে ফরিয়াদ জানায়, তখন তিনি তা উত্তমরূপেই শুনতে পান। তিনি মহাপরাক্রমশালী। অমুখাপেক্ষী।
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ﴾
তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। [সূরা মুমিন: ৬০]
তাই, যেকোনো বিপদে, যে কোনো সংকটে, স্মরণ করো তাঁর নাম। ডাকো তাকেই। সাহায্য চাও তাঁর কাছে। তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো। লুটিয়ে পড়ো সেজদায়। তবেই তুমি লাভ করবে তাঁর গোলাম হওয়ার মর্যাদা।
দু'হাত তোলো। বিছিয়ে দাও ভিক্ষার আঁচল। ক্ষমা চাও তাঁর কাছে। জপো তাঁর নাম। তালাশ করো তাঁর রহমত। সু-ধারণা পোষণ করো তাঁর প্রতি। হও একনিষ্ঠ। আকড়ে থাকো তাঁর দুয়ার। তবেই তুমি পাবে প্রকৃত সুখ ও সাফল্যের দেখা।
📄 অবস্থান করো ঘরেই
মূর্খ ও অসৎ লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করো। সম্ভব হলে অধিকাংশ সময় ঘরেই অবস্থান করো। এতে মানসিকভাবে প্রশান্তি লাভ করবে। যেসব কাজ তোমাকে আল্লাহ্-র আনুগত্য থেকে বিমুখ করে দেয়, সেসব কাজ থেকে দূরে থাকো। এটি এমন এক ঔষধ, যা আল্লাহর ওলীগণ ব্যবহার করেছেন এবং সুফল পেয়েছেন।
আরেকটি কথা যা আমি তোমাকে বলতে চাই, তা হলো- তুমি সকল প্রকার পাপাচার, অনর্থক কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকো। এতে যেমন কার্যক্ষম হবে তোমার মেধা, তেমনি সুরক্ষিত থাকবে তোমার মর্যাদা। মহান প্রভুর সাথেও সম্পর্ক স্থাপনের মিলবে সুযোগ।
তবে কিছু স্থান রয়েছে যেখানে সমবেত হওয়া ও মানুষের সাথে কথাবার্তা বলা প্রয়োজনের গন্ডিতে পড়ে। যেমন, সালাতের জামাত, জুমা, ইলমে দীনের মজলিস ও ভালো কাজে সহযোগিতার স্থান। অতএব, তুমি অলসতা ও অকর্মণ্যতার স্থান থেকে দূরে থাকো। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য রোনাজারি করো। জবানকে সংযত রাখো এবং ঘরের ভেতরেই অবস্থান করো।
বেকার ও অলস লোকদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। যদি করো তবে তুমি যেন নিজের বিরুদ্ধে নিজেই যুদ্ধ ঘোষণা করলে। মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক স্বস্তিকে নিজ হাতে ধ্বংস করলে। কেননা, এরা সময় নষ্ট করতে পটু। গুজব রটানোতে সিদ্ধহস্ত। ফেতনা ছড়ানোতে দক্ষ। এরা তোমাকে হতাশা ও নিরাশার সাগরে এমনভাবে হাবুডুবু খাওয়াবে যে, মরার আগেই তুমি দশবার মারা যাবে।
لَوْ خَرَجُوا فِيكُمْ مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا
যদি তারা তোমাদের সাথে (অভিযানে) বের হত, তা হলে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করত না। [তওবা: ৪৭]
আমার বিশ্বাস, তুমি নিজেকে তোমার ঘরে আলাদা করে রাখবে। একমনে নিজের কাজ করে যাবে। হাঁ, কোথাও কোনো ভালো কাজ কিংবা কল্যাণকর বিষয় থাকলে, অবশ্যই তাতে অংশগ্রহণ করবে। এতে তোমার মন পাবে শান্তি। কাজে লাগবে সময়। জীবন হবে না ধ্বংস। জবান পরনিন্দা থেকে বাঁচবে। কান শোনবে না কোনো মন্দ কথা। মনে জাগবে না কোনো খারাপ আকাঙ্ক্ষা। এই ফর্মুলাটি তুমি ট্রাই করে দেখো, সফলতা তোমার পদচুম্বন করবে। কল্পনায় যার বসবাস, অনর্থক সময় নষ্ট করা যার অভ্যাস, তাকে দূর থেকেই বলো - সালাম বলো।
📄 প্রতিদান একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাও
আল্লাহ যদি তোমার কাছ থেকে কোনো কিছু নিয়ে নেন, আর তুমি যদি ধৈর্য ধারণ করতে পারো এবং সাওয়াবের আশা রাখতে পারো, তা হলে তিনি এরচেয়েও উত্তম কিছু দিয়ে তোমাকে তার প্রতিদান দেবেন।
হাদিসে কুদসীতে তিনি এরশাদ করেছেন- আমি যার দুটি প্রিয় বস্তু অর্থাৎ দুটি চোখ ছিনিয়ে নিই এবং সে ধৈর্যধারণ করে, তার একমাত্র বিনিময় হচ্ছে জান্নাত।
অন্য আরেকটি হাদিসে বর্নিত হয়েছে- এ দুনিয়া থেকে আমি যার কোনো বন্ধুকে ছিনিয়ে নিই আর সে ধৈর্যধারণ করে এবং সাওয়াবের আশা রাখে, এর বিনিময়ে আমি তাকে দান করবো জান্নাত।
যদি কেউ সন্তান হারিয়ে ধৈর্য ধারণ করে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে। যে ঘরের নাম হবে ‘বাইতুল হামদ’ (প্রশংসার ঘর)। তাই ভেবে-চিন্তে কাজ করবে। বিপদ-আপদে ঘাবড়ে যাবে না। হা-হুতাশ করবে না।
বিপদ যিনি দিয়েছেন, তাঁর কাছে আছে জান্নাত। আছে সাওয়াবের খাজানা। নেয়ামতের ভান্ডার। সুতরাং, আল্লাহ-র যেসকল নেককার বান্দা বিপদে পড়বে এবং সাওয়াবে আশায় ধৈর্যধারণ করবে, জান্নাতে তাদেরকে বলা হবে-
سَلَّمٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ
তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তোমাদের ধৈর্য ধারণের বিনিময়ে। তোমাদের এ পরিণাম-গৃহ কতই চমৎকার। (রা'দ: ২৪)
তাই আমাদের উচিত বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং উত্তম প্রতিদানের জন্য অপেক্ষা করা।
أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ)
তারাই হল সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়াতপ্রাপ্ত। [সূরা বাকারা: ১৫৭]
মসিবতগ্রস্তদের জন্য সুখবর। দুর্দশাগ্রস্তদের জন্য সুসংবাদ। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। এর ধন-সম্পদ নিতান্তই তুচ্ছ। পক্ষান্তরে পরকাল চিরস্থায়ী ও উত্তম। তার নেয়ামত অফুরন্ত। দুনিয়াতে যে সমস্যা-জর্জরিত, আখেরাতে তার পুরস্কার মহা উন্নত। দুনিয়াতে যে ভোগ করবে ক্লান্তি, আখেরাতে সে লাভ করবে মহা প্রশান্তি।
অতএব, হে বিপদগ্রস্ত! তুমি হারাওনি; বরং পেয়েছো। তুমি লসে নয়, লাভেই আছো।
অপরদিকে পৃথিবীর সাথে যাদের সম্পর্ক সুনিবিড়, দুনিয়ার ভোগ বিলাসের প্রতি যারা চরম আসক্ত, তাদের জন্য এর আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করা বড়ই কঠিন। সামান্য বিপদেই ঘাবড়ে যায় তারা। অল্পতেই হয়ে যায় বিচলিত। তুচ্ছ সমস্যাও তাদের সামনে ধরা দেয় সুবিশাল হয়ে।
فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ
অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা থাকবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব। [সূরা হাদীদ : ১৩]
বস্তুত আল্লাহ -র কাছে যা আছে, তা উত্তম, উৎকৃষ্ট ও সুন্দর।
📄 আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান রাখো
যার মাঝে নেই ঈমানের নূর, যার কাছে নেই বিশ্বাসের ঐশ্বর্য, সে-ই তো হতভাগা। জীবনটা তার ব্যর্থতার চাদরে মোড়ানো। দূর্দশা ও লাঞ্ছনা তার চিরসঙ্গী।
﴿ وَ مَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا ﴾
আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকুচিত। [সূরা ত্ব-হা : ১২৪]
যদি চাও আত্মাকে পবিত্র করতে, যদি চাও দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে মুক্ত থাকতে, তাহলে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহ -র প্রতি পূর্ণ ঈমান রাখো। এটাই হচ্ছে একমাত্র উপায়। প্রকৃতপক্ষেই ঈমান ছাড়া জীবনের কোনো স্বাদ নেই। ঈমানহীন জীবন হতভাগা জীবন। ঈমানহারা ব্যক্তি জীবনের বোঝা, শৃঙ্খল ও অন্ধকার থেকে মুক্তির দিশা খুঁজে পায় না।
﴿ وَ نُقَلِبُ أَفْدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَ نَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ ﴿١١٠ ﴾
আমি তাদের মনোভাব তেমনি পরিবর্তন করে দেব, যেমনিতার এর প্রতি ঘুরে বেড়াতে প্রথমবার ঈমান আনেনি এবং আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে দেবো। [সূরা আনআম : ১১০]
তোমার ঈমান যতটা সবল ও দুর্বল, দৃঢ় ও কোমল হবে, সে অনুপাতেই তুমি সুখ ও সৌভাগ্য লাভ করবে।
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَ هُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيُوةٌ طَيِّبَةً وَ لَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿٩٧﴾
যে কোনো ঈমানদার নর-নারী নেক আমল করবে, আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র জীবন দান করবো এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করবো। [সূরা নাহল: ৯৭]
যদি তোমার অন্তরে থাকে সৌম্যতা, হৃদয় থাকে সদা আল্লাহ -র ভালোবাসায় পূর্ণ, মন থাকে বক্রতামুক্ত, বিপদ-আপদে তুমি থাকো প্রশান্ত, তাকদীরের ফয়সালায় তুমি থাকতে পারো সন্তুষ্ট- তবে সেটাই তো ‘পবিত্র জীবন’। কারণ, এর অর্থ হলো- তুমি আল্লাহ -কে রব, ইসলামকে দীন এবং মুহাম্মাদ -কে রাসূল হিসেবে মেনে নিয়েছো।